আচেবের অন্তর্ধান

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস | ২৫ মার্চ ২০১৩ ১:৩১ পূর্বাহ্ন

achebe-e.gifসমকালীন আফ্রিকার বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের পুরোধা এবং সম্ভবত সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্ব সাহিত্যের প্রথম সারির একজন লেখক চিনুয়া আচেবে দুদিন আগে অন্তর্হিত হলেন। পুরো নাম এলবার্ট চিনুয়ালুমোগু আচেবে। পরিণত বয়সেই চলে গেলেন, তবে প্রতিভাবান ব্যক্তিদের বিশেষ করে যাঁরা সৃষ্টিশীল থাকেন এরকম শিল্পীদের সম্পর্কে বলা হয় যে এদের পরিণত বয়স বলে কিছু নেই, নেই বয়সের গাছপাথরও। এর কারণ নিশ্চয়ই এই যে এদের কাজ সময়কে অতিক্রম করেও বহু বছর, কখনো কখনো মানব সভ্যতার ও মননশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে বাঁচে। নাইজেরিয়ার সবচেয়ে খ্যাতিমান এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় আচেবেও ছিলেন এধরনেরই একজন লেখক। লিখেছেন যে খুব বেশি তা নয়, তবে পাঁচটি উপন্যাসই এবং কিছু ছোটগল্প বিশ্বসাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এদের একটি-প্রথমটি-থিংস্ ফল অ্যাপার্ট বিদগ্ধ মহলে প্রায় গৃহপালিত একটি নাম। এমনই পরিচিত ও জনপ্রিয় এই উপন্যাস যে এই দূরদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ ২০০৯ সালে এই বইয়ের প্রকাশনার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে দুদিন ব্যাপী এক উৎসবেরই আয়োজন করে বসে। কেবল থিংস্ ফল অ্যাপার্ট নয়, আচেবের অন্যান্য উপন্যাসও যেমন, নো লংগার অ্যাট ইজ, এ ম্যান অফ দ্য পিপল, এ্যারো অফ গড এবং অ্যান্টহিলস্ অফ দ্য সাভান্নাহ আচেবের প্রথম শক্তিকে শুধু ধরেই রেখেছে তা নয়, এগিয়েও নিয়ে গেছে।
আচেবেকে চাক্ষুষ দেখার সুযোগ আমার ঘটেছিলো দুবার-যুক্তরাষ্ট্রে। ওসব দেশে কিছুকাল বসবাস করলে নানান সুবিধার মধ্যে একটি সুবিধা হলো বিশ্বমানের লেখকদের বক্তৃতা শোনা যায়, তাঁদের চোখে দেখা যায়, এবং দর্শক-শ্রোতা বেপরোয়া হলে কখনো কখনো তাঁদরে কাছাকাছি গিয়ে কথাবার্তাও বলতে পারে। একবার সম্ভবত ১৯৮৮ সালে ওয়াশিংটন, ডি. সির স্মিথসোনিয়ান অডিটোরিয়ামে আচেবের একটা বক্তৃতা অনুষ্ঠানের খবর পেয়ে সেখানে যাই। আমেরিকার সাধারণ শিক্ষিত সমাজ যেহেতু গুণী লোকের কদর দিতে জানে সেজন্য এরকম পরিস্থিতিতে যথেষ্ট আগে না গেলে ঘরে বসার আসন পাওয়াই অসম্ভব। সেদিনও অডিটোরিয়ামটি ছিলো কানায় কানায় ভরা। দূর থেকে কালো ঋজু মানুষটিকে ছোটই দেখাচ্ছিলো। কিন্তু তিনি বললেন ঘন্টাখানেক। বিশ্ব রাজনীতি, পাশ্চাত্য দেশের বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব, টেকনোলজি, নিজের লেখা ইত্যাদি নিয়ে আচেবে সেদিন অনেক কথাই বললেন। তিনি থামলে প্রশ্নোত্তর পর্যায়ে একজন তরুণ আমেরিকান উঠে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “মি. আচেবে, আপনি তো পাশ্চাত্যকে অনেক পরামর্শই দিলেন, কিন্তু আমি যদি জিজ্ঞেস করি পাশ্চাত্যকে দেওয়ার মতো আফ্রিকার কী আছে তাহলে আপনি কী বলবেন?“ শুনে আচেবে এক মূহূর্ত চুপ থেকে শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন: হিউমিলিটি। হলঘরে হাততালির রোল পড়ে গেল। বাস্তবিকই উদ্ধত আমেরিকা এবং তার অনুসারীদের কিছুটা বিনয়, কিচুটা শোভন আচরণ প্রদর্শণের পরামর্শই সেদিন দিয়েছিলেন আচেবে।
আরেকবার হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটির একটা ছোট হলঘরে আচেবেকে আমার দেখার সুযোগ হয় তাঁরই ইগবো সম্প্রদায়ের এক নৈশভোজে। সম্ভবত: তাঁকেই সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ওই ছোট ঘরে জড়ো হয়েছিলো ওয়াশিংটনে বসবাসকারী ইগবো সম্প্রদায়ের বেশ কিছু লোক। সবাই টেবিল ঘিরে বসে আছে, মাইক্রোফোনে ওদের গানবাজনা বেজে চলেছে বিরামহীন। আচেবেও আসেন না, টেবিলে খাবারও আসে না। কারো কোনো বিকার নেই, যে যার মতো ঢিলেঢালাভাবে গল্প গুজব করে যাচ্চে। ইতিমধ্যে কোনো কোনো টেবিলে দেখা গেল খাবার যাচ্ছে। একটা টেবিলে কিছু শ্বেতাঙ্গ বসেছিলো। তারা অস্থির হয়ে পড়লো। কিন্তু ইগবোদের মধ্যে খাবারের জন্য হুড়োহুড়ি চেঁচামেচি সেসব কিছুই হচ্ছে না। লোকে মনে হয় চুপচাপ গান শুনতে আর কথাবার্তা বলতেই পছন্দ করছে বেশি। ওদিকে রাতও বাড়ছে। আমার মনে হলো ইগবোরা রাত-জাগা মানুষ। কেউ একজন পাশ থেকে বললোও সেকথা: ম্যান, দিজ আর নাইট-পিপল। এরকম সময় হঠাৎ দেখি আচেবে এসে বসেছেন স্টেজে। ওই হট্টগোলের মধ্যে তিনি দুচার কথা কি বললেন তা তেমন বোঝাও গেল না, তবে কৃষকায়, মোটামুটি দীর্ঘদেহী এই মানুষটিকে সেদিন তাঁর নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যমণি হিসেবে বেশ তৃপ্ত ও উৎফুল্ল বলেই মনে হয়েছিলো। একসময় ইগবোদের নাচেও তিনি অংশ নিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে বিনয়ী ও স্বল্পভাষী আচেবে কিন্তু তাঁর প্রবন্ধে, সাক্ষাৎকারে ও অন্যান্য গদ্য রচনায় ভয়ানক দৃঢ় ও উচ্চকন্ঠ। পঞ্চাশের দশক থেকেই ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা নিয়ে আফ্রিকান লেখকদের মধ্যে তুমুল বাকবিতন্ডা শুরু হয়। সেই সব তর্কে আচেবে খুব জোরালোভাবে ইংরেজি ভাষায় লেখার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন আফ্রিকান লেখক ইংরেজিতেই লিখবেন তবে ইংরেজের মতো লিখবেন না। অর্থাৎ ইংরেজিকে তিনি মাধ্যম করে নিজেদের সমাজকে, নিজেদের আটপৌরে জীবনের সাধ-আহ্লাদ, কষ্ট-ক্লেশ শিল্পায়িত করতে ইচ্ছে মতো কেচে কুঁদে ছেনে ইংরেজিকে একটি নতুন ভাষা হিসেবে ব্যবহার করবেন। এই কাজটিই তিনি করে দেখিয়েছেন। ইগবো সমাজের যথার্থ, প্রামাণিক জীবনকে কী করে একটি বিদেশী ভাষায় পুননির্মাণ করতে হয় তার স্বাক্ষর তিনি নিজের উপন্যাসগুলোয় বেশ জোরের সঙ্গেই রেখেছেন।
সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী আচেবে খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দেশের রাজনীতিতে কেবল উৎসাহীই ছিলেন তা নয়, ১৯৬৭ থেকে বছর তিনেক চলা ইগবোদের স্বাধীন ভূমি বায়াফ্রার জন্য যুদ্ধে তিনি সক্রিয় অংশও নেন। আচেবের প্রায় সকল লেখাই রাজনীতি নির্ভর। ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা যেহেতু আফ্রিকার অধিকাংশ দেশেরই একেবারে নাড়ি ধরে টান দেওয়া একটি অভিজ্ঞতা সেজন্য এই মহাদেশের যেকোনো বিবেকবান লেখকেরই মনোযোগের কেন্দ্র বিন্দু হবে উপনিবেশিক শাসন এবং সমাজে এর প্রভাব। আচেবে এর ব্যতিক্রম নন। তাঁর উপন্যাস ও বহু গল্পের উপজীব্য এই উপনিবেশিক দু:শাসন এবং সমাজে এর তোলপাড় করা প্রভাব। বিদেশী শাসনের অবসান ঘটলে দেশী শাসকদের অরাজকতা, লুটপাট, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি নিয়ে লেখা হয় তাঁর পরবর্তী দু তিনটে উপন্যাস। এসব উপন্যাসে বিশেষ করে নো লংগার অ্যাট ইজ , এ ম্যান অফ দ্য পিপল, এবং এ্যান্টহিলস অফ দ্য সাভান্নাহ্য় বর্ণিত রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ইত্যাদির যে চেহারা তার সাজুয্য প্রায় একশো ভাগই দেখতে পাই আমাদের বর্তমান রাজনীতিতে। এজন্য আচেবে আমাদের এখানে আরো বেশি করে পাঠ করা প্রয়োজন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তিনি কেবল এই সাদৃশ্যের জন্যই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। তিনি সামাজিক দায়কে যতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, একই রকম গুরুত্বের সঙ্গে তিনি শিল্পের দায়িত্ব পালন করেছিলেন নিপুন শিল্পীর মতো । তবে তৃতীয় বিশ্বের নেতৃত্বে যতদিন শয়তানি, বদমায়েসি, নষ্টামি বহাল থাকবে, গণতন্ত্রের নামে যতদিন চৌর্যতন্ত্র বা ক্লেপটোক্রেসি চালু থাকবে চিনুয়া আচেবের আবেদনও সেসব দেশে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন alfred khokon — মার্চ ২৫, ২০১৩ @ ১১:২৯ অপরাহ্ন

      ইলিয়াস ভাইর লেখা আমার অসম্ভব ভালো লাগে। আচেবেকে আত্মস্থ না করলে এমন করে তাকে নিয়ে কি লেখা যায় !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Khondakar Ashraf Hossain — মার্চ ২৬, ২০১৩ @ ১:৩৩ অপরাহ্ন

      ইলিয়াসের লেখাটি চমতকার। কিন্তু আমার একটু আপত্তি তার ব্যবহৃত শিরোনামে। অন্তর্ধান আর তিরোধানে পার্থক্য রয়েছে — আশা করি আমার বন্ধুটি তার স্বভাবের বিপরীতে গিয়ে কবিত্ব করার কোশেশ করেনি। ওর একটি আচেবে তরজমার নাম ‘দেবতার ধনুর্বাণ’ । আমার কেন জানি মনে হয় The Arrow of God হওয়া উচিত ছিল ‘ঈশ্বরের ধনুর্বাণ’ ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — মার্চ ২৭, ২০১৩ @ ২:৩৮ অপরাহ্ন

      সংক্ষিপ্ত পরিসরে আচেবে সম্পর্কিত লিখাটি ভাল লাগলো। পরবর্তীতে বিস্তারিত লিখার অনুরোধ রইলো। ধন্যবাদ ইলিয়াস ভাই।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Khaliquzzaman Elias — মার্চ ৩১, ২০১৩ @ ১:৩০ অপরাহ্ন

      লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্যে কবি খোন্দকার আশরাফকে ধন্যবাদ । আসলে “ অন্তর্ধান “ ও “তিরোধান”-এ আমি তেমন পার্থক্য দেখি না, যদিও সেসময় “তিরোধান” মাথায় এলে হয়তো সেটাই ব্যবহার করতাম । আর ঈশ্বর আর দেবতার দ্বন্ধে এটুকু বলি যে ইগবোদের কিন্তু অনেক দেবদেবী । আচেবের আলোচ্য বইয়ে পুরোহিত ইজেউলু একটি দেবতা উলুরই পুরোহিত । সে কিন্তু তার হাতেরই তীর হিসেবে ব্যবহৃত হয় । এজন্য আমার কাছে ঈশ্বরের চেয়ে দেবতাকেই বেশী গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com