মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম, একজন এনায়েত মওলা ও ’কাকলী’ নামের বাড়িটি

আলম খোরশেদ | ২৬ december ২০১৩ ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের গৌরবময় ভূমিকার কথা সবারই কমবেশি জানা। কিন্তু এই যুদ্ধে বেসামরিক জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অপরিমেয় অবদানের সঠিক মূল্যায়নটি আজো ঠিক সেইভাবে করা হয়নি। অখ্যাত অনেক সাধারণ মানুষের অজস্র বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের কথা চাপা পড়ে গেছে আমাদের নির্মম উপেক্ষা ও উদাসীনতার বলি হয়ে। সেই দীর্ঘ উদাসীনতার ধুলো সরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এক অবিশ্বাস্য, প্রায় মহাকাব্যিক আখ্যানের বয়ান উপস্থাপনের জন্যই এই নাতিদীর্ঘ নিবন্ধের অবতারণা, যার কেন্দ্রে রয়েছে এই চট্টগ্রামেরই একজন অসমসাহসী, নিভৃতচারী, প্রচারবিমুখ মানুষ ও তাঁর ’কাকলী’ নামের বাড়িটি।

অকুতোভয় এই মানুষটির নাম এনায়েত মওলা (জন্ম. ১৯২৯)। দেশভাগের পর তিনি ভারত থেকে ঢাকায় এসে প্রথমে রেডিয়ো পাকিস্তানে এবং পরে চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করেন। ক্রমান্বয়ে স্থায়ী বসতি গড়ার লক্ষ্যে একটি বাড়িও নির্মাণ করেন নাসিরাবাদ অঞ্চলে, বর্তমান জিইসি মোড়ের কাছাকাছি, নাম রাখেন তার ’কাকলী’। সেই উত্তাল, উদ্বেল নয় মাসে চট্টগ্রাম শহরের মুক্তিযুদ্ধের একটি ছোটখাটো, প্রায় অঘোষিত নিয়ন্ত্রণকক্ষের ভূমিকা পালন-করা এই বাড়িটিকে ঘিরে সংঘটিত হয় নানা নাটকীয় আর রুদ্ধশ্বাস ঘটনা-পরম্পরা। সেইসব গায়ে কাঁটা দেয়া, রোমাঞ্চকর ঘটনাপুঞ্জের বিশ্বস্ত ও হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা দেন এনায়েত মওলা তাঁর লেখা ’মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ছবি: চট্টগ্রামের কাকলী’ নামক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থটিতে। সাহিত্যপ্রকাশ থেকে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত এই ক্ষীণতনু গ্রন্থপাঠে আমরা ফিরে যাই মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন শহর চট্টগ্রামের দমবন্ধকরা, বারুদের গন্ধে ভরা এক অধিকৃত ভূখণ্ডে, যেখানে তখন এক বীর সেনানীর নেতৃত্বে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করে চলেছে একদল টগবগে তরুণ, দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে।

এনায়েত মওলা যে খুব সজ্ঞানে ও সচেতন সিদ্ধান্তে এই যুদ্ধে যুক্ত হয়েছিলেন তা কিন্তু নয়, বরং বলা চলে অনেকটা ঘটনাচক্রেই তিনি এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সখের শিকারী, সেই সুবাদে বন্দুকচালনায় বিশেষ পারঙ্গম। একদিন ক’টি তরুণ, কোত্থেকে কিছু বন্দুক যোগাড় করে তাঁর বাড়িতে এসে হাজির। বন্দুকগুলো চালাতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়ে তারা কার কাছ থেকে যেন খবর পেয়ে এই সৌখিন শিকারীর কাছে ছুটে এসেছিল বন্দুক চালানো বিষয়ে জ্ঞান নিতে। তিনি যখন দেখলেন যে তারা নিতান্তই আনাড়ি অথচ দেশের জন্য যুদ্ধ করতে এক পায়ে খাড়া, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাদেরকে হাতে ধরে, যত্ন করে বন্দুক চালনা শিক্ষা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। তিনি তার পাড়ার গুরুজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে বর্তমান জাকির হোসেন রোডের পাশ্ববর্তী পাহাড়ে, এবং পরবর্তী সময়ে শহরের অদূববর্তী কুমিরার দুর্গম অরণ্যে, নিয়ম করে তাদের অস্ত্রচালনা শিক্ষা দিতে শুরু করেন। এনায়েত মওলার লেখা থেকে আমরা আরও জানতে পারি যে, সেইসময় তরুণদের দেখাদেখি এলাকার বেশ কিছু নারীও অস্ত্রশিক্ষায় বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি তাদেরকেও নিরাশ করেননি।

এভাবে তরুণ যোদ্ধাদের অস্ত্রচালনা শিক্ষা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি নিজেই এই ন্যায়যুদ্ধের সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলেন দেহে ও মনে। মুক্তিকামী বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নখানি তাঁর চেতনাতেও ঢেউ তুললো প্রবল আবেগে। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর বসতবাড়িটি হয়ে ওঠে একাধারে একটি ছোটখাটো অস্ত্রাগার, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প ও যুদ্ধ পরিচালনার মূল মন্ত্রণাকক্ষ বিশেষ। এর জন্য অবশ্য তাঁকে কম মূল্য দিতে হয়নি। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাতে গিয়ে আর্থিক ক্লেশ স্বীকারের পাশাপাশি শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণাভোগ, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার বেদনা, এমনকি পদে পদে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পথ চলা কোন কিছুই অবশ্য দমাতে পারেনি তাঁকে। একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছে তাঁর এই বাড়ি, নির্মম হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে তাঁর চোখের সামনে, তারপরও অদম্য প্রাণশক্তিতে চালিয়ে গেছেন তিনি তাঁর এই ব্যক্তিগত মুক্তিযুদ্ধ।

চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের অদ্যাবধি অজ্ঞাত, অসংখ্য অবিশ্বাস্য ঘটনাবলির বর্ণনায় পূর্ণ এই অভূতপূর্ব গ্রন্থটি থেকে অন্তত একটি নাটকীয় আখ্যানের উল্লেখ না করা হলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের খোঁজখবর যারা রাখেন তাদের কাছে চট্টগ্রাম বন্দরকে অচল করে দেয়ার লক্ষ্যে সংঘটিত অপারেশন জ্যাকপট-এর কথা অজানা থাকার কথা নয়। তবে ফ্রান্স প্রত্যাগত ক’জন বাঙালি নৌকমান্ডো দ্বারা পরিচালিত সেই বীরোচিত অভিযান পরিকল্পনায় যে খোদ একজন পাকিস্তানী নৌসেনার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই কথাটি সম্ভবত খুব কম লোকেরই জানা। বাঙালিপ্রেমী সেই বীর যোদ্ধার নাম লেঃ কমান্ডার আনোয়ার। তিনি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান নৌবাহিনীর একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের সময় নির্বিচারে শ্রমিকহত্যা এবং পরে দামপাড়া অঞ্চলে নির্মমভাবে অসংখ্য বাঙালি নৌসেনার হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে তিনি বিবেকের তাড়নায় পাকিস্তানী পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং প্রতিশোধ নেবার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি এনায়েত মওলার সংস্পর্শে এসে নৌকমান্ডোদের দ্বারা চট্টগ্রাম বন্দরে সেই ঐতিহাসিক অপারেশন চালানোর কাজে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অবশ্য তাঁকে যুদ্ধপরবর্তী নৈরাজ্যময় পরিবেশে প্রতিহিংসার কোপানল থেকে বাঁচার জন্য অশ্রুসজল চোখে দেশত্যাগ করতে হয়। বেশ কয়েক বছর পরে প্রায় একই পরিণতি বরণ করতে হয় এই গ্রন্থের লেখক খোদ এনায়েত মওলাকেও। তিনিও অর্থকষ্টে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সেই সুবর্ণ স্মারক ’কাকলী’ নামের বাড়িটি অবশেষে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন এবং নানাবিধ সামাজিক-রাজনৈতিক বিরুদ্ধতার মুখে দেশত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।

তবে আজন্ম লড়াকু চরিত্রের এই নিখাঁদ দেশপ্রেমিক মানুষটি অবশ্য সেখানেও একেবারে হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। প্রবাসে বেড়ে ওঠা ইতিহাসবিমুখ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের গৌরবময় জন্মগাথাকে তুলে ধরতে এবং তাদের মনে দেশপ্রেমের অনুরণন জাগিয়ে তুলতে তাঁর এই অনন্যসাধারণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি গল্প বলার ভঙ্গিতে, খুবই সুখপাঠ্য ইংরেজিতে রচনা করেন আরো একটি অসাধারণ গ্রন্থ, The Birth of a Nation। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার সুমহান যজ্ঞের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই বীরযোদ্ধা এনায়েত মওলা-কে তাঁর প্রাপ্য যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মাননা প্রদান এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক সেই ঐতিহাসিক বাড়িটিকে সংরক্ষণ করার মাধ্যমেই কেবল তাঁর কাছে আমাদের অপরিমেয় ঋণভার কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zubair Alam — december ২৬, ২০১৩ @ ১:০৪ অপরাহ্ন

      অখ্যাত অনেক সাধারণ মানুষের অজস্র বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের কথা চাপা পড়ে গেছে আমাদের নির্মম উপেক্ষা ও উদাসীনতার বলি হয়ে। তেমনি একজন এনায়েত মওলা ও ’কাকলী’ নামের বাড়িটি
      সম্পর্কে জানলাম ভাল লাগল।ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — december ৩০, ২০১৩ @ ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন

      সুন্দর লিখেছেন। এমন অনেকেই আজ্ও আমাদের অজ্ঞাত রয়ে গেছেন, যাঁদের মূল্যায়ন হয়নি। এ ধরনের একটি মূল্যবান বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com