ঢাকার কবিতা

মেসবা আলম অর্ঘ্য | ১৭ মে ২০১৩ ৪:২১ অপরাহ্ন

নিরানন্দের প্রশ্ন

নিরানন্দের প্রশ্ন বর্তুলাকার
এবং নিরানন্দের প্রশ্ন উদয়
কেন হে
বারান্দা টেনে লম্বা করো
আদি মাড়ের গন্ধ ভাসাও নতুন মাড় থেকে

যেহেতু নিরানন্দের প্রশ্নে একের ভিতর বহু কিছুর সম্ভাবনা আছে
তোমার আমি তোমার কল্পনার
বনের মধ্যে নগ্ন যুগল
ব্যালকনিতে নগ্ন যুগল

আজিমপুর গোরস্থানে ১

আজিমপুর গোরস্থানে লাশ যাচ্ছে
গোলাপ জল জরি
নতুন তোলা কবরের মাটিতে পূর্বাপর
হাড্ডি দেখা যায়
দুধ ছাড়া চা খাওয়া যায় না – কষ্টা লাগে

ফুটপাথে নবজাতক
এখনো ওর কাঁধ ফোটেনি
ফুটপাথের পাশ দিয়ে লাশটি গোরস্থানে ঢুকে যাওয়ার পর
আমি চায়ে আরেকটু দুধ মিশাতে বললাম

আজিমপুর গোরস্থানে ২

পড়ন্ত বিকালবেলা কবর জিয়ারতে আসা মানুষ
আগরবাতির মতো শুনশান
পড়ন্ত স্মৃতি
কাতরতা যেন ভ্রান্তির আগের অবস্থা
স্মৃতি কোমল রোদ কোমল রোদ স্কন্ধ
জরিকাতর
হাত, গোরখোদকের হাতে ফুলগাছ ভাল হয়
সব কবরে ফুলগাছ নাই

আমি আগরবাতির চওড়া স্কন্ধে
ক্ষুদ্র একটা স্মৃতির মতো ঢুকে পড়লাম
আজিমপুর গোরস্থানে বিকাল বেলা
অন্য মানুষের স্মৃতি

ঢাকা মেডিকেলে মেলাংকলি

ঢাকা মেডিকেলে মেলাংকলি
শক্ত এবং ডিপ্রেসড – অর্থাৎ মেলাংকলি
ব্যাগ থেকে নেমে আসা নল
দুলতে দুলতে মিশে যায় ভিড়ের ভিতর
করিডোরে
করিডোর কোনটা কোনদিক?
বিশাল ওয়ার্ড চুইয়ে নামছে নবজাতক শিশু

এত এত নব্যপিতা – এত রোদ -ফিনাইল কাদা জরি
রোদের বিপরীতে
এক্স্ রে প্লেটের মতো মেলে ধরে আমাকে মেলাংকলি!
আলাপ করে নিজের ভিতর
নিজের ভাষ্যে
আমার সোডিয়াম পটাশিয়াম বলাবলি করে

১০১ প্রেমের কবিতা

নিউমার্কেট মিনারের মতো ১০১ প্রেমের কবিতা
সোনার দোকানে, কাতান বিপনীতে
বাচ্চাদের ট্রাইসাইকেল, নিজেকে কনফিডেন্ট রাখার ১০ টি উপায়
ডিসপেন্সারি
ফুচকার দোকানে তরুণ তরুণী
প্যাচানো আইস্ক্রিম
প্যাচানো আলাপের জন্য বরাদ্দকৃত আইস্ক্রিম হাতে তাকিয়ে আছে
এইসব অদৃশ্য খটকার দিকে

সিনেপোস্টার

সিনেমা দেখবি সিনেমা দেখবি সিনেমা দেখবি
সিনেমা দেখলাম না
সে ফুলার রোডে পুরান চাদর
পলাশীতে পুরান চাদর তের বছর লম্বা
একটা একটা ক্ষমা
আমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে পরিষ্কার, রগরগে
সিনেপোস্টারের উপর ছিন্ন ভিন্ন সিনেপোস্টারের দিকে

অপেক্ষা

সন্তাপ ভাসে অপেক্ষা
মহাবাক্য অঙ্গরাখা
সন্তাপ ভাসলো চারুকলায়
কদমাবিপণি
ওই মেয়ে কীসের ছবি আঁকে?
আমি তো গিয়ে দেখতে পারি – আলাপ করতে পারি
যেন আমি তুলা
যেন আমি পুকুর যেমন আলাপ করে হায় অপেক্ষা!
ভালবাসা ক্ষমা ছাড়া কিছু না
অপেক্ষা আমাকে শত্রুর মতো বুঝিয়ে যাচ্ছে

আমি শত্রুপরিবেষ্টিত

আমি শত্রুপরিবেষ্টিত হায়
সন্তাপ
আমায় ছেড়ে চলে গেছে আমার লেখা সব ফেস্টুন
বাতাস যেমন, ভিক্ষু যেমন মুক্ত আমি আজ
স্লোগান দিচ্ছি
প্রেস ক্লাবে
তোতাপাখি সাজিয়ে বসেছে কপালগনক
আমার হাতে কারো অঙ্ক নাই

ঘুড্ডি উৎসবের দিন

ঘুড্ডি উৎসবের দিন
আমি ও রাদ আহমদ পুরান ঢাকার জ্যামে বসে আছি
একটু আগে ভাত খেয়েছি বিউটি বোর্ডিঙে
এখন মৃত কবিরা আমাদের তাঁতিবাজার ছাড়তে দিচ্ছে না
রিকশার গিট্টু দিয়ে বেঁধে রেখেছে
রিকশাগিট্টু মায়াময় – তবে মায়ার মুখ খারাপ
এমন গালি দেয় কিছুই বোঝা যায় না

সেন্ট্রাল রোড

স্তরের উপর স্তর
তার উপর সেন্ট্রাল রোড
এইকথা সেইকথায় আসল কথা বাহির হবে কি?
সেন্ট্রাল রোডে আসল কথা সোজাসাপ্টা বলে ফেললেও
যেই হেতু ইজ্জত থাকে
যেই হেতু সেন্ট্রাল রোডে সত্য স্বীকার করাই ভাল
আমরা হাঁটি
আমাদের সাথে আমাদের আত্মহারা কুকুর
ও যে আজ কই থাকবে!
সেন্ট্রাল রোডে সঞ্জীব পুরোহিতের বাড়ি
ওখানে আমরা দেয়াল থেকে ইট খুলি
ভয় লেগে, আবার হাসি পায় -আমরা অনেক হাসি
হাসতে হাসতে ইট খুলি
আমাদের কোনো ভয়ডর নাই

পদ্ধতি আমাকে

পদ্ধতি আমাকে খায়
আমি পদ্ধতিকে খাই
আমরা একে অপরের নীরব ভাঁপাপিঠা
হাতিরপুলের বিগত হাতির মতো
পরীবাগের বিধেয় থেকে ভূতেরগলির উদ্দেশ্যে
ক্রমাগত রওনা হতে থাকি


হাতিরপুল

হাতিরপুলের কবুতর কই গেল?
হাজার হাজার বিমের মধ্যে উপর থেকে নিচে তাকালে
নানান চালবাজির ভিতর
একটা বেমানান খাটো ছাদে শাদা শাদা ব্রা শুকাতে দেখা যায়
কবুতর কি ব্রা?

বঙ্গবাজার

বঙ্গবাজারে প্রেম
বঙ্গবাজারে আগরবাতির গন্ধে জনৈক হুজুর আমাকে পেয়ে বসে
হুজুর জানালো
বিদেশ যেতে শীতবস্ত্র লাগে
সুরমা পরা হুজুর আমাকে বেয়াদবির অর্থ বুঝিয়ে বলল
বঙ্গবাজার কাঠফ্লোরে সুলোচন
অপার্থিব বিদেশে তার গ্রিবা
আমি তার চলন্ত বর্তুল থুতনির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে
প্রেম নিবেদনের প্রকারভেদ ভাবতে থাকি

আত্মপ্রেম

আত্মপ্রেম বলে
আমার কারো দরকার নাই – নিজেকে খুলে নিজে
লটকাতে পারি
ভূতের গলির মাংসের দোকানে
রানের গায়ে রক্ত
খুব নীরবে রঙ বদলায়

কাঠমিস্তিরি

সাতাইশে জানুয়ারি
বইমেলার ঘটমান কঙ্কাল কি মায়াময়
কোনোদিন কি এসেছি এখানে!
বাঁশের গায়ে তেরছা করে রশি বাঁধছে কাঠমিস্তিরি
ভাষার বাঁধন শক্ত করছে
ভাষার বাঁধন শক্ত করো হে
অন্ধকার সন্ধ্যায় তোমার প্রেমে আমি পুরানো জটিল গন্ধ
তোমার প্রেমে আমার বুকের উপর
গায়ের মধ্যে
টুপ করে
ঝরে পড়া আমি

মুচি

শহীদ মিনারের বাম পাশে টাকনি
শহীদ মিনারের বাম পাশে পুরানো দাগ মুছে যায়
পুরানো ফিতা জোড়া লাগে
সব সাইজের পায়ের জন্য একটাই স্যান্ডেল

গোড়ালির কাছে ঢালু
এর বেশি নাই
এর বেশি কেউ আশা করে না
শহীদ মিনারের বাম পাশে মেডিকেল গেটে

নানান ধান্দার
নানান গোড়ালির মানুষ
জুতাসারাইয়ের দশমিনিট
ওই তাপ্পিমারা একক স্যান্ডেলে রাজি হয়ে যায়
নরোম কালো স্পঞ্জ – যেন কয়েক লক্ষ অমাবস্যা
যেন ও না হলে সব তেল ফুরিয়ে যাবে
সব বরফ গলে যাবে

দোয়েল চত্তরে

দোয়েল চত্তরে ওই লোকটা কি ছিনতাইকারী?
দোয়েল চত্তরে ওই লোকটা কি ছিনতাইকারী?

আমি কার্জন হলের গেট থেকে মাঠের সাইডে গেলাম
সেও আসলো
আবার রাস্তা পার হলাম
সেও আসলো পিছে পিছে
আমি তিন নেতার মাজার পর্যন্ত এসে ঘুরে দাঁড়ালাম
আমার উম্মত এমন চমকে উঠলো
যেন আমি তাকে এখন ছিনতাই করবো

আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললাম ভাই আগুন আছে?
সে বললো আগুন নাই
আমি বললাম চা খাবেন?
সে তালগাছের মত পা ফেলে পার্কে ঢুকে গেলো
আমাদের মধ্যে কে যে বেশি ভয় খাইলো
সেইটা বুঝতে একজন ইকনমিস্ট লাগবে

আজিমপুর গোরস্থানে ৩

বিসম আধান
একই সাথে স্ফটিক
একই সাথে রোদে হলুদ আজিমপুর কলোনি
প্রতিদিন জীবিত – প্রতিদিন এত এত নালা থেকে
ময়লাবালা নাচুনি
নগ্ন যুগল
বিষম
ওগো কেমনে তুমি জাইনা গেলা?
সত্য যদি অনেক রকম
মিথ্যা অনেক রকম – অতএব আমি আজিমপুরে বিস্কুট খাবো
কবরের পাশে আরো এমন ফুল আছে
সন্ধ্যাবেলা ধূলার নিচে
ধূলার উপর আলোর স্কন্ধে
তোমার পরানমুখোতা জানলো কিভাবে ?

শাহবাগ

একটা পদ্ম ফুল কি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি!
একটা নারিকেল ছোবড়া!
আমি ধুলার ভিতর চক্রাকার, ধূলার মধ্যে
প্রেমের কথা বললো মানুষ
অনেক কঠিন প্রেমের কথা, বোঝাই যায় না!
এখন শাহবাগের ছবি দেখে মনে পড়লো
সেইদিন্ও চাদর –
শাহবাগ ফুটপাথ জড়াচ্ছিলাম বুকের উপর তেরছা করে
দুইদিকে দুই স্বাস্থ্যকেন্দ্র
মধ্যেখানে প্রেম
কার সাধ্য বোঝে!

এখন সবকিছু বদলে গেছে
পদ্ম আর নারিকেল মিলে মিশে গেছে
আমি বরফের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টেলিফোনে শুনতে পেলাম

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — মে ১৮, ২০১৩ @ ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

      কতো কিছুইতো অতিক্রম করে এগুচ্ছে মানুষ এগিয়ে নিচ্ছে তার সভ্যতা । কতো অশ্রু,কতো জীবনের বলি দান এবং তার পর তারপর আরো তারপর কতো পথের ভেতরে পথ _পথ খুঁজে নেয়ায় অস্থিরতা, চিৎকার ভাঙচুর,তচনচ আবার নির্মাণ আবার এগিয়ে চলা। পুরাণোকে ভাঙা, ছুড়ে ফেলা নতুনের আয়োজন । নতুনটা তবে কি ! কার জন্য- মানুষেরইতো । কবিতা,পরাকবিতা,অকবিতা,এন্টি কবিতা ইত্যাদির নির্মাণ সমাজ রাষ্ট্রীক জীবনের অস্থিরতা যা মানুষের মনে নানা বিচিত্রবোধের রেখা টানছে তা’ নিছক দু’চার কথায় উড়িয়ে দেয়া যাবে না, কারণ পুঁজিবাদ তার অস্থিরতার অন্তর্বাস খুলে দিয়েছে, বিপর্যস্ত জীবন ভাবনা,বাড়ছে অস্থিরতা, তার প্রকাশ বাস্তব হোক বা না হোক,শিল্পের প্রশান্তির ধারণাগুলো থাকুক বা না-ই থাকুক প্রকাশ পারঙ্গমতায় শক্তি থাকলে পাঠক আপন কল্পনায় গড়ে নেবে সহস্র-সহজ কবিতা আর প্রশান্তি হবে তার বেদনায় । তেমন আশা নিয়েই হয়তো সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীন মানুষ কবি, সমাজের সকল কিছুর সংগে সমানুপাত নয়- যারা নিজেরা যে বিশ্বাসে বিশ্বাসী বলে প্রতীয়মান হয়, প্রকারন্তরে তার উপস্থিতিরও অনেক কিছু তাদের মান্য করে যাওয়া কঠিন তাঁর প্রকাশ শিল্পের মাধ্যমেই ঘটান তবুও তা’ যেনো নৈরাজ্যের কবলে না পড়ে, সেটুকুনতো সমাজ-রাষ্ট্র-পাঠক মানুষ কবির কাছে দাবী করতেই পারে ।কবির কবিতাগুলো ভালো লেগেছে বলবার কারণ এগুলোতে আছে নতুনত্ব, টুকরো টুকরো চিত্র থেকে পেড়ে নেয়া য়ায় পূর্ণতাকে,রাগ-দ্রোহ-অন্তর্দাহ আছে কবিতার শরীরে মিশে। দু’একটা কবিতায় একটু সম্পাদনার দাবী করা য়ায় আশা কবি তরুণ এই কবি তা করে নেবেন । কবিকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আহমদ ময়েজ — মে ১৯, ২০১৩ @ ২:০১ পূর্বাহ্ন

      কবিতাগুলো একেবারর ঝরঝরে। সুন্দর টানা বারান্দা হেটে যেতে যেতে যেমন একটা অনুভূতি পাশ থেকে উকি দেয় সেরকম। আর চেনা চিত্রগুলো যা আমরা দেখি আবার অন্যভাবে গোপনে ভাবি তাও দেখার সুযোগ হলো।
      ভালো লাগা রেখে গেলাম। অন্যসময় পাঠ হবে। এখনকার পাঠ খুব দ্রুতার ভেতর। মূলত মগ্নতা নিয়ে পড়তে হয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মেসবা আলম অর্ঘ্য — সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৪ @ ৮:২৮ অপরাহ্ন

      দীর্ঘ মন্তব্যের জন্য অগ্রজ কবি মতিন বৈরাগীকে ধন্যবাদ।
      আহমদ ময়েজ, আপনাকেও ধন্যবাদ। ভাল থাকুন সবাই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com