আন্তর্জাতিক গ্রন্থদিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

সুব্রত বড়ুয়া | ২১ মে ২০১৩ ৯:২৫ অপরাহ্ন

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ২৮তম সাধারণ সম্মেলনে ২৩ এপ্রিল দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থদিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। এই তারিখটি তারা বেছে নিয়েছিলেন কারণ ২৩ এপ্রিল তারিখটি ইউরোপের তিন কালজয়ী কবি ও কথাসাহিত্যিকের মৃত্যুদিবস। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে ইংল্যান্ডের উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, স্পেনের মিগেল দে সের্বান্তেস্ এবং ইনকা গার্সিলাসো দে লা ভেগা প্রয়াত হন। নিশ্চয়ই আমাদের বিনা বাক্যব্যয়ে স্বীকার করতে হয় যে, আন্তর্জাতিক গ্রন্থদিবস হিসেবে নির্বাচনের জন্য এমন তারিখের খুব কম বিকল্পই পাওয়া যাবে। ইউনেস্কোর অধিবেশনে এই তারিখ নির্ধারণ উপলক্ষে যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় তাতে প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে বলা হয়েছিল :

i. historically books have been the most powerful factor in the dissemination of knowledge and the most effective means of preserving it.

ii. all moves to promote their dissemination will serve not only greatly to enlighten all those who have access to them, but also to develop fuller collective awareness of cultural traditions throughout the world and to inspire behaviour based on understanding, tolerance and dialogue,

iii. One of the potentially most effective ways to promote and to disseminate books as shown by the experience of several UNESCO Member states is the establishment of a ‘Book Day’ and the organization of events such as book fairs and exhibitions on the same day.

ইউনেস্কোর প্রস্তাবের এই তিনটি অংশের বিষয় অনুধাবনের চেষ্টা করলে আমাদের বুঝতে মোটেই কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, গ্রন্থদিবস উদযাপনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞানের সর্বজনীনতার মাধ্যম হিসেবে বইয়ের ভূমিকাকে আরও ফলপ্রসূ করে তোলা। বিশ শতকের শেষ দশকের মধ্যভাগে এসে জাতিসংঘের এই সংগঠনটির এমন উদ্যোগ গ্রহণের পেছনে এমন আশঙ্কাও হয়তো কাজ করতে পারে যে, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ ও বিশ্বব্যাপী তার উত্তরোত্তর অধিক ব্যবহারের ফলে মানবসমাজে বইয়ের প্রয়োজন ও ব্যবহার দুই-ই ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকবে। আর শুধু হ্রাস পাওয়া নয়, একসময় হয়তো তা ফুরিয়েও যাবে। আমরা এখনও অন্তত অনেক সৌভাগ্যবান যে, সে আশঙ্কা নির্মমভাবে সত্য হয়ে যায়নি এবং বই বিরল তবে, আমার মনে হয়, সে বিষয়ে শেষ কথা বলার অবস্থানে আমরা এখনও পৌঁছে যাইনি। প্রযুক্তি আমাদের জন্য আরও কী কী বিস্ময় নিয়ে আসছে তা আমরা এখনই বলে দিতে পারি না।

আমরা অবশ্য ইচ্ছে করলেই ভুলে যেতে পারি না যে, বইয়ের পেছনেও রয়েছে মানুষের কারিগরি উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অবদান। কাগজ আবিষ্কারের ইতিহাস মাত্র প্রায় দুহাজার বছরের; আর বই ছাপানোর ইতিহাস মাত্র প্রায় বারো শ’ বছরের। মুদ্রণ প্রক্রিয়া আবিষ্কৃত হওয়ার আগেও যেমন বই লেখা ও পড়া হত, তেমনি কাগজ আবিষ্কারের আগেও বই লেখা হত এবং তা পড়াও হত। সে অর্থে, বই মানুষের বহু পুরনো সঙ্গী– যে সঙ্গী ভৌত অবস্থানের দিক থেকে মানবশরীরের বাইরের জিনিস হলেও মনের দিক থেকে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠতে পারে। আর সে অস্তিত্ব শুধু মানুষের বর্তমান নয়, তার পরিসর অতীত ও ভবিষ্যৎ– এই দুই দিকেও প্রসারিত। কিন্তু সেখানেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। সব মানুষের কাছেই কি বই এমনভাবে অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত? এ প্রশ্নের উত্তর হাঁ ও না– এই দুটিই হতে পারে।

যে মানুষ পড়তে জানে না এবং সে কারণে লিখতেও জানে না তার কাছে বইয়ের উপস্থিতি কেবলমাত্র একটি বস্তু হিসেবে, বড় জোর বিস্ময়ের বস্তু হিসেবে, অন্য কোনোভাবে নয়। এটি ব্যক্তিমানুষের ক্ষেত্রে সত্য, কিন্তু সামাজিক মানুষের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের নাগরিক মানুষের ক্ষেত্রে? যে মানুষ লিখতে বা পড়তে তার বেঁচে থাকার মধ্যেও তো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বইয়ের একটি ভূমিকা থেকেই যায়।

ইউনেস্কোর অষ্টবিংশতিতম সাধারণ সম্মেলনের প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে ঐতিহাসিক বিবেচনার দিক থেকে বই হচ্ছে জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম এবং জ্ঞান সংরক্ষণের সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায়। জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর সর্বপ্রকার উদ্যোগ তাই যাদের জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের অধিকার আছে তাদেরই কেবল অনেকখানি আলোকিত করবে না, বরং বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক সর্বজনীন সচেতনতা পূর্ণতর করার ক্ষেত্রেও যেমন সাহায্য করবে, তেমনি পারস্পরিক সমঝোতা, সহনশীলহতা ও আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে আচরণের বিষয়টিকেও উদ্দীপ্ত করবে। এ জন্যই গ্রন্থদিবসের সৃষ্টি এবং সে জন্য কী কী করণীয় তার উপায়ও কিছু কিছু ইউনেস্কো বলে দিয়েছে। তবে ইউনেস্কো যা বলে দেয়নি এবং বলে দিতে পারেনি তা হলো গ্রন্থদিবসে শেষ পর্যন্ত আমরা কী কী করব এবং করতে পারব।

মুদ্রিত গ্রন্থ প্রচলনের বহু আগে থেকেই মানুষ বই লিখেছে, বই পড়েছে এবং সেসব বইয়ের খোঁজ নিতে এবং প্রয়োজন ও সাধ্যমতো নকল করে নিয়ে যেতে, আক্ষরিক অর্থেই, পর্বতসঙ্কুল দুর্গম ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে ভিন্ন দেশে ভিন্ন মানবগোষ্ঠী ও ভিন্ন মানবসংস্কৃতির জগতে ছুটে গেছে, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে কী অসীম দৈর্যের সঙ্গে সে বই নকল করেছে এবং আবারও একই কষ্ট সহ্য করে সেই নকল করা বই নিজের দেশে নিয়ে গেছে, আর নিয়ে যাওয়ার পর তা অনুবাদ করেছে নিজের ভাষায়। অবশ্যই শেষ পর্যন্ত এই কাজ বিশ্বমানবের জ্ঞানের ভা-ারকেই সমৃদ্ধ করেছে এবং মানুষের চিন্তা ও সাধনাকে, বহু ক্ষেত্রে, অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেছে। এমনও তো ঘটেছে, মূল বইটি যে দেশের ছিল তা সেখানেই ফিরে এসেছে পরে সেই অনুবাদ থেকেই। বইয়ের মাধ্যমে এভাবে জ্ঞানের বিস্তার ও প্রসার অবশ্যই কোনো নতুন কথা নয়। ইউনেস্কো যে জ্ঞানপ্রবাহের ক্ষেত্রে বইয়ের প্রধান ভূমিকার কথা বলেছে তা মূলত বইয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে একালে যে সঙ্কটের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ার কথা উঠেছে, তার প্রতি লক্ষ্য রেখেই।

আমাদের কিশেষভাবে মনে রাখা উচিত হবে ইউনেস্কোর প্রস্তাবে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে dissemination of knowledge কথাটির উপর। আর এই dissemination of knowledge কিন্তু কিছুতেই শুধু তথ্যের আদান-প্রদান কিংবা তথ্য সংরক্ষণ নয়, যা ইদানীং আমরা অনেক ক্ষেত্রে ‘জ্ঞান’ কথাটি বুঝাতে বা বুঝতে ব্যবহার করার দিকে ঝুঁকছি বলেই জ্ঞানের পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণের জন্য প্রলুব্ধ হচ্ছি। তথ্য মূলত জ্ঞানেরই একটি অংশ মাত্র, সম্পূর্ণ জ্ঞান নয়। সে জন্যই ইউনেস্কোর প্রস্তাবের উদ্ধৃত দ্বিতীয় অংশে ’to develop fueller collective awareness of cultural traditions throughout the world and to inspire behaviour based on understanding, tolerance and dialogue’ কথাগুলি এসেছে। কেন এসেছে? না, understanding, tolerance ও Dialogue-এর ভিত্তিতে যেন আমাদের আচরণ পরিচালিত হয়; অন্ধতা, অসহিষ্ণুতা ও অনবধানতার ভিত্তিতে যেন না হয়। অর্থাৎ বই যেমন আমাদের জ্ঞানভা-ারকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে জীবনধারণের প্রক্রিয়াকে সাহায্য করবে, তেমনি জীবনবোধকে পরিশীলিত করার মাধ্যমে জীবনচর্চাকে মহৎ করবে। বলা হয়েছে collective awareness-এর কথাও। অর্থাৎ কেবল একক ব্যক্তিসত্তা নয়, সামাজিক ও সামূহিক সত্তার মধ্যেও সচেতনতা জাগিয়ে তুলবে বই।

কেন? কারণ, তা না হলে– একক মানুষের ভূমিকা একটি ক্ষুদ্র পরিসরেই শুধু সীমিত থাকবে, বিশ্বজনীন মানবসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে সামাজিকভাবে মহৎ সংস্কৃতি ও জীবনচর্চার সুযোগ পাবে না। সে জন্যই উদ্ধৃত অংশের তৃতীয় ভাগে ’Book day’ উদযাপন উপলক্ষে গ্রন্থের প্রদর্শনী ও বইমেলার মতো অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বই সম্পর্কে মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে হবে, বইয়ের কথা তাকে জানাতে হবে, বইয়ের জগতে যে অশেষ আনন্দ ও সৌন্দর্য আছে সে তথ্য তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

ভাবতে ইচ্ছে করে ইউনেস্কোর প্রস্তাবে এসব উদ্যোগ গ্রহণের কথা কেন বলা হয়েছে। একালের মানুষ প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য আহরণের সুযোগ পাওয়ার পর বইয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা আছে বলেই কী?

২.
অক্ষর পরিচয় কিংবা বই পড়ার মতো ভাষাজ্ঞান অর্জিত হলেই যে মানুষ বই পড়বে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমাদের চারপাশে আমরা যা দেখতে পাই তার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি বই পড়া তো দূরের কথা, বই নাড়াচাড়া করতেও তো তেমন একটা দেখি না। বইয়ের প্রতি, বই পড়ার প্রতি বই পড়ানোর প্রতি আমাদের চারপাশের মানুষজনের এই চরম অনাগ্রহের জন্য তাদেরই কেবল দায়ী করব– এমন হওয়া উচিত নয়। বই পড়ার বা পড়ানোর আগ্রহ যে মাত্র একদিনে তৈরি হয় তাও নয়। যে কোনো মানুষের বই পড়ার অভ্যেস গড়ে ওঠার পেছনে দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার একটা প্রস্তুতি তো থাকতে হবেই।

আমার নিজের এই প্রস্তুতি ও অভ্যাসের কথা একটু বলি এখানে। বাড়িতে সামান্য কিছু ছোটদের ও বড়দের বই ছিল। বই পড়ার মতো অক্ষর ও ভাষাজ্ঞান রপ্ত হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যে বইগুলো পড়তে শুরু করি, তার সবগুলো যে সে বয়সে পড়ার উপযোগী ছিল তাও নয়। কিন্তু সেগুলোই অবসর ও সুযোগমতো বারবার পড়েছি। আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তাতে মানসিকভাবে ইঁচড়ে পেকে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল; কিন্তু যথেষ্ট প্রয়াস সত্ত্বেও তা বোধহয় ঘটেনি।

নয় বছর বয়সে এসে চট্টগ্রাম শহরের একটি স্কুলে ভর্তি হই। সে স্কুলের একেবারে গা ঘেঁষেই ছিল কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটির এক বিশাল বইয়ের দোকান। পরিচ্ছন্ন বিশাল পরিসর। আলমারি ঠাঁসা বই। সেই দোকানটি ছিল আমাদের এক বিশাল আকর্ষণের স্থল। ছোটদের বই বা পত্রপত্রিকা যে সেখানে খুব বেশি ছিল তা নয়। কিন্তু সেখানে গেলেই মনে হত কী বিশাল এক সুন্দরের জগতে এসে পড়েছি। তেমন বইয়ের দোকান এ জীবনে আর কখনও চোখে পড়েনি। চট্টগ্রাম শহরের এই সুন্দরের জগৎটি বহু আগেই অবলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু আমার নিজের মধ্যে রেখে দিয়ে গেছে বইয়ের প্রতি ভালোবাসার এক অতৃপ্ত বাসনা। স্বদেশে কি বিদেশে, রাজধানী ঢাকা কি ঢাকার বাইরের অন্য কোনো শহরে বইয়ের দোকান দেখলেই ঢুকে পড়ি। প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনার কথা বলি।

আজ থেকে প্রায় চুয়াল্লিশ বছর আগের কথা। বিকেলে সিডিএ ভবনের সামনে দিয়ে হেঁটে আসছিলাম সরকারি মুসলিম হাই স্কুলের দিকে। বিশিষ্ট নাট্যজন মমতাজউদ্দীন আহমদ রিকশা করে আসছিলেন। দেখতে পেয়ে রিকশা থামালেন।

বললেন, “উঠে এসো।”

স্টেশন রোডে তখন একটি বইয়ের দোকান ছিল– রিডারস্ চেম্বার। সেখানে গিয়ে ঢুকলেন। দোকানটি থেকে খুঁজে খুঁজে একটি বই হাতে নিলেন। সেটি কনলেন। বললেন, “প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারির দিন আমি কমপক্ষে একটি বাংলা বই কিনি।”

সেদিন ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। আজ ভাবি একুশে ফেব্রুয়ারির দিন অন্তত একটি বাংলা বইও যদি আমরা সবাই কিনতাম, তাহলেও বই ও ভাষার প্রতি, দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর দায়িত্বটা বুঝি হয় তো কিছুটা পালন করা হত।

তবে সত্য এই যে, অত সহজে দায়িত্ব পালনের কাজটা শেষ হয়ে যায় না। ইউনেস্কোর আহ্বান সে জন্যেই। বই কোনো বিনোদনের বস্তু নয়, যদিও বই বিনোদনের ভূমিকাও যথেষ্ট পালন করে। স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে একটি ছবি।

বর্ষাকাল। সন্ধে হয়ে গেছে। বৃষ্টি পড়ছে একটানা, তবে খুব জোরালো নয়। বাড়ির ভেতরের লম্বা বারান্দায় হারিকেনের আলোয় একটি বই থেকে জোরে জোরে পড়ে যাচ্ছেন আমার এক জ্যেঠতুতো দাদা। তিনি বাড়ির চাষবাসের কাজ করতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষধাপ পর্যন্ত ছিল তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া। তিনি পড়ছিলেন একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। তাকে ঘিরে যে কয়েকজন শ্রোতা তাদের কারও অক্ষরজ্ঞানও নেই– বাড়ির বয়স্ক মহিলা সবাই। তারা নিবিষ্টচিত্তে শুনছেন সেই বই পড়া। শুধু একদিন নয়, প্রায় প্রতিদিনই এই বই পড়ার আসর বসে। এই ছবিটা এখনও খুব উজ্জ্বল হয়ে ফিরে আসে স্মৃতিতে, যখন বই পড়ার কথা ওঠে। আবহমান বাংলার গ্রামগুলোতে পুঁথিপাঠের আসরে যে জমজমাট পুঁথিপাঠ চলত সে কথাও-বা ভুলে যাই কী করে!

সময় কখনও অতীতে ফিরে যায় না– সে আমরা এইচ.জি. ওয়েলস-এর টাইম মেশিন’-এর আরোহী হতে পারি কি, না পারি। আমাদের চোখের সামনেই কী অভাবনীয়ভাবেই না বিনোদনের ধরনগুলো কেমন দ্রুত পাল্টে গেল। সাময়িকপত্রে ধারাবাহিক উপন্যাসের জগতে ডুবে থাকার পরিবর্তে হিন্দি-বাংলা সিরিয়ালের বর্ণিল ছবিই এখন সময় কাটানোর মোক্ষম হাতিয়ার। সেখানে গল্পের গরু ঘরের চালে উঠে পড়লেও চোখ ফিরে আসে না। অতি নিম্নমানের রসিকতাও সহনীয় হয়ে উঠতে দেরি হয় না। রুচির এমনি পরিবর্তন ঘটে ধীরে ধীরে যে সহজে টের পাওয়া যায় না। এটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তির কারণেই ঘটে শুধু এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। সম্ভবত বাণিজ্যের একটি বড় প্রভাব থাকে সেখানে। মুনাফাই মুখ্য। তাকে শিল্প-সাহিত্যের মোড়কে মুড়ে দেওয়াটা যতখানি সম্ভব।

বই লেখা, বই প্রকাশ করা, বই বিক্রি করা তার মধ্যে বাণিজ্যের ছোঁয়া যে নেই সে কথা হলফ করে বলতে পারব না। কিন্তু বাণিজ্যটা সেখানে মুখ্য নয়, উদ্দেশ্যও নয়। বই যারা প্রকাশ করেন তাদের সেখানে বিনিয়োগ থাকে, মুনাফার বিষয়টিও থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কী লেখক, কী কবি, কী প্রাবন্ধিক তারা কেউ বাণিজ্যের কথা মনে রেখে লিখতে শুরু করেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অধিক প্রচারসংখ্যার বিষয়টি লেখক প্রকাশক পরিকল্পনাকারীর ভাবনার মধ্যে থাকে বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটেই নয়। তাই বিপণন কার্যক্রম, পাঠকের হাতে পৌঁছানো ইত্যাদির মধ্যে বাণিজ্যিক প্রয়াস থাকলেও লেখকের বিবেচনায় অধিক বইয়ের ক্ষেত্রে, অন্তত আমাদের দেশে, বাণিজ্য প্রধান বিষয় নয় বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু বাণিজ্যিক প্রকাশককে তো বাণিজ্য এবং মুনাফার কথা ভাবতেই হবে। তখন ভালো বই প্রকাশ করার পরিবর্তে চালু বই প্রকাশের দিকে তার প্রবণতা বেশি থাকবে সেটিই স্বাভাবিক। সে জন্যই আমার মনে হয়– সামগ্রিকভাবে বইয়ের কথা ভাবতে গেলে এসব বিষয় সার্বিকভাবেই মাথার মধ্যে রাখতে হবে, বিবেচনায় আনতে হবে। অন্যথায় প্রকাশনার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হতে বাধ্য। বই যদি বিক্রি না হয়, পাঠকের হাতে যদি না পৌঁছায়, তাহলে বই লেখার ও প্রকাশের মূল উদ্দেশ্যই তো ব্যর্থ হয়ে যায়। বই যখন বাজারে যায়, তখন সেটিও একটি পণ্য, বিপণনের নিয়ম তখন বইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাঠক যদি বইয়ের খবরটিই না পায়, তাহলে তার মধ্যে সে বই পড়ার বা কেনার আগ্রহই তো সৃষ্টি হবে না। আমাদের বই বিপণন ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা এই যে, নতুন বইয়ের খবর পাঠক বা ক্রেতাকে জানানোর সুষ্ঠু উপায় বা কার্যক্রম আমরা তৈরি করতে পারিনি। গ্রন্থদিবসের ভাবনার মধ্যে এ কথাটিও থাকা উচিত বলে আমার মনে হয়।

৩.
ইউনেস্কোর উদ্ধৃত প্রস্তাবের তৃতীয় ক্রমিকে খুব স্পষ্টভাবে বইয়ের প্রদর্শনী ও বইমেলার কথা বলা হয়েছে। প্রতি বছর মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলার আয়োজন ছাড়াও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং কিছু কিছু বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে আমাদের দেশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। একুশের বইমেলাই আমাদের প্রধান বইমেলা এবং সৃজনশীল প্রকাশনার সিংহভাগই এই মেলা উপলক্ষে ও মেলা চলাকালে প্রকাশিত হয়ে থাকে। প্রতিদিন মোড়ক উম্মোচনের যে আয়োজনগুলো হয়ে তার সংখ্যাও অনেক। কিন্তু এ বইমেলায় বর্তমানে বইয়ের হদিশ নিতে যাওয়া বিড়ম্বনার নামান্তর মাত্র।

অনেক সময় মনে হয়, কেবল বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো জন্যই কিছু বই প্রকাশ করা হয়। সেসব বইয়ের না আছে কোনো মান, না নাছে কোনো প্রয়োজন। একুশের বইমেলার মূল উদ্দেশ্য, আমার যা মনে হয়, বইয়ের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে আমাদের প্রকাশনার ক্রমোন্নতি সাধন করা ভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধি অর্জন করা এবং কূপমণ্ডুকতা ও চিন্তার জড়তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নিজেদের তৈরি করা। আমরা জানি না– সে উদ্দেশ্য অর্জনে একুশের বইমেলার প্রকাশনা সত্যি সত্যি কতটা সহায়ক নয়, কিংবা আদৌ সহায়ক হয় কি না। বইমেলায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য, আমার জানা মতে, একসময় নতুন প্রকাশনা ও মোট প্রকাশনার সংখ্যা অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল। আজ হয়তো তার আনুষ্ঠানিকতাটুকুই শুধু আছে, পর্যালোচনা মোটেও নেই। আমি মনে করি, প্রতি বছর এই বইমেলা আয়োজনের বিভিন্ন দিক, মেলা শেষ হওয়ার পর পর্যালোচনা করা উচিত, যাতে বুঝতে পারা যায়, মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত বইয়ের মান কেমন, বিষয় বৈচিত্র্য কতটা আছে, পাঠকের চাহিদা কেমন এবং ভালো বইয়ের প্রচার-প্রসারের উদ্যোগ ভবিষ্যতে কীভাবে নেওয়া যেত। এ কাজ গতানুগতিক ও দায়সারা গোছের হওয়া উচিত নয়। পরিসংখ্যানমূলক উপাত্ত ব্যবহার করা সম্ভব হলে আরও ভালো হয়। সেই সঙ্গে এ কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে বইয়ের প্রদর্শনী আয়োজনের কাজটা কীভাবে সফল করা যেতে পারে। আর ভিন্ন ভাষার নানারকম বইয়ের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ঘটানোর কাজটির কথাও কি বিবেচনায় রাখা উচিত হবে না?

আন্তর্জাতিক গ্রন্থদিবসে এসব ভাবনা মনে আসে বৈকি। গ্রন্থদিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তাতে প্রতিফলিত হয় কি না জানি না।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবদুল্লাহ — মে ২২, ২০১৩ @ ৩:১০ অপরাহ্ন

      বাঙালির বই পড়া কমে যাওয়ার পিছনে হিন্দী-বাংলা সিরিয়ালের কথাটাই মনে আসল আপনার, কিন্তু যে আরবীয় দর্শন বই পড়তে বাধা দেয়, চিন্তা করতে নিষেধ করে, তার চাষাবাদ যে দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। পাড়ায় পাড়ায় এখন আর পাঠাগার নেই, আছে মসজিদ। এই বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন কি আর আপনার চোখে পড়ল না?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইফতেখার ইকবাল — মে ২২, ২০১৩ @ ৪:৪৯ অপরাহ্ন

      খুব ভালো লাগলো। ধন্যবাদ লেখককে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com