উন্মাদ সিরিজ
উন্মাদ: ১
এই শয্যা পাথরের, প্লাবিত জ্যোৎস্নায় উন্মাদের
কিন্তু তার কোনো সাক্ষ্য নেই,
যেমন রাখে না চিহ্ন ধু-ধু বালুরাশি, কিংবা জল দিগন্তের
পাহাড়ের সুউচ্চ-চূড়ার মতো কেবলি কান্না জেগে ওঠে ।
কে যায়, কোথায়, কোন উন্মত্ত নগরে
দেখি, অরণ্য গভীরে পাতা ঝরে ।
মধ্যরাতে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ভাবি– কে বেশি দ্রুতগামী
কচ্ছপের পিঠে সময় না কী প্রফেটের অশ্বারোহী বাহিনী ?
মক্কা থেকে দামাষ্কার বালুময় বাণিজ্যিক পথে, ক্যারাভ্যানে একদিন
আমিও ছিলাম পুতুলপূজার কোরেইশী কিংবা ঈশ্বরবিহীন বেদুঈন,
ছিলাম বাংলার-জলাঙ্গীর-ঢেউয়ে-ভেজা বেহুলা কিংবা
প্রজ্জ্বলিত চিতাকাষ্ঠে শিশুকন্যা– কোমলঅস্থির সতী ।
এখনও পৃথিবীর পথে ফুল ফোটে, রেণু ঝরে
তার সৌন্দর্য আমাকে করে জ্বরতপ্ত, করে বিষণ্ন ।
আজ কৃষ্ণচূড়ার বিক্ষোভে জেগেছে সময়,
আর তার অন্তহীন প্রলাপ ।
উন্মাদ হাওয়ায় পড়ে আছে শয্যা- পাথরের ;
কিন্তু তার কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই ।
নিউইয়র্ক/ মে ০২, ২০১০
উন্মাদ: ২
আমি নই রাজর্ষি–
কারণ, দিব্যতার নামে আমি করি নি সন্ত্রাস ।
ধর্মের বাণী আর তার অতিদীর্ঘ তীর
বিদ্ধ করে রক্তাপ্লুত আমার দু’চোখ ।
ঈশ্বর আমাকে করে নি কৃষ্ণাবতার কিংবা প্রফেট মোসেস । তাই,
যুদ্ধ নয়, উম্মাহ্ নয়, বরং দিনশেষে দিনের নিভৃতিতে জেগেছে প্রত্যয়-
গাঙুড়ের জলে বেহুলার ভেলা আমি, বলেশ্বরের ঢেউ ;
কীর্তনখোলার জলে আমি এক নামহীন কীর্তনিয়া-
গৌরাঙ্গে লালন প্রেম, তাই শরতের মেঘ হয়ে ভাসি
পৃথিবীর পথে দূরতর ।
তবু, কেউ কী আমাকে বেঁধেছে, যেভাবে মৃত্যু বাঁধে জন্মকে,
উপাসনায় আসীন মানুষ শুধু ইঁদুরের মতো লেজ নাড়ে ।
রক্তাপ্লুত, তীরবিদ্ধ আমি
তবু পৌঁছে গেছি দশদিক শূন্যকরা সেইখানে–
যেখানে বাতাস সুপ্রচুর, আছে বৃষ্টির তির্যক গতি,
আর যেখানে শুয়ে আছে উন্মাদ, যেন চন্দ্রাহত পাথর ।
নিউইয়র্ক/ মে ৬, ২০১০
উন্মাদ: ৩
অশেষ ক্রন্দন শেষে জেগে ওঠে ভোর, কিন্তু
কেউ কী কারও জন্য কাঁদে ?
শ্রমযাতাকলে বিদ্ধ যে মানুষ– দেখেছি
সন্ধ্যার অভিমুখে তাকে বয়ে নিয়ে যায় সময় ।
আকাঙ্খায় বাষ্পীভূত হয়েছে জল, আরও কিছু জল
বেদনার কাছাকাছি এসে হয়েছে ধমনীপ্রবাহ– রংধনুময় উজ্জ্বল ।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধশেষে তীরবিদ্ধ হয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ ;
ব্যর্থ হয়েছে ধর্মাবতারদের সাম্য আর মৈত্রী–তাই, বোধকরি
সময়ের বাঁকে যিনি তথাগত, তিনি-ই-তো নবী মুহাম্মদ ;
মানুষের পাপবিদ্ধ যিনি শ্রীকৃষ্ণ, তিনি-ই-তো ক্রুশবিদ্ধ যেসাস ।
উন্মাদের মৃত্যু হলে, তার পিছে চলে গেছে সময়
এখন চারিদিকে জল– সাঁকোচ্যুত উদ্ভ্রান্তিময় ।
যুদ্ধরত, মৈত্রীহীন কোথায় চলেছে মানুষ ?
দিনরাত্রিহীন এইতো অনন্ত সময় ।
নিউইয়র্ক / আগস্ট ০৩, ২০১০
উন্মাদ: ৪
গ্রহ নক্ষত্রের কোনো সায় নেই আমাদের এই সম্পর্কে,
আর আমার ধ্বংস অনিবার্য এবং অত্যাসন্ন জেনেও
নিতান্তই ভীরু ধার্মিকের মতো
তোমার দিকে আমি হাত বাড়িয়েছি ।
ডিমের কুসুম, পচা মাংস, আর জঞ্জালের ভিতরে ব্যস্ত ইঁদুরের মতো
চাঁদ, বাতাসের প্ররোচনায়, জলের ওপর এসে খেলা করে, আর
উজ্জীবিত করে
দূর অববাহিকায় ম্লান পাথরের স্মৃতি–
মা ও বাবা- এই অতি প্রিয় দুই মুখ
অগ্নির প্ররোচনায়
গার্হস্থের লাবণ্য ছেড়ে চলে গেছে শ্মশান বৈরাগ্যে
আমাকে ছেড়ে একদিন
তুমিও চলে যাবে কোনো এক বিপ্রতীপ দিকে –
শিশ্নের অধিকতর ক্ষিপ্রতায়, দ্রুততর জীবনের বেগে ।
শুধু থেকে যাবে সময়,
যেভাবে বৃদ্ধ মনিবের পাশে শুয়ে থাকে মায়াবি কুকুর
আর ভাঙ্গা টিনের পাতে জেগে থাকবে অদৃশ্যমান শব্দাবলী–
একরৈখিকভাবে ধাবমান, সময় আর উন্মাদ কবি ।
নিউইয়র্ক/ আগস্ট ১২, ২০১০


”সিরিজ” কাঠামোতে সম্পন্ন আরেকজন কবিকে খুলতে দেখে অত্যন্ত ভাল লাগলো!কাঠামো ছাড়াও ভাব ও রসের খেলায়ও গাছপাকা!পঞ্চাশ যেখানে শেষ করেছিল, আশি যেখানে মৌলিক মোড় ঘুরায়েছিল, তাপসের উপস্থাপনা সে-পরম্পরাগুলোকেই প্রশস্ত করলো!’উন্মদ’ এয়ারব্রাশের প্রচ্ছন্নতায় সুস্থতার অনিবার্য পথ্য-নির্দেশ; কিছুটা ভারি; কিন্তু তা নান্দনিকতার সাথে স্বচ্ছতার ভারসাম্য মিটিয়েই।আমন্ত্রণের গরম ভাপটাও চোখ ভরে দেখবার মত!ধন্যবাদ, তাপসকে!
প্রিয় তাপস গায়েন,
চমৎকার লেগেছে কবিতাটি। যেন নিঃস্বাসের অস্থিরতায় পড়ে গেলাম মাকড়সার জালে বিদ্ধ ফড়িং হয়ে।
কবি, বেঁচে থাকুন দীর্ঘদিন।
“ব্যর্থ হয়েছে ধর্মাবতারদের সাম্য আর মৈত্রী–তাই, বোধকরি
সময়ের বাঁকে যিনি তথাগত, তিনি-ই-তো নবী মুহাম্মদ ;
মানুষের পাপবিদ্ধ যিনি শ্রীকৃষ্ণ, তিনি-ই-তো ক্রুশবিদ্ধ যেসাস ।”
কবিতা সাম্য ও মৈত্রীবাদী হতে পারে, কিন্তু পৃথিবী কখনোই সাম্য ও মৈত্রীর ধার ধারেনি। অসাম্য ও হানাহানিই তার গতি। হতাশার এক প্রগাঢ় অন্ধকার পৃথিবীকে সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে। বেদনার ব্যাপার হলো মানুষকে এই হতাশার মধ্যেই জন্মগ্রহণ এবং মৃত্যুবরণ করতে হয়। মাঝখানে কবিতা শোনায় কিছু ব্যর্থ আশার বাণী। মানুষের এগজিসটেনশিয়াল ক্রাইসিসকে তাপস গায়েন সুন্দরভাবে তার কবিতায় ধারণ করেছেন। তাকে ধন্যবাদ অর্থপূর্ণ উন্মাদ-প্রলাপের জন্য।
চয়ন,
আপনার সকল লেখা এবং মন্তব্য আমি মনোযোগ সহকারে পড়ি, আর বাক্যের অন্তরালে আপনার লেখক সত্তাকে বুঝতে আগ্রহী হয়ে উঠি । কোনো একদিন দেখা হলে এ-নিয়ে কথা বলা যাবে । অনেক শুভেচ্ছাসহ, তাপস
প্রিয় হাসান শাহরিয়ার,
আপনার ভালোবাসায় আমি বিদ্ধ । আপনি আমার আনন্দিত শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন । তাপস গায়েন ।
প্রিয় বিনয় বর্মন,
আপনার মন্তব্যের সাথে আমি একমত । তবু, জীবনানন্দের ‘তবু’ থেকে যায় । এবং সেইসূত্রে আমেরিকান কবি জয় হার্জো’র বরাত দিয়ে বলতে ইচ্ছা হয়, ‘এই ভূমি হোল একটি কবিতা, উৎসারিত গৈরিক মাটি এবং তপ্ত বালু থেকে, যা আমি কখনো লিখতে পারতাম না, যদি না এই কাগজ হয়ে উঠত আকাশের পুরাণ এবং যদি না এই কালি হয়ে উঠত দূর দিগন্তে ধাবমান বন্য ঘোড়ার ভগ্ন সারি । তদুপরি এ-যাবৎ যা লেখা হয়েছে তা দিয়ে এই পৃথিবী, এই বাতাস, এবং এই আকাশের কী বা এসে যায় ?’
অনেক শুভেচ্ছাসহ, তাপস গায়েন
কবিতাগুলো ভালো লেগেছে । এ জন্য কবিকে অভিনন্দন ।
পড়তে পড়তে, থেমে একটুখানি স্থিতিশীলতায়, গতিশীলতার ছেদ ঘটাবো, পারিনি।
এই গতিময়তা ভাল না মন্দ জানি না, তবে মন্তব্য করার ভাষাটা গতির স্রোতে হারিয়ে গেছে। তা যাক, তবুও ভাল। অন্যরকম বোধের বিরতিহীন যাত্রা। আসলে আমরা খুব বেশি থেমে থাকা, বলেই হয়তো বেশি ভাল লেগেছে।
কবি-কে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আমৃত্যুকাল একটি প্রশ্ন
আমার অস্থি-মজ্জা-রক্ত-মাংস-কোষ
করবে ক্ষয় সময়ের কাছে
নাকি প্রিয় সঙ্গিনীর কাছে
তুলতে পারার দু:সাহস
হবে না কখনো ;
কে চায় আত্মহনন বা আত্মাবমানন ?
- উপরের লেখাটি পাঠ প্রতিক্রিয়া নয় তবে তাপসের অমন শব্দ বুনন আবেগের প্রভাব হয়তোবা। শব্দের শিল্পী যিনি ভাল, তার কি আলোচনা হয় ? তিনি তো আরো সৃষ্টির উৎসাহ যোগান।
-ধন্যবাদ অনেক !
প্রিয় বনি আমিন,
সময় নিয়ে আপনার অনুভব, বিশেষ করে, আপনার কবিতাটি আমার মনকে নাড়া দিয়েছে । আপনার কবিতার জন্য অভিনন্দন এবং মতামতের জন্য ধন্যবাদ !
প্রিয় মতিন বৈরাগী এবং প্রিয় স্বপন মাঝি,
‘উন্মাদ’ সিরিজের এই কবিতাগুলো আপনাদের ভালো লেগেছে জেনে আমি উৎসাহিত । আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ ।
”শুধু থেকে যাবে সময়,
যেভাবে বৃদ্ধ মনিবের পাশে শুয়ে থাকে মায়াবি কুকুর
আর ভাঙ্গা টিনের পাতে জেগে থাকবে অদৃশ্যমান শব্দাবলী–”
খুব ভালো লেগেছে।
প্রতিটি কবিতাই শব্দ ও ধ্বনি মাধুর্য়ে একটি ঐন্দ্রজালিক মায়া তৈরি করে পাঠককে একটি স্বপ্নের দেশে নিয়ে যায়। কোলাহলপূর্ণ পৃথিবী ছেড়ে বহুদূর।
কবিকে অনেক শুভেচ্ছা।