সর্বজনীন কবি নজরুল

মারিয়া এলেনা বাররেরা-আগারওয়াল | ৩ জুলাই ২০১৩ ১০:৫২ অপরাহ্ন

বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে নজরুল ব্যাপকভাবে পরিচিত ও জনপ্রিয় হলেও পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় তাঁর রচনার অনুবাদ বা তাঁকে নিয়ে চর্চা এখনো সীমিত। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪১ কোটি মানুষের ভাষা স্প্যানিশ, অথচ এই ভাষায় নজরুলের রচনার অনুবাদ ও তাঁর সম্পর্কে চর্চার কোন উদাহরণ আজও নেই। এই প্রথম একুয়াদরের লেখক-প্রাবন্ধিক মারিয়া এলেনার হাত ধরে নজরুল প্রবেশ করছেন স্প্যানিশভাষী জগতে। মারিয়া সম্প্রতি নজরুলের নির্বাচিত কবিতার একটি স্প্যানিশ সংস্করণ প্রস্তুত করেছেন। কবিতা অনুবাদের পাশাপাশি এতে থাকবে নজরুলকে নিয়ে তার লেখা একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ।
লেখিকা নিজেই স্প্যানিশে রচিত প্রবন্ধটির একটি সংক্ষিপ্ত ইংরেজি অনুবাদ পাঠিয়েছিলেন আমাদের অনুরোধে। বর্তমান নিবন্ধটি তারই বাংলা তর্জমা। ভাষান্তর করেছেন কবি, প্রাবন্ধিক
মুহম্মদ নুরুল হুদা, রাজু আলাউদ্দিনসামিন সাবাবা

আমাদের এই যুগটা যখন ভুলভাল যশস্বী ব্যক্তি দিয়ে ভরা, তখন ক’জন প্রকৃত কবিই-বা তার দেশবাসীর ভালোবাসা আদায় করতে পারেন! ক’জনই-বা হলফ করে বলতে পারেন যে, তাঁদের সৃষ্টি স্বদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করবে? কজন অনুমান করতে পারেন যে, তাঁদের লেখা পঙ্ক্তিমালা অপরিবর্তিত ভাষ্যে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বারবার উচ্চারিত হবে? আসলে খুব কম কবিই সেই উচ্চতা অর্জন করতে পারেন। কাজী নজরুল ইসলাম সেই বিরল ভাগ্যবানদের মধ্যে অন্যতম।

আজ কবির মৃত্যুর পর চার দশক গত হতে চলল। আর তার অসুস্থতার পরও অতিবাহিত হয়েছে সাতটি দশক, যা তার সাহিত্যজীবনে ইতি টেনে দিয়েছে। অথচ কী আশ্চর্য, এই এতদিন পরও তার সৃষ্টি-কর্ম বাংলা সাহিত্যে চিরকালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। কবি নজরুল স্প্যানিশ ভাষাভাষীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো পরিচিত নন। নিউ ইয়র্ক সিটির একটি ট্যাক্সিতে আমি তাঁর সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে প্রথম অবগত হই। ড্রাইভার শুনছিল এমন একটি গান, যার সুর আমি তখন সনাক্ত করতে পারিনি; অথচ যার রেশ আমি আজ পর্যন্ত বয়ে বেড়াই।
“কী গান শুনছ তুমি?” আমি প্রশ্ন করলাম।
সে বলল, “শুনছি এমন কিছু গান, যা লিখেছেন মহান এক কবি।”
এই গাড়িতে বসেই আমি বাকি পথে চালকের কাছ থেকে নজরুলের বিভিন্ন দিক জানতে পারি। ক্যাবচালক অত্যন্ত সদয়ভাবে কবিজীবনের নানা দিক তুলে ধরছিলেন, স্মৃতি থেকে নজরুলের বাংলা কবিতা উদ্ধৃতি দিচ্ছিলেন এবং তার উপর ইংরেজি ভাষায় মন্তব্য করে যাচ্ছিলেন। তারপর থেকেই আমি তাকে গভীরভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম। নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে ঢাকাস্থ নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত নজরুলের প্রায় সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিকর্ম সহজলভ্য।

নজরুলের কবিতা আমার কাছে মনে হল এক আলোকিত উন্মোচন। তার কণ্ঠস্বর কবিগুরুর চেয়ে আলাদা। তার ধ্যানধারণা নিশ্চিতভাবেই অনেক বেশি তাৎক্ষণিক ও সমসাময়িক। স্বাধীনতার জন্য তার আকাক্সক্ষা কালাতীত ও বিশ্বজনীন। তার তত্ত্ব ও দর্শন তার জীবদ্দশায় যেমন সত্যনিষ্ঠ ছিল, তেমনি আজও তা সঠিক বিবেচিত। সময় তার রচনার মৌলিক আবেদন ও সজীবতাকে মোটেই ম্লান করতে পারেনি।

এখানে আমরা এমন এক কবির সাক্ষাৎ পাই, যিনি তার শক্তিমত্তা দিয়ে জীবনের গতানুগতিক অভিজ্ঞতাকেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈয়ায়িক বিষয়াবলির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি এমন এক লেখক, যার সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত মানবিক সাম্যবাদ, যার শক্তি ঘুচিয়ে দেয় নিয়তি, ধর্ম, ঐশ্বর্য এবং লিঙ্গ-বৈষম্যের কুসংস্কার।

নজরুল একজন বহুমুখী শিল্পী। তিনি সঙ্গীত, চলচ্চিত্র এবং সক্রিয় সমাজকর্মেও সমান শক্তি নিয়ে বিচরণ করেছেন। সবচেয়ে প্রশংসার বিষয় এই যে, নজরুল আরাম কেদারায় বসে থেকে আদর্শবাদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি। তিনি তার মেধা ও প্রতিভা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে আয়েশী ও বুর্জোয়াজীবন যাপন করতে পারতেন। তা না করে তিনি বরং তার বিশ্বাসে অটুট থেকে জেল-জুলুম, দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্টকে বেছে নিয়েছেন।

ক্রান্তিকাল

নজরুল এক ব্যতিক্রমধর্মী দুঃসময়ের অধিবাসী। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক শাসন ছিল এক সর্বগ্রাসী বাস্তবতা, যা প্রায় তৎকালীন সকল কর্মকাণ্ড ও সম্পর্কসূত্রে প্রভাব ফেলেছে। কেউ সৃষ্টিশীল কর্মে নিয়োজিত হতে চাইলে তাকে নানাবিধ বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হত। কেননা, ঔপনিবেশিক শাসক এমন কোনো মৌলিক চিন্তাকে উৎসাহিত করেনি, যা তাদের বিপক্ষে যাবে। বরং এই ধরনের মৌলিক চিন্তা তাদের কাছে ছিল দেশদ্রোহিতার শামিল। খুব কমসংখ্যক কবি-সাহিত্যিকই এই ধরনের বৈরী বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ আমরা গণিতশাস্ত্রে শ্রীনিবাস রামানুজন ও জিএইচ হার্ভি এবং কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ও ইয়েটসের কথা বলতে পারি। তারা তাদের মেধা ও মানবিকতাবাদের সমন্বয়ে কখনও কখনও এমন কিছু সম্পর্কসূত্র তৈরি করেছেন, যা ঔপনিবেশিক প্রতিবন্ধকতাকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছে। সঙ্গত কারণেই এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল। অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীকে বইতে হয়েছে দ্বৈত এক বোঝা: একদিকে বিরাজমান সমাজের যাবতীয় কুসংস্কার, অন্যদিকে বাকস্বাধীনতাকে শ্বাসরোধকারী ঔপনিবেশিক নীতিমালা।

যেসব লেখক জাতীয়তাবাদী ধ্যানধারণা পোষণ করতেন, তাদেরকে কাজ করতে হত অত্যন্ত সন্তর্পণে। কেউ কেউ নিজেরাই নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতেন, যাতে তাদের রচনা দেশদ্রোহিতার পর্যায়ে না পড়ে। কেউ কেউ ছদ্মনাম ব্যবহার করে এক ধরনের বিপজ্জনক ঝুঁকি গ্রহণ করতেন।

এ পর্যায়ের এক মহান লেখকের নাম ধনপতি রায়, যিনি বাধ্য হয়ে মুন্সী প্রেমচাঁদ ছদ্মনামে লিখে পুলিশের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলেছেন। প্রতিবাদের জন্য লেখকদের দিতে হত উচ্চমূল্য। জরিমানা, প্রকাশিত গ্রন্থ বাজেয়াপ্তকরণ ও ধ্বংসসাধন, কারাবরণ এবং সংবাদপত্র বন্ধকরণ ইত্যাদি ছিল সাধারণ নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা। ভৈকম বশীরের বারবার কারাবরণ কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং সেটিকেই বলা যায় ঔপনিবেশিক রীতিনীতি। বলা যেতে পারে, এই ধরনের আইনি কড়াকড়ি ঔপনিবেশিক শাসকদেরই আতংকপ্রসূত। তারা এই ভেবে ভীত ছিল যে, শিল্পী-সাহিত্যিকরা উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রভাবিত করার শক্তি রাখেন।

এই আতংক ও আশংকা যুক্তিসঙ্গত। আত্মশক্তির উদ্বোধনে ও অন্বেষণে কবিতার ভূমিকা বিশিষ্ট ও প্রাগ্রসর। হাজার বছর ধরে এই উপমহাদেশে জাতীয়তাবাদের অস্তিত্ব ও অগ্রগতি কাব্যিক অভিব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ইংরেজ শাসনামলে রামপ্রসাদ বিসমিল, চিহ্নস্বামী সুব্রামানিয়া ভারতী এবং অজিত সিং-এর মতো কবিরা তাদের কাব্যকীর্তির সাহায্যে সমসাময়িককালে জাতীয়তাবাদী গৌরব ও দেশাত্মবোধক চেতনা বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের এই মনোভাব মানুষকে কর্মী ও সংগ্রামী করে তোলার শক্তি রাখত। স্বাধীনতার শহীদ ভগৎ সিং কবি বিসমিলের একটি চরণ গাইতে গাইতে ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, ‘মেরা রাং দে বাসন্তি ছোলা’ (মাগো, আমার বসন রাঙিয়ে দাও বসন্তের রঙে)।

কবিগুরু ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলাদেশে দেশাত্মবোধক গীতিকবিতার সূচনা করেন। রবীন্দ্রনাথও এমন দুটি কবিতা লিখেছিলেন, যার একটি ঘটনাক্রমে ভারতের জাতীয় সংগীত (জনগণমন) এবং অন্যটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত (আমার সোনার বাংলা) হিসেবে গৃহীত হয়েছে। বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম’ ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদী চেতনার অত্যুৎকৃষ্ট সৃষ্টি, যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা হিসেবে বিবেচিত।

স্বাধীনতার কবি

উপর্যুক্ত পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলও সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন এক বিশেষ ধরনের দেশাত্মবোধক প্রেরণা। স্বাধীনতার জন্য বিরতিহীন অন্বেষণ এবং অদম্য সংগ্রামই ছিল তার লক্ষ্য। নজরুলের আবির্ভাব কেউ অনুমান করতে পারেননি। বিশের দশকে পা দিয়েই নজরুল তার সৃষ্টিজীবনে প্রবেশ করলেন।

না সম্পদ, না সুরক্ষা– কিছুই ছিল না তার জীবনে। ধনশালী বা প্রভাবশালী কোনো পরিবারের বদান্যতাও তিনি পাননি। কিশোর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর তাকে নিয়োজিত হতে হয়েছে বিভিন্ন পেশায়। জীবনধারণের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে ছেদ পড়েছে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষায়। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকও তুচ্ছ প্রতিভাত হল। তার প্রথমদিকের রচনা ও প্রকাশনা থেকে বোঝা গেল, নজরুল কালে কালে এক অনন্য অভিধায় অভিহিত হবেন। তিনি এক নির্ভীকচিত্ত দ্রষ্টা যিনি শাসকের বিরুদ্ধে সত্যবাক্য উচ্চারণ করতে পারেন। এককথায় বলা যায়, তিনি বিদ্রোহী।

১৯২২ সালেই তার বিরল মেধা পূর্ণ বিকশিত হয়েছিল। এই সময়ে তিনি এমন কিছু রচনা প্রকাশ করেছিলেন, যা সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তার অনন্যসাধারণ কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ । কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে এক বছর কারাগারে কাটাতে হয়। কারান্তরালে অত্যাচার ও নিপীড়নের মধ্যেই তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তার ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ শীর্ষক স্বীকারোক্তিমূলক রচনাটি লেখার জন্য। এটি কবির অকুতোভয় সাহস ও স্পর্ধার পরিচায়ক। তৎকালীন বাস্তবতা থেকে বিযুক্ত করে এই একশ বছর পরেও রচনাটি পাঠ করলে মনে হয় এটি নজরুলের কোনো ব্যক্তিগত রচনা নয়। এই রচনাটি এমন একটি মন ও মানসিকতার অভিব্যক্তি, যা গভীরতম ব্যক্তিগত সংকটের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে বিশ্বমানবতার জন্যেও প্রাসঙ্গিক।
kazi-nazrul_3.jpg
এই জবানবন্দিতে কবি উপমহাদেশের সংকট উন্মোচন করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, কেন ঈশ্বর বা স্রষ্টা দুর্বল ও শাসিতের পক্ষে। তার মতে, রাজশক্তি একটি বিপথগামী শক্তি ছাড়া অন্য কিছু নয়। উপমহাদেশের নিপীড়িত জনতা ও ঔপনিবেশিক শাসকদের অবস্থান বদল করে তিনি তার যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তার এই যুক্তি অভূতপূর্ব। তার মতে ভারত যদি হত ঔপনিবেশিক শক্তি এবং ব্রিটেন যদি হত উপনিবেশ, তাহলে ইংরেজরা তৎকালীন ভারতীয়দের মতোই বিদ্রোহ ও যুদ্ধ করার যৌক্তিকতা খুঁজে পেত। সেক্ষেত্রে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অধিকার থাকত ব্রিটিশদের। ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিনিধিরা নিজেদের সবসময় শ্রেষ্ঠ মনে করত। এই যুক্তি তাদের উপর কী রকম প্রভাব ফেলেছিল তা সহজেই অনুমেয়। এটি ঔপনিবেশিকতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার বিরুদ্ধে একটি প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জ। অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের মধ্যে যে সাধারণ মানবিকতা বিদ্যমান এই যুক্তি তাকেও গ্রাহ্য করে। সেই সঙ্গে ‘সেলফ’ বা ‘নিজ’-এর অবস্থান বিবেচনা করার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে। আসলে ন্যায়নীতি সম্পর্কে সঠিক ধারণার জন্য ‘নিজ’ ও ‘অন্য’-এর এই দ্বৈতসত্তা বিবেচনা জরুরি।

‘অন্য’ সত্তা সম্পর্কে এই বোধ সুকঠিন প্রতিভাত হলেও আমরা তা নজরুলের ক্ষেত্রে সহজেই দেখতে পাই। গদ্যে-পদ্যে তার বিবিধ চিত্রকল্পে তিনি ধর্মীয় পার্থক্য দূরীকরণের জন্য দ্ব্যর্থহীন আহবান জানিয়েছেন। উপরন্তু, তিনি হিন্দু ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এই ঐতিহ্যের রূপকল্প তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মত প্রকাশ করেছেন। তার এই ধরনের ঐকমত্যের মনোভাব ব্রিটিশ শাসকরা ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তারা ভারতকে শাসন করার জন্য বিভেদ সৃষ্টির নীতি গ্রহণ করে তাদের রাজত্ব অব্যাহত রাখার নীতি গ্রহণ করেছিল। যা কিছু তাদের এই নীতির পরিপন্থী তাকেই তারা বিপজ্জনক মনে করত। নজরুলের মতামত শুধু এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সকল প্রকার অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। জাত্যাভিমান, শ্রেণিগত কুসংস্কার, নারীবিদ্বেষ, শাসকবর্গের দুর্ব্যবহার ইত্যাকার সকল প্রকার সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। সামগ্রিকভাবে গোটা মানবজাতিই ছিল তার চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। গোঁড়ামি বা ধর্মান্ধতা তার চেতনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।

বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর

আমি নজরুলের কবিতা স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। এটি যেমন আলোকসঞ্চারী ও দুরুহ কর্ম, তেমনি আমার জন্য লাভজনকও বটে। শুরু থেকে আমি এ বিষয়ে সচেতন যে, কোনো অনুবাদেই মৌলিক রচনার অনন্য শৈলীর চমৎকারিত্ব পুনঃসৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এমনকি তার কবিতার সুগভীর নিনাদকে সীমিতভাবেও প্রতিধ্বনিত করা যায় না। এতদসত্ত্বেও, আমি এই বিষয়টি গভীরভাবে অনুভব করলাম যে, তার কবিতার আশ্চর্য শক্তিমত্তা (যেমন ‘বিদ্রোহী’), স্প্যানিশ ভাষাভাষী পাঠক-পাঠিকার কাছে তুলে ধরা যেতে পারে। বাংলা ভাষায় লিখিত এই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি শুধু প্রতিবাদ নয়, এটি একই সঙ্গে একটি আর্তনাদ, যা স্বাধীনতাকে ধারণ ও আবাহন করে। এই কবিতায় তিনি তার শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে এমন সব প্রতীকের ব্যবহার করেছেন, যা পার্থিব হয়েও মহৎ ও সমুন্নত। ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়াদি তিনি বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে গ্রহণ করেছেন, যা পাঠকের প্রত্যাশাকে উদ্দীপ্ত করে। কবিতাটি লিখেছিলেন যখন, তখন তার বয়স মাত্র ২২। অথচ এই কবিতাটিতে এক পরমাশ্চর্য শৈল্পিক উৎকর্ষের পরিচয় মেলে। এই রচনা এমন এক উন্মুক্ত মনের সৃষ্টি, যা সবচেয়ে বিসদৃশ প্রভাব-বলয়কেও গ্রহণ ও স্বীকরণ করতে সক্ষম। তদুপরি, এই ধরনের গ্রহণ ক্ষমতার মাধ্যমে কবি অসংখ্য বিসদৃশ বিষয়কেও একটি মৌলিক কাব্যভাষ্যের ভিতর সাঙ্গীকৃত করতে সমর্থ হয়েছেন।

‘বিদ্রোহী’তে কবির কণ্ঠস্বর একই সঙ্গে একক ও সামষ্টিক। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিসত্তার ভিতর যে নানাকৌণিক অভিজ্ঞতা লুকায়িত থাকে, এই কবিতায় তারও রূপায়ন ঘটতে দেখা যায়। অন্যদিকে, কবির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার পৌরাণিক প্রসঙ্গসমূহ ঐশ্বরিক ও প্রাকৃতিক শক্তিমত্তায় একীভূত হতে দেখি। এসব ক্ষেত্রে নজরুলের উপর ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্ববহ। এই বাঙালি কবির রচনা সাক্ষ্য দেয় যে তিনি এই মার্কিন কবি সম্পর্কে জানতেন এবং তার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। যা-হোক, আমি বিশ্বাস করি নজরুলের ক্ষেত্রে লিভস অব গ্রাস অনুপ্রেরণার একটি তুঙ্গীয় উৎস, যা ‘বিদ্রোহী’ রচনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। তবে এটা সত্য যে লিভস অব গ্রাস বিদ্রোহী রচনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক নির্ণায়ক উৎস নয়।

স্মর্তব্য, যে পরিস্থিতিতে ‘বিদ্রোহী’র সৃষ্টি তাতে এই কবিতার মৌলিকতাই বিশেষভাবে বিবেচ্য ও প্রশংসার দাবিদার। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে কবিতা লিখেছিলেন হুইটম্যান, যিনি তার নাগরিক অধিকারসমূহকে সহজভাবেই অর্জন করে জীবনযাপন করেছেন। নজরুলের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। নজরুল লিখেছিলেন এক অবর্ণনীয় দমন ও নিপীড়নের মধ্যে। এক বিদেশি শক্তির আরোপিত শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন নজরুল ও তার সম্প্রদায়। কাজেই তার বিদ্রোহ এমন কিছু বিষয়কে তুলে ধরেছে যা হুইটম্যানের রচনায় অনুপস্থিত। নজরুলের রচনায় আছে সীমাহীন ক্রোধ, তৎসহ স্বাধীনতার জন্য আকাক্সক্ষা, যা নিরানন্দ, কিন্তু সুতীব্র। এই ক্রোধ এসেছে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে; কিন্তু কী আশ্চর্য সেই ক্রোধ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে সর্বকালের এক স্মরণীয়তম কবিতা।

আমি সর্বান্তকরণে কামনা করি নজরুলের কাব্যস্বর স্প্যানিশ ভাষাসহ অন্যসব ভাষার পাঠক-পাঠিকার কাছে পৌঁছে যাক। এটি নজরুলের অবশ্যই প্রাপ্য।

এই প্রসঙ্গে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, “নজরুল মূলত বৈশ্বিক কবি; তিনি তা-ই ছিলেন এবং তা-ই থাকবেন।” এটি এমন এক অভ্রান্ত সত্য যা স্বয়ং কবির রচনাতেও প্রতিধ্বনিত। তিনি বরাবর সাহিত্যকে একটি বৈশ্বিক শিল্প মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। তাই তিনি বারবার ঘোষণা করেছেন, সাহিত্য সকল মানুষের জন্য, কেবল কোনো একক ব্যক্তির জন্য নয়।

তিনি আরও লিখেছেন, লেখক কবি ও সারস্বত সমাজের চিত্ত আকাশের মতো প্রমুক্ত হওয়া বাঞ্চনীয়। তার চিত্তও সুনিশ্চিতভাবেই উম্মুক্ত ছিল সকল মানুষের জন্য। নজরুলের ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার ক্রমবর্ধমান হারে মানবজাতির কাছে পৌঁছে যাক, এটিই আমাদের কাম্য ।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (13) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন maniryousuf — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ১:১০ পূর্বাহ্ন

      স্প্যানিশ ভাষায় নজরুল চর্চা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য অনেক গর্বের। বাংলাদেশের গণমানুষের কবি নজরুলকে বিদেশিরা চিনতে শুরু করেছে এটা আমাদের অকেক বড় পাওয়া। বিশ্বের ৪১ কোটি মানুষেরর ভাষায় নজরুল ধ্বনিত হোক এ আমাদের প্রত্যাশা। বিডি নিউজ২৪.কম বাংলা ভাষার পাঠকদের নানা ভাবে সমৃদ্ধ করছেন। সাহিত্যের বিভন্ন বিষয়ে গভীর ও তথ্য সমৃদ্ধ মূল্যবান প্রবন্ধ, কবিতা,গল্প, সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে একটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আমরা সে নতুনের অংশীদার। মারিয়া এলেনা বাররেরা-আগারওয়াল উপমহাদেশের সাহিত্য অনুবাদ করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিচ্ছেন–তাকে অশেষ ধন্যবাদ। ধন্যবাদ বাংলায় অনুবাদ করার জন্য মুহম্মদ নূরুল হুদা, রাজু আলাউদ্দিন,সামিন সাবাবাকেও। একজন বিদেশীর চোখে নজরুলকে নতুন করে আবিষ্কার আমাকে মুগ্ধ করেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Iqbal — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ১:৩২ পূর্বাহ্ন

      খুবই ভালো খবর। এ ধারা অব্যাহত থাকুক। একুয়াদরের লেখক-প্রাবন্ধিক মারিয়া এলেনাকে আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা।…

      আর এমন একটি সংবাদ পাঠকদেরকে দেওয়ার জন্য বিডিনিউজ এবং সংক্ষিপ্ত ইংরেজি প্রবন্ধের বাংলা তর্জমার জন্য কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, অনুবাদক ও সাহিত্যিক রাজু আলাউদ্দিন ও সামিন সাবাবাকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মেসবা আলম অর্ঘ্য — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ২:২৩ পূর্বাহ্ন

      নজরুলের কবিতা স্প্যানিশে অনুদিত হচ্ছে জেনে খুব ভাল লাগলো। আমার কৌতুহল হচ্ছে জানতে যে মারিয়া এলেনা বাংলা ভাষা জানেন কিনা। তাঁর প্রবন্ধটি পড়ে মনে হলো উনি নজরুল নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন। এবং বাংলা না জানলে নজরুল সম্বন্ধে যত তথ্য উনি জেনেছেন বলে ওনার প্রবন্ধপাঠে বোঝা যায়, তত তথ্য ওনার পক্ষে জোগাড় করা দুষ্কর হবার কথা!
      প্রবন্ধটির অনুবাদকত্রয়ের জন্য শুভেচ্ছা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাবলু — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ৩:০৩ পূর্বাহ্ন

      নজরুলকে নিয়ে উনার উঁচু মানের লেখা প্রমাণ করছে যে লেখিকা বেশ পড়াশুনা করেছেন। উনি আমাদের মত মধ্যমমানের জ্ঞান নিয়ে আবেগতারিত নন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shams — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

      শুভকামনা, অভিনন্দন এবং কৃতজ্ঞতা।

      লেখিকাকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Subhash Sarker — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ২:০৩ অপরাহ্ন

      নজরুলের মৃত্যুর এত বছর বাদে আজ এ সুখবরটি নিয়ে ইচ্ছে করে তার সমাধি পাশে দাড়িয়ে “দারিদ্র্য” কবিতাটি আবৃত্তি করি, যা এ বিদ্রোহীকে করেছে মহান।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ৪:৪২ অপরাহ্ন

      লেখাটি যেমন উচ্চমার্গের, অনুবাদও তেমনি উচুঁস্তরের, এ ধরনের উৎকর্ষ লেখনির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য অনুবাদক ত্রয়কে অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন arif nazrul — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ৫:৪৭ অপরাহ্ন

      অসংখ্য ধন্যবাদ লেখককে

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুল ইসলাম — জুলাই ৪, ২০১৩ @ ৬:৩৪ অপরাহ্ন

      আমি লেখাটির খুবই প্রশংসা করছি। আর স্প্যানিশ ভাষায় নজরুলকে তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে তাকে কী বলে সাধুবাদ দেবো জানি না। এই লেখিকাকে আমি বেশি শ্রদ্ধা করে ফেলেছি।…

      আমাদের মহান কবিকে সর্বজনীন বলে একটি সত্যকে অকপটে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি যেটা বলার ক্ষেত্রে আমাদের দেশেরও অনেকের বুকের পাটা নেই।

      আসলে নজরুলকে ব্যাপকভাবে পঠনের প্রয়োজন মনে না করার পেছনে অন্য এক হীনম্মন্যতা রয়েছে কারো কারো যা হৃদয়ের ক্ষুদ্রতারই নামান্তর। এক্ষেত্রে এই লেখিকার উদারচিত্ততার কদর আমাদের করতেই হবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taposh Gayen — জুলাই ৬, ২০১৩ @ ২:৪২ পূর্বাহ্ন

      I salute Maria Barrera-Agarwal for taking such an arduous task in translating the work of Poet Kazi Nazrul Islam. I wish this endeavor a huge success! Cheers, Taposh

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shamset tabrejee — আগস্ট ২৮, ২০১৪ @ ৯:৫০ পূর্বাহ্ন

      এটি সত্যিই একটি আনন্দ সংবাদ! হুদা ভাই, রাজু এবং সামিন সাবাবাকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — আগস্ট ২৮, ২০১৪ @ ১১:২১ পূর্বাহ্ন

      মারিয়া এলেনা বাররেরা-আগারওয়াল কে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য আর্টসকে ধন্যবাদ। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা ভাষান্তর করার জন্য কবি, প্রাবন্ধিক মুহম্মদ নুরুল হুদা, রাজু আলাউদ্দিন ও সামিন সাবাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। জাতীয় কবির প্রয়াণদিবসে এমন একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন আর্টসের পাঠক হিশেবে আমাকে সুখী করেছে। আরো এমন আয়োজন চাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন HASAN SHAHRIAR — আগস্ট ২৮, ২০১৪ @ ৬:২৮ অপরাহ্ন

      I convey my heartfelt gratitude to Dear Maria Elena for her great initiative of literary work about our great POET and great MUSICIAN Nazrul which will be for sure a mesmerising work to the huge amount of the spanish linguistic people around the world. Meeting this poet, to me who has always been an amaranth, they will know more about our literature and its animate face which has always been teching us that the fight against colonialism, fight against imperialism, fight against all apartheid and injustice aren’t aleatory rather it is materialistic. And again the words, the sound of his poetry, the symphony of his great music highly values the customs, the belief, the myths, the spiritual contact of soul of the mass people. Nazrul is our nightingale and he sings, the animosity is erased. I feel the Nazrul-re-buff inside me against all odds. So I reckon, this initiative of dear Maria will float the raft of harmony between two cultures. Hats off to dear Maria and of course to the BDnews literary team!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।