পথবৃত্তান্ত

হাবীবুল্লাহ সিরাজী | ৫ মার্চ ২০১৪ ১০:৪৮ অপরাহ্ন

এঁটোপথ
ভাতের দেমাগ ফুরোতে না ফুরোতেই মদের দেমাগ দেখায়; আর, তারপর মাগীর দেমাগের সঙ্গে বাজায় সোনার সিন্দুক, ফুটায় সীসের গুলি। এ বড়ো সুসময়ের কথা, বড়োই আনন্দের বার্তা ! একাত্তরে ফ্যানের গন্ধে মুখ পাতা ছিলো দায়, একানব্বইতে বাসমতি ছাড়া গলা দিয়ে নামে না — আর এগারোতে এসে — ‘ও ভাত ! নো ডিয়ার, ওটিতে হাই সুগার।’ ক্লাবের পাটাতনে এক স্লাইস প্রাইম বিফ একটু হাসি-খেলা করলো তো পাঁচতারা হোটেলের কেভিয়ার জিহ্বার ঢালে মৃদু চুমু খেলো। দিন ও রাতের ফারাক যে বিস্তর !

দিন শুরু হয় কাৎ হয়ে, সূর্য তখন ঘাড়ের উপর উঠে মই সরিয়ে দিয়েছে। চিৎ হ’লে চোখ জ্বালা করে, নাকের ফাঁকে জল গড়ায়। লে বাবা, মাথার ভেতর তো এখনো বত্রিশ বছরের ঘণ্টা ! মনে পড়ে কী পড়ে না — রেস্টরুমের বাষ্পে খুশবু ওড়ে, সিল্কের ওপর দিয়ে উড়ে যায় বেসুমার হাওয়া-ঝঙ্কার। এরপর খানিক মাজা-ঘষা, তারপর ভবন-বিচরণ। বঙ্গ থেকে গণ, কৃষি থেকে বস্ত্র, শিক্ষা থেকে সেনা — শেষ করতে-করতে মন্ত্রণার জট। কেচ্ছা-কাহিনী, হিস্যা-হকিকত মিলঝুলকে পশ্চিমের পেয়াদা আর পুবের পাইকে গলাগলি চলাচল, হাতেহাত দোলাদল। এর মধ্যেই ক্ষণে-ক্ষণে মোবাইলের হাক-ডাক : ‘আমি এখন বেইজিং; না ভাই ওয়াশিংটন আছি; প্যারিস থেকে ফিরে কৈতর ঘরে নেবো।’ ও আব্বা, আমি কার খালু ! সেই যে সারা সকাল দরজা পাহারা দিয়ে, তারপর ইস্টিকুটুম মিস্টিছুটুম করে সঙ্গে-সঙ্গে ছুটছি — আর তুমি কীনা বেইজিং-ওয়াশিংটন-প্যারিসে আছো ? তবে আমি কোথায় ? আমি নিদেনপক্ষে কলমাকান্দা ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের ভাঙ্গা চেঞ্চিতে মাথা ঠেস্ দিয়ে ঘুমাই ! ‘ক’ শিখতে-শিখতে দুপুর হ’লো, দঅ’ বলতে-বলতে সন্ধ্যা, আর রাত তো ‘০’ দেখার জন্য। যাক বাবা শূন্য থেকে যে সব উৎপত্তি — এ আর তোমার মতো কে বোঝে ?

রাত তো শুরু হ’তে চায় না, শুরু করা হয়। কারো আটটা না বাজতেই মাথার তলে বালিশ, কেউ আবার বারোটায় হাভানা চুরুটে টান দেয়। ফুঁ দেবার মাস্টারেরা আলাদা। তাদের ঘরে জানালা থাকে না। ঘড়িয়াল নাচে, টইটম্বুর ডোবে ইচিকদানা ! ফুট-ফরমায়েশের হাফ-গেরস্ত মোলায়েম হাতে ক্রিস্টাল নামায়, সৌরভে মাতে কেতা ও ক্যালিওগ্রাফি। দেখনটি তার, ইয়ারমুলুকের ; পাহাড়ের নিচে ঝর্না ফসকায়। এই ফসকা গেরো খুলতে-খুলতে হায় মর্জিনা; বাগদাদ পোড়ে, লিবিয়া তপড়ায়। বঙ্গজননীর সোনার সন্তান হুমড়ি খেয়ে পড়ে গুনতি করে শূন্যগুলো। একের ডান দিকে পাতা জুড়ে কেবল শূন্য আর শূন্য। মহাশূন্যে পৌঁছাতে পারলে চাচা গ্যালিলিওর দেখা মিলতো !

ঘেঁটোপথ
ঘেঁটেঘুঁটে জীবনকাহিনীর পুরোটা পাওয়া না গেলেও অংশ মেলে। দেখা গিয়েছিলো সেই একাত্তরের আক্টোবরে, বাংলাবাজারে। বাংলাবাজারের বইপাড়ার এক প্রেসের দোতলায় তিনি রান্নার কাজ করতেন। বাড়ি মুকুন্দপুরও হতে পারে আবার আগৈলঝরা হওয়াও এমন কিছু নয়। চল্লিশোত্তর মহিলার জীবন-সংগ্রামের একটি ভাগ হঠাৎ করেই মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে গেলো। বাড়ি থেকে খবর এলো আঠারো/ঊনিশ বছরের একমাত্র পুত্র যুদ্ধে গেছে। ছেলে এমন কিছু করতো না ; প্রাইমারীর পাট চুকিয়ে এদিক-সেদিক আয় রোজগারের চেষ্টায় ছিলো। মায়ের সঙ্গে ঢাকা আসতে পারতো, কিন্তু নিজের চেনা জায়গা ছাড়তে মন চায়নি। ছেলের জন্য রাঁধুনি মায়ের বিলাপ দিন পার করে রাত পর্যন্ত গড়ালো। তারপর একদিন ডিসেম্বরও পার হ’লো, বন্দুক কাঁধে ছেলে দেশে ফিরলো। সোজা-সাপ্টা কথা, ছেলে এখন কি করবে ?

প্রশ্নটির জবাব বাহাত্তর পার ক’রে পঁচাত্তরে এ’সে থিতু হয়। এর মধ্যে পক্ষ-বিপক্ষের হৈ-চৈ গেছে, গণবাহিনী গেছে, অভাবও গেছে কিন্তু ছেলে মুক্তিই আছে। ছেলের কৃষিতে হয়নি, দোকানদারি জমেনি, এমন কি ঢাকার টানেও সংসার খোলেনি। মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি এক করার মতো মাথা থাকলেও মুরুব্বি ছিলো না, তাই ওদিকও শূন্য। পঁচাত্তরে এক নতুন কিসিমের জোয়ার এলো, পলি পড়লো — ধান গজালো লকলক করে। কৈতর উড়লো, টাকা ঢুকে পড়লো খানা-খন্দে। ছেলে ভেসে গেলো, মজে গেলো। মদিনার মান রাখার জন্য মাথার গামছা আর পায়ের বাটা জোর কদমে ছুটলো। শ্লেটের দাগ মুছে গেলো, কিন্তু শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগে বৃষ্টির পানি পড়ে ঝলমল করে উঠলো। মানুষ ও পশুর মধ্যে তফাৎ করতে-করতে ছুরি শান হলো। গ্রাম ছাড়িয়ে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন পার করে থানা, থানার পর জেলায় এসে হায়ারে চললো। কোরবানীর পশুর চারটি পা, একটি গলা। মানুষের একটি গলা, দু’খানা পা। নেতার শাদা পোশাকে লাল গোলাপের পাঁপড়ি হয়ে ফিনকি দেয়া রক্ত পড়ে। আহা, কী সৌন্দর্য ! একানব্বই গেছে পুলসিরাতের উপর ডিগবাজি খেয়ে; এগারোতে এসে বেহেশতের মেওয়া দু’হাতে উপচে পড়ছে। রাঁধুনি মায়ের লাশ তো সেই কবেই বুড়িগঙ্গায় হাওয়া।

হেঁটোপথ
হাঁটার কী আর শেষ আছে ! দানা পিষে তেল বের করতে হবে, হাঁটো। বলদ হাঁটছে মানে ঘুরছে। কলুর বলদ হাঁটছে, এগুচ্ছে না। ‘রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা / তার উপরে বসলো রাজা / ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা / খাচ্ছে, কিন্তু গিলছে না।’ তো এই বলদ আর কলু মিলিয়েই তো তেল-আখ্যান। একাত্তরের আগের কলু এখন দেশের ভোজ্যতেলের জোগানদার। কারবারের লক্ষণরেখাটি ছিন্ন করে সরিষার সঙ্গে তিসি মিশেছে, সয়াবিন-পাম একাকার। ভোজ্য তেলকলের দাপটে কলুর বলদ এখন মার্সিডিজ দাবড়ায়। শুধু কলু বলি কেন, জোলারও লুঙ্গি-শাড়ি হাঁটতে-হাঁটতে তাঁতকল পর্যন্ত পৌঁছে দিলো দৌড়। আর সে কী দৌড় — কাপড়কল, সেলাইকল পার করে ব্যক্তিগত কপ্টারে এখন প্রমোদভ্রমণ। ওদিকে লবণচাষি — সল্ট ইন্ডাস্ট্রীজের মালিক-মহাজন, দই বিক্রেতা মিষ্টান্নভাণ্ডারসহ ফুড চেইনের কর্তা, বিড়িঅলা তামাকের কারিশমায় কর্পোরেট ক্লাউন, ক্ষৌরকার তার ব্যবসার পর্দায় ঝুলিয়ে দিয়েছে নারী-পুরুষের কেশ থেকে শরীর বিন্যাস ! বল্টুর কারবারির রি-রোলিং মিল, মাছ-সবজিঅলার সুপার মার্কেট — আর পাড়া-মহল্লার শোভিত কক্ষে তো এন্তার নাটক-বায়োস্কোপ ! সবই কিন্তু একাত্তরের রেখাটির ওপাশ আর এপাশের চিত্র। একাত্তর হাঁটছিলো, দৌড়ও শুরু করলো — চল্লিশ বছরের জীবনে মাধুর্য কি কেবলই ফর্মালিনের উম ?

রাজপথ
রাজা নেই, তবু রাজপথে যানবাহন মানুষ চাপা দিয়ে সগর্বে ছুটছে। প্রজাতন্ত্র হাঁসফাঁস করতে-করতে দশ পা এগিয়ে বিশ পা পেছোচ্ছে। জনগণের মৌলিক অঞ্চলটি খরায় জর্জরিত হ’লেও উপত্যকার ঊর্বরতায় চলে রক্তপায়ীদের উল্লাস-যাপন। কার হাতের বাঁশি কে ফুঁ দেয়, বোঝা দায় ! তবে রাজপথকে জনপথে এবং প্রজাতন্ত্রকে জনতন্ত্রে রূপান্তরের দায় তো জনগণেরই।

পাদটিকা :
টোলের পণ্ডিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিশেবে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথম বক্তৃতায় ছাত্রদের বললেন : তোমাদের বাবার হাতের তালুতে লাঙ্গলের মুঠির দাগ লেগে আছে, আমি চাই তোমাদের পাঁচ আঙুলে পাঁচ মহাদেশ নেচে উঠুক।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sayed Chowdhury — মার্চ ৯, ২০১৪ @ ৪:১০ অপরাহ্ন

      “তোমাদের বাবার হাতের তালুতে লাঙ্গলের মুঠির দাগ লেগে আছে, আমি চাই তোমাদের পাঁচ আঙুলে পাঁচ মহাদেশ নেচে উঠুক।”

      এখন তো দেখছি দশ আঙুলে দেশটাকেই খুবলে খাচ্ছে !

      সায়্যিদ চৌধুরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন saifullah dulal — মার্চ ১০, ২০১৪ @ ১০:৫৭ পূর্বাহ্ন

      অন্য রকম মজা পাইলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ali Habib — মার্চ ১০, ২০১৪ @ ৫:৩৯ অপরাহ্ন

      ভালো লেগেছে। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে অভিনন্দন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Habibullah Sirajee — মার্চ ১২, ২০১৪ @ ১২:০০ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ সায়্যিদ চৌধুরী, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, আলী হাবিব।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com