মিশেল ফুকোর শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম

অদিতি ফাল্গুনী | ১৬ december ২০০৭ ৫:১৩ অপরাহ্ন

foucault
মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

[আর্টস-এর পাতায় এ সংখ্যা থেকে শুরু হচ্ছে ফরাসি লেখক-বুদ্ধিজীবী মিশেল ফুকোর (Michel Foucault, ১৯২৬-১৯৮৪) শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (১৯৭৫)বইটির ধারাবাহিক অনুবাদ। বইটি ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন Alan Sheridan। ইংরেজিতে বইয়ের নাম Discipline and Punish: The Birth of the Prison। ইংরেজি থেকে বাংলায় বইটি অনুবাদ করছেন অদিতি ফাল্গুনী। নিচে অনুবাদ অংশের আগে অনুবাদকের ভূমিকা যুক্ত হলো। –বি. স.]

অনুবাদকের ভূমিকা
সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের মধ্যে মিশেল ফুকো অন্যতম। ১৯২৬ সালের ১৫ অক্টোবর ফ্রান্সের পইতিয়েহতে জন্ম ফুকোর। দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, সমালোচক এবং ভাবনার ইতিহাসবিদ ফুকো ছিলেন কলেজ দ্যু ফ্রাঁসের চিন্তা পদ্ধতির ইতিহাসের শিক্ষক। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতেও শিক্ষকতা করেছেন। ফরাসী কাগজ এবং রিভিয়্যু জার্নালে নিয়মিত লিখতেন। তিনি ক্রিটিক সম্পাদনা করেছেন।

বিবিধ সামাজিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ে সমালোচনামূলক আলোচনার কারণে মিশেল ফুকো বিখ্যাত। মনস্তত্ত্ব, চিকিৎসাবিদ্যা, মানবিক বিজ্ঞানসমূহ ও কারাগার ব্যবস্থার তিনি সমালোচনা করেছেন। মানবীয় যৌনতা নিয়ে তাঁর কাজও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা ও ক্ষমতার ভেতরকার আন্তঃসম্পর্ক, জ্ঞান ও ডিসকোর্সের নানা বিষয়ে তাঁর রচনা আলোচিত ও প্রয়োগকৃত হয়েছে। কখনো উত্তরাধুনিক (Postmodernist) বা উত্তর-কাঠামোবাদী (post-structuaralist) হিসেবে পরিচিতি পেলেও ১৯৬০-এর দশকে তিনি বরং কাঠামোবাদী (structuaralist) আন্দোলনে বেশি জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ফুকো নিজেকে কাঠামোবাদ থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং উত্তর- কাঠামোবাদী বা উত্তরাধুনিকতাবাদীর তকমা বর্জন করেন।

২.
১৯৬৮ সালে প্রচুর সাধারণ ধর্মঘট ও ছাত্র আন্দোলনের কারণে ফ্রান্সে দ্যগল সরকারের পতন ঘটে। এ সময়ে বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশই বামপন্থী ভাবাদর্শ গ্রহণ করেন, যদিও প্রতিষ্ঠিত বাম প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক ইউনয়িনগুলি এই আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছিল।
may_68_poster_1.jpg………
১৯৬৮-র ফরাসি ছাত্র বিক্ষোভের সময়ের পোস্টার: ‘তরুণ হও এবং চুপ থাকো’
………
এ আন্দোলনকে অনেকেই দেখে থাকেন শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ সামাজিক নানা প্রশ্নে পুরোনো নৈতিকতার অচলায়তনকে ঝাঁকুনি দেওয়ার একটি সুযোগ হিসাবে। এ ঘটনার পরে ফরাসী সরকার ভিনসেন্নেসে একটি নতুন নিরীক্ষাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় প্যারিস অষ্টম প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বিভাগীয় প্রধান হিসেবে মিশেল ফুকো জুডিথ মিলারসহ এমন সব তরুণ ও বামপন্থী শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে থাকেন যাদের বিপ্লবীয়ানা শিক্ষামন্ত্রণালয়কে উদ্বুদ্ধ করে দর্শন বিভাগের সরকারী স্বীকৃতি বাতিল করতে। ফুকো ছাত্রদের সাথে যোগ দেন। প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করা থেকে শুরু করে পুলিশের সাথে মারামারি করার মাধ্যমে কুখ্যাতি অর্জন করেন।

ভিনসেন্নেসে ফুকোর কাজ ছিল সংক্ষিপ্ত আয়ুর। ১৯৭০ সালে তিনি ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলেজ দু ফ্রাঁস চিন্তা পদ্ধতির ইতিহাসের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। তাঁর রাজনৈতিক নানা যুক্ততা ইতোমধ্যে বেড়েছে, উগ্র-মাওবাদী সংগঠন গোশে প্রলেতারিয়েঁনে (জিপি)-তে তিনি অংশ নেন। ফুকো তাঁর দেশে এসময় প্রিজন ইনফর্মেশন গ্রুপ গড়ে তোলাতেও সাহায্য করেন যা কারাবন্দিদেরকে তাদের দাবিদাওয়া ও উদ্বেগ ব্যক্ত করতে সাহায্য করবে।
College de France
ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলেজ দু ফ্রাঁস

ফুকোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রচনা Surveiller et Punir (Discipline and Punish) এ ক্ষমতা কাঠামোর ক্ষুদ্রতম অংশেরও বর্ণনা করেন, করেন ক্ষমতা কাঠামোর পরমাণু বিভাজন যা অষ্টাদশ শতক থেকে পশ্চিমা সমাজে গড়ে উঠেছে; জেলখানা এবং স্কুলকে আলোচনার ফোকাস বা বিশেষ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফুকো এই কাজ করেছেন।

৩.
১৯৭০-এর শেষের দিকে ফ্রান্সে বামপন্থী জঙ্গীদের মোহভঙ্গজনিত হতাশার দরুন রাজনৈতিক সক্রিয়তা থিতিয়ে আসে। মাওবাদী তরুণরা নব্য দার্শনিক হবার আকাঙ্ক্ষায় অতীত পরিচয় ত্যাগ করতে থাকেন। তারা প্রায়ই ফুকোকে তাদের মুখ্য অনুপ্রেরণা হিসেবে নির্দেশ করতে শুরু করেন। এ বিষয়ে ফুকোর নিজের ভেতর মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। এ সময়ে ফুকো যৌনতার ইতিহাস (দ্য হিস্ট্রি অফ সেক্সুয়্যালিটি) শিরোনামে তাঁর ছয় খণ্ডের রচনাবলীর কাজ শুরু করেন, যা তিনি পুরো শেষ করে যেতে পারেন নি। এর প্রথম খণ্ড জ্ঞানের ইচ্ছা (দ্য উইল টু নলেজ) প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। আট বছর পরে যখন নতুন খণ্ড প্রকাশিত হলো, পাঠকেরা চমকে গেলেন এর বিষয়বস্তু (ধ্রুপদী গ্রিক এবং ল্যাটিন টেক্সটের উপর আলোচনা), রচনার ভঙ্গী ও প্রকরণ দেখে। নতুন খণ্ডে ফুকো এমন সব বিষয় আলোচনার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করেন যা অতীতে কখনো করেন নি।

এরপর ফুকো অধিকতর সময় ব্যয় করতে থাকলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফালোতে। এখানেই তিনি ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের পর তাঁর বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের জাবারিস্কি বিন্দুতে তিনি প্রথম এলএসডি মাদক গ্রহণ করেন। যাকে তিনি পরবর্তীতে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেছেন। ১৯৭৯ সালে ফুকো ইরানে যান দু’বার এবং ইরানী বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বিশদ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে শুরু করেন। ইতালীয় সংবাদপত্র করিয়ের দেল্লা সেরা-তে ইরান বিষয়ক তাঁর রচনাবলী প্রকাশিত হয় যা মাত্র ১৯৯৪ সালে ফরাসী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে এবং ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে। এই নিবন্ধাবলী ও মাদক গ্রহণ সম্পর্কিত তার বক্তব্য বিতর্কের সূচনা করে।

১৯৮৪ সালের ২৫ জুন এইডস-সংক্রান্ত এক অসুস্থতায় ফুকো প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন। তিনিই প্রথম বিখ্যাত ফরাসী যার এইডস রোগ শণাক্ত করা গেছে। সেই সময়ে এই রোগ সম্পর্কে খুব অল্পই জানা যেত এবং তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটা রহস্য ও বিতর্কের ধূম্রজালে আচ্ছাদিত। মৃত্যুর আগে, ফুকো তাঁর অধিকাংশ পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করে যান।

৪.
শাস্তি ও শৃঙ্খলা: জেলখানার জন্ম প্রথম ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয় ১৯৭৭ সালে। মূল ফরাসী সংস্করণে বইটির নাম ছিল Surveiller et Punir: Naissance de la prison, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে।

book_d.jpgহোবা ফ্রাঁসোয়া দেমিয়েঁ নামের এক ব্যক্তি ১৭৫৭ সালের জানুয়ারির ৫ তারিখে অশ্ববাহী শকটে আরোহনের সময় রাজা পঞ্চদশ লুইকে অকস্মাৎ ছুরিকাঘাত করেন। রাজা তাতে সামান্য আহত হন। এরপর বিচারের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও বীভৎস্য ভাবে জনসমক্ষে দেমিয়েঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই মৃত্যুদণ্ড প্রদানের চিত্রময় বর্ণনার মাধ্যমেই শুরু হয়েছে বইটির প্রথম অধ্যায়। দেমিয়েঁর এ ঘটনার মাত্র ৮০ বছরের মধ্যেই ফরাসী কারাগার ব্যবস্থায় কয়েদিদের জন্য দৈনন্দিন রুটিনের সময়বিধি সন্নিহিত হয়। এ দুই ঘটনা পাশাপাশি সন্নিপাত করে ফুকো অনুসন্ধানে ব্রতী হন যে কী করে এত অল্প সময়ে বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত কয়েদিদের জন্য শাস্তি ব্যবস্থা এতটা বদলে যেতে পারে। এই দুই ব্যবস্থা হলো ফুকো কর্তৃক বর্ণিত ‘শাস্তির কৃৎকৌশল’-এর দুটো ভিন্নধর্মী প্রকরণের স্ন্যাপশট। প্রথম প্রকরণটি বিবৃত করে ‘রাজকীয় শাস্তি’র ধরন যা দণ্ড ও নির্যাতনের নিষ্ঠুর ও প্রকাশ্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে জনতার দমনকে প্রতিভাত করে। দ্বিতীয়টি হলো ‘শৃঙ্খলামূলক শাস্তি’, যা ফুকোর মতে বর্তমান জমানায় চর্চিত হচ্ছে। শৃঙ্খলামূলক শাস্তি ‘পেশাদার’দের (মনস্তত্ত্ববিদ, কার্যক্রম সহায়ক, প্যারোল অফিসার প্রমুখ) কয়েদিদের ওপর ক্ষমতা বিস্তারের সুযোগ দেয়। বিশেষতঃ কয়েদিদের জেলে থাকার মেয়াদ এই পেশাদারদের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।

Panopticon……..
জেরেমি বেন্থাম-এর প্যানোপটিকন ব্লুপ্রিন্ট, ১৭৯১
………
ফুকো আধুনিক সমাজকে জেলখানার জন্য জেরেমি বেন্থাম নক্সাকৃত ‘প্যানোপটিকন’-এর সাথে তুলনা করেন, যা তার আদিরূপে ব্যবহৃত না হলেও অত্যন্ত প্রভাবশালী। প্যানোপটিকনে, একা একজন রক্ষী অনেক কয়েদিকে দেখতে পায় যদিও তাকে দেখা যায় না। প্রাগাধুনিক পর্বের অন্ধকার কারাগার বর্তমানের আধুনিক কারাগার দিয়ে প্রতিস্থাপিত কিন্তু ফুকো এই বলে সতর্ক করে দেন যে ‘দৃশ্যমানতা এক ধরনের ফাঁদ।’ এই দৃশ্যমানতার মাধ্যমেই, ফুকো বলেন, আধুনিক সমাজ তার ক্ষমতা এবং জ্ঞানের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখে। ক্ষমতা এবং জ্ঞানকে ফুকো এতটাই মৌলিকভাবে সম্পর্কযুক্ত মনে করেন যে তিনি এই দুই শব্দকে অহরহই ‘ক্ষমতা-জ্ঞান’ হাইফেনের মাধ্যমে নির্দেশ করেন। ফুকো ইঙ্গিত করেন, আধুনিক সমাজের ভেতর দিয়ে একটি ‘কার্সেরাল কন্টিনিউয়াম’ প্রবাহিত। দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা কারাগার থেকে শুরু করে নিরাপদ বাসস্থান, প্রবেশন, সমাজকর্মী, পুলিশ ও শিক্ষকদের মাধ্যমে আমাদের প্রতিদিনকার কাজের জায়গা আর গার্হস্থ্য জীবনেও এই প্রবাহ বহমান। এ সব কিছুই কিছু মানুষ দিয়ে অন্য মানুষদের তদারক (খবরদারি বা গ্রহণযোগ্য আচরণ রীতির প্রয়োগ) করার মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে আছে।

৫.
মিশেল ফুকোর প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থের ভেতর রয়েছে উন্মাদনা ও সভ্যতা (Madness and Civilization, 1961), ক্লিনিকের জন্ম (The Birth of the Clinic – 1963), জ্ঞানের প্রত্নতত্ত্ব (The Archaeology of Knowledge, 1969), শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (Discipline and Punish: The Birth of the Prison 1975) এবং তিন খণ্ডে যৌনতার ইতিহাস (The History of Sexuality): খণ্ড ১, জ্ঞানের ইচ্ছা (The Will to Knowledge, 1976); খণ্ড ২, আনন্দের ব্যবহার (The Use of Pleasure, 1984); এবং খণ্ড ৩, আত্মের প্রযত্ন (The Care of the Self, 1984)। তাঁর প্রচুর বই পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। নৈতিকতা, নন্দনতত্ত্ব এবং ক্ষমতা (এথিকস, ইসথেটিক্স এন্ড পাওয়ার), তিন খণ্ডে মিশেল ফুকোর অ্যাসেন্সিয়াল ওয়র্কস সম্প্রতি পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকা, ডিসেম্বের ২০০৭

paris-execution-de-damien.jpg
প্যারিসে হোবা দেমিয়েঁ-র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে, ১৭৫৭


শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম

মিশেল ফুকো

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ১ : নির্যাতন

প্রথম অধ্যায়: অভিযুক্তের দেহ

১৭৫৭ সালের ২ মার্চ রাজহত্যাকারী দেমিয়েঁকে ‘চার্চ অব প্যারিসের মূল দরজার সামনে গোটা শাস্তিকে আরো সম্মানজনক করে তুলবার জন্য’ আনা হয়, যেখানে তাকে ‘একটি শকটে বহন করা হয়, অভিযুক্তের পরনে তখন শার্ট ছাড়া আর কিছুই ছিল না, তার হাতে জ্বলন্ত মোম গলে পড়া একটি মশাল দেওয়া হয়েছিল যার ওজন দুই পাউণ্ড;’ অতঃপর, ‘ সেই গাড়িতে, প্লাস দ্যু গ্রেভের কাছে যেতে যেখানে একটি বধ্যমঞ্চ তৈরি করা হবে, দেমিয়েঁর বুক, বাহু, উরু এবং পায়ের ডিম হতে গনগনে লাল চিমটার সাহায্যে মাংস ছিঁড়ে নেওয়া হবে, তার ডান হাতে সেই ছুরিটি ধরা যে ছুরি দিয়ে সে কথিত পিতৃহত্যা করেছে বলে অভিযুক্ত, সেই ছুরিটি গন্দকে পুড়িয়ে দেমিয়েঁর দেহের যে অংশগুলো হতে মাংস ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে সেই সেই অংশে চেপে ধরা হবে, ঢেলে দেওয়া হবে গলিত সীসা, ফুটন্ত তেল, উত্তপ্ত রজন, মোম এবং গন্দকের মিশ্রণ ঢেলে দেওয়া হবে আহত অংশে এবং তারপর তার শরীরটা টেনে নিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে চারটি ঘোড়ার পায়ের নিচে এবং তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ ও গোটা শরীরটাই আগুনে পুড়িয়ে ভষ্মীভূত করা হয় এবং শেষমেশ সেই ছাই বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়’ (পিয়েসেস ওহিজিন্যাল…, ৩৭২-৪)।

Assassination attempt……..
হোবা দেমিয়েঁ ছুরিকাঘাত করতে যাচ্ছেন রাজা পঞ্চদশ লুইকে
………
‘শেষমেশ তাকে চার টুকরা করা হয়,’ ১ এপ্রিল ১৭৫৭-এ প্রকাশিত গেজেট দ্যু আমস্টারডাম-এ এভাবেই ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়। ‘শেষের এই অংশটুকু ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ, যেহেতু ঘোড়াগুলো এভাবে মনুষ্যদেহ টুকরো টুকরো করায় অভ্যস্ত ছিল না; ফলাফলস্বরূপ, চারটি ঘোড়ার পরিবর্তে ছয়টি ঘোড়ার প্রয়োজন হয় এবং তাতেও যখন কুলোয় নি, তখন রক্ষীরা বাধ্য হয় অভিযুক্তের উরুর মাংস কেটে ফেলতে, দেহের মাংসপেশীর তন্তুগুলো এবং সন্ধিস্থানগুলো দা কি কুড়াল দিয়ে ছিন্ন করা হয়…

‘এটা বলা হয়েছে যে যদিও দেমিয়েঁ সর্বদাই ছিল একজন ভাল গালিবাজ, তার ঠোঁট হতে কোন গালিই বাদ যায় নি; কিন্তু শাস্তির এই নির্মম যন্ত্রণায় সে প্রবল জোরে চিৎকার করতে করতে কাঁদছিল এবং পুনরাবৃত্তি করছিল: “হে ঈশ্বর! আমাকে দয়া করো! যিশু, আমাকে বাঁচাও!” এই বধ্যমঞ্চের দর্শকরা সবাই সেন্ট পল কাউন্টির যাজকের অভিযুক্তকে সান্ত্বনা দান প্রচেষ্টার মহানুভবতায় মুগ্ধ হয় যিনি অনেক বয়স হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্তকে সান্ত্বনা দান প্রচেষ্টায় কোন ত্রুটি করছিলেন না।’

বুটন, রক্ষীবাহিনীর এক কর্মকর্তা, আমাদের কাছে তাঁর স্বাক্ষ্যনামা নিম্নোক্তভাবে প্রণয়ন করেন: ‘গন্দক ঢেলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আগুনটা এত কমজোরি ছিল যে শুধুমাত্র হাতের উপরের চামড়া আলতোভাবে পুড়ে গেছিল। তখন জল্লাদ, তার জামার হাতা গোটানো, ইস্পাতের চিমটা হাতে নিল, যে ইস্পাতের চিমটা কিনা এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল এবং যা ছিল প্রায় দেড় ফুট লম্বা; লম্বা চিমটাটি জল্লাদ প্রথমে অভিযুক্তের ডান পায়ের ডিমে চেপে ধরলো এবং তারপর চেপে ধরলো উরুতে, সেখান হতে ডান বাহুর দুই মাংসল অংশে; সেখান হতে অভিযুক্তের বুকে। যদিও এই জল্লাদ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মজবুত গড়নের তবু অভিযুক্তের দেহ হতে মাংস তুলে নেবার কাজটি তার জন্যও খুব কঠিন হয়ে পড়ায় সে শরীরের একই অংশে দু’বার তিনবার করে চিমটা ঠেসে ধরছিল, চিমটাকে নানা ভাবে বাঁকিয়ে সে এই কাজ করছিল, এবং শরীরের প্রতিটি অংশ হতে সে এমন পরিমাণ মাংস তুলে নিচ্ছিল যা আক্রান্ত প্রতিটি অংশে ছয় পাউণ্ড গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছিল।’

‘চিমটার সাহায্যে এভাবে মাংস ছিঁড়ে নেবার পর দেমিয়েঁ, যে কিনা যন্ত্রণায় ভয়াবহ চিৎকার করছিল, কোন গালিগালাজ ছাড়াই, মাঝে মাঝে মাথা তুলছিল এবং নিজের দিকেই তাকিয়ে দেখছিল; একই জল্লাদ সেদ্ধ আরকের পাত্রে চামচ ডুবিয়ে প্রতিটি ক্ষতের উপর প্রচুর পরিমাণে উত্তপ্ত আরক ছড়িয়ে দিচ্ছিল। তারপর যে দড়িগুলো ঘোড়াগুলোর গায়ে বাঁধা ছিল সেগুলো খুলে অভিযুক্তের দেহে লাগানো হয়; তারপর ঘোড়াগুলোকে অভিযুক্তের হাত-পায়ে সবেগে ছেড়ে দেওয়া হয়, শরীরের এক/একটি প্রত্যঙ্গে এক/একটি ঘোড়া।

‘মঁসিয়ে লো ব্রেতোঁ, আদালতের কেরাণি, কয়েকবারই এই আক্রান্ত ও আহত ব্যক্তির কাছে যান এবং তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে তার কিছু বলার আছে কিনা। অভিযুক্ত জানায় যে তার কিছু বলার নেই; প্রতিটি অত্যাচারে সে চিৎকার করে উঠছিল যেভাবে নরকে দণ্ডিত অপরাধীরা কাঁদে, ‘ঈশ্বর, আমাকে ক্ষমা করো! ক্ষমা করো, প্রভু!’ এমন যন্ত্রণার পরেও, মাঝে মাঝেই
Robert damiens………
হোবা ফ্রাঁসোয়া দেমিয়েঁ (১৭১৫-১৭৫৭)
………
সে মাথা তুলছিল এবং নিজের শরীরের অবস্থার দিকে সাহসের সাথে তাকিয়ে দেখছিল। রক্ষীরা তার দেহে এত শক্ত করে দড়ি বেঁধেছিল এবং দড়ির প্রান্ত ধরে তারা এমনভাবে টানছিল যে সে অসম্ভব ব্যথা পাচ্ছিল। মঁসিয়ে লো ব্রেতোঁ আবার অভিযুক্তের কাছে গেলেন এবং পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন যে তার কিছু বলার আছে কিনা; দেমিয়েঁ বললো, না। কয়েকজন যাজক তার কাছে গেলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কথা বললেন; দেমিয়েঁ স্বেচ্ছায় তার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া ক্রুশে চুমু খেল; সে তার ঠোঁট খুললো বার বার বলতে লাগলো: ‘প্রভু, আমাকে ক্ষমা করো।’

Luis15…….
রাজা পঞ্চদশ লুই (১৭১০-১৭৭৪)
………
একজন একজন করে রক্ষীরা এক/একটি ঘোড়া অভিযুক্তের দেহের এক/একটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছেড়ে দিয়ে শক্তভাবে হেঁচকা টান মারলো। পঁচিশ মিনিট পর, গোটা নাটকটি আবার অভিনীত হলো এবং শেষপর্যন্ত, কয়েকবার চেষ্টার পর ঘোড়ার গতিপথ পাল্টাতে হলো, যেমন, আগে যে ঘোড়াটি অভিযুক্তের বাহুতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল সেটাই তার মাথা টানতে ব্যবহার করা হলো, উরু টানতে ব্যবহৃত ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া হলো বাহুতে, যা হাতের সন্ধিস্থল ভেঙে দিল। কোন সাফল্য ছাড়াই এই চেষ্টাগুলো কয়েকবার করা হলো। দেমিয়েঁ মাথা তুলে নিজের দিকে একবার তাকাল। দুটো ঘোড়া অতিরিক্ত যোগ করা হলো দেমিয়েঁর উরুতে আঘাত করতে, ফলে ঘোড়ার সংখ্যা সব মিলিয়ে দাঁড়ালো ছয়ে। কোন লাভ হলোনা।

‘শেষপর্যন্ত, জল্লাদ স্যামসন মঁসিয়ে লো ব্রেঁতোকে বললো যে এভাবে অভিযুক্তর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না এবং দয়া করে মসিঁয়ে ব্রেতোঁ যেন বিচারকদের জিজ্ঞাসা করে জেনে নেন যে দণ্ডিতকে টুকরো টুকরো করে কাটা হবে কিনা। মসিঁয়ে লো ব্রেতোঁ, যিনি কিনা শহর হতে এসেছেন, আদেশ দিলেন যে একই চেষ্টা পুনরায় করা হোক এবং তাই করা হলো; কিন্তু ঘোড়াগুলো আর পারছিল না বরং যে ঘোড়াটি কিনা অভিযুক্তের উরুতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘোড়াটি মাটিতে পড়ে গেল। স্বীকারোক্তি আদায়কারী যাজকেরা ফিরে এসে দণ্ডিতের সাথে আবার কথা বললেন। দেমিয়েঁ তাদের বললো, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, আমাকে চুম্বন করুন।’ সেন্ট পলের প্রধান যাজক সাহস করলেন না, সুতরাং মসিয়েঁ দ্যু মার্সিলি দড়ির নিচে দণ্ডিতের বাঁ বাহু ধরে তার কপালে চুম্বন করলেন। শাস্তিদাতারা তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়ালো এবং দেমিয়েঁ তাদের বললো গালি-গালাজ না করতে; দেমিয়েঁ তাদের কাজ চালাতে বললো এবং এটাও বললো যে সে তাদের খারাপ মনে করছে না; সে তাদের অনুরোধ জানালো যেন ঈশ্বরের কাছে তার হয়ে প্রার্থনা করে এবং সেন্ট পলের কাউন্টি যাজককে অনুরোধ করেন পরবর্তী ভক্ত সমাবেশে তার জন্য প্রার্থনা করতে।

‘দুই বা তিনবার চেষ্টার পর, দণ্ডদাতা স্যামসন এবং যারা যারাই চিমটা ব্যবহার করেছে, প্রত্যেকে তার পকেট হতে একটি ছুরি বের করে পদসন্ধিতে পা কেটে ফেলবার বদলে উরুতে মাংস কাটে; চারটি ঘোড়া সামনের দিকে একটা হেঁচকা টান মারলো এবং উভয় উরু বয়ে নিয়ে চললো, প্রথমে ডান উরু এবং তারপর অন্যটি; অতঃপর একই কাজ করা হয় অভিযুক্তের বাহু, কাঁধ, বগল এবং চারটি অঙ্গে; হাড় অবধি মাংস কাটা হয়, হেঁচকা টান দেওয়া ঘোড়াগুলো প্রথমে অভিযুক্তের ডান বাহু এবং তারপর শরীরের অন্যান্য অংশ টেনে নেয়।

‘যখন অভিযুক্তের শরীরের চারটি অংশই টানা হলো, স্বীকারোক্তি আদায়কারী যাজকেরা তার সাথে কথা বলতে এলো; কিন্তু জল্লাদ জানালো যে সে মৃত, যদিও সত্য কথা হলো আমি মানুষটিকে তখনো পর্যন্ত নড়তে দেখেছি, তার নিচের দিকের চোয়াল একদিক হতে আর একদিকে এমনভাবে নড়ছিলো যেন সে কথা বলছিলো। দণ্ডদাতাদের একজন পরে এটাও স্বীকার করেছিল যে তারা যখন অভিযুক্তের ধড়টা তুলে আগুনে ফেলে দেয়, তখনো সে বেঁচেছিল। শরীরের চারটি অংশ হতে দড়ি খুলে ফেলা হয় এবং বধ্যমঞ্চের সীমারেখা বরাবর জ্বালানো অগ্নিকুণ্ডে ধড়টি ফেলে দিয়ে তা ঢাকা হয় কাঠের গুঁড়ি এবং ডালপালার আঁটি দিয়ে এবং কাঠের সাথে মিশ্রিত খড়ে আগুন ধরানো হয়।

‘…শাস্তির নির্দেশ সম্বলিত ডিক্রির সাথে সঙ্গতি রেখে অভিযুক্তের গোটা শরীরটি ছাইয়ে পরিণত করে ফেলা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে দশটায় কয়লার ভেতর তখনো শেষ টুকরোটি জ্বলছিল। মাংসের টুকরোগুলো এবং ধড়টি পুড়তে চারঘণ্টা সময় লেগেছে। রাত প্রায় এগারোটা অবধি কর্মকর্তাগণ, যাদের ভেতর আমিও একজন ছিলাম এবং আমার ছেলেও ছিল, এবং তীরন্দাজদের এক বাহিনী চত্বরে অবস্থান করেছে।

‘ঘটনাস্থলে থাকা কিছু কিছু মানুষ পরবর্তীসময়ে দাবি করেছে যে আগের দিন যেখানে আগুন জ্বলেছে, তার ঘাসের উপরে একটি কুকুর শুয়েছিল। কুকুরটিকে কয়েকবার তাড়িয়ে দেওয়া সত্ত্বেও সে বারবার ফিরে এসেছে। তবে, এটা বোঝা তেমন কর্ঠিন নয় যে একটি প্রাণী এই জায়গাটি অন্য যে কোন জায়গা হতে তুলনামূলক গরম মনে করেছে।’ (জেভায়েসে উদ্ধৃত, ২০১-১৪)।

আশি বছর পরে, লিও ফোশার ‘প্যারিসের তরুণ কারাবন্দিদের গৃহে’র জন্য কিছু নিয়মাবলী প্রণয়ন করেন:

‘অনুচ্ছেদ ১৭। কারাবন্দিদের দিন শুরু হবে শীতকালে সকাল ছ’টায় এবং গ্রীষ্মে সকাল পাঁচটায়। সারা বছর তারা দিনে নয় ঘণ্টা করে কাজ করবে। দিনে দুঘণ্টা যাবে নির্দেশপালনে। শীতকালে রাত ন’টায় এবং গ্রীষ্মে রাত আটটায় কয়েদিদের কাজ এবং দিনের শেষ হবে।

অনুচ্ছেদ ১৮। ঘুম হতে জাগরণ। ড্রামে প্রথম শব্দতরঙ্গের সাথে সাথে, কয়েদিদের জেগে উঠতে হবে এবং তারা নিঃশব্দে পোশাক পরবে, যখন কিনা কারা তত্ত্বাবধায়ক সেলের দরজা খুলে দেবেন। ড্রামে দ্বিতীয় শব্দতরঙ্গের সাথে সাথে, কয়েদিরা পোশাক পরে ফেলবে এবং বিছানা তৈরি করবে। তৃতীয় শব্দতরঙ্গের সাথে সাথে কয়েদিরা সার বেঁধে দাঁড়াবে এবং সকালের প্রার্থনার জন্য কারাগারের চ্যাপেল (খ্রিষ্টীয় প্রার্থনা স্থান) অভিমুখে রওনা হবে। ড্রামে প্রতিটি শব্দতরঙ্গের মাঝে পাঁচমিনিট করে বিরতি প্রদান করা হবে।

অনুচ্ছেদ ১৯। কারাগারের যাজক প্রার্থনা পরিচালনা করবেন যার শেষে নৈতিক বা ধর্মীয় কোন পাঠ থাকবে। আধা ঘণ্টার বেশি এই উপাসনা পর্ব চলবে না।

অনুচ্ছেদ ২০। কাজ। গ্রীষ্মকালে সকাল পৌনে ছ’টায় এবং শীতকালে সকাল পৌনে সাতটায় কয়েদিরা বারান্দায় গিয়ে প্রথমে হাত-মুখ ধোবে এবং তাদের প্রথম রেশনের রুটি নেবে। এর পরপরই, কয়েদিরা ছোট ছোট কাজের দলে ভাগ হয়ে কাজে যাবে, যা অবশ্যই গ্রীষ্মকালে সকাল ছ’টা নাগাদ এবং শীতকালে সকাল সাতটা নাগাদ শুরু হবে।

অনুচ্ছেদ ২১। খাবার। সকাল দশটায় কয়েদিরা তাদের কাজ ছেড়ে ভোজনশালায় যাবে; বারান্দায় মুখ ধুয়ে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। দুপুরের খাবারের পর, দশটা চল্লিশ অবধি বিনোদন বা বিশ্রামের সুযোগ আছে।

অনুচ্ছেদ ২২। স্কুল। দশটা চল্লিশে, ড্রামে শব্দনিনাদের সাথে সাথে অভিযুক্তরা সার বেঁধে কারাগারের স্কুল অভিমুখে অগ্রসর হবে। দু’ঘণ্টা ব্যাপী ক্লাস চলবে এবং পড়া, লেখা, অঙ্কন ও গণিত পাঠদান করা হবে।

অনুচ্ছেদ ২৩। দুপুর বারোটা চল্লিশে, কয়েদিরা স্কুল শেষ করে সার বেঁধে বারান্দায় ফিরবে এবং বিশ্রাম নেবে। বারোটা পঞ্চান্ন মিনিটে, ড্রামে শব্দনিনাদের সাথে সাথে তারা আবার কাজের দল গঠন করবে।

অনুচ্ছেদ ২৪। একটা বাজলে তারা অবশ্যই কারখানায় ফিরবে: তারা চারটা পর্যন্ত কাজ করবে।

অনুচ্ছেদ ২৫। চারটা বাজলে কয়েদিরা কারখানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ভোজনশালায় সার বেঁধে দাঁড়াবে।

অনুচ্ছেদ ২৬। পাঁচটা পর্যন্ত নৈশ আহার এবং বিশ্রাম চলবে: কয়েদিরা এরপর আবার কারখানায় যাবে।

অনুচ্ছেদ ২৭। গ্রীষ্মে সন্ধ্যা সাতটায় এবং শীতকালে রাত আটটায় কাজ শেষ হবে; কারখানায় শেষবারের মতো রুটি দেওয়া হবে। পঁচিশ মিনিট ধরে কয়েদিদের একজন অথবা কারা তত্ত্বাবধায়ক কিছু নির্দেশমূলক রচনা হতে পাঠ করবেন। সবশেষে হবে সান্ধ্য প্রার্থনা।

অনুচ্ছেদ ২৮। গ্রীষ্মে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এবং শীতকালে সন্ধ্যা সাড়ে আটটায় কয়েদিরা অবশ্যই হাত-মুখ ধুবে এবং বারান্দায় কারারক্ষীগণ কর্তৃক তাদের কাপড়-চোপর পরীক্ষার পর সেলে ফিরবে; ড্রামে প্রথম শব্দ নিনাদের পর তারা অবশ্যই তাদের পোশাক খুলে ফেলবে এবং দ্বিতীয় শব্দের পর বিছানায় যাবে। সেলের দরজাগুলো বন্ধ করে ফেলা হয় এবং কারা তত্ত্বাবধায়করা করিডোরে পরিদর্শনে বের হবে শৃঙ্খলা এবং নৈঃশব্দ্য নিশ্চিত করতে।

অতঃপর আমরা একটি সর্বজনীন মৃত্যুদণ্ডপ্রদান ব্যবস্থা এবং একটি সময়-তালিকা পেয়েছি। এই ব্যবস্থা ও সময়-তালিকা অনুযায়ী একই ধরনের অপরাধ বা কিশোর অপরাধকে শাস্তি দেওয়া হয় না। বরং প্রত্যেকেই একটি ভিন্ন ধরনের শাস্তি ব্যবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করে। এক শতাব্দীর কম সময়ে এই শাস্তি ব্যবস্থা পৃথকীকৃত হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোটা শাস্তির অর্থনীতিকেই পুনর্বন্টন করা হয়েছে। সনাতনী বিচারব্যবস্থার বৃহৎ ‘কলঙ্কে’র এই সময়ে সংস্কারের জন্য অসংখ্য সংশোধন উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়। আইন এবং অপরাধ বিষয়ক নতুন তত্ত্বের উদ্ভব হয়, শাস্তি দানের অধিকার বিষয়ক নতুন নৈতিক এবং রাজনৈতিক বৈধতা ভাবনার উন্মেষ দেখা দেয়; পুরনো আইনগুলো বাতিল করা হয়, পুরনো প্রথাসমূহের অবলুপ্তি ঘটে। পশ্চিমের নানা দেশে ‘আধুনিক’ সব আইন-সংহিতার পরিকল্পনা করা হয়: যেমন, রাশিয়া, ১৭৬৯; প্রশিয়া, ১৭৮০; পেনসিলভানিয়া এবং তুষ্কানি, ১৭৮৬; অস্ট্রিয়া, ১৭৮৮; ফ্রান্স, ১৭৯১, চতুর্থ বর্ষ, ১৮০৮ এবং ১৮১০। নিবর্তনমূলক বিচারব্যবস্থার জন্য এ ছিল এক নতুন যুগের সূচনা।

এতগুলো পরিবর্তনের ভেতর আমি একটি পরিবর্তনকে বিবেচনা করতে চাই: বন্দি বা অভিযুক্তের প্রতি নির্যাতন জনসমক্ষে প্রদর্শন করার যে প্রথা এতকাল চালু ছিল, তা রহিত করা। বর্তমানে আমরা জনসমক্ষে বন্দিকে নির্যাতন করার ব্যাপারটি এড়িয়ে চলতে চাই; সম্ভবতঃ যেকালে এই প্রথাটি চালু ছিল তা’ এতটাই বাগবিস্তারের জন্ম দিয়েছিল বা সম্ভবতঃ ‘মানবিকীকরণে’র প্রক্রিয়া হিসেবে এই প্রথা রহিতকরণের বিষয়টি এতটাই জোরালোভাবে প্রচার করা হয় যে এ বিষয়ে নতুনতর কোন বিশ্লেষণের প্রয়োজন যেন বাদ দেওয়া হয়। এবং এই পরিবর্তন কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা’ বোঝা যাবে শুধুমাত্র বৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরগুলোর সাথে তুলনা করলে, বিচার প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট, সর্বজনীন এবং একীভূত বিধিমালা গঠন; জুরি ব্যবস্থার প্রায় শাশ্বত অবধারণ, অনিবার্যভাবে শাস্তি এবং প্রবণতার সংশোধনমূলক চারিত্র্যের সংজ্ঞায়ন যা কিনা উনবিংশ শতক হতেই শাস্তিকে ব্যক্তিগত অপরাধীর জন্য প্রযোজ্য বিষয় করে তুলেছে? অপেক্ষাকৃত কম শারীরিক শাস্তি, অপরাধীকে যন্ত্রণা দানের শিল্পে তুলনামূলক বিচক্ষণতার প্রয়োগ, সূক্ষ্মতর কিন্তু কম কষ্টদায়ী যন্ত্রণা যার আপাতঃ কোন বাহ্যিক প্রদর্শন নেই…এ সবকিছুকেই কি একটি বিশেষ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, গভীরতর পরিবর্তনসমূহের ঘটনাগত প্রভাব হিসেবে দেখা যায় না কি? এবং তারপরেও ঘটনা এটাই থাকে যে মাত্র অল্প কয়েক দশক হয় জনসমক্ষে অভিযুক্ত বা দণ্ডিতের মৃত বা জীবিত যেমনি হোক তার নির্যাতিত, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবচ্ছিন্ন বা কর্তিত দেহ, মুখ অথবা কাঁধে প্রতীকি ভাবে দাগ দেওয়া চেহারা আর দেখানো হয় না। শাস্তিমূলক অবদমনের মূল লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শরীরের ব্যবহার এখন উহ্য।

হঠাৎ করেই এখানে সেখানে মুহূর্তের জন্য পুরনো উৎসব জ্বলে উঠবার মুহূর্তগুলো বাদ দিলে অষ্টাদশ শতকের শেষ এবং উনবিংশ শতকের সূচনায় শাস্তির বিষণ্ন উৎসব মৃতপ্রায় হয়ে আসছিল। এই রূপান্তরে দু’টো প্রক্রিয়া কাজ করেছে। প্রক্রিয়াদ্বয়ের অবশ্য একই কালপঞ্জি বা কারণ ছিল না। প্রথম প্রক্রিয়াটি হলো সাধারণ মানুষের ভেতর শাস্তির উন্মুক্ত প্রদর্শনী। শাস্তির অনুষ্ঠান আয়োজন ক্রমাগত হারে হ্রাস পায়; এটা শুধুমাত্র একটি আইনগত এবং প্রশাসনিক আচরণ হিসেবে কোনমতে টিকে ছিল। শাস্তির এই উন্মুক্ত প্রদর্শনী, ফরাসী ভাষায় যাকে বলা হতো এ্যামেণ্ডে অনারাবল, ১৭৯১ সালে ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো বাতিল করা হয়। স্বল্পসময়ের জন্য এই প্রদর্শনী ব্যবস্থা ফিরে আসার পর পুনর্বার বাতিল করা হয় ১৮৩০ সালে; অপরাধীর গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া কাঠের চাকা ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে এবং ১৮৩৭ সালে ইংল্যাণ্ডে বাতিল করা হয়। অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যাণ্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া সহ কতিপয় অঙ্গরাজ্যে রাস্তা পরিষ্কার, হাইওয়ে মেরামত সহ নানা ধরনের কাজে কারাবন্দিদের ব্যবহার করা হয়। এই দণ্ডিত কয়েদিদের, যাদের কিনা সহজেই তাদের ‘কলঙ্কজনক পোশাক’ এবং মুণ্ডিত মস্তক দিয়ে আলাদা করা যেত, জনসমক্ষে আনা হতো। অলস ও ঘৃণ্য প্রমোদে জড়িত ব্যক্তিদের বিনোদন উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত এই কয়েদিরা মাঝে মাঝেই খেপে গিয়ে তাদের আক্রমণকারীদের ফিরিয়ে দিত পাল্টা আক্রমণ। যেন এই কয়েদিরা খেপে গিয়ে পাল্টা আক্রমণ না করতে পারে, এজন্য তাদের গলায় পরানো হতো বড় বড় লোহার গলবন্ধনী এবং শেকল যাতে আবার বোমার গোলা সংযুক্ত থাকতো, কারারক্ষীরা বন্দিদের টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাবার অবমাননামূলক কাজটি করার সময় বন্দিদের রাখা হতো তলোয়ার, বড় বন্দুক এবং ধবংসাত্মক নানা অস্ত্র হাতে প্রহরারত রক্ষীদের নজরাধীন।’ (রবার্টস ভো, নোটিশেস, ২১, তিতারস-এ উদ্ধৃত, ১৯৩৭, ২৪)। অষ্টাদশ শতকের শেষ এবং উনবিংশ শতকের সূচনায় এই পুরনো প্রথা বলতে গেলে পুরোপুরি বাতিল করা হয়। কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও কারাবন্দিদের উন্মুক্ত প্রদর্শনী ব্যবস্থা ফ্র্র্র্রান্সে বলবৎ ছিল ১৮৩১ সালেও–‘একটি অকথ্য দৃশ্য,’ রিয়েল (গ্রন্থপঞ্জি দেখুন) বলতেন; ফ্রান্সে এই ব্যবস্থা চিরতরে রহিত হয় ১৮৪৮ সালে। ব্রেসত এবং ত্যুলোর মত দূরবর্তী সব এলাকাসহ গোটা ফ্রান্সেই শৃঙ্খলিত কয়েদি দল অভিযুক্তদের টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলতো, ১৮৩৭ সালে এই ব্যবস্থা কালো রঙের জেল-গাড়ি আমদানির মাধ্যমে অবলুপ্ত হয়। ধীরে ধীরে শাস্তিকে প্রদর্শনীর বিষয় হতে রহিত করা হয়। শাস্তির এই প্রদর্শনী ব্যবস্থায় তখনো পর্যন্ত যে নাটকীয় উপাদান ছিল, তা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়, যেন বা শাস্তির এই অনুষ্ঠান ক্রমাগত তার বোধগম্যতা হারিয়ে ফেলছিল, যেন বা এই আচার যা ‘অপরাধকে শেষ করে’ তা’ যেন অনাকাক্সিক্ষত ভাবে উল্টো জনমনে অপরাধের সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে প্রতিভাত হতো। যেন বা প্রদর্শিত শাস্তি প্রক্রিয়া অপরাধের বর্বরতাকে ছাড়িয়ে না গেলেও তার সমমাত্রার নিষ্ঠুর একটি প্রপঞ্চ, যা শাস্তিদানকারীকে অপরাধীর সমপর্যায়ে নামিয়ে আনে, বিচারকদের মনে হয় যেন বা খুনী, যেন বা শেষ মুহূর্তে সবার ভূমিকা পাল্টে যায়. নির্যাতিতকে মনে হবে সবার করুণা বা সমীহের পাত্র। ১৭৬৪ সালে, ব্যক্কারিয়া মন্তব্য করেছিলেন: ‘শাস্তি যেন পরিতাপহীন ভাবে খুনের ভয়াবহ ঘটনাকেই শীতল রক্তে পুনরায় সঙ্ঘটিত করে (বেক্কারিয়া, ১০১)।’ দণ্ডদান প্রক্রিয়াকে বর্তমানে একটি অগ্নিকুণ্ড হিসেবে প্রত্যক্ষ করা হয় যেখানে সন্ত্রাস পুনরায় অগ্নিশিখা হিসেবে ফেটে পড়ে।

শাস্তি, অতঃপর, বিচার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গোপন বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়ে উঠবার প্রবণতা দেখাবে। এর কতিপয় প্রতিক্রিয়া আছে: এটা কম বেশি প্রতিদিনকার দৃষ্টিভঙ্গির চৌহদ্দি পরিত্যাগ করে এবং বিমূর্ত চেতনায় প্রবেশ করে; দণ্ডের কার্যকারিতা এর দৃশ্যমান জান্তবতা নয় বরং অপরিহার্যতা হতে উদ্ভুত, জনসমক্ষে দণ্ডদান প্রক্রিয়া কার্যকর করার নিষ্ঠুরতা নয় বরঞ্চ দণ্ডিত হবার অমোঘতাই অপরাধ সঙ্ঘটনকে নিরুৎসাহিত করে; দণ্ড বা শাস্তির উদাহরণযোগ্য নির্মাণ-পদ্ধতি বা বলবিদ্যা এর নির্মাণকৌশলকে পরিবর্তিত করে। ফলে বিচার ব্যবস্থা আর এর অনুশীলন হতে উদ্ভুত সন্ত্রাসের জনদায়িত্ব পালন করে না। দণ্ড যদি এর পরেও আঘাত করে, করে হত্যা, তবে তা দণ্ডের শক্তি প্রদর্শনের মহিমা নয়, বরং দণ্ডপ্রক্রিয়া যতদূর সহ্য করতে পারে তার একটি উপকরণ যার জন্য নিজেকে দায়ী করাও তার জন্য বেশ কষ্টকর। অপবাদ বা নিন্দার বণ্টন পুনর্বিন্যস্ত হয়: বধ্যমঞ্চ হতে প্রদর্শিত শাস্তি সংশয়মিশ্রিত আতঙ্ক সৃষ্টি করে: এই আতঙ্ক দণ্ডদাতা ও অভিযুক্ত উভয়কেই ভয়ের খামে মুড়ে রাখে; এবং যদিও দণ্ড বা শাস্তি প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্তের লজ্জাকে করুণা বা মহিমার মোড়কে পুরে দিতে সদা প্রস্তুত, দণ্ডপ্রক্রিয়ায় দণ্ডদাতা কর্তৃক ব্যবহৃত আইনী সহিংসতাকে লজ্জার বিষয় হিসেবে পাল্টে দিতে সাহায্য করেছে। এখন কলঙ্ক এবং আলো ভিন্ন ভাবে বণ্টন করতে হবে; দোষী সাব্যস্তকরণের মাধ্যমে অপরাধীকে অনপনেয়ভাবে নেতিবাচক ভাবে চিহ্নিত করা হয়: অপরাধের প্রচার আদালতে ট্রায়াল বা বিচার প্রক্রিয়া সূচনা করে এবং ঘটনা প্রবাহকে এগিয়ে নেয় শাস্তি বা দণ্ডপ্রদান অবধি; দণ্ডদান প্রক্রিয়া নিজেই যেন একটি অতিরিক্ত লজ্জা যা বিচার ব্যবস্থা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি প্রয়োগ করতে লজ্জা পায়; ফলে, দণ্ড বাস্তবায়ন হতে বিচার প্রক্রিয়া নিজেকে আলাদা করে রাখে; যেহেতু বিচার ব্যবস্থা দণ্ডদান বা শাস্তিপ্রদানের গোটা কাজটি হতে নিজেকে দূরে রাখে, গোপনীয়তার মোহরানার আড়ালে কাজটির দায়ভার সে ন্যস্ত করে অন্যদের উপর। দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া কুৎসিত নিশ্চয়, তবে দণ্ডদান বা শাস্তিপ্রদানের কাজেও তেমন কোন গৌরব নিহিত নেই। একারণেই বিচারব্যবস্থা নিরাপত্তার দ্বৈত ব্যবস্থা তার আপনকার এবং অপরাধীর কাঁধে বর্তানো শাস্তির ভেতর রেখে দিয়েছে। যারা শাস্তি বা দণ্ডকে কার্যকর করে, তারা নিজেরাই একটি স্বায়ত্ত্বশাসিত খাত হয়ে দাঁড়ায়; ন্যায়বিচার শাস্তি বা দণ্ডপ্রদানের বিষয়টিকে লুকিয়ে রাখার মাধ্যমে নিজস্ব দায়-দায়িত্ব এড়ায়। এটা প্রায় গৎবাঁধা যে ফ্রান্সে কারাগারের পরিচালনা ব্যবস্থা এতকাল ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে থাকলেও দণ্ডিত অপরাধীদের জাহাজ এবং বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থাদি নৌ মন্ত্রণালয় এবং উপনিবেশ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিল। এবং দায়-দায়িত্ব বন্টনের এই ব্যবস্থার উর্ধ্বে একটি তাত্ত্বিক অস্বীকৃতি রয়েছে: কল্পনা করো না যে আমরা বিচারকেরা যে সব শাস্তি বা দণ্ডাজ্ঞা প্রদান করি, তা’ স্রেফ শাস্তি দেবার আকাক্সক্ষা হতে উদ্ভুত; বরঞ্চ এই দণ্ডাজ্ঞাসমূহ সংশোধন, পুনরুদ্ধার এবং ‘সারিয়ে তুলবার’ ইচ্ছা হতে জাগ্রত; শাস্তি বা দণ্ডপ্রদান ব্যবস্থায় ‘উন্নতি’র এই কৌশল, মন্দ কাজের কঠোর দণ্ড ম্যাজিস্ট্রেটকে শাস্তি প্রদানের নিচু কাজের যন্ত্রণা বহনের হাত হতে অব্যাহতি দেয়। আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় এবং যারা এই ব্যবস্থাকে স্বীকার করে না, তাদের জন্য দণ্ড বা শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়ায় যেন লজ্জার একটি বিষয় আছে, যা সবসময় উদ্দীপনার অংশটুকু ছেঁটে ফেলে না। লজ্জার এই বোধ ক্রমাগত বাড়ছে: পরিত্যক্ত ক্ষতস্থানে মনঃস্তত্ত্ববিদ এবং নৈতিকতার অস্থিবিদগণ ব্যাপকহারে বংশবৃদ্ধি করেন।

প্রকাশ্যে শাস্তি বা দণ্ডপ্রদানের হার অবলুপ্তির সাথে সাথে দর্শকদের হারও কমতে থাকে; এটা একইসাথে শরীরের উপর দখল বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও শৈথিল্য আনে। ১৭৮৭ সালে, সোসাইটি ফর প্রমোটিং পলিটিক্যাল এনকোয়ারিজ -এ প্রদত্ত এক ভাষণে, বেঞ্জামিন রুশ মন্তব্য করেন: ‘আমি এটুকু মাত্র আশা করতে পারি যে সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন ফাঁসি কাঠ, দণ্ডিতের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া কাঠের চাকা, বধ্যমঞ্চ, চাবুকাঘাত এবং চাকার ব্যবহার, শাস্তির ইতিহাসে একদিন শতাব্দীর বর্বরতা হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং মানব মনের উপর যুক্তি ও ধর্মের দুর্বল প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে।’ (টিটারস, ১৯৩৫, ৩০)। এতদ্সত্ত্বেও, ষাট বছর পরে, ভ্যান মিনেন, ব্রাসেলসে দ্বিতীয় শাস্তি কংগ্রেসের উদ্বোধনীকালে বলেন: ‘আমি মাটির উপর দেখেছি চাকা, অপরাধীর ঝুলন্ত শরীরবাহী ফাঁসিকাঠ, অপরাধীর গলায় ঝোলানো কাঠের চাকার দাগ (এ্যানালস্ দো লা চ্যারিতে, ৫২৯-৩০)।’ ইংল্যান্ডে (১৮৩৪) এবং ফ্রান্সে (১৮৩২) অপরাধীকে ‘দাগ দেওয়া’ নিষিদ্ধ হয়েছিল; ১৮২০ সালে বিশ্বাসঘাতক বা দেশদ্রোহীদের পূর্ণ শাস্তি দিতে অস্বস্তি বোধ করা শুরু করেছে (থিসলউডকে চার টুকরো করা হয় নি)। শুধুমাত্র চাবুকাঘাত তখনো পর্যন্ত অনেক দেশের শাস্তি ব্যবস্থায় প্রচলিত ছিল (রাশিয়া, ইংল্যাণ্ড, প্রুশিয়া)। তবে, মোটামুটিভাবে ততদিনে শাস্তিমূলক আচরণগুলো হ্রাস পেতে শুরু করেছে। অপরাধীর শরীর তখন আর স্পর্শ করা হয় না, অথবা স্পর্শ করা হলেও যতটা কম করা যায় ততটাই। অবশ্য একথার প্রতিবাদ করা যেতে পারে এই বলে যে কারাবন্দিত্ব, আটকদশা, বাধ্যতামূলক শ্রম. শাস্তিমূলক দাসত্ব, কিছু এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধকরণ, চালান–শাস্তির এ যাবতীয় প্রকরণ, যেগুলো কিনা আধুনিক শাস্তি ব্যবস্থায় এত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে–এর সবগুলোই হলো ‘শারীরিক’ শাস্তি: অর্থদণ্ডের মতো তা দেহ বা শরীরের ব্যাপারে অপ্রত্যক্ষ নয়, বরঞ্চ বেশ প্রত্যক্ষ ভূমিকাই পালন করে। কিন্তু, প্রকাশ্যে শাস্তি প্রদানের যুগে নির্যাতনের প্রকরণ যেমন ছিল, আজকের যুগের শাস্তি-দেহ সম্পর্ক আর তেমন নেই। শরীর বর্তমানে যন্ত্রের মতো বা মধ্যবর্তী ভূমিকা পালন করে: যদি কেউ এই শরীরকে বন্দি করার জন্য বা একে দিয়ে কাজ করানোর জন্য হস্তক্ষেপ চালায়, তবে তা’ করা হয়ে থাকে মূলতঃ ব্যক্তিকে তার মুক্তি বা স্বাধীণতা হতে বঞ্চিত করার জন্য যা একইসাথে তার অধিকার ও সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। শরীর, এই শাস্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, বাধা ও বঞ্চণা, দায়বোধ ও নানা নিষেধাজ্ঞার একটি ব্যবস্থায় বন্দি। শারীরিক ব্যথা, শরীরের নিজস্ব ব্যথা, শাস্তির গঠনকারী উপাদান হিসেবে আর বিবেচিত নয়। অসহনীয় যন্ত্রণার শিল্প হতে শাস্তি আজ রূপান্তরিত হয়েছে স্থগিত অধিকারের অর্থনীতিতে। যদি আজো আইনের জন্য অভিযুক্তের দেহ অবধি পৌঁছানো এবং দেহকে ব্যবহার করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে, তবে তা-ও করা হবে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব হতে, একটি যথাযথ পন্থায়, কঠোর নীতিমালা অনুসারে এবং একটি ‘উচ্চতর’ লক্ষ্যে। এই নতুন প্রতিবন্ধকতা অনুযায়ী, যন্ত্রণার প্রত্যক্ষ শবব্যবচ্ছেদকারী বা এককথায় দণ্ডপ্রয়োগকারীর হাত হতে নানা ধরণের কলাকুশলীবিদদের বলতে গেলে একটি গোটা সৈন্যবাহিনী শাস্তিপ্রয়োগের ব্যবস্থাটি হাতে নিয়ে নিল: এদের ভেতর আছে কারারক্ষী, ডাক্তার, যাজক, মনস্তত্ত্ববিদ, শিক্ষাবিদ; বন্দির খুব নিকটে তাদের নিজস্ব উপস্থিতির মাধ্যমে তারা আইনের প্রয়োজনীয় প্রশংসাবানী গায়: তারা এটা পুনর্নিশ্চিত করে যে তাদের শাস্তিপ্রদানমূলক কাজের শেষ গন্তব্য শুধুমাত্র দণ্ডিতের শরীর এবং সেই শরীরে যন্ত্রণাপ্রদান নয়। আজকের দিতে ফাঁসি প্রয়োগকারী দণ্ডদাতার পাশাপাশি একজন চিকিৎসকও থাকেন যিনি দণ্ডিতের মৃত্যুর শেষমূহর্ত পর্যন্ত গোটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন–জীবন সংহারী দণ্ডদাতার কাছে থেকেই নিজেকে কল্যাণের দূত, ব্যথা উপশমকারী হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এই ভাবনাটা বেশ মজার। দণ্ডদানের মুহূর্তটি যখন আসে, ট্রাঙ্কুলাইজার দিয়ে অভিযুক্তকে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। যেনবা বিচার বিভাগীয় স্বল্পভাষিতার এক অলীক কল্পনা: জীবন নিয়ে নাও, কিšত্ত রোগীকে জীবন চলে যাবার কষ্ট বোধ করতে দিও না; কয়েদিকে তার যাবতীয় অধিকার হতে বঞ্চিত করো, কিন্তু যন্ত্রণা দিও না; শাস্তিসমূহকে যথাসম্ভব ব্যথামুক্ত করো। মনো-ওষুধপ্র¯ত্ততবিদ্যা (সাইকো-ফার্মাকিউলোজি) এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তিয় ‘বিযুক্তিকারক’-এ আশ্রয় নাও, যদি এটা ক্ষণস্থায়ীও হয়, এটাই ‘অ-দৈহিক শাস্তি’র একটি যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া।

দণ্ডপ্রয়োগের অধুনা অনুষ্ঠানাদি এই দ্বৈত প্রক্রিয়াকে বলবৎ করে: বধ্যমঞ্চের বিলুপ্তি এবং যন্ত্রণার অবসান। একই আন্দোলন বিভিন্ন ইউরোপীয় আইনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে।

এই একই আন্দোলন বিভিন্ন ধরনের ইউরোপীয় আইনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে, এই প্রতিটি আন্দোলনই প্রভাবিত করার কাজটি করেছে তার নিজস্ব মাপে–দণ্ড এখন কোনভাবেই আর অপরাধের বিশেষ চিহ্ন বা অপরাধীর সামাজিক অবস্থানকে বহন করে না; অপরাধীর প্রতি প্রযোজ্য মৃত্যুদণ্ড যা একমুহূর্তেই নিষ্পন্ন হয়–তার আগে বাড়তি আর কোন অত্যাচার বা নির্যাতন দিয়ে অপরাধীকে কষ্ট দেবার প্রয়োজন নেই, শবদেহের উপর আর কোন আঘাত করার দরকার নেই; একটি মৃত্যুদণ্ড যা শরীরের চেয়ে জীবনকেই বেশি প্রভাবিত করে। বর্তমানে আর কোন দীর্ঘ মৃত্যুদণ্ডপ্রদান প্রক্রিয়া নেই যে প্রক্রিয়ায় মৃত্যুকে হিসেবি নানা প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে থামিয়ে দেওয়া হয় এবং তারপর ধারাবাহিক ও একের পর এক আঘাতের মাধ্যমে মৃত্যুর সম্ভাবনা ও যন্ত্রণাকে বহু গুণ বাড়িয়ে তোলা হয়। রাজহত্যার অপরাধে শাস্তি হিসেবে বীভৎস নানা অত্যাচারের যে সম্মিলন দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, আঠারো শতকের শুরুতে ফাঁসি যথেষ্ট শাস্তি নয়–হ্যাঙ্গিং নট পানিশমেন্ট এনাফ (১৭০১) গ্রন্থের নামহীন লেখক যে ধরনের শাস্তির কথা বলে গেছেন, যে শাস্তি বা দণ্ডাজ্ঞার মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চাকার নিচে ফেলে তার শরীর ভেঙে গুঁড়ো করা হবে, অতঃপর যতক্ষণ না সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, ততক্ষণ তাকে চাবুক মারা হবে, তারপর শেকলে ঝুলিয়ে রাখা হবে, এবং শেষমেশ ধীরে ধীরে সে চলে যাবে মৃত্যুর জগতে–তেমন শাস্তি বর্তমানে আর প্রচলিত নেই। বর্তমানে এমন কোন দণ্ডপ্রথা আর প্রচলিত নেই। বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের সেই সব প্রকরণ আর নেই যে প্রকরণাদি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একটি প্রতিবন্ধকের উপর টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হতো (যাতে বাঁধাইকরা পাথরের উপর তার মাথা আঘাত পেয়ে ফেটে না যায়), এমনভাবে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া হতো যাতে তার পেট বা উদরপ্রদেশ খুলে নাড়ি-ভুঁড়ি বা অন্ত্রনালীসমূহ দ্রুতই ছিঁড়ে বের হয়ে আসতো এবং এই দৃশ্য অভিযুক্তকে নিজের চোখেই প্রত্যক্ষ করতে হতো, আগুনের উপর তাকে ছুঁড়ে ফেলা হতো; গোটা প্রক্রিয়ার শেষে তার মাথা কেটে ফেলা হতো এবং শরীরটা করা হতো চার টুকরো। অপরাধীকে ‘হাজারো মৃত্যু’ ভোগ করানোর এই ব্যবস্থাকে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত মৃত্যুদণ্ডে হ্রাসকরণ গোটা শাস্তিব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন নৈতিকতার জন্মকেই সংজ্ঞায়িত করে।

১৭৬০ সালের দিকে লর্ড ফেরেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে একটি ফাঁসিকল তৈরি করা হয়েছিল। এই ফাঁসি কলে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পায়ের নিচে একটি মঞ্চ খুলে যেত যা ইতোপূর্বের ধীরগতি মৃত্যুদণ্ডকে তরান্বিত করেছিল এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ও দণ্ড কার্যকারকের ভেতর ঝগড়া-ফ্যাসাদের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছিল। পরে এ অবস্থার আরো উন্নতি হয়। এবং ১৮৭৩ সালে ফাঁসির এই ব্যবস্থা গৃহীত হয়। একই বছর নিউগেট থেকে টাইবার্ন অবধি দণ্ডপ্রাপ্তকে নিয়ে জনতার সামনে যে পথযাত্রা হতো তা রহিত করা হয়, গর্ডনের দাঙ্গার পর কারাগারের পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং নিউগেটে বধ্যমঞ্চ স্থাপন করা শুরু হয় (দেখুন হিবার্ট, ৮৫-৬)। ১৭৯১ সালের ফরাসী আইনের অনুচ্ছেদ ৩-এ উদ্ধৃত–‘মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত সকল ব্যক্তির শিরচ্ছেদ করা হবে–’ বিধির ত্রিবিধ গুরুত্ব বা ব্যঞ্জনা আমরা লক্ষ্য করি: সবার জন্য সমান মৃত্যু (গিলোটিনের গতিশব্দে প্রস্তাবিত এবং ১৭৮৯ সালের ১লা ডিসেম্বর পাসকৃত বিধি ‘একই ধরনের অপরাধের জন্য একই ধরনের শাস্তি বিধান করা হবে, সে অপরাধীর পদমর্যাদা বা অবস্থান যেমনি হোক না কেন’); ফাঁসিকাঠের মতো মৃত্যুদণ্ডের ‘দীর্ঘ এবং ফলাফলস্বরূপ নিষ্ঠুর’ পদ্ধতিসমূহে আশ্রয় নেবার পরিবর্তে প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একটি মাত্র আঘাতের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রদানের এই নতুন নিয়ম লো পেলেতিয়ার জনসমক্ষে ঘোষণা করেন; শেষতঃ শিরচ্ছেদের সময় থেকে শুধুমাত্র অভিযুক্তের একার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা, অভিজাতদের জন্য মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি নতুন ব্যবস্থা ছিল অপরাধীর পরিবারের পক্ষে সবচেয়ে কম লজ্জাজনক (লো পেলেতিয়ার, ৭২০)। ১৭৯২-এর মার্চে গিলোটিনের প্রথম ব্যবহার এই নতুন নীতিমালা কার্যকরী হবার বাহক হিসেবে সূচীত হয়। মৃত্যু একটি প্রত্যক্ষ কিšত্ত মুহূর্তের কার্যক্রমে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। আইন, যারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এবং অপরাধীর শরীর, এই যাবতীয় অনুষঙ্গের ভেতর যোগাযোগ মুহূর্তের ভগ্নাংশে কমিয়ে আনা হয়। কোন শারীরিক সঙ্ঘর্ষ নেই; মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগকারীর কাজ এখন একজন নিষ্ঠাবান ঘড়িনির্মাতার বেশি নয়। ‘ অভিজ্ঞতা এবং যুক্তি এটাই আমাদের দেখায় যে অতীতে যখন একজন অপরাধীর মাথা কেটে নেওয়া হতো সেটা তার কাছে জীবন হারানোর চেয়েও আতঙ্ককর এক নির্যাতনের মুখোমুখি করতো, যা ছিল আইনের প্রদর্শিত ইচ্ছা; মৃত্যুদণ্ড এক মুহূর্তে এবং এক আঘাতে কার্যকরী হওয়া উচিত; উদাহরণ আমাদের দেখায় যে সেটা কত কঠিন কাজ। যথাযথভাবে কাজ সম্পন্ন হবার জন্য অপরিবর্তনীয় যান্ত্রিক উপায়সমূহের সাহায্য নেওয়া দরকার যার শক্তি এবং অভিঘাত যাচাই করে নেওয়া যায়… একটি শক্তিশালী বধ্যযন্ত্র নির্মাণ এমন কোন কঠিন বিষয় নয়; শিরচ্ছেদ তখন নতুন আইনের ইচ্ছানুযায়ী মুহূর্তের পলকে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনবোধে এই যন্ত্রকে এমনভাবে তৈরি করা হবে, যাতে তেমন কোন ব্যথা অনুভূত হবে না এবং কষ্টটা তেমন দেখাও যাবে না’ (সেইন্ট-এডমি, ১৬১)। গিলোটিন শরীরকে স্পর্শ না করেই জীবন কেড়ে নেয়, যেমন কারাগার কেড়ে নেয় স্বাধীনতা অথবা জরিমানা সম্পদ হ্রাস করে। দণ্ডদানের নতুন এই প্রযুক্তি যত না ব্যথা অনুভবে সক্ষম একটি সত্যিকারের শরীরের প্রতি আইন প্রয়োগ করতে চায়, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ তার বিচারের কর্তাকে অস্তিমান রাখা ও বৈধতা যোগান দেওয়া। কোন সন্দেহ নেই যে ফ্রান্সে একটি নির্দি’ সময়ের জন্য, কিছু পুরনো জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড প্রথা, নতুন মৃত্যুদণ্ডব্যবস্থা সমূহের মিতাচারিতার সাথে মিশ্রিত করে জুড়ে দেওয়া হয়। পিতৃহত্যা এবং রাজহত্যার দায়ে দণ্ডিতদের মুখ কালো পর্দায় আবৃত করে বধ্যমঞ্চে নিয়ে যাওয়া হতো; ১৮৩২ সাল পর্যন্ত এই দুই অপরাধে অভিযুক্তদের হাত কেটে ফেলা হতো। অতঃপর আলঙ্কারিক ক্রেপ ব্যতীত কিছুই অবশি’ থাকতো না। এভাবেই ফিয়েশ্চির ঘটনায়, লুই-ফিলিপের হবু আততায়ী, ১৮৩৬-এর নভেম্বরে ঘোষণা করেন: ‘তাঁকে বধ্যমঞ্চে নিয়ে যাওয়া হবে নগ্নপদ এবং শুধুমাত্র একটি শার্ট পরিয়ে, তার মাথা একটি কালো পর্দায় ঢাকা; তাঁকে বধ্যমঞ্চে জনতার সামনে প্রদর্শন করা হবে যখন ঘোষক সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে দণ্ডাজ্ঞা পাঠ করে শোনাবে এবং তাঁকে সাথে সাথেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হবে।’ আমাদের দেমিয়েঁর কথা মনে রাখা উচিত–লক্ষ্য করুন যে মৃত্যুদণ্ডে শেষ যে বিষয়টি যুক্ত হয় তা’ হলো অভিযুক্তের মুখে শোকবিলাপকারী একটি পর্দা। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আর দেখা যেত না। শুধু বধ্যমঞ্চে শাস্তির ঘোষণা হতে জানা যেত অপরাধটি কী এবং এই অপরাধীর মুখ দেখা যাবে না। (একজন অপরাধী যত বেশি দানবীয় হবে, তাকে ততই আলো হতে দূরে রাখা হবে: সে কিছু দেখবে না এবং তাকে কেউ দেখবে না। সেসময়ে এটা বেশ প্রচলিত একটা ধারণা ছিল। পিতৃহত্যার জন্য একজনের উচিত ‘একটি লোহার খাঁচা বানানো অথবা একটি অভেদ্য ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষ খনন করা যা তার জন্য একটি চিরস্থায়ী পলায়নস্থল হিসেবে কাজ করবে–’ (দ্যু মোলেন, ২৭৫-৭)। প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডে কার্যকর করার শেষ গণজমায়েত দেখা যায় বেনোয়ার বিচারের ঘটনায়: যেখানে অপরাধীর মুখ কাপড়ে আবৃত ছিল।

বেনোয়া, তিন/তিনটি দোষে কলঙ্কিত (মায়ের হত্যাকারী, সমকামী এবং ঘাতক), ছিল প্রথম পিতৃহত্যাকারী যার হাত কাটা হয় নি :‘যখন শাস্তির রায় পড়ে শোনানো হচ্ছিল, সে দণ্ডপ্রদানকারীদের দ্বারা প্রস্তুত ও ধরে রাখা বধ্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিল। এটা ছিল একটা ভয়াবহ দৃশ্য; একটি দীর্ঘ সাদা চাদরে শরীর মোড়ানো, মুখ কালো কাপড়ে আবৃত থাকায় পিতৃহত্যাকারী নিঃশব্দ জনতার দৃষ্টি এড়াতে পারলেও সেই রহস্যময় এবং বিষণ্ন কাপড়ের নিচে জীবনকে অনুভব করা যাচ্ছিল ভয়ার্ত কান্নার চিৎকার থেকে যা দ্রুতই ছুরির নিচে থেমে যায় (গেজেট দেস ত্রাইব্যুনাক্স, ৩০ আগস্ট ১৮৩২)।

উনিশ শতকের সূচনায় দৈহিক শাস্তির প্রকাশ্য প্রদর্শনী বিলুপ্ত হয়; শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়; শাস্তি হতে যন্ত্রণার নাটকীয় প্রতিনিধিত্বটুকু বাদ দেওয়া হয়। শাস্তি বা দণ্ডে সংযম ও মিতাচারের প্রয়োগ এসময় হতেই শুরু। ১৮৩০-৪৮ সাল নাগাদ, জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড, যার সূচনা হতো শারীরিক নির্যাতন দ্বারা, প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়। নিঃসন্দেহে এই সাধারণীকরণের পেছনে কিছু কারণ ছিল। গোড়া হতে শুরু করলে, এই পরিবর্তনগুলো একদিনে আসেনি অথবা কোন একটি নির্দিষ্ট ও একক প্রক্রিয়ার অংশও নয়। শুরুতে সময় নিয়েছে। অযৌক্তিকভাবে হলেও ইংল্যান্ড ছিল সেই দেশগুলোর একটি যারা জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের কাজটি তড়িঘড়ি করে নিষিদ্ধ করতে চায়নি: সম্ভবতঃ জুরিবর্গের ভূমিকা, আদালতে প্রকাশ্য শুনানি ব্যবস্থা এবং হেবিয়াস করপাস ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা তাকে একটি অপরাধ আইন দিয়েছিল; সর্বোপরি, এব্যাপারেও কোন সন্দেহ নেই যে ১৭৮০-১৮২০ সালের গভীর সামাজিক অসন্তোষের বছরগুলোয় সে তার দণ্ডবিধি আইনের কঠোরতা কমাতে চায় নি। একটি দীর্ঘসময় ধরে রোমিলি, ম্যাকিনটোশ এবং ফওয়েল বাক্সটন ব্রিটিশ আইন কর্তৃক প্রদত্ত বহুবিধ এবং নিষ্ঠুর শাস্তির মাত্রা কমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন–সেই ‘ভয়াবহ কসাইপনা’ বলে রোসি যা বর্ণনা করেছেন। এর তীব্রতা (বস্তুতঃ জুরিগণ এই যাবতীয় শাস্তিকে অতিরিক্ত বলে গণ্য করতেন এবং শাস্তিসমূহ প্রয়োগের ব্যাপারে যথেষ্ট শিথিল, কোমল ও দয়ালু ছিলেন) অবশ্য আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে: ১৭৬০ সালে ব্ল্যাকস্টোন ব্রিটিশ আইনের আওতায় ১৬০ ধরনের গুরুতর অপরাধ নথিভুক্ত করেন, ১৮১৯ সাল নাগাদ নথিভুক্ত গুরুতর অপরাধের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৩-এ। আবার, ১৭৬০ হতে ১৮৪০-এর ভেতর গোটা প্রক্রিয়াটি যতটা আগু-পিছু হয়, তারও হিসেব রাখা উচিত; যেমন, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরা’্র, সংসদীয় ফ্রান্স সহ বেশ কিছু দেশের দ্রুত সংস্কার, এবং প্রতিবিপ্লবকালীন ইউরোপে আইনী কঠোরতার ফিরে আসা, কম বেশি আপৎকালীন আদালতের (ইমার্জেন্সি কোর্ট) মাধ্যমে আইনের দ্রুত পরিবর্তন; এবং ১৮২০-৪৮ সময় পর্বে সঞ্চারিত ভয়াবহ সামাজিক ভীতি; আইন ও আদালতের বাস্তব অনুশীলনের ভেতর বিদ্যমান ফারাক (যা কোনক্রমেই আইনী পরিস্থিতির কোন বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবি নয়)। শতাব্দীর বাঁক বদলের সময় এই সব বিষয়ই আইন রূপান্তরে অনিয়মের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সেই সাথে একথাও যোগ করা উচিত যে যদিও ১৮৪০ সাল নাগাদ অধিকাংশ পরিবর্তনই সম্পন্ন হয়েছে, যদিও এসময়ের ভেতর শাস্তির কলাকৌশল তাদের সক্রিয়তার নতুন পন্থা পরিগ্রহ করেছে, গোটা প্রক্রিয়াটি নিষ্পন্ন হতে তখনো ঢের দেরি। ১৭৬০-১৮৪০ নাগাদ বৃহৎ মাত্রার সামাজিক সংস্কারের বছরগুলোয় এই নির্যাতন হ্রাস বা অবনমনের শেকড় প্রোথিত, তবে এটাই শেষ কথা নয়; এটা বেশ বলা যেতে পারে যে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দণ্ড বা শাস্তি ব্যবস্থাকে তাড়া করে ফিরেছে এবং আজো তাড়া করে ফেরে। ফ্রান্সে, দ্রুত ও কৌশলী মৃত্যু উৎপাদনকারী যন্ত্র গিলোটিনের আবিষ্কার, আইনী মৃত্যুর একটি নতুন নৈতিকতার প্রতিনিধিত্ব সূচনা করে। কিšত্ত, বিপ্লব গিলোটিনে মৃত্যুকে একটি বিশাল নাটকীয় আনুষ্ঠানিকতায় উদ্ভাসিত করে। বহু বছর ধরে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো বহু মানুষের সামনে। পরবর্তী সময়ে বেরিয়ের সেইন্ট-জ্যাকসে এটা অপসারিত করে নিয়ে যেতে হয়; অপরাধীকে বহনকারী উন্মুক্ত গাড়িটি একটি বদ্ধ গাড়ি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করতে হয়; অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গাড়ি হতে সোজা বধ্যমঞ্চ অভিমুখে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হতো; অপ্রত্যাশিত সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো খুব দ্রুত লয়ে। শেষতঃ গিলোটিনটি জেলখানার ভেতরর দেয়ালে স্থাপন করা হয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে অনভিগম্য করে রাখা হয় (১৯৩৯ সালে উইডম্যানের মৃত্যুদণ্ডের পর), কারাগারে যাওয়া যায় এমন সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যেহেতু সেখানে রাখা হয়েছিল ফাঁসির মঞ্চটি (১৯৭২ সালে সাতেঁ এলাকায় কার্যকর হওয়া বুফে ও বোঁতম্পসের মৃত্যুদণ্ডের বেলায় যেমনটি ঘটেছিল)। প্রত্যক্ষদর্শী যারা এই দৃশ্যটি বর্ণনা করেছেন তাদের এমনকি হয়তো আদালতে বিচারের মুখোমুখি পর্যন্ত হতে হতো। আর এভাবেই নিশ্চিত করা হয় যে মৃত্যুদণ্ড প্রদান কোনভাবেই জনসমক্ষে প্রদর্শনের বিষয় হতে পারে না এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ব্যাপারটি আইন ও যারা আইনের নিন্দা করে তাদের ভেতর একটি গোপন বিষয় হিসেবেই থাকা উচিত। মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি আজো মৌলিকভাবে জনপ্রদর্শনীর বিষয়টি ইঙ্গিত করে যা থেকে মুক্ত থাকার জন্য এবং যা নিষেধ করার জন্য এখনো আমাদের বহু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

weidmann……..
১৯৩৯ সালে, ফ্রান্সে, প্রকাশ্যে, গিলোটিনে, উইডম্যানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে
………..
একইভাবে, মধ্য-উনিশ শতকে শরীরের উপর দখলের ব্যাপারটি পুরোপুরি লুপ্ত হয়নি। নিঃসন্দেহে শাস্তি ততদিনে যন্ত্রণা প্রদানের কৌশল হিসেবে নির্যাতনের উপর কেন্দ্রীভূত হওয়ার দিকটি পরিত্যাগ করেছে; ততদিনে অপরাধীকে সম্পদ ও অধিকার হতে বঞ্চিত করাই শাস্তির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু, বাধ্যতামূলক বা জবরদস্তি শ্রম অথবা কারাগারে বন্দিত্ব–স্বাধীনতার আপাতঃ হরণ–প্রভৃতি শাস্তি বা দণ্ড সবসময়ই কয়েদির শরীর বা দেহে চাপানো বাড়তি কিছু শাস্তি দিয়ে নিজের সক্রিয়তা অক্ষুণœ রেখেছে: খাবারের রেশন, যৌন অবদমন, দৈহিক শাস্তি, নির্জন প্রকোষ্ঠবাস এহেন বাড়তি শাস্তি বা দণ্ডভোগের কিছু নমুনা। এই বিষয়গুলো কি কারাবন্দিত্বের উদ্দেশ্যহীন অথচ অনিবার্য কিছু প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল? বস্তুতঃ সবচেয়ে প্রকাশ্য অনুশীলনেও কারাবন্দিত্ব একটি বিশেষ ধরনের বা মাত্রার শারীরিক যন্ত্রণাকে যুক্ত করেছে। উনিশ শতকের শুরুতে শাস্তি ব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করে যে সমালোচনা প্রায়শই করা হতো (কারাবন্দিত্ব শাস্তি হিসেবে যথেষ্ট শক্তিশালী নয়; কারাবন্দিরা বহু দরিদ্র মানুষ এমনকি শ্রমিকদের তুলনায় বর্তমানে কম ক্ষুধার্ত, কম শীতার্ত এবং কম বঞ্চিত) তা এমন একটি স্বতঃসিদ্ধ প্রদান করে যা কখনোই প্রকাশ্যে অস্বীকৃত হয়নি: এটা ন্যায্য যে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি অন্য আর দশজনের তুলনায় শারীরিক ভাবে অধিকতর নিগ্রহ ভোগ করবে। বাড়তি শারীরিক যন্ত্রণা হতে শাস্তিকে আলাদা করাটা কি কঠিন? একটি অ-দৈহিক শাস্তি কেমন হয়ে থাকে?

একারণেই অপরাধ বিচারের আধুনিক কলাকৌশলে ‘নির্যাতনে’র একটি দাগ থেকেই যায়–নির্যাতনের একটি চিহ্ন যা সম্পূর্ণ অবলুপ্ত করা যায়নি, বরং শাস্তি বা দণ্ড ব্যবস্থার অ-দৈহিক প্রকৃতি দ্বারা আচ্ছাদিত থাকার মাধ্যমে যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে?

কিস্তি ২

তথ্যনির্দেশ

১. উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোনের কমেন্টারিজ অন ল’জ অব ইংল্যাণ্ড-এ (খণ্ড ৪, ১৭৬৬ ৯, ৮৯) বিশ্বাসঘাতকদের প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বর্ণনা রয়েছে। যেহেতু এই গ্রন্থের ফরাসী অনুবাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৭৬০ সালের পুরনো ফরাসী আইনের তুলনায় ইংরেজ আইনের মানবতার দিকটি তুলে ধরা, ফরাসী অনুবাদক তর্জমার মুখবন্ধে এই মন্তব্যটুক জুড়ে দেন, “এই ধরনের মৃত্যুদণ্ডে, যা কিনা দেখতে এত ভয়াবহ, অপরাধীকে খুব বেশি ব্যথা পেতে হয় না বা দীর্ঘ সময় ধরে ভুগতে হয় না।”

a_falgun@yahoo.com

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজীব রহমান — december ১৭, ২০০৭ @ ১:১০ পূর্বাহ্ন

      পুরোটার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম…এইটুকু পড়ে দারুণ লাগল…বই আকারে কবে হাতে পাব জানাবেন কি?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইমরুল — december ১৭, ২০০৭ @ ১১:৫৭ অপরাহ্ন

      বাঃ! মজার তো!!

      আমি শুনছিলাম যে, হিস্ট্রি অফ সেক্সুয়ালিটির অনুবাদ হইতেছে। এখন এইটার নমুনা দেখেও ভালো লাগলো। এর কারণ আমি মনে করি যে, সাম্প্রতিক চিন্তাগুলি বাংলাভাষাতে আলোচিত/সমালোচিত হওয়া দরকার, কারণ এর ভিতর দিয়া আমরা নিজেদের চিন্তাগুলি আরো রিলেট করতে পারবো এবং একইসাথে এইটা ভাষা ও চিন্তার সক্ষমতারও একটা ব্যাপার। আর এইক্ষেত্রে অনুবাদ একটা বড় ব্যাপার।

      আবার, ফুকোর ফাঁকিবাজি নিয়া কোনো আলোচনার মাহাত্ম্য আমরা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবো যখন তার টেক্সটগুলি একইসাথে হাজির থাকবে। এই দিক দিয়া সন্দেহ নাই যে, এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

      কিন্তু প্রায়ই এর কনটিনিউশনগুলি কেন থাকে না, এইটা ভাবাটাও মনে হয়, জরুরী। কারণ জরাথুস্ত্র-এর অনুবাদ বাংলাতে হইছিল ১৯৬৫-তে। তারপরও নিটশের চিন্তা কতোটা আলোচিত হইছে, বাংলাভাষায়? আমার ধারণা, এর ইন্টারপ্রিটেশনটাও তাই দরকারী একটা বিষয়। অদিতি’র অনুবাদ এই কাজ-এর সুযোগ করে দিতেছে।

      তাই অদিতি’র সাহস ও সক্ষমতাকে ধন্যবাদ জানাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লীনা — december ২২, ২০০৭ @ ১২:৫৭ অপরাহ্ন

      লেখাটা দারুণ হয়েছে। অদিতি’র লেখার পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস বড়ুয়া — জুন ১৭, ২০১০ @ ১২:১৯ অপরাহ্ন

      অপরাধীর বিচার না হলে যেমন সমাজে অপরাধের সংখ্যা বেড়ে গিয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে কিন্তু তাই বলে শাস্তির নামে এমন নিষ্ঠুর পন্থায় মৃত্যুদণ্ড? পড়ে শিউরে উঠলাম। মনে পড়লো একটা উক্তি “Man is a beast even a beast don’t behave like them.” অদিতি ফাল্গুনীকে ধন্যবাদ।

      তাপস বড়ুয়া
      প্রকৌশলী, টোকিও

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shamsul Alam — মে ৮, ২০১২ @ ৪:৩৪ পূর্বাহ্ন

      This is really good. I am looking forward to reading when it get published as a complete book.

      Thanks

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইউসুফ বান্না — মে ২৯, ২০১৪ @ ৯:৫৭ অপরাহ্ন

      অনুবাদটি পড়ে প্রভূত উপকৃত হলাম। অদিতি ফাল্গুনীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।