নাগরকোটের এভারেস্ট

শাকুর মজিদ | ৮ এপ্রিল ২০১৪ ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

নাগরকোট ভক্তপুর জেলার একটা পাহাড়ি গ্রাম। নেপালের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে ‘ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট কমিটি’ নামে কতগুলো গ্রাম উন্নয়ন পরিষদ থাকে। অনেকটা আমাদের ‘ইউনিয়ন’ পর্যায়ের। ‘নাগরকোট’ আসলে সে ধরনেরই একটি গ্রাম উন্নয়ন কমিটির অধীনে শাসিত একটি অঞ্চল।
নাগরকোট মূলত: বিখ্যাত দু’টো কারণে। প্রথমটি হচ্ছে, প্রায় ৭ হাজার ফুট উপরের অনেকগুলো পাহাড় চূঁড়ার উপর থেকে বসে বসে, অনায়াসে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখা যায়। দ্বিতীয় কারণটি আরো মজার। তা হচ্ছে, কপাল ভালো থাকলে, আকাশ যদি পরিস্কার পাওয়া যায়, তবে ওখান থেকে খুব সহজে হিমালয় রেঞ্জের পাহাড়শ্রেণী, বিশেষ করে এভারেষ্টশৃঙ্গসহ আরো কতগুলো পর্বতশৃঙ্গ একটু করে হলেও দেখা যায়। এর আগে পোখরার সারাংকোট চূঁড়া থেকে সাড়ে ২৫ মাইল দূরের অন্নপূর্ণাকে এক চিলতে ত্রিভূজ ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না, আর এই নাগরকোট থেকে সাড়ে ৮৮ মাইল দূরের এভারেষ্ট চূঁড়াকে কী-ই বা দেখা যাবে!
এধরনের পর্যটনপ্রিয় পাহাড়ি লোকালয়ে রাতের বেলা তেমন কিছু করার থাকে না। হানিমুনারদের জন্য এ কারনে এ জায়গাটি খুব প্রিয়। আমরা কতগুলো বয়স্ক যুবক এক ঘরে বসে আড্ডা দেই। রাতে আরাম করে আহার করা ছাড়া বিনোদনের তেমন কিছু আমাদের জন্য নাই।
বডি ক্লকে এলার্ম দেয়া থাকলে যা হয়, ঠিক সাড়ে পাঁচটায়ই ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম ভাঙ্গার পর বাহিরটুকু দেখার জন্য অন্য সময় হলে পর্দা সরানো হতো। আজ হলো না। পর্দা সরিয়েই রাখা হয়েছে। সকালবেলার প্রথম সূর্যের আলো হিমালয় ছুঁয়ে সরাসরি যাতে বিছানায় পড়ে, তার জন্য এ আয়োজন। দেখি দেবতোষ বাইরের বারান্দায় একটা কফি মগ নিয়ে বসে আছে। আমার জেগে যাওয়াটা ও টের পেলো। হাতের কফির মগ উপরের দিকে বাড়িয়ে বলে- চলবে?
এই ভোরে কফির আহ্বান উপেক্ষা করবো, এমনটা আমি নই। চোখে মুখে হালকা পানি ছিটিয়ে বারান্দায় এসে বসতেই দেখি পাশের টুলে আমার জন্য কফির মগ।
দেবতোষ আর মলয় কোলকাতা থেকে এসেছে দু’দিন আগে। মলয় কনফারেন্সে যোগ দেবে, দেবতোষ আজই দুপুরে ফ্লাইটে কোলকাতা ফেরত যাবে। নেপালকে আজই বিদায় দেবে বলে অনেক ভোরে ঘুম থেকে উঠে একা একা এই বারান্দায় বসে হিমালয় মেহনে বসেছে। তার এক হাতে নেপাল নিয়ে একটা বই আরেক হাতে আইপ্যাড। গুগল আর্থ খুলে বসেছে। আমাকে বললো, বলোতো, এভারেস্ট থেকে আমরা এখন কত দূরে?
– জানি না। বলতে পারবো না।
– একজাকটলি ৮৮.৬ মাইল দূরে। এই দেখো।
আমি একবার তার আইপ্যাড দেখি, আরেকবার আমাদের পূর্বদিকের আকাশ। আকাশের শেষ মাথায় নাগকোটের পাহাড়ি গাছপালার ছায়া যেখান দিয়ে শেষ হয়ে গেছে, তার শেষ মাথার দিগন্ত বরাবর নীল আকাশ, সেখানে কতগুলো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। সাদা মেঘের সাথে প্রায় মিলে মিশে কতগুলো আঁকাবাঁকা রেখা নিয়ে আরো কিছু অবয়ব।
দেবতোষ বলে, ওগুলোই হিমালয় রেঞ্জ, ঐ দেখো সামনে বড় ত্রিভূজটার পেছনে ছোট্ট যে একটা ত্রিভূজের সুঁচালো একটা মাথা দেখা যাচ্ছে– উনিই এভারেস্ট।
– আর ইউ সিউর?
– হানড্রেড পার্সেন্ট।
– হাউ ?
– আমি এই ম্যাপ নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। এখানকার ওয়েটাররা আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে। বসো, এভারেস্টের অনেক মজার কাহিনী আছে, আমি পড়ে শোনাই —
মাউন্ট এভারেষ্ট হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে শীর্ষবিন্দুর উচ্চতার হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এটি হিমালয় পর্বতমালার একটি অংশ, এশিয়ার নেপাল এবং চীনের সীমানার মধ্যে এর অবস্থান। ১৮৫৬ সালে সর্বপ্রথম এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাপ করে ২৯,০০২ ফুট (অবশ্য সে এ সময় এভারেস্ট পরিচিত ছিল ঢ়বধশ ঢঠ (১৫ নং চূঁড়া) নামে। উচ্চতা নির্ণয় করার পর পর্বতচূঁড়াটির সঠিক নামকরণ হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। জরিপকারী দল চাচ্ছিল পর্বতচূঁড়াগূলোর স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নামগুলো সংরক্ষণ করতে ( যেমন কাঞ্চনজঙ্গা বা ধবলগিরি এসব কিছু)। কিন্তু ওয়াহ বললেন তিনি প্রচলিত কোন স্থানীয় নামের সন্ধান পাননি। বিদেশীদের জন্যে তিব্বত ও নেপাল উন্মুক্ত না থাকায় তার স্থানীয় নামের অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হয়। তিব্বতীরা এই শৃঙ্গকে চোমোলুংমা, নামে ডাকতো। কিন্তু বৃটিশদের কাছে এই নাম অনেক কঠিন। ওয়াহ যুক্তি উত্থাপন করেন যে যেহেতু অনেকগুলো স্থানীয় নাম প্রচলিত তাই এদের থেকে সঠিক নামটি বেছে নেওয়া দুঃসাধ্য। তাই তিনি তার পূর্বসূরি ভারতের প্রাক্তন জরিপ পরিচালক জর্জ এভারেস্টের নামে পর্বতচূঁড়াটির নামকরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু যার নামে এই চূঁড়াটির নামকরণের প্রস্তাব হয়, তিনি স্বয়ং এ নামটির বিরোধিতা করেন। ১৮৫৭ সালে রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটিকে বলেন এই নামটি হিন্দীতে লেখা সম্ভব নয় এবং ভারতের স্থানীয়রা নামটি উচ্চারণ করতে পারবে না। তবে তার এই আপত্তি ধোপে টেকেনি – ১৮৬৫ সালে রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটি আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতচূঁড়ার নামকরণ করে মাউন্ট এভারেস্ট। তার পরের বছর, ১৯৬৬ সালের ১ ডিসেম্বর জর্জ এভারেস্ট মারা যান। ইংল্যান্ডে এখনো তার কবর চিহ্নিত করা আছে। এই জর্জ এভারেস্ট্রে অনেক অবদান আছে এই অঞ্চলে। তিনি ১৮৩০ থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের সার্ভেয়ার-জেনারেল ছিলেন। তবে তিনি সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় হয়ে আছেন দক্ষিণ ভারত থেকে নেপাল পর্যন্ত মধ্য বৃত্তাকৃতি গ্রেট ট্রিগোমেট্রিক সার্ভে করে। প্রায় ১৫শ মাইল এলাকা জুড়ে এই জরিপ হয়েছিল।
everest.gif
এভারেস্টের উচ্চতা নিয়ে কতগুলো মজার তথ্য আছে। ১৮৫৬ সালে ত্রিকোনমিতির ফর্মুলা দিয়ে এভারেস্টের ছায়া হিসাব থেকে এই পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা জানা গিয়েছিল ২৯,০০২ ফুট। এর প্রায় ১০০ বছর পর নতুন করে মাপা হয় ১৯৫৫ সালে। তখন তার মাপ পাওয়া যায় ২৬ ফুট বেশী, ২৯,০২৮ ফুট। আবার ১৯৯৯ সালে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমে যখন মাপা হলো, পাওয়া গেলো- ২৯,০৩৫ ফুট। এবং এটাকেই এখন মানছেন সবাই। কিন্তু চীনারা এই হিসাব মানে না। তারা নিজেরা একবার মেপেছিলো। তাদের হিসাবে এভারেস্টের উচ্চতা ২৯,০১৫ ফুট। এবং চীনা ভাষার সব পরিসংখ্যানে এই উচ্চতাই আছে। মজার বিষয় হচ্ছে, এভারেস্টের চূঁড়া প্রতি চার বছরে এক ইঞ্চি করে বাড়ছে।

পাহাড় পর্বত চড়া মানুষগুলো একটা ক্লাব বানিয়েছে। নাম–আলপাইন ক্লাব। ১৮৫৭ সালে তার জন্ম, ইংল্যান্ডে। ইউরোপের অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, জার্মানী আর ফ্রান্স এর সাড়ে ৭শ মাইল এলাকা জুড়ে যে আল্প্স পর্বতমালা রয়েছে, সেগুলোকে যারা চরে বেড়ান তাদের নিয়ে তৈরি হয়েছিলো এই ক্লাব। এই ক্লাব এর সে সময়কার প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন টমাস ডেন্ট তার বই অনড়াব ঞযব ঝহড়ি খরহব এ মন্তব্য করেন যে এভারেস্ট পর্বতে আরোহণ করা সম্ভব। তারপর থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয় এভারেস্টের চূঁড়ায় ওঠার চেষ্টা। ব্রিটিশরা ১৯২১ সালের অভিযানে হিমালয়ে প্রত্যাবর্তন করে। এতে জর্জ ফিঞ্চ প্রথমবারের মত অক্সিজেন ব্যবহার করে পর্বতারোহণ করেন। তার আরোহণের গতি ছিলো বিস্ময়কর, ঘন্টায় প্রায় ৯৫০ ফুট। তিনি ২৭,৩০০ ফুট ওপরে ওঠেন, যা ছিল সর্বপ্রথম কোনো মানুষের ৮,০০০ মিটারের বেশি উঁচুতে আরোহণ। পরবর্তী অভিযান হয় ১৯২৪ এ। ৮ জুন, ১৯২৪ তারিখে জর্জ ম্যালোরি ও এন্ড্রু আর্ভিং উত্তর গিরিখাত দিয়ে এভারেস্ট-চূঁড়া বিজয়ের মিশন শুরু করেন। এই অভিযান থেকে তাদের আর ফিরে আসা হয়নি। তবে এভারেস্টের চূঁড়ায় মানুষের প্রথম পায়ের ছোয়া লাগে ১৯৫৩ সালের ২৯ মে সকাল ১১ টা ৩০ মিনিটে। নিউজিল্যান্ডের এডমন্ড হিলারী, নেপালী শেরপা তেনজিং নরগেকে নিয়ে এই অসাধ্য কাজটি করতে পেরেছিলেন।

এভারেস্ট জয় ওতো সহজ নয়। যদিও সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্বত চূঁড়া হিসেবে এটা ওতোটা বিভিষিকার কারণ নয়, তারপরও এর ডেথ জোন (২৬ হাজার ফুটের উঁচু জায়গা) প্রতি বছরই শত শত রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের প্রাণ কেড়ে নেয়। ওখানে নিহত হওয়া পর্বতারোহিদের লাশের খোঁজও পাওয়া যায় না। বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে কোথায় যে বরফ চাপা দিয়ে রাখে, কেউ তার হদিস পর্যন্ত বের করতে পারে না। তবে ঐ দুর্গম পথে চুরি, ডাকাতি রাহাজানীর ঘটনাও ঘটেছে। ডাকাতদের হাতে খুন হওয়ার ঘটনাও আছে সেখানে।

এভারেস্ট জয়ের কাহিনী শুনতে শুনতে রোমঞ্চিত হয়ে পড়ি। দেবতোষ আমাকে আরো কয়েকটি পরিসংখ্যান পড়ে শোনায়।
– ১৯৭৮ সালের ৮ মে অস্ট্রিয়ার পিটার হেবলার এবং ইতালির রেইনহোল্ড মেসনার প্রথম অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট এর চূঁড়ায় সফলভাবে অরোহণ করেন।
– ১৯৭৫ সালের ১৬ মে প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টের চূঁড়ায় আরোহণ করার কৃতিত্ব লাভ করেন জাপানের জুনকো তাবেই।
– প্রথম দুইবার এভারেস্টে উঠতে সক্ষম হন শেরপা নাওয়াং গোম্বু। প্রথমে ১৯৬৩ সালে একটি আমেরিকান অভিযানে এবং ১৯৬৫ সালে একটি ইন্ডিয়ান অভিযানের মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো এভারেস্ট জয় করেন।
– প্রথম প্রতিবন্ধী হিসেবে ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টম হুইটেকার এভারেস্টের চূঁড়ায় উঠেন। একটি কৃত্রিম পা নিয়েও তিনি এভারেস্ট জয় করে বিশ্ববাসীকে চমকে দেন।
– নেপালের আপা শেরপা সবচেয়ে বেশিবার এভারেস্ট জয় করেছেন। ১৯৯০ সালের ১০ মে থেকে ২০১১ সালের ১১ মে পর্যন্ত তিনি মোট ২১ বার তিনি এভারেস্টের চূঁড়ায় পা রেখেছেন।
– অ-শেরপা হিসেবে এই রেকর্ড আমেরিকান পর্বতারোহী ও অভিযানের গাইড ডেভ হানের দখলে। ১৯৯৪ সালের ১৯ মে থেকে ২০১২ সালের ২৬ মে পর্যন্ত মোট ১৪ বার এভারেস্ট জয় করেছেন তিনি।
– দ্রুততম সময়ে এভারেস্টের চূঁড়ায় উঠেছেন কাজী শেরপা ১৯৯৮ সালে। অক্সিজেন ছাড়া তার সময় লেগেছিলো মাত্র ২০ ঘন্টা ২৪ মিনিট। তবে অক্সিজেন নিয়ে মাত্র ৮ ঘন্টা ১০ মিনিটে উঠেছিলেন পেমবা দর্জি শেরপা ২০০৪ সালে।
– চোখে দেখতে না পেলেও এভারেস্ট জয় করতে মানুষের আগ্রহ জন্মে। ২০০১ সালে প্রথম যে জন্মান্ধ এই সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তার নাম এরিখ উইহেনমায়ার।
– সবচেয়ে কম বয়সী এভারেস্ট জয়ীর নাম জর্ডান রোমেরো। ১৩ বছর বয়েসী এই আমেরিকান ২০১০ সালে এভারেস্ট জয় করে।
– এই পর্বত জয় কেবল কিশোর বা যুবাদের মধ্যেই নেই, বুড়ো-বুড়িরাও কম যান না। সবচেয়ে বেশী বয়েসী যে বৃদ্ধ এভারেস্ট জয় করেছেন, তার নাম ইউচিরো মিউরা। ৮০ বছর বয়েসী এই জাপানী তৃতীয়বারের মতো এভারেস্টের চূঁড়ায় উঠেন ২০১৩ সালের ২৩ মে। আর সবচেয়ে বেশী বয়েসী এভারেস্ট জয়ী মহিলার নাম ঢামি ওয়াতানাকে। জাপানী এই মহিলা ৭৩ বছর বয়সে ২০১২ সালে এভারেস্ট জয় করেন।

ওমন স্থির হয়ে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকা এই পর্বতটি বিগত ৬ কোটি বছর ধরে কত শত সভ্যতার আবির্ভাব, বিকাশ আর ধ্বংস দেখেছে। মানুষের ছাপ সে তা মাথায় নিয়েছে মাত্র ৭০ বছর আগে। সেদিন কি হিমালয়ের দর্পচূর্ণ হয়েছিল?
২০১০ সালের ২৩ মে তারিখটি হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূঁড়ার জন্য বড় বেদনাদায়ক ছিলো। কারণ, সেদিন সর্র্বোচ্চ সংখ্যক মানব তার শীর্ষ চূঁড়ায় নিজেদের পদচিহ্ন রেখে এসেছেন।

এভারেস্টের উপরের অংশে সব সময়ই ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। কখনো কখনো ২শ মাইল বেগেও বাতাস বয়। তাপমাত্রা সব সময়ই মাইনাস থাকে। শীতকালে অনেক বেশী। গ্রীষ্মকালে সবচেয়ে কম ঠান্ডা, তা-ও মাইনাস। তাও এই দুর্গেয় পথ পরিভ্রমণ করা কম কথা নয় অনেকের আবার নেশায়ও পেয়ে যায় এমন কাজ। ২০১২ সাল পর্যন্ত যে জরীপ আছে, তাতে ৩,৬৬৮ জন চড়েছেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূঁড়া। সব মিলিয়ে এই সংখ্যাটি ৬২০৮ জনের। এদের ৩৬৩ জন নারী পর্বতারোহীও আছেন। এ বছর, ২০১৩ সালে ৬০০ জন ঐ চূঁড়ায় উঠবেন বলে হিসাব করা আছে।

এভারেস্ট চড়ানোর কাজে নেপাল সরকার অনেক আয় করে থাকে। নেপালের অর্থনীতির একটা বড় আয়ের খাত এই পর্যটন। পর্যটন বলতে এখানে কতগুলো পাহাড়-পর্বতই। এভারেস্ট চড়তে যেতে হলে নেপাল সরকারের অনুমতি লাগে। এ অনুমতির জন্য ১০ থেকে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার ফী দিতে হয়। এসবের বাইরেও পর্বতারোহীদের আরো ১০-১৫ হাজার ডলার খরচ করতে হয়। সঙ্গে নিতে হয় একজন শেরপা। এই শেরপারাই মূলত: মাউন্ট এভারেস্ট ট্যুরের গাইড কাম সহকারি। তারা পর্বতারোহীদের গাট্টি-বোচকা টানে, রান্না করে খাওয়ায়, পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়।

শেরপারা নেপালের পূর্বাঞ্চলে হিমালয়ের তলা বরাবর বেড়ে ওঠা এক ধরনের উপজাতী। পাহাড় চড়ে বেড়ানো তাদের কাছে ডাল-ভাতের মতো বিষয়। ১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিলারী একজন শেরপাকে নিয়ে এভারেস্টের চূঁড়ায় উঠেছিলেন। তিনি হচ্ছেন তারকা শেরপা তেনজিং। তার চেনানো পথ ধরে স্বজাতির অন্য শেরপারা এই পেশায় বেশ ভালো করছেন।

দেবতোষের সঙ্গে আমার আড্ডা জমে গেছে। অনেক আগেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আরিফভাই, এনায়েত ভাই আর মলয়। এর মধ্যে হিমালয়, পর্বত, এভারেস্ট, অহংকার, প্রকৃতি, ঈশ্বর, সৃষ্টিকর্তা– এসব নানা বিষয় নিয়ে আমাদের তর্ক হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। রিসোর্টের বেলকনি থেকে প্রশস্থ ডাইনিং রুম, কোথাও আড্ডার উপলক্ষ্য বদল হয়নি। এমন এক জায়গায় আমরা এসে উঠেছি যে, এখান থেকে পূর্বদিকে চোখ গেলেই হিমালয়কে আড়াল করা যায় না।

এই এভারেস্টকে নানাভাবে দেখানোর জন্য আয়োজন রেখেছে নেপালী কর্তৃপক্ষ। কাঠমান্ডুর বিমান বন্দর থেকে ১০০ ডলারে ‘বুদ্ধা এয়ার’ ৪০ মিনিটের একটা রাইডের ব্যবস্থা রেখেছে। ২৮ আসনের যাত্রী নিয়ে এবং সবাইকে জানালার পাশে বসিয়ে এভারেস্টের কাছাকাছি থেকে ঘুরিয়ে আনে যাত্রীদের। কাঠমান্ডু বিমান বন্দর থেকে উড়ে গিয়ে মিনিট ১০-১৫ এর মাথায় হিমালয় রেঞ্জের কাছাকাছি পৌছে যান। সেখান থেকে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণির সমান্তরালে ধীরে ধীরে উড়ে যান তারা। ২৩,৭৩৪ ফুট উচ্চতায় লাংগাটাং লিরুং দিয়ে শুরু হয় তাদের পর্বত দেখার অভিযান। এরপর একে একে পার হয়ে যান সীসা পাংমা, লর্জিং লাংপা, পূর্বি-গিয়াংচু, ছবা-ভামরি, এসব চূঁড়া। এক সময় সাগরমাতা বা এভারেস্ট এসে হাজির হয় তাদের সামনে। তারপর হিমালয় দেখা শেষ করে উড়োজাহাজটি কাঠমান্ডু বিমান বন্দরে ফেরত আসে।

এমন কিছু কেমন হতে পারে আমার একটু ধারণা আছে। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার উপর দিয়ে আমরা যখন উরুগুয়ের পথে যাচ্ছিলাম, তখন আন্দিজ পর্বতমালার উপর দিয়ে অনেক নিচু উচ্চতায় প্লেন চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। সে এক অসাধারণ দৃশ্য। এমন কিছুই আছে নিশ্চয়ই এখানেও। আমাদের দলের অনেকেই শুনেছি টিকেট কেটে রেখেছে। কাল ভোরে এভারেস্ট ফ্লাইটে যাবে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mizan — এপ্রিল ৮, ২০১৪ @ ৩:৩৮ অপরাহ্ন

      আপনার এই লেখার সব চেয়ে মজা লাগছে আমার তা হলে বিমানে করে এভারেস্ট দেখার সুজুক যা মাত্র ১০০ ডলারে ‘বুদ্ধা এয়ার’ ৪০ মিনিটের একটা সংখেপে দেখার ব্যাপার টা

      আপনার এই টা আমার কাজে লাগবে
      আর ১০০ ডলারে যে সুজুক তা কি সব সময় পাওয়া যায় কি না ?

      মজিান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধূরী — এপ্রিল ৮, ২০১৪ @ ৪:২১ অপরাহ্ন

      এভারেষ্টের আদ্যপান্ত সর্ম্পকে খুব সুন্দর লিখেছেন শাকুর ভাই। জনাব দেবতোষের সরবরাহে অনেক নতুন নতুন তথ্য জানতে পারলাম….. শুভ কামনা রইল আপনার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zahid Hasan — আগস্ট ১, ২০১৪ @ ৯:০৯ পূর্বাহ্ন

      I have enjoyed the short but very informative history.
      Thanks.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com