ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাচ্ছে : মিনার মাহমুদ

শাকুর মজিদ | ২৯ মার্চ ২০১৩ ১১:৩৭ অপরাহ্ন

সময়টা ছিল ২০০১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী। তার সাথে দেখা। মানুষটিকে এর আগে অনেকবার দেখেছি। কথাও বলেছি। তবে সেই পরিচিত মানুষটিকে দেশের গন্ডি পেরিয়ে দূর দেশে গিয়ে যেন নতুন করে আবিস্কার করলাম। পরবর্তীতে ‘আমেরিকা: কাছের মানুষ দূরের মানুষ’ নামক ভ্রমন কাহিনীতে সে অংশটি প্রকাশ হয়েছিল।

আমেরিকা যাবার আগে এক সন্ধ্যায় রঞ্জু বলেছিল, নিউইয়র্কে গেলে মিনার মাহমুদের সাথে দেখা করিস।
মিনার মাহমুদের ব্যাপারে আমারও কৌতূহল আছে। সাপ্তাহিক বিচিন্তায় এরশাদবিরোধী ভূমিকা পালনের জন্য ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কয়েক বার এ পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয় নিজেও লিখেছি। বিচিন্তায় লেখা ছাপালে খুব পুলক বোধ হতো। ক্যাম্পাসের প্রচুর ছেলে বিচিন্তা পড়ত। লেখার কথা জানাত।

এক সময় শুনি মিনার মাহমুদ কুরিয়ার পত্রিকার মালিকের কাছে পত্রিকা বিক্রি করে আমেরিকা চলে গেছেন। কসমস হাউজ থেকে এর পর কয়েকদিন এ পত্রিকাটি বেরিয়েও ছিল। কিন্তু বেশি দিন চলে নি। বিচিন্তা বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু মিনার মাহমুদের আর দেশে ফেরা হয় নি। রঞ্জু বলল জ্যাকসন হাইট্স-এ কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই মিনার মাহমুদ-এর খোঁজ পাবি। শুনেছি ও এখন ট্যাক্সি চালায়।

নিউইয়ার্ক পৌঁছে মিনার মাহমুদকে নিয়ে একটা মজার গল্প পেলাম।
এক রাতে তার ট্যাক্সিতে সোয়ার হয়েছেন এক ফরাসি পর্যটক। মিনার মাহমুদের কাছ থেকে জানতে চাইলেন তার দেশের পরিচয়। পর্যটক যখন শোনেন তার দেশ বাংলাদেশ তখন তিনি জিজ্ঞাস করে বসেন, তুমি নিশ্চয়ই তসলিমা নাসরিনের নাম শুনেছ, চেনো তাকে?
জি, ভালো করে চিনি।
ফরাসি পর্যটক নড়েচড়ে বসেন। জানতে চান তার সাথে কখনো আলাপ হয়েছে কি না।
মিনার মাহমুদ বলেন, ও আমার বৌ ছিল। আমি ওর স্বামী। ফরাসি ভদ্রলোক ট্যাক্সি থামাতে বলেন। তাড়াতাড়ি ভাড়া মিটিয়ে অন্য ট্যাক্সি নিয়ে চলে যান। মিনার মাহমুদের কথা তার বিশ্বাস হয়ই নি, বরং পাগল ঠাউরেছেন তাকে। তসলিমা নাসরিনের স্বামী নিউইয়র্কে ক্যাব চালাবে এটা তার কাছে বিশ্বাস্য ছিল না।

এ গল্পটা নিউইয়র্কে এক বাঙালির কাছ থেকে শোনা। আমার ইচ্ছা ছিল মিনার ভাইকে পেলে তার সত্যমিথ্যা যাচাই করব। এমনিতে ঐ বিয়ের কথা আমি ঢাকায়ও শুনেছি। কাকরাইলে যখন বিচিন্তার অফিস ছিল, আমি লেখা দিতে গেলে একবার দুইবার সম্পাদকের ঘরে তসলিমা নাসরিনকে একা বসে থাকতে দেখেছি। মিনার ভাই অফিসে নেই, তিনি বসে বসে অপেক্ষা করছেন।

মুক্তধারার বিশ্বজিৎদার কাছে মিনার মাহমুদের খোঁজ নিলাম। বলেন কাল একবার ফোন করবেন, আমি নাম্বার যোগাড় করে রাখব। তবে আপনি যদি একুশের রাত পর্যন্ত থাকেন তবে চলে আসেন শহীদ মিনার , মিনার ভাই ওখানে আসবেনেই।
একুশে ফেব্র“য়ারির রাতে ম্যানহাটনের ফার্স্ট এভিনিউ সেকেন্ড। স্ট্রিটে জাতিসংঘ ভবনের শেষ দিকে কতগুলো স্থাপনা দিয়ে একটা অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে জোরে চিৎকার করে উঠলেন বিশ্বজিৎ দা। যেতেই ইশারায় দেখান।
আমেরিকান তাজা ফলের রস তার ত্বকে মসৃণতা কতটুকু বাড়াল রাস্তার নিয়নবাতির আলোয় তা পরিষ্কার বোঝা গেল না।
এমনিতে আমি ডিভি-ক্যাম নিয়ে ঘোরাঘুরি করছি। একটু অন্যরকম কাউকে পেলেই ধরে বসিয়ে দিচ্ছি ক্যামেরার সামনে। যেমন মিনার মাহমুদ আমার জন্য একটা ভালো সাবজেক্টও বটে।

আমি হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়াতেই চেপে ধরেন মিনার মাহমুদ। মিনার মাহমুদকে বলি, আসেন, আপনার ইন্টারভিউ হবে, এই দেখেন ক্যামেরা।
ভেবেছিলাম রাজি হবেন না। সারাজীবন সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। জটিল কঠিন সব প্রশ্ন করে কতজনকে বিভ্রান্ত করেছেন কত সময়। কিন্তু খুব সমস্যা হলো না। এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন কোথায়?
ফার্স্ট এভিনিউর রাস্তায় মিনার মাহমুদের ট্যাক্সি পার্ক করা। গাড়ির হেড লাইটের আলো জ্বলছে। আমার ভিডিওগ্রাফির জন্য ঐটুকু আলো যথেষ্ট। রাত মাঝামাঝি বলে গাড়ির চলাচল খুব নেই। আমেরিকায় যেহেতু লোকজন হর্ন বাজিয়ে গাড়ি চালায় না, আমরা ঠিক করলাম ওখানেই, ফুটপাথে বসে আমার সাক্ষাৎকার পর্ব সারব।
আমেরিকায় আপনি কি করছেন?
: প্রথম প্রশ্ন যেন একটু ঘাবড়ে গেলেন মনে হলো মিনার মাহমুদ। কথা ছিল ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু তিনি খানিক তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নিলেন আরেক ৭০ তলা ভবনের দিকে। তারপর ও মুখে স্মীত হাসি। বলেন, ‘আমি রিকশা চালাই, নিউইয়র্কের রাস্তার আমি একজন রিকশা ড্রাইভার।’
মিনার মাহমুদ নড়েচড়ে বসেন। তাকে জিজ্ঞেস করি, দেশে আপনি পত্রিকার সম্পাদনা করতেন, এখানে ক্যাব চালাচ্ছেন কেমন লাগছে আপনার এই পেশা?
আমি সৎভাবে কাজ করছি। এটা তো অন্যায় কিছু না।
এখানে কোনো পত্রিকা করার চেষ্টা করেছেন?
: না। আসলে এখানকার পত্রিকাগুলোতে সে রকম পরিবেশ ছিল না ? কিংবা আমি সেভাবে চেষ্টাও করি নি।

মিনার মাহমুদ বলেন, চলে যাচ্ছে দিন, ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাচ্ছে।
কিন্তু এই মিনার মাহমুদের আমেরিকার অভিবাসনকে কি স্বেচ্ছানির্বাসনের মতো চিন্তা করেন? এদের কেউ কেউ হয়তো করেন, কেউ করেন না।
মিনার ভাই সাফ জানালেন, দেশে থাকলে তাকে থাকতে হতো জেলখানায়। জেলখানার জীবন তার জানা আছে। কিন্তু এও স্বীকার করলেন, যে ছোট জেলখানার জীবন ছেড়ে একটু বড়ো জেলখানায় মধ্যে এখন আটকে গেছি।
মিনার মাহমুদের স্পষ্ট জবাব, না, আমি মনে করি এভাবে দেশের সাথে শিকড় ছেড়ে কারোরই আমেরিকায় থাকা ঠিক নয়। তিনি বলেন, আমার বৈধতার কাগজপত্র হয়ে পেলে আমি হয়তো একেবারেই চলে যাবো। এগারো কোটি মানুষ যেভাবে বেঁচে আছে আমারও বেঁচে থাকা খুব কষ্টের হবে না।

মিনার মাহমুদকে নিয়ে আমার বৈঠক শেষ করতে হয়। একুশের মূল অনুষ্ঠানে শেষ হতে মিনিট পাঁচেক বাকি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আসবেন অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুলের তোড়া দিতে।
ক্যামেরা বন্ধ করার আগে মিনার ভাইকে প্রশ্ন করি : মিনার ভাই, সত্যি কথা বলেন, এ জীবন আপনার কেমন লাগছে?
তিনি চুপ করে থাকেন।
ক্যামেরার লাল বাতি টিপ টিপ করছে।
রাস্তার পাশের গাড়ির লাল আলো তার মুখকে করে তুলছে আরো রক্তিম।
মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ভাঙা টুকটাক গাড়ির কর্কশ শব্দের সাথে সুর মিলিয়ে মিনার ভাই বলেন, এই জীবন কি কোনো জীবন হলো?
মিনার মাহমুদকে আর কোনো প্রশ্ন করতে আমার ইচ্ছা হলো না।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com