চিঙ্গিজ আইৎমাতভের স্তেপ ও পাহাড়ের আখ্যান

মনির ইউসুফ | ২৯ মে ২০১৩ ৮:৪৮ অপরাহ্ন

চিঙ্গিজ আইৎমাতভ তার লেখা দিয়ে মুগ্ধ করে রেখেছেন রাশিয়া ও বিশ্বের অবশিষ্ট পাঠককে। পাহাড় ও স্তেপের আখ্যান সে মুগ্ধতার অনমনীয় কাহিনি। ভাষার সুষম বিন্যাসের সঙ্গে জনজীবনের ঘনিষ্ঠ সংযোগ, হৃদয়ের বিগলিত অনুবেদনকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করার পাশাপাশি সৌন্দর্য আত্মায় পুলক তৈরি করে। সে আত্মার কথা বলতে বলতে পাহাড় ও স্তেপভূমির ঘ্রাণ আর জীবনের প্রথাগত বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করে দেন তিনি। এ ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে ফেলে আসা অনুভব মাটির টানে নিয়ে যায় কিরগিজের সে পাহাড়ের ধূসর ভূমিতে। এখানে রয়েছে হাজার বছরের পাহাড়ি জীবনের যুদ্ধ, সংগ্রাম, পরিবর্তন, মানবিক ঐক্যের এক পরিশুদ্ধ চিরায়ত কৌম জীবনের বিস্তার। পাহাড়ের সরলতা, রুক্ষতা, ভালোবাসা, যাযাবর জীবন, তাবু, ঘোড়া ও মেষপাল, গোবর, নেকড়ে ও শৃগালের চিৎকারের সঙ্গে সে জীবন এমনভাবে মিশে আছে যে পাহাড়ের এই ঘ্রাণ ছাড়া স্তেপের মানুষদের জীবন কল্পনাও করা যায় না। স্তেপের আখ্যান মুক্তচিন্তার আবেশ তৈরি করে। মানুষকে হৃদয়বৈভবে সমৃদ্ধ করে তোলে। সুন্দরকে ভালোবাসতে শেখায়। ব্যাকুল বেদনা, প্রশান্তি, মমত্ববোধ হৃদয়কে প্রতিমুহূর্তে বিগলিত করে দেয়।

জামিলা, প্রথম শিক্ষক, বিদায় গুলসারি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন দুর্লভ গল্প, যা বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি গল্পের অন্যতম। মানুষের অন্তর্গত স্বভাবের শান্তি অন্বেষণে এক স্বাভাবিক প্রপঞ্চ যেন এই আখ্যানগুলো। পাহাড়ি জীবনের প্রশ্রয় ও দরদ দিয়ে আঁকা এই আখ্যান।

অতল পাহাড়ি ঝরনাধারায় পাহাড়ি জীবনব্যবস্থা, তাদের শক্তসমর্থ শরীর, চোয়াল, বাহু, অদম্য সাহস, তেজের বর্ণিল সমাবেশ লেখক এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, মনে হয় এ সমাজে বেড়ে উঠতে পারলে জীবন মধুর সরল ও সুন্দর হতে পারত। আখ্যানে সমাজচিত্রের অপূর্ব মিলন ও ভাষার স্বরূপ মুগ্ধতা পৃথিবীকে অনেক বড় ও বিনীত করে তুলে। মনোজগতে স্বস্তির সৃষ্টি হয়। মানবিক সৌন্দর্যের কারণে পৃথিবী সুন্দর হয়ে ওঠে আর বস্তুসৌন্দর্য মনের ভিত তৈরি করে দেয়। পাহাড়ি আত্মা প্রশান্ত হয়ে ওঠে আইৎমাতভের এই স্তেপ ও পাহাড়ের জীবন চরিতে।

আখ্যানে স্তেপসংলগ্ন পাহাড়ি সংস্কৃতি, প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য চিরায়ত কিরগিজিয়া জীবনের মাটির প্রাণছবি এমন নিপুণ দক্ষতায় এঁকেছেন– এ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় পৃথিবীর সব ভাষার কথাসাহিত্যের সঙ্গে এই গল্পগুলোর আদলে বিস্তর ফারাক কেন? সমাজতন্ত্রের ভেতর থেকে সমাজব্যবস্থার চলমান সংকটকে দেখেছেন তিনি, তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে খুঁজতে ‘বিদায় গুলসারি’র আখ্যানটি সমাজতন্ত্রের বাস্তবতার দিকে চোখ ফিরিয়ে দেয়।

পৃথিবীর কোনোকিছুই যে রাজনীতির বাইরে নয়, আইৎমাতভ তা ভালো করেই জানতেন। পাহাড়ি সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সমাজতন্ত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব, যৌথখামারের সামাজিক দায়, অভাব, অনটন, সব কিছুকে তুল্যমূল্য বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে গেছেন লেখক। মা, মাটি, মানুষ, ধূলি, নূড়ি, তুষার, ঘোড়ার পালের মনিব, মনিবের পাহাড়ি স্বস্তি ও সৌন্দর্য, ভাব ও অভাব, নারী জাগরণের অগ্রদূত হয়ে নিজেকে অন্য উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন আইৎমাতভ।

পাহাড়ি ঝরনা, পপলার বৃক্ষ, তাবু সমাজজীবনের এমন এক গভীরে প্রোথিত– আইৎমাতভের আধুনিক না হয়ে উপায় ছিল না। জীবনযাপনে পাহাড়ি সনাতনী জীবনের সঙ্গে আধুনিকতার যে ধারাবাহিক ঐক্য তৈরি হয়েছে তা ধরতে চেষ্টা করেছেন, সফলও হয়েছেন। পাহাড়ি জীবনের নব উন্মোচিত সমাজের একটি দুঃসাহসিক কাঠামো নির্মাণ করেছেন তিনি। এই পাহাড়ি আখ্যানকে নতুন আধুনিকতার সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন। পাহাড়ের মর্মরিত ও গুঞ্জরিত সে সুরের মধুর তান তুলে দিয়েছেন চিঙ্গিজ। ছড়িয়ে দিয়েছেন তাতে আত্মার পরশ। সে পরশ ছুঁয়েছে পাঠকের আত্মায়। কঠিন কঠোর নীরব সৌন্দর্যে বিগলিত হতে হতে নাছোড়বান্দার মতো লেখক সে ব্যকুলতাকে আরও বেশি উসকে দেন।

পাহাড়ের সম্পদের টানাপোড়েন, জীবনযাপনের দুর্দমনীয় কষ্ট পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার যৌথ উপখ্যানে মানুষের ভেতরের অর্ন্তগত মিল ও অমিল আমাদের পরিব্যাপ্ত করে রাখে। হতাশাকে সমূলে উৎপাটন করে মানুষের মনে আশার পরশ বুলিয়ে দেয় যেন। আত্মার ক্রন্দন ধ্বনি নীরব হা-হুতাশে চোখের কোনা ভিজে গোলাপ হয়ে ওঠে। পাঠক অনুভব করতে শেখে হৃদয়ের গভীরে ডুব দিতে না পারলে নিজের জীবনের কথা বলতে না পারলে একজন মানুষ কখনও মানুষ হতে পারে না।

পাহাড়ে হাজারো চিঙ্গিজ বসবাস করে। কিন্তু একজন চিঙ্গিজ লিখতে পেরেছেন ‘জামিলা’, ‘প্রথম শিক্ষক’, ‘বিদায় গুলসারি’ (১৯৬৬), মুখোমুখি, সাদা জাহাজ (১৯৭০), ‘দিনগুলো দীর্ঘতর শতাব্দীর চেয়ে’ (১৯৮০) ‘যূপকাষ্ঠা’ (১৯৮৬) আখ্যান। যে আখ্যান মানবজাতির একটি ক্ষুদ্র অংশকে বলিষ্ঠভাবে অন্য পৃথিবীর মানুষের কাছে আত্মপ্রকাশ করিয়েছে।

মনের বাসনা ও কামনা এবং কল্পনা মানুষের আত্মায় বিস্তার করতে পারাটাই অনেক মহৎ শিল্প। চিঙ্গিজ আমাদের সে মহৎ শিল্পের কাছে নিয়ে যায়। শিল্পের গিরিখাদে এমনভাবে ডুবিয়ে দেন সে গিরিখাদ হয়ে ওঠে ভালোলাগার মৌলিক ভূমি। চিঙ্গিজের লেখা জুড়ে সে ভূমির স্বাদ পাঠক অক্লান্তভাবে পেতে থাকে।
জামিলা চিঙ্গিসকে সারাবিশ্বে মৌলিক লেখক হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। পাঠক বিস্মিত হয়ে লক্ষ করেন পাহাড়ি একজন নারীর প্রেম, অনুভূতি, দৃঢ়তা, সমাজকে ভাঙার সাহস এবং মনোগত জীবনবোধের নান্দনিক সমাহার। শৈশব থেকে পাহাড়ের ঘ্রাণ মেখে নিয়ে এ যেন জীবনের পাঠ।

পাহাড় যার বুক ও ভূখ-, পাহাড়ের উন্মাতাল ও উন্মুক্ত বাতাস যাকে পুষ্ট করেছে, ঘুর্ণি হাওয়ায় যার বেড়ে ওঠা, সে সব তাকে টেনে ধরে আপদমস্তক। সামাজিক বিয়েতে বাধ্য হলেও নারী যে পরম পুরুষের কল্পনা করে, এক জীবনে তা পায় আবার পায়ও না। না পাওয়ার মর্মযাতনায় তার স্বপ্ন দলিত হয় অংকুরেই। কখনও কখনও কাকতালীয়ভাবে নারীর কাছে স্বপ্ন এসে ধরা দেয়। ‘জামিলা’য় সে স্বপ্ন হচ্ছে দানিয়া, যে নিঃস্বঙ্গ এক ভাবুক। পাহাড়ের দূরদিগন্ত যাকে ব্যাকুল করে তোলে। সমুদ্রের শব্দ যাকে হাতছানি দেয়। তারা ভরা জোছনা যাকে আনন্দে মাতিয়ে রাখে। এ হচ্ছে সৃজনে স্বপ্নবুনন। দানিয়া সে স্বপ্নের নায়ক। পাহাড়ি বিকেলের সূর্যরাঙা আঁচলে যার দোলা। জামিলা ও দানিয়া একই স্বপ্নের অমরাবতী।

জামিলার জীবনে বৈষয়িক স্বার্থহীন ভক্তিভাজন আরাধ্য পুরুষ দানিয়া। যে সৃজনের ব্যথাকে বুকে ধারণ করতে পারে। নিভৃতে যাপন করতে পারে যাপিত সময়। কোনো চাওয়া পাওয়ার সঙ্গে তার মেলে না। বুকের ভেতর পুষে রাখে স্বর্গসম প্রেম-ভালোবাসা। এমন পুরুষই জামিলা কল্পনা করেছিল, যে পরিপূর্ণ এই পাহাড়কে বুঝতে পারবে, এই পাহাড়ের রুক্ষ মাটির ঘ্রাণ যে শুকতে পারবে।

‘আনতাই’ এ এতিম কিশোরী মেয়েটির বেড়ে ওঠার দুঃসহ গ্লানি পাঠককে বিগলিত না করে পারে না। পৃথিবীর যে কোনো দরিদ্র সমাজের প্রতিনিধি এই মেয়েটি। মেয়েটির বেড়ে ওঠার সঙ্গে পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলের বাস্তবতার হুবহু মিল দেখে অবাক হতে হয়। এই রকম দুঃসহ যাতনা নিয়ে যারা বেড়ে উঠতে জানে তারাই জীবনে সফলতা লাভ করে।

কিশোর মনে যে কষ্টের দাগ, যাতনা, বেদনা, অনুভূতির সংবেদনা লেগেছে তা সারা জীবন ভুলতে গেলেও পারে না। তবু জীবন কেটে যায় , সময় কেটে যায়। পাহাড়ের বেড়ে ওঠা একটি মেয়ের সত্য সুন্দরের আকাক্সক্ষা কিশোর দিউশেন। দিউশেন তার কৈশোরের একমাত্র প্রেম যাকে হারিয়ে সে মানসিকভাবে উদভ্রান্ত, দিশেহারা।

চিঙ্গিজ তার পাহাড়ি মনোমাটির সঙ্গে যেভাবে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছেন এই আখ্যানগুলো তার উজ্জ্বল প্রমাণ। পাহাড়ি সনাতনী জীবনের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মিলন ও টানাপোড়েন আমরা দেখি ‘জামিলা’ ‘প্রথম শিক্ষক’, ‘গুলসারি’ এবং তার অনন্য সাধারণ অন্য উপন্যাস ও গল্পগুলোতে। হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা গোত্রভিত্তিক পাহাড়ি যাযাবর শ্রেণির সমাজব্যবস্থা ও তার ছিরি আমরা দেখে ফেলি এই বাস্তবতায়। এর মধ্যে আবার আধুনিক ট্র্যাক্টর, যৌথখামার, সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতায় ধাতস্থ হতে হতে পাহাড়ি কিরগিজিয়ারা দেখল, ক্রমে সমাজতন্ত্রের বিদায়। লেখক কি তার দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখে ফেলেছিলেন সমাজতন্ত্রের বিদায়। সচেতন পাঠক হয়তো তা-ই ভাবতেই পারে। ভাবনার মৌলিকত্বে চিন্তার বীজ রোপন করেছিলেন আইৎমাতভ। তার চিন্তা ও চেতনায় সনাতনী পাহাড়ি ঘাস ও গোবর, উইলো ফুলের সৌরভ ও পপলার বৃক্ষের আমেজের মধ্যে কি আরও দূর পৃথিবী কল্পনা করার মগ্নতা ছিল না?

চিঙ্গিজ হৃদয়ের ভাষা ও পাহাড়ের ভাষাকে এক করে ইংগিত দিয়েছেন পাঠককে, পাঠক তার গল্পের ভেতর ডুব দিয়ে যা বোঝার বুঝে নেন। গুলসারির বিদায় আখ্যান কি সমাজতন্ত্রের বিদায়ের দিকে ইংগিত করেছিলেন। পাঠক হয়তো তা ভাবতেও পারেন। চিঙ্গিজ পাহাড়ি মনোভাষা ও ঝরনা, বৃক্ষের ভাষাকে এক করে জামিলা, আনতাইদের চেতনার মুখে খৈ ফুটিয়েছেন। পাহাড়ের মৌনতা, দৃঢ়তা, সুঠাম ও বলিষ্ঠ বাহুলতা, রূপকথা ও প্রাচীন গল্পের স্বর ও সুরকে টেনে নিয়েছেন আধুনিকতার প্রপঞ্চে।

পাহাড়ি মননের সঙ্গে বেড়ে ওঠা প্রকৃতির সমাপতন এবং মানুষের মনও যে অভিন্ন তা আমরা প্রতিটি সংলাপে প্রকৃতির বর্ণনায় অবিমিশ্রভাবে দেখি। আইৎমাতব পাহাড়ি বলে সে ঐ অঞ্চলের মাটির ভাষা বুঝতেন এবং তার আত্মার পরিচয় জানতেন, সময়ের পরিবর্তন ও দিনবদলের পাহাড়ি সত্তাকে এঁকেছেন তাই অপরিসীম দরদে, অকৃত্রিম ভালোবাসায়। কিরগিজিয়ার পাহাড়, উপত্যকা, প্রান্তর, অরণ্যের সঙ্গে তার আঁকা চরিত্রগুলো তাই মানুষের মনে চিরন্তন দাগ কাটতে পেরেছে।

আমরা এক্ষেত্রে রাশিয়ান আরেক উপন্যাসিক নিকোলাই গোগল-এর উপন্যাস ‘তারাস বুলবা’র কথা বলতে পারি। নিকোলাই এই উপন্যাসে সপ্ত শতকের ইউক্রেনের ভূমিদাসদের কৃষক বিদ্রোহ তথা স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা বলেছেন। দক্ষিণ রাশিয়ার নিপার নদীর তীরাঞ্চল থেকে এই আন্দোলন সমগ্র ইউক্রেনে ছড়িয়ে পড়েছিল; ঔপন্যাসিক এই গ্রন্থে কেবল মাত্র ভূমিদাসদের আন্দোলনের ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করেননি, তিনি সেই সঙ্গে ককেশীয় পর্বতমালার কসাকদের লোকগীতি, রূপকথা ও উপকাহিনিরও বর্ণনা করেছেন।

আজকের আলোচিত উপন্যাসিক আইৎমাতভ শুধু এসব বিষয় তুলে ধরেননি, বিষয়ের আরও গভীরে গিয়ে নতুন সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তার পূর্বপুরুষের এই গাথা, ধাঁধা, গান, পাহাড়ি নিঃসঙ্গতাকে যৌথ ঐক্যের সুন্দরে বাধতে চেয়েছেন। এই স্তেপের আখ্যানভাগে একটা বিষয় খুব সুক্ষ্মভাবে অনুভব করলে বুঝা যায়, জামিলাতে যে স্বপ্নের বিস্তার, প্রথম শিক্ষকে সে স্বপ্নের আরও সুন্দর বুনন, গুলসারিতে এসে সে স্বপ্নের ধাক্কায় আবারও আশার স্বপ্নবুনন। লেখক এমন করে ভাবলেন কেন? ভাবতে অবাক লাগে একজন পাহাড়ির অন্তর্দৃষ্টির গভীর চেতনা কতদূর সম্প্রসারিত হতে পারে।

সোলজেনিৎসিন ও আইৎমাতভ একই বছর মৃত্যুবরণ করেন। দুজনেই শুরু করেছিলেন গ্রামীণ আলেখ্য দিয়ে। এখানেও তফাৎ আছে। সোলজেনিৎসিনের পল্লি ছিল রাশিয়ার , চিঙ্গিজের ছিল তার মাতৃভূমি কিরগিজিয়ার। সোল্জেনিৎসিন ছিলেন রাশিয়াবিরোধী, কিন্তু আইৎমাতভ ছিলেন একান্তই সোভিয়েত– তার যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বা প্রতিবাদ সোভিয়েত আনুগত্যের ভিত্তিতে। যে কোনো কারণেই হোক, সোল্জেনিৎসিনের মৃত্যু রাশিয়া তথা পশ্চিমে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল আইৎমাতভের মৃত্যুতে তার সাবেক দেশ রাশিয়া বা বিদেশে কোথাও সে রকমটা হয়নি। অথচ সাহিত্য বিচারের মাপকাঠিতে আইৎমাতভ, সোল্জেনিৎসিনের তুলনায় কোনো অংশে খাটো নন।

আইৎমাতভ নিজ দেশ কিরগিজিয়ার ভৌগলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সামন্তীয় কৃষিজীবনের সনাতনী জীবনধারার লৌকিক বাস্তবতাকে নিপুণভাবে এঁকেছেন। বিষয়বস্তুকে এমন মন্ময় সৌন্দর্যে গেথেছেন পাঠক যতই কাহিনির গভীরে যায় ততই ডুবে যায়। মনে হয় পাহাড়, স্তেপ, গিরিখাদ, সব উন্মুক্ত হয়ে আছে চোখের সামনে।

১৯২৮ সালের ১২ ডিসেম্বর কিরগিজস্তানের পাহাড়ি গ্রামে আইৎমাতভের জন্ম। পিতা ছিলেন অক্টোবর বিপ্লবের সময় থেকে পার্টি কর্মী। আইৎমাতভের পরিবার বাস করতেন কিরগিজিয়ার দুজাম্বুল শহরে। ছোটবেলা থেকেই দ্বিভাষী, রুশ ও কিরগিজিয়া দুই সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠেন। দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধনে বেড়ে উঠেছিল তার সৃজনী কল্পনা। বিদ্যাশিক্ষা রুশ বিদ্যালয়ে। তার সমগ্র জাতির সঙ্গে তিনিও মাতৃভাষায় বই পান বিপ্লবের পর।

১৯৬৩ সালে আইৎমাতভ তাঁর গল্প সংকলন পাহাড় ও স্তেপের আখ্যান ( ‘জামিলা’, ‘প্রথম শিক্ষক’ ও ‘বিদায় গুলসারি- এই তিনটি বড় গল্প সংকলন)-এর জন্য লেনিন পুরস্কারের অধিকারী হন। যে বছর (১০ জুন ২০০৮) তিনি মৃত্যুবরণ করেন, সে বছরই রাশিয়ার রুশবিরোধী বিখ্যাত লেখক সোলজেনিৎসিন মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলা ভাষায় চিঙ্গিজের বিখ্যাত অনুবাদক অরুণ সোমের ভাষায়, “গর্বাচেভের পেরেস্ত্রৈকার আমলে আইৎমাতবকে ল্যুক্সেমবার্গে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়েছিল। তারপর থেকে সোভিয়েত দেশে এবং পরবর্তীকালে রুশদেশে তার নাম আর বিশেষ শোনা যায়নি। গর্বাচেভের ডামাডোলের রাশিয়াতেও নয় আজকের পরিবর্তিত রাশিয়াতেও নয়। অথচ তাঁকে বিংশ শতাব্দীর শেষ কয়েক দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সোভিয়েত কথাশিল্পী বললেও অত্যুক্তি হবে না।”

তথ্যসুত্র:
১. জামিলা, অনুবাদ: খালেদ চৌধুরী
২.প্রথম শিক্ষক, অনুবাদ: মামুদ হায়াৎ
৩.বিদায় গুলসারি, অনুবাদ: অরুণ সোম
৪.চিঙ্গিজ আইৎমাতভ প্রসঙ্গে: অরুণ সোম

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nurul Islam — মে ৩০, ২০১৩ @ ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

      অনেক অজানা বিষয় সম্পর্কে জানলাম। খুউব ভাল লেগেছে। মনির ভাইকে বিনীত ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — মে ৩০, ২০১৩ @ ১০:১৮ পূর্বাহ্ন

      চিঙ্গিজকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য, সারগর্ভ এ লেখনি উপস্থাপনের জন্য মনিরকে ধন্যবাদ।

      মানিক মোঃ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন imran hossain — মে ৩০, ২০১৩ @ ৩:৩২ অপরাহ্ন

      চিঙ্গিজ আইৎমাতভের ওপর বাংলায় কোনো লেখা এই প্রথম দেখলাম । বোধহয়, ৮০-৮১ এর দিকে রুশ সংস্কৃতি কেন্দ্রে রুশি চলচিত্র দেখান হত । তখন বিদায় গুলসারি ছবিটা দেখানো হয়। পরে ৮৯-৯০ দিকে পাহাড় ও স্তেপের আখ্যান এ বিদায় গুলসারি যে কতবার পরেছি জানা নেই, যাই হোক এই বইটার কথা ভুলেই গেছিলাম!! লেখক কে ধন্যবাদ, আজ হয়ত আবার বের করব বইটা। চিঙ্গিজ আইৎমাতভ এর সাথে ঘুরতে বের হব পাহাড় ও স্তেপে…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — মে ৩০, ২০১৩ @ ৫:১৮ অপরাহ্ন

      বাহ্! দুর্দান্ত লেখা মনির ইউসুফ। ধন্যবাদ চিঙ্গিজ আইৎমাতভ এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন reazuddin — মে ৩১, ২০১৩ @ ৬:৩৩ অপরাহ্ন

      valo laglo, besh valo laglo

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুহিত হাসান — জুন ৭, ২০১৩ @ ৩:২১ অপরাহ্ন

      বড় বেদনার সাথে বলছি, জনাব মনির ইউসুফের ”চিঙ্গিজ আইৎমাতভের স্তেপ ও পাহাড়ের আখ্যান” লেখাটার একটা অংশে এসে মনে হলো, বড্ড চেনা চেনা। এই একুশের বইমেলায় বেরুনো আইৎমাতভের “বিদায় গুলসারি” উপখ্যানের প্রথম সংহতি সংস্করণের যে অসামান্য ভূমিকাটি লিখেছেন অনুবাদক অরুণ সোম, তারই একটা অংশের হুবহু ছায়া ও অনেকখানি কপিপেস্ট দেখতে পেলাম যেন।

      অরুণ সোম তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন : “দুজনেই(অরুণ সোম আইৎমাতভ ও আলেক্সান্দর সোলজেনিৎসিনের কথা বলছেন, এর আগে দুজনেরই মৃত্যু যে একই সালে, সেই কাকতালীয় ঘটনার তথ্যটি আছে) সোভিয়েত আমলের , কিন্তু দুজনে দুই ভিন্ন মেরুর, যদিও পথযাত্রা দুজনেই শুরু করেছিলেন গ্রামীণ জীবনের আলেখ্য দিয়ে। এখানেও তফাৎ আছে। সোলজেনিৎসিনের পল্লী ছিল রাশিয়ার পল্লী, আইৎমাতভের ছিল তাঁর মাতৃভূমি কির্গিজিয়ার।…সোলজেনিৎসিন ছিলেন সোভিয়েত-বিরোধী, কিন্তু আইৎমাতভ ছিলেন একান্তই সোভিয়েত—তা যা কিছু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বা প্রতিবাদ সোভিয়েত-আনুগত্যের ভিত্তিতে। যে-কোনো কারণেই হোক, সোলজেনিৎসিনের মৃত্যু রাশিয়ায় এবং পশ্চিমে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল আইৎমাতভের মৃত্যুতে তাঁর সাবেক দেশ রাশিয়ায় বা বিদেশে কোথাও সেরকমটা হয়নি। অথচ সাহিত্য বিচারের মাপকাঠিতে আইৎমাতভ সোলজেনিৎসিনের তুলনায় কোনো অংশে খাটো তো ননই…।”

      আর মনির ইউসুফ সাহেব কোনোরকম উদ্ধৃতি-চিহ্ন না দিয়েই অরুণ সোমের ভূমিকার উপরোক্ত অংশটি বসিয়ে দিয়েছেন তার লেখার ভিতরে, একটু-আধটু অদল বদল করে :

      ”সোলজেনিৎসিন ও আইৎমাতভ একই বছর মৃত্যুবরণ করেন। দুজনেই শুরু করেছিলেন গ্রামীণ আলেখ্য দিয়ে। এখানেও তফাৎ আছে। সোলজেনিৎসিনের পল্লি ছিল রাশিয়ার , চিঙ্গিজের ছিল তার মাতৃভূমি কিরগিজিয়ার। সোল্জেনিৎসিন ছিলেন রাশিয়াবিরোধী, কিন্তু আইৎমাতভ ছিলেন একান্তই সোভিয়েত– তার যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বা প্রতিবাদ সোভিয়েত আনুগত্যের ভিত্তিতে। যে কোনো কারণেই হোক, সোল্জেনিৎসিনের মৃত্যু রাশিয়া তথা পশ্চিমে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল আইৎমাতভের মৃত্যুতে তার সাবেক দেশ রাশিয়া বা বিদেশে কোথাও সে রকমটা হয়নি। অথচ সাহিত্য বিচারের মাপকাঠিতে আইৎমাতভ, সোল্জেনিৎসিনের তুলনায় কোনো অংশে খাটো নন।”

      এরকম কুম্ভীলক বৃত্তি দেখে কষ্ট লাগে। কারো কোনো রকমের অনুভূতিতে আঘাত লাগলে দুঃখিত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন maniryousuf — জুন ৮, ২০১৩ @ ৩:৪৫ অপরাহ্ন

      চিঙ্গিজ আইৎমাতভ নিয়ে আমার লেখাটি কষ্ট করে পড়ার জন্য জনাব মুহিত হাসান দিগন্তকে ধন্যবাদ। আমার লেখা নিয়ে মুহিত যে অভিযোগ করেছেন তা কতটুকু সত্য তিনি নিজেই বুঝতে পারেন নি। একটা দীর্ঘ লেখাতে অনেক লেখকের উদ্ধৃতি থাকে তথ্য আকারে। রুশ সাহিত্য নিয়ে আমি দীর্ঘিদন ধরে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। অরুণ সোম, হায়াৎ মামুদ, খালেদ চৌধুরী, দ্বিজেন শর্মাসহ, ইন্টারেনেট ঘেটে আমি যে তথ্যগুলো পেয়েছি তা সন্নিবেশিত করেছি মাত্র। সেখানে চিঙ্গিজ আইৎমাত‌্ভ প্রসঙ্গে অরুণ সোমের ভূমিকা থেকে একটু বেশি উদ্বৃতি দেওয়া হয়েছে। কেননা রুশ সাহিত‌্যের মনযোগী পাঠকমাত্রই জানেন অরুণ সোম এবং রুশ বাংলা অনুবাদ কত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমার লেখায় প্রাসঙ্গিক কারণেই অরুণ সোমকে নিতে হয়েছে। এবং তার স্পষ্ট তথ্যসুত্র আমি উল্লেখ করেছি। এতে উনি চুরি কোথায় পেলেন। আমি যদি তথ্যসূত্র উল্লেখ না করতাম তাহলে সেটা চুরির পর্যায়ে পড়ত। চিঙ্গিজের প্রতি আমার অসম্ভব ভাল লাগা থেকে আমি আমার লেখাটি লিখেছি। এবং আমি বিশ্ব সাহিত্যের বড় বড় লেখকদের নিয়ে লেখা শুরু করেছি। আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল হতেই পারে। কিন্তু এটাকে কুম্ভীলকবৃত্তি বলে মুহিত যে-কথা বলেছেন তা ঠিক নয়।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com