ধারাবাহিক স্মৃতিকথা

: জীবনের পাতায় পাতায় (কিস্তি-৬)

বেবী মওদুদ | ১০ আগস্ট ২০১৩ ২:৩৯ অপরাহ্ন

কিস্তি- ৬

ঢাকা থেকে ফরিদপুর যাবার তখন একটাই পথ ছিল, নৌ-পথ। লঞ্চ বা স্টীমারে চড়ে যেতে হবে। পথে চাঁদপুর নৌ বন্দরে থামতে হয়। আমার বাবা ফরিদপুরে যোগদান করে পনেরো দিন পর এসে আমাদের নিয়ে চললেন। মালপত্র আগেই চলে গেছে। ভোরবেলা দুটো ট্যাকসি চড়ে আমরা রওনা দিয়ে নারায়নগঞ্জ নৌ বন্দরে এলাম। সেখানে একটা বড় স্টীমারের দোতলায় চার-পাঁচটা কেবিন নেয়া হয়েছিল। এই প্রথম আমরা দীর্ঘক্ষণ নৌপথে চলেছি – তাই বেশ রোমাঞ্চ ছিল।

আমার বড় ভাই নটরড্যাম কলেজ থেকে টিসি নিয়ে আমাদের সঙ্গে চললেন। তার মনও বেশ ভারাক্রান্ত ছিল, কারণ ঢাকায় পড়া হলো না। যদিও কলেজের প্রিন্সিপ্যাল তার জন্য হোস্টেলের সিট বরাদ্দের কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমার বাবা তাকে ঢাকায় রেখে যেতে চাননি।

স্টীমার ছাড়লো বেলা এগারোটায় এবং ঘন্টা বাজিয়ে। সারাদিন পানি দেখতে দেখতে চললাম। যেদিকে তাকাই না কেন কুল নাই, কিনার নাই – শুধু পানি আর পানি। ওপরে আকাশ নীল। পথে একবার মেঘনা – যমুনার মিলন রেখা দেখলাম। অবাক কান্ড রেখার ওপর যতই স্রোত আছড়ে পড়–ক না কেন দুদিকের পানির রং দু’রকম। সবুজ আর সাদা। আরও দেখলাম পাল তোলা নৌকা। এর আগে ছবিতে দেখেছি এবং ড্রইং খাতায় এঁকেছি। এবার নদীতেই ভাসতে দেখলাম। আমি স্টীমারের ডেকে বসে বসে শুধু নদী দেখলাম এই নদীর বিশালত্ব আর ঢেউ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমরা সাদা বক উড়ে যেতে দেখলাম। তীরে গুন টানতে দেখলাম। আর নদীতে বড় বড় জেলে নৌকা দেখলাম মাছ ধরতে। নদী যে এতো ভালোলাগার হয়ে উঠবে আমি কল্পনাও করিনি। নদীপথে বেশ ক্ষিধে লাগতো। আমার বাবা অর্ডার দিয়ে পাউরুটি টোস্ট মাখন এবং ডিম পোচ আনিয়ে খাওয়ালেন। চমৎকার দুধ চা খেলাম। দুপুরের খাওয়াটাও ছিল ভালো। সরু চালের ভাত, সব্জি, ডাল ও মুরগি। ডাল ও মুরগীর স্বাদ ভুলে যাবার নয়। পাকা পেপে ও কলা খেলাম। মা বললেন একটু ঘুমুতে। ঘুমুবো কি? নদী দেখে দেখে আমাদের আশ মিটছিল না। পথে চাঁদপুরে একবার স্টীমার থামলে। অনেক যাত্রী উঠলো। অনেক মালপত্র ওঠানামা করলো। এখানেই দেখলাম ঘাটে ঝাকা ভর্তি বড় বড় ইলিশ। রুপার মতো চক চকে রূপালী ইলিশ যাকে বলা হয়।

faridpur-1-28313.gif
স্টীমার আবার যাত্রা শুরু করলো গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে। গোয়ালন্দ তখন অনেক বড় নৌ-বন্দর। এখান থেকে রেলগাড়িতে কলকাতা যাওয়া আসা করা যেত। দক্ষিণবঙ্গ থেকেও লঞ্চ – স্টীমার ও বড় বড় বজরা নৌকা এসে ভিড়তো এখানে। আমাদের স্টীমার এসে ভিড়লো এখানে। আমরা স্টিমার থেকে নেমে হেঁটে স্টেশনে গিয়ে রেলগাড়িতে উঠলাম। রেলগাড়ি ছাড়লো সন্ধ্যায়। অন্ধকারে বাইরে তো কিছুই দেখা যায় না। আমরা রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। সারাদিনের ক্লান্তি আর রেলের ঝাঁকুনিতে চোখে ঘুম নামতে সময় লাগলো না। শীতকাল ছিল বলে আমরা আটভাই -বোন বেশ গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকলাম।

অনেক রাতে রেলগাড়ি থামলো ফরিদপুর স্টেশনে। আব্বার কোর্টের চাপরাশিরা এসে মালপত্র নিয়ে গেলো বাসায়। আমরা সম্ভবত: ঘোড়ার গাড়ি চড়ে বাসায় এলাম। বাসার নাম শুনলাম কুঠি বাড়ি। ইংরেজ আমলে সাহেবরা এই বাড়িটি তৈরি করে থাকতেন। বাইরে থেকে গোল বাড়িটার ভেতরে পাঁচ-ছয়টা কক্ষ এবং স্টোর, রান্নাঘর, বারান্দা সব আছে। সে রাতে আমরা নতুন বাসায় এসে শুয়ে পড়লাম। বাসাটা বেশ বড় এবং একতলা এটাই ভালোলাগলো।

ফরিদপুর ঈশান স্কুলে ভর্তি হলাম আমি চতুর্থ শ্রেণীতে। এখানে মেয়েদের ক্লাশ হতো সকালে। ছেলেদের বেলা এগারোটা থেকে। ছোট ভাই হুমায়ুন ভর্তি হলো তৃতীয় শ্রেণীতে। আমাদের বাসা থেকে ভোরবেলায় স্কুলে দিয়ে আসতো একজন চাপরাশি, আবার হুমায়ুনকে দিয়ে আমাকে বাসায় নিয়ে আসতো। হেঁটেই যেতাম স্কুলে। নতুন নতুন বান্ধবী হলো অনেক। স্কুলের পেছনে আমরা খেলতাম। একটা বিশাল আমলকি গাছ ছিল। ঢিল মেরে আমলকী পেড়ে খেতাম। তারপর টিউবয়েল টিপে পানি খেতাম, খুব মিষ্টি লাগতো এটাই ছিল খুব মজার আনন্দ। আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।
এই স্কুলে আমাদের ক্লাশ শিক্ষক ছিলেন প্রখ্যাত সনেটকার সুফী মোতাহার হোসেন। তিনি একজন কবি, জানতাম এবং খুব শ্রদ্ধা করতাম। আমাদের বাসায় প্রায়ই আসতেন, আমার বাবার কাছে। আমাদের বাংলা পড়াতেন। উস্কো খুস্কো মাথার চুল, শার্ট ও পাজামা, স্যান্ডেল পরা মলিন বেশের ভাঙ্গাচোরা চেহারার আমার সেই প্রিয় কবি শিক্ষকের স্মৃতি আজও আমার মনে আছে। আমাদের কবিতা পড়ে শোনাতেন, আবার আমাদের কাছ থেকে মুখস্থ শুনতেন। স্কুল ক্রমশ: আমার প্রিয় হয়ে উঠে। বাড়িতেও আমাদের জন্য গৃহ শিক্ষক ছিলেন। আমার মেজভাই জেলা স্কুলে ভর্তি হলো, বড়ভাই রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হলেন। পরে আই.এস.সি পাশ করে বড় ভাই ঢাকায় প্রকৌশল বিশইবদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি বাড়ি এল ঢাকার হোস্টেলের গল্প করতেন। একবার আমার জন্য একটা গোলাপি নাইলন শাড়ি কিনে আনেন। বড়ভাইকে আমরা লুকিয়ে সিগারেট খেতে দেখে খুব অবাক হতাম। পরে পাহারা দিতাম যাতে আব্বা বা মা টের না পান।

আমরা মারবেল, ডাঙ্গুলি খেলতাম। তারপর সাদা চুন দিয়ে কোর্ট বানিয়ে নেট লাগিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলতাম । কর্ক আর র‌্যাকেট কিনে দিতেন মা। সাইকেল চালানো শিখে ফেললাম।

বড়ভাইয়ের নিজস্ব একটা আলমারি ছিল, যেখানে তাঁর বই ও শখের জিনিষপত্র থাকতো। আমরা তাকিয়ে শুধু দেখতাম, হাত দেবার কোন অধিকার ছিল না। আমাদের বাসায় কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক ’দেশ’ ও ত্রৈমাসিক ‘চতুরঙ্গ’ আসতো আব্বার জন্য। কলকাতা থেকে শিশুসাথী’, ‘শুকতারা’ ও ‘সন্দেশ’ আসতো বড়ভাইয়ের জন্য। এছাড়া সিনেমা পত্রিকা উল্টোরথ, জলসা, আসতো। আমার মা পড়তেন এগুলো। ঢাকা থেকে নিয়মিত আসতো মাহে নও, মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত, সমকাল, বেগম এবং আরও অনেকগুলো। আমি লুকিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখতাম, পড়ার চেষ্টা করতাম। পঞ্চম শ্রেণীতে ওঠার পর লুকিয়ে পড়তে শুরু করি। মায়ের খাটের তলায় লুকিয়ে বেগম পড়তাম। পড়ার বইয়ের তলায় গল্পের বই রাখতাম। আমার মা বলতেন, ‘এই বয়সে গল্পের বই ও পত্রিকা পড়া ভালো না’। আর আমার বাবা যেদিন দেখে ফেললেন, বললেন ভালোই তো। ফরিদপুর পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বই আসতো আমাদের বাসায়। আমার পছন্দমত আনার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার সামনে যেন এক রুদ্ধ দুয়ার খুলে গেল। বড়দের বই পড়ার অধিকার, স্বাধীনতা ও সাহস অর্জন করলাম। আমি মনে করি এটাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় শরৎচন্দ্র, সুবোধ ঘোষ, নীহারঞ্জন, বিমল কর, মনোজ বসু, আশুতোষ আশাপূর্ণা, প্রতিভা পড়তে শিখি। শরৎচন্দ্রের পরীনীতা কত বার পড়েছি আজও মনে করতে পারি না। শেখর ও ললিতার প্রেম একটু হলেও নিশ্চয় বুঝতে পেরেছিলাম, তাই তো ললিতা আজও আমার হৃদয়ে আশ্রিত হয়ে আছে। শ্রীকান্ত পড়ে রাজলক্ষীকে বুঝতে শিখেছি অনেক পরে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে আমাদের পাঠ্যবই ছিল।

পঞ্চম শ্রেনীতে পাঠ্যবইয়ে মহিয়সী রোকেয়ার জীবনী পড়ে দারুন অভিভূত হয়ে পড়ি। আবার বাবার কাছে জানতে চাইলে তিনি আমাকে শাসসুন্নাহার মাহমুদের লেখা ‘রোকেয়া জীবনী’ এনে দিলেন। বইটা দু’তিনবার পড়লাম। আমার কাছে মনে হলো রোকেয়া যেন এক রুপকথার রাজকন্যা। তাঁকে আমার আদর্শ নারী মনে হলো, জননী হিসেবে শ্রদ্ধা করতে শিখলাম। আমার ব্রত হলো, রোকেয়া হতে হবে, শিক্ষিকা হিসেবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম যদিও রোকেয়ার লেখা প্রবন্ধ আমি কলেজে এসে পড়ার সুযোগ পাই। আমার মেজ ভাইয়ের পাঠ্যবইয়ে ‘চাঁদ’ ও ‘নারীস্থান’ কিছুটা পড়ার সুযোগ হয়। ‘বেগম’ পত্রিকায় রোকেয়াকে নিয়ে অনেকের লেখা পড়তাম। আমার মায়ের কাছে বিবি খাদিজা (রা), বিবি ফাতেমা, তাপসী রাবেয়ার কথা শুনেছি। আর ইতিহাসের পাতায় সুলতানা রাযিয়া, ঝাঁসীর রাণীর কথা পড়ে তাদের সাহসীকতায় মুগ্ধ হলাম। পাঠ্যবইয়ের সুফিয়া কামালের লেখা কবিতা পল্লীস্মৃতি’ পড়ে মুখস্থ করে ফেললাম, রবীন্দ্রনাথের লেখা আমাদের ছোট নদী, নজরুলের খুকুমনি, কাঠবেড়ালি এবং জসীমউদ্দীনের ‘নিমন্ত্রন’ আমার মুখে আবৃত্তি শুনে সবাই হাততালি দিলে বুঝতে পারতাম আমি পারি।

এইসময় আমাদের বাসায় দৈনিক আজাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা রাখা হতো। আমি ছোটদের পাতা পড়াতাম এবং নিজে লেখার চেষ্টা করতাম। আমার বই খাতার মধ্যে একটি রুলটানা মোটা খাতা ছিল। আমি কবিতা, গান বা চিন্তা-ভাবনার কিছু কিছু লিখতাম। কোন প্রিয় কবিতা বা ছড়া পড়লেও লিখে রাখতাম খাতায়। ঝাপসা মনে পড়ে একটি লেখা, ‘পাতা ঝরে ঝরে মাকে মনে পড়ে, ঘরখানা সারাদিন খালি, মমতার দীপ গেছে জ্বালি।’ আমি খাতাটা খুব যতœ করে লুকিয়ে রাখতাম। একদিন ভাইরা খুজে পেয়ে আব্বার হাতে তুলে দেয়, আমার সে কী লজ্জা! কবি সায়েমা চৌধুরী আমাদের বাসায় আসতেন। তিনিও খাতাটা দেখলেন। আমার আব্বা খুব হাসলেন, ভাইরা সবাই ‘কবি’ বলে ডাকা শুরু করলো। মা শুধু বললেন, ‘ও জন্মের পর প্রথম সুফিয়া বুবুর কোলে উঠে তার দোয়া পেয়েছে। ওর কপালে কী আছে কে জানে?’

এ বাড়িতে আমিও একটা ছোট্ট আলমারি পেয়েছিলাম। চতুর্থ শ্রেনী পর্যন্ত আমি পুতুল খেলতাম। আলমারিতে আমার পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল আর পড়ার বই থাকতো। আমারই সহপাঠীর ছেলে পুতুলের সঙ্গে আমার মেয়ে পুতুলের বিয়ে দিয়ে বিদায় করে পুতুল খেলার সমাপ্তি টেনেছিলাম। বিয়ে হয়েছিল ক্লাশরুমে। মিষ্টি আর নিমকি ছিল খাবার। বন্ধুদের সঙ্গে সেই বিয়ের আনন্দ আজও মনে পড়ে। ঈশান স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করি। চতুর্থ শ্রেণী থেকে পাশ করে ওঠার সময় সুফী স্যার ক্লাশে আমাদের রেজাল্ট রিপোর্ট ঠিক করছিলেন। আমরা সব দুরু দুরু বুকে অপেক্ষায় আছি পাশ ও ফেলের চিন্তায়। একফাকে তিনি আমার উদ্দেশ্যে শুধু বললেন, ‘অঙ্কে এতো ভালো নাম্বার পেয়েছে তুমি!’
রিপোর্ট হাতে নিয়ে দেখলাম একশত! সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো আমার রিপোর্ট দেখতে। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারলাম না। অঙ্ক আমার কাছে সবসময় আতঙ্ক! কেমন করে পুরো নাম্বার পেলাম আজও হিসাব মেলাতে পারি না।

স্কুলে আমাদের আমেরিকান দুধ ও বিস্কুটের টিন দেয়া হতো। মাঝে মাঝে। হেলিকপটার এসে নামতো স্কুলের সামনের খোলা মাঠে। আমরা দুধের টিন বাসায় নিয়ে এলেও আমার মা খেতে দিতেন না। চাপরাশিদের কাউকে দিয়ে দিতেন।

পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় আমি অনেকটা শান্ত হয়ে উঠলাম। এসময় আমি ফরিদপুর সরকারি বালিকা দ্যিালয়ে ভর্তি হই। ষষ্ট শ্রেনীতে ওঠার পর পাঠ্য বইয়ের দিকে নয় গল্পের বই প্রধান নেশা হয়ে উঠলো। আমি একটু বড় হয়েছি। আমার মা আমাকে সালোয়ার পরালেন। ফ্রক ও কামিজ তো পড়তামই। ওর্না পরতে শুরু করি পঞ্চম শ্রেণীতে ওঠার পর। স্কুলে যাওয়া-আসা একাই করতাম। তবে অন্য কোথাও একা যেতে দেয়া হতো না। বৃষ্টির দিনে স্কুলে যেতামই, কেননা স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে যেত। তখন বান্ধবীরা দলবেঁধে এর ওর বাড়িতে যেতাম। আমি হলাম জজ সাহেবের মেয়ে, আমার একটা আলাদা খাতির ছিল। এক বান্ধবীর বাসায় গিয়ে দেখি মাটির চুলোয় বড় এক কড়াইতে দুধ জ্বাল দেয়া হচ্ছিল। তার মা কাসার বাটিতে সর তুলে চিনি মাখিয়ে আমাকে খেতে দিলেন। আমি বাটিতে সামান্য রেখে দিলে তিনি তা আঙ্গুলে তুলে আমাকে খাইয়ে দিলেন। আমার হিন্দু বান্ধবীর মায়েরাও আমাকে খুব আদর করে খাওয়াতেন। আমরা আচার-চাটনী এক হাতেই খেতাম। ছোঁয়াছুয়িটা তখন ছিল না। অঞ্জলী কলকাতা বেড়াতে গিয়ে স্পঞ্চের স্যান্ডেল এনে পায়ে দিয়ে স্কুলে এলো। আমি প্রথম ঐ স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে খুব মজা পাই। কিন্তু ও রোজ পরে আসতো না।

আমাদের বাসায় এক গোয়ালা দুধ দিয়ে যেতো, এক টাকায় চারসের। শুকুর আলী নামে একজন চাপরাশী ছিল, যে বাজারে ও হাটে যেত কেনাকাটা করতো। চার বা আট আনা হালি ইলিশ মাছ কিনে আনতো। একেবারে রূপোর মত ঝকঝকে।

আমার মা বাজারের খাতা আমাকে দিয়েও লেখাতেন। ধোপা কাপড় নিয়ে যেত আমাকে দিয়ে লেখাতেন। এভাবে একটু একটু ঘরের কাজ শেখাতে শুরু করেন। আলু-পেয়াজের খোসা ছাড়ানো আলু ভর্তা করা, পরোটা ও রুটি বানানো। এই সাথে বিছানা করা, কাপড় ধোয়া ও ঘর ঝাড়– দেয়াও। আমাদের বাসায় বাবুর্চি কাজের লোক ছিল তিন চারজন। তারপরও মা বলতেন, ঘরের কাজ শিখতে হবে। কোথায় বিয়ে হয়, কখন কি কাজ করতে হয় – সব শেখা ভালো। তিনি সেলাই শেখাতেও চেষ্টা করতেন – যা আমার পছন্দ ছিল না। তবু শিখেছিলাম বোতাম লাগানো, উলবোনা। তিনি এতো ভালো সেলাই জানতেন, আর আমি শিখতে পারলাম না বলে দু:খ করতেন।

ঘরের কাজ, সেলাই ও রান্না শেখার চেয়ে গল্পের বই পড়া আমার প্রিয় ছিল। সাইকেল চালানো ও মারবেল খেলা, পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে আমার বেশি ভালোলাগতো।

আমার মায়ের শৌখিন কিছু বিষয় ছিল। তিনি মিষ্টি ও দই খেতে পছন্দ করতেন, কিন্তু দুধ খেতেন না। হরলিকস দিয়ে চা বানিয়ে খেতেন। তার একটা নির্দিষ্ট বাটি ছিল, চায়ের কাপ নয়। তার চা খাবার সময় আমরা কাছাকাছি থাকতাম, যদি এক চামচ হরলিকস হাতে পাওয়া যায় তাহলে চেটে খাবো অনেকক্ষণ ধরে সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে। তার প্রিয় মৌরলা মাছ (মলামাছ) চুনো মাছ (এখন এই মাছ বাজারে দেখা যায় না), আর চাপিলা মাছ। এসব মাছ কাঁটার জন্য আমরা খেতে চাইতাম না, কিন্তু তিনি এতো সুন্দর করে পরিস্কার করে রান্না করতেন, তারপর কীভাবে কাটাসহ মাছ ভাতে মাখিয়ে আমাদের খাইয়ে দিতেন। এটা আমার মায়ের কাছে শিখে আমি আবার সবাইকে খাইয়ে দিতাম। একটা বড় থালায় ভাত ডাল সব্জি ও মাছ মাখিয়ে ছোট ছোট গোলাকার বানাতাম। তারপর ‘আয়রে আমার গোলাপ ফুল’ ‘আয়রে আমার চাঁদের আলো,’ ‘আয়রে আমার তোতা পাখি’ ডাকলেই বাইবোনেরা একজন করে ছুটে এসে খেয়ে যেত।

faridpur-2-7-28313.gif
আমার মায়ের আরও শৌখিন খাদ্য ছিল আম। তিনি ভাত দিয়েই একটা পাকা আম মাখিয়ে খেয়ে নিতেন। তাকে দেখেই ভাত আমার প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে। তিনি পান্তাভাতও খেতেন, আমাদেরও খাওয়া শেখান। শুকনো মরিচ পুড়িয়ে পান্তা ভাত ও গরম ভাত খাওয়ার স্বাদই আলাদা। শীতকালে আমরা কেউ পুকুরে নামতে চাইতাম না। খুব ঠান্ডা থাকতো পানি। তবে একবার নেমে পড়লেই হলো, আর উঠতে চাইতাম না। আমার ঘরে কলের পানিতে গোসল করতেন। প্রতিদিন গোসলের সময় একটি নতুন লাকস সাবান ব্যবহার করতেন। আমি বসে থাকতাম তার ব্যবহৃত সাবানটি নেবার জন্য। তখন এই সাবানটির বিজ্ঞাপন ছাপা হতো সিনেমার নায়িকাদের ছবিসহ। তাই সাবানটি আমাদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। এছাড়া লইফবয় সাবান পাওয়া যেত। আমার মায়ের মাথায় কালো ঘন ফুল ছিল। তিনি লক্ষীবিলাস, জবাকুসুম তেল মাখতেন। আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল নারকেল তেল। আমি লুকিয়ে তেল মাখার চেষ্টা করতাম।

এ সময় জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হয়। আমার বাবা কোথা থেকে একদিন একটা রেডিও আনলেন খবর শোনার জন্য। সেই প্রথম ঘরে রেডিও শোনা। খবর ছাড়া গানও শুনতাম। আমার বাবা সকালে ও সন্ধ্যায় রেডিও খুললে আমরা তার কাছে বসে শুনতাম।

আমাদের স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটক হতো। তার রিহার্সেল দেখতাম। উচু ক্লাশের ছাত্রীরা মেজদিদি নাটক করলো। ‘পুরাতন ভৃত্য,’ ‘নারী’ কবিতার আবৃত্তিও শুনে ঘরে এসে ‘সঞ্চয়িতা এবং সঞ্চিতা খুলে আমিও মুখস্থ করে তাদের মত আবৃত্তি করতাম। আমার ছোট ভাই মামুন ও রাঙ্গা এবং বোন রুবী মিশন স্কুলে পড়তো। সেখানে নাচ ও গান দেখে দেখে বাসায় এসে করতো। তখন আমরাই ভাই-বোনরা মিলে অনুষ্ঠান করতাম। মামুন চমৎকার গান গাইতো। তার সঙ্গে ছোটরা নাচত। গানগুলো এখনও মনে আছে, ‘হিমের রাতের ঐ গগনের দীপগুলিরে,’ ‘আমার মাইজা ভাই সাইজা ভাই কই গেলারে।’

আমারদের স্কুলে খেলার ক্লাস, লাইব্রেরীতে বই পড়া এবং গার্লস গাইড ক্লাশ ছিল। লাইব্রেরি ক্লাসে বই নিয়ে পড়তাম। পাশেই ছিল শিক্ষকদের কমন রুম। তারা ঐ রেডিও ছেড়ে কলকাতা আকাশবানীর অনুরোধের আসর শুনতেন। বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও আমি কান পেতে গান শোনার সুযোগ নষ্ট করতাম না। বিশেষ করে হেমন্ত-শ্যামল-সতীনাথ-সন্ধ্যা-গীতা-লতার আধুনিক ও সিনেমার গানগুলো খুব প্রিয় ছিল। বারবার শুনতেও ভালোলাগতো। আমার মা গ্রামোফোনে পূজার গানের রেকর্ড কিনে এনে বাজাতেন। আমার বড় ভাই কলেজে পড়তেন বলে মা তাকে বাজাতে দিতেন। চুপ চুপ লক্ষীটি শুনতে যদি গল্পটি, রানার রানার রানার ছুটেছে, এইকুলে আমি আর ঐ কূলে তুমি, হয়তো কিছুই নাহি পাবো, ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে, ‘তুমি আজ কতদূরে, ‘পৃথিবী আমারে চায়’ প্রভৃতি গানগুলোর কথা ভুলতে পারি না। আমি বাড়ীর সামনের সিড়িতে বসে বই পড়তাম। একদিন হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে’-গানটি। আমি বইপড়া বন্ধ করে ভেসে আসা দিক লক্ষ করে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে জজকোর্টের রাস্তায় চলে যাই। ওখানকার কোনও দোকানে বোধহয় বাজছিল। গান থামতেই আমি দাঁড়াই। গানের অর্থ ভালো না বুঝলেও গানটি আমার প্রিয় ওঠে। আমি এখনও এই গানটি শুনলে বিভোর হয়ে যাই। এসময় উত্তম-সুচিত্রা ছবি দেখার সৌভাগ্য হয় আমার। নতুন ছবি এলেই মা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। তখন তো সিনেমার বেশি কিছু বুঝতাম না শুধু দেখেই মুগ্ধ হতাম। ছবির ভালো-মন্দ বড় হয়ে বিশ্লেষন করতে শিখি। শামমোচন, সাগরিকা, অগ্নিসাক্ষী, চাওয়া-পাওয়া, হারানো সুর বার বার দেখেছি। ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’ এবং ‘তুমি যে আমার’ গান দু’টো আমাদের মুখে মুখে ছিল। সুচিত্রা সেন আধুনিকার ছোয়া এনে আমাদের আদর্শ হয়ে ওঠেন। সুচিত্রা উত্তমের ছবি সংগ্রহ ছিল আমাদের শখ। বিশেষ করে কলকাতার উল্টোরথ এবং ঢাকার সাপ্তাহিক চিত্রালী তখন জনপ্রিয় সিনেমা পত্রিকা ছিল।

faridpur-3.gif
ফরিদপুরে আমাদের বাসায় একবার চুরি হয়ে গেল। জেলা জজ সাহেবের বাসায় চুরি, শহরে বেশ বড় একটা ঘটনা হিসেবে সাড়া পড়ে গেল। আমার মনে আছে এখনও। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখি আমার মায়ের আলমারীটা খোলা। কাপড়-চোপড়, গহনা ও টাকাপয়সা থাকতো এতে। তালায় চাবি দিয়ে বন্ধ করে তিনি চাবির গোছাটা আচলের কোনায় বেধে। আমার বাবা এবং আমাদের কারও অধিকার ছিল না সেই আলমারী খুলে দেখার। আলমারী খোলা দেখে আমি ভাবলাম, আমার মা খুলে থাকবেন। আমি বাথরুমে ঢুকে দেখি বাইরের দরোজা খোলা। আমি ভেতরে গিয়ে দেখি মা তখনও ঘুমিয়ে আছেন। আমি তাকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করি ‘আপনার আলমারী খোলা কেন? আমার মা উঠে দেখেন আচলে চাবি ঠিকই আছে। তারপর আলমারীর কাছে এসে কাঁদতে শুরু করেন, ‘হায় হায় আমার সব গেছে।’ আমার বাবা ও ভাইরা ছুটে এলো। খবর পেয়ে ডিসি ও এসপি সাহেব এলেন, পুলিশ এলো। তারা কীসব তদন্ত করলো। জানা গেল আলমারী রাখা কিছু টাকা, আমার মায়ের সব গহনা চুরি হয়েছে। আমার ও আমার ছোটবোনের নাম লেখা লকেটসহ চেন সব গেছে। বাথরুমের দরজা কৌশলে খুলে, তারপর ঘরে ঢোকার দরজার ফাঁকে কিছু ঢুকিয়ে ছিটকিনি খুলে আলমারীর তালা ভেঙ্গে চুরি করেছে। আমরা পাঁচ ভাই-বোন এঘরে ঘুমাই, কেউ কোন শব্দ পাইনি। নিশ্চয় ঘুমের ওষুধ দিয়েছিল। পুলিশ তদন্ত করলো। আমাদের বাসার কাজের লোক, বাবুর্চি ও চাপরাশি গার্ড ও মালী, সুইপারকে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। আমরা বেশ ভয় পেলাম। আমার মা দোয়া পড়ে আমাদের মুখে বুকে ফু দিতেন। তিনি দু:খভরা কণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে বলতেন, আমার তো সামান্য কিছু গহনা ছিল। আর কি বানাতে পারবো? আমার মেয়েদের বিয়েতে কী দেব?’ আমার মায়ের সেই দু:খ ও কান্না আমাকে এতো কষ্ট দিয়েছিল যে এই মূল্যবান জিনিশটাকে আমি সারাজীবন অবহেলা করে সরিয়ে রেখেছি। কখনও আকর্ষন বোধ করিনি।

তিনদিন পর শোনা গেল চোর ধরা পড়েছে। চোর নাকি কয়েকদিন আগেই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল। আমার মায়ের সব গহনা, টাকা-পয়সাও পাওয়া গেছে। এরপর মামলা শুরু হলো। কোর্টের একজন লোক পুলিশসহ আমার মায়ের কাছে গহনাগুলো নিয়ে এলো। আরও কিছু গহনার সঙ্গে সেগুলো মেলানো ছিল। আমার মা’কে বলা হলো তার গহনাগুলো বাছাই করতে। আমার মায়ের গহনা সামান্য থাকায় তিনি নিজেরগুলো বাছাই করে দিলেন। টাকা কিছু কম পাওয়া গেল। বোধহয় চোর নিজে খরচ করেছিল।

একদিন শুনলাম, আমাকে সাক্ষী দিতে কোর্টে যেতে হবে। আমি একটু ভয় পেলেও মনে মনে কৌতুহূল ছিল। আমাকে সবাই বোঝাল জজ সাহেব যা কিছু জিজ্ঞেস করবেন, উকিল সাহেবরা প্রশ্ন করলে আমি যেন সত্যি সত্যি উত্তর দেই। যারা সাক্ষ্য দিয়ে এসেছে তারাও জানালো ভয়ের কিছু নাই। কোর্টে গিয়ে কাঠগড়ায় আমি একদিন দাঁড়ালাম। চোরের দিকে খুব ভয়ে ভয়ে তাকালাম। সে তো একজন মানুষই এবং চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখে। আমাকে বলা হলো আমাদের গহনাগুলো বাছাই করে দিতে। অনেকরকম গহনার ভেতর থেকে আমাদেরগুলো চিনে চিনে বের করে দিলাম। মায়ের, আমার ও ছোট বোন রুবীর নাম লেখা লকেট চেনসহ ছিল। আমার দুটো বালাও খুঁজে দিলাম। ছোট কানের রিংও চিনে দিলাম। তার মধ্যে আমার মায়ের মোটা কঙ্কন, গলা ও কানের ঝুমকা, দুলও ছিল। জজ সাহেব আমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাতে কোন শব্দ পেয়েছিলাম কী না, কখন ঘুম ভাঙ্গে এবং কি কি দেখেছি। এরপর আমি কাঠগড়া থেকে নেমে আসি।

এই মামলার রায়ে চোরের আবার তিন বছর জেল হয়েছিল এবং আমার মায়ের সব গহনা ও উদ্ধারকৃত ফেরৎ দেয়া হয়েছিল।

বিচার কার্য সম্পর্কে আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। আমার বাবার বিচার সম্পর্কিত গল্প ‘ক্রিমিনাল’ ধারাবাহিকভাবে ‘সমকাল’ পত্রিকায় ছাপা হতো। আমি ঠিক করলাম বড় হয়ে জজ বা ব্যারিস্টার হতে হবে। আমার বাবা ফরিদপুর কোর্টের এক বিচারে পাঁচজনকে ফাঁসি দিয়েছিলেন খুনের মামলায়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মামলা গড়ালে ফাঁসির রায় বহাল থাকে। এই মামলায় আমার বাবার নাম ডাক হয় ‘ফাঁসুড়ে জজ’ হিসেবে।

ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় আমার খুব বাত জ্বর হলো। যাকে বলে হাত-পা বাঁকা হয়ে যায়। আমাকে প্রায় পনেরো দিন সরকারি হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। আমাকে নিয়ে বাড়ির সবার সেই দুশ্চিন্তা আজও ভুলতে পারি না। সেই ওষুধ খাওয়া আর ইনজেকশন নেয়ার আতঙ্ক আমাকে সারাজীবন ভুগিয়েছে।

সপ্তম শ্রেনীতে ওঠার পর আমার আর ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা থাকলোনা। মা বলতেন, বড় হয়েছ। বড় হওয়া মানে কী নিয়ন্ত্রিত থাকা? নাকি নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখা তখন বুঝিনি। তবে আমি অনেকখানি শান্ত ও ঘরমুখী হলাম। ভাই বোনদের সঙ্গে খেলাধুলা, বই পড়া নিয়ে থাকতাম। আমার মা আমাকে বিছানা গোছানো, কাপড় ভাজ করে রাখা, কাপড় ধোয়া, থালাবাসন ধোয়া, আলু পেয়াজ তরকারি ফল কাটা শেখাতেন। আটা ও ময়দা মাখানো, রুটি ও পরোটা তৈরি করা শেখাতেন। আমি চা বানানো শিখলাম। আমার মা বলতেন, মেয়ে দেখতে এসে জানতে চাইবে পরোটা লুচি বানাতে পারে কী না। পেয়াজ কুচি কত সরু, আলু ছিলার পর কোনও দাগ আছে কী না।’এই রান্না ঘরের কাজটাই আমার কাছে বিরক্তিকর ছিল। তারপর সেলাই শেখা, সে তো আরও বিশ্রী ব্যাপার মনে হতো। এইসব শেখানোর সময় আমার মা বলতেন, ‘শিখে রাখা ভালো। কোথায় বিয়ে হবে, কোন অবস্থায় থাকবে নিজের কাজ নিজে করাই ভালো।’

আমি বলতাম, ‘বিয়ের দরকার কী! আমার ছয় ভাইয়ের বাড়ি ছয়দিন, আর একদিন হোটেল থেকে কিনে খেলেই আমার দিন কেটে যাবে। আমি তো বড় হযে চাকরী করবো। আমার তো টাকাই থাকবে।’ আমার এসব কথা শুনে আমার মা দুশ্চিন্তা করতেন।

আমার বড় ভাই ঢাকায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন। একবার বাড়ি এলেন আমার জন্য একটা গোলাপী নাইলন শাড়ি কিনে। শাড়িটা আমার খুব পছন্দ হলো। আমি তখন শখ করে মাঝে মাঝে শাড়ি পরা ধরেছি। কিন্তু বাসায় পরতাম।

ষষ্ট শ্রেনীতে স্কুলে ছুটির পর গান শেখার ক্লাশ হতো। আমার মায়ের অনুমতি ছিল না। তবে বাবার অনুমতি ছিল। ভোরবেলা ছাদে উঠে সা – রে – গা – মা সাধতাম। স্কুলে হারমনিয়াম বাজিয়ে গান শিখলাম, ‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না’ এবং ‘কাবেরী নদী জলে’। যেহেতু বাসায় হারমনিয়াম কেনা হলো না সুতরাং শেখার আগ্রহটা নষ্ট হয়ে যায়। আমার বইপত্র নিয়েই সময় কেটে যায়। পূজার সময় বান্ধবীদের সঙ্গে মন্ডপে ঘুরে বেড়ানো, নারকেলের নাড়– বা সন্দেশ খাওয়া চলতো। আবার শবেবরাতের সময় আমাদের বাসায় এসে সবাই হালুয়া রুটি খেতো।

ফরিদপুর শহরে প্রতিবছর বর্ষায় পানি জমে বন্যা দেখা দিতো। আমাদের বাড়ি উচু হলেও সিড়ি বেয়ে পানি ঘরে ঢুকে পড়তো। সন্ধ্যার পর অনেকদিন সাপও দেখা যেতো। সে কী ভয়াবহ কান্ড। দিনের বেলা আমরা কলাগাছের ভেলা ও নৌকা চালিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। পানি নেমে গেলে প্রচুর ছোট্ট মাছ পাওয়া যেত। আমরা গামছায় ধরে ধরে রান্নাঘরে এনে রাখতাম। আর খাবার সময় হিসাব করতাম কে কোন মাছ ধরেছে। আমার প্রিয় ছিল পুঁটি ও চিংড়ি মাছ। এক বাটি চিংড়ি চচ্চরি না থাকলেআমি ভাত খেতে চাইতাম না।

১৯৬১ সালে আবার আমাদের মালপত্র বাঁধতে হলো। আমার বাবা ঢাকায় জেলা জজ হিসেবে বদলী হলেন। প্রথমে তিনি ঢাকায় গিয়ে একমাস থেকে ফরিদপুর এলেন আমাদের নিয়ে যেতে। এখানকার স্মৃতি ও শিক্ষকদের ¯েœহ, বান্ধবীদের ভালোবাসা আমার জীবনে একটা বড় অভিজ্ঞতা। তাই বিদায় বেলায় কষ্ট পেয়েছিলাম, চোখ ভরে উঠেছিল অশ্রুতে। আমার জীবনের অনেকখানি গড়ে উঠেছে এখানেই। ফরিদপুরের সেই খোলামেলা প্রকৃতি এরপর আর কোথাও পাইনি।

জীবনের পাতায় পাতায় (কিস্তি ৫)

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Abdul mozid — আগস্ট ১০, ২০১৩ @ ৭:১২ অপরাহ্ন

      ব্যাক্তি,পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বিষয়সহ সমাজের সকল কিছু তুলে এনেছেন। তখনকার ঐ সমাজটা খুবই ভালো ছিল। ধন্যবাদ ।আরো লিখবেন। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — আগস্ট ১১, ২০১৩ @ ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

      আপাকে অভিনন্দন। লিখাটি পড়ে ভাল লাগলো।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mohammed Zakir Hossain — আগস্ট ১১, ২০১৩ @ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন

      Baby Apa,

      Oshadharooooooooon Nostalgic….! Apa khub sundor hoyeche lekhaaa…..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Monzoor Murshed — আগস্ট ১১, ২০১৩ @ ২:২৮ অপরাহ্ন

      It’s a lovely and nostalgic bio – lets us have a peek inside the heart and mind of a little girl from an era of simplicity and innocence.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kamrul — আগস্ট ১৮, ২০১৩ @ ৯:৪৭ অপরাহ্ন

      It is a photographic depiction of a district town called Faridpur which is close to my heart. Truly nostalgic.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com