নজরুলঃ দ্রোহের আলোকিত দূত

মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক | ২৫ মে ২০১৩ ১০:১৯ অপরাহ্ন

আজকের দিনে নজরুলকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে, অবশ্যই সে সময়কার কালপর্বকে বিবেচনায় এনেই তাঁকে মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি যে সময় সাহিত্য জগতে কলম চালিয়েছেন সে সময়কালটি ছিল ঔপনিবেশিক সময়কাল। ব্যক্তি স্বাধীনতা তথা মত প্রকাশের স্বাধীনতা তখন পুরোটাই ছিল নিয়ন্ত্রিত। এর উপর উপমহাদেশ জুড়ে বইছিল সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে পুরো উপমহাদেশ ছিল দ্বিধা বিভক্ত। বিদেশি শক্তি বিতাড়নের ক্ষেত্রেও ছিল নানা পথ নানা মত।

একদিকে চলছিল গান্ধীর সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে চলছিল খিলাফত আন্দোলন, চলছিল স্বদেশিদের শসস্ত্র সংগ্রাম। এক্ষেত্রে নজরুলই প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার আহ্বান জানাতে হয়েছিলেন সোচ্চার। জাতিগত ভেদাভেদ ভুলে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য দিয়েছিলেন ঐক্যর ডাক। সামাজিক বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সুসম সমাজের জন্য হয়েছিলেন উৎকণ্ঠিত। এ সমস্ত অভীষ্ট অর্জনের পথে, পদে পদে তাঁকে বিরুদ্ধবাদীদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তিনি যেমন ব্রিটিশ রাজশক্তির কোপানলে পড়েছিলেন, তেমনি পড়েছিলেন বাঙালি হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক কোপানলে। এই ত্রি-মুখি বিরোধিতার বিরূপ পরিবেশও তাঁকে স্তব্ধ করতে পারেনি। রোধ করতে পারেনি তাঁর কণ্ঠ।

‘বিদ্রোহী’ কবিতাসহ একে একে তিনি রচনা করতে থাকেন কালজয়ী সব কবিতা। বৈষম্যহীন সুসম সমাজের জন্য ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় লিখেছেন,
‘গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান’।

একই আঙ্গিকে তিনি ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন,
‘গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!’

হিন্দু মুসলিম দু পক্ষকে সামাল দিতে গিয়ে তিনি দু সম্প্রদায়কেই স্ব স্ব অবস্থান থেকে জাগিয়ে তোলার নিমিত্ত দু সম্প্রদায়ের জন্যই রচনা করে আলাদা আলাদা কবিতা। ‘আজাদ’ কবিতায় মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে লিখেন,
‘কোথা সে আজাদ? কোথা সে পূর্ণ-মুক্ত মুসলমান
আল্লাহ ছাড়া করে না কারেও ভয়, কোথা সেই প্রাণ?
একই সাথে তিনি হিন্দু সমাজকেও সমভাবে দ্রোহের আহ্বান জানানোর প্রত্যয়ে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতায় লিখেন,
‘আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাড়াল’।
নিজের নিরপেক্ষ এবং সার্বজনীন অবস্থানগত কারণে সাধারণ মানুষের জন্য লিখেন মানবিক আবেদন সম্বলিত কবিতা। তাঁর ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় সাধারণ সর্বহারা মানুষের জন্য লিখেন,
‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত একটু নুন’
একই কবিতায় তিনি কৈফিয়ত দেবার মত করে বলেন,
‘বন্ধুগো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে’।

দেশ কাল স্থানের উর্ধ্বে উঠে তিনি হয়ে উঠতে চান পৃথিবীর সন্তান। ‘আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধে তিনি তাঁর দল নিরপেক্ষ অবস্থান তুলে ধরে বৈশ্বিক পরিসরের একজন যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। এ প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘আমি ‘নবযুগে’ যোগদান করেছি, শুধু ভারতে নয়, জগতে নবযুগ আনার জন্য। এ আমার অহঙ্কার নয়, এ আমার সাধ, এ আমার সাধনা। এই বিদ্বেষ-কলহ-কলঙ্কিত, প্রেমহীন, ক্ষমাহীন, অসুন্দর পৃথিবীকে সুন্দর করতে শান্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে আল্লার বান্দা রূপেই কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছি’। এ প্রবন্ধে তিনি আরও বলেন, ‘আমি লীগ, কংগ্রেস মানি না, মানি শুধু সত্যকে, মানি সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বকে, মানি সর্ব জনগনের মুক্তিকে’। এ প্রেক্ষিতেই তিনি রচনা করেন সর্বহারাদের আন্তর্জাতিক সঙ্গীত, সে ‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’এ তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়;
জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত/ জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত’।

প্রথম থেকেই কবিকে সত্য কথা ববার জন্য, স্বাধীনতার কথা বলবার জন্য, অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের জন্য বিদেশী শাসকদের শ্যেণ দৃষ্টিতে পড়তে হয়। শাসকেরা একে একে তাঁর পাঁচটি গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করেছিল। সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অনুপ্রেণার অভিযোগে ২৩ নভেম্বর ১৯২২ এ ‘যুগবাণী’। সরকারের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহাত্মক কবিতা সংকলন’র অভিযোগে ২২ অক্টোবর ১৯২৪ এ ‘বিষের বাঁশী’। শাসকদের বিরুদ্ধে ভাঙনের বীজ বপনের অভিযোগে ১১ নভেম্বর ১৯২৪ এ ‘ভাঙার গান’। শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসন্তোষ উৎপাদনের প্রেক্ষিতে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ এ ‘প্রলয় শিখা’ এবং ইংরেজদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপের কারণে ১৪ অক্টোবর ১৯৩০ এ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল ‘চন্দ্রবিন্দু’। এক লেখকের এত অধিক সংখ্যক গ্রন্থ ইতোপূর্বে ব্রিটিশরা কোনো উপনিবেশে বাজেয়াপ্ত করেছিল কি না, তা আমাদের জানা নেই। একে একে গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করেই শাসককুল সন্তষ্ট থাকেনি। কবিকে নিয়ে কারাগারেও পুরেছিল ওরা। তদুপরি কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠেও থেমে থাকেনি কবির কণ্ঠ। ওখানেও ধ্বনিত হয়েছে লৌহ কপাট ভেঙে ফেলবার এবং শিকল পরে শিকল বিকল করবার দৃপ্ত প্রত্যয়। কারা কর্তৃপক্ষের অনাচারের বিরুদ্ধে করেছেন অনশন। তাঁর অনশনের ব্যাপারে ব্যাকুল হয়ে কবিগুরু তাঁকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়ে পত্রও দিয়েছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সে পত্র তাঁকে হস্তান্তর করা হয়নি। এই সংবাদ জানতে পেরে কবিগুরু এই মর্মে শঙ্কিত হয়েছিলেন যে, হয়তোবা ব্রিটিশ রাজ তাঁকে আত্মহননের পথেই ঠেলে দিতে উদগ্রীব। জেল জুলুম হুলিয়া কোনো কিছুই এই বাঁধনহারা কবিকে সামান্য ক্ষণের জন্য নিস্পৃহ করতে পারেনি। বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে তিনি অকুষ্ঠ চিত্তে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করে স্বাধীনতার স্বপক্ষে বক্তব্য প্রদান করেছেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে অবস্থানকালে ৭ জানুয়ারী ১৯২৩ খ্রিঃ তিনি বিচারকের সমুখে যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ দিয়েছিলেন তার কিয়দংশ এখানে তুলে ধরছি, ‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত’। এ জবাবন্দীর এক অংশে তিনি বলেন, ‘রাজার বাণী বুদ্বুদ, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র। আমি কবি, অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তি দানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন। আমার বাণী সত্যের প্রবেশিকা, ভগবানের বাণী। সে-বাণী রাজ বিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায় বিচারে সে-বাণী ন্যায়-দ্রোহী নয়, সত্য-দ্রোহী নয়। সে বাণী রাজদ্বারে দন্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়ারে তারা নিরাপদ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বান সত্য-স্বরূপ’। অতঃপর তিনি আরও বলেন, ‘আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসিবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে এ রাজত্বে তা হবে রাজদ্রোহ। এ-তো ন্যায়ের শাসন হতে পারে না’। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমি পরম আত্মবিশ্বাসী। তাই যা অন্যায় বলে বুঝেছি, তাকে অন্যায় বলেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি’। শুধু এই জবানবন্দিতেই নয় কিংবা কবিতাতেই নয়, বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরে দ্রোহের, প্রতিবাদের, আহ্বানের দীপশিখা জ্বালিয়েছেন। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ‘ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’ প্রবন্ধে জাতিসত্তার স্ফুরণের জন্য ক্ষেদের সাথে তিনি লিখেন, ‘মনুষ্যত্ব’র এ অবমাননা ও লাঞ্ছনা শুধু ভিক্ষুকের জাতিই হাসিমুখে নিজেদের গৌরব বলিয়া মানিয়া লইতে পারে। অন্তরে যাহারা ঘৃণ্য নীচ আর ছোট হইয়া গিয়াছে, আত্ম সম্মান-জ্ঞান যাহাদের এত অসাড়-হিম হইয়া গিয়াছে তাহাদিগকে জাগাইয়া তুলিতে চাই’। ‘আমি সৈনিক’ প্রবন্ধে তাঁর লেখনিতে ধ্বনিত হয়েছে আগুন ঝরা অমিত আহ্বান, জাতিকে জাগিয়ে তোলার আকুতি। এ প্রবন্ধের এক অংশে তিনি বলেন, ‘ওরে আমার ভারতের সেরা, আগুন খেলার সোনার বাঙলা! কোথায় কোন্ অগ্নেয়গিরির তলে তোর বুকের অগ্নি-সিন্ধু নিস্তব্ধ নিস্পন্দ হয়ে পড়ল?’ বস্তুত বাংলাকে নিয়ে কবির মনে ছিল অতীব উচ্চাশা। ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে বাংলাকেই তিনি মুক্তি সংগ্রামের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করতেন। এছাড়াও বাঙালি জাতি সত্তা বিনির্মাণের প্রশ্নেও কবির হৃদয়ে ছিল অনবদ্য তাগিদ। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি অখন্ড বাঙলার। একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙলার জন্য তিনি ছিলেন ব্যাকুল। বাঙালির শৌর্য বীর্যের প্রতি পরম আস্থাশীল কবি তাই তাঁর ‘বাঙালির বাঙলা’ প্রবন্ধে আত্মবিশ্বাসের সাথে লিখেন, ‘বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে, ‘বাঙালির বাঙলা’ সেদিন তারা অসাধ্য করবে। সেদিন একা বাঙালিই ভারতকে স্বাধীন করতে পারবে। বাঙালির মত জ্ঞান-শক্তি ও প্রেম-শক্তি (ব্রেন সেন্টার ও হার্ট সেন্টার) এশিয়ার কেন, বুঝি পৃথিবীর কোন জাতির নেই। কিন্তু কর্মশক্তি একেবারে নেই বলেই তাদের এই দিব্যশক্তি তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাদের কর্মবিমুখতা, জড়ত্ব, মৃত্যুভয়, আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, ব্যবসা বাণিজ্যে অনিচ্ছার কারণ। তারা তামসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে চেতনা শক্তি হারিয়ে ফেলেছে’। একই প্রবন্ধে এরপর তিনি বাঙলা সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেন, ‘বাংলার আবহাওয়ায় আছে স্বাধীনতামন্ত্রের সঞ্জীবনী শক্তি। আমাদের বাংলা নিত্য মহিমাময়ী, নিত্য সুন্দর, নিত্য পবিত্র’। স্বপ্ন দ্রষ্টা কবির নির্দেশিত পথে পরবর্তীতে ভারতের রাজনীতির স্টিমার ধাবিত হয়নি। বাঙালিও আর বাঙালির সত্তা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিতে পারেনি। তিনি তাঁর অবস্থানে থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেননি।
সাম্প্রদায়িকতার সংকীর্ণ গলি ভেদ করে বিদেশি বিতাড়ণের জন্য অতঃপর তিনি ‘ধূমকেতু’র পথ’ প্রবন্ধে এর উদ্দেশ্য, কার্যপরিধি কিংবা করণীয় সম্পর্কিত অনিসন্ধিৎসু পাঠকদের অবগতির জন্য কৈফিয়ত দেওয়ার মত করে বলেন যে, ‘সর্ব প্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম ক’রে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীদের অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লী করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লী ক’রে দেশকে স্মশান ভূমিতে পরিণত করেছেন, তাঁদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগর পারে পারি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদেরও এ প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকু দূর করতে হবে। পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল-কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে। আর এই বিদ্রোহ করতে হলে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে। বুক ফুলিয়ে বলতে হবে আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’।

সর্ব ক্ষেত্রে তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণার দৃষ্টিতেই দেখেছেন, এর বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ ঐক্যের জন্য মরিয়া হয়ে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে আমরা এর স্ফুরণ দেখতে পাই। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে তিনি হিন্দু মুসলিমের ঐক্যের আকাঙ্খায় ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কিত ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ধূমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়। মানুষ-ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। হিন্দু মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য।,,,,,দেশের পক্ষে যা মঙ্গলকর বা সত্য, শুধু তাই লক্ষ্য ক’রে এই আগুনের ঝান্ডা দুলিয়ে পথে বাহির হ’লাম’।

নজরুলের কালপর্বে বিষ ফোঁড়ার মত আমাদের স্কন্ধে চেপে বসেছিল সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে এ বিষবাষ্প স্কন্ধ থেকে উৎপাটন করা ছিল অত্যাবশ্যক। এ নিয়ে কবির হৃদয়ে দূর্ভাবনার অন্ত ছিল না। একটি অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন ভূ-খন্ডের স্বপ্ন দোলায়িত ছিল তাঁর মনোজগতে। ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে এ সম্পর্কিত বিষয়ে আলোকপাত প্রাক্কালে তিনি লিখেন, ‘একদিন গুরুদেব রবীন্দ্র নাথের সাথে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বল্লেন: দেখ, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভেতরের ন্যাজ কাটবে কে? হিন্দ-মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারেবারে গুরুদেবের ঐ কথাটাই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদিত হয় মনে যে, এ ন্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় তা ভেতরেই হোক আর বাহিরেই হোক তারা হয়ে ওঠে পশু’। একই প্রবন্ধের অন্য প্যারাতে তিনি লিখেন, ‘অবতার পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি, আমি ক্রীশ্চানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন আমরা মানুষের জন্য এসেছি আলোর মত, সকলের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তেরা বলে- কৃষ্ণ হিন্দুর, মুহম্মদের ভক্তেরা বলে- মুহাম্মদ মুসলমানের, খ্রিস্টের শিষ্যেরা বলে-খ্রিস্ট খ্রিস্টানের। কৃষ্ণ, মুহম্মদ, খ্রিস্ট হয়ে উঠলেন জাতীয় সম্পত্তি’। এর পর তিনি এ প্রবন্ধের সমাপ্তি পর্যায়ে টিপ্পনি কেটে লিখেন, ‘রাস্তায় যেতে যেতে দেখলাম, একটা বলদ যাচ্ছে, তার ন্যাজটা খ’সে গেছে। ওরই সাথে দেখলাম, আমার অতি বড় উদার বিলাত ফেরত বন্ধুর মাথায় এক জব্বর টিকি গজিয়েছে। মনে হ’ল, পশুর ন্যাজ খসছে আর মানুষের ন্যাজ গজাচ্ছে’।

সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বাতাস কবিকে সব সময় বিচলিত করেছে, এ বিষয়টি তিনি কখনো কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারেননি। যখন যেখানে এহেন অবস্থা পরিদৃষ্টি হয়েছে তখনই তিনি নিজের অবস্থানে দৃঢ় থেকে আত্ম প্রত্যয়ের সাথে এর বিরোধিতা করেছেন। নির্ভীক চিত্তে তিনি বলেছেন, ‘এসো ভাই হিন্দু! এসো মুসলমান! এসো বৌদ্ধ! এসো ক্রিশ্চিয়ান! আজ আমরা সর্বগন্ডী কাটাইয়া সব সংকীর্ণতা, সব মিথ্যা সর্ব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না’।

বস্তুত সাম্প্রদায়িকতার অনেক উর্দ্ধে ছিলেন আমাদের এই দ্রোহের কবি। ধর্মকে নিয়ে যেমন অতিশোয়ক্তি করেননি। তেমনি ধর্মের চেয়ে পরাধীনতার গ্লানিকে দেখেছেন অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে। যে কারণে দেখা যায়, ‘আমার ধর্ম’তে তিনি পরাধীনতার গ্লানিকে নিয়ে আক্ষেপের সাথে লিখেছেন, ‘আমার আবার ধর্ম কি? যার ঘরে বসে কথা কইবার অধিকার নেই, দুপুর রাতে দুস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়, অত্যাচারকে চোখ রাঙাবার যার শক্তি নেই, তার আবার ধর্ম কি?’

সর্বক্ষেত্রে কবিকে বিতকির্ত করবার জন্য এক শ্রেণীর ঈর্ষকাতুর সমালোচক সব সময় তাঁর পেছনে লেগে থাকতো। কোনো উছিলা পেলেই নিক্ষেপ করতো কটাক্ষের মিসাইল। ‘শনিবারের চিঠি’তে কবির সমালোচনা করতে গিয়ে তাঁকে অত্যন্ত অমার্জিতভাবে আক্রমণ করা হয়। তাঁর লেখনি সম্পর্কে বলা হয়, ‘শিক্ষাদীক্ষাহীন অর্বাচীন রচনা, অশিক্ষিত পটুত্ব, কামজ চেতনা, বিদ্রোহীর প্রলাপ, প্রোলিটারিয়েট বাইরন মানবাত্মার প্রতি এক শ্রেণীর ভাব, দেহ সর্বস্বতা, মনুষ্যত্বের বিরুদ্ধে মনুষ্যত্বের আক্রোশ, যৌনতা, হুইটমেনিয়া, গেঁয়ো কবি’।

কবির কবিতায় যেমন সাংস্কৃতিক শব্দের সমাহার থাকতো তেমনি তিনি ইচ্ছেমত ব্যবহার করতেন আরবী, ফারসি, উর্দূ এবং নানা ভাষার শব্দ। এ ধরনের শাব্দিক সমাবেশে বাংলা ভাষার কোনো অঙ্গ হানি না হলেও সমালোচকেরা থেমে থানেনি। রক্তের বদলে ‘খুন’ শব্দটি ব্যবহার করায় এটিকে উপজীব্য করে এন্তার সমালোচনা করা হয়। কবিগুরুর ঘরানার কবিরাও এক্ষেত্রে বসে থাকেনি। এ সব সমালোচনার বিরুদ্ধে কবি তাঁর ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে দাঁত ভাঙা জবাব দেয়ার অভিপ্রায়ে লিখেন, ‘এই আরবি-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারত চন্দ্র, রবীন্দ্র নাথ, সত্যেন্দ্র নাথ প্রমুখ করে গেছেন’। একই প্রবন্ধের এক পর্যায়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি একটা জিনিস কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করে আসছি, সম্ভ্রান্ত হিন্দু বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানি-টুপি ব্যবহার করেন, এমন কি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রুপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম তখন হয়ে যায় ‘অরিয়েন্টাল’। কিন্তু ওগুলোই মুসলমানরা পরলে তারা হয়ে যায় মিয়া সাহেব’। এরপর একই প্রবন্ধে বাঙলা কাব্যে বিদেশি শব্দের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাঙলা কাব্য লক্ষ্মীকে দুটো ইরানি জেওর পরালে তার জাত যায় না, বরং তাকে আরও খুবসুরতই দেখায়’। একই প্রসঙ্গে তিনি পূর্ব বাঙলার বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য কবি গুরুসহ অন্যান্যদের দৃষ্টি আকর্ষণার্থে লিখেন, ‘কবি গুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্য লক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাদের কাছে টুপি আর চাপকান চায় না, চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে, ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর’।

এত কিছুর পরেও কবিকে নিজ সম্প্রদায়ের তরফ থেকেও তাঁকে কম ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। নিজ ধর্মের লোকদের সমালোচনা করায় তাঁকে কাফের হিসেবেও চিহ্নিত হতে হয়। সে আমলে হয়তো আজকের দিনের মত মুরতাদ ঘোষণার চল ছিল না, থাকলে হয়তো তাঁকে মুরতাদ হিসেবে পলাতক জীবন ধারণ করতে হতো। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেন, ‘প্রথম গালাগালির ঝড়টা আমার ঘরের দিক থেকে অর্থাৎ মুসলমানের দিক থেকেই এসেছিল’ এরপরও এ নিয়ে কবির মনে কোনো আক্ষেপ ছির না, একই বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি লিখেন, ‘প্রবীণদের আশীর্বাদ মাথার মণি হয়তো পাইনি, কিন্তু তরুণদের ভালবাসা, বুকের মালা আমি পেয়েছি। আমার ক্ষতির ক্ষেতে ফুলের ফসল ফলেছে’। এত সমালোচনার পরেও তিনি স্ব সম্প্রদায়ের ধর্মান্ধতা, কুপমন্ডকতার বিরুদ্ধে কথা বলতে দ্বিধা করেননি, এক মুহূর্তের জন্য থেমে থাকেননি, নির্বিকার চিত্তে লিখেছেন,
‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনো বসে
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি ফেকা ও হাদিস চষে’।

তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা স্বল্প শিক্ষিত গন্ডমূর্খ বলে তিরষ্কর করতে দ্বিধা করেনি। এদের কেউ কেউ নিজের অজ্ঞানতার কারণে কবির প্রতি তাদের নেতিবাচক মন্তব্য ছুঁড়েছেন, কেউ আবার ঈর্ষা প্রসূত অত্যন্ত সচেতনতা, চাতুর্যতার সাথে কবির বিরুদ্ধাচারণ করেছেন। কবিকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তাঁর প্রজ্ঞা, মেধা, সৃষ্টিশীলতাকে আকারণে ব্যঙ্গ করেছে। বস্তুত নজরুল শুধুমাত্র ভারতীয়, গ্রিক এবং অ্যারাবিক মিথ সম্পর্কেই বি˜গ্ধ ছিলেন না, সমসাময়িক বিশ্ব সাহিত্য এবং রাজনৈতিক প্রপঞ্চের ব্যাপারেও ছিলেন সম্যক অবহিত। তাঁর ‘বর্তমান বিশ্ব সাহিত্য’ প্রবন্ধের দিকে আলোকপাত করলেই এ কথার স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এ প্রবন্ধে তিনি নোগুচি, ইয়েসট, গোর্কি, যোহান বোয়ার, বার্নার্ড শ, বেনাভাঁতে, লিওনিঁদ, আঁদ্রিভ, দস্তয়ভস্কি, টলস্টয়, ফ্রয়েড, ইবসেনসহ আরও অনেক পন্ডিতের উপর আলোকপাত করাসহ রাশান রেভিউলিশন এবং কার্ল মার্ক্সের উপরও আলোকপাত করেছেন। বস্তুত করমেড মোজাফর’র সাথে সম্পৃক্ততার কারণে বৈশ্বিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ এবং আন্দোলনের বিষয়েও তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে ওয়াকিফহাল।

তাঁর ভাষা, ছন্দ এবং শব্দ ব্যাবহারের বিষয়ে এখানে কবি নূরুল হুদার একটি মূল্যায়ন তুলে ধরছি। নজরুলের ব্যবহৃত ভাষা, শব্দ, ছন্দ সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে কবি নূরুল হুদা বলেছেন, ‘নজরুলের ভাষা বিদ্রোহের মুখ্য হাতিয়ার তাঁর বিদ্রোহাত্মক কবিতাগুচ্ছে ব্যবহৃত যৌগিক শব্দ, শ্বাসাঘাত প্রধান ধ্বনিগুচ্ছ এবং ইসলামি অনুসঙ্গে ব্যবহৃত আরবি ফারসি শব্দমালা। এ শব্দগুচ্ছ ছন্দের অলঙ্কার শাসিত,,,,, এছাড়া প্রায় অপ্রচলিত সংস্কৃত ছন্দ, আরবি ছন্দ, ইত্যাদির বিস্তর পরীক্ষা করেছেন তিনি। অর্ধ শতাধিক ছন্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায় তাঁর কবিতায়। ছন্দের পাশাপাশি অলঙ্কার ব্যবহারে ছিল তাঁর অনায়াস দক্ষতা। কবি প্রসিদ্ধি, রূপক, প্রতীক, অনুপ্রাস, মিল, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, নরাত্বারোপ, চিত্রকল্প, যমক, বক্রোক্তি, শ্লেষ, ইত্যাদির অভিনবত্ব তাঁর কবিতার দৃশ্যমান শরীরকে করেছে ঋদ্ধ’। এখন নজরুল স্বমহীমায় উদ্ভাসিত। তাঁর থেকে যতটুকু আমরা গ্রহণ করতে পারবো, ততটুকুই লাভবান হবো।

শুধু কবিতা, গল্পে, প্রবন্ধে বা গতানুগতিক গানে তিনি নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেননি। সঙ্গীতের নতুন রাগ রাগিনী সৃষ্টিতেও তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কমপক্ষে ১৭/১৮টি রাগ তিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন দোলন চাঁপা, দেবযানী, মীনাক্ষী, অরুন রঞ্জনী, নির্ঝরিনী, রূপমঞ্জুরী, সন্ধ্যামালতী, বনকুন্তলা, অরুনবৈভব, শিবানী বৈভব, রুদ্র বৈভব, আশা বৈভবী, উদাসী বৈভব, শিব সরস্বতী, বেণুকা, শঙ্করী, যোগিনীসহ আরও অনেক রাগ।
এই অস্থির চিত্তের কবি যেখানে যখন যা কিছুর সন্ধান পেয়েছেন সেখানেই নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। গান, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখতে লিখতে প্রবেশ করেছেন সিনেমার জগতে। সিনেমায় অভিনয়করেছেন গান লিখেছেন। পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে তিনি ১৩ টি সিনোমার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন।

১৮৫৪ সালে ফরাসি দেশের শার্লভিলে জন্ম নেওয়া কবি র্যাঁবো যেমন ‘কলুষিত রক্ত’ কবিতায় পুরো গ্যল জাতিকে তাদের সংকীর্ণতার জন্য আক্রমণ করেছিল, এবং সমস্ত কুসংস্কার ভেদ করে আলোকিত পথের আহ্বান জানিয়েছিল, তেমনি আমাদের চুড়–লিয়ার কবিও আত্ম সমালোচনার মাধ্যমে সমস্ত ধর্মান্ধতা, কুপমন্ডকতা পরিহার করে ধর্মান্ধতার শেকল ভেঙে সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার ভেদ করে ঐক্যবদ্ধভাবে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। নজরুলের সামাজিক অবস্থানই সে সময় তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করণে ভূমিকা রেখেছিল। তখনকার দিনে সাহিত্য জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতো সমাজের অগ্রবর্তী শ্রেণীর লোকেরা। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে একটি পরজীবী শ্রেণী শাসককুলের ছত্রছায়ায় থেকে সাহিত্য সংস্কৃতির চালিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করতো। শ্রেণী বিভাজিত সে সমাজে চাল চুলাহীন এক হাবিলদারকে গ্রহণ করে নেয়ার মত মানসিক উদারতা তখনো বিকশিত হয়নি। তারপরও নজরুলকে অবদমিত করা যায়নি। তিনি হয়ে উঠেছেন এ জাতীর আলোকদূত। বাংগালির প্রাণের কবি। বিশ্বের বিদ্রোহের কবি। এ বাংলাসহ সারা বিশ্বে যতদিন বৈষম্য বিরাজ করবে, সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্প ঘোলাটে করবে মুক্ত আকাশ, ততদিন এ মহান কবির আবশ্যকতা অনুভূত হবে। ততদিন এ কবি আলোক দূত হয়ে আমাদের পথ দেখাবেন। কবিকে তাঁর ১১৪ তম জন্মদিনে অনেক অনেক শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্র এবং কৃতজ্ঞতায়

(০১) আনোয়ারুল হক। নজরুল ও তাঁর বৈরী পক্ষ। ঢাকা। নজরুল ইনস্টিটিউট। ২০০০।
(০২) আবদুল মান্নান সৈয়দ (সংকলিত ও সম্পাদিত)। শ্রেষ্ঠ নজরুল। অবসর। ২০১২ (পুনর্মুদ্রণ)
(০৩) নজরুল জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন স্মারক গ্রন্থ। ঢাকা। নজরুল ইনস্টিটিউট। ১৯৯৩।
(০৪) মজিদ মাহমুদ। নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র। ঢাকা। নজরুল চর্চা কেন্দ্র। ২০০৮ ৯২য় প্রকাশ)।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন humaun kobir — মে ২৬, ২০১৩ @ ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

      WRITER tar lekhay Bidrohi kobi kazi Nazrul, Bharat er shadinota songram er somoy ze protikul paribeshe tar lekhonir dara manush ke ujjibito korese, ta songkhepe tule doresen. Tule doreshen literaturer er sokol ongone tar dipto padocharona.E lekhay kazir 114tomo birthday ke koresi aro moheean. Manik mohammed Razzak ke janai thanks.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — মে ২৬, ২০১৩ @ ১১:৩২ পূর্বাহ্ন

      নজরুল : দ্রোহের আলোকিত দূত/মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, প্রবন্ধটিতে কবি নজরুল ইসলামের অজানা বিষয় নয় বরং বহুল জানা বিষয়ই প্রবন্ধকার নতুন করে স্বল্প পরিষরে আলোচনা করেছেন প্রাঞ্জল ভাষায় । আলোচনায় নতুন প্রজন্মের জন্য কেবল নয় আমাদের অনেকের স্মৃতিতে তলিয়ে থাকা অনেক বিষয়ই সামনে এসে পড়ে। কবি নজরূল ইসলামকে নিয়ে স্বার্থ হাসিলে তৎপর গোষ্ঠি নানা সময়ে নানা ভাবে তাঁকে ব্যাবহার করতে গিয়ে কখনও মুসলমান,কখনও হিন্দু পক্ষ ভূক্ত করবার অপচেষ্টা করেছেন,করছেন কিন্তু তাতে তিনি বা তাঁর মহত্মের বিস্তৃতিতে কোন আবদ্ধতা আরোপিত হয়নি। কারণ একটাই তিনি মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে সচেতন ভাবে মানুষের কল্যাণের জন্য. তাঁর স্বাধীনতার জন্য, নিপীড়ণ থেকে মুক্তির বার্তা-যা মানুষকে স্বাধীনতার সড়কে পৌঁছে দেবে তার জন্য লিখেছেন নির্মোহ হয়েই। সে কারণে নজরূল বহুকাল থেকে যাবেন প্রাসংগীক। তাঁর বিদ্রোহী কবিতা, কি ভাবের দিক থেকে, শিল্পের দিক থেকে, ভাষার দিক থেকে, মিথ ব্যবহারের দিক থেকে এবং সর্বপরি ছন্দের দিক থেকে এমন এক সময়কে ধরে রেখেছে_ যার আধুনিকত্ব আজো অতিক্রান্ত হয় নি । শুধুমাত্র এই একটি কবিতাই যদি তিনি লিখতেন তা’হলও তিনি তেমনি ভাবে মানুষের চেতনায় জেগে থাকতেন আজো যেমন আছেন । মানিক ভাই অনেক বিষয়ের দিকে এই প্রবন্ধে আলোকপাত করেছেন অল্প পরিষরে,বলবার ভঙিটি তাঁর সুন্দর,স্বাবলীল,ছন্দময়, পাঠককে তৃপ্ত করবার অনুষঙ্গ আছে। মানিক ভাইকে অনেক শুভেচ্ছা..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদুনিয়া — মে ২৬, ২০১৩ @ ৪:৫১ অপরাহ্ন

      তিনি নিজেই সেটা বলে গেছেন তাঁর বিদ্রোহী কবিতায়, ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’।

      তাঁর বিদ্রোহী কবিতাটি মৌলিক রচনা হয়ে থাকলে- ততদিন পর্যন্ত শুধু বাঙ্গালী নয়, সবার কাছেই তিনি প্রাসঙ্গিক থাকবেন – শুধুমাত্র বিদ্রোহীরকবি হিসাবেই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৈকত হাবিব — মে ২৮, ২০১৩ @ ১০:১৮ অপরাহ্ন

      প্রিয় মানিক ভাই,

      আপনার সুস্বাদু রচনাখানি পড়িয়া সাতিশয় প্রীত হইলাম। আপনার কবি ও গবেষকের চরিত্র এইখানে আসিয়া যেন মোহনায় মিলিত হইয়াছে। তথ্য যাহা দিয়াছেন তাহা নতুন নহে, কথা যা কয়েছেন তাহাও বিস্ময়কর ঠেকে নাই, কিন্তু পুরো রচনাখানিতে আপনি উভয়ের এত সুন্দর দাম্পত্য রচিয়াছেন যে, মুগ্ধ হইয়া পাঠ করিয়াছি। আপনার ভাষা অতীব সুন্দর, তথ্যবহুল ও সহজ। আপনার এতাদৃশ রচনা আরও পাঠ করিতে চাহি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com