৭১’-এর সেই জনযুদ্ধ যেমনটা দেখেছি
১৯৭১ এর মে মাসের প্রথম সপ্তাহের কোন একটা দিন, দুপুরের দিকে, আমার দাদীর বাড়ীতে অন্যদের নিয়ে খেলায় মত্ত আমি। তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র, তবে স্কুলে যাওয়ার বালাই নেই, কারন যুদ্ধ লেগেছে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে, স্কুলের স্যাররা সবাই যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, দু একজন নাকি চলেও গেছে। সারাদিনই শুধু খেলা আর খেলা। হঠাৎ বড়দের মধ্যে ভিশন হৈ চৈ, আমার চাচারা ও তাদের বন্ধুরা যাঁরা ভেতরের বাড়ীতে জটলা করছিল, সবাই দৌড়াচ্ছে বাইরের বাড়ীর কাঁচারী ঘরের দিকে। সেখানে আমার আব্বা অনেক লোকজন নিয়ে প্রতিদিনের মতই সেদিনও সলা-পরামর্শ করছিলেন, বোধকরি দেশের যুদ্ধ নিয়েই। আমাদের বাড়ী সংলগ্ন খেলার মাঠ থেকে আমিও দৌড়ালাম কাঁচারী ঘরের দিকে। যেতে যেতে দেখলাম আশেপাশের বাড়ীগুলো থেকেও পরিচিতরা সবাই আমাদের বাড়ীর দিকেই ছুটে আসছে। গিয়ে দেখলাম একজন লোক একটা ঘোড়ার পিঠে বসা (সেই সময়ে আমাদের এলাকায় দ্রুততার সাথে সংবাদ প্রেরণের একমাত্র অবলম্বন ছিল ঘোড়সওয়ার হওয়া), উচ্চস্বরে আব্বাকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে এতই উত্তেজিত যে কেউই তার কথার কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। এক পর্যায়ে তার পরনের লুঙ্গির গিট খুলে একটা চিরকুট বের করে আব্বার হাতে দিল। মুহুর্তেই তিনি কাগজের ভাজ খুলে চিঠিটি পড়ে ফেললেন। তাঁর মুখের ফ্যাকাসে অবস্থা দেখে ছোট্র আমারও বুঝতে বাকী রইল না যে ঐ চিরকুটে কোন একটা মহা বিপদের বার্তা আছে। আব্বা সম্প্রতি যুদ্ধ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ‘বাংলা বাহিনী’ নামে একটা দল গঠন করেছেন, ২৫/৩০ জনের এই দলটি গত কয়েক মাস হল মোটামুটিভাবে আমাদের বাড়ীতেই থাকে, খায়। এদের কাজ এলাকার যুবকদের সংগঠিত করা, মিটিং মিছিলের আয়োজন করা, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কেউ কোন শব্দ উচ্চারণ করলে তাকে শয়েস্তা করা ইত্যাদি। তারা আব্বার অত্যন্ত অনুগত, বিনা বাক্য ব্যায়ে যে কোন নির্দেশ বাস্থবায়নে জীবন দিতেও প্রস্তুত। বড়দের বলাবলি করতে শুনেছি ওরা সবাই খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধে চলে যাবে এবং দেশ স্বাধীন করে তবেই ফিরবে। আব্বা হুঙ্কার দিয়ে এই বাংলা বাহিনীকে হুকুম দিলেন,- ‘তোরা এক্ষুনি বেরিয়ে যা, আশেপাশের সব গ্রামে খবর দে, সবাই যেন ঢাল, সড়কি, লাঠি, বল্লম যার যা কিছু অস্ত্র আছে সব নিয়ে এক্ষুনি চলে আসে’। ‘মোক্তার সাহেব’ (আমাদের এলাকার নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য) খবর পাঠিয়েছেন, ভাটিয়াপাড়া ওয়ারলেস স্টেশনে পাকিস্তানি মিলিটারীর ৪০/৫০ জনের একটি দল আজ সকালেই এসে ঘাঁটি গেড়েছে। মোক্তার সাহেবের নির্দেশ, আশপাশের পঞ্চাশ গ্রাম থেকে হাজার হাজার লোক নিয়ে মিলিটারীদের ঘিরে ফেলতে হবে এবং একজন একজন করে পিশে মারতে হবে।
তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার কাশিয়ানি থানার এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার দাদির বাড়ী। বংশানুক্রমে আব্বা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট এবং থানা আওয়ামী লীগের সম্পাদক, অঞ্চলের মানুষ তাঁকে ভালবাসে, সমীহ করে, শ্রদ্ধা করে, দুষ্টু লোকেরা ভয়ও করে। আক্তার উদ্দিন মিয়া, পেশায় গোপালগঞ্জ মহাকুমা ফৌজদারী আদালতের মোক্তার, কাশিয়ানী থানা আওয়ামী লিগের সভাপতি। এলাকার সাধারন মানুষ সন্মান করে তাঁকে ‘মোক্তার সাহেব’ বলে ডাকে। ১৯৭০ এর সাধারন নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে মুসলিম লিগের ডাকসাইটে প্রার্থির জামানত বাজেয়াপ্ত করে দিয়ে প্রাদেশিক সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আক্তার কাকাকে আমাদের পরিবারের একজনই মনে হত আমার কাছে, আমার আব্বার থেকে বয়সে বেশ বড়, তাঁর নাম ধরে ‘টিপু মিয়া’ বলে ডাকেন, তবে দীর্ঘ দিনের নিবীড় বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া দুজনার মধ্যে। ‘দল চালাবার টাকা’ এবং স্থানীয় আওয়ামী লিগের যে কোন নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য মোক্তার সাহেব আব্বার উপরেই নির্ভরশীল ছিলেন।
দু তিন ঘন্টার মধ্যেই আমাদের বাড়ীর সামনের মাঠ হাজারো মানুষে পরিপুর্ন। সবাই উত্তেজিত, প্রত্যেকের হাতেই দেশী অস্ত্র। কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ, কেউই বাদ যায় না, লাঠী/সড়কীর শির্শে স্বাধীন বাংলার পতাকা। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর সারা গ্রামের আকাশ বাতাস। মুক্তিকামি হাজারো মানুষের গগন বিদারী চিৎকার,- ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘তোমার নেতা আমার নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’, ‘ইয়াহিয়ার চামড়া, তুলে নেব আমরা’, ‘শেখ মুজিবের কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ ইত্যাদি। এ যেন হাজারো মানুষের সম্মিলিত শক্তির মহাবিষ্ফোরণ, কি তার তেজ, কি বিক্রম ! কে রুখবে এদের স্বাধীনতা ? নিরীহ, নিরন্ন মানুষদের এমন প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, পৃথিবী আর দেখেছে বলে আমার জানা নেই, এ অহংকার কেবল বাঙালীরই সাজে।
আমাদের ভেতরের বাড়ীতে দৃশ্যটা অন্যরকম। আমার দাদী বসে আছেন উঠনের মাঝখানে তাঁর সেই চেয়ারখানায়, মাঝে মধ্যেই হাকডাক করে সবাইকে তটস্থ রাখছেন, আমার আম্মা আর মেঝচাচী রান্নার তদারকীতে ব্যস্ত। অন্তত দশটা চুলায়, বড় বড় ড্যাগে (বিশাল সাইজের রান্নার পাত্র) ভাত ও খেসাড়ীর ডাল রান্না হচ্ছে। কোন একটা ড্যাগের রান্না শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বাংলা বাহিনীর লোকেরা সেটা বাইরের বাড়ীর উঠোনে নিয়ে লম্বা লাইনে বসা ক্ষুধার্থ মানুষদের কলাপাতার থালায় খাবার বেড়ে দিচ্ছে। মাঝেমধ্যেই আমার দাদী তদারকী করতে বাইরের উঠোনে আসছেন আর বলছেন সবাইকে ‘পেট ভরে খাও, যুদ্ধে যাচ্ছ তোমরা, আবার কখন খেতে পাবে সেতো আল্লাহই জানে’!
বাঙলা বাহিনীর ছেলেরা আমাদের মাঠে ইতিমধ্যেই একটা কাঠের চৌকির উপরে আরো একটা চৌকি দিয়ে ষ্টেজ বানিয়ে ফেলেছে। বেলা দুইটার দিকে আব্বা সেই ষ্টেজে উঠলেন, হাতে নিলেন তাঁর প্রিয় হ্যান্ড মাইকটি। হাজার হাজার মানুষ, মাঠে তিলধরাবার জায়গাও নেই, কেউ কোন শব্দ করছে না, সবাই অপেক্ষায় নির্দেশের! উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন,- আজ রাতেই ভাটিয়াপাড়া মিলিটারী ঘাটি ঘেরাও করে ৫০/১০০জন পাঞ্জাবী যাই থাকুক সবাইকে জীবিত বা মৃত ধরে এনে এলাকা শত্রুমুক্ত করতে হবে। ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে হাজারো জনতা এ প্রস্তাবে সমর্থন জানালো, এ যেন তাদের সকলেরই মনের চাওয়া! নিজেদের শক্তি সামর্থের একটা ছোটখাট বর্ণনাও দিলেন আব্বা। প্রধান শক্তি হল দেশী অস্ত্রে সজ্জিত কয়েক হাজার সসস্ত্র মানুষ এবং তাঁদের তাদের অদম্য সাহস আর মাত্র দুটো বন্দুক। আমাদের বন্দুকটা দোনলা, উপস্থিত সাধারন মানুষদের ধারনা অনেকটা এরকম যে, ঐ দোনলা বন্দুকটা পৃথিবীর সর্ব শ্রেষ্ট মারণাস্ত্র, ওটা যাঁদের সাথে আছে, জয় তাদের সুনিশ্চিত ! যাই হোক, শক্তি বর্ণনার শেষ পর্যায়ে আব্বা চাইলেন জনতাকে সেই শক্তির প্রদর্শনীর ব্যাবস্থা করে চাঙা করতে। তিনি স্টেজে ডাকলেন তাঁর ইউনিয়ন পরিষদের দফাদারকে, সে আব্বার নিত্য সহচর ও বিস্বস্ত, ছায়ার মত তাঁকে অনুসরণ করে সব সময়, ২৬শে মার্চ থেকে, অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর পরপরই এই দফাদার ভদ্রলোক নিজে থেকেই আব্বার দেহরক্ষিতে পরিনত হয়েছে। সব সময়ই সে বন্দুকটা নিয়ে তাঁর সাথে। আব্বার ইসারায় দফাদার ভাই স্টেজের উপর উঠে বিশেষ কৌশলে দোনলা বন্দুকের দুটো গুলি পরপর এমনভাবে ছুড়লো যেন উপস্থিত জনতার মনে হল ’ব্রাস ফায়ার করা যায় এ বন্দুক দিয়ে’। গুলির শব্দের পরে জনতার যে উল্লাস, তেজ ও বিক্রম সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিলাম, সেকি লিখে প্রকাশ করা যায় ?
পরিকল্পনামত যাত্রা শুরু করলো ৩/৪ হাজার জনতার এক বিশাল মুক্তিযোদ্ধার দল, গন্তব্য ভাটিয়াপাড়া ওয়ারলেস স্টেশন মিলিটারী ক্যাম্প। রাতের কোন একটা সুবিধাজনক সময়ে বিশাল এ যোদ্ধার দল একযোগে ঝাপিয়ে পড়বে হানাদারদের উপর, ওরা কিছু বুঝে উঠার আগেই সব শেষ করে দেবে।। শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করে জনতা এগিয়ে চলছে ফসলের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে। আমিও চলেছি সাথে। কিছুদুর যেতেই বদর ভাই (আমার ফুফাত ভাই) পেছন থেকে আমাকে ধরে ফেললো, বললো তোকে মামী ডাকে। আমি দৌড় দেবার চেষ্টা করতেই সে আমাকে চ্যাংদলা করে ঘাড়ে তুলে সোজা বাড়ীতে এনে আম্মার সামনে হাজির করলো। আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন, দেখি সেখানে আমার দাদী আছেন ! দাদীকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না আমার, বায়না একটাই, ‘সবাই যুদ্ধে যাচ্ছে, আমিও যাব’। আমার ইংলিস প্যান্টের পকেট থেকে কাঠের ছোট্র পিস্তলটা বারে বারে বের করছি, দাদীকে দেখাচ্ছি, আর আমার শক্তির উৎসটা তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করছি (আমাদের পশ্চিম পাড়ার কাঠমিস্ত্রী খগেন দাদু পিস্তলটা সম্প্রতি আমাকে বানিয়ে দিয়েছেন)। আমার আব্দার না করার ক্ষমতা, আমার ক্ষমতাশালিণী দাদীর কোনদিনই ছিলনা, আর আমার মায়েরও জানা ছিল যে দাদীর ইচ্ছাই চুড়ান্ত। দাদী তাঁর গোমস্তাকে ডেকে বললেন, একে নিয়ে যা যুদ্ধ করাতে, ঘাড়ে করে রাখবি সব সময়, মাটিতে ছাড়বি না, আধা মাইল দুরে থাকবি এবং সন্ধ্যার আগেই বাড়ী ফিরিয়ে আনবি। দাদীর প্রশ্রয়ে, মায়ের রক্তচক্ষু অতিক্রম করে এই শিশুযোদ্ধা তার কাঠের পিস্তল নিয়ে ঈমান দাদার ঘাড়ে চড়ে জনযোদ্ধাদের মিছিলে সামিল হল।
আমাদের গ্রাম থেকে ভাটিয়াপাড়া ৭/৮ কিলোমিটার দুর। শুকনা মৌসুমে হাটা আর বর্ষায় নৌকা ছাড়া অন্য কোন যাতায়াত ব্যাবস্থা নেই। হাজারো মানুষের কাফেলা এগিয়ে চলেছে দৃপ্ত পদক্ষেপে, এদের কোন ধারনাই নেই শত্রুর সম্পর্কে বা তাদের মারনাস্ত্রের মানুষ মারার সামর্থ সম্পর্কে। বিশাল এই জনযোদ্ধার কাফেলা একটির পর একটি গ্রাম পার হচ্ছে, আসপাশের গ্রামগুলো থেকে আরো শত শত মানুষ সসস্ত্র অবস্থায় যোগ দিচ্ছে এই দলে, কাফেলা বড় হচ্ছে প্রতি মুহুর্তেই, এতক্ষনে বোধকরি ৫/৭ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। প্রতিটি গ্রামেই কিছুক্ষনের জন্য এ গণমিছিল থামছে, হ্যান্ড মাইকে আব্বা জনসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা/অনুরোধ রাখছেন, কখনও বা সেই গ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তাঁদের একাত্বতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখছেন, আবার এগিয়ে চলছে এই জনযোদ্ধার দল।
গ্রামগুলো যখন পেরুচ্ছে এই বিশাল মিছিলটি, তখন আশপাশের বাড়ীগুলো থেকে মহিলারা মুড়ি, চিড়া, গুড়, পানি, যাঁর বাড়ীতে যা কিছু শুকনো খাবার আছে সব জড় করে পথের পাশে দাড়িয়ে থাকছে, যদি কেউ ক্ষুদার্থ থাকে? সেদিনের একটি ছোট্র ঘটনা আমার শিশু মনকে স্পর্শ করেছিল যা আজো আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি। যোদ্ধাদের এই বিশাল কাফেলা ‘ঘোনাপাড়া’ নামক গ্রামের বাজারে কিছুক্ষনের জন্য থামলো। বৃত্তাকারে প্রায় এক মাইল, শুধু মানুষ আর মানুষ, ঈমান দাদার ঘাড়ে আমি। অসতিপর এক বৃদ্ধা ঐ ভিড়ের মধ্যে লাঠি ভর দিয়ে আমার আব্বাকে খুজছে, তাঁর কাছে যেতে চাইছে। ‘বাঙলা বাহিনীর’ ছেলেরা বৃদ্ধাকে পথ করে দিল, তিনি আমার আব্বাকে তাঁর হাতের লাঠিখানা দিয়ে বললেন, ‘ বাবা আমিতো তোমার সাথে যেতে পারবো না, তুমি আমার লাঠিখানা নাও, অন্তত একজন খানকে এই লাঠি দিয়ে মারা চাই।’ অত্যন্ত আবেগ ও শ্রদ্ধার সাথে আব্বা সেই লাঠিখানা নিলেন এবং তাঁর কৌসুলি অবস্থান থেকে বৃদ্ধাকে ঐ কথাগুলো আবারো বলতে অনুরোধ করে মাইকটি তাঁর মুখের কাছে এগিয়ে দিলেন। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে তাঁর সে নির্দেশ ‘আমার লাঠি দিয়ে পিটিয়ে খান সেনাদের খতম করবা’, যেন বারুদের মত বিস্ফোরিত হল জনতার মধ্যে। ‘বীর বাংগালী অস্ত্র ধর, খান সেনাদের থতম কর’ ধ্বনিতুলে আবার এগিয়ে চললো কাফেলা।
মাঝে আর কোন বাড়ীঘর নেই, আনুমানিক দুই কিলোমিটার লম্বা একটা বিল পেরুলেই ভাটিয়াপাড়া মিলিটারী ক্যাম্প, । সন্ধ্যা প্রায় ৬টা, জনযোদ্ধাদের এই কাফেলা এগুচ্ছে, শুধু ঐ বিলটাই পেরুতে হবে। হঠাৎ গুলির শব্দ, প্রচন্ড শব্দ, বিরামহীন একটানা, শব্দের উৎপত্তিস্থল বোঝাই যাচ্ছে ভাটিয়াপাড়া। পরিস্থিতি অনুধাবনে জনযোদ্ধাদের মিছিল থমকে দাড়ালো। কিছুক্ষনের মধ্যে ঐ দুর থেকেই আমরা দেখতে পেলাম ধোয়ার কুন্ডলী আকাশে, মাঝেমধ্যে আগুনের শিখা, গুলির শব্দ আরো বাড়ছে, কিছুক্ষণ পরপর ভারী গোলার শব্দে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে। ২৫/৩০ মিনিটের মধ্যেই দেখতে পেলাম শত শত নারী, পুরুষ, শিশু দৌড়ে বিল পার হয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। নেতৃবৃন্দের নির্দেশে হাজার হাজার মানুষের কাফেলা বিলের মধ্যে বসে পড়লো। জানা গেল, খান সেনাদের ৫/৭জনের একটি দল বিকেলে টহলে বের হয়েছিল ভাটিয়াপাড়া বাজারে। গ্রামের যুবক ছেলেরা দল বেধে ঝাপিয়ে পড়ে ঐ টহল দলের উপরে, সড়কি ছুড়ে একজন খান সেনার গলা ফুটো করে দেয়। এরপর থেকেই সেনারা দল বেধে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে ঝাঝরা করতে থাকে, যাকে সামনে পায় তাকেই। পুরো বাজারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, গ্রামের মধ্যে ঢুকে নির্বিচারে চালাচ্ছে গুলি। প্রত্যক্ষদর্শিদের বর্ণনায়, শত শত লাশ পড়ে আছে বাজারে ও গ্রামের পথে পথে।
সন্ধ্যা লেগেছে, তবে তখনও কিছু আলো আছে, কাছাকাছি সবই দেখা যায়। খবর এলো ‘মোক্তার সাহেব’ (এ.এল.এ সাহেব) আসছেন। সবার মধ্যেই যেন নতুন প্রানের সঞ্চার হল। মোক্তার সাহেবের সাথে আরো দুজন, তাঁরা বয়সে তরুন, দেখতে শহুরে, পরে জেনেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা তাঁরা (তাঁদের নাম আজ আর মনে নেই)। মোক্তার সাহেব বিলের মধ্যে এসেই আব্বাকে কাছে ডাকলেন, দুজনে কি যেন সলা পরামর্শ করলেন (!), ‘বাংলা বাহিনীর’ ছেলেরা জনতাকে তাঁদের কাছে ঘেসতে দিচ্ছে না। কিছুক্ষন পরে সেই দুই ছাত্রনেতাসহ চারজনে মিলে কথাবার্তা বলে মোক্তার সাহেব মাইক হাতে নিলেন। সবাইকে সেই রাতেরমত বাড়ী ফিরতে অনুরোধ করলেন তিনি। হাজারো জনতা সমস্বরে নেতার এ নির্দেশ অমান্য করে বসলো, তাঁরা সেই রাতেই খান সেনাদের ক্যাম্প আক্রমন করবে,- এই তাদের সংকল্প! নেতা অসহায়ের মত মাইক হাতে দাড়িয়ে। ছাত্র নেতাদের একজন মাইক হাতে নিলেন, সুবক্তা তিনি, সেই রাতে আক্রমন করলে হানাদারদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কতটা এবং পরিস্থিতি কেমন ভয়ংঙ্কর হতে পারে তা বুঝালেন সবাইকে, একে একে বর্ণনা করলেন পাক সেনাদের ব্যবহৃত মারনাস্ত্রগুলোর কর্মক্ষমতা। আমরা হাজার হাজার মানুষ সেদিনই তাঁর মুখে প্রথম শুনলাম টমিগান, ষ্টেনগান, সাব-মেশিন গান, চাইনিজ অটোমেটিক রাইফেল, এ.এল.আর, মেশিন গান, রকেট লান্সার, গ্রেনেড, ডিনামাইট ইত্যাদি সব মারনাস্ত্রের নাম এবং আরো জানলাম এ অস্ত্রগুলোর মানুষ মারার ক্ষমতা সম্পর্কে। উপস্থিত হাজারো জনযোদ্ধার ধারনা ছিল খান সেনা মানেই হাতে ৩০৩ রাইফেল, এদের কাবু করা কঠিন হবে না। কিন্তু ঐ ছাত্র নেতার বর্ণনার পরে জনতা যেন বুঝতে পারলো যে এই হাজার হাজার যোদ্ধাকে পাখির মত মেরে ফেলতে হানাদারদের ১০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না এবং তারা তা করতে দ্বিধাও করবে না।
জনযোদ্ধারা একটু শান্ত হতেই মোক্তার সাহেব আবার মাইক নিলেন, সবাইকে অনুরোধ করলেন সে রাতের মত বাড়ী ফিরতে। এরপর তিনি বললেন একেবারে নতুন সব কথা! আশার কথা! বললেন, ‘কিছুক্ষনের মধ্যেই আমি ইন্ডিয়া রওনা হচ্ছি, আপনাদের জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনতে। দেশের মধ্যেই আপনারা অস্ত্র চালনার ট্রেনিং করবেন, প্রয়োজনে আপনাদের ইন্ডিয়া পাঠাবো ট্রেনিং নিতে। এরপর শুরু করবেন গেরিলাযুদ্ধ। গেরিলাযুদ্ধ! সেটা আবার কি? জনতার অনুচ্চারিত জিজ্ঞাসা ? গেরিলাযুদ্ধের সাদামাটা একটা ব্যাখ্যা দিলেন মোক্তার সাহেব, বললেন, ‘হানাদারদের চলার পথে পথে ওৎ পেতে থেকে, তাদের খতম করে, দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ,- এই হল গেরিলাযুদ্ধ।’
‘গেরিলাযুদ্ধ’, ‘স্টেনগান’, ‘গ্রেনেড’, ‘ডিনামাইট’,- কথাগুলো সেই প্রথম শোনা। এই শব্দগুলো যেন কোন এক যাদুর ছোয়ায় উপস্থিত হাজারো মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করলো। মুহুর্তেই যেন সবাই বুঝে ফেললো এভাবে হবে না, যুদ্ধের কৌশল বদলাতে হবে। কিছুটা অপেক্ষা, অস্ত্রহাতে ট্রেনিং, তারপরেই মরণ আঘাত। আপাততুষ্ট জনতা ততক্ষনে বাড়ী ফিরতে শুরু করেছে। মোক্তার সাহেব আমার আব্বাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষন কাঁদলেন, তারপর বললেন, ‘টিপু মিয়া, আমি যাই, যদি বেঁচে থাকি আবার দেখা হবে। হাজার হাজার অসহায় এবং নিরস্ত্র যোদ্ধাদের আপনার হেফাজতে রেখে গেলাম, এঁদের দেখে রাখবেন’।


লেখাটা ভালো লাগলো। সাজ্জাদ ভাই অনেক ধন্যবাদ। আশা করি নিয়মিত লিখবেন মুক্তিযুদ্ধের আপনার অভিজ্ঞতাগুলো।
সুন্দর, স্বচ্ছ, সাবলীল এবং বাস্তবভিত্তিক লেখা। এ লেখা প্রবলভাবে আমাকে টেনে নিয়েছে সেই সময়ে - মনে হচ্ছে চোখের সামনে ঘটছে সব কিছু - আবার - এবং বিজয়ে সমাপ্ত হবে আবার ! বছর দশেক আগেও কষ্ট পেতাম ভেবে যে আমাদের প্রজন্ম চলে গেলে এই জাতি আমাদের এত বিশাল বিপুল মুক্তিযুদ্ধটা হয়ত ভুলেই যাবে। কিন্তু এখন এ ধরণের লেখা পড়ে, একাত্তরের ওপর নুতন প্রূন্মের বিভিন্ন প্রচেষ্টা দেখে আমি নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত - আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম চিরটাকাল বারবার ফিরে যাবে একাত্তরে। কারণ, প্রতিটি জাতির দরকার হয় গর্ব করার মত আত্মপরিচয়ের শক্ত কোনো ভিত্তির ওপরে দাঁড়াবার। আমাদের একাত্তরের মতো অমন ভিত্তি ক’টা জাতির আছে?
একাত্তরটা আবেগের বেশী নাকি হিসেবের আমি জানি না - তবে দুটোই চলুক পাশাপাশি হাত ধরে ধরে - এরকম লেখার মাধ্যমে।
মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে একটি অনবদ্য চিত্র লেখাটিতে রয়েছে। স্মৃতিচারণটি মুক্তিযুদ্ধের গতানুগতিক প্রোটোটাইপ থেকে আলাদা। ব্যক্তির বীরত্বের গল্প নয়, সামষ্টিক বোধের গল্প। মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত সাধারন চিত্র অথচ কত অসাধারণ মানবিক বোধের ছবি আঁকা হয়েছে- দেশপ্রেম, সংঘবদ্ধতা, ভাতৃত্ববোধ এবং সর্বোপরি যুদ্ধ সম্পর্কে বিবিধ অজ্ঞতা, নেতার নেতৃত্ব মেনে নেয়া…সব মিলিয়ে কি সারল্য লেখাটিতে! কেউ-ই হিরো নয়, আবার সবাই হিরো! এই আমাদের দেশের মানুষ, এরাই আমাদের দেশঅন্তপ্রাণ জনতা! লেখাটিতে কোনো অলংকারের ঝনঝন নেই, আমিত্বের বড়াই নেই, বীরত্বের চকমকির চমকানো নেই, নিতান্তই আমাদের গায়েঁর মাটিমাখা মানুষের গল্প। স্মৃতিচারণটি একটি কোয়ালিটিসম্পন্ন স্বল্পদৈঘ্য ছবি/নাটক তৈরির জন্য উপযুক্ত কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হবার যোগ্যতা রাখে। ধন্যবাদ সাজ্জাদ আলী!
পড়ে ভালো লেগেছে। একটানা পড়ে যাওয়ার মত ব্যাপার আছে। অনেকটা এইরকম একটা স্মৃতি আমার আছে । তেজগাঁও এ থাকতাম। ঐখানে রুহুল আমিন ভুইয়া নাম একজন শ্রমিক নেতার নেতৃত্বে হাজার খানেক লোক ২৫ মার্চ রাত্রে ওনাদের মত দেশীয় অস্রসহ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কারণ বিকাল থেকে শোনা যাচ্ছিল আজকে কিছু একটা হবে । মধ্য রাত্রে যখন রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্প এ আক্রমণ হয় গুলির আওয়াজ শুনে বুঝতে পারেন যে লাঠি সঠা দিয়ে এদের সঙ্গে কিছু করা যাবেনা। তাই সিদ্ধান্ত হলো সবাই চলে যাবে। তার পর তো জানেন ঢাকায় কি হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ তো কল্পনা করতে পারে নাই, যে যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব করা হয় তা বাঙালিদের উপর চালাবে ।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যে সামরিক যুদ্ধ ছিল না, ছিল জনযুদ্ধ- এই লেখাটি তারই আরো একটা দলিল।
লেখাটা খুবই ভাল লাগলো। এমন আরও লিখলে নুতন প্রজন্ম ১৯৭১ এর বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে পারবে। ধন্যবাদ লেখক মহোদয়কে।
এটাতো লেখা নয়, সত্য ঘটনার বর্ণনা মাত্র। এমন সত্য তো সবারই কম বেশী জানা আছে। এ সত্যগুলো সবাই বলুন প্লিজ ! লেখককে ধন্যবাদ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখাগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় শুধু ‘আমি’তে ভরা। প্রানবন্ত এই লেখাটিতে সেই প্রবনতা নেই। ভাল লাগলো।
Dadu likha pore onek valo laglo.Sisu muktijoddake
salam o valobasha.Oidin jara nihioto hoyaesen sobayke , sokol sohidke sosordo salam roilo
গেরিলাযুদ্ধ! সেটা আবার কি? জনতার অনুচ্চারিত জিজ্ঞাসা ? গেরিলাযুদ্ধের সাদামাটা একটা ব্যাখ্যা দিলেন মোক্তার সাহেব, বললেন, ‘হানাদারদের চলার পথে পথে ওৎ পেতে থেকে, তাদের খতম করে, দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ,- এই হল গেরিলাযুদ্ধ।’
জনতার অবস্থান থেকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ এমনটাই ছিল। মুজিবের নামে ও জয়বাংলা শ্লোগানের শক্তিতেই স্বাধীন করেছিলাম দেশটাকে। এমন রচনা আরো চাই !
I am proud of our moktizoddah & moktizodho
g&cG
কেউ কেউ বলতে চান এবং নতুন প্রজন্মকে বোঝাতেও চান, সামরিক বাহিনীর লোকেরাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন এবং পরিচালনা করেছে। এটা যে কতটা অসত্য, এ বর্ণনার মধ্যে সেটা ফুটে উঠেছে। এমন অভিজ্ঞতাতো আরো শত মানুষেরও আছে, সবাই আমাদের বলছেন না কেন আপনার জানা কথাগুলো ?
A hair raising write up to bring in our glorious history in a cellulod of words. Many thanks.
সত্যিই তো ডিনামাইট, ষ্টেনগান, গেরিলাযুদ্ধ, রকেট ল্যান্সার, এ শব্দগুলো আমরা ৭১-এই শিখেছি। আজও যে সব অপশক্তি দেশের মধ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের জানা প্রয়োজন ওসব আমরা ভুলিনি। প্রয়োজনে আবার দেখা হবে ময়দানে !