দিলীপ পালের লেখা: বাংলাদেশে সংষ্কৃতি-চর্চা, নববর্ষ ও মৌলবাদ

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ১৭ এপ্রিল ২০১৪ ২:৩৮ অপরাহ্ন

এদেশেরই মানুষ ছিলেন তিনি। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় শৈশব ও কৈশোর কাটিয়ে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে আই-এ পাশ করেন। এরপর কিসে কি হলো তিনি পাড়ি জমালেন কোলকাতা। সেখান থেকে শান্তিনিকেতনে। বাবা মা ভাই বোন সবাই রয়ে গেলেন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায়; কেবল দিলীপ পাল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেই গিয়ে হাজির হলেন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে–একা। সেখানে পড়লেন রসায়ণ। সেখানে স্নাতকোত্তর পাশ না করা পর্যন্ত চুটিয়ে যাপন করলেন ছাত্র জীবন। আবার, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে চাঁদা তুলে নানাভাবে সাহায্যও করলেন।

দিলীপ পালের সম্মোহনী শক্তি ছিলো তাঁর কন্ঠস্বরে–যেমন বাচনভঙ্গি তেমনি উচ্চারণগুণে শ্রুতিমধুর। গাইতেনও খুব ভালো কিন্তু কেন যেন প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষা নেননি। শিল্প সাহিত্যবোধ ছিলো তাঁর অত্যন্ত উন্নতমানের। স্ত্রী মন্দিরা পাল কোলকাতার দূরদর্শনের একজন প্রযোজক ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি বেশ কিছু শিল্পোত্তীর্ণ অনুষ্ঠান তৈরি করেন। এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কন্ঠের বিবর্তন নিয়ে করা কবিকন্ঠ, শ্রীমতি কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে ডকুমেন্টারী ইত্যাদি অনুষ্ঠান বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নেপথ্যে থেকে দিলীপ পাল এসবের স্ক্রিপ্ট রচনা থেকে শুরু করে নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে মন্দিরা পালকে সহযোগিতা করতেন।

মানুষ হিসেবেও দিলীপ ছিলেন অত্যন্ত সৎ এবং আদর্শবাদী। নিজের প্রতিবন্ধী ছেলে, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় নদীর নামে যার নাম–সেই তিতাসের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেন বললে অত্যুক্তি হবে না। জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী ছেলেটি, যে চলাফেরা করতে পারতো না, কথাও বলতে পারতো না, সেই ছেলেটিকে তিনি তেইশটি বছর একনিষ্ঠভাবে নিরব কর্তব্যনিষ্ঠার প্রনোদনায় শুশ্রুষা করেন। ডাক্তার অনেক আগেই বলেছিলেন, মি. পাল ইউ আর ফাইটিং এ লস্ট ব্যাটেল। দিলীপের উত্তর ছিলো, সে আমাদের অতিথি, তার প্রতি আমার স্বাভাবিক যে দায়িত্ব তা করতেই হবে। গানের প্রতি তিতাসের ছিলো এক সহজাত প্রবৃত্তি। তো এই ছেলেকে তিনি ওস্তাদ রেখে গান পর্যন্ত শেখানোর অসম্ভব প্রয়াসে রত হয়েছিলেন। প্রতিবছর ছেলের জন্মদিনে তিনি আয়োজন করতেন সঙ্গীতানুষ্ঠান। সেখানে কোলকাতার স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পীরা গান করে তিতাসকে আনন্দ ও প্রেরনা দিতেন। প্রথমে স্ত্রীর মৃত্যু, তার ন’মাসের মাথায় ছেলের মৃত্যুর পর দিলীপ পালের জীবনে কেবল শূণ্যতা ছাড়া আর কিছুই রইলো না। এই শূণ্যতা নিয়েই তিনি বছর দেড়েক বেঁচে থেকে গত ২৫শে মার্চ সকালে পরলোক গমন করেন। মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধির একনিষ্ঠ প্রবক্তা এবং অনুসারী–যে গুণ এযুগে আমাদের মধ্যে ক্রমেই দূর্লভ হয়ে উঠছে–তো এরকম একজন গুনী মানুষের চলে যাওয়ায় যে একটি শূণ্যতার সৃষ্টি হলো তা ঠিক সেভাবে আর কোনোদিনই পূরণ হবে না।

আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু দিলীপ পালের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর একটি লেখা যা পশ্চিম বঙ্গের মন্থন সাময়িকীর মে-জুন ২০০১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিলো, তো সেই লেখাটিরই অংশবিশেষ এখানে প্রকাশিত হলো । –খালিকুজ্জামান ইলিয়াস

বাংলাদেশের সংস্কৃতি-চর্চায় নতুন কোন উন্মোচন ঘটলে আমরা, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা, বলা ভালো, হিন্দু বাঙালিরা খুব উদ্দীপিত বোধ করি, আবার সেই চর্চার আচমকা কোন আঘাত এলে আমরা খুব বিচলিত হয়ে পড়ি। এজন্যেই সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সুরম্য রমনা-উদ্যানে বাংলা নববর্ষের উৎসব চলার সময় আকম্মিক বোমা-বিস্ফোরণে ৮ জনের মৃত্যু ও অনেকের আহত হওয়ার ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের অনেক সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিদের খুব বেদনাহত করেছে। ভারতের অন্য কোন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আমাদের আবেগকে এতটা মথিত করে না। এর কারণ অবশ্যই ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ইতিহাস ও ভূগোল একসূত্রে গাঁথা। এ যেন ভাগীরথী ও পদ্মার মতো দুই প্রবাহ, মূল গঙ্গা থেকে মাঝপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুটি ভিন্নপথে একই সাগরের দিকে যাত্রা।
দেশভাগ বা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাদেশ ছিল আমাদের কাছে পূর্ববাংলা, আক্ষরিক অর্থেই সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা এক দেশ, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘সোনার বাংলা’। ও দেশের গণচেতনার দিকে তখন আমাদের বিশেষ দৃষ্টি ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর পূর্বপাকিস্তানে ভাষাআন্দোলনের মাধ্যমে যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মষ ঘটে, তখন থেকেই ওদিকে আমাদের নজর পড়ে। এই জাতীয়তাবাদী চেতনা যত তীব্র হতে থাকে ততই আমাদের ঔৎসুক্য বাড়ে। আমরা আলোড়িত হতে থাকি। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার সূচনা হয়েছিল (‘হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন’,… ‘জন্ম যদি তব বঙ্গে’, মাইকেলের ইত্যাদি কবিতা স্মরণীয়) গত শতাব্দীর গোড়ায় বঙ্গ-ভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যা একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করে এবং পরে যা নানাজাতি অধ্যুষিত বৃহত্তর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা ঘাতপ্রতিঘাতে ক্রমশঃ ম্লান হয়ে পড়ে, আমাদের মনে হল, বাংলাদেশের ভাষাআন্দোলনে সেটাই যেন নবরূপে পুনর্জীবন লাভ করেছে। ভাষাআন্দোলন ও তার অনুবর্তী নানা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যে আমরা আমাদের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার ফসল যেন প্রতক্ষ করতে থাকি। বাংলাদেশের নববর্ষ উৎসব ওখানকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সাম্প্রতিক সংযোজন, যদিও আমরা অনেকেই এ সম্পর্কে ঠিক ওয়াকিবহাল নই।

লোকায়ত বৈশাখী মেলা বা পারিবারিক স্তরে নববর্ষকে অভ্যর্থনা জানাবার এক দীর্ঘ এতিহ্য বাংলাদেশে ছিল। বছরের প্রথম দিনটিকে সুখের আগমনী হিসেবেই দেখা হতো, কিন্তু সেই বিশেষ আবেগটিকে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ শুরু হয় ষাটের দশকের গোড়ায়, আয়ুব খাঁর স্বৈরশাসনের সময়, উদ্যোক্তা ছিল প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। প্রভাতফেরী করে রমনার উদ্যানে সমবেত হয়ে সংগীত পরিবেশন করা হতো।

আপাতভাবে এটি একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও আসলে এটা ছিল বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী নানা দমননীতির বিরুদ্ধে এক প্রতীকী প্রকাশ্য বিদ্রোহ। পরে অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংস্থাও তাতে যোগ দেয় এবং নববর্ষের এই অনুষ্ঠান ক্রমশঃ জনপ্রিয় হতে থাকে। তবুও এটি ঢাকা শহরেই সীমিত থাকে, এমনকি, বাংলাদেশ হবার পরও। বাংলাদেশে সামরিক শাসন প্রবর্তনের পর বিভিন্ন জেলাশহরে এর প্রসার ঘটে। গোড়ায় যা ছিল রমনা-উদ্যানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রমশঃ তা হয়ে উঠলো সারা দেশের শহরে মধ্যবিত্তদের এক বর্ণাঢ্য উৎসব। ৯০-এর দশকের গোড়ায় বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলনেত্রী বেগম হাসিনা যখন ঢাকায় নববর্ষের সকালে নানা ফেষ্টুন, ব্যানার-শোভিত এক বিশাল শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন তখন নববর্ষের উৎসব বাংলাদেশে এক বিশেষ মাত্র পেয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে, বিশেষত শহরগুলোতে নববর্ষের উৎসাহ এমন পারিব্যাপ্ত হয়েছে, সারাদেশ জুড়ে সেদিন এমন উদ্দীপনা দেখা যায় যে পশ্চিমবাংলায় আমরা যারা নববর্ষের দিন ব্যবসায়ীদের গণেশপূজো ও হালখাতার অনুষ্ঠান দেখে অভ্যস্ত, তারা তা কল্পনাও করতে পারবো না। এরকম একটি উৎসবের মঞ্চকে বাংলাদেশেরই কিছু লোক কেন আক্রমণ করল, তার কারণ কেবল বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে খুঁজলেই চলবে না, সেখানকার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতার মধ্যেই আমাদের তা খুঁজে দেখতে হবে। এখানেই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনায় ধর্মীয় ভূমিকার প্রসঙ্গটি এসে পড়ে।

ধর্মকেন্দ্রিক সামাজিক ঐক্যের চেতনা আমাদের দেশে যতটা প্রাচীন, জাতিভিত্তিক রাজনৈতিক চেতনা ততটাই অর্বাচীন, এটা তৈরি হয়েছে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় পাশ্চাত্য শিক্ষার দৌলতে। ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যেই তা সীমিত ছিল। কিন্তু তাদের জাতিগতবোধ ধর্মীয় বোধের উর্ধে কখনো উঠতে পারেনি, ফলে তার বিকাশও ঘটেনি। জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় প্রাধান্য পাওয়ার ফলেই দুই প্রকারের বাঙালি জাতির উদ্ভব হয়, একটি হিন্দু বাঙালিজাতি, অন্যটি মুসলমান বাঙালিজাতি। এরা হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, পরস্পরের প্রতি সন্দিহান, এবং একে অন্যের আধিপত্য সম্পর্কে আতঙ্কগ্রস্ত। এই উদ্ভট জাতীয়তাবোধের ধারা শুধু বাংলাদেশের বাঙালিরা নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও এখনো বহন করে চলেছি।

বাংলাদেশের সবাই বাঙালি হতে পারে, কিন্তু সেটা সমস্ত বাঙালির দেশ নয়। ইজরায়েল যেমন সমস্ত ইহুদির স্বদেশভূমি, পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে কোন ইহুদি চাইলেই যেমন সেখানে সমস্তরকম নাগরিক সুযোগসুবিধা নিয়ে বসবাস করতে পারেন, বাংলাদেশের দরজা কিন্তু পৃথিবীর যে কোন বাঙালির জন্যে সেরকম উন্মুক্ত নয়। বাস্তব সত্য এই যে, এটা কেবলই পূর্বতন পূর্ববাংলার মুসলমান বাঙালিদের দেশ, শত শত বৎসর ধরে বসবাসকারী হিন্দু বাঙালিরা, এমনকি, পশ্চিমবাংলার মুসলমান বাঙালিরাও সেখানে ব্রাত্য। বাংলার পূর্বখণ্ডের মুসলমান বাঙালিদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করাই যেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক লক্ষ্য। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সেখানকার বিপুলসংখ্যক হিন্দুদের দেশত্যাগের এটাই কারণ। এজন্যই বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের ভিন্নধর্মী স্বদেশবাসীদের নীরব দেশত্যাগের প্রেক্ষিতে নীরবই থেকে যান। বাংলাদেশ হবার পর এই সংকীর্ণ মুসলমান বাঙালি সাম্প্রদায়িকতা আরো পুষ্ট হয়েছে। সেখানকার জাতীয়তাবাদী চেতনা এই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতাকেই যেন প্রতিষ্ঠা করেছে। এর সঙ্গে বোধ হয় সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের ন্যায্যতার প্রশ্নটিও জড়িয়ে রয়েছে।
এটা ঠিক যে, বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান মুসলমানও বটে আবার বাঙালিও বটে। এই দুটোর মধ্যে কোন প্রকৃত বিরোধ নেই। কিন্তু যদি তার ধর্মীয় পরিচয়টা নেপথ্যে থেকে বাঙালি পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সঙ্গে তার পার্থক্যটাও গৌণ হয়ে পড়ে এবং সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা বাঙালির রাষ্ট্র গঠনের যৌক্তিকতাও থাকে না। এরকম একটা পরিস্থিতি যে সত্যিই এক গভীর আতঙ্কের বিষয় তা অস্বীকার করা যায় না। এজন্যই বাংলাদেশের মুসলমান বাঙালিকে তার ধর্মীয় পরিচয়কে প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠা করে তার রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখার এক মানসভূমি তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়ে। এখানেই বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সমাজের ভেতর থেকেই এর তাগিদ তৈরি হয়। এজন্যেই বাংলাদেশে ক্রমাগত নতুন মসজিদের নির্মাণ বেড়ে চলে, বাংলাদেশের বৃহত্তম মসজিদ ঢাকার বায়তুল মোকাররমে প্রতি জুম্মাবারের নামাজে বিপুল সমাবেশ হয়, স্কুলকলেজের অনেক ছাত্রও সেখানে সমবেত হয়। ঢাকার অদূরে টঙ্গীতে প্রতি বছরই তিনদিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক ইসলামী ধর্মসম্মেলনে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে বহুলক্ষ লোকের সমাবেশ ঘটে। মক্কার হজ-সমাবেশের পর এটাই নাকি পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম সমাবেশ। এসবের সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজের কোন যোগ নেই, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা নেই –এটা ভাবা ভুল হবে।

বাঙালি হিন্দু বা হিন্দু-প্রধান ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তি পাবার জন্য বাংলাদেশের জনগণ যেমন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শরিক হয়েছিল, আবার পশ্চিমপাকিস্তানের অধিপত্য থেকে মুক্তি পাবার জন্যে ভাষাআন্দোলনের মাধ্যমে এক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে সমবেত হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সামরিক শাসনের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলন নানাধারায় বিকশিত করে তুলেছে, তেমনি তুলনামূলকভাবে বিপুল শক্তিধর হিন্দুপ্রধান ভারত রাষ্ট্রদ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ার ফলে তার সার্বভৌমত্বকে নিরাপদ রাখার জন্যে ইসলামী মৌলবাদীরা যদি বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয়কে কখনো কখনো তীব্রভাবে জাহির করতে চান তাহল অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বাংলাদেশে নববর্ষের উৎসব যতই স্বতঃস্ফুর্ত হোক মাঝে মাঝে তা ইসলামী মৌলবাদীদের আক্রমণের লক্ষ হবে, আপাতত এটাই বাংলাদেশের নিয়তি।
পরিশেষে একটা প্রশ্ন তোলা যাক।
বরাবরই দেখা গেছে, বাংলাদেশে জাতীয়তবাদী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন হলে আমরা খুব উল্লসিত হয়ে উঠি, কিন্তু বাংলাদেশে যখন নিরক্ষরতার হার কমে, গ্রামের সাধারণ মহিলাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ে, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়ে ওঠে, তখন উল্লসিত হওয়া দূরে থাক, আমাদের আগ্রহও তেমন দেখা যায় না। এর কারণ কী? ইসলামী মৌলবাদীদের মতো আমরাও কি বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যে একটা হিন্দু-হিন্দু গন্ধ পাই? সেজন্যেই কি আমরা তার সঙ্গে একাত্ম বোধ করি ও একটা তৃপ্তির আস্বাদ পাই? এমন একটি ধারনায় আমরা অভ্যস্ত যে, ভারতবর্ষের বা সাধারণভাবে এই উপমহাদেশের যা কিছু প্রাচীন, সেটাই হিন্দু, সেটা ধর্মচর্চা, কৃষ্টি বা লোকাচার, যাই হোক। এজন্যে কিছুটা অবচেতনভাবেই আমরা ভেবে বসি বাংলার আবহমান কালের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোতে যেন বাঙালি হিন্দুদেরই উত্তরাধিকার। বাঙালি হিন্দুরাই সেগুলো ব্যবহার করবে। বাঙালি মুসলমান যখন তাদের জীবনে সেগুলো প্রয়োগ করে, তখন যেন আমাদের চোখে তারা কিছুটা হিন্দু হয়ে ওঠে। বাঙালিসত্ত্বা ও হিন্দুসত্ত্বা আমাদের কাছে সমার্থক হয়ে ওঠে, এজন্যেই দূর্গাপুজোকে আমরা ‘বাঙালি হিন্দুদের প্রধান উৎসব’ না বলে ‘বাঙালিদের প্রধান উৎসব’ বলি, বাংলাদেশ থেকে অপরিচিত কারুর আসার খবর পেলে জানতে চাই, তিনি বাঙালি না মুসলমান, বাঙালি মুসলমানরা বাংলা নাম রাখলে আমরা অবাক হয়ে ভাবি, আরে। এটা তো হিন্দু নাম এবং আমাদের সেটা ভালোও লাগে। যেন বাংলার লোকাচারের মত বাংলা শব্দও হিন্দু শব্দ। আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদীদের দৃষ্টভঙ্গী কেমন হুবহু মিলে যায়। কাজেই বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদীদের সঙ্গে আমাদের পরোক্ষ সহযোগিতার অভিযোগ উঠলে সেটা অসংগত হবে না। আমরা যদি যথেষ্ঠ বাঙালি হতে পরাতাম, যদি বাঙালিত্বের সঙ্গে হিন্দুত্বকে গুলিয়ে না ফেলতাম, তাহলে সেটা হয়তো বাংলাদেশের ইসলামী মৌলবাদীদের নিরুৎসাহ করতে পারতো। কে জানে, সম্পূর্ণ মুসলিম-দেশ ইরানের নববর্ষের অনুষ্ঠান ‘নওরোজ’-এর দৃষ্টান্ত সামনে রেখে বাংলাদেশের নববর্ষ-উৎসবকে এই মৌলবাদীরা হয়তো একটি নির্মল আনন্দের উৎসব হিসেবেই বরণ করে নিতে পারতো।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sayed Chowdhury — এপ্রিল ১৯, ২০১৪ @ ৭:৫০ পূর্বাহ্ন

      তীক্ষ্ন বিশ্লেষণ ও নির্মোহ সত্য । পুরো লেখাটি ছাপলে ভালো হোত ।

      সায়্যিদ চৌধুরী

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com