হ্রস্ব ও দীর্ঘ কবিতা গুচ্ছ

ওমর শামস | ২৪ নভেম্বর ২০১২ ৯:০৫ অপরাহ্ন

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
(জ্যোতির্ময় দত্ত-র অনুসরণে )

sunil.jpg
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মাতাল দীপক ফেলে বাংলোয় ছুটে গিয়ে দিয়েছেন খিল;
পুলিশে ও আদালতে হাংরিকে দেখে,- পালিয়েছে কবিচক্রঃ নুভোগার্ড, বিপ্লবী, সাহসী মিছিল।
মীনাক্ষী দত্ত, সে পরিত্যাক্তা - কে তাকে দপ্তরে নেবে? কাউকে ফ্যালেনি যে কথাকার মহারাজ!
কার্পণ্য! কেন ভগবান? কেন এই ক্লিষ্ট দেশে দাওনি এন্তার আরও সুনীলের দিল্‌।

কোরবানির হাড়

ছিন্নমূল বলে : “বল্‌তি পারি নে হাড় কুন্‌খানে যায়?
খুলনার আসগর হাড় কিনে বস্তায়, পৃথিবী পাঠায়।“
গফুরের গরু সে কি জানে, মেরুদন্ড-হাড়-শিং এমন কি খুর –
বাংলার কৃশ শিশু, আকলিমা-নূরবানু-ফ্যালানিরে, মাস-লোহূ সশরীরে পুষ্টি যোগায় ।

পদাবলী - ১

star.jpg
ফলদা স্বাতীর পূণ্যবারি সে চমকায় আজো বিদ্যুদ্দামে,
মৃগশিরা-মঘা-শতভিষা-মূলা-অংগিরা-ক্রতু-শ্রবনাও১ যামে -
অবিনশ্বর জ্যাোতি ও বিভায় অসীমায় আজো স্বতচলমান ;
তোমারও হৃদয় , অন্ধ বিবর এড়িয়ে বিরানে বৃষ্টি নামে।

১ স্বাতী, মৃগশিরা, মঘা, শতভিষা, মূলা, অংগিরা, ক্রতু, শ্রবনা – এগুলো নক্ষত্রের নাম।

পদাবলী - ২

ফলদা স্বাতী সে চমকে পূণ্যবারির ঝলকে
বিদ্যুদ্দামে ;
মৃগশিরা – ক্রতু – মূলা অংগিরা–মঘা-শ্রবনা
প্রোজ্জ্বল যামে -

- অবিনশ্বর জ্যাোতি ও বিভায় অসীমায় আজো স্বতচলমান -

তোমারও হৃদয় অন্ধ এড়িয়ে বিবর ধন্দ
বৃষ্টিতে নামে,
বৃ ষ্টি তে না মে ।

জালালুদ্দীন রুমীর প্রতি

rumi.jpg
আমিও তো আপনারই মতো উন্মাদ
শব্দ ও স্বপ্নের ক’রে যাই যুগল যিকির,
কিন্তু কেন আসে নাই আজো – মৌলানা রুমী –
আমার খাবের মধ্যে ফেরেস্তা নিশির !

শুনবে রুবাই ব’লে, কোন পাখি নামে নাই ডালে,
মেঘের স্তোত্র পাঠে, চৈত্রের চৌচিরে
ঝরে নি একটি বিন্দু সুরেলা বৃষ্টির ;
কাঠবিড়ালিও সেও দেওদার নেমে
নিলো না আমার হাতে প্রিয় আখরোট,
জ্বলন্ত তরু ধরিত্রীরঃ
তবে,
কিসের সাধনা করি, জালালুদ্দীন,
কবে পাবো, কবে হবো আব-খাব আদ্যপান্ত
কল্পনা প্রতিভার শায়েরির পীর ?

সোনালি কাবিন

মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে দেখে নিলো শানে-নযুল –
অবিকল চাঁদ, নিচে নদীর দুকূল ।
কালে,- কাবিন-নামায় আরো কতো লেখা হলোঃ দুর্দিন, সংগ্রাম, উৎসব –
আনন্দ উচ্ছলঃ শুধে-ভুলে তৈরি হলো মূর্তির মূল ।

আস্তিত্বিক

(চৈতালি চট্টোপাধ্যায়ের অনুসরণে)

astitik.jpg
ভালবাসিস্‌ নি!
তবে কেন আস্তিত্বিক?
প্রশ্নে বহ্নিপীড়া – বিহ্বল, ম্রিয়, প্রিয় দৃক;
বিন্যস্ত শরীরে ন্যস্ত সুখের প্রতীক।

কার ভাগ্যে তোর হাত, কার জন্য স্তন্য,
বাহূলতা কারো জন্য, কুন্তলীন সেও কেউ পাবে –
কারুর কপালে কন্ঠা, ঊরুদ্বয় – উষ্ণ লাবণ্য।

নখের পালিশও কারো ভাগ্যে, কারু বা কটাক্ষ,
শৈত্য যা নির্মম, সেও তো কাউকে দিবি –
প্রকৃতি দিব্যদাতা, মহাকাল লিখে রাখে সাক্ষ্য।

হায়! পৃথিবী ঘূর্ণায়মান, ক্ষীণমধ্যে ঝ’রে পড়ে বালি –
রক্তেও ঘড়ি সমাসীন, পেশী-মেদ বিশ্লেষে রসায়ন খালি।

ক্রমশ কেশের রং ফিকে, ত্বক ক্রমে কুঞ্চিত –
মদিরার ঝাঁজ ক’মে আসে, চাহনিও শান্ত সমাহিত,
লোপমান উদ্বেল মধু, সৌরভ যেটুকু সঞ্চিত।

তবে কেন আস্তিত্বিক?
উর্বশী, সে নাকি মরে না!
সেই বীজ দিয়ে কেন, ভগবান, মানুষী গড়ে না?


Fellini on Fellini

felini.jpg

আমি মিথ্যুক কিন্তু সৎ।
এই যে কাহিনী বানাই সেলুলয়েডে – বিজ্ঞরা বলেন শিল্প,
সে কি রিয়্যালিটি!
বাস্তব সে নয়, বাস্তব একটাই।
বলুক শিল্প, তা সে এই দু-হাতেই তৈরি
যেমন কবির শ্লোক, চিত্রীর প্রতিকৃতি, ভাস্করের মূর্তি।
তবে আমি জীবনের শাঁস তুলে আনি
অন্ধকারের তালের মধ্যে থেকে –
তোমরা যা জানো আবার জানো না।
আমি শুধু চামুচের মতো
শাক সরিয়ে মাছের চোখ বার করি।

আমি ফেলিনি, রোমক
এবং রোমের ইতিহাস ও জীবন থেকেই
নিংড়ে আনি চমক।


ফ্লোরেন্স ছেড়ে যখন রোমে পৌঁছলাম
তখন আমি বড্ডো ফ্যাকাশে, ঘর্মাক্ত কিন্তু প্রণয়োৎসুক –
আমার জামা সব সময়ই কোঁচকানো
আর চুল লম্বা।
ভাড়াটে বাসায় থাকি
আর সব সময়ই প্রস্থান এক বাসা থেকে অন্য বাসায়,
কেননা আমি হয় ভাড়া দিতে অক্ষম
নয় বাড়ীওয়ালা মহিলার সঙ্গে প্রণয়জনিত সংকট।

আমার অজ্ঞতা, আলসেমি, কৌতূহল , জিজ্ঞাসা, সত্যিকারের বলিদানের অপারগতা , বিশৃঙ্খলা , ফশ করে দেশলাইয়ের মতো জ্বলে-ওঠা আবার ভাঙা পাটাতনের মতো সমুদ্রে ডুবে যাওয়া – এ সব জেনে-শুনে মনে হলো, সেলুলইয়েডেই আমার জন্য শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রেডিও, নাটক, সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখতে-লিখতে, কার্টুন আঁকতে আঁকতে একদিন দেখি আমিই ডিরেক্টর।


আমি একা থাকতে ভালোবাসি
নিজের সঙ্গে চিন্তালীন।
ভীড়ের মধ্যে আমি একলা হতে সক্ষম ;
আবার যখন আমাকে ঠ্যালা দাও,
পাথর ছুঁড়ে মারো,
বুনো জন্তুকে পোষ মানাতে বলো
তখন আমি জ্বলে উঠি , উদ্দীপিত হই।

সিনেমা কিন্তু আমি কদাচ দেখি,
আর একটু দেখেই বেরিয়ে আসি –
রেডিও শুনি না, না দেখি টেলিভিশন,
ভীড় আমার ভাল্লাগে না।
বাগীশ নই – রাজনীতিবিদ, বক্তা, দার্শনিক, বিশ্লেষক
এ সব আমি আদৌ নই।
আমি শুধু গল্প বলি –
আর আমাকে আমি নিজেই আবিষ্কার করেছিঃ
শৈশব, সাধ, সংকল্প, স্বপ্ন, হতাশা, স্মৃতি,
ভালোবাসার খরজ থেকে নিখাদ অবধি আসহকলা শ্রুতি,
বিশ্রম্ভান্দোলিত গমক; আর মৃত্যু –
রেমব্রা-র প্রতিকৃতির পিছনের কালচে-খয়েরির মতো গভীর –
এ সব আমারই ।

আহ! বিয়া-আপ্পিয়া – গলি-রাস্তা-রাজপথঃ লা-স্ট্রাদার ওপরে গেলসোমিনা,

গেলসোমিনাঃ আমি ম’রে গেলে তুমি কষ্ট পাবে?
যাম্পানোঃ কেন, মরার চিন্তা-ভাবনা করছিস নাকি?
গেলসোমিনাঃ এক সময়ে আমি সত্যি মরতে চেয়েছিলাম। যাম্পানো, আমাকে কি একটুও ভালো
লাগে তোমার?
যাম্পানোঃ চুপ কর, ঘুমো – আমি এখন ক্লান্ত।

হে মানুষ, তুমি কি রাস্তা খোঁজার জন্যই জন্মেছিলে? যে রাস্তা জন্মায়, মরে, হারিয়ে যায়,
শুকনো ধুলোর মধ্যে শুধু সনাতন একটু ঘ্রাণ রেখে দিয়ে!

কিন্তু পথ না পাই, আমি গতি পছন্দ করি,
আর তার জন্য সিনেমা বানাই;
চতুস্পার্শে সব্বাইকে ঘোরাই আর আমিও ঘুরি।
বাস্তবতা চুলোয় যাক,
আমাকে ঘূর্ণিঝড়ের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে।
কিন্তু আমি টুরিস্টের মতো ঘুরি না
বাউন্ডেলের মতো ঘুরি –
সব কিছুর প্রতি কুতূহলী ,
সর্বত্র অনুগামী, আর এত দুঃসাহসী যে
কানুন আমাকে হূঙ্কার দিতে পারেঃ “বেরিয়ে যাও”।

কিন্তু আমি বেরোই না –

মুকুট কিংবা পুরস্কারও আমাকে বিক্ষিপ্ত করতে অক্ষম।


জানো তো, সফলতা আর গর্ব কুষ্ঠরোগীর মতো –
মানুষকে কাবু করে, কুরে খায়, অপঘাত ঘটায়।
যখন সিনেমা দেখি – যা কদাচ – শুধু কাহিনীর মর্ম টুকু দেখি, কোন টেকনোলজি নয়।
পরিবেশ-প্রতিবেশ আমাকে আকর্ষণ করেছে
যখন ছোটবেলায় সিনেমা গিয়েছিঃ
আমি ভালবাসতাম সরগরম হৈ চৈ , গরম চিনেবাদাম, চকিতে জ্বলে ওঠা এক্সিট,
দর্শকের আসা-যাওয়া, শিশুর মুতের ঘ্রাণ, তরুণীর কল-কল –
আমি জীবন ভালোবাসি।

ভালোবাসি জীবনের ঢল ও গতি – মানুষ মানুষে , গোত্র গোত্রে , গান গানে এবং সিনেমায় আসা-যাওয়ায়। সব সীমান্ত , চেকপোস্ট , কারেন্সি , পাসপোর্ট , গুলাগ , দুর্গ , প্রাচীর , ম্যাজিনো লাইন তাবৎ অবান্তর। নিশ্চিত, নির্ধারিত আদর্শবাদ তাও আমার অপছন্দ । আমি শুধু জানতে চাই, আমি এখানে কেন? জীবন কি? এবং উৎসবের জন্য অপেক্ষায়। সন্ধ্যা । ডুবলো সূর্য আর ঝলসে উঠছে আলো রোমের রাস্তায়, পিয়াৎসায় – পসরা , দোকান আর দালানের জৌলুশে – জ্বলন্ত-চলন্ত-জীবন্ত জীবন ।

আমি ফেলিনি, আমি পৃথিবীতে বাঁচার জন্য এসেছিলাম ।
এখন সন্ধ্যা, সামনে পিয়াৎসা নাভোনা –
আর চার স্রোতস্বিনীর ফোয়ারা ফিনকি দিয়ে উঠেছেঃ
একটা তামার পয়সা ছুঁড়ে দিলাম – ঐখানে ব’সে থাকো হে মৃত্যু নির্বেদ ,
কেননা আমার চোখে এখন নতুন বায়স্কোপের ফ্রেম ।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (১) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shakil ahmed — জানুয়ারি ৩, ২০১৩ @ ৬:৫৮ অপরাহ্ন

      অনেক ভাল লাগল

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com