হোর্হে লুইস বোর্হেসের সঙ্গে ফের্নান্দো সররেন্তিনোর আলাপচারিতা

মাসুদ খান | ১১ মার্চ ২০১৩ ১০:৩৩ অপরাহ্ন

অনূদিত এই সাক্ষাৎকারটি আর্হেন্তিনীয় লেখক ফের্নান্দো সররেন্তিনোর Seven conversations with Jorge Luis Borges (by Fernando Sorrentino, translated by Clark M. Zlotchew, 1982) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত সাতটি সাক্ষাৎকারের একটি। বইটি প্রথমে প্রকাশিত হয় স্পান্ঞল ভাষায় ১৯৭২ সালে। পরে এটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মার্কিন অনুবাদক ক্লার্ক এম. জ্লোৎচিও। ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে এই প্রথমবারের মতো এটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন কবি ও অনুবাদক মাসুদ খান। মূল লেখক ফের্নান্দো সররেন্তিনোর অনুমতি সাপেক্ষে এই বাংলা তর্জমা প্রকাশিত হলো । অচিরেই সম্পূর্ণ বইটি বাংলাদেশে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।
sorrentino-borges1.jpg

ফের্নান্দো সররেন্তিনো : আমরা জানি, আপনি ট্যাংগো পছন্দ করেন লিরিক ছাড়া
হোর্হে লুইস বোর্হেস: ট্যাংগোকে গান হিসাবে পছন্দ করি না আমি। এটা সত্যি যে, প্রথম-প্রথম ট্যাংগোতে লিরিক ছিল; এক ধরনের অশোভন লিরিক, গানটাকে মনে রাখার সহায়ক হিসাবে। তা ছাড়া ট্যাংগোতে লিরিক থাকলে তা তাকে নিয়ে যায় নাটকীয়তার দিকে, যা আমার অপছন্দ। কারণ আমার পছন্দ গাউচো (Gaucho) ত্রুবাদুরের ঐতিহ্য, যা আসলে এক প্রকারের আয়েশি নিস্পৃহ গায়নশৈলীর ঐতিহ্য, যেখানে কখনো-কখনো রক্তঝরা ঘটনাবলিকে বর্ণনা করা হয় এমন এক নিরীহ নির্দোষ ভঙ্গিতে যে, কী বর্ণনা করা হচ্ছে তা যেন গায়েনরা ঠিক উপলব্ধি করতে পারছেন না। আর তাতে করে ওই ঘটনাবলি হয়ে ওঠে আরো কার্যকর। অপরদিকে, এগুলোর প্রতিটি ট্যাংগোতেই, বিশেষ করে গার্ডেল এবং উত্তর-গার্ডেলে, রয়েছে নাটকীয় ও ভাবালু এপিসোড হয়ে ওঠার প্রবণতা খানিকটা, এক ধরনের ফোঁপানো কান্নার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়াটাই যেখানে রেওয়াজ…। এবং ব্যাপারটা ব্যক্তিগতভাবে অরুচিকর ঠেকে আমার কাছে। হতে পারে তা নেহাতই এক আর্হেন্তিনীয় সেকেলে মানুষের সংস্কার।

ফের্নান্দো: এবং সুনির্দিষ্টভাবে বলতে চাইছি ওমেরো মানসি-র (Homero Manzi) কথা, তাঁর ট্যাংগো কি পছন্দ আপনার? এই যেমন ধরুন ট্যাংগো “স্যুর”।

বোর্হেস: ট্যাংগো “স্যুর”? হ্যাঁ। এর শুরুর লাইনটা চমৎকার! “দক্ষিণ পাশে/ আছে এক গলি/ আর তারপর…।” একইসঙ্গে সেখানে রয়েছে এমন কিছু বাক্যবন্ধ যা, দেখাই যাচ্ছে, সত্য হয়ে বাজছে না কিছুতেই, বরং প্রতারণা করছে। মানসি-কে বুজুর্গ ব্যক্তি না বললেও ছদ্ম-বুজুর্গ তো অবশ্যই বলব। ধরা যাক, একটা ট্যাংগোতে- আমার বিশ্বাস ট্যাংগোটা তাঁরই- “বাহির-সীমান্তের বাতাস” এই বাক্যবন্ধটির উল্লেখ আছে। প্রথম কথা, এটা সেই ধরনের বাক্যবন্ধ যা কোনো মহল্লাবাসী কখনো ব্যবহার করে না। কারণ, “বাহির-সীমান্তের বাতাস” ধারণাটা শুনতে ভালো, কিন্তু ঠিক যুৎসই হয়নি এখানে। এবং দ্বিতীয়ত, কোনো বস্তিবাসীই বড়াই করে বলবে না যে সে বাস করে বাহির-সীমান্তে; সে বরং বলবে, “আমি এসেছি রেটিরো ডিস্ট্রিক্ট থেকে”, কিংবা বলবে, “আমি এসেছি মন্তসেরাত ডিস্ট্রিক্ট থেকে”, কিংবা যেখান থেকে এসেছে সে। “বাহির-সীমান্ত” শব্দবন্ধটা সম্পূর্ণ জটিল, অভিজাত একটা শব্দবন্ধ যা মহল্লার কোনো মাস্তান কখনো ব্যবহার করবে না। “বাহির-সীমান্তের নক্ষত্র ও বাতাসেরা/ ফিসফিস করে বলে তার নাম।//”- পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, স্বচ্ছল ডাউন টাউনের কোনো লোক লিখেছে এটা। “কমপাদ্র” সম্পর্কে তার ধারণা ভাবালুতায় ভরা, লোকসংগীত সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ সে। লোকসংগীতে কখনো এ ধরনের লিরিক থাকে না। এখন, ওমেরো মানসি (তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাঁর নাম আসলে ছিল মানসিয়ন) সম্ভবত একদম কিছুই জানতেন না বস্তির ওই পরিবেশ সম্পর্কে, কিংবা থোড়াই কেয়ার করেছেন তিনি এবং এই সম্ভাবনাটাই বেশি।

ফের্নান্দো: হুয়ান মুরানার কথা আপনি উল্লেখ করেছেন একাধিক কবিতায়। দেখা হয়েছে কি তার সঙ্গে কখনো?

বোর্হেস: না, দেখা হয়নি কখনো। তবে যারা তাকে চেনে তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। যেমন মার্সেলো দেল মাসো (Marcelo del Mazo) এবং দন নিকোলাস পারেদেস (Don Nicolas Paredes)- এদের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার। পালেরমো ডিস্ট্রিক্টের এক মশহুর মানুষ ছিল এই মুরানা। আমার বিশ্বাস, সে ছিল পারেদেসের দেহরক্ষী। পশু-টানা গাড়ির চালকও ছিল সে। আর যেমনটা শুনেছি, শেষ দিকটায় সে মারাত্মক মদ খাওয়া শুরু করে দিয়েছিল; এবং একদিন রাতে সে পড়ে গিয়েছিল গাড়ির সামনের সিট থেকে; লাস এরাস (Las Heras) স্ট্রিটের পাথরের ওপর পড়ে মাথা ফেটে গিয়েছিল তার। সবচাইতে ডাকসাইটে চাকুবাজ ছিল মুরানা। সে আর সুয়ারেজ দ্য চিলিয়ান। ব্যাপারটা কিছুটা এরকম যে, গুণ্ডামাস্তান সম্পর্কে যা-কিছু বলা হয়ে থাকে, কিংবা বলা ভালো, যা-কিছু বলা হতো ওই ডিস্ট্রিক্টে, ধরে নেওয়া হয়, তা সবই বলা হচ্ছে ওই মুরানা সম্পর্কেই। তবে আমরা নিশ্চয়ই মনে রাখব সেই ফরাসি প্রবাদটা যাতে বলা হচ্ছে, “মানুষ টাকা ধার দেয় কেবল ধনীদেরকেই”, অর্থাৎ টাকা ধার পায় কেবল ধনীরাই। মানে, কোনো হিম্মতি কারবার ঘটলেই কৃতিত্ব পায় মুরানা। সবার কাছে তখন মনে হয় এটা মুরানার কাজ, এ কেবল মুরানার পক্ষেই মানানসই, যে-কিনা মশহুর তার হিম্মতের জন্য, চাকুবাজিতে ওস্তাদির জন্য। অবশ্য চাকুবাজিতেই তার একমাত্র মুনশিয়ানা। কারণ আমার মনে হয় না তার ঘটে কিছু আছে, এবং সঙ্গতভাবেই, কোনোই কারণ নাই কিছু থাকবার।

ফের্নান্দো: এর আগে কোনো এক উপলক্ষে আপনি খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে বলেছিলেন কাফে লা পালেমোর কথা যেখানে ‘ট্রুকো’ খেলত তারা। তা ছাড়া আপনি একটা কবিতাও লিখেছেন ট্রুকো নিয়ে। তাতে এরকম একটা আভাস পাওয়া যায় যে, এই তাস খেলাটা আপনার জীবনের অত্যন্ত আনন্দপূর্ণ একটি বিষয়।
jorge-luis-borges.jpg
বোর্হেস: হ্যাঁ, খেলাটি প্রতিনিধিত্ব করে অত্যন্ত আনন্দপূর্ণ কিছু সময়ের। কারণ, অন্যান্য খেলার তুলনায় ট্রুকোকে অনেক উন্নতমানের বলে মনে হয়। অবশ্য দাবা বা ব্রিজের চেয়ে উন্নত নয়, তবে পোকারের চেয়ে তো অবশ্যই উন্নত। এবং ঘটনা হলো, আপনি যদি পয়সা দিয়েও এই খেলা খেলেন (হামেশাই যা হয়ে থাকে), তারপরও বলব টাকা জেতার ব্যাপারটা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয় এখানে। কেউ কখনো এরকম বলে না যে “আমি অত পেসো জিতেছি ট্রুকো খেলে”, বরং বলে, “অমুক-অমুককে হারিয়ে দিয়েছি আমি।” অর্থাৎ এক ধরনের অনুৎসাহী বৈরিতা রয়েছে এই খেলায়। তা ছাড়া, অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি সময় কাটানোর জন্যই বোধহয় উদ্ভব হয়েছে এই ট্রুকো খেলার। এ-কারণেই এটা খুব ধীরগতির খেলা; পোকারটা ঠিক ওরকম নয়। আর সেটাই খুব স্বাভাবিক, কারণ আমার মনে হয় পোকারের উদ্ভব হয়েছে পশ্চিম আমেরিকার রোমাঞ্চসন্ধানীদের হাতে, রাতারাতি ধনী হবার জন্য যারা বেরিয়ে পড়ত সোনার সন্ধানে। পক্ষান্তরে, ট্রুকো হচ্ছে তাদের জন্য যাদের কিছু করার নাই বা থাকলে সামান্যই। এই খেলা মাঠপ্রান্তরের খেলা, এই খেলা পাহাড়ি পল্লির, এই খেলা খামারবাড়ির। আমি একে তুলনা করব মদ্যপানরত ইয়ার-বন্ধুদের সঙ্গে; এই অর্থে যে, খেলাটি যে কোনা কিছুর চেয়ে বড় এক যাপনমাধ্যম।

ফের্নান্দো: ট্রুকোর উৎপত্তি কোথায়? আর্হেন্তিনা, উরুগুয়ে, নাকি স্পানঞা?

বোর্হেস: বলা মুশকিল। স্পান্ঞল এক তাসখেলার নাম ট্রকিফ্লোর। এখন, ওই খেলা সম্পর্কে জানে এরকম লোকজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি স্পেনে, তারা যা বলেছে তাতে বুঝলাম আমাদের ট্রুকোর মতো নয় সেই ট্রকিফ্লোর। ট্রুকো আছে দুই ধরনের: একটা, যা আমরা খেলি আর্হেন্তিনায়; আরেকটা খেলা হয় উরুগুয়েতে যাকে বলা হয় ‘ট্রুকো-আপটু-টু’ অর্থাৎ ‘ট্রুকো-দুই-পর্যন্ত’, এবং তা খেলা হয়ে থাকে “শো কার্ড” সহযোগে। অর্থাৎ কার্ড বাটার পর আপনি একটা কার্ড ওঠাবেন এবং সেই কার্ডের স্যুটটা হবে “শো”। ধরেন, ডায়মন্ড হচ্ছে “শো”, এখন আপনার যদি হয় ডায়মন্ডের ৪টা কার্ড, তবে তাদের দিয়ে আপনি হারিয়ে দিতে পারবেন স্পেডের টেক্কাকে। একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে, এবং তা হলো, আস্কাসুবি-র (Ascasubi) লেখা সেই দীর্ঘ ও ধীরগতি কবিতা সান্তোস ভেগা ও লো মেইয়িসোস দে “লা ফ্লোর”-এ (Santos Vega o Los mellizos de “La Flor”) বর্ণনা করা হয়েছে এক প্রকারের ট্রুকো খেলার, যা খেলা হতো মে বিপ্লবের আগে। আর ওই ট্রুকোটাই হচ্ছে ‘ট্রুকো-আপটু-টু’। দুই ধরনের ব্যাখ্যা হতে পারে কবিতাটার: আমরা ভাবতে পারি সেই আস্কাসুবির কথা যিনি উরুগুয়েতে কাটিয়েছেন দীর্ঘকাল। তিনি সেখানে ছিলেন মহাযুদ্ধের সময়, ওরাইবের হোয়াইটদের দ্বারা মন্টেভিডিও দখলের সময় তিনি শিখেছিলেন ওই ‘ট্রুকো-আপটু-টু’ ব্রান্ডটি। আমরা এও ধরে নিতে পারি, ট্রুকোর এই সংস্করণটা আসলে খেলাটার একটা পুরনো রূপ। আমরা আরো ধরে নিতে পারি, যে খেলাটি আমরা খেলি (যাকে উরুগুয়েতে বলা হয় ব্লাইন্ড ট্রুকো বা বুয়েনোস আইরেস ট্রুকো, এবং যা তরুণেরা শিখে ফেলে ব্রান্ডটির সঙ্গে পরিচিত হবার আগেই), তা হচ্ছে ট্রুকোর ওই ভিন্ন সংস্করণটার এক সহজ-সরল রূপ। এখন, এই ‘ট্রুকো-আপটু-টু’ খেলাটা, যা আমি শিখিনি কখনো, ব্লাইন্ড ট্রুকোর চেয়ে আরো জটিল, কারণ পুরো খেলাতেই ঘুরেফিরে আসে সেই “শো কার্ড”, যেমন, এর ফ্লাওয়ার-সংখ্যা হতে পারে……এত বেশি। আমার বিশ্বাস সর্বোচ্চ ফ্লাওয়ারটি হচ্ছে ৪৭। আমি অবশ্য ঠিক নিশ্চিত নই…

ফের্নান্দো: এই কালপর্বে, যখন আমাদের চোখের সামনে পুরনো নগরীগুলো নাই হয়ে যাচ্ছে, এরকম একটা সময়ে আমি চাই আপনি চিনিয়ে দিন সেইসব জায়গাকে, যেসব জায়গায় ছিল গণিকালয়, যাদের উল্লেখ আপনি করেছিলেন ভিন্ন একটি প্রসঙ্গে; মালদোনাদো নামের সেই সোঁতাটার আশেপাশে ছিল যেগুলো। পালেরমো ডিস্ট্রিক্টের কোন কোন স্ট্রিটে ছিল ব্রোথেলগুলো, বলবেন কি?
বোর্হেস: মালদোনাদো থেকে দূরে ছিল ওই গণিকালয়গুলো। স্বাভাবিকভাবেই, আমি তখন ছোট আর এ-ব্যাপারে সরাসরি কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি আমার। তবে এলাকার অনেক লোকের সঙ্গে কথা বলেছি আমি; যেমন আলফ্রেদো পালাসিয়োস (Alfredo Palacios), যিনি বাস করতেন এক কোনায়। তারা থাকতেন সোঁতাটার ওই কিনারে, অর্থাৎ এখন যেটা হুয়ান বে. হুসতো (Juan B. Justo) স্ট্রিট, যেখানটায় পাইপের মতো হয়ে বয়ে গেছে সোঁতাটা। এবং আমার মনে হয়- আমি কথা বলেছি ভিইয়া ক্রেসপো (Villa Crespo) ডিস্ট্রিক্টের লোকজনদের সঙ্গে, কথা বলেছি ফ্লোরেস সেকশনের লোকদের সাথেও- ওই মানদোনাদো সোঁতাটার ছিল একটা বিশেষ প্রবণতা, কী কারণে তা অবশ্য আমি জানি না, কিংবা জানি না সুনির্দিষ্টভাবে: যেহেতু সোঁতাটা ছিল বিশ্রী একটা ড্রেনেজ খাদ, তাই এর একটা প্রবণতা হলো এই যে, এর ধারে গজিয়ে ওঠে বিশ্রী ধরনের এক জনপদ। কিংবা কিছু লোক কোনো-না-কোনোভাবে খুঁজে বের করেছে ওই দরিদ্র জনপদটাকে। আর রাস্তার নাম দেখে মনে হয় ব্রোথেলগুলো ছিল ওইসব রাস্তার ধারেই। আমার মনে হয় ওইসব রাস্তার নাম এখনো হ্যামবোল্ট স্ট্রিট কিংবা ডারউইন স্ট্রিট; প্রকৃতিবাদীদের নামে নাম। কিংবা গদই ক্রুস (Godoy Cruz) স্ট্রিট, পাসিফিকোর এই পাশটায়, মোটামুটি তার আশেপাশেই। এবং আমার বিশ্বাস, বদনামখচিত ওই ধরনের বাড়িগুলোকে আর অন্ধকার জগতের বাসিন্দা গোছের ওই স্থানীয়দেরকে, ক্যালাব্রায়ান ব্র্যান্ডের (Calabrian brand) মানুষদেরকে, দেখতে পাওয়া যেত মালদোনাদো সোঁতার পাড়ে। অবশ্য, ওটা একটা লম্বা সোঁতা, বেশ লম্বা একটা খাদ। কারণ আমি মালদোনাদো সোঁতাটাকে দেখেছি ভিয়া লুরো ডিস্ট্রিক্টে, যেখানে রয়েছে এমনসব রাস্তা যাদের নাম রাখা হয়েছে কবিদের নামে…, এই যেমন ধরুন ভার্জিল স্ট্রিট, হোমার স্ট্রিট…এইসব

ফের্নান্দো: সেদিন পুরনো কিছু বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিলাম, হঠাৎ করে আর্তুরো হুয়ারেৎচের (Arturo Jauretche) ১৯৩৪ সালের একটা বই এল পাসো দে লিব্রেস (El Paso de los Libres), তাতে দেখলাম…

ascasubi.jpg
বোর্হেস: আমার লেখা একটা গৌরচন্দ্রিকা, তাই না? হ্যাঁ, কিন্তু অবাক হচ্ছেন যে! আমি মনে করি ওই বইয়ে বেশ কিছু ভালো কাব্যপঙ্ক্তি আছে। এবং আমি মনে করি, যদিও আমরা এখন রাজনৈতিক বেড়ার দুই বিপরীত পাশে, তার মানে এই নয় যে সেই সময়ে তিনি যে কবিতাগুলো লিখেছেন সেগুলোকে খারাপ বলব। অর্থাৎ আজকাল আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হয় না (বলব না যে আমি তাঁকে এড়িয়ে চলছি, কারণ আমার চোখের অবস্থা এতটাই খারাপ যে আমি কাউকে এড়াতে পারি না)। তবে, মোট কথা, এখন আমাদের মধ্যে দূরত্ব অনেক; তিনি হয়ে উঠেছেন একজন পেরনপন্থী, এইসব আর কি… তবে কবিতার বেশ কিছু ভালো পঙ্ক্তি ছিল বইটাতে। এনরিক আমোরিমের মাধ্যমে তাঁর সাথে পরিচয় আমার, কেননা উরিবুরু বিপ্লবের পর তিনি চলে যান উরুগুয়ে। এনরিক আমোরিমের বিয়ে হয় এস্তের আএদো (Ester Haedo) নামের আমার এক কাজিনের সঙ্গে, ওদের ওখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় আমার। তিনি তাঁর বইয়ের একটা গৌরচন্দ্রিকা লিখে দিতে বলেন আমাকে, আর যেহেতু বইটাতে সত্যি কিছু ভালো কবিতা ছিল, ছিল বেশ কিছু পঙ্ক্তি যা মাঝে-মাঝে মনে করিয়ে দেয় ইলারিও আস্কাসুবির (Hilaro Ascasubi) কণ্ঠস্বর, যিনি গাউচো ঘরানার সেইসব কবিদের অন্যতম যাদের আমি প্রশংসা করি-, তাই ওই প্রবেশক লেখাটুকু লিখে দিই আমি এবং লিখেছি যে তাতে আমি লজ্জিত নই।

ফের্নান্দো: না। ব্যাপার হলো প্রথমত আমি জানতাম না যে হুয়ারেৎচে (Jauretche) কবিতা লিখেছেন। আমি বরং তাকে জানতাম একজন রাজনীতিবিদ হিসাবে…

বোর্হেস: তাই? আর তিনি যে এখন রাজনীতি করেন আমিও তা জানতাম না। অনেকদিন হলো কোনো খবর পাই না তাঁর…

ফের্নান্দো: তিনি যে সিনেটের একজন প্রার্থী ছিলেন, সে-ও বছর দশেক আগে, জানতেন না?

বোর্হেস: কে, হুয়ারেৎচে (Jauretche)??? না তো, জানি না তো। জানি না কত বছর যে হবে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় না আমার। কোনো খবরও পাইনি তাঁর। এমনকি তাঁকে যারা চেনেন এমন কারুর সঙ্গে পরিচয়ও নাই। মাঝে মাঝে তাঁর নাম কানে আসে কেমন-যেন এক ধরনের ঝাপসা তরিকায়… তবে যাই হোক, তাঁর কবিতার বইয়ের গৌরচন্দ্রিকা লিখেছি, সেজন্য লজ্জার কোনোই কারণ নাই আমার; বইটা আমার ভালো লেগেছিল এবং যদি আমাকে আবার পড়তে হয়, সম্ভবত এখনো ভালো লাগবে।

ফের্নান্দো: লা ফুন্দাসিওন মিতিকা দে বুয়েনোস আইরেস (বুয়েনোস আইরেসের পৌরাণিক বুনিয়াদ) বইতে আপনি একটা বাক্য লিখেছিলেন এরকম: “সহিসেরা তাদের মতামতের ব্যাপারে নিশ্চিত: ইরিগোয়েন (Yrigoyen)” এই যে বাক্যটা, এটা কি নিন্দার্থে বলা হচ্ছে, নাকি এটা সহিসদের যে মতামত তার প্রেক্ষিতে একাত্মতাসূচক একটা বাক্য?

বোর্হেস: আমি খুশি যে আপনি কথাটা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি ছিলাম একজন র‌্যাডিক্যাল (ইউনিয়ন সিভিকা রাদিকাল: একটি গণমুখী পার্টি); র‌্যাডিক্যাল পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম আমি। তবে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক কারণে এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম আমি: কারণটা আর কিছুই না, আমার নানাজান ইসিদোরো আসেবেদো (Isidoro Acevedo) ছিলেন আলেম-এর (Alem) একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু; কারণ স্রেফ এটাই, আর কিছু না। সুতরাং ঐতিহ্যগতভাবে আমি ছিলাম র‌্যাডিক্যাল। কিন্তু তারপর, র‌্যাডিক্যালেরা যখন ক্ষমতায় এল, তখন আমি টের পেয়ে গেলাম যে তারা হলো দেশের জন্য একটা মহাগজব। ভাবলাম, আমার পক্ষে অবাস্তব ও অসম্ভব র‌্যাডিক্যাল হয়ে থাকাটা; সেইসব কারণে অসম্ভব যেসব জড়িত, এই ধরুন, পবিত্রতার সঙ্গে, পিতৃপুরুষ-অর্চনার সঙ্গে। কিংবা কুলুজিগত কারণেও সম্ভব নয় আমার পক্ষে র‌্যাডিক্যাল হয়ে থাকা। এবং তারপর, ভোটের চার বা পাঁচ আগে হারদয়ের (Hardoy) সঙ্গে দেখা করে বললাম, “আপনার পার্টিতে আমি যোগ দিতে চাই।” এটার একটা পূর্ব-ইতিহাসও আছে। একদিন আমি এক লেখিকার সঙ্গে আলাপ করছিলাম। কথাপ্রসঙ্গে তিনি আমাকে হঠাৎ বলে বসলেন, “আপনি তো একজন কনজারভেটিভ হিসাবে বলছেন এই কথা,” তখন আমি তাঁকে বললাম, “না, আমি কনজারভেটিভ নই, আমি একজন র‌্যাডিক্যাল।” তখন তিনি বললেন, “না, না, মর্মগতভাবে আসলে আপনি একজন কনজারভেটিভ।” পরে আমি দেখলাম যে তিনি ঠিকই বলেছেন। এটা একটা কারণ ছিল যা আমাকে এগিয়ে দিয়েছে কনজারভেটিভ পার্টির দিকে। তা ছাড়া, আমি টের পেলাম- যখনই আমার কনজারভেটিভ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলি তখনই দেখি তাদের সাথে সব ব্যাপারে মতের মিল হচ্ছে আমার। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তাই যোগ দিই কনজারভেটিভ পার্টিতে। হারদয় অবশ্য আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন পার্টিতে যোগ না দেবার ব্যাপারে; তিনি বললেন, “এটা হয় না, আমাদের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নাই নির্বাচনে জেতার।” আমি তখন মন্তব্য করলাম, “কেবল হেরে-যাওয়া কাজের ব্যাপারেই আগ্রহ থাকে একজন ভদ্রলোকের।” শুনে তিনি বললেন, “ও, তাই? বেশ, তাহলে আমি আর একটা কথাও খরচ করব না।”

ফের্নান্দো: তবে যে-সময় গৌরচন্দ্রিকা লিখে দিয়েছিলেন হুয়ারেৎচের জন্য, এটা সেই সময়কার কথা নয়… এটা নিশ্চয়ই তারও বছর দশেকের আগেকার কথা, তাই না?

বোর্হেস: না, আমার মনে হয়, অত না, অবশ্যই কিছু কম হবে…

ফের্নান্দো: সালটা নিশ্চয়ই ১৯৬৩ হবে, মোটামুটি ইলিয়া-র নির্বাচনে জেতার সময়টায়।

বোর্হেস: হ্যাঁ, ঠিক। আর তারপর থেকে মনে হয়েছিল কনজারভেটিভ পার্টিতে যোগ দিয়ে ভালোই করেছি। তবে আমি রাজনীতিতে কখনোই সক্রিয় ছিলাম না, এমনকি যখন আমি র‌্যাডিক্যাল পার্টিতে ছিলাম, তখনো না। আমি যখন কনজারভেটিভে যোগ দিই, তখন স্বভাবতই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং আমি সম্ভবত কিছু বক্তৃতাও দিয়েছিলাম। কিংবা বক্তৃতা নয়, বরং বলা যায়, পার্টির কয়েকটা কমিটিতে কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম, কনজারভেটিভ সরকারের মেয়াদকাল ছিল দেশের জন্য সবচেয়ে সম্মানের, সবচেয়ে উন্নতির, সবচেয়ে মর্যাদার যুগ। তবে ওইটুকুই, আমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল ওইটুকুতেই। এটা সত্য, রাজনীতির জন্য কেউ কোনো ডাক দেয়নি আমাকে।

ফের্নান্দো: ইপোলিতো ইরিগোয়েন-এর সেই রহস্যজনক ভাবমূর্তির ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে দেখেছিলেন?

বোর্হেস: আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি কখনো। আমার পরিবার, হ্যাঁ; তারা ছিল তাঁর বন্ধু। আমি কখনো দেখা করিনি তাঁর সঙ্গে, এবং মজার ব্যাপার হলো ইরিগোয়েন লালন করতেন রহস্যের ওই বাতাবরণটুকু। এমনকি এটাও বলা হতো, রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি অবিরাম চালিয়ে যেতেন নানা ষড়যন্ত্র, সারাজীবন ধরেই যেমনটা তিনি করতেন। এবং, অন্য যে শাসকটা যার নাম আমি মনে করতে চাই না (পেরন), তার মতো অতটা বুদ্ধিমান ইরিগোয়েন ছিলেন না ঠিকই, তবে তাঁর ছিল চারিত্রিক অখ-তা। যেমন, তাঁর জীবনযাপন ছিল শাদাসিদে, থাকতেন ব্রাজিল স্ট্রিটের একটি বাড়ির অ্যাপার্টমেন্টে যেখানে তাঁকে উঠতে হতো সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে। অন্যান্য একনায়কেরা ছিল বিলাসব্যসনের ভক্ত, তাদের যাতায়াত ছিল কোলন থিয়েটারে। ওদের মতো নাকউঁচু ভাব ছিল না ইরিগোয়েনের। তিনি এসেছিলেন খানদানি পরিবার থেকে; ‘হাই সোসাইটি’ পার্টিতে যাতায়াতে আগ্রহী হন নাই তিনি কখনো, প্যারিসে গিয়ে কাপড়চোপড় কেনার ব্যাপারে কখনো উদ্গ্রীব হয়ে থাকত না তাঁর মেয়ে; যত্রতত্র ছবি থাকবে তাঁর, সেটাও দেখতে চাইতেন না তিনি। মোট কথা, অপরিচিত শাদাসিদে এক আর্হেন্তিনীয় ভদ্রলোকের মতোই থাকতেন তিনি, আবার একইসঙ্গে তিনি ছিলেন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টও বটে।
hipolito-yrigoyen.jpg
ইরিগোয়েনের কথা উঠলই যখন, তখন বলি- জানি না তাঁর একটি মন্তব্য আমরা মনে রেখেছি কিনা…। একবার একদল লোক, যারা তাঁকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল দ্বিতীয় বারের মতো (অবশ্য তাঁর জন্য দুর্ভাগ্য), দেখা করতে গিয়েছিল তাঁর কাছে। সেই বৈঠকে তাদের একটা কথার জবাব দিতে গিয়ে ইরিগোয়েন একটা মন্তব্য করেছিলেন, অনেকটা প্রফেটিক ভঙ্গিতে: “আপনাদের আমি এখন বলতে যাচ্ছি এমন একটা কথা যা বলত বালভানেরার বাসিন্দারা (বালভানেরা- সেপ্টেম্বর ১১- হলো ইরিগোয়েনের নিজের ডিস্ট্রিক্ট, যেখানে আলেম ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক গুরু)। কথাটা হলো- সবসময় সবকিছু এত খারাপ গেছে আমার, যে, কখনো যদি ভালো যায় তখন ভয় লাগে খুব।” এবং বৃষ্টির মতোই তা সঠিক। কারণ, ইরিগোয়েন যদি হেরে যেতেন ওই নির্বাচনে, তবে আমরা তাকে মনে রাখতাম, বা, আমাদের মনের মধ্যে তিনি রেখে যেতেন একজন উত্তম রাষ্ট্রপতির ভাবমূর্তি বা একজন সম্মানীয় ব্যক্তিত্বের স্মৃতি (অবশ্য এখনো তিনি একজন সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব)। সত্যি বলতে-কি, দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচিত না হওয়াটাই ভালো ছিল তাঁর জন্য। তা ছাড়া তিনি মেনে নিয়েছিলেন উরিবুরুর বিপ্লবকে। অর্থাৎ যখন তিনি বুঝতে পারলেন দেশ তাঁকে চাচ্ছে না রাষ্ট্রপতি হিসাবে, তখন তিনি চাপা দিয়ে রাখেননি বিষয়টা।

ফের্নান্দো: ফ্রান্সিসকো লোপেজ মেরিনোকে একবার একটা কবিতা উৎসর্গ করেছিলেন আপনি। তাঁর সম্পর্কে কোনো স্মৃতি আছে কি আপনার?

বোর্হেস: লোপেজ মেরিনোকে নিয়ে খুব সূক্ষ্ম কিছু স্মৃতি আছে আমার। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম আমরা। আমি জানি আত্মহত্যা করেছিল সে। কারণ সে একদিন আবিষ্কার করল যে, যক্ষা হয়েছে তার। লা প্লাতা থেকে বুয়েনোস আইরেসের ডাক্তারের কাছে নিজের একটা এক্স-রে রিপোর্ট নিয়ে যাবার সময় ইনভেলাপটি খুলে ফেলেছিল সে। আমার ধারণা এটা ১৯২৮ সালের কথা। তখন যক্ষা ছিল নিরাময়-অযোগ্য একটা ব্যাধি। অতএব সিদ্ধান্ত: আত্মহনন। তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা আমাদের বাড়িতে। আমরা তখন থাকতাম মন্টেভিডিও আর রদ্রিগেস পেনঞা-র (Rodrigues Peña) কিনতানা (Quintana) অ্যাভেনিউয়ে। স্নেহবশত আমরা তাকে পানচিতো লোপেজ মেরিনো বলে ডাকতাম। তো, প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি দুই সপ্তাহে একবার করে সে আসতই আমাদের বাসায়। তারপর লা প্লাতা-র ফিরতি ট্রেন ধরতে তাকে হেঁটে যেতে হতো দীর্ঘ পথ, রেকোলেটা ডিস্ট্রিক্ট থেকে সেই কনসটিটিউসিয়ন স্টেশন পর্যন্ত। আমাদের সঙ্গেই সে রাতের খাবার খেয়েছিল। রাতে একটু আগেভাগেই বিছানায় যেতেন আমার বাবা। লোপেজ মেরিনো বলল: “ডঃ বোর্হেস কোথায়? বিদায় জানাতে চাই তাঁকে।” ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন আমার বাবা। কিছু কিছু মানুষ থাকে-না, যারা বালিশে মাথা রাখার সাথে-সাথে ঘুমিয়ে পড়ে, আমার বাবাও ছিলেন সেরকম। (বাবা একদিন আমাকে বলেছিলেন, “ঘুমাতে যাবার আগে তিনি ভাবতেন এক কাল্পনিক দেশের কথা- অবশ্য তিনি দেশটার ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে চাইতেন না। তারপর দেশটাকে নিয়ে শুরু করে দিতেন স্বপ্ন দেখতে আর ঘুমিয়ে পড়তেন দ্রুত)। আমি তাই জানি বাবা ঘুমিয়ে গেছেন এতক্ষণে। মা পানচিতোকে বললেন- উনি তো ঘুমিয়ে গেছেন, আচ্ছা কাল আমি ওনাকে বলব যে লোপেজ মেরিনো তোমাকে গুডবাই জানিয়ে গেছে। লোপেজ মেরিনো ছিল খুব আদবদুরস্ত ব্যক্তি, তবু এক ধরনের একরোখা ভাব নিয়েই বলে উঠল সে: “তবু আমি একটু বিদায় জানিয়ে যেতে চাই ডঃ বোর্হেসকে।” (এই নামেই সে ডাকত আমার বাবাকে)। আমি তাই ওপর তলায় বাবার রুমে গিয়ে জাগিয়ে দিলাম তাঁকে; বললাম, “বাবা, লোপেজ মেরিনো বিদায় জানাতে চাইছে তোমাকে।” বাবা অবাক হলেন একটু। লোপেজ মেরিনো ভেতরে ঢুকে বাবাকে বললেন: “আপনাকে গুডবাই জানাতে চাই, ডঃ বোর্হেস।” হাত নেড়ে বিদায় নিলো সে। আর তারপর, দিন দশেক পর আত্মহত্যা করল। তখন আমরা বুঝলাম কেন সে বিদায় জানাতে চেয়েছিল। সে বিদায় জানাতে চেয়েছিল কারণ সেই বিদায় জানানোটা শুধুই ভদ্রতা বা আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে নয়, সে আসলে প্রকৃত বিদায়ই জানাচ্ছিল। অর্থাৎ সে জানত যে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে সে অচিরেই। তা-ই যদি না হবে তাহলে তার সেদিনকার সেই একরোখা আচরণের ব্যাখ্যা কী? আমার মনে পড়ে সে আত্মহত্যা করেছিল মা-র জন্মদিনে, ২২ মে তারিখে। পেছনের বহির্বাটিতে ইয়ারবন্ধুদের ছোট্ট একটা গ্রুপে শ্যাম্পেন খাচ্ছিলাম। তুমুল বৃষ্টি। এমন সময় তারা আমাকে এল মুন্দো (El Mundo) পত্রিকার কথা কিছু একটা বলল। তারাই খবরটা দিল আমাকে, তার সম্পর্কে কিছু বলতে বলল। এরপর সেই ঘটনাটাই ঘটল যা সচরাচর ঘটে থাকে যখন লোকে কারুর বন্ধুর প্রসঙ্গ তোলে। হয়তো তার একটা সূক্ষ্ম ভাবছবি আছে আপনার মনের ভেতর, কিন্তু তা দিয়ে তার সম্পর্কে কথা বলা বা সেই ভাবছবি অন্যের ভেতর সঞ্চারিত করা খুব কঠিন কাজ।

ফের্নান্দো: বিশেষ কোনো খবরের কাগজ পড়ে আপনি আনন্দ পান?
বোর্হেস: খবরের কাগজই পড়ি না আমি ।

ফের্নান্দো: এমনকি অন্ধত্বের আগেও না?

বোর্হেস: খবরের কাগজ আমি কখনোই পড়িনি। পড়িনি কারণ সমসাময়িক ঘটনার চেয়ে বরং বহুদিন আগে কী ঘটেছে সেই ব্যাপারে আমার আগ্রহ বেশি। এটা আমার এক ধরনের বিকারও বলতে পারেন। মনে পড়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন আমি জেনেভায়। সে সময় আমি প্রাচীন ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করছিলাম। তখন ভাবতাম, সম্পূর্ণ নিরীহ ভঙ্গিতে, আমার বয়স তখন চৌদ্দ কি পনেরো হবে- ভাবতাম: “কী অদ্ভুত হঠাৎ করে এখন সবাই ইতিহাস বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন; কী অদ্ভুত কেউই আর আগ্রহী নন কার্থেজের যুদ্ধ কিংবা পারসিক ও গ্রিকদের মধ্যকার যুদ্ধের ব্যাপারে, কী অদ্ভুত সবাই এখন আগ্রহী সাম্প্রতিক ইতিহাসের ব্যাপারে।” তা ছাড়া, আমার মনে হয়েছিল ঠিক এই সময় কী ঘটছে তা জানতে পারাটা সম্ভবত খুব একটা সহজ নয়। মেসেদোনিও ফেনান্দেসের একটা মন্তব্যের কথা মনে পড়ল- সবসময় ঘুরে-ফিরে চলে আসছে তাঁর কথা- “ইতিহাসবিদ, তারা অতীত বিষয়ে তেমনটাই এলেমদার, যেমনটা আমরা বর্তমান বিষয়ে অজ্ঞ।” এটা এতটাই যে, মানুষ যখন চাঁদে গেল তখন আমি জানতাম না যে এটা আমার ওপর কোনো আবেগী প্রভাব ফেলবে। আমি ভাবতাম, বিজ্ঞানের লক্ষ্য যেমনটা তাতে এটা এমন একটি ঘটনা যাকে আগে হোক পরে হোক ঘটতেই হতো। এবং তা সত্ত্বেও ঘটনার সপ্তাহখানেক আগে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলাম; ভয় পাচ্ছিলাম মিশন ফেল করে যদি! আর তারপর, সত্যিই যখন মানুষ গিয়ে দাঁড়াল চাঁদের পিঠে, তখন এমন এক আবেগ বোধ করছিলাম যাকে বলা যায় অন্তরঙ্গ, ব্যক্তিগত। একইসঙ্গে আমি উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম এই ধারণায় যে, ঘটনাটা অবশেষে ঘটল আর তার সঙ্গে শুধু তাঁরাই শামিল ছিলেন না যাঁরা এর পরিকল্পনা করেছেন, বাস্তবায়ন করেছেন; বরং শামিল ছিলাম কোনো-না-কোনোভাবে আমরা সবাই। এতে খুব খুশি লাগছে আমাদের সবারই, গর্ববোধ করছি আমরা সবাই। চাঁদের দিকে তাকিয়েছে সবাই, কামনা করেছে ঘটুক এমন একটা ঘটনা এবং তৃপ্তিবোধ করেছে নিশ্চয়ই সবাই। আর তার পরপরই ভাবলাম- ভুলও হতে পারে ভাবনাটা- এই যে তিনজন মানুষ চাঁদে গেলেন, তথ্যটা এমন একটা কিছু যা সকল মানুষকে করতে পারে একত্রিত। কারণ, এটা সেই ধরনের একটা কাজ যার অংশভাক্ সমগ্র মানবজাতিই, হতে পারে তারা মার্কিনী, কিংবা হাঙ্গেরীয়, কিংবা চীনা, কিংবা…

ফের্নান্দো: লা প্রেনসা-য় (La Prensa) একবার পড়েছিলাম- আপনাকে যদি তিনজন আর্হেন্তিনীয় লেখকের কাজকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে অবশ্যই একটা হবে বিসেন্ত ফিদেল লোপেসের (Vicente Fidel Lopez) ‘ইস্তোরিয়া’। বইটাকে আপনি এতটাই পছন্দ করেন, কেন?

বোর্হেস: কোনো কিছুকে আমরা কেন পছন্দ করি, বিষয়টা আসলে ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন।

ফের্নান্দো: তাহলে মিত্রে-র (Mitre) সঙ্গে তুলনা দিয়েই বলুন।

বোর্হেস: আমার মনে হয়, লোপেজের কণ্ঠস্বরে আছে এক ধরনের অন্তরঙ্গতা, যা মিত্রে-র মধ্যে নাই। এবং আমি বিশ্বাস করি লোপেজের যে কাজগুলো, সেগুলো সৃজিত হয়নি কোনো প্লাটফর্ম হিসাবে যার ওপর স্থাপন করা যায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিত্বকে। অন্যদিকে, ‘ইস্তোরিয়া দ্য সান মারতিন’ বা ‘ইস্তোরিয়া দ্য বেলগ্রানো’ লেখা হয়েছিল অনেকটা প্ল্যাটফর্ম হিসাবে, সৌধ হিসাবে: যা তৈরি করা হয়েছে বিশেষ কোনো ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্যে। পক্ষান্তরে, আমার মনে হয় বিসেন্ত ফিদেল লোপেস গ্রহণ করেছেন সমগ্র আর্হেন্তিনীয় ঐতিহ্যকে, একইসঙ্গে নিয়েছেন তার ত্রুটিগুলোকেও।

ফের্নান্দো: বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে কীভাবে, কোথায়, কখন দেখা হয়েছিল আপনার?

বোর্হেস: একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম- বরং বলা যায়, আমি লিখেছিলাম একটা বক্তৃতা আর কেউ একজন পড়েছিল সেটা (জনসমক্ষে বক্তৃতা দেবার সাহস ছিল না আমার)। লেখাটা ছিল এল ইদিওমা দে লোস আর্হেন্তিনোস (El idioma de los argentines) বা আর্হেন্তিনীয়দের বুলি-র ওপর। বেশ গালভরা একটা শিরোনাম অবশ্য। এখন হলে বরং বক্তৃতা দিতাম হিস্পানি ভাষার আর্হেন্তিনীয় স্বরের ওঠানামা বিষয়ে, বক্তৃতা দিতাম হিস্পানি ভাষার আর্হেন্তিনীয় শ্বাসাঘাত বা ঝোঁক নিয়ে, কিন্তু কক্ষনোই ভিনভাষা নিয়ে নয়। এবং আমার সেই বক্তব্যের সঙ্গে একমত ছিলেন বিক্তোরিয়া। তারপর তিনি আমাকে একটা চিঠি লেখেন এবং আমার বাড়িতে আসেন। এটা তখনকার কথা যখন আমরা থাকতাম কিনতানা অ্যাভেনিউয়ে। এবং তারপর থেকে তিনি আমার প্রতি ছিলেন অত্যন্ত দয়াবান।
ocampo-y-borges.jpg পরবর্তীকালে যখন প্রতিষ্ঠিত হলো স্যুর পত্রিকাটা, আমাকে তিনি নিয়ে নিলেন এর সম্পাদকম-লীতে। পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল আমার বোনের করা একটা খোদাই কাজ, আর আস্কাসুবি-র কাজের ওপর লেখা আমার একটা প্রবন্ধ, যা তলিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে (সত্যি অবিচার করা হয়েছে তার প্রতি)। এবং তারপর থেকে বিক্তোরিয়া আর আমি ছিলাম পরস্পরের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তা ছাড়া, ন্যাশনাল লাইব্রেরির পরিচালকের পদের ব্যাপারে আমি ঋণী তাঁর কাছে, এবং এস্তের সেমবোরাইন দে তররেসের (Esther Zemborain de Torres) কাছে, এবং ড. দেল’ওরো মেইনির (Dr. Dell’Oro) কাছেও, এবং রিকার্দো সায়েন্স আ য়েসের (Ricardo Saenz Hayes) কাছে। কারণ, ১৯৫৫-তে, স্বাধীনতা-বিপ্লবের পর, যখন খুব দরকার এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যিনি পেরনপন্থী নন, যিনি সন্দেহের সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে, আমার কথা তখন ভেবেছিলেন তাঁরা। এসতার সেমবোরাইন ভাবলেন আমার কথা, কথা বললেন বিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে, বিক্তোরিয়া কথা বললেন ড. সেবাস্তিয়ান সোলেরের (Dr. Sebastian Soler) সঙ্গে, তারপর প্রচারণা শুরু করে দিলেন তাঁরা লাইব্রেরির পরিচালক পদে আমার নিয়োগের ব্যাপারে। বিষয়টা জানার পর কথা বললাম বিক্তোরিয়ার সঙ্গে। বললাম, ন্যাশনাল লাইব্রেরির যতটুকু-না আমি চিবুতে পারব, কামড়াতে থাকব তার চেয়ে বেশি। তাঁকে আরো বললাম: অতি লোভে তাঁতী নষ্ট- যদিও এটা খুব একটা মৌলিক মেটাফর নয়, তবু যা হোক… – বিক্তোরিয়াকে আরো বললাম: “আমাকে, এই ধরুন, লোমাস দে সামোরা-র (Lomas de Zamora) লাইব্রেরির ডিরেক্টরের পদে নিয়োগের ব্যাপারে চেষ্টা করছেন না কেন আপনারা, যাতে আমি থাকতে পারি লোমাসে, যে-শহরটা আমার খুব পছন্দের একটা শহর।” বিক্তেরিয়া বললেন: “বোকার মতো কথা বোলো না তো!” এরপর সত্যি-সত্যি কিছুদিন পর অক্টোবরের ১৭ তারিখে (বিপ্লব হয়েছিল সেপ্টেম্বরে), একদল লেখকের সঙ্গে গেলাম জেনারেল লোনার্দিকে অভিবাদন জানাতে। মনে পড়ে সেই দিনটার কথা। আমরা ছিলাম প্লাসা দে মাইয়ো-তে (Plaza de Mayo)। এক কোনায় ছিল ভয়ে-ভয়ে-থাকা পেরনপন্থীরা, নিরাপত্তা স্কোয়াডের তীক্ষ্ণ নজরদারির মধ্যে। কিছুক্ষণ পর-পর তারা চোখ তুলে তাকাচ্ছে আকাশের দিকে, খুঁজছে একটা কালো উড়োজাহাজকে। এরকমটাই বলাবলি হচ্ছে তখন। ভাবলাম: “কী অদ্ভুত! ঢুকতে যাচ্ছি রাষ্ট্রপতি-প্রাসাদে। একনায়কটা আর নাই প্রাসাদে। এবং এই প্রথমবারের মতো করমর্দন করতে যাচ্ছি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে… স্বপ্নের মতো লাগছে সবকিছু।” তারপর রাষ্ট্রপতি এলেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। আমি ছিলাম সবার পেছনে। সবাইকে নাম বলতে হচ্ছিল যার যার। নাম বললাম আমার। অমনি জেনারেল লোনার্দি বলে উঠলেন: “ন্যাশনাল লাইব্রেরির ডিরেক্টর, যদি আমি ভুল না করে থাকি।” এবং এরপর মুহিকা লাইনেস (Mujica Lainez) বা অন্য কেউ একজন বললেন: “ইয়োর এক্সেলেন্সি, এই যে কথাগুলো বললেন, শুনে আমরা খুব সন্তুষ্ট বোধ করছি।” আমি তো থ। তারপর একসময় চলে এলাম আমরা। বাড়ি গেলাম; মা জিজ্ঞেস করলেন: “কেমন হলো সাক্ষাৎ, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে?” বললাম: “ভালো।” মা তখন বললেন: “তাঁরা শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলেছেন তোমার সাথে, তাই না?” আমি বললাম: “ও, তুমি নিশ্চয়ই জানতে চাইছ লোনার্দি আমাকে কী বলেছেন, তাই না?” মা-র কাছে তখন ভেঙে বললাম: “লোনার্দি বললেন আমি নাকি ন্যাশনাল লাইব্রেরির পরিচালক।” সেই রাতে, মা আর আমি হাঁটতে বেরুলাম। এখানে, এই মেহিকো স্ট্রিটে এসেছিলাম আমরা। মা বললেন: “এখন তো তুমি এই লাইব্রেরির ডিরেক্টর, যাও, ঢোকো না কেন ভেতরে? চলো গিয়ে একটু দেখে আসি কেমন সবকিছু, ভেতরটার!” আমার ভেতর রয়েছে এক ধরনের কুসংস্কারমূলক ভয়। বললাম: “না মা, ঢুকব না আমি, যতক্ষণ-না আমাকে বলা হয়, সব ঠিক আছে, পাকাপাকি হয়ে আছে আপনার নিয়োগের বিষয়টা…” এবং সত্যি বলতে-কি, ঢুকিনি আমি।” পরদিন সকালে আমার নিয়োগের ব্যাপারে জানানো হলো মন্ত্রণালয় থেকে। বলা হলো, লাইব্রেরি পরিচালনার দায়িত্বভার আমি নিতে পারি এখন। এবং পুরো ব্যাপারটা ছিল যেন একটা প্রীতি-আখ্যানের প্লট, যার স্বপ্ন দেখেছিলেন এসতার সেমবোরাইন দে তোররেস, আর যার আয়োজনে ছিলেন বিক্তোরিয়া ওকাম্পো আর আমার অন্যান্য বন্ধুরা।

ফের্নান্দো: ডিরেক্টর হওয়ার আগে লাইব্রেরিতে আসা যাওয়ার অভ্যাস ছিল না আপনার?

বোর্হেস: আমি ছিলাম খুব ভীরু স্বভাবের। আমি প্রায়ই আসতাম ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ঠিকই, কিন্তু পড়তাম ওই একটিমাত্র বই, এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা। কারণ আমি জানতাম এনসাইক্লোপেডিয়াটা থাকত সাইড শেল্ফে; ফরমাশ দিতে হতো না লাইব্রেরিয়ানের কাছে। খুবই সোজা ছিল ব্যাপারটা। একেক সময়ে এনসাইক্লোপেডিয়াটার একেক খণ্ড পড়তে নিতাম। (এনসাইক্লোপেডিয়াটার একটা পুরনো সংস্করণ আছে লাইব্রেরিটাতে, বলা যায়, সেইসব সংস্করণের একটি যেগুলি প্রকাশিত হতো হতো শুধুমাত্র পড়বার জন্য, ‘রেফারেন্স’-এর জন্য নয়। সেগুলিতে থাকত দীর্ঘ সব প্রবন্ধ। যা-হোক, পরিসংখ্যানটা বইয়ের পৃষ্ঠায় আছে কি নাই তা নিয়ে আমি, বলতে-কি, থোড়াই কেয়ার করতাম- ওসব ব্যাপারে আমি আগ্রহী নই।) আমার মনে পড়ছে সেই মনোরম সন্ধ্যার কথা, যখন আমি লাইব্রেরিতে বসে ড্রুইড আর ড্রুজদের ব্যাপারে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম; এনসাইক্লোপেডিয়ার পাতায় ‘ড্রুইড’ আর ‘ড্রুজ’ শব্দ দুটি স্বভাবতই পরস্পরের কাছাকাছি। অর্থাৎ আমি প্রায়-প্রায়ই আসতাম লাইব্রেরিতে এবং অবশ্যই জানতাম, গ্রৌসাক (Groussac) ছিলেন তখন লাইব্রেরির পরিচালক। কিন্তু সাহস হতো না তাঁর কাছে যেতে, কারণ তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল খুব খর্খরে। মোট কথা, তাঁর সঙ্গে কথা বলাটা হতো অপ্রীতিকর। গ্রৌসাক ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি অল্পতেই মেজাজ খারাপ করতেন। তা ছাড়া, তাঁর নিজের কাছে এমন লাগত যেন নির্বাসনে আছেন তিনি। গ্রৌসাক ভাবতেন বড় একজন ফরাসি লেখক হবেন তিনি এবং সেটাই তাঁর আসল নিয়তি। এখানে, পৃথিবীর এই শেষ প্রান্তে এসে বাস করতে হচ্ছে তাঁকে, ব্যাপারটা খুব কষ্ট দিত তাঁকে। তিনি লিখেছিলেন সেই বাক্যটি: “দক্ষিণ আমেরিকায় কেউ বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারেন ঠিকই, কিন্তু তারপরও তিনি থেকে যেতে পারেন অপরিচিত।” তাঁর এই কথায় ফ্রান্সের জন্য তাঁর নস্টালজিয়া ও এক ধরনের তিক্ততা লক্ষ করা যায়।

ফের্নান্দো: এদুয়ার্দো মাইয়েয়া-ও (Eduardo Mallea) তো স্যুর পত্রিকার সম্পাদনা পর্ষদে ছিলেন…
eduardo-mallea.jpg
বোর্হেস: হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার… কিন্তু ঠিক কেমন করে সেটাই বলছি। কোনো এক রোববারে একদল তরুণ লেখক এলেন আমার বাড়িতে। তাদের চেয়ে আমি চার কি পাঁচ বছরের বড় হব, এবং বয়সের এই পার্থক্যটা সেই আমলে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার ছিল। এখন হয়তো গুরুত্ব নাই, কারণ সময়ের সাথে সবকিছু সমান হয়ে আসে। তো সেই লেখকরা হলেন: লিওনিদাস দে বেদিয়া (Leonidas de Vedia), কার্লোস আলবের্তো এররো (Carlos Alberto Erro), সাসলাভস্কি (Saslavsky), মাইয়েয়া, এবং আরো কেউ একজন। তারা আমাকে বললেন, একটা পত্রিকা করতে যাচ্ছেন তারা আর তার জন্য একটা কবিতা চাইলেন আমার কাছে। আমার বেশ গর্ববোধ হলো, এবং একইসঙ্গে একটু ভয়ও হলো, কবিতাটা পড়েই হয়তো তারা একবাক্যে খারিজ করে দেবেন। কিন্তু যাই হোক, তাদেরকে আমি অভ্যর্থনা জানালাম, কবিতা দিলাম, এবং কিছুদিন পর তারা আমাকে কবিতাটার প্রুফ দেখতে বললেন। আমি ভাবলাম লক্ষণ তো ভালো… মনে হয় পত্রিকাটার নাম ছিল রেবিস্তা দে আমেরিকা (Revista de America), এবং তার তিন-চারটা সংখ্যা বেরিয়ে গেছে ততক্ষণে। তো, আমাদের সেই সাক্ষাৎ-পর্বটা নিয়ে গর্ব হয় আমার।

ফের্নান্দো: মাইয়েয়ার উপন্যাস কি আপনি পছন্দ করেন?

বোর্হেস: হ্যাঁ, বিশেষ করে চাবেস (Chaves) নামের একটা ছোট্ট উপন্যাস, যেটাকে আমার মনে হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ। এবং তারপর একটা ছোটগল্প, নাম মনে আসছে না। গল্পটা একজন ব্যক্তিকে নিয়ে যে ঈর্ষা করত এক আগন্তুককে, এবং তারপর এক পর্যায়ে সে কতকটা উস্কিয়ে দেয় তার স্ত্রীর ব্যভিচারিতা। যেন সারভান্তেসের এল কুরিওসো ইমপেরতিনেন্ত-এর (El curioso impertinente) এক জটিলতর সংস্করণ। এখন, মায়িয়া ছিলেন আমার মতোই ভীরু এক লোক, তাই হয়তো বন্ধুত্ব হয়েছে আমাদের মধ্যে, যদিও ঘনিষ্ঠতা ছিল না খুব একটা। অর্থাৎ তাঁর সম্পর্কে আমার ধারণা বেশ উঁচু, আমার সম্পর্কেও তার ধারণা সেরকম বলেই জানি, কিন্তু আমাদের দেখাসাক্ষাৎ হয় না খুব একটা। কার্লোস মাস্ত্রোনার্দি (Carlos Mastronardi) সম্পর্কেও ওই একই কথা। বরং তাঁর সাথে ব্যাপারটা আরো অদ্ভুত। কারণ, আমি বলব কার্লোস মাস্ত্রোনার্দি আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, আমি ঠিক ‘ঘনিষ্ঠতম’ শব্দটা ব্যবহার করতে চাই না কারণ তাতে অন্যরা বাদ পড়ে যায়, এবং আমি নিশ্চয়ই বাদ দিতে চাইব না, এই ধরেন, আদোলফো বিঅই কাসারেস-কে (Adolfo Bioy Casares), কিংবা মানুয়েল পেইরো-কে (Manuel Peyrou)। এ কথা সত্যি, কার্লোস মাস্ত্রোনার্দির সঙ্গে হয়তো বছরে মাত্র দু-বার দেখা হয় আমার, কিন্তু তাই বলে আমাদের বন্ধুত্ব ফিকে হয়ে আসেনি একটুও।

ফের্নান্দো: কার্লোস আলবের্তো লিউমানকে (Carlos Alberto Leumann) কি চিনতেন?

বোর্হেস: হ্যাঁ, তবে অতটা নয়।

ফের্নান্দো: কোনো লেখা পড়েছেন তাঁর?

বোর্হেস: তাঁর কিছু উপন্যাস পড়েছিলাম; টানেনি আমাকে। মার্টিন ফিয়েরো-র কোনো একটা সংস্করণের মুখবন্ধটাও পড়েছিলাম। মুখবন্ধটায় জোর দিয়ে বলা হয়েছিল এমনকিছু যার ভিত্তি, আমি মনে করি, খুব দুর্বল। তিনি বলছেন, ওই সংস্করণটার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন এমন একটি প্রক্রিয়া যা ব্যবহার করেছেন লাচমান (Lachmann)। আমার বিশ্বাস, কথাটা তিনি বলেছেন নিবেলুনহেনলিয়েদ (Nibelungenlied) বা নিবেলুংসের গান (Song of the Nibelungs) প্রকাশের ব্যাপারে। এখন তাহলে… আমি ঠিক জানি না… মধ্যযুগের একগুচ্ছ পাণ্ডুলিপির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ বের করা আর বুয়েনোস আইরেসে ১৮৭২-এ প্রকাশিত একটা বইয়ের পুনর্মুদ্রণ করা, এ-দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক কী! তা ছাড়া আমার মনে হয় এই ক্ষেত্রটিতে খুব একটা জানাশোনা ছিল না লিউমানের। এবং এখন মার্টিন ফিয়েরো-র কথা উঠলই যখন, আমার বিশ্বাস, মার্টিন ফিয়েরো-র একটি সংস্করণ আছে যাতে রয়েছে মূল্যবান সব টীকাটিপ্পনী। এটা সেই সংস্করণটা নয় যেটা করেছেন তিসকর্নিয়া (Tiscornia); আমি নিশ্চিত। [যেহেতু তিসকর্নিয়া তাঁর কাজটা সীমিত রেখেছেন হিস্পানি পিকারেস্ক উপন্যাসরীতি (ভবঘুরে ও দুষ্ট চরিত্রদের অভিযান বিষয়ে লিখিত উপন্যাসরীতি) আর গাউচো কাব্যঘরানা এ-দুয়ের ভেতরকার একগুচ্ছ কাল্পনিক প্রতিতুলনার মধ্যে]। সংস্করণটা বরং সান্তিয়াগো লুগোনেসের- আমার ধারণা ল্ওেপোল্দো লুগোনেসের (Leopoldo Lugones) কাজিন তিনি- যাঁর সত্যিকার জানাশোনা আছে এই ক্ষেত্রটিতে। এবং যিনি মার্টিন ফিয়েরো-কে নিয়ে বসিয়েছেন মার্টিন ফিয়েরো-র নিজস্ব পারিপার্শ্বিকতার ভেতর; নিয়ে বসাননি পিকারেস্ক স্পেনের সতেরো শতকীয় সেই পারিপার্শ্বিকতায় যার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নাই ১৮৮০-র দশকের ইন্ডিয়ান হামলা ও কাষ্ঠদুর্গচিহ্নিত আমলের বুয়েনোস আইরেস প্রদেশের জীবনযাত্রার।

ফের্নান্দো: কিছুদিন আগে আমরা মার্টিন ফিয়েরো নামের সিনেমাটা নিয়ে কথা বলছিলাম। এরপর এই সেদিন হয়ে গেল দন সেগুন দ্য সোমব্রা-র চলচ্চিত্ররূপের প্রিমিয়ার প্রদর্শনী..

বোর্হেস: দেখিনি ওটা। তবে যেসব রিপোর্ট আমি শুনেছি সেগুলো চমৎকার। এবং একইসঙ্গে এও বলব, অনেকটা আচরণগত রূপরেখার সিরিজ হলো বইটা; এরকম একটা বইয়ের ওপর চলচ্চিত্র বানানো খুবই কঠিন কাজ বলে মনে হয়। কারণ, এক বৃদ্ধ কাউবয় ও একটা বালকের মধ্যে গড়ে-উঠতে-থাকা বন্ধুত্বের বাইরে, জানি না, কী অ্যাকশন আছে বইটাতে যা উপন্যাসসুলভ।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন subrata augustine gomes — মার্চ ১৫, ২০১৩ @ ১১:৪৫ অপরাহ্ন

      বোর্হেসের লেখা, খানের অনুবাদ… সোনায় সোহাগা… ঋদ্ধ হলাম।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com