নজরুলের কাগুজে চর্চা আর কতকাল?

সৈকত হাবিব | ২৫ মে ২০১৩ ২:৫৫ পূর্বাহ্ন

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কাজী নজরুল ইসলাম বহুকাল ধরে বিশেষণের জীর্ণ দেয়ালে আটকা পড়ে আছেন। সেখান থেকে তাকে উদ্ধারের কিছু চেষ্টা থাকলেও সাফল্য খুবই কম। এটা যেমন তার জীবদ্দশায় সত্য ছিল, তার মৃত্যুর পর আরো বেশি সত্য। অন্যদিকে নজরুলের কাছ থেকে এখনো আমাদের অনেক কিছু নেবার থাকলেও বাস্তবে কাগুজে চর্চা আর সাহিত্যবাণিজ্য ছাড়া তেমন কিছুই হচ্ছে না।

‘বিদ্রোহী কবি’, ‘বুলবুল কবি’, ‘জাতীয় কবি’ ইত্যাদি কিছু বিশেষণের আড়ালে প্রকৃত নজরুল বহুকাল ধরেই হারিয়ে যেতে বসেছেন। এর ফলস্বরূপ, আমাদের ভক্তি গদগদ ভাব ছাড়া নজরুলকে সঠিকভাবে পাঠ, মূল্যায়ন, অনুভব বা বিশ্লেষণ করার কোনো তাগিদই বহু ক্ষেত্রে আমরা বোধ করি না। একসময় বাঙালি মুসলমান ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানে’র জন্য তাকে রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। আর এমন সব আজগুবি গল্প সৃষ্টি করেছিল যে, ভাবলে হাসব না কাঁদব ঠিক বুঝতে পারি না। যেমন : অনেকের ধারণা নোবেল পুরস্কার হয়তো অনেকটা রেসের দৌড়ের মতো। অনেক কথিত ‘শিক্ষিত’ লোকের মুখেও শুনেছি, নোবেল প্রতিযোগিতার দৌড়ে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে যান, আর সেই দৌড়ে নজরুল কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন বলে পুরস্কারটা বাগাতে পারেন নি। কিন্তু সত্যি কথা হলো, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার বছর নজরুলের বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর আর রবীন্দ্রনাথের তিপ্পান্ন, অর্থাৎ তাদের বয়সেরই ব্যবধান ছিল প্রায় চল্লিশ বছরের (রবীন্দ্রনাথ জন্মেছেন ১৮৬১ সালে আর নজরুল তার ৩৯ বছর পর ১৮৯৯ সালে)। এবং সে সময় নজরুলের একটি রচনাও কোথাও প্রকাশ পায়নি। অন্যদিকে নোবেল পুরস্কার নিয়ে নানারকম রাজনীতি ও পক্ষপাতের অভিযোগ থাকলেও, সেটি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে খুব প্রযোজ্য ছিল না। রবীন্দ্রনাথ কাউকে তোষণ করে এই পুরস্কার পাওয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তিনি তার বিরল কাব্যপ্রতিভা এবং প্রাচ্যীয় বা ভারতীয় দর্শনের নিগূঢ় বাণীকে পশ্চিমের কাছে সফলভাবে তুলে ধরেই এমন একটি বিশিষ্ট স্বীকৃতি তার স্বজাতির জন্য বয়ে এনে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এর ছোট্ট একটি যুক্তি হিসেবে আমাদের মনে থাকা দরকার যে, যে-ইয়েটস গীতাঞ্জলির একজন মুগ্ধ পাঠক ছিলেন এবং ইংরেজি সংস্করণের জন্য অসাধারণ একটি ভূমিকা লিখেছিলেন, তিনিও কিন্তু তাঁর আগে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ায় বেশ খাপ্পা হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদিকে এমনও প্রচারণা ছিল যে, রবীন্দ্রনাথ নাকি ষড়যন্ত্র করে নজরুলের সঙ্গে প্রমীলার বিয়ে দেন, এবং তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নজরুলকে পঙ্গু করে দেওয়া। আমাদের শৈশবে এমন ধরনের কথা অনেক শিক্ষককেও বলতে শুনেছি।

দুঃখজনকভাবে, পাকিস্তানি সেই বমন-উদ্রেককারী প্রচারণা আজও আমাদের মধ্যে বহাল আছে, অত্যন্ত যুক্তিহীনভাবেই। পাকিস্তানপন্থীরা তাদের অন্ধত্ব ও মুসলমানিত্বকে এমনভাবে গুলিয়ে ফেলেছিল যে, তাদের নিজেদের স্বার্থপরতা, মূর্খতা আর যুক্তিহীনতাকে ধর্মের ওপর চাপিয়ে দিয়ে স্বয়ং ধর্মকেও কলুষিত করে তুলেছিল। প্রকৃতপ্রস্তাবে তারা পাকিস্তান ও ইসলামকে প্রায় সমার্থবোধক করে তুলেছিল। এসব কারণেই বায়ান্নতে যখন পাক শাসকগোষ্ঠী তাদের আপন ভাইদের হত্যা করল এবং একাত্তরে তাদের মুসলমান ভাইবোনদের নির্বিচারে হত্যা-ধর্ষণে মেতে উঠল, তখনো তাদের কাছে এসব অন্যায় বলে মনে হলো না। অন্যদিকে, বাংলা-বাঙালি এবং হাজার বছর ধরে এই সজল পলিমাটির শিল্প-সাহিত্য-কৃষ্টির বদলে পাকিস্তানি ভিনদেশী সাহিত্য-কৃষ্টিকে পরম জ্ঞান করে আমদানি সংস্কৃতির আশ্রয় নিল। তারা রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু’ জ্ঞান করে পাকিস্তানের ‘মুসলমান’ ইকবালকে প্রতিষ্ঠা করার নানা অপচেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু যে মাটির সন্তানেরা নিজের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে, তারা কবি ইকবালকে যতই সম্মান করুক, অন্ধ পাকিস্তানপন্থিদের নোংরা রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করল। তখন তাদের মনে হলো এই সাম্প্রদায়িক মনোভাব টিকিয়ে রাখার জন্য এখন একজন মুসলমান অথচ বাঙালি কবিকে দরকার। তারা হাতের কাছেই পেল নির্বাক নজরুলকে। আর এসব করতে গিয়ে তারা নজরুলকে সম্মান জানানোর বদলে অপব্যবহার করতে শুরু করল। যে নজরুল সারা জীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়েছেন, ধর্মীয় গোঁড়ামিকে চাবকেছেন, ধর্মনির্বিশেষে মানবতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তারা সেই নজরুল এবং তার দর্শনকে বাদ দিয়ে তাদের মনগড়া ‘মুসলমান’ নজরুলের ওপর হামলে পড়লেন এবং তাকে বিখণ্ডিত করলেন। এসব করতে গিয়ে তারা কবির সৃষ্টির ওপরও চড়াও হলেন। তার রচনায় যা কিছু ‘হিন্দুয়ানি’ ব্যাপার, তা কেটেছেঁটে ‘ইসলামীকরণ’(!) করলেন। এসবের মধ্য দিয়ে নজরুল হলেন যুগপৎ ট্র্যাজিক ও কমিক হিরো। কেননা, তার স্বপ্ন ও চেতনা তাদের হাতেই লাঞ্ছিত হলো, যারা তার কথিত জাতভাই ও অনুসারী। কিন্তু কবি তো দ্রষ্টা, এবং আসল সত্য হলো, নজরুল কিন্তু পাকিস্তান জন্মের কালেই একে ‘ফাঁকিস্তান’ বলে অভিহিত করেছিলেন, আর নির্মমভাবে বাঙালি মুসলমান এটা অনেক রক্ত আর প্রাণ দিয়ে আড়াই দশক পরে বুঝেছে! তাঁর এই দ্রষ্টা-কল্পনার পরও যারা নজরুলকে কেবল ভাব আর আবেগের কবি বলে স্বস্তি বা আনন্দলাভ করেন, তারা যে কোন ভাবে আছেন জানি না। তবে এই ধারা ভাবকল্পনার ফলে আমাদের ক্ষতি বৈ লাভ হয়েছে সামান্যই। শুধু কবিতায় বাঁকবদল নয়, কেবল তার অসামান্য গানের সম্ভার নয়; প্রবন্ধে, অনুবাদে, সাংবাদিকতায়, রাজনীতিতে, শোষণ আর স্বজাতির কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে তার যে লড়াই, স্বদেশকে শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য তার যে পর্বতপ্রমাণ দৃঢ়তা, এসবকে আমরা আজ আর তেমন করে যেন মনেই করতে পারি না। যারা তার ‘রাজবন্দির জবানবন্দী’ পড়েছেন, পড়েছেন তার শেষতম বক্তৃতা ‘যদি আর বাঁশী না বাজে’, নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন একদিকে দৃঢ়তা আর অন্যদিকে আত্ম-অনুসন্ধানের কী গভীর মাত্রা তাতে ছড়িয়ে আছে। আবার যারা তাঁর প্রবন্ধ ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’, অন্যদিকে ‘রুবাইয়াত-ই-হাফিজ’-এর আলোচনা পড়েছেন, তাদের নিশ্চয়ই চোখে পড়ে থাকবে, প্রাচীন গৌরবগাথার সঙ্গে একেবারে হালফিল বিশ্বসাহিত্যকেও তিনি কীরকম যৌক্তিক ও বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অন্বেষণ করেছেন। কিন্তু আমাদের আমজনতা সেই নজরুলকে কেবল কাগুজে ‘জাতীয় কবি’র সম্মান দিয়ে তার এই গুণগুলোকে যেন কবর দিয়ে বসে আছেন।
nazrul1.jpg
খুব সামান্য সাহিত্যজীবনের পুরোটাই তার কেটেছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে। ব্যক্তিগত জীবনে ছিল অপরিমেয় শোক, দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও প্রতারণা; ছিল জেল-জুলুম-নির্যাতন কিন্তু এত সব বাধা ডিঙিয়ে, এত এত কাজ রেখে যাওয়ার ক্ষমতা সম্ভবত খুব কম বাঙালিই দেখিয়েছেন। অন্যদিকে এতটা দৃঢ়তা, আপসহীনতা, সৃষ্টিশীলতা আর নৈতিক শক্তিও সম্ভবত খুব কম বাঙালিরই ছিল (এখনকার কথা বলে আর লজ্জিত হতে চাই না)।

বিশেষত, উপনিবেশবাদ-আক্রান্ত স্বদেশে, দূর বিদেশী-ব্রিটিশ যখন ছিল দণ্ডমুণ্ডকর্তা, যাদের আইন ছিল কেবল নিজেদের স্বার্থ ও শোষণের হাতিয়ার, যখন সামান্য প্রতিবাদেই জেল-ফাঁসি-হত্যা ছিল সাধারণ ঘটনা, এমন এক বিপন্ন ও কণ্ঠরোধী সময়ে, তিনি যে স্বজাতির পক্ষে এমন দৃঢ় নৈতিক ও রাজনৈতিক উচ্চকিত অবস্থান নিয়েছেন, একে খুব সরলভাবে দেখার উপায় নেই।

এই অবকাশে আমরা যেন মনে রাখি, নজরুল কোনো বিশিষ্ট পরিবার থেকে উঠে আসেননি, তার পূর্বপুরুষেরা তার জন্য কিছুই রেখে যাননি, বরং তার যেটুকু অর্জন তা তিনি করেছেন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টা ও সাধনা দিয়েই। কেবল দেশপ্রেম, নৈতিক শক্তি ও ব্যক্তিগত সাহস দিয়ে তিনি যা করেছেন, এ থেকে শিক্ষা নেবার প্রয়োজন হয়তো এ জাতির কখনোই ফুরোবে না।

২.
নজরুল এখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন টিভি-রেডিওর বিশেষ আয়োজন, অধ্যাপক-গবেষক, একাডেমি-ইনস্টিটিউট, আমলা-কেরানিদের হাতে। তার জন্ম-মৃত্যুদিন আমরা এখন অনেকটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো উদযাপন করি। তার কবরে ফুল দিই আর গাই ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’। বড়জোর এক সপ্তাহ, তারপর এক বছরের জন্য ভুলে যাই। তবে স্মরণ একবার হয়েছিল বটে, বছরজুড়ে, ১৯৯৯ সালে, তাঁর জন্মশতবর্ষে, সরকারিভাবে। আর সরকারি ‘স্মরণ’ কেমন হয়, এই রঙ্গভরা বঙ্গদেশে, সে কথা বুঝিয়ে না বললেও চলে। অন্যদিকে নজরুলের বইপত্তর, তার বিষয়ে গবেষণামূলক প্রকাশনা, সামান্য কিছু বাদে, সহজে পাওয়া বড় কঠিন। বাংলা একাডেমী অর্ধশতাব্দী ধরে বহু অপ্রয়োজনীয় বই প্রকাশ করলেও, একটা কারণে বিশেষভাবে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য, তা হচ্ছে তারা খুব সুলভ মূল্যে এই জাতিকে নজরুল-রচনাবলি উপহার দিয়েছিল। অন্যদিকে ধানমন্ডির কবিভবনে একটি সরকারি নজরুল ইনস্টিটিউট আছে এবং তারা নজরুলকে নিয়ে সুপ্রচুর কাজ করেছে। কিন্তু প্রকাশনায় তাদের যতটা আগ্রহ, এগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে বোধহয় ততটাই অনাগ্রহ। কারণ, তাদের দরবার ছাড়া এসব বইপত্র দেশের বইয়ের দোকানগুলোতে পাওয়া বেশ কঠিন। খোদ রাজধানীতেই পাওয়া যায় না, অন্য জায়গায় তো পরের কথা। তা এই বিস্মৃতপ্রবণ বাঙালির কতজনেরই বা এত দায় যে, তারা বহু সময় ও অর্থ খরচ করে নজরুলের জন্য ধানমন্ডিতে গিয়ে এসব বইপত্র খুঁজে খুঁজে গিয়ে পড়বেন! আবার ওখানে গেলেও যে খুব সহজে বইপত্র বা সাহায্য পাওয়া যাবে এমন ভরসাও অনেকে পান না। এই ইনস্টিটিউটটি কেবল একুশে বইমেলায় একটি স্টল দিয়ে দায়িত্ব পালন করে। অথচ তারা যদি দেশের প্রতিটি জেলাসহ ঢাকায় কয়েকটি পরিবেশক নিযুক্ত করত কিংবা প্রতি বছর ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ ছাড়ের বইমেলা করত, তাহলে নজরুল অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতেন। কিন্তু এই পোড়ার দেশে সহজ কাজটাই যে বড় কঠিন! গুদামঘরে গুমরে মরা ছাড়া নজরুল আর কী করবেন?

এভাবেই কতকটা সজ্ঞানে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, কতকটা অজ্ঞানে এবং আমাদের দৈন্যদৃষ্টির কারণে নজরুল ক্রমশ একটি অবাস্তব রূপকথা কিংবা দূর অতীতের গল্পে পর্যবসিত হচ্ছেন, যেন এই সময়ে তার আর কোনো বাস্তব মূল্য নেই!

এমনকি তার উত্তরসূরি কবিরা, যারা প্রায় সবাই উপনিবেশী শিক্ষালালিত এবং অনেকাংশে উপনিবেশের চেতনাদাস, তারাও নজরুলের দর্শনকে প্রাচীন ও বাতিল বলে শিকেয় তুলে রেখেছেন। তাকে নিয়ে ভাবলে যেন তারাও ‘ব্যাকডেটেড’ হয়ে পড়বেন। তাদের অনেকেরই আবার পশ্চিমা সাহিত্যের প্রতি অন্ধপ্রীতি। শেক্সপীয়র-দান্তে-মিল্টন কয়েকশ বছরের প্রাচীন হলেও তাদেরকে একুশ শতকেও জীবিত রাখেন, মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথকে খানিক পাত্তা দেন, আর নজরুলকে সম্ভবত হাজার বছর আগে মৃত বলে ভাবতে পছন্দ করেন। আমার ঘোরতর সন্দেহ, এরা অনেকেই আসলে নজরুল-রচনার অনেকটা দূরে থাক, সামান্যও পড়েননি। ওদের বক্তব্য অনেকটাই পরের মুখে ঝাল খেয়ে অভিজ্ঞতা লাভের মতন। অন্যদিকে আমাদের কথিত প্রগতিশীলদের অবস্থাও খুব সুবিধের নয়, মাঝে মাঝে নজরুলকে তাদের মনে পড়লেও, ‘মোল্লা-পুরুত’দের হাতের সম্পত্তি বানিয়ে দিয়ে নিজেরা বসে বসে ঝিমুচ্ছেন।

৩.
এটা ঠিক, নজরুল যে ভাষায় কবিতা লিখেছেন, যেভাবে লিখেছেন, কালের গতির কারণে, তার প্রয়োজন হয়তো ফুরিয়েছে। থাকলেও সে ভাষায় কেউ নতুন করে সৃষ্টিশীলতার চর্চা করবেন না, করা উচিতও নয়। কিন্তু তার বিষয় আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। তার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার পৃথিবী আজও দূরগামী। যদিও এর মধ্যে একটি শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, এবং এই ভূখণ্ডের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-ভৌগোলিক অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু আজও ক্ষুধা, শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন সমানে চলছে। স্বাধীনতার সাধ মিটেছে বটে এই ভূখণ্ডের ভুখা-নাঙা মানুষগুলোর, কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ তাদের আস্বাদন করা হলো না আজ অবধি। বরং নতুন মাত্রার অদৃশ্য পরাধীনতা ও দাসত্ব গ্রাস করে চলেছে আমাদের। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণবিরোধী রাজনীতি, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ আর নানাভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে পিছিয়ে দেবার অপচেষ্টা।

৪.
কিন্তু উপনিবেশের কালে যেমন, এই নব্য-উপনিবেশের কালেও নজরুল আমাদের জন্য খুব দরকারি। এ কেবল নয় তার আবেগকে গ্রহণ, বরং তার সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তিনি যে প্রবহমান চেতনা আমাদের জন্য রেখে গেছেন, একে পাঠ ও অনুধ্যানে আমরা পেতে পারি বর্তমান এই দুঃসময়কে অতিক্রম করার যুক্তি, সাহস ও শক্তি।

আজকের এই নতুন পৃথিবীতে বিশ্ব যখন শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিকতা, নারীমুক্তি আর উন্নত চিন্তা নিয়ে এগিয়ে চলেছে; ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদকে ধিক্কার জানাচ্ছে; তখন তারই স্বদেশ যেন মধ্যযুগের অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলেছে। অথচ কত কত কাল আগে নজরুল এগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, তার কলম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এসবের মূলোপাৎটন করতে চেয়েছেন।

আমরা কি তার কাছ থেকে এগুলো শিখব না? এগুলোর সুষ্ঠু প্রয়োগ করে দেশ ও জাতিকে রাহুমুক্ত করব না? নাকি কেবল তাকে কাগুজে আর ‘পণ্ডিত’দের রোজগারের ফিকির করেই রাখব? এই একঘেয়ে আর নকল ভক্তি আর কতকাল?

বাংলাদেশের এ দুঃসময়ে এই দ্রষ্টাকে প্রকৃত পাঠ ও অনুভব আমাদের নতুন পথের দিশা হয়তো খুব সহজেই দিতে পারে, যদি আমরা সত্যিই তা পেতে চাই।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মতিউর রহমান শুভ — মে ২৫, ২০১৩ @ ১২:১০ অপরাহ্ন

      আপনার লেথা পড়ে অনেক ভালো লাগল। আমিও কজন সাহিত্যপ্রেমী কিন্তু নজরুলের প্রতি একটু বেশী্ । আপনার অনুভূতি” নাজরুলকে আমাদের আজও অনেক বেশী প্রয়োজন” এটার সাথে একমত। তবে বর্তমানে কেন জানি কবি সাহিত্যিকরা একটু অনুগত ধরনের হয়েছে। জানিনা কষ্ট পেলেন কিনা। যদি পেয়ে থাকেন তাহলে স্যরি বলা ছাড়া আমার কিছু করার নাই। আমি শিক্ষক এবং কবি সাহিত্যিকদের অনেক শ্রদ্ধা করি আর তাদের উচ্চ মর্যাদাসন কামনা করি। কিন্তু তারা তাদের নিজের আসন নষ্ট করেছে। তাই নজরুলকে বাস্তব চেতনায় ধারণ করা দরকার । তাহলেই সমাজকে কিছু দেয়া সম্ভব বলে মনে হয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — মে ২৫, ২০১৩ @ ৪:০৬ অপরাহ্ন

      প্রিয় সৈকত হাবিব, আপনার সারগর্ভ লেখনি পড়িয়া যারপর নাই মুগ্ধ হইলাম। নজরুলকে নতুন করিয়া ভাবিবার একাধিক ইঙ্গিত দিয়াছেন। এখনো যখন সাম্প্রদায়িকতার ধোঁয়ায় আমরা আচ্ছন্ন, বৈষম্যের কষাঘাতে জর্জরিত, তখন নজরুলকে আমলে না লওয়া মূর্খতার নামান্তর বৈকি। আমাদের ধ্যানে, জ্ঞানে, চিন্তনে নজরুলকে ধারণ না করিলে আমরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্থ হইবো। তাই আপনার মত করিয়া বলিতে চাই, ‌”নজরুলকে বাস্তব চেতনায় ধারণ করা দরকার”।
      আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা এবং ধন্যবাদ।

      মানিক মোঃ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — মে ২৫, ২০১৩ @ ৮:০৬ অপরাহ্ন

      সৈকত হাবিব “নজরুলের কাগুজে চর্চা আর কতকাল?” লিখে বাঙালি হিসেবে আমাদের অবিমৃশ্যকারিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনাটিকেও যদি আমরা যথাযথভাবে লালন করতে পারতাম, তবে জাতি আজ অনেকদূর এগিয়ে যেতো। হাবিবের ভাবনা যৌক্তিক, সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। সাবলীল গদ্যে তিনি বিবৃত করেছেন নজরুলকে নিয়ে রাজনীতির কথা, তার প্রতি আমাদের অবহেলার কথা, তাকে নিয়ে আমাদের সম্ভাবনার কথা। নজরুলের মেকি চর্চা নয়, আমরা চাই সত্যিকারের চর্চা। কেবলমাত্র জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে বসে থাকলে হবে না, তাকে পৌঁছে দিতে হবে প্রতিটি বাঙালির কাছে, পুস্তকে-সঙ্গীতে-নাটকে-আলোচনায়, সাংবাৎসরিক হয়, সার্বক্ষণিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com