নিখোঁজ

গাজী তানজিয়া | ২০ নভেম্বর ২০১২ ১০:৩১ অপরাহ্ন

চারপাশে ছায় ছায়া অন্ধকার। স্পষ্ট করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সে শুয়ে আছে চিৎ হয়ে, মাথার ওপর ধূসর প্রাণহীন আচ্ছাদন, ঠিক আকাশ নয়। এটা কি স্বপ্ন, না কি সত্যি? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। শরীরটা কেমন হালকা আর বোধহীন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন শূন্যে ভাসমান। শূন্যে ভাসমান শরীরকে ঠিক নিজের ইচ্ছেমতো নাড়ানো চাড়ানো যায় না। তারপরও বেশ কসরত করে সে সেই শরীরটাকে ধীরে ধীরে টেনে তোলে। বসবার পর পা দুটো টান টান করে মেলে দিয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখল, কোথাও কোনো পথ নেই। চারদিকে পানি আর পানি। সে পানি পরিষ্কার নয় আবার ঘোলাও নয়। সে হাত বাড়িয়ে সেই পানি ছোঁয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু অদ¢ুত পানি! মেঘের মতো, ছোঁয়া যায় না। এরকম একটা জায়গায় সে কীভাবে এলো? কিছুই মনে করতে পারছে না। স্মৃতি কেবলই ধাক্কা খাচ্ছে। তার শরীরটা সামান্য দুলছে এটা বুঝতে পারছে সে। আশে পাশে মনে হচ্ছে আরো অনেক মানুষ তারই মতো। তারা কেউ কোনো কথা বলছে না। কিন্তু সে কাউকে দেখতে না পেলেও তাদের কথা না শুনলেও তাদের অস্তিত্ব অনুভব করছে। তারা সবাই অধীর আগ্রহে কিসের যেন প্রতীক্ষায় সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। সেখান থেকেই একটা সুড়ঙ্গ মতো পথ নীচ থেকে ওপরের দিকে উঠে গেছে। সামান্য আলো ভেসে আসছে সেদিক থেকে। সেই অস্পষ্ট আলোর রেখার দিকে তাকিয়ে আছে সেও। এভাবে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে বোঝা গেল না। হঠাৎ দেখা গেল একজন দূত বড় একটা খাতা হাতে এসে দাঁড়িয়েছেন ওই টানেলের মাথায়। তাঁকে বেশ ব্যাস্ত মনে হচ্ছে। দ্রুতহাতে কিছুক্ষণ খাতার পাতাগুলো উল্টে পাল্টে দেখলেন। তারপর একের পর এক করে নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন। তাঁর ডাক শুনে প্রতীক্ষারতরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো একজন একজন করে এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকে।
এক সময় ডাক এলো, মেহফুজ আলম, মেহফুজ আলম!
নামটা কানে পৌঁছতেই সবকিছু মনে পড়ে গেল তার। মেহফুজ আলম! এটা তো তারই নাম।
তার একটা নাম ছিল, একটা পরিচয় ছিল, একটা সংসার ছিল আর তার সাথে জড়িয়ে ছিল আরো কত কত মানবিক সম্পর্ক। হ্যাঁ সবকিছু, সবকিছু মনে পড়ে গেল তার মুহূর্তে।
সে হাত তুলে স্কুলের ছাত্রের মতো ওই ডাকে সাড়া দিল কিন্তু সামনে এগোলো না এক পা’ও।
কি হলো যাও! এই পথ ধরে ওপরে চলে যাও, নির্দেশ করলেন দূত।
সে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, না।
না মানে! চমকে উঠলেন দূত, এমন কথা যেন তিনি কস্মিনকালেও শোনেন নি। কি বললে তুমি হে মানব?
আমি এই মুহূর্তে যেতে পারব না।
কেন?
আমি তালিকাভুক্ত নই।
আমি যতদূর জানি এই বইয়ের তালিকায় তোমার নাম আছে।
আমি ওই তালিকার কথা বলছি না।
তাহলে?
আমি আমার দেশের কথা বলছি।
ওই হামেশা উৎপাতের দেশে আবার কি হয়েছে?
আমি এখনো সরকারি তালিকাভুক্ত হই নাই।
কেন, আমরা যতদূর জানি তোমাদের দেশে তোমার নামে একটা ভোটার আইডি কার্ড ছিল, তোমার একটা ট্রেড লাইসেন্স, একটা টিন নাম্বার ছিল, এমনকি তুমি বাস দুর্ঘটনায় নিহত হলেও তোমার নামে একটা টয়োটা করোলা গাড়ির লাইসেন্সও ছিল। এখন কীভাবে বল যে তুমি সরকারের তালিকায় ছিলে না! এই হলো তোমাদের এক দোষ, কথায় কথায় অজুহাত দেখিয়ে বিদ্রোহ করতে চাও।
আপনি ভুল বুঝছেন দূত। আমি কোনো অজুহাত দেখাতে চাইনি।
তাহলে তুমি কি বলতে চাচ্ছ?

একথা সত্যি, যতদিন আমি জীবিত ছিলাম ততদিন আমার একটা আইডেনটিটি ছিল, সে কথা তো আমি অস্বীকার করছি না। আর এই আইডেনটিটি তৈরি করতে আমাকে জীবনে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। সেটা ভুলে যাই কী করে? কিন্তু যখনই আপনারা আমাকে মৃত ঘোষণা করলেন, যখন আমি যে বাসটাতে চড়ে সাভার থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলাম সেই বাসটা বেপরোয়া ড্রাইভিং-এর কারণে পানির তলায় ডুবে গেল, সেই থেকে আমি নিখোঁজ। সেই থেকে আমি মিসিং পার্সন হিসেবে বিবেচিত পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে। আপনি নিশ্চই মৃত মানুষ আর নিখোঁজ মানুষের মধ্যে পার্থক্যটা বোঝেন?
বুঝব না কেন?

তাহলে বুঝেন, আমার বাড়ির মানুষ, আমার স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয় স্বজন এরা আমাকে দিশেহারার মতো হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি এখন জীবিত মানুষের তালিকাতে নেই, আবার মৃত মানুষের তালিকাতেও নেই। তাহলে কী করে আপনারা আমাকে এই টানেল পার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন?

কিন্তু হে মানুষ, তোমার দেশের সরকারের তালিকায় থাকুক আর না থাকুক, এ কথাতো সত্য যে তুমি আর বেঁচে নেই!
কিন্তু তার প্রমাণ কোথায়? পৃথিবীর কেউ জানে না যে আমি এখনো বেঁচে আছি, কী মরে গেছি। আমার প্রতি, আমার আত্মার প্রতি আমার আত্মীয় পরিজন এখনো শেষ শ্রদ্ধা জানায়নি। আমার আত্মার শান্তির জন্য তারা কোনো স¦র্গীয় স্তোক উচ্চারণ করেনি। ক্ষমা করুন আমায় দূত; আমি এখন, এই মুহূর্তে যতক্ষণ না আমার দেশ, আমার পরিবার আমাকে মৃত বলে মেনে না নিচ্ছে ততক্ষণ আমি আপনার এই আদেশ পালন করতে পারব না। আপনার নির্দেশ মতো জীবন মরণের মাঝে ঝুলে থাকা ওই সেতু আমি পার হতে পারব না।

কিন্তু মানুষ, তুমিতো দেখতে পাচ্ছো এখানে কী ঘটছে!
আমি দেখতে পাচ্ছি, অপনারাও তো দেখতে পাচ্ছেন, তাহলে এতটা নির্দয় কিভাবে অপনারা আমার ওপর হতে পারেন! পৃথিবীতে আমি একজন সামান্য মানুষ ছিলাম। আমার আত্মীয় এবং কর্মের পরিধির বাইরে কোনো মানুষ আমাকে চিনত না। আমি কোনো বিখ্যাত মানুষ ছিলাম না। এমনকি পাতি পরিচিত ব্যক্তির তালিকায়ও আমার নাম নেই। কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য আমার নাম কখনো পত্রিকার পাতায় ওঠেনি। নিতান্তই সাধারণ একজন মানুষ ছিলাম আমি। সোজা ভাষায় যাকে বলে আমজনতা। তারপরও একজন সুন্দরী স্ত্রী আমার ছিল এবং ফুটফুটে সুন্দর দুটো কন্যা সন্তানের জনক আমি। সেই অতি সাধারণ মানুষটার বড় মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্র একজন সরকারি কর্মকর্তা। কাল তার গায়ে হলুদ হওয়ার কথা ছিল। আর এমন সময়, ঠিক এমন সময় আমার এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা আপনি ভাবতে পারছেন দূত! আপনি ভাবতে পারছেন আমার পরিবারের ওপর কী বিপর্যয় নেমে এসেছে! এই অবস্থায় আমি আপনার নির্দেশ মত সাঁকোর ওপারে যেতে পারি না, কিছুতেই না।

এতো আচ্ছা যন্ত্রণায় ফেললে হে মানুষ! তোমার খোঁজ দেয়ার দায়িত্ব তো তোমার সরকারের। তুমি জীবিত কি মৃত সে কথা আমরা কীভাবে জানাই! তোমরা তো জান মানুষের কর্মকাণ্ডে আমরা সরাসরি অংশগ্রহণ করি না।
তাহলে কি আপনারা মানুষের জন্য একটা কাজই শুধু করেন? তাদেরকে কি করে ওপরে তুলে নেয়া যায় সেই কাজ করাই কি আপনাদের একমাত্র কাজ?

ওহে মূর্খ মানব, তুমি নিশ্চই জান, আমাদের কর্মের ক্ষেত্র ভাগ করা আছে। এর বাইরে আমরা তোমার কোনো প্রশ্নের জবাব দেব না। আমি এখন শুধু বলব তুমি যদি এখন এই সাঁকো পার না হও তাহলে অনন্তকাল ধরে তোমাকে মর্ত্য ও মৃত্যুলোকের সন্ধিস্থলে ঝুলে থাকতে হবে। সেই ঝুলন্ত অবস্থা তুমি কতক্ষণ বরদাস্ত করতে পারবে আমি জানি না। তবে আমি একথা বলতে পারি এরপর তুমি শত চিৎকার করলেও কোনো কাজ হবে না। ওই দেখ তোমারই দেশ থেকে এসেছে সাংবাদিক একজন; একমাত্র শিশু সন্তানকে স্কুলে দিয়ে কর্মˉ’লে যাচ্ছিল, পথে একটা মাইক্রোবাস তাকে চাকায় পিষ্ঠ করে চলে গেছে। সে তার শিশু কন্যাকে স্কুল ছুটির পর আর আনতে যেতে পারেনি। কে আনবে তাও জানে না..। ওই দেখ, ওই শিশুটির দিকে দেখ; ও মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছিল, প্রতিদিন যেমন যায় তেমনি সেদিনও যাচ্ছিল। কিন্তু সেদিন বাস থেকে স্কুলের সামনে নামতেই একটা বাস ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ওর বুকের ওপর দিয়ে চলে গেল। কী নৃশংস! কী ভয়াবহ সেই দৃশ্য যা সহ্য করতে হলো ওর মাকে। এখনো মা মেয়েটা ঘুমাতে পারে না। চোখ বুজলেই ওই বিভৎস যন্ত্রণাময় দৃশ্য তাকে গিলে খায়। ওর মাকে ওই অবস্থায় ফেলে সেও তো যাচ্ছে। পার হচ্ছে ধীরে ধীরে। ওই দেখ পাশাপাশি দুজন বসে আছেন, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা আর একজন সাংবাদিক-শিক্ষক। তাঁরা গিয়েছিলেন তাঁদের কাজে। একটা বাস তাঁদের গাড়িকে দলিত-মথিত করে দিয়ে গেছে। ওই তো ওঁরাও পার হচ্ছেন। আর তুমি, তুমি কেন পার হতে চাচ্ছ না? এরাতো সবাই নীরবে পার হচ্ছেন, বিখ্যাত সব মানুষ। আর তুমি তোমাকে একজন আম-জনতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছ আর এঁদেরকে অনুসরণ করতে পারছো না! যাও চুপচাপ পার হও! ধমকে উঠলেন দূত।

হে দূত! একথা সত্য যে আমি একজন আম-জনতা, তাই কী আমার মৃত্যুর পর আমি জীবিত কী মৃত সে কথা জানার অধিকার আমার পরিবারের, আমার সমাজের থাকবে না! কেন একজন নিখোঁজ মানুষ হিসেবে আমাকে সবাই বিবেচনা করবে? কেন সবাই ভাববে যে আমি আমার সব দায় দায়িত্ব অস্বীকার করে হারিয়ে গেছি!

কিন্তু মানব, তুমি এতো অবুঝ কেন হচ্ছো? ওই দেখ, উদ্ধার কর্মীরা কি করছে। তুমি যে গাড়িতে ছিলে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া অনেক ছাত্র ছিল। এতোগুলো ছাত্র মারা গেছে সেটা জানান দেয়া তোমাদের দেশ নিয়ন্ত্রকের জন্য খুব সুবিধাজনক হবে না।
তাই কি সরকারের উদ্ধার কর্মীরা এমন করছে! এক একজন নিহত মানুষ টেনে তুলছে, তাদের কপাল দেখে বয়স আইডেন্টিফাইয়িং এর চেষ্টা করছে, আর তরুণ বয়সী কপাল দেখলেই তার ভুড়ি কেটে গভীর পানিতে ডুবিয়ে দিচ্ছে!
তুমি তো সবই জানো।

কিন্তু আমি কি দোষ করেছি? আমি তো কম বয়সী নই, আমি তো এদেশের হতভাগ্য তরুণ নই!
তোমার এত কথা শোনার আমার এখন সময় নেই। আমাকে এখন যেতে হবে।
শোন দূত, চলে যেও না, শুনে যাও প্লিজ! কত অখ্যাত সাধারণ মানুষও বেঘোরে মৃত্যুর কারণে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে যায়। শিরোনাম না হই অন্তত ওয়ারিশ করে দাও।

তুমি হতভাগ্য তরুণ নও ঠিকই, তবে তোমাকে এটা মেনে নিতে হবে, তুমি দুর্ঘটনার শিকার। আর তুমি যেহেতু তোমাদের দেশের একজন আম-জনতা তাই নিখোঁজ হওয়াই তোমার নিয়তি।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (৬) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পৃথ্বীশ রায় — নভেম্বর ২১, ২০১২ @ ৩:০৬ পূর্বাহ্ন

      অসম্ভব সুন্দর কথাগুলো যা দেশ ও জাতিকে নাড়া দেয়ার জন্য যতেষ্ট |প্রার্থণা করি, কেউ যেন নিখোঁজ বা দুর্ঘটণার স্বীকার না হয় |

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rajib — নভেম্বর ২২, ২০১২ @ ২:৪০ অপরাহ্ন

      অসম্ভব সুন্দর কথাগুলো যা দেশ ও জাতিকে নাড়া দেয়ার জন্য যতেষ্ট |প্রার্থণা করি, কেউ যেন নিখোঁজ বা দুর্ঘটণার স্বীকার না হয় |

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Omar Shams — নভেম্বর ২২, ২০১২ @ ৮:১১ অপরাহ্ন

      চমৎকার লেখা। সাবাশ!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন linda — নভেম্বর ২৮, ২০১২ @ ১২:৩৯ অপরাহ্ন

      সাবলীল উপস্থাপনায় দারুন একটি গল্প। হৃদয়কে নাড়া দিয়ে গেলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহমুদ খান — december ১৪, ২০১২ @ ৯:৩৯ অপরাহ্ন

      অসম্ভব সুন্দর।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com