চিনুয়ার সঙ্গে এক সন্ধ্যা

আলম খোরশেদ | ৩০ মার্চ ২০১৩ ৮:২০ অপরাহ্ন

achebe-e1.gifঅবশেষে চিনুয়াও চলে গেলেন, অবশ্য পরিণত বয়সেই, তবে নোবেল না পেয়েই। আমরা যারা তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রবল অনুরাগী এটি তাদের জন্য একটি বড় আক্ষেপের বিষয় সন্দেহ নেই। কেননা চিনুয়া নিছক আর পাঁচজন ভুবনখ্যাত সাহিত্যিকের একজনমাত্র নন, তিনি একটি মহাদেশের আধুনিক কথাসাহিত্যের জনকপ্রতিম। এবং সেই মহাদেশ ও তার অধিবাসীদের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা, সাজাত্যবোধ ও স্বাধিকার চেতনার প্রতীকপুরুষও বটে। তো এহেন মহীরুহতুল্য সাহিত্যিক ও সমাজচিন্তকের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল এই লেখকের, আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগে, ন্যুয়র্ক শহরে। তারই সানুরাগ স্মৃতিচারণ এই ছোট্ট ব্যক্তিগত নিবন্ধখানি।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী, নাসির আলি মামুন, যাঁর প্রবল প্যাশন নামজাদা লেখক-শিল্পীদের ছবি তোলা। তিনিও তখন ন্যুয়র্কবাসী ছিলেন। ওঁর কাছ থেকে খবর পেয়ে এই অভাজনও মাঝে মধ্যে তাঁর সঙ্গী হয়ে বেশ কিছু গুণীজনের দর্শন পেয়েছি খুব কাছ থেকে। তেমনি এক সুবর্ণ সুযোগ হয়েছিল ১৯৯৪ এর এক হাঁড়কাঁপানো শীতসন্ধ্যায়। মামুন খবর দিলেন, ম্যানহাটানের সিক্সথ এভেনিউতে সম্প্রতি বার্নস অ্যান্ড নোবেল বইয়ের দোকানটি যে বিশালাকার, অত্যাধুনিক শাখা খুলেছে সেখানে চিনুয়া আচেবে আসছেন তাঁর নিজের লেখা থেকে পড়ে শোনাতে আর ভক্ত পাঠকদের অটোগ্রাফ বিতরণ করতে।

আধুনিক আফ্রিকী কথাসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব চিনুয়া আচেবের বিখ্যাত উপন্যাস Things Fall Apart, No Longer at Ease, Arrow of God ইত্যাদি আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার সঙ্গে সঙ্গেই যোগাড় করে পড়েছিলাম। দেশে থাকতে তাঁর একটি গল্প The Sacrificial Egg অনুবাদ করেছিলাম নৈবেদ্য নামে, আর আটাশিতে যখন তাঁর নতুন উপন্যাস The Anthill of Savannah প্রকাশিত হলো তখন সেটি পাঠ করে তার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বৈরশাসক এরশাদ ও আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের মধ্যকার তৎকালীন বিরোধ ও সংঘাতের সাযুজ্য খুঁজে পেয়ে একটি ছোট্ট তুলনামূলক আলোচনাও লিখেছিলাম বাংলাদেশের দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকীতে। আর চিনুয়ার ন্যুয়র্ক আগমনের কিয়ৎকাল আগেই তাঁর সাড়া জাগানো প্রবন্ধগ্রন্থ Hopes and Impediments পড়ে তাঁর উত্তরঔপনিবেশিক সাহিত্য সমালোচনার স্বাতন্ত্র্য, সাহস ও সারবত্তায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। ফলে এহেন একজন লেখককে কাছে থেকে দেখা ও তাঁর কথা শোনার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করিনি।

অনুষ্ঠান শুরু হবার কথা ছিল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। মামুন বলে দিয়েছিলেন একটু আগেভাগেই যেতে, কেননা প্রচুর লোকসমাগম হবার সম্ভাবনা। ফলে একটু তাড়াতাড়িই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম সেদিন। আমার কার্যালয় থেকে অনুষ্ঠানস্থলটি বেশি দূরেও নয়। তাই হেঁটেই রওয়ানা দিলাম। মাঝখানে অবশ্য প্রবাসী ভারতীয়দের পত্রিকা India Abroad এর দপ্তরে থামতে হয়েছিল, সেখানে কর্মরত কোলকাতার এককালের ডাকসাঁইটে সাংবাদিক, লেখক বুদ্ধদেব বসুর জামাতা, কোলকাতা পত্রিকার সম্পাদক জ্যোতির্ময় দত্তকে সঙ্গে নিতে। তিনি অবশ্য জরুরি কাজের জন্য শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি। কিন্তু এই করে বার্নস অ্যান্ড নোবেল এ পৌঁছুতে পৌঁছুতে প্রায় সাতটা বেজে গিয়েছিল। গিয়ে দেখি মামুনের কথাই ঠিক। আসন সব পূর্ণ হয়ে গেছে। অত্যুৎসাহীরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউবা মেঝেতে বসে। মামুন অবশ্য আমার জন্য একখানা আসন দখল করে রেখেছিলেন।

বইয়ের দোকানখানা বিশাল, খোলামেলা। ভেতরে রেস্তোরাঁ অবধি রয়েছে। কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠান মঞ্চের পাশে একটি টেবিলে চিনুয়ার যাবতীয় বই ডাঁই করে রেখেছিল অটোগ্রাফ শিকারীদের জন্য। দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই সব বই প্রায় শেষ। কেউ কেউ পাঁচ-ছ’টা করেও কিনেছে লেখককে দিয়ে সই করিয়ে নেবে বলে। মামুনকে দেখলাম তাঁর সংগ্রহ থেকে No Longer at Ease বইখানা নিয়ে এসেছেন স্বাক্ষর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। মামুন ক্যামেরা বাগিয়ে তৈরি কখন চিনুয়া আসবেন তার প্রতীক্ষায়। দর্শকদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গর সংখ্যা প্রায় সমান সমান। ঠিক সাড়ে সাতটায় এলেন চিনুয়া। হুইল চেয়ারে করে। ক’বছর আগে একটি দুর্ঘটনার পর তিনি পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতে পারেন না। তার পরনে ঐতিহ্যবাহী বহুবর্ণিল আফ্রিকান জোব্বা, মাথায় ফেজ টুপি। সঙ্গে তাঁর পত্নীও এসেছেন আফ্রিকান পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে। তিনিই পরম মমতায় স্বামীর হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এসেছিলেন।

জানা গেল, ঘটনাচক্রে সেদিন চিনুয়ার জন্মদিন। চৌষট্টি বছর পূর্ণ করেছেন, ১৯৩০-এ নাইজেরিয়ার ইবো সম্প্রদায়ে জন্ম নেয়া এই প্রতিভাবান, দূরদর্শী লেখক। বার্নস অ্যান্ড নোবেল কর্তৃপক্ষ তাই কেক কাটার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই সঙ্গে সবাই মিলে Happy Birth Day to Chinua গাওয়া হলো। স্বভাবতই লেখককে খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছিল তখন। চিনুয়া দর্শকদের অভিনন্দনের প্রত্যুত্তর জানিয়ে তাঁর Things Fall Apart এর শেষ কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে শোনালেন জলদগম্ভীর কণ্ঠে। সাদা চামড়ার চার্চ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় ইবো জনগণের সংঘাতের বর্ণনাটি পাঠ করার মুহূর্তে তাঁকে বেশ উত্তেজিতই মনে হচ্ছিল।

পাঠশেষে ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। শ্রোতারা নানারকম প্রশ্ন করছিলেন আর তিনি সে-সবের জবাব দিচ্ছিলেন অত্যন্ত সরস অথচ তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনায়। একজন জানতে চাইলেন তিনি কেন তাঁর বইয়ের নামগুলো ইংরেজি কবিতার লাইন ধার করে রাখেন। তাঁর চটপট উত্তর Young man, I was showing off, আর একজন তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এবং সেইসঙ্গে একজন লেখকের জন্য স্বদেশে থাকাটা কতখানি জরুরি জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই তাঁর প্রথম পছন্দ হবে স্বদেশে থেকেই সাহিত্যচর্চা করা, তবে আপাতত তাকে স্বাস্থ্যগত ও রাজনৈতিক কারণেই বাধ্য হয়েই যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে হচ্ছে। অবশ্য সেইসঙ্গে তিনি এও জানাতে ভুললেন না যে একজন লেখকের জন্য ভ্রমণও অত্যন্ত জরুরি ও উপকারী। তা না হলে, একটি আফ্রিকান প্রবাদ উল্লেখ করে তিনি বললেন যে, লেখক চিরকালই ভাববে তাঁর মা-ই বুঝি জগতের শ্রেষ্ঠ স্যুপ রাঁধিয়ে।

চিনুয়া ও তাঁর পত্নী দু’জনেই ন্যুয়র্কের উপকন্ঠে বার্ড কলেজে শিক্ষকতা করেন। ঔপনিবেশিকতা বিষয়ে তাঁর আপোষহীন অবস্থান বিষয়ক এক প্রশ্নের সূত্র ধরে তিনি আরেকটি মজার আফ্রিকান প্রবাদ উদ্ধার করে জানান, সিংহদের মধ্য থেকে যতদিন না কোন ঐতিহাসিকের জন্ম হচ্ছে ততদিন সিংহশিকারের ইতিহাসে কেবল শিকারীদের কথাই শুনে যেতে হবে আমাদের। তিনি বর্তমানে সিংহদের ঐতিহাসিক হবারই চেষ্টা করছেন বলে জানালেন। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ রসঘন ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনার পর অটোগ্রাফ শিকারীরা লাইন ধরলেন, সে এক সুদীর্ঘ মনুষ্যসারি। মামুন আমাকেও তাঁর বইখানা দিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন এবং নিজে ক্যামেরা নিয়ে তক্কে তক্কে রইলেন লেখকের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তোলার অপেক্ষায়। আমার যখন সুযোগ এলো সই নেবার, আমি বাংলা ভাষায় তাঁকে নিয়ে লেখা আমার দু’খানা প্রবন্ধের কথা জানাতে তিনি বিস্ময় ও আনন্দ প্রকাশ করলেন। মামুন ততক্ষণে প্রাণভরে অসংখ্য ছবি তুলে নিয়েছেন চিনুয়া আচেবের, খোঁজ নিলে তাঁর সংগ্রহে সে-সবের কিছু কিছু নিশ্চয়ই এখনো পাওয়া যেতে পারে।

সিংহদের স্বপ্রণোদিত ঐতিহাসিক, সেই চিনুয়া আজ আচমকা স্রেফ ছবি হয়ে গেলেন!

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com