গুচ্ছ কবিতা
স্তব্ধতার শোকবহি
কোথাও আগুন লাগিয়াছে
দমকল জল ঢালিতেছে
ভেতরে কতগুলো মানুষ আছে
দমকলে কতটুকু জল
আগুন নিভিবার পূর্বে কতজনের মৃত্যু হইল
আগুন নিভিবার পর কতজনের
দর্শক দমকলের মৃত্যু দেখিতেছে
দমকল দর্শকের
মৃত্যুজল গড়াইয়া কতদূর যাইবে
হোসপাইপ কতবার দৌপদীর বস্ত্র হইবে
মৃতরা কোথায় সমাধিস্থ হইল
বীমাকল কখন জলঢালা বন্ধ করিল
শোকবহিতে কি লেখা হইয়াছে
শোকবহিতে কি লেখা হয় নাই
জিজ্ঞাসা করো
পৃথিবীর সব স্তব্ধতার ভাষায়
তোমরা নিজেরা কোথায়
আগুনে পুড়িতেছো
সাগরদাঁড়ি
যে দেশে রাবণ নেই
সে দেশে সীতার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কেন
যে দেশে সাগরদাঁড়ি মধুশূন্য ম’রে
সে দেশে কপোতাক্ষ কি আশায় হবে প্রবাহিত
বঙ্গদেশে জন্ম যার তার কোন মাতৃভক্তি নেই
রামের দোসর সব অর্ঘ্য দেয় পাণ্ডবের পায়ে
ক্ষত্রিয়ের পক্ষ নিয়ে পূর্বপুরুষ যারা ছিলো যুদ্ধমান
তারা কি কৈবর্ত্যরে রক্ত নিয়ে আসেনি বাঙলায়
জন্মদাতা যেই হোক জননী জাহৃবী জানে সন্তানের শোক
জানে এই সাগরদাঁড়ির তীরে অভিমান হাহাকার করে
কোনো জনশূন্য নদ যদি খুঁজে পায় স্মৃতির লবণ
বাতাসের হাতে-হাতে বিলি হয় প্যারিসের স্বপ্নপত্রগুলো
তবে কি আসবেন তিনি রক্ষকুলোদ্ভব
কবি হয়ে দেশে ফিরবে মধু– মা ভাবেন পুত্রদেবতা
সাগরদাঁড়িতে ফের জলবন্যা হবে
ক্ষুধা ও খরায় দেবে খানিক অভয়
নদ হবে স্রোতবান দিগন্তের দিকে
জাহাজ পোতাশ্রয় পেয়ে শান্ত হবে অপেক্ষা অনেক
আর চতুর্দশপদী বুকে শুয়ে থাকবে বাংলাদেশ
মধুর মায়ের মতো সাগরদাঁড়িতে
রেখে যাবো
রেখে যাবো এমন এক উত্তরাধিকার
আদিগন্ত হু হু পথ অনিঃশেষ অন্তরীক্ষ
সকাল না হওয়া এক গভীর রাত্রি
নক্ষত্রের নেমে আসা নিরর্থক আলো
জানালায় বিধবার লেপ্টে থাকা চোখ
কখনো মাতৃক্রোড় দ্যাখেনি এমন কৈশোর
রেখে যাবো বুক-উজাড় বেদনার বাঁশি
শুকনো নদীর চড়া নৌকার নাভিতে রৌদ্র
দু’একটা গাঙচিল দিকভ্রষ্ট ঘুড়ির অসীম
ঝঞ্চাহত বৃক্ষের নুয়ে পড়া দাঁত
হাঁ-মুখ ম্যানহোলে পড়া রাস্তার বুক
এমন নিঃসঙ্গ পথিক যার গন্তব্য উধাও
রেখে যাবো জলাভূমি চাঁদের চিৎকার
ক্ষুধার স্বর্গরাজ্য শ্লোগান মিছিল
মঙ্গায় দগ্ধ লোক কর্কশ জিহ্বার দাগ
সর্বনাশ স্নিগ্ধ সাদা সাপের লেহন
অসহ্য আইনে পোড়া বিবেকের বাহু
হৃদয়ের রন্ধ্র জুড়ে হতাশার হিংস্র হাহাকার
রেখে যাবো দুঃসময় স্মৃতিচারণের মহাকাল
সূর্য ডোবে না এমন এক বন্ধ্যা প্রান্তর
উত্তরসূরী কেউ যেন অর্জন করতে পারে কাক্সিক্ষত দিন
স্বপ্ন আর সুন্দরের অবিচ্ছন্ন ঘড়ি
অনায়াসলব্ধ কিছু রেখে যাওয়া মারাত্মক পাপ
যাদের তারা হত্যা করেছিলো
ভালোবাসার সুযোগে
গ্রান্ড ক্যানিয়ন
তার আকাশে লাল ঈগল
উঁচু থেকে সে দ্যাখে
অনেক অতলের এক অসহায় পাথুরে মাছ
ছটফট করছে কাদায়
গিরিখাদের ভেতর বাতাসের বেহালা ছোটে অহোরাত্র
করুণ সুরেলা ধ্বনি
মৃতদের আর্তস্বর বয়ে যায়
এরিজোনা রাজ্যের অবাক করা গাছে গাছে
আর মাইল ফলকের লজ্জানত চোখ– দুঃখদীর্ণ সুরের ধ্রুপদী
ধারালো ধৈবত
রক্তাক্ত ঋষভ
গলিত গান্ধার
ভ্রমণভোলা মানুষ কি শুনতে চায়
পাথর মর্মরে ঢাকা সূর্যাস্তের গান
পর্যটকের মুগ্ধ দৃষ্টি– কাঠবিড়ালির ফুলে ওঠা লেজের পালে
বহুদূর পাহাড়ে পাহাড়ে
ফুডকোর্টগুলো ডাকে
আর ডলার দৌড়ে যায়
তার বিশ্বপ্রমাণ ক্ষুধা
গনগনে বিফস্টেক আর রেডওয়াইনের
শীৎকারে ভরাট গিরিপ্রান্তর
ধীরে ধীরে অসীম নৈঃশব্দ নামে
অভিশাপে কুঁচকে যাওয়া রেস্তোরার দরোজাগুলো তাকায়
যেন সত্যিই তারা এ প্রান্তরের প্রতিনিধি নয়
পর্যটকদের ক্লান্ত পা গিয়ে পড়ে
শপিং মলের মখমলে
ফেল্টহ্যাট ঘোড়সওয়ার বন্ধুক ছুরি কত চাবি ও আয়না
ঈগলের অবিকল ডানা আর সুরাপাত্র
এক সাদা মার্কিন তরুণ তাক থেকে তুলে নেয়
তীরন্দাজ রেড ইন্ডিয়ান সুন্দরীকে
একদিন যাদের তারা হত্যা করেছিলো ভালোবাসার সুযোগে
বাঘরক্ষা প্রকল্পে জনসচেতনতা
প্রকল্পকর্তা বললেন, প্রিয় উপস্থিতি
বাঘ মানুষের বন্ধু
বাঘ রক্ষার দায়িত্ব সকলের
এবার আপনাদের জন্য একটি ডেমোনেস্ট্রেশন
নিরাপদ দূরত্বে বিজ্ঞ দর্শকমণ্ডলী
অরণ্যরূপী বিশাল খাঁচায়
ঋজু ভঙ্গিতে রিং মাস্টার
হাতে লিকলিকে চাবুক আর বন্ধুক
রাগে গরগর করছে এক রয়েলবেঙ্গল
ছটফট করছে তার সবুজ চোখ
কষদাঁত বেয়ে ঝরছে লালা
ক্রোধোন্মত্ত সে থাবা মারছে শূন্যে
ভয়ঙ্কর আদিম ও আরণ্যক এই দৃশ্যে
অপমানে কাঁপছে তার ডোরাকাটা
মাঝে মাঝে রিং মাস্টারের চাবুক
বিদ্যুৎ বুলিয়ে দিচ্ছে আত্মসম্মানে
আর বন্দুক আতঙ্ক
এবং জোর হাততালির মধ্যে
হারিয়ে যাচ্ছে তার প্রাগৈতিহাসিক
আবার ব্যাকুল হয়ে উঠছে জিঘাংসা
সে ছিঁড়ে ফেলতে চায় আপোসের দূরত্ব
এই বিপুল গর্জন ও ভোজবাজির মধ্যে
দর্শকদের মুখে মৃত্যুর ভয়াবহ স্থিরতা
তারা অপেক্ষা করে এক রক্তাক্ত পরিণতির
কিন্তু তাদের এ প্রতীক্ষা প্রতিহিংসার নয়
বরং এক জন্তুর কৌতুহল
দীর্ঘকাল
পোষমানা
চাঁদ না থাকলে
অনেক জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়ে
চাঁদ তার তাৎপর্যসহ
ঔৎসুক্যের ভ্রুর মধ্যে ভেঙে পড়ে
অভিজাত পাড়ার উৎসব কাতর
এক কিশোর প্রশ্ন করে তার মাকে
ম্যাম চাঁদ এতো স্লিম কেন
কোন জিমে যায়
প্রায় একই সময়ে
শহরের অপাংক্তেয় স্থানে দাঁড়িয়ে
এক টোকাই তার বন্ধুকে বলে
দ্যাক্ হারা বছর না খাইয়া
চাঁনটা কেমুন হুকাইচে
আনন্দ যখন চোখে চোখে দৌড়ে ক্লান্ত
মফস্বলের এক কলেজ-পড়–য়া
তার বিরহী বোনকে বলে
এবারের চাঁদ কেমন রক্তাক্ত
চেটে চেটে ক্ষয় করেছে ইয়াজুজ মাজুজ
নিভে আসা কোলাহলের মধ্যে
খুশিতে আত্মহারা এক বালক
তার গৃহশিক্ষককে বলে চাঁদ উঠেছে
আজ ছুটি
আচ্ছা স্যার, যদি চাঁদ না থাকতো
তাহলে কি দেখে ঈদ হতো
প্রকল্প পরিদর্শন
পরিসংখ্যান বসে আছে প্রশ্নের অপেক্ষায়
কতজন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন
মহামান্য দেখছেন এক আদর্শ বিদ্যাশ্রম
সদাপ্রভুুর নামে সকাল শুরু করে কতজন
ব্ল্যাকবোর্ডে প্রশ্ন লিখতে লিখতে কালসিটে ধরে আঙুলে
সকলেই শিক্ষক
উত্তর আসে না
উন্নয়ন প্রকল্প হাঁ করে তাকিয়ে আছে
পরিদর্শকগণ সেনানিবাসে হাঁটছেন
পদক্ষেপ ধীর
গ্রীক ট্রাজেডির নিস্তব্ধতা
এক আদর্শিক উন্নয়ন
তৈরী হয়েছে বন্দুকের বিবেক
কোনো সৈনিক নেই
নক্ষত্রখচিত সেনাপতিদের কুচকাওয়াজ
স্বাস্থ্য উন্নয়নের পূর্বশর্ত -ডাটাবেইজড সফটওয়ার
হাসপাতালের করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে বলেন মাননীয়
মোট রোগীর সংখ্যা কত
নিরবে সিরিঞ্জ থেকে সুঁই আলাদা করে সেবিকা
হকচকিয়ে ওঠেন ব্যবস্থাপক
এখানে প্রত্যেকেই চিকিৎসক
কোনো রোগী নেই


এক কথায় চমৎকার লেগেছে। আরও লিখবেন এ প্রত্যাশা রইল।
অনেক অনেক ধন্যবাদ।
মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক
it was simply nice.
‘অনায়াসলব্ধ কিছু রেখে যাওয়া মারাত্মক পাপ’