কবি আহমেদ মুজিব ও আশির স্নাইপারেরা

চয়ন খায়রুল হাবিব | ৭ জানুয়ারি ২০১৩ ৪:৪৯ অপরাহ্ন

আশির দশকের প্রবর্তনামূলক কবিতাসভার পত্তনি পাবলিক স্পেসে! উচ্চকিত স্লোগানকে পাশ কাটিয়েও এ-সময়ের নিবিষ্ট কবিতাকৃতি কলাকৈবল্যবাদী নয়; বরং চেহারাবিহীন সামষ্টিক গোঁজামিলের বাইরে ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বে, উন্মোচনে ভাস্বর! এই প্রবর্তনাগুলো এমন এক সময় জেগে উঠছে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র জবরদস্তি নগরায়নের সাথে চাপিয়ে দিচ্ছে অন্ধ প্রতিক্রিয়াশীলতা; যেখান থেকে আলো আসবার কথা তা পরিণত হচ্ছে কালো শক্তিতে এবং তার প্রতিরোধে ৫২, ৭১, ৭৫ পার হওয়া মধ্যবিত্ত আত্মিকভাবে হয়রান-পেরেশান! বেসামরিক অবকাঠামোর দুর্বলতা পূরণ করছে সামরিক বাহিনী, ব্যক্তিকে দিতে হচ্ছে তার জন্য চড়া দৈহিক-মানষিক-মূল্য! যে-মাদক চাপানো হচ্ছিলো ব্যক্তির বিনাশে, তাই হয়ে উঠছে মনোগত প্রত্যাবর্তনের প্রচণ্ড ঝুঁকিবহুল আড়াল: নৈরাজ্যিক মহাফাটলের অন্তর্গত প্রতিরোধের রসদ! আগের যে কোন সময়ের মতই এ-সময়েও অনেকের কাছেই ধরা পড়েছে প্রত্যাশার শুভঙ্করের ফাঁকি, কিন্তু ফেরার পথ বন্ধ! উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিবিত্ত সবাইকেই যখন গ্রাস করছে এক ক্লান্তিকর-ধূসরতা, তখন স্বল্পতম ব্যাঞ্জনে রংধনুর আয়োজন শুধু স্পর্ধার নয়, মনোগত অস্তিত্ব রক্ষার ন্যূনতম তান্ডবও বটে! এই নৈরাজ্য, তান্ডবের থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি আশির স্পর্শকাতরদের ছিল কি না তার স্মরণযোগ্যতার নিরিখের চেয়েও দ্রষ্টব্য এটাই যে তা পরের সময়ের চলিষ্ণু যোগসূত্রের অন্যতম প্রধান মেলবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়েছে!

অনেকের কাছে ‘প্রেসের কবিতা’র কবি বলে পরিচিত আহমদ মুজিব উপলক্ষে এ-লেখাটাকে একটা উদযাপন হিশাবে নিলে ভাল। তিনি ভাল ছিলেন, তিনি খারাপ ছিলেনের বদলে আহমদ মুজিব আকা আমার বাল্যবন্ধু কচি যে রক্তমাংসে একটা সময়ের সক্রিয় প্রতিনিধি তাই তুলে আনতে চেয়েছি চাপানো মূল্যবোধের ছাকাছেনি ছাড়াই!

কচির বরাতে:

ঢাকার আজিমপুর ওয়েস্ট এন্ড স্কুল ছিল নৈরাজ্যবাদের রাজধানী! স্কুল’টাকে অলঙ্কৃত করেছে মাহমুদুল হক, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ এবং আহমদ মুজিব ওরফে কচি, আমার কয়েক বছর আগে!শহীদ সাবের এখানে খন্ডকালিন শিক্ষকের কাজ করেছিল! সত্তর দশকের শিক্ষক মনিরুজ্জামান মিয়া ছিলেন কমিউনিস্ট, যোগদান করেছিলেন পিলখানার রাইফেল স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে! বি, ডি’আর হত্যাকাণ্ডের সময়ে যে বি, ডি, আর প্রধানের বৌকে সেপাইরা হত্যা করে, সেই প্রধানের বৌ নাকি মনিরুজ্জামান’কে বরখাস্ত করেছিল হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর আগে!কচি অবশ্য কমিউনিস্ট ছিল না।কচি ছিল বোবা-হেডোনিস্ট। কিন্তু কচির ভাই সবুজ ছিল কমিউনিস্ট।

উচ্চ মাধ্যমিকের আগে থেকেই বিভিন্ন রকম প্রথাবিরোধী আচার ও উনতা কচি, আমার যাপনে প্রভাব ফেলছিল! বিশ্ববিদ্যালয় পর্বে সামাজিকভাবে আর কারো বাসাতে যাই না; ঢা, বিতে ক্লাস করি কি করি না। সকালবেলা বাংলার ছাত্রী প্রেমিকা নীলাকে বলি এই করবো, সেই করবো। ও রোকেয়া হলে ঢুকে গেলেই সব ভুলে যাই। কোথায় কি বস্তি’তে একসময়ের কচির দেয়া বন্ধুদের সাথে মাস্তিতে মজে যাই। রাত কাবার করে ভোর রাতে বাসাতে ফিরে জাগে অপরাধবোধ। ঘুমানোর আগে প্রতি রাতে নীলাকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা চিঠি লিখি। কচির দেয়া বন্ধু বলতে আক্ষরিকভাবেই কচির বরাতে পাওয়া বন্ধু! আজিমপুরের একই বাসাতে আজন্ম, আশৈশব বড় হলেও আমার বাবা বিভিন্ন অজুহাতে আমার স্কুল বদল করেছিল দফায়, দফায়। ফলে স্কুল জীবনে আমার কোন বন্ধু-দঙ্গল তৈরি হয় নাই। মেট্রিকের পর কচির সাহিত্য প্রয়াসী বিভিন্ন বয়সের বন্ধু আমার বন্ধু হয়ে উঠতে থাকে; সেই একই পর্বে আজিমপুরের আরেক বন্ধু কবি তারিক সুজাত ওর ইউল্যাব বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে তাদের ঘিরেও
একটা সার্কেল গড়ে উঠে !

কলেজ জীবন থেকেই সংসারী কচির মনোজমিনটা ছিল কংসারি! বিশ্ববিদ্যালয় পর্বে তারিকের ইউল্যাব সার্কেল সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাবার পর, নীলা পর্যায়ে আমার সাহিত্যের যোগসূত্র হয়ে উঠে কচির বোবাত্ব! নিঃশব্দের দীর্ণতায় আমাদের নিউরোসিস ভিতরে বাইরে বিচূর্ণ হতে থাকে!

ফুটবল, দ্বান্দিকতা এবং ডাইল:

পাড়াতে কৈশোরের ফুটবল ক্লাবেই আমার কয়েক বছরের বড় দুই ভাই কচি, সবুজের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। আবার ওরা থাকতো রাস্তার এপার ওপার কলোনি ভবনের ফ্ল্যাটে! দুই ভাই-ই অত্যন্ত ভালো ফুটবল খেলোয়াড়। সবুজ কেরি কাটানোর ওস্তাদ, আর কচি ফ্লাইং কিকের! দুই ভাই-ই পাড়ার ভালো ছেলে আর বখাটে মাস্তান গ্রুপ দু’টোতেই জনপ্রিয়। দুই ভাই-ই কবিতা অন্ত প্রাণ! সবুজ কয়েকটা কবিতা লিখে এখানে, ওখানে প্রকাশ করেছিল সবুজ সরোজ নামে। কচি প্রথম থেকেই লিখত আহমেদ মুজিব নামে।সবুজ কবিতা লেখা চুকিয়ে দেয় উচ্চ মাধ্যমিকের পর পর, কিন্তু পুরনো পাঠাভ্যাস বাড়িয়ে দেয় দশগুণ; ভক্ত হয়ে ওঠে দ্বান্দিক বস্তুবাদের!

আশির শুরুতে কচি উচ্চ মাধ্যমিকের আগেই বিয়ে করে বসে আছে পাড়ার রঞ্জনাকে। সেই সময় থেকেই না কি অল্প কিছু পরে ও চাকুরী নেয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছাকাছি কবি আবিদ আজাদের শিল্পতরু প্রেসে। কচি’র সাথে আবিদ ভাইর পরিচয় রিফাত চৌধুরী’র মাধ্যমে। রিফাতের সাথে কচির পরিচয় কিভাবে তার হদিস আমি কখনো বের করতে পারি নাই। শিল্পতরু প্রেসে কচির খোঁজে যেতে যেতেই পরিচয় হয় কাজল শাহনেওয়াজের সাথে। কচির কাছে অবশ্য সে সময়কার আরো তরুণ কবিরা আসতো। সিলেট থেকে ঢাকায় এলেই ওর সাথে দেখা করত কিশোয়ার ইবনে দেলোয়ার।শিল্পতরুতে আবিদ আজাদের ”কবি” ঘিরে আরো আসতো পুলক হাসান, বুলান্দ জাভীর,রাজু আলাউদ্দিন, শামসেত তাবরেজি। কিছু পরে শিল্পতরুর বাইরের চক্করে এসে যোগ দেয় সরকার মাসুদ।কারো সাথেই কচিকে তেমন দুর্দান্ত আলাপে মত্ত হতে দেখা যেত না। গাজা, মদেও ওর কোনোই আগ্রহ ছিলনা। এখানে, সেখানে যে তিন তাসের আড্ডায় আমি, কচি মশগুল থাকতাম তাও কিছুদিন পরেই আমরা দুজনেই ছেড়ে দেই। কবিতা ছাড়া, কচির রঞ্জনাময় জীবন:

‘এ-ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া!’

আবুল হাসানের ঐ চরণ’টার মতোই এক সহজ রোমান্টিকতার ভেতর ডুবে যেতে চেয়েছিল! ওর প্যাশনগুলো খুবই ধারালো আবার সাদা-কালো। প্রবাস জীবনে সবার সাথে বিচ্ছিন্নতা এবং ইন্সুলারিটিতে রূপান্তরও এই দ্বিমাত্রিকতায় সুত্রবদ্ধ ছিল: প্রীতিবোধ গড়াচ্ছে অনির্ণীত রক্ষণাত্মক ভীতিবোধে! আজিমপুর, হাজারীবাগ গ্যাং ফাইটে স্থির হ’লো হাজারীবাগের যে কাউকে আজিমপুর রোডে পাওয়া যাবে, তাকেই পুচিয়ে দিতে হবে! এই পোচাপোচিতে দেখলাম কিশোর কচি হঠাৎ অন্যান্য খুচরাদের কচি ভাই হয়ে গেল এবং রিক্সা থামিয়ে হাজারি বাগের কয়েকটা লুঙ্গি পাট্টিকে পোচানোর নেতৃত্ব দিয়ে ফেললো। কিন্তু এর পরের পাইকার পর্যায়ে উন্নয়নের জন্য যেসব নৈর্ব্যক্তিক ঠিকাদারিগুলো করতে হয় সেগুলোতেও আবার ওর অনীহা। এই অনীহাগুলোই পরে নান্দনিক তাড়নার বিকল্প যোগসূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং শত সামাজিক অনটনেও মনোভূমিগত শক্তিশালী পত্তনির রসদ যুগিয়েছে: এখানে কারো বস হবার তাড়নাও নেই, কারো মুরিদ বা বৌদ্ধিক বশম্বদ হবার হীনমন্যতাও নেই! ব্যাক্তির এই আত্মিক সংগ্রামের ধারক, সহায়ক যে বাংলাদেশ নয় তা বলাই বাহুল্য!

রঞ্জনার বাইরে কচির আসক্তি ছিল ডাইলে। আমি নব্বইতে দেশ ছাড়া পর্যন্ত ওর লেনদেনগুলোর হিশাব ছিল ডাইল নির্ভর। বৌয়ের সাথেও সম্পর্ক টালমাতাল! আবিদ ভাইয়ের প্রেস কাঁঠাল বাগানে নিলে, ওখান থেকে কচি অন্য আরেক বড় প্রেসে চাকুরী নেয়। বলা মুশকিল রঞ্জনা, ডাইল, কবিতা কোন’টা ওর কাছে বেশি প্রিয় ছিল। সমীকরণে যোগ হ’লো রাজকুমারীর মতো উজ্জ্বল কন্যা মমো! রঞ্জনা সিধান্ত নিল মমোকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যাবার। এরপর আর বোঝা গেল না, ওরা আদৌ বিবাহিত না কি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। চুল, নখ না কাটা কচি নিজে হয়ে গেল ওর কবিতা সংগ্রহ ‘প্রেসের কবিতা’র ট্রেডল মেশিন! ঢাকায় থাকলে যে এই মনোগত-জটিলতা এবং অনুষঙ্গ নির্ভরতা আরো বাড়বে তা ও ঠিকই আঁচ করেছিল! এটাও বুঝতে পেরেছিল যে ইটালিতে এশিয়ান শ্রমিকের সামাজিক অবস্থান অষ্টাদশ শতকে উপনিবেশি প্রভুদের তত্বাবধানে দূরান্তরে পাঠানো শ্রমিকদের মতই! ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি কল্যাণকামী অর্থনীতির অনুসারী হলেও ইয়োরোপিয়ান আর্থিক অঞ্চলের ভাগীদার হয়েও ইটালি, স্পেন-এর অর্থনীতি সর্বাংশে পুঁজিবাদী!বিদেশি শ্রমিক এখানে সমাজের সবচেয়ে সস্তা স্তরের মানুষ হিশাবে পরিগণিত! বেকার ভাতার কোন নিরাপত্তা বিধান না থাকায় আগত প্রবাসীদের দৈনিক টানা ১২/১৪ ঘণ্টা কাজ করা ছাড়া উপায় নাই!

বাংলাদেশের জীবনের তুলনায় এই প্রবাস জীবন অনেকেরই কাম্য এবং সাশ্রয়ী!স্পর্শকাতরতার নিরিখে এই জীবন একেকজনকে একেকভাবে সংক্রমিত করে!কাগজপত্র ঠিকঠাক হয়ে যাবার পর কেউ প্রতি বছর থোক টাকা, অনেক অনেক জামা, জুতো, কম্বল, জাম্পার দেশে নিয়ে গিয়ে খুশি থাকে এবং ফিরে এসে আরো কম্বলের প্রণোদনায় আজীবন এই রুটিন চালিয়েই যেতে থাকে; সংস্কৃতির স্বাদ থাকলে দেশের কাউকে মাসোহা্রা দিয়ে লিটল ম্যাগ বের করে প্রবাসের প্রত্যাখ্যাত সামাজিক যাপনের দায় ঘোচায়!আবার কচির মত অনেকেই কম্বল, জুতায়, থোক টাকায়, লিটল ম্যাগ, সংস্কৃতির ইধার উধারেও উৎসাহী না! এদের জন্য জীবন আক্ষরিকভাবেই ঘানি! সময়টাকে এড়িয়ে সময় পার করতে গিয়ে, নিজের সাথে নিজের ছায়ার দ্বন্দ্ব এবং এক পর্যায়ে ছায়া-অপসারিত নিরাবেগ স্নায়বিক চাপের ধ্বংসস্তুপে রূপান্তরিত! ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ার দেশগুলোর ভেতর ইটালির সংস্কৃতি হচ্ছে আঙ্গুর-পেষা ওয়াইন নির্ভর! ইহুদিরা তাদের মেশবার গুনে ইউরোপের বিভিন্ন সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করলেও, আরবের দর্শন নির্ভর বাংলাদেশি-শ্রমিক-ঘেটোর দেশজ অনুপানের একটা হচ্ছে যত বেশি কম মিশে থাকা যায়! ইটালির রঞ্জনারা, সোফিয়া লোরেনরা আরো বেশি রঞ্জিত, শিঞ্জিত হলেও শ্রমিক ঘেটোতে তার কঙ্কণ-কিঙ্কিণী দুর্লভের চেয়েও দুর্লভ! যৌন অবদমন এ অবস্থায় স্নায়বিক স্বাস্থ্যকে ভিতর বাহির দু-দিক
থেকেই কাটে!

ভাঙ্গা লিরিকের ভাঙ্গা বয়ানঃ

খুব একটা পড়াশোনা না করলেও হয়ত দ্বান্দিক বস্তুবাদ নিয়ে সবুজের অতি পঠন, সবুজ বলতে না চাইলেও টেলিপ্যাথি মারফত কচির মগজে চলে গিয়েছিল! মানে সরকারি ভর্তুকি দেয়া মাদক চেখে চেখে দিন কাবার করলেও ও’তো আর অন্ধ ছিলনা! ট্রাকে পিষে মানুষ মারার কৌশল বের করা রাস্ট্রযন্ত্রের নিম্নতমো ভোক্তা হিশেবে আরো লাখো তরুণ প্রাণের মতোই কচির ভেতরেও একটা সময়-স্বয়ংক্রিয় দ্বান্দিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।আমি ছিলাম কবিতার কেন্দ্রনিবিড়তায় আবার মিছিলের কেন্দ্রছুট প্রবণতায়।কাজল ঢাকাতে প্রায় আসলেও ওর নৈসর্গিক আশ্রয় চিল ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়! আমাদের সবারই ইঞ্জিন, চেসিস আলাদা।দম নিতে, নান্দনিক হাড়গোড়ের জয়েন্ট জুতসই রাখতে প্রায়ই যে গ্যারেজে যাই তার তেল, মবিলেও পেলাম ঘাপলা!

শান্ত কবিতা আমাদের কারোই লক্ষ্য না। আবার কথিত দ্রোহ, প্রেমের রোমান্টিকতায়ও আমাদের অনাস্থা নিজেদের খোড়া একেবারে নতুন পথে, নতুন ডিজাইনের নান্দনিক চলিষ্ণুতার পত্তনিতে আমরা সবাই ছিলাম প্রবলভাবে আস্থাবান!লাভ, লোকসানের কেজো হিসাবটা ঐ এন্টেনার কাছে আসতেই পারে নাই! এটাও লক্ষণীয় যে কচি, রিফাত, কাজল ও আমি সাংবাদিকতার, শিক্ষকতার একাডেমিক কাজও যেমন করি নাই; তেমনি আনুষ্ঠানিক কেরিয়ারের দিকেও যাই নাই! কচির কথা বলতে বলতে রাজুর দীর্ঘদিনের জন্য মেক্সিকো চলে যাওয়াটাও মনে পড়লো! মূলত শব্দশ্রমিক এবং উম্মুল দেহশ্রমিকের মিশেলে এক নতুন মাত্রিক মনোশ্রমিকের উন্মেষপর্ব হবার কথা এ-পর্যায়টার! যেমন ঘটেছিল শেলি, কিটস, বায়রন, জয়েস, বেকেট, নেরুদা, নবোকফের! অভিবাসনের জটিল মনস্তত্ব অনেক সময়েই মানষিক কানাগলিতে আছড়ে পড়তে পারে;কিম্বা বিগত নস্টালজিক সংস্কৃতি চর্চার পুনরাবৃত শেকলের ঝনঝনাকেই মনে হতে পারে নন্দন-চর্চা! এ-পর্যায়ে কচি নৈশব্দের বুদ বুদে নিয়ন্ত্রনবিহিনভাবেই আত্মনির্বাসিত!

আবিদ ভাই’র আশির মাঝামাঝি কবিতা কেন্দ্রে যোগদানের সুবাদে কাঁঠাল বাগান শিল্পতরু পরিণত হয় শুল্কতরুতে! একটা দম আটকানো অবস্থা! আমরা কেউ আর তেমন আবিদ ভাই’র সাথে দেখা করি না। কচি ওখানে চাকুরীরত। ওর জন্য অপেক্ষা করি প্রেসের বাইরে লুকিয়ে, যাতে হুট করে আবিদ ভাইর চোখে না পড়ে যাই! কাজল, রিফাত, আমি আমাদের আড্ডাগুলো ছড়িয়ে দিলেও কচি আটকে গেল ঐ রঞ্জনা-আছে-রঞ্জনা-নাই; প্রেসের-চাকুরী-আছে-প্রেসের- চাকুরী-নাই; কিন্তু-ডাইল-সবসময়-আছে-সমীকরণের-গাবতলি-ঘেরজালে!

আমাদের কারো অবস্থাই যে কচির চেয়ে খুব একটা উন্নত তা নয়। আমি আটকে আছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন মাপের অনির্দিষ্ট সেশন জটে। সেখানে আমার রঞ্জনা’র নাম নীলা । গন্তব্যকে নীলামূখী না করে নিজেকে ভাবতে শুরু করে দেই আশির কনিষ্ঠতম আত্মিক শহিদান হিশেবে।!শহিদান মিছিলে এসে সংগ দেয় কাজল, অপু এবং আরো উত্তমর্ণ কাপ্তেনেরা! এ-বস্তিতে, সে-বস্তিতে খুঁজে বের করি রিফাত’কে, তার পর বিভিন্ন অনুপানে চলতে থাকে হায় হোসেন, হায় হোসেন মাতম!

অপু শোনায় নাটক পাড়ার কিচ্ছা! কাজল বলে লিটেল ম্যাগাজিনের কথা।কখনো দৌড়াচ্ছি চিলের পিছে, কখনো দৌড়াচ্ছি বাদুরের পিছে। কখনো এই রাস্তায়, ঐ রাস্তায় কফিলের সাথে দেখা। কফিল কিছুই খায়না ! অপুর মুখে নাটক পাড়ার কচি কচি মেয়েদের কথা শুনে নাটক করতে ইচ্ছা করে! যে-নীলার সাথে আশনাই শ্রেণি সংগ্রামে তার কমিটমেন্ট দেখে বিপ্লব করতে ইচ্ছা করে। মিছিলে গিয়েও কান্নি মেরে বেরিয়ে যাই, চলে যাই কখনো কাজলের ক্যাম্পাসে ব্রক্ষপুত্রের তিরে, কখনো জাহাঙ্গীর নগরে! কাজল, কফিলও আসে আমার আজিমপুরের বাসাতে।রাত কাটায়, মশারির ভিতর হুট করে লাফ দিয়ে বলে: একটা কবিতা আসলো! সকালে নাস্তার টেবিলে কাজল’কে আম্মা বলে: আমিও কবিতা লিখতাম! কাজল মিটমিটায় হাসে! সকালে কচি আসে, জিন্দেগিতে ও আমাদের বাসার ভেতর ঢুকে নাই। কিন্তু বারান্দার সামনে দাড়িয়ে আম্মা’র সাথে খুব অন্তরঙ্গভাবে কথা বলতো। বিয়েতো করে ফেলেছিল; বাচ্চাও পয়দা করেছিল; কিন্তু বসত শব্দটার সাথে মনে হয় তেমন পরিচয় ঘটে নাই!
ওর বাবা অবসর নেবার আগে, আগে যখন আজিমপুরের পাট চুকায়, মোহাম্মদপুরে বাড়ি তুলছে তখনো ইট, কাঠ, কংক্রিট, কামলার তদারকি করতো সবুজ। বাড়ি তৈরি হবার পর ওখানে গেলে দেখতাম অনেক ঘর থাকা সত্ত্বেও আমাকে নিয়ে খালি ব্যাল্কনিতে চলে আসে। ওর কবিতা পড়লেই আমার মনে হয়, ব্যাল্কনিতে গিয়ে দাড়াই!

স্বল্প ব্যাঞ্জনের পাকা রাধুনিঃ

কে এক মাখনা ভাই বস্তিতে এসে রিফাতের বন্ধু হবার জন্য ক্ষেপে যায়; রাজ্যের যত নাটক পাড়ার কথা, টি, ভি পাড়ার কথা শুনাতে চায়। কচি বলে, নাটকের কিচ্ছা শোনাতেতো অপুই আছে, ও তারানার সাথে নায়ক হয়েছে! তখন মাখনা মিডিয়ার কথা বলে! কচি বলে: সে জন্যতো মুস্তফা ভাই আছে, উনি রেডিওর মহাজন! সবকিছু একটা করে হলেই কচি তুষ্ট! কচি খেয়াল করে যে এইসব মাখনাদের কোনই রঞ্জনা নাই এবং এদের সমস্ত রঞ্জনাকে চাই! খুব বেশি খেয়াল করে কচি! ও বলে: গাবতলি’র বাস ধরতে হবে!

বাসায় ফেরার পথে কখনো কখনো দেখি ইডেনের উলটো পাশে তারিকদের কলোনি ভবনের সামনে তাসলিমা নাসরিন’কে। টি,এস, সি’র সামনে তারিক বলে: দেখ ঝামেলা, বই বের করতে চায়! তাসলিমা কচির নামও নিশ্চিত জানে না। অথচ কচি প্রেসে কাজ করে! অথচ তাসলিমা বই বের করতে চায়! কচি ঢাকা ছাড়বার আগেও তাসলিমা-ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে না পারলেও, এটুকু বুঝছিল ছিল যে একটা স্নায়বিক উচ্ছেদমত ঘটছে। এক সময় নখ কাটাও ছেড়ে দিয়েছিল। কোনটা যে ক্ষিপ্ততা, কোনটা প্রক্ষিপ্ত তার একটা তালগোল পাকাতে থাকে ওর ভিতর। কবিতায় দেখতাম যেখানে বিস্ময়বোধকতায় বাক্য শেষ হচ্ছে, সেখানে ও দিত দাড়িচিহ্ন। ওর যুক্তিবোধ সাহিত্যের নান্দনিক পরম্পরা থেকেও আসছে না। আসছে পদার্থের ভিতরের অধ্যাত্ম থেকে। টোটাল। ভাংলে তা আরো জ্বলজ্বলে, আরো শক্তিমান।

আজিমপুর গ্রামে কচি প্রথম থেকেই আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কবিতার দূতিয়ালি করতে করতে কচি আবিদ ভাইর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার পর আমার কবিতাকৃতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পালাবদলের সূত্রপাত হয়। তখন আমার বয়স উনিশ! আমি দীর্ঘ কবিতার এপিক ফর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ি, আর কাজলের সাথে সিরিজ কবিতার নিরীক্ষায় মেতে উঠি। কচির ‘প্রেসের কবিতা’ এপিক ফর্মেরই সিরিজ কবিতা! ১৯৮৫ থেকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্র। জান্তা শাসনের আশীর্বাদে ক্লাস শুরু হতে হতে আরো এক বছর। কচির সূত্রে আবিদ ভাই; আবিদ ভাই’র সূত্রে ঘনিষ্ঠতা ”তুত” ”ক্ষুর” এর কবি মুস্তফা আনোয়ারের সাথে। প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ দু-ভাবেই আমাদের সবাইকেই মুস্তফা ভাই প্রভাবিত করেছিল! কাজল আর আমাকে মুস্তফা’র কবিতা-নাটক-ধারাটা বিশেষভাবে টেনেছিল।

কচির মাধ্যমে আমার কাজল, রিফাতের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠলেও আজিমপুরের জামাইর হোটেল, পিলখানার কাছাকাছি বয়রার ঘর থেকে কাজলের ক্যাম্পাস ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রক্ষপুত্র নদীতীরের রাতাকাবারি আড্ডাগুলো থেকে কচি সাংসারিক কারনেই দুরে পড়ে যায়। আবার ঘুরেফিরে নতুন কবিতা লিখলেই প্রথমে আমাদেরই দেখাতো। ওর ‘প্রেসের কবিতা’ বের করবার সময় আমাকে মলাটের লেখাটা লিখবার অধিকার দিয়ে সম্মানিত করেছিল।’প্রেসের কবিতা’র ফ্ল্যাপ মান্নান সৈয়দকে দিয়ে লিখিয়ে নেবার পরামর্শ কচিকে দিয়েছিল প্রকাশক আবিদ ভাই। কচি তা অগ্রাহ্য করে আমাকে দিয়ে লেখায়; এতে আবিদ আজাদ কিছু মনে না করলেও মান্নান সৈয়দ তা ব্যক্তিগতভাবে নেয়! আমার নাম ভুলে গীয়ে মান্নান সৈয়দ বাকি জীবন আমাকে ”এই ইয়ে ইয়ে…” করলেও কচির প্রতি কারোই রাগ করে থাকা সম্ভব ছিলনা! কিন্তু কেন যেন মনে হয়, কোথায় যেন আমরা কেউ, কেউ কচির প্রতি বেশ একটা রাগ রাগ ভাব মনে মনে পুষে রেখেছি। পাইকারি না, খুচরা রাগ!

আবিদ ভাই মানসিকভাবে মান্নান সৈয়দের প্রতি এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন যে ওনার চাকুরীরত হয়েও তা পার হয়ে আসাটা কচির চারিত্র্যের দার্ঢ্যটাকেই মনে পড়ায়।

এই যে কচির অন্তরঙ্গে, বহিরঙ্গে একটা আলুথালু, অন্যমনস্ক নিবিড়তা; এগুলোও ওর কবিতায় যে অনিবার্যতার ঝোঁক তার সুত্রচিহ্ন, সুরতহাল, ময়না তদন্ত করতে বেশ সহায়ক হয়ে উঠে। একটা ব্যাপার লক্ষনীয়ঃ যে ঢাকাতে কচি, আমিসহ অনেক স্পর্শকাতর, সৃজনশীল নিজ নিবাসে প্রবাসী, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল ৭৫ পরবর্তী একের পর এক আরোপিত সামাজিক আবদ্ধতায়! প্রায় কৈশোরে কচির বিয়ে করে বাবা হয়ে যাওয়া এবং গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যস্ততা একদিকে যেমন সাবালকত্ব এনে দেয়, আরেকদিকে কৈশোর, তারুণ্যের নমনীয়তাকে করে তোলে আটোসাটো! কিন্তু কচি কিছুতেই আত্মহত্যাপ্রবন ছিলনা, চুপচাপ হলেও চঞ্চলতায় ভরপুর! বৌ রঞ্জনাও ছিল আমাদের পাড়ার বন্ধু। কিন্তু একসাথে ফুটবল খেলা, মোমবাতি জ্বালিয়ে কলোনির সিড়িবারান্দায় রাতভর তিনতাস পিটানি আর কবিতা পত্তনির বন্ধুকে দূরে সরিয়ে দেবার জন্য রঞ্জনার ওপর আমার একটা রাগও ছিল অনেক দিন। তবে সুন্দরি মেয়েদের সামনে রাগ, বীতরাগ ধরে রাখাও মুস্কিল! এই বেলাতে মনে পড়লো কচির বড় ভাই সবুজের সাথে তুই তোকারি হলেও, কচির সাথে সম্বোধন বরাবরই ছিল তুমিসূচক! আবিদ ভাই’র প্রেসে ম্যানেজারির কারণেও কচি ওনার সামনে আমার, কাজলের যে অনানুষ্ঠানিক কথোপকথন ছিল তাতে তাল মেলাতে চাইতনা! এটা রিফাতের মধ্যেও ছিল। রিফাত, আবিদ ভাই’র প্রেসের ম্যানেজারি ছেড়ে দেবার পরেই কচি সেই কাজ’টা পায়।

”প্রেসের কবিতা” পার হয়ে:

প্রেস টেকনোলজি মুজিব আর মুজিবের কবিতার মধ্যে স্বচ্ছতোয়া আয়না হয়ে উঠেছে: বিজ্ঞান বা মেশিন টুলস এ-কবিতাগুলো লেখেনি বরং কবিতার সংগলিপ্সা মেশিন’কে সংবেদনশীল চলকে রূপান্তরিত করেছে। অনুষঙ্গের জড়ত্ব ভাংগতে ভাষার যে জ্যান্ত জৈবিকতা দরকার তাতেও মুজিব সফল। মানুষ তার স্বভাবজাত মমত্ব দিয়ে যতই যন্ত্রকাতরতা প্রকাশ করুক যন্ত্রের নিজস্ব অভিধানে কাতরতা দীর্ণতাজাতীয় ভাবাবেগের অবকাশ নেই! ফলে মুজিবের অনুকরণে যদি অন্য কেউ যন্ত্রানুসঙ্গে মেতে উঠতে চায় তাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে আত্ম নিয়োজিত না হলে এ-অনুষঙ্গের প্রাবল্য কবিতাকে অনিবার্য জড়ত্বের দিকে ঠেলে দেবে! মননশীলতার অভাবহেতু টেকনোক্রেটিক বহিরঙ্গে যদি কবিতা জারিত হয় তাহলে আগামীকালের প্রাগ্রসর তথ্যসমৃদ্ধ পাঠকের কাছে আজকের উজ্জ্বল কবিতা হয়ে উঠবে অবসোলিট! শুধু টেকনোলজির ক্ষেত্রে নয় নাগরিক অনুষঙ্গের বেলায়ও একই বিচার প্রযোজ্য!

বাংলা ভাষাতে ষাটের, সত্তরের, আশির এবং এখনো অনেকেই নগরায়নের অনুকারকতায় সংক্রামিত; কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞ্বানসম্মত করে তুলতে পারেননি অর্থাৎ টেকনিক ব্যবহার করেছেন বৈজ্ঞানিক অভিসন্ধিতসাকে এড়িয়ে। নিজের লেখাতে এবং অন্যকে পাঠে এদের তৈরি হয়েছে কেন্দ্রনিবিড় ধর্মানুষংগ যা একধরনের হস্তমৈথুনও বটে; যার থেকে উত্তরণের আয়ুধ অধ্যাত্ম নির্মিত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ! ‘প্রেসের কবিতা’য় যে যাত্রার শুরু তা কচি কেন চালিয়ে যেতে চায়নি তার উত্তর একটাই: সে যাত্রার গন্তব্য যাত্রা শুরুর আগেই নির্ধারিত, স্বপ্নদ্রষ্টা! এই যাত্রাগুলো ভয়ঙ্কর: তাপ ছড়াচ্ছে, আচ পাওয় যাচ্ছে, ফুল্কি জ্বালানো পাথরের ফসিলগুলোও দেখা যাচ্ছে; দাবাগ্নিতে জ্বলে, পুড়ে সব ছাই হয়ে যাচ্ছে; তার মধ্যে কয়েকটা সম্পন্ন কবিতা নিয়ে দাড়িয়ে আছে ক্রশবিদ্ধ্ব, প্রলম্বিত এক স্মিতহাসি! এত শক্তি এই বজ্রপাতের; এটা মন্থনের ভেতর সমুদ্র, পোষা শুশুক-শব্দের সওয়ারি শাঁখের খোল হাতে উভচর এক রাজকুমার; এত সুন্দর এই কবিতাগুলো! সুন্দর শব্দটার সমস্ত নান্দনিকতা’ আদায় করেও একটুকুও ধস্তাধস্তির চিহ্ন নাই; কোথাও কোন আশ, ছোকলা, ছোবড়ার চিহ্ নাই! প্রিস্টিন। সেরেন্ডিপিটি! হারাকিরি! সবকিছু খুলে দেখায়!

কচি এখানে আবুল হাসান! রঞ্জনা এখানে সুরাইয়া খানম! হননের এবং বার বার পুনর্জন্মের গৌতমী-চক্কর! সবচেয়ে বেশি দ্রষ্টব্য এটাই যে আবিদ আজাদের ‘কবি’ পত্রিকাতে আশির দশকের যে দঙ্গলটা একত্রিত হয়েছিল এবং পরে যারা লিখেছে বিভিন্ন সময় কাজল শাহনেওয়াজের ‘ফৃ’ তে, তাদের যৌথনন্দনের চিহ্নায়ন সূত্রগুলো অর্থাৎ দেহছন্দে মিলানো ভাঙ্গা লিরিকের মোজাইক’ই হয়ে উঠেছে কচির কবিতার মুল মেরুদন্ডঃ কচি যে আবুল হাসানি সহজ রোমান্টিকতায় দৃঢ়ভাবে প্রোথিত ছিলনা এবং আশির সিগনেচার টিউনগুলোকে আত্মস্থ করতে চাইছিল, তার উদযাপন-অনুশীলন হিশেবেই ১৯৯৫তে কাজল সম্পাদিত ‘ফৃ স্ট্রীট স্কুলের’ প্রথম সংখ্যায় লিখেছিল, ‘ছানি কাটার পর”ঃ

”আবার সে খবরের কাগজ পড়ছে মনোযোগে, অনেক্ষন ধরে
কিম্বা ছোটখাটো হরফে লিখছে সবুজ গ্রামের উদ্দেশ্যে সবিশেষ চিঠি।”

গ্রামটা আরবান বোহেমিয়ার সেই ছিটকে দূরে সরে যাওয়া সোনার হরিণ! আর চিঠিটাতো আমরা সবাই মিলেই নিরন্তর লিখেই যাচ্ছি, খামে ভরছি, ডাকবাক্সেও ভরছি! ঠিকানাটা লেখাটা কখনোই দরকারি মনে হয় নাই!

পুনশ্চ:

কবি আহমেদ মুজিব ইতালির একটা হাসপাতালে গত তেসরা জানুয়ারি বৃহস্পতিবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। শেষ কথা হয়েছিল কয়েক বছর আগে টেলিফোনে ও যখন বহুবছর ইটালিতে কাটিয়ে দেশে ফিরে প্রথম/দ্বিতীয় হার্ট এটাকের শিকার হয়েছিল। তারপর আবার ও ইটালিতে ফেরে। আমাদের সবার সাথে কচির এবং তার পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়! কচির স্ত্রী রঞ্জনাও আশৈশব আজিমপুরের, ওদের প্রায় অষ্টাদশী কন্যার নাম ‘মমো’! কচির পিঠাপিঠি ভাই সবুজ কানাডা প্রবাসী।ওর দুই ছোট বোনের নাম শিমুল, পুতুল! বড় বোনকে কচি বড়দি বলে ডাকতো!
যা দেখাইলারে ভাই কচি!…আদিউ…

ব্রিটানি/ফ্রান্স, জানুয়ারি ২০১৩

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (৬) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাঈফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল — জানুয়ারি ৮, ২০১৩ @ ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

      কচি এখানে আবুল হাসান! রঞ্জনা এখানে সুরাইয়া খানম!
      Ahreeeeeeeeeeeeeeeeee

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাজল শাহনেওয়াজ — জানুয়ারি ৯, ২০১৩ @ ১:৩৯ অপরাহ্ন

      কচির সাথে ২০০৭ এ শেষ দেখা। সেই রূপ ভুলতে পারবো না… কাঁধ ছাড়িয়ে পিঠভরা চুল, তার ভিতর আরো লাজুক, আরো স্বাস্থসমৃদ্ধ আমাদের কবি। জিগাইলাম সময় কাটান কিভাবে? বলে কোন কোন দিন রোববারে গির্জায় গিয়ে বসে থাকে, ওদের সাথে গান গায়, একচুমুক রেড পান করে কখনো… নারী সঙ্গহীন, কবিবন্ধুহীন…

      তখনি আমার মেয়ের সমান বড় মোমো কে আরেকবার দেখলাম… বারবার বাবার কাছ ঘেষে যাচ্ছে… চেনা-অচেনা বাবার ঘ্রাণ থেকে মেয়েটা কিছু পাচ্ছিল, কিছু পাচ্ছিলনা… ।

      আর আজ আমরাও এই অকাল প্রয়াত কবির সাথে একদন্ড বসে থাকার আশা হারালাম। একটা নতুন কবিতার লোভ থেকে হাত গুটিয়ে নিলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shawrup quadri — জানুয়ারি ৯, ২০১৩ @ ৯:০০ অপরাহ্ন

      ”আশির দশকের প্রবর্তনামূলক কবিতাসভার পত্তনি পাবলিক স্পেসে!”…এ-ঘোষনাটি খুব দার্ঢ্যপুর্ন! লেখাটি পরে যেভাবে খুলেছে, তাতে এ-ঘোষণাটিতেই যোগ হয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্স্পেকটিভ! অনেকদিন থেকেই আমার মত নিশ্চয়ই অনেকের আগ্রহ ছিল আশির দশকের মৌলিক প্রবর্তনাগুলোর ব্যাক্তিক ও আন্ত-কেমিস্ট্রি জানার! তা এখানে যথার্থভাবে পূরণ হয়েছে! সাধারনত কবিতা-মেয়াদ বা সময়খন্ডগুলোতে দেখা যায় ৩০ বছর খন্ডে প্রথম দশক পত্তনি তৈরি করে, পরের দশক তাকে শক্তিশালী করে, তৃতীয় বা শেষ দশক পুনরাবৃতি করে! সে হিশাবে ৭০এর দশকটা হচ্ছে ৫০এর পুনরাবৃত্ত দশক। আবার আবিদ আজাদ সেই পুনরাবৃত্ত গীতলতার ভেতরেই শক্তিমান। কিন্তু ঐ সাম্প্রতিক-বিগত ৩০ বছর থেকে বের হওয়াতে প্রায়োগিক ভূমিকা নিশ্চিতভাবে আশির কয়েকজন কবির কাজ। শামসুর, শহীদ কাদরী যেমন ৩০-এর দশক থেকে বের হয়ে এসেছিল সেই ৩০ বছরের একটা হিশাবেই! এটা গুরুত্বপূর্ণ যে এই সময়খন্ডগত হিশাবও আবার আশির অনেককে এক জায়গাতে বেধে রাখছে না, এদের কেউ, কেউ প্রচন্ডভাবে নবায়িত হচ্ছে! এদের প্রকরণ, বাচনিকতা আমার পাঠে শুধু পরের অনুজদের নয়, অগ্রজদেরও প্রভাবিত করেছে!
      এ-সপ্তাহে আহমেদ মুজিবের অনেকগুলো কবিতা একসাথে পড়বার সৌভাগ্য হয়েছে। আমার মনে হয় মেজর কবিতার মহত্তম উতসারনগুলো একেবারে গতিমুখে দাঁড়িয়ে দেখবার, পড়বার বিরল সুযোগ পেলাম!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৃনা রাব্বানি — জানুয়ারি ১০, ২০১৩ @ ১২:২১ পূর্বাহ্ন

      ”একসাথে ফুটবল খেলা, মোমবাতি জ্বালিয়ে কলোনির সিড়িবারান্দায় রাতভর তিনতাস পিটানি আর কবিতা পত্তনির বন্ধুকে দূরে সরিয়ে দেবার জন্য রঞ্জনার ওপর আমার একটা রাগও ছিল অনেক দিন। তবে সুন্দরি মেয়েদের সামনে রাগ, বীতরাগ ধরে রাখাও মুস্কিল!”…হাসি পেয়েছে, খুব মন খারাপও হয়েছে।আবার ভাল লেগেছে যে বন্ধুর কির্তি ধরে রাখতে চেয়েছেন।আপনাদের সবার লেখা পড়ার আগ্রহ তৈরি হল!আপনারা যখন ঢাকা চষে তুলকালাম করছেন, আমরা তখন সবে পৃথিবীতে এসেছি।ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shamol Dutta — জানুয়ারি ১০, ২০১৩ @ ১:৫৩ পূর্বাহ্ন

      মুজিব সাহেবের সাথে ২০/২২ বছর আগে দেখা হয়েছিল বেশ কয়েকবার।অফিসের বাতসরিক ক্যালেন্ডার ছাপতে গিয়েছিলাম।যে ডিজাইন নিয়ে গিয়েছিলাম তা নিজেরই পছন্দ ছিলনা!শুধু যে ডিজাইন বদলে সাহাজ্য করেছিলেন তা না, খুটিনাটি নিয়ে ওনার উতসাহ এখনো মনে আছে।এরকম qc পেলে অনেকেই বর্তে যাবে!আবার এই লেখাটাতে আন-সেটেলড অবস্থার ভিতর ওনার একটা পুর্নতাও পাচ্ছি।আমার গন্ডির একদম বাইরের।কিন্তু কাছের মনে হলো।ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নাসরিন জয়া হক — জানুয়ারি ১০, ২০১৩ @ ৮:৪৩ পূর্বাহ্ন

      লেখাটাতে রঞ্জনা এসেছে, আর তার সাথে সম্পর্কটা কোথায় গড়াচ্ছে তা বোঝবার একটা চেষ্টা ভাল লেগেছে।হয়ত রঞ্জনার গল্পটা একদিন রঞ্জনা বলতে পারবে…।

      মন্তব্যে, কাজল শাহনেওয়াজ ”’নারী সঙ্গহীন, কবিবন্ধুহীন…” বলেছেন। নারিসংগের মত ‘কবিবন্ধু’ কি পুরুষসংগবাচক! খটকা লেগেছে। লেখাটার ক্ষেত্রে এটা মনে হয় নি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 

মাউস ক্লিকে বাংলা লেখার জন্য ত্রিভুজ প্যাড-এর 'ভার্চুয়াল কীবোর্ড' ব্যবহার করুন


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com