সৈয়দ হকের সাক্ষাতকার:

‘ইতিহাস কখনও শূন্যতা পছন্দ করে না’

শিবু কুমার শীল | ২৭ december ২০১২ ১:৪৭ অপরাহ্ন

syed-haq-1.gifসময়টা দু হাজার আট সাল এর মাঝামাঝি। বাংলাদেশের পথিকৃৎ ভাস্কর নভেরা আহমেদকে নিয়ে একটি ডকুফিল্ম বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছি। সেই সূত্রেই নভেরার সমসাময়িক এই অগ্রজ কথাসাহিত্যিকের দ্বারস্থ হই আমি। উদ্দেশ্য নভেরা আর শহীদ মিনারের র্নিমাতা হিসেবে তার নাম যুক্ত না হওয়া প্রসঙ্গে কথাবার্তা ধারন করা। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে সৈয়দ হক সে সময়ে দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকায় ‘হৃৎকলমের টানে’ ধারাবাহিক কলামে শহীদ মিনারের নির্মাতা হিসেবে হামিদুর রহমানের সঙ্গে ভাস্কর নভেরার নাম যুক্ত হওয়ার পক্ষে একটি লেখা লিখেছিলেন। আর সেই সূত্রেই তার কাছে যাওয়া। তার কথোপকথনে বাংলাদেশের এক মহান কৃতি ভাস্করকে নিয়ে নানা অজানা অধ্যায় উঠে আসে।
আজ (২৭-১২-২০১২) সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ৭৮ তম জন্মদিন। তাঁকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

প্রশ্ন : শহীদ মিনার এর স্থপতি হিসেবে হামিদুর নহমানের পাশাপাশি ভাস্কর নভেরা আহমেদের নাম যুক্ত হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন কিনা?

হক : আমার ধারনা যে শহীদ মিনারের যে রূপটি আমরা দেখি এই রূপ ও পরিকল্পনা করেছেন বলে আমরা হামিদুর রহমানের নাম শুনি কিন্তু তার পাশাপাশি আরেকটি নাম উল্লেখ করা দরকার সেটি হচ্ছে নোভেরা। নোভেরার নাম করা দরকার। আমি একটা কথা বলি যে অনেক সময় আমরা জন-রবে চলি। যার নামটা প্রচারিত হয় যে কোন কারনেই হোক তিনি সামনে চলে আসেন। পেছনের মানুষগুলো অজ্ঞাত অখ্যাত থেকে যায়। নোভেরা কিন্তু অজ্ঞাত অখ্যাত থেকে যাবার মত মানুষ নন, তিনি সেই মাপের ভাস্কর, শিল্পী নন। তিনি এমন এক ভাস্কর যিনি আমাদের দেশে শুধু প্রথম বললেই কম বলা হবে বরং বলা যেতে পারে যে প্রথম এবং দুঃসাহসী এক পথিকৃত। সেটা এই অর্থে যে মুসলিম সমাজে ভাষ্কর্যের কোন পরম্পরা ছিল না। সেখানে মুসলিম সমাজ থেকে একজন এসছেন এবং তাও একজন নারী এইটা আমাদের মনে রাখতে হবে। তো নোভেরার সঙ্গে হামিদের একটা ব্যাক্তিগত বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, গভীর সম্পর্ক ছিল। নোভেরার সঙ্গে আমার কখনও আলাপ হয়নি। তাকে দূর থেকে দেখেছি, হামিদের বন্ধু হিসেবে জেনেছি। আমার বন্ধুদের ভেতরে অধিকাংশই হচ্ছেন চিত্রশিল্পী এবং সেই সূত্রেই নোভেরার কথা জেনেছি নোভেরাকে দেখেছি কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এখন পেছন ফিরে দেখি যে তার সঙ্গে আমার কখনই সরাসরি আলাপ হয়নি। হামিদ যখন এই শহীদ মিনারের পরিকল্পনা করেন তখন আমার ধারনা যে নোভেরা তার সঙ্গে মানসিকভাবে অনেক কিছু যোগ করেছেন এর কল্পনা এর রূপ নির্মাণে। এবং যে শহীদ মিনারটি এখন আমরা দেখি এটি আসলে একটি ভাস্কর্য এবং এই ভাস্কর্যের পেছনে স্বভাবতই একজন ভাস্করের হাত থাকবে তার দৃষ্টি থাকবে এটাও স্বাভাবিক। আর আমি ব্যাক্তিগত আলাপ থেকে জানি হামিদ আমাকে বহুবার বলেছেন যে, এই পরিকল্পনা করতে গিয়ে নোভেরার সঙ্গে তার প্রতিদিন আলাপ হয়েছে, প্রতিদিন কথা হয়েছে; ওরা প্রায় একসঙ্গেই থাকতেন তখন। কাজেই সেইদিক থেকে আমার এইটুকু বলবার আমি কোন লিখিত প্রমাণ দিতে পারব না। কিন্তু আমার অনুভবের প্রমাণ এই যে এই পরিকল্পনার পেছনে নোভেরা এবং হামিদ দুজনেরই নাম আমাদের করা উচিত। এবং নোভেরা যে ধরনের কাজ তিনি নিজে করেছেন তার ভাস্কর্যে যে বিমূর্ত কল্পনাগুলো আমরা দেখতে পাই সেই বিমূর্ত কল্পনারই একটি প্রকাশ আমরা এই শহীদ মিনারে দেখতে পাই। মা শোকে অবনত তার দুপাশে সন্তানেরা– এই যে কল্পনা এটি কিন্তু একটি ভাস্কর্যসুলভ কল্পনা। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এই যে আমাদের দেশে শুধু নয় সারা বিশ্বেই মৃতদের প্রতি স্মরণ করবার জন্যে যে ভাষ্কর্যগুলো কল্পনা করা হয়, যে মন্যুমেন্টগুলো, যে মঠ, যে স্মৃতি-স্বারক নির্মানগুলো সেগুলো থেকে একেবারেই আলাদা একটি কল্পনা আমরা এখানে দেখতে পাই। সম্পূর্ণ আলাদা। এর সঙ্গে না খ্রীষ্টিয় মন্যুমেন্টের কোন যোগ আছে, না হিন্দুদের মঠ যেটা আমরা শশ্মানে দেখি তার কোন যোগ আছে, না আমরা গোরস্তান…কবরের উপরে যে ধরনের নির্মাণগুলো দেখি তার কোন যোগ আছে। এটি একেবারেই নতুন ধরনের একটি কল্পনা। এবং আরো একটি আশ্চর্যের বিষয় আমার মনে হয় যে পৃথিবীতে বোধহয় আর কোন ভাষ্কর্য এত বেশি অনুকৃত হয়নি। আজকে বাংলাদেশে যেখানেই যাওয়া যাবে। কোন না কোন রূপে একটি শহীদ মিনার আছে। এবং সেই শহীদ মিনারগুলোর কিন্তু পেছনের অনুপ্রেরণা এই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার যেটি আমি মনে করি শুধু হামিদুর রহমানের একক সৃজন নয় তাঁর সঙ্গে নোভেরারও অনেকখানি যোগ রয়েছে। বরংচ হামিদ যেটা বলতেন এবং আমরাও জানি যে শহীদ মিনারের মূল নকশা তারা যেটি করেছিলেন সেটি সম্পূর্ণ করা যায়নি। সেখানে চোখ থাকবার কথা ছিল কাঁচের, যার ভিতর দিয়ে আলো এসে পড়বে শহীদ মিনারের চত্বরে। বিভিন্ন রঙের আলো এসে পড়বে এবং বেলা যত ঘুরে যাবে তত সে আলোগুলোর মিশ্রন বিভিন্ন রকম রূপ নেবে, ব্যঞ্জনা নেবে। এইটে কিন্তু চিত্রকরের কল্পনা আমি মনে করি। এবং এইখানে হামিদের সবচেয়ে বেশি চোখ কাজ করেছে, তার মন কাজ করেছে। আর এই যে মাতৃমূর্তি, এই যে সন্তান এইটি আমি মনে করি একটি ভাস্করের অবদান। এবং সেই ভাষ্করটি আর কেউ নয় নোভেরা আহমেদ।
novera.gif
প্রশ্ন : তাহলে আমরা কি এটাকে একটি রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচার হিসেবে মনে করতে পারি?

হক : এটাকে মিথ্যাচার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, ষড়যন্ত্র বলেও দেখা ঠিক হবে না। আজকাল আমরা খুব বেশি রাজনৈতিক আমন্ডলে রয়েছি বলে মনে হতে পারে কিন্তু আসলে তা নয়। এটা আমি একধরনের… কি বলব তথ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা বা খানিকটা…ওই জনরব যা শোনা গেছে সেইটেই আর বেশি তলিয়ে না দেখা। আর বাঙালিরতো এটি একটি দোষ যে আমরা যেটা কানে শুনি সেইটেকেই মনে করি যে বোধহয় শেষ কথা এবং দশজনে যখন বলছেন তখন এইটেই বোধহয় সত্য কথা, একমাত্র কথা। আমরা পুর্নবিবেচনা করি না। এবং আমি সেদিক থেকে সবসময় বলি যে বাঙালির যেটা উচিৎ সেটা হচ্ছে প্রতিটি বিষয়ে পুর্নবিবেচনা করা, মুল্যায়ন… নতুনকালে নতুনভাবে করা। এবং যাকে আমরা যা বলে জানি তিনি তাই কিনা সেটাও আমাদের অনুষন্ধান করে দেখা দরকার। এইটে একটা সাধারনভাবে কিন্তু বাঙালির ব্যর্থতা। এবং আমি এইভাবেই দেখি। আমরা খবর রাখি, আমরা অতটা তলিয়ে দেখি না। আর আমাদের প্রজন্মের মানুষ যেমন আমরা যারা যেমন হামিদ, নোভেরা আমরা প্রায় একই প্রজন্ম। দু-চার বছরের ছোট বড় হব। তো আমরাও এ বিষয়ে সবাই কথা বলি। সম্ভবত আমিই প্রথম এই নোভেরার যে অবদান শহীদ মিনার কল্পনায়, রচনায় রয়েছে এইটে প্রথম উল্লেখ করি। এবং আমার মনে আছে যে এইটে যখন… আমার লেখাটি ছাপা হয় তখন অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকেই বলেছেন যে হ্যাঁ এইটে তো এতদিন পরে একজন যোগ্য মানুষের সম্মান দেওয়া আমরা দেখতে পেলাম। অর্থাৎ নোভেরাকে আমরা পেলাম। আবার দু একজন বিশেষ করে হামিদের দু-একজন আত্মীয় আমার খুব সমালোচনা করেছিলেন এই বলে যে আমি এতদিনপর এই কথা কোথায় পেলাম। আমি বললাম পেলাম… আমি হামিদের বন্ধু হিসেবে হামিদকে যেমন দেখেছি। শহীদ মিনার যখন তৈরি হচ্ছে তখন আশেপাশে আড্ডা দিতে গিয়ে, কথা বলতে গিয়ে, চোখে দেখতে গিয়ে যতটুকু জেনেছি সেইভাবেই করেছি। এসব বিষয়েতো কোন সাক্ষ্য প্রমাণ থাকে না, লিখিত দলিল থাকে না। এবং মনে রাখতে হবে যে কাজটি পূর্ব পাকিস্তান সরকার থেকে দেয়া হয়েছে। এবং নিশ্চয়ই…গবেষকদের উচিৎ নিশ্চয়ই সরকারি নথিপত্রে উল্লেখ আছে। কাকে চুক্তিটা দেয়া হয়েছিল। যদি চুক্তিটা শুধু হামিদের নামে হয়ে থাকে, নিশ্চয়ই তাই হয়েছে। কাজেই হামিদের নামটা চলে এসছে।

প্রশ্ন : আমরা যতদূর জানি নভেরার বোনের হাজবেন্ড এর মাধ্যমে কন্ট্রাক্টটা পেয়েছিলেন…

হক : এ বিষয়ে এত বিস্তারিত আমি জানি না।

প্রশ্ন : মেহবুব আহমেদ এর মাধ্যমে এটি আমি জেনেছি।

হক : এটা আমার একেবারেই জানা নেই।

প্রশ্ন : ফলে তারা যখন ভাবছিলেন তারা বিয়ে করবেন ফলে একটা ক্যাজুয়াল জায়গা থেকেই বিষয়টি ঘটেছিল।

হক : এটা আমার একেবারেই জানা নেই।

প্রশ্ন : সাঈদ আহমদের লেখায় এসেছে যে এই নথিপত্রগুলো (শহীদ মিনারের নথিপত্র) হারিয়ে গেছে। এবং স্পষ্ট লিখেছেন যে এইখানে (শহীদ মিনারে) নভেরার কোন অবদান নেই। আর আপনার লেখাটি…আমি ঠিক জানি না এর আগে কেউ লিখেছিল কিনা, ‘হৃৎকলমের টানে’ আপনার যে লেখাটি আমার কাছে মনে হয়েছে তৎকালীন বুদ্ধিজীবি সমাজের এগেইন্সটে গিয়ে একটি লেখা। যেটা আসলে কারো সাহস নেই বলার, সেই লেখাটিই আপনি লিখেছেন। ওই সময় আরেকটা মানুষ বা দুইটা মানুষ পাওয়া গেল না যে কিনা এটার পক্ষে কথা বলে জোড়ালো আন্দোলন গড়ে তুলবে। যা হামিদুর রহমানের পাশাপাশি নভেরার নামটিও যুক্ত করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারত…

হক : তবে শেষ পর্যন্ত কথা কি কাজটাই থেকে যায়। কাজটা কে করল সেটা বোধহয়…আমার এই বয়সে এসে বলতে পারি সেটা এতটা জরুরী নয়। এটা তথ্য হিসেবে ভাল কিন্তু অনুভব করবার জন্য এটা জরুরী নয়। যেমন অজন্তা ইলোরার কাজ, কে করেছে? এই যে গ্রীক কত ভাষ্কর্য কত অসাধারন ভাস্কর্য –আমরা কি জানি? আমরা জানি না। এইযে নাম যুক্ত হওয়া, ব্যাক্তিগত একটি স্বাক্ষর যুক্ত হওয়া এইটে কিন্তু অনেক আধুনিক কালের ঘটনা। এটা আধুনিক কালের ঘটনা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে দেখা যাবে যে আমরা অনেক শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মেও স্রষ্টার নাম জানি না। কাজেই এটাও যে খুব একটা জরুরী– তাও না, কিন্তু হ্যাঁ যখন আমরা ইতিহাস উল্লেখ করব আমরা যখন এর আদ্যপান্ত আলোচনা করব তখন শিল্পীর নাম উঠে আসবে। এবং শহীদ মিনার কে কল্পনা করেছিলেন, কে রচনা করেছিলেন, কার সৃজন প্রতিভা থেকে এই অসামান্য কাজটি বেরিয়েছে এইটি আমরা আলোচনা করতেই থাকবো। এবং যেহেতু ওই সময় হামিদ এবং নোভেরা পরস্পরের খুব কাছাকাছি ছিলেন বন্ধু হিসেবে ছিলেন। তারা একসঙ্গে থাকতেন। একসঙ্গে দিবারাত্র গল্প করতেন। কাজ করতেন, স্কেচের পর স্কেচ করেছেন। কাজেই এটা একেবারেই অস্বাভাবিক কিছু নয় যে দুজনেরই মেধা এর ভেতরে কাজ করেছে। আমি সেইদিক থেকে ব্যাপারটাকে দেখি।

প্রশ্ন : কিন্তু যার যেটা প্রাপ্য সেটাতো দিতে হবে

হক : হ্যাঁ দিতে হবে। জানা থাকলেতো অবশ্যই…

প্রশ্ন : আপনার কোন লেখা যদি কেউ নিজের নামে ছাপে আপনি মেনে নেবেন?

হক : আমি মেনে নেব। আমার রচনা হচ্ছে মানুষের জন্যে, মানুষের যদি ভাল লাগে… এই যে আমরা যখন কথায় কথায় বলি ‘নানান বরন গাভিরে একই বরন দুধ, জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত’ এই যে অসাধারান দুটি পদ কার লেখা বলতে পারে কেউ? কেউ বলতে পারে না। তাতে কিছু এসে যায়? কিচ্ছু এসে যায় না। শিল্প শিল্পই। আমরা যখন তার ইতিহাস আলোচনা করব, আদ্যোপান্ত আলোচনা করব তখন প্রয়োজন পড়ে নাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিল্প শিল্পের জায়গাতেই থেকে যায়। এই যে শহীদ মিনার কে তৈরি করেছেন, কারা তৈরি করেছেন, কারা কল্পনা করেছেন তারচে অনেক জরুরী যে জাতি এটা চেয়েছে। পুরো জাতি এটাকে তৈরি করেছে যদি আমি এভাবে বলি। আজকে যখন আমি দেখি যে গ্রামে গ্রামে গ্রামান্তরে প্রতিটি জনপদে একটি না একটি শহীদ মিনার আছে। তখন… আমরা কি জানি যে কত ভিন্ন রকমেরও শহীদ মিনার আছে। কারা করেছে? মানুষ করেছে। যে মানুষ অনুভব করেছে। যে জিনিসটার একটা স্মারক দরকার যেন আমরা ভুলে না যাই আর যেহেতু আমরা একালের মানুষ আমরা জানি কেউ না কেউ এটা করেছে, কল্পনা করেছে। তার কথা আলোচনা করছি। হামিদের কথা এতকাল শুনেছি। এ নিয়ে এত বিতর্ক হবার কিচ্ছু নেই। নোভেরার কথা বলা হয়নি। আমি বলেছি নোভেরার কথা, তোমরা ছবি করছো ডকুমেন্টারি করছো নভেরার উপর। হাসনাত আবদুল হাই লিখেছেন নোভেরাকে নিয়ে উপন্যাস। আলোচনাতো হচ্ছে, প্রাপ্য তো তাকে দেয়া হচ্ছে। এদেশ তাকে আর কি দিতে পারে মানুষের ভালবাসা ছাড়া? এবং একজন এরচেয়ে আর বড় কি পেতে পারে, যে তার কাজটি অন্ততপক্ষে কয়েক হাজার অনুকৃত হয়েছে। সারাদেশে ছড়িয়ে আছে। এমনকি সারাদেশে কেন লন্ডনে আলতাবালি পাহাড়কে… একেবারে হুবহু শহীদ মিনার সেখানে স্থাপন করা হয়েছে।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনি যেটা বলছেন সেটা একটা উদারতার জায়গা থেকে…

হক : না, আমি উদারতার জায়গা থেকে বলছি না। আমি উদার মানুষ নই। এবং আমি সংকীর্ন মানুষ নই। আমি সত্যকে সত্য বলে জানি। সেটা হচ্ছে কথা।

প্রশ্ন : যখন পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে শহীদ মিনারের স্থপতি কে তখন কিন্তু আমাকে হামিদুর রহমানের নামটাই লিখতে হচ্ছে। এবং তখন আমার মধ্যে কিন্তু একটা কনফিউশন… একটা অপরাধবোধ কাজ করে। আমি বলতে চাচ্ছি…

হক : তুমি লিখবে না, তোমার যদি অপরাধবোধ হয় তুমি লিখো না। সেটার জন্যইতো উল্লেখ করেছি। এটা অপরাধবোধেরও নয়।

প্রশ্ন : এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোন ভূমিকা থাকা উচিত নয় কি?

হক : রাষ্ট্রের কিসের ভুমিকা থাকবে এতে?

প্রশ্ন : রাষ্ট্র কি পুনর্মুল্যায়ন বা বিষয়টা পুনর্বিবেচনা করতে পারে না?

হক : এটা রাষ্ট্রের কোন ব্যাপারই নয়। এটা মানুষের ব্যাপার। এটা তোমাদের ব্যাপার, এটা আমাদের ব্যাপার। আমরা যারা শহীদ মিনারে যাচ্ছি, আমরা যারা শহীদ মিনার নিয়ে কথা বলছি। আমরা যারা জানতে চাই। এটা আমাদেরই ব্যাপার। আমাদেরই ভেতরে এটা আসবে। এটাতো রাষ্ট্র বা আইন করে বা কোন একটা নীতি নির্ধারন করে বা ঘোষণা দিয়ে বলবার কিছু নেই।

প্রশ্ন : তার মানে সেই ক্ষেত্রে আমরা চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব না?

হক : না। এটা শুধু আমরা যারা জীবিত আছি এই আমাদের কথাই যা প্রমাণ, যা তথ্য, উপাত্ত এই আমি বলছি এইটেই হচ্ছে কথা।

প্রশ্ন : এটাকে বাস্তবে রূপায়িত করার কোন স্কোপ কি নেই আমাদের? আমরা কি পারি না একটা নাম ফলকে তার নামটাও যুক্ত করতে?

হক : সেটা চেষ্টা করে দেখ। তোমরা সেটার দাবি তোল।

প্রশ্ন : সেটাই বলছি যে সেটার দাবি তোলাটা প্রয়োজন কিনা?

হক : উচিৎ অনুচিৎ আমার কাছে… তুমিতো মনে হচ্ছে রাজনৈতিক প্রশ্ন করছ আমাকে। দেশের যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি…আজকাল সাহিত্যিকের কাছে আসলে প্রশ্নগুলো সেইরকমই হয়। এবং আমি এটা অত্যন্ত অপছন্দ করি। আমার যতটুকু দ্বায়িত্ব আমি পালন করেছি। আমার যেটা মনে হয়েছে আমি বলেছি। এটা উচিৎ কি অনুচিৎ দাবী তোলা উচিৎ কি উচিৎ নয়, ফলক স্থাপিত হবে কি না হবে সেটা আর দশজনের কথা। আমি এইটুকুই বলতে পারি যেহেতু আমি সমসময়ের মানুষ আমার যেটা মনে হয়েছে যে নোভেরার নামটিও করা দরকার। ‘নামটিও’। আমি বলছি না নোভেরা মূল পরিকল্পক। আমি বলছি হামিদ এটা করেছে। নোভেরা তার সঙ্গে ছিলেন নোভেরারও অবদান রয়েছে। কারন এই পুরো ব্যাপারটি… এর ভেতরে ভাস্কর্যের যে প্রাধান্য রয়েছে… এবং তারা যখন অত্যন্ত গভীর বন্ধুত্বে আবদ্ধ ছিলেন তখন তারও অবদান আমাদের স্বীকার করতে হবে। এসবেরতো কোন লিখিত প্রমান থাকে না।

প্রশ্ন : নভেরা আহমেদের কাজ এবং শহীদ মিনারের যে মূল স্থাপনা এর দুয়ের মধ্যে কোন সাজুয্য আপনি খুঁজে পান কিনা? আর নভেরা সম্পর্কে যে আলোচনা সেখানে আমরা শুনেছি যে তিনি রুদ্রাক্ষের মালা পড়তেন, উনি সুন্দরী ছিলেন, ফেমিনিষ্টদের মত চলাফেরা করতেন। উনার ব্যাক্তিগত জীবনযাপন নিয়েই কথা হয়েছে বেশি– এ সমস্ত আলোচনায় তার কাজের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। আমি বলতে চাইছি আপনি তার কাজ সম্পর্কে বিশেষ করে আমাদের গ্রাম বাংলার বা আমাদের সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে তার কাজগুলোকে নিয়ে একটু মূল্যায়ন করবেন? অন্তত তার যে কাজগুলো আপনি দেখেছেন।

হক : ওর কাজের মূল্যায়ন আমি করেছি। আগেও করেছি এখনও করছি সেটি হচ্ছে তিনি আমাদের প্রথম এবং দুঃসাহসী পথিকৃৎ। বাঙালি মুসলিম সমাজে ভাস্কর্যের পরম্পরা ছিল না। সেখানে সেই মুসলিম সমাজ থেকে তিনি উঠে এসেছেন তাও একজন নারী। কিন্তু তার কাজের সংখ্যা অত্যন্ত কম। কাজেই তাকে ভাস্কর হিসেবে মূল্যায়ন করার চেয়ে তার ঐতিহাসিক যে অবস্থান সেটি মূল্যায়ন করা প্রথম দরকার। এবং সেটি হচ্ছে আমি যেমনটি বললাম তিনি প্রথম এবং দুঃসাহসী একজন পথিকৃৎ।

প্রশ্ন : আপনার লেখাটি কত বছর আগে ছাপা হয়?

হক : আমার মনে নেই; অনন্তপক্ষে আজ থেকে আঠার বিশ বছর আগে হবে।

প্রশ্ন : তার কাজ আপনি কতটা কাছ থেকে দেখেছেন বা তার সম্পর্কে কোন বিরূপ সমালোচনা আছে কিনা…

হক : বিরূপ সমালোচনা কেন থাকবে?

প্রশ্ন : মানে তিনি আরো কাজ করতে পারতেন… বা…

হক : না, না, আমি সবসময় তার সম্পর্কে সশ্রদ্ধ, সস্নেহ। আমার সবসময় দৃষ্টি তার প্রতি। তিনি অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন এবং সেটা ঐতিহাসিক দিক থেকে।

প্রশ্ন : নভেরা তরুনদেরকে এক্সপ্লয়েট করত। এটা আপনি মনে করেন কিনা?

হক : তার ব্যাক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমার কোন উৎসাহ নেই। এবং কোন কিছু জানারও নেই। আমি আগেই বলেছি তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোন পরিচয়ও ছিল না। এবং এখনও তিনি আছেন। তার সঙ্গে আমার কোন রকম যোগাযোগ নেই।

প্রশ্ন : হামিদুর রহমান যেহেতু আপনার বন্ধু ছিলেন ওই সূত্রেই বলছি আর কি…

হক : না, অনেক কথা আছে যেগুলো সাক্ষাৎকারে আসে না। মানুষের সঙ্গে যখন মানুষের যোগ ঘটে তার অনেকগুলো স্তর আছে। ব্যাক্তিগত স্তর, সামাজিক স্তর, শৈল্পিক স্তর সব কিছু কি বলা যায়? সবকিছু কি বলা উচিৎ? সবকিছু কি জরুরী? আমিতো এটাকে ফালতু প্রশ্ন মনে করি যে নোভেরা রুদ্রাক্ষের মালা পড়তেন, কিংবা তুমি যেরকম জিজ্ঞেস করছো তিনি কি এক্সপ্লয়েট করতেন? এগুলো একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। মাইকেল মধুসুদন দত্ত মদ খেতেন। মদ খেয়ে চুর হয়ে থাকতেন। তাতে কি আসে যায়? তার মেঘনাদবধ কাব্য রয়েছে তিনি সায়েবদের পোষাক পড়তেন, ইংরেজিতে কথা বলতেন সো হোয়াট? এগুলো কিছু ব্যাপারই নয়।

প্রশ্ন : তার কাজের ফিলসফিকাল জায়গাটা যদি বলেন…

হক : আমিতো বলেছি তার কাজের সংখ্যা অত্যন্ত কম। এবং আমি দেখেছি তার দু তিনটে কাজ। কাজেই এর ভিত্তিতে…

প্রশ্ন : তেজগাঁ রোডে যে কাজটা দেখেছেন ওই কাজটা সম্পর্কে যদি বলেন

হক : কী বলব?

প্রশ্ন : আপনার লেখায় যেটা এসেছে যে আসা যাওয়ার পথে যে স্কাল্পচারটা দেখতেন এবং সেই কাজটা সম্পর্কে যদি বিস্তারিত বলতেন।

হক : আমি আর কী বলব। আর ভাস্কর্যতো সেখানে নেইও।

প্রশ্ন : যাদুঘরে আছে।

হক : হ্যাঁ, তো যাদুঘরেই… আমি আর বিস্তারিত কী বলব? (হাসি)

প্রশ্ন : না, মানে যে স্মৃতিকথাটুকু লেখায় এসেছে সেটা যদি ডকুমেন্টারিতে আনতে চাই সে ক্ষেত্রে…

হক : এটা এতটুকু পর্যন্ত বলতে পারি যে তেজগাঁর রাস্তায় যে পাট ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের নামটা ভুলে যাচ্ছি… মি. খান তার বাড়ির সামনে এটি ছিল এবং যাতায়াতের পথে চোখে পড়ত। এবং আমার কাছে এইটে মনে হয়েছে যে অনেক পথচারীকে দেখেছি থেমে একটু দেখতে, একটু এগিয়ে যেতে কিন্তু এর যে কোন প্রভাব পড়েছে মানুষের মনে এমনটা আমার মনে হয়নি। কিন্তু এটা একটা ভীষণ ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল। এখনও এত যে বিত্ত, এত যে অট্টালিকা ঢাকায় কোন বাড়ির সামনে কোন ভাস্করের করা কাজ কেউ স্থাপন করেছেন বলে আমার চোখে পড়েনি। কিন্তু সেই সময় এটি ছিল। এবং একমাত্র। তাও সেটি এখন নেই। আর একটি ছিল তেজগাঁ এ এফ ডি সি’র চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের মাঠে। এবং সেই ভাষ্কর্যটি একটি মাতৃমুর্তি ছিল। মা এবং তার শিশু সন্তান। এইটে সেই চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম নাজির আহমেদ সাহেব ওটা কিনে ওখানে স্থাপন করেছিলেন। নাজির আহমেদ সাহেব হচ্ছেন হামিদুর রহমানের বড় ভাই।

প্রশ্ন : তিনি কি কোন আন্দোলনের ফসল ছিলেন কিনা? যখন তিনি কাজ করছেন তার সময়কালটা সম্পর্কে একটু বলেন তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি…

হক : না, না। এগুলো কোন ব্যাপারই না। এটা আমরা… যখন সেই উনিশশ সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান হল তারপরে দশ বছরে শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা যারা এসছি, কোন আন্দোলনের ফসল আমরা নই। এগুলো আন্দোলনের ফসল হাল চলতি কথা। সত্তর আশির দশকে মুখরোচক কথা। আমরা ভেতর থেকে বেরিয়ে এসছি আলো থেকে আমরা আরো বৃহত্তর আলোর দিকে আসবার চেষ্টা করেছি। আমরা নিজেদের অনুভব করবার চেষ্টা করেছি। এবং এইটে কোন একটা আন্দোলনের রূপ নয়। এটা ব্যাক্তিক ছিল। আমরা কে কিভাবে গড়ে উঠেছি সেটা সমাজতত্ত্বের বিষয় কিন্তু এখনকার মত কোন আন্দোলন ভিত্তিক নয়। এটা পড়ে দানা বাঁধে।

প্রশ্ন : ভারতবর্ষের আন্দোলনগুলোতে আমরা দেখতে পাই … যেমন আমরা গান্ধিকে পাচ্ছি, জিন্নাহ, নেহরু, সোহরাওয়ার্দীকে পাচ্ছি বা এরকম আরো অনেকের নাম করতে পারছি। সাতচল্লিশ পূর্ববর্তী যে আন্দোলনগুলো হয়েছে সেখানে ব্যক্তিই প্রাধান্য পেয়েছে। বা বলা যেতে পারে ব্যক্তি আন্দোলনগুলোর কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু বায়ান্ন, উনসত্তর, একাত্তর, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রেও কিন্তু ভিন্ন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তো আমি বলতে চাচ্ছিলাম এইসমস্ত আন্দোলনের ধারাবাহিকতা কতটুকু প্রভাব বিস্তার করেছিল তৎকালীন শিল্পী সাহিত্যিকদের। যেমন শিখা গোষ্ঠীর নাম আমরা জানি…

হক : না। না। একেবারেই নয়। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ তখন অন্যরকম। উনিশ শ সাতচল্লিশের পর থেকে অন্তত বছর দশেক পর্যন্ত আমরা যারাই যে কাজে এসেছি শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে এজ ইনডিভিজুয়ালি উই কেম। এবং আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে গড়ে তুলেছি। সেই সময়টাকে বুঝতে হবে। সেই সময়টা…তুমি যে প্রশ্ন করছো তোমার পক্ষেও অনুধাবন করা সম্ভব নয়। যদি না তুমি পড়াশোনা কর। আমার মনে হয় ততটা খবর রাখনি। তখন আমরা প্রত্যেকে একটা ব্যক্তিক উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে এসছি। এবং এটার একটাই কারন আমি দেখতে পাই সেটা হচ্ছে যে ইতিহাস কখনও শূণ্যতা পছন্দ করে না। শূণ্যতাই জন্ম দেয় মানুষের।

প্রশ্ন : তাহলে মধ্যযুগের সাহিত্যকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

হক : আমি সাহিত্য সম্পর্কে কোন কথাই বলি না কারন আমি সাহিত্য সম্পর্কে খুবই অনভিজ্ঞ মানুষ যদিও আমি লিখি।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনিতো বললেন ইতিহাস শূণ্যতা পছন্দ করে না। তাহলে আমরা যেমন শুনি মধ্যযুগ মানে বন্ধ্যা একটা সময়…ইত্যাদি

হক: আমিতো ক্লাশ নিচ্ছি না শিবু? আমি কি ক্লাশ নিচ্ছি? তাহলে?

প্রশ্ন : আমরাতো আপনার ছাত্রই। আমরাতো আপনার লেখা পড়েই…

হক: এর বেশি আমি বলতে পারব না। ইতিহাস শূণ্যতা পছন্দ করে না। মধ্যযুগে কি হয়েছিল না হয়েছিল সেটা আমার জানা নেই। এখন জানি ইতিহাস কখনও শূণ্যতা পছন্দ করে না। শূণ্যতা থেকেই মানুষকে তৈরি হতে হয়। মানুষ তৈরি হয়।

প্রশ্ন : নভেরার ভাষ্কর্য এবং তার পরবর্তী সময়ের ভাষ্কর্য চর্চার একটা মূল্যায়ন যদি করেন কোন প্রভাব, সঙ্গতি বা মিল খুঁজে পান কিনা।

হক : হ্যাঁ নিশ্চয়ই। নোভেরারতো একটা প্রভাব আছেই। বিমূর্ত কল্পনা… সেটা তিনি প্রথম আমাদের দেশে ভাস্কর্যে এনেছেন। কাজেই বিমূর্ত কাজ যারা করছে তারা সবাই যে নোভেরা দ্বারা প্রভাবিত তা না। আরো অনেকই আছেন। কিন্তু তিনি পথটা খুলে দিয়েছেন। এই দিক থেকেই। তাছাড়া তার কাজের সংখ্যা আমি বারবার বলছি এত অল্প যে তার প্রভাব বা মূল্যায়ন আমার পক্ষে নির্নয় করা মুশকিল।

প্রশ্ন : কিন্তু দেশের বাইরে বিশেষ করে ব্যাংককে তার কাজ রয়েছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের উপর কাজ করেছেন, উনিশশ ষাট সালে এতগুলো কাজ নিয়ে তিনি প্রদর্শনী করলেন যেই কাজের অনেক কাজই নষ্ট হতে হতে আজো বিভিন্ন জায়গায় সংরক্ষিত আছে। মানে আমি বলতে চাচ্ছি আমাদের বর্তমান সময়ের অনেক ভাস্করের চেয়ে তার কাজের সংখ্যা আমার কাছে বেশিই মনে হয়েছে ।

হক: আমি দেখিনি বলেইতো বলছি যে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমার এ বিষয়ে জানা নেই। আমার ধারনা তার কাজের সংখ্যা খুবই কম।

প্রশ্ন : যদিও আপনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন তারপরও জানতে চাইছি সাতচল্লিশ পরবর্তী আন্দোলন সমূহ এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের রক্তপাত ও সর্বোপরি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে দেশটি পেলাম সেখানে একজন নভেরার স্থান কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

হক : নোভেরাকে মনে রাখতে হবে প্রথম ভাষ্কর হিসেবে। পথিকৃৎ হিসেবে এবং মুসলিম সমাজের একজন নারী হিসেবে। আমার কাছে তার অবস্থান ঐতিহাসিক দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তার শৈল্পিক অবস্থানের চেয়ে। এবং এটা শুধু নোভেরার ব্যাপানে নয় আমাদের ভেতরে অনেক কবি লেখক এদেরও কিন্তু এই ভূমিকাটি রয়েছে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা তাদের অনেক বেশি। শক্ত এবং উজ্জল। তাদের হাতের কাজের চেয়ে।

প্রশ্ন : আপনার লেখায় যে প্রসঙ্গটি এল যে শহীদ মিনারের স্থপতি হিসেবে নোভেরার নামটিও যুক্ত হওয়া দরকার। কিন্তু সমসাময়িক শিল্পী বা অন্য বুদ্ধিজীবিদের কাছ থেকে কেন কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল না?

হক : এই প্রশ্নের জবাবতো আমার দেয়ার কথা নয়।

প্রশ্ন : আপনি কি চান নোভেরা দেশে ফিরে আসুক? তার কাজগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ হোক তরুণ প্রজন্ম নভেরাকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করবে শুধুই একজন পাইওনিয়ার নাকি একজন সফল আধুনিক ভাস্কর হিসেবে?

হক: আমিতো বারবার বলছি তার অবস্থান আমার কাছে ঐতিহাসিক দিক দিয়ে অনেক উজ্জল এবং সেই স্বীকৃতি তাকে দিতেই হবে। তার কাজের বিষয়ে এর অতিরিক্ত কিছু এই মুহূর্তে আমার বলবার নেই কারন তার সবটা কাজের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। আমার ধারনা তার কাজের সংখ্যা অনেক কম। তিনি দেশে ফিরে আসবেন কিনা আসা উচিৎ কিনা এটা অবান্তর প্রশ্ন। পৃথিবী আমার দেশ। আমি নিজেও দেশে যতটা থাকি বিদেশে বছরের ঠিক ততটা সময়ই কাটাই। সারা পৃথিবী আমার দেশ। ওই যে একটু আগে বললাম না যে ‘জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত।’ তো এই জগৎ ভ্রমন… আর দেশ। মানুষ যেখানে অনুভব করে তার আত্মার শক্তি, তার সৃজনের প্রেরণা সেটাইতো তার দেশ তিনি যেখানেই থাকুন তিনি যদি তার কাজ চালিয়ে যান তাহলেই তিনি আছেন। আমাদের ভেতরেই আছেন। এর বেশি আমি অন্য কিছু বলবার প্রয়োজন দেখি না। যে কে কোথায় থাকবে না থাকবে এটা ব্যক্তিগত যেমন সিদ্ধান্ত তেমনি কার কোনখানে ভাল লাগে, কোনখানে তিনি প্রেরণা পান, কোনখানে তিনি স্বস্তি পান সেইটা তার কাছে সবচেয়ে বড় কারন, মানুষটাতো শেষপর্যন্ত মানুষ। ব্যক্তি। তাইতো?
syed-haq-2.gif
প্রশ্ন : নভেরাকে আপনার কোন কারনে ফেমিনিস্ট মনে হয়েছে কি?

হক: আমার কাছে তাকে মানুষই মনে হয়েছে। এবং আমি সেইভাবেই দেখি। যে নারী তথাকথিত অর্থে নারীত্ব থেকে মুক্ত তিনি মানুষতো বটে। এবং সে হিসেবেই আমাদের দেখা উচিৎ। আমি নিজে সে হিসেবেই দেখি। আমি নারী পুরুষের প্রতি যখন তাকাই তখন তাদের আমি মানুষ হিসেবে প্রথম দেখি এবং সেইটেই শেষপর্যন্ত সত্য।

প্রশ্ন : আমরা তরুণ প্রজন্ম নভেরা বিষয়ে কি করতে পারি বলে আপনি মনে করেন?

তোমরা নিজেরা কাজ করবে সেইটেই হচ্ছে বড়। নোভেরাকে নিয়ে তোমাদের কিচ্ছু করবার নেই। কথা বলছো এইটে অনেক ভাল। এবং এইখানেই এটার প্রাসঙ্গিকতা। কিন্তু আজকে যদি দেশে ভাস্কর্যের বিকাশ দেশে আরো ঘটে তাহলে তার ভেতরেই নোভেরা আছে। সেইটেই নোভেরার প্রতি সম্মান জানানো যে তিনি আমাদের প্রথম এবং পথিকৃত ছিলেন। আজকে দেশে ভাস্কর্য ভাঙ্গার যে ঘটনা ঘটেছে যা নিয়ে প্রতিবাদ করছি আমরা, তার ভেতরেই নোভেরা আছে কারন আমরা জানছি এটি মূর্তি নয় এটি ভাস্কর্য, এটি শিল্প। ধর্মের সঙ্গে এর কোন বিরোধিতা বা সংঘর্ষ নেই। সেদিক থেকে দেখা উচিৎ নয়। সেই চেতনা যদি আমরা ধারন করি তাহলেই আমরা নোভেরাকে পাব।

(বি:দ্র- সৈয়দ হক নভেরাকে নোভেরা উচ্চারন করে থাকেন তার লেখায়ও এই বানান ব্যবহার করেন। ফলে তার কথার অংশে তার বানানবিধি অনুসরন করা হয়েছে।)

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (১১) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন golam rabbani — december ২৭, ২০১২ @ ৪:৫৫ অপরাহ্ন

      কবি কবির জায়গা থেকেই বলেছেন। তাঁকে রাজনীতির দোলনায় না দোলালেও চলতো। যাই হোক ভালোই লেগেছে নভেরাকে জেনে। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহসিন রাহুল — december ২৭, ২০১২ @ ৮:৪৩ অপরাহ্ন

      শিবু কুমার শীল , পড়লাম । মধ্যযুগ নিয়া প্রশ্নটা মজার । ভালো থাকবেন ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন pahlabi — december ২৯, ২০১২ @ ৯:২৮ পূর্বাহ্ন

      Asole ekjon kobir dharonar upor base kore Sohid Minar er nirmata hisabe noverar nam asa uchit noi. Hamidur Rahman ke je konjon chinen novera keo se ko chinen…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাজী মাহবুব হাসান — december ২৯, ২০১২ @ ১১:২৫ পূর্বাহ্ন

      সৈয়দ শামসুল হক এর চমৎকার কিছু উত্তর ভালো লাগলো…;
      প্রশ্নকর্তার প্রশ্নগুলোর অস্থিরতার মধ্যেই সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন monwar Iqbal Rahat — december ২৯, ২০১২ @ ১:৩৯ অপরাহ্ন

      নভেরা নিয়ে পড়েিছলাম ৮০’র দশক এ প্রকাশিত হাসনাত আব্দুল হাই রচনায় সাপ্তাহিক “বিচিত্রায়” উপন্যাশ আকারে। আমার বন্ধু শিবু আবার এই রহস্য মানবীকে বের করে আনার প্রয়াশ দেখাচ্ছেন। কিন্তু উনি যে সব সময় পর্দার আড়ালে থাকা মানুষ। নেপথ্যে থাকতে ভালোবাসেন।
      ==============
      মনোয়ার ইকবাল রাহাত।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেওয়ান আবদুল বাসেত — december ২৯, ২০১২ @ ৫:৩৩ অপরাহ্ন

      বিডিনিউজ২৪ ডটকম কে অন্তবিহীন ধন্যবাদ এমন একটি তথ্য ও তত্ব ভিত্তিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করার জন্য। আমরা নোভেরাকে জানতে পেরেছি আপনাদের মাধ্যমেই…এটাই আমাদের জন্য বড় পাওয়া। এখন আমরাই আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করবো আমাদের এখন কী করা উচিৎ। সুপ্রিয় কবি সৈয়দ শামসুল হককে আন্তরিক ধন্যবাদ যে ওনি বেঁচে থাকতেই একটি সত্য নোভেরাকে নিয়ে দু’বার লিখে, বলে দেশ ও জাতিকে জানালেনে। এখন আমাদেরই ঠিক করা উচিত ‘আমরা কি হুজুগে বাঙালই থাকবো’ নাকি সেটা এবার গোছাবার চেষ্টা করবো। তথ্যপ্রমান ছাড়াতো আমাদের এই বিভূঁই প্রবাসে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন (তারা প্রায় সবাই মৌলবাদী দলের লোক) তাদের সার্টিফিকেটও আছে কিন্তু অনেক তথ্যপ্রমানের মুক্তিযোদ্ধাদের কোন সার্টিফিকেট নেই……।এদিকে আর বেশীদূর এগোলাম না।কেননা সত্য বলতে গেলেইতো বিপদ! তারপরও কবি সত্য বলেছেন…এবং কবিরা সবাই সত্যই বলে এবং বলা উচিৎও…দেওয়ান আবদুল বাসেত, সম্পাদক, মরুপলাশ….রিয়াদ, সউদী আরব।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গোপাল মজুমদার — december ৩০, ২০১২ @ ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

      নভেরা সম্পর্কে জেনে অনেক ভাল লাগলো তবে মধ্যযুগ সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর ব্যাখ্যা হলে আরো ভাল লাগতো| স্যারকে ধন্যবাদ|

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসমা সুলতানা — december ৩১, ২০১২ @ ৩:৪২ পূর্বাহ্ন

      যে থাকতে চায় আমরা তাকে ধরে রাখতে জানি না । যে স্বেচ্ছায় চলে যেতে চায়, আমরা তাকে ছেড়ে দিতে জানি না ।

      নভেরা যেখানেই থাকুন আমাদের উচিৎ তাকে একা থাকতে দেয়া ।

      উনি দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন কাজে লাগানোর মতো । আমরা যেটুকু পেয়েছি শিল্পী হিসেবে তাঁর কাছ থেকে সেটুকু নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে ।
      তবে একটা কথা না বললেই নয়; কেনো জেনো আমরা সঠিক মানুষের কাছে সঠিক প্রশ্নটি করতে আজো শিখিনি ; তাই আমাদের সঠিক উত্তরটিও মেলে না কখনো !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোঃ আলী আজম — জানুয়ারি ৬, ২০১৩ @ ৪:০৩ অপরাহ্ন

      দেশ-দেশান্তরে কোন ভাস্কর্যের গায়ে ভুল বানানে শিল্পী নভেরার নাম দেখে হয়তো আমরা বিমোহিত হব, বিড়বিড় করে বলব- “দাঁড়াও পথিক বর জন্ম যদি তব বঙ্গে তিষ্ট ক্ষণকাল”। সম্মান নভেরার প্রতি। সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হককে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন binay joydhar — জানুয়ারি ৬, ২০১৩ @ ৪:৪০ অপরাহ্ন

      Thanks admin. Thanks shibu da

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তানসেন — অক্টোবর ২০, ২০১৩ @ ১০:০০ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারটি তথ্যবহুল, নভেরা আহমেদকে নিয়ে কৌতুহলের নিবৃত্তি হয়নি । আমার মনে হয়েছে সৈয়দ হক আরও বলতে পারতেন । নভেরার অবদান প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 

মাউস ক্লিকে বাংলা লেখার জন্য ত্রিভুজ প্যাড-এর 'ভার্চুয়াল কীবোর্ড' ব্যবহার করুন


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com