বাংলা ক্রিয়াপদ: কাল্ট, অকাল্ট, প্রতিক্রিয়া পার হয়ে

চয়ন খায়রুল হাবিব | ২০ নভেম্বর ২০১২ ১০:১৫ অপরাহ্ন

দৃশ্য ১ঃ আট শতকের বাংলা, ধর্মপালের শাসনামল!ধলেশ্বরী তিরের বিক্রমপুরে বেড়ে ওঠা তরুণ চন্দ্রনাথের নাম হবে শ্রীজ্ঞ্বান অতীষ দীপঙ্কর!তিব্বতে থেরোবাদি প্রবর্তনা প্রচারের কয়েক বছর আগে চন্দ্রনাথ ধর্মপালের আমন্ত্রণে বিহারের বিক্রমশীলাতে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে। এসময় থেকেই বাঙালি সিদ্ধা শর্বরিপা, ভুসুকুপা, কুক্কুরিপা’র চর্যাগীতির নাড়িস্পন্দন শোনা যাচ্ছে বাংলা, বিহার,উড়িষ্যার বিহারগুলোতে: ”সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।
কানেট চোরে নিল কা গই [ন] মাগঅ॥”কুক্কুরিপাদাম

দৃশ্য ২ঃ ৯ থেকে ১২ শতকের মাঝামাঝি। পশ্চিম বাংলার বারাসাতের এক প্রাচীন গ্রামে খ্যাতিমান জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ বরাহ মিহিরের ছেলের বৌ কিম্বদন্তিতুল্য কবি ক্ষনা ঘরকন্নার অবসরে শ্বশুরকে শোনাচ্ছে চাষাবাদ নিয়ে পুর্ভাভাসমূলক প্রবচন, যা পরে তার জিব ওপড়ানোর কারণ হয়ে উঠবে:
‘আষাঢ়ে কাড়ান নামকে,
শ্রাবণে কাড়ান ধানকে,
ভাদরে কাড়ান শিষকে,
আশ্বিনে কাড়ান কিসকে।’

দৃশ্য ৩ঃ ১৯২০শের দশকে বিশ্বযুদ্ধের ক্রন্তিলগ্নে,বাংলাদেশ, ভারতের ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী চিয়ড়া এলাকায় দেখা যাবে নিরক্ষর কিষান রায়হান আলপথে চলেছে তার সুফি মুর্শিদ জমির শাহ’র কাছে! কাদামাখা খালি পায়ে, উদিলা গায়ে, খাটো ধুতির রায়হান পুরোটা পথ জুড়ে কখনো গুনগুনিয়ে, কখনো গলা ছেড়ে বেধে চলেছে একের পর এক মুর্শিদি গান:
”দেশ বিদেশে হৈছে ভান্ডারি নামের বিজ্ঞাপন।
কে জানে তান প্রেমেরী সন্ধান।।
রুমে(রুমি)শ্যামে(কৃষ্ণ) মিছির হইতে বাড়াইছে ভান্ডারী নাম।”

দৃশ্য ৪ঃ ১৯৭০ দশকের প্রথম পর্ব: ঢাকার হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গণে নুরা পাগলার সাথে মজমা সেরে চাঙ্খার পুলের সামনে কমলাপুরগামি বাসের জন্য অপেক্ষমাণ তরুণ আজম খান ও গিটার বায়েন সঙ্গীরা…
”আলাল ও দুলাল, আলাল ও দুলাল
তাদের বাবা হাজি চান…
চাঙ্খার পুলে প্যাডেল মেরে পৌঁছে বাড়ি…”

পুর্বকথনঃ
শত মন্বন্তরে,শত অশনিসংকেতে অযুত কোটি মর্মরিত ঝরা পাতার মত এই ৪ দৃশ্যের যোগসূত্রেও ধরা আছে বাংলা ক্রিয়াপদের বিনি-সুতার মালা:
৮ থেকে ১৪০০ শতকে চর্যাপদের আমি, তুমি, ইলা, ইবা; তারপর মধ্যযুগের চণ্ডিদাসে ও’কার অন্তে ইলো, ইবো এবং অপরাপর বাংলা সাহিত্য ফারসি প্রভাব; আর ১৮০০ শতকে ‘তাহার’ হয়ে এলো ‘তার’ এবং ‘করিয়াছিল’, ‘দেখিয়াছিল’র বদলে ‘করেছিল’, ‘দেখেছিল’!ব্যাকরণের খুঁটিনাটি এ-রচনার লক্ষ্য নয়।বরং ভাষার গায়ে ব্যাকরণবিদের বেতের শুকনা ঘা’য়ের দাগগুলো চিহ্নিত করে চলিষ্ণু-ক্রিয়াপদ বনাম বিভিন্ন সময়ের প্রতিক্রিয়াশীলতার গলিঘুচিতে সাধ্যমত আগুপিছু করে বাংলা ভাষার নেবার সক্ষমতা দেখানোই এই রচনার লক্ষ্য!

কল্পনা বা স্বপ্নের ক্রিয়াপদ কী?তা কি পুং, স্ত্রী না ক্লীব? ইংরেজিতে যে ”মাদার টাংগ”‌,মাতৃভাষা তারই অনুবাদ!’ভারতবর্ষ’ মাতৃবাচক নয়,পিতৃবাচক। ভারতবর্ষ জুড়ে ঋষি, সাধু, মহাপুরুষদের বৃত্তান্ত থেকেই পরকালে পিতৃলোকের পথকে হিন্দুর ক্ষেত্রে সদ্গতি, মুসলমানের ক্ষেত্রে বেহেস্ত প্রাপ্তির পথ বলে গণ্য হয়েছে।

এ-গণ্যতাই শাসকের অনুগ্রহে প্রবল মান্যতা পেয়েছে এবং চলতি প্রমিতের যে প্রধান মেরুদণ্ড অর্থাৎ ক্রিয়াপদ তার শক্তি হরণের অবকাশ পেয়েছে। কিন্তু ভাষার চলবার শক্তি যৌথ পথবন্ধনের মাধ্যমে অবিরাম সামনে এগোতেই থাকে!’আলিঙ্গন’ গড়িয়েছে’কোলাকোলি, ‘জড়াজড়ি’থেকে ছিন্ন-বিজড়িত’ মনস্তত্বের সহজিয়াতে!অশৌচ, হারাম ক্রিয়াপদের ওপর সমাজের চাপানো সমস্যা, ভাষার নয়!

ক্রিয়াপদের কঙ্কাল: বিদেশি শাসন,বিদেশি ব্যাকরনঃ
প্রাচীন ভারতে স্থানীয় প্রাকৃত কৌমগূলোর ভাষা দুই প্রধান শাখায় বিভক্ত ছিল— শৌরসেনী ও মাগধী। শৌরসেনী ছিল পাশ্চাত্য হিন্দির মূলে, মাগধী অথবা প্রাচ্য ছিল প্রাচ্য হিন্দির আদিতে।আমরা মারাঠি বা পশতু শুনলে বুঝতে পারবো না; কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানীদের চোখে এগুলো কাছাকাছি ভাষা।আর ছিল ওড্রী, ওড়িয়া; গৌড়ী, বাংলা। অহমীয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না।কিন্তু অনতিপ্রাচীন এবং সাম্প্রতিক অহমীয়া গদ্যের যে দৃষ্টান্তে মেলে,তার সঙ্গে বাংলার বাবা, মা দুই দিকেরই আত্মীয়তা!

শুরুতেই বলেছি বাংলার চর্যা প্রণেতা সিদ্ধাদের কথা! বাংলা ছাড়াও সিদ্ধারা এসেছিল উড়িষ্যা, আসাম, বিহার, মিথিলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে! বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের মত এই অঞ্চলের প্রাচীন অনেক কৌমকেই দেখা যাবে চর্যাপদকে তাদের ভাষার আদিসুত্র হিসাবে ব্যবহার করতে। বৌদ্ধিক তান্ত্রিক সিদ্ধাদের লেখা কিভাবে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাষিক চর্চার আদিসুত্র হয়েছে তা নিয়ে প্রামাণ্য ব্যাকরনিক কাজ হয়েছে অনেক, অনেক পরে!এত পরে যে কথন, বাচন, লেখনের অনেক সূত্রই হারিয়ে গেছে চিরতরে!

প্রামাণ্য বাংলা ব্যাকরণ প্রথম বাঙ্গালির ঘরে আসে ১৮০০ শতকে পর্তুগিজ মিশনারি ম্যানুয়েল দা আসুমচাও’র হাত ধরে। ১৭৩৪-১৭৪২এ ভাওয়ালে কাজ করার সময় ম্যানুয়েল এ-কাজটা সম্পন্ন করে।১৭৭৮ ব্রিটিশ ব্যাকরণবিদ নাথানিয়েল ব্রাসি হলহেড Nathaniel Brassey Halhed বাংলা ব্যাকরণের বই বের করে,A Grammar of the Bengal Language নামে, যেখানে প্রথম ছাপার অক্ষরে বাংলা বর্ণ ব্যবহার করা হয়!প্রায় অর্ধশতক পরে ১৮৩২ সালে রেনেসাওয়ালা কথিত সংস্কারবাদি রাম মোহন লেখে,”Grammar of the Bengali Language”

রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ:
রামমোহন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলোঃ ”রামমোহন রায় যখন গদ্য লিখতে বসেছিলেন তখন তাঁকে নিয়ম হেঁকে হেঁকে কোদাল হাতে,রাস্তা বানাতে হয়েছিল।ঈশ্বর গুপ্তের আমলে বঙ্কিমের কলমে যে গদ্য দেখা দিয়েছিল তাতে যতটা ছিল পিণ্ডতা,আকৃতি ততটা ছিল না।”…চর্যাপদের আমল থেকে,মধ্যযুগ ধরে ফার্সি,তুর্কি,হিন্দি প্রভাবকে আত্মস্থ করে বাংলা ক্রিয়াপদের যে স্থানীয় বিবর্তন হয়েছিল রামমোহনসহ আরো কিছু রেনেসাওয়ালা তাকে এড়ানোর ফলে সজনীকান্তদের হাতে ‘কোদাল’খোঁড়া কাচা ক্রিয়াপদের কর্কশ রূপটা দেখা যাক:
”গগনমণ্ডলে বিরাজিতা কাদম্বিনী উপরে কম্পায়মানা শম্পা সঙ্কাশ ক্ষণিক জীবনের অতিশয় প্রিয় হওত মূঢ় মানবমণ্ডলী অহঃরহঃ বিষয় বিষার্ণবে নিমজ্জিত রহিয়াছে।”সজনীকান্ত দাসের প্রবন্ধ থেকে।

কথিত উন্মেষ পর্বের নামে রাম মোহনের অধ্যায়টা পার হতে বাংলা ভাষাভাষীরা কৃতজ্ঞতাভরেই স্মরণ নিতে পারে বিদ্যাসাগরি গদ্যের।বঙ্কিমও বুঝতে পেরেছিল যে শুদ্ধতাবাদের কোদাল, শাবল, গাঁইতি দিয়ে সাহিত্য চর্চা হয় না।কল্পনাশক্তির এবং স্থানিক কথনভঙ্গির প্রতি পক্ষপাত গুনে ভাষাতে, ক্রিয়াপদের ব্যবহারে অসঙ্কোচ-নান্দনিকতা যোগে সমর্থ হলেও প্রবর্তনাগত দিক থেকে ধর্মীয় জাগরনবাদি স্কুলেই থেকে যায় বঙ্কিম!

আবার রামমোহনকে ‘কোদালধারি’ বলা রবীন্দ্রনাথও গৌরবগাঁথার খোজ করছে উত্তর ভারতে, সংস্কৃত পুরাণে!পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বাউলদের গানসহ, বিভিন্ন পুথি, পাঁচালিতে চর্যার আমল থেকে যে বিবর্তন হয়েছে, তা রবীন্দ্রনাথের পাঠে হয়’লোকসাহিত্য’বা’পল্লি-সাহিত্য’!ক্রিয়াপদের পথচলতি ব্যাবহারকে কয়েকশ বছর এগিয়ে দিয়ে মান্য প্রমিতে রূপান্তরে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা যুগান্তকারী হলেও,তার ভূমিকাকে প্রশ্ন-সাপেক্ষ করা যেতে পারে!

(১)”সাধু ভাষার বাংলা বর্ণমালায় আর-একটা বিভীষিকা আছে, মূর্ধন্য এবং দন্ত্য ন’এ ভেদাভেদ -তত্ত্ব। বানানে ওদের ভেদ, ব্যবহারে ওরা অভিন্ন। মূর্ধন্য ণ’এর আসল উচ্চারণ বাঙালির জানা নেই!”….রবীন্দ্রনাথ,’বাংলাভাষা পরিচয়’

(২)”বাংলা বর্ণমালায় সংস্কৃতের তিনটে বর্ণ আছে, শ স ষ।…ওরা বাঙালি শিশুদের বর্ণপরিচয়ে বিষম বিভ্রাট ঘটিয়েছে। উচ্চারণ ধরে দেখলে আছে এক তালব্য শ।আর বাকি দুটো আসন দখল করেছে সংস্কৃত অভিধানের দোহাই পেড়ে। …যেমন, স্নান হস্ত কাস্তে মাস্তুল।শ্রী মিশ্র অশ্রু : তালব্য শ’এর মুখোশ পরেছে কিন্তু আওয়াজ দিচ্ছে দন্ত্যস’এর।”…রবীন্দ্রনাথ’বাংলাভাষা পরিচয়’

এরকম অনেক অভিযোগ রবীন্দ্রনাথ নিজে নিষ্পত্তি না করে ভার তুলে দিয়েছেন সুনীতি কুমারদের হাতে।।হিন্দু, মুসলিম মিলায়ে ব্যাপক নিরক্ষর বাঙ্গালি কৌমের ক্রিয়াপদ ব্যাবহারে সহজতার প্রধান শর্ত যে প্রায়োগিক বানান সংস্কার সেটা বুঝেও ব্যাকরণের জাবেদা খাতাটা আনুষ্ঠানিক অধ্যাপকদের হাতে সমর্পণ সামাজিক আপোষ য্যামন, তেমনি নিজের বাড়ন,গড়নের পুরোটাই অনানুষ্ঠানিক হবার পরিপ্রেক্ষিতে স্ববিরোধীও বটে!
রামমোহনের সাথে পার্থক্য এখানেই যে উচ্চারণের দোহাই পেড়ে ক্রিয়াপদের পরম্পরা ও বিবর্তনের জন্য যে সাহেবি নাগরিকতার বাইরে নিরন্তর খোড়াখোড়ি চালিয়ে যাওয়া দরকার তার তাগিদও বার বার এসেছে রবীন্দ্রনাথ থেকেই!

সাঙ্খ্য ও যোগের সাকোপথেঃ
দৃশ্য-১ থেকে দৃশ্য-৪র সময়খন্ডগত ব্যবধান হাজার বছরেরও বেশি!এর ভেতর দাক্ষিণাত্য থেকে আসা সেনদের উগ্র বর্ণবাদি শাসনে বাংলার বৌদ্ধ বিহারগুলো ধ্বংশস্তুপে পরিণত;সাধারন্য থেকে আসা সিদ্ধাদের লেখা চর্যাগুলার হদিশ বিলুপ্ত; ৯৫% ভাগ জাতক অনুসারীর দেশে একের পর এক জেনোসাইড চালিয়ে বৌদ্ধিকদের হয় ঠেলে দেয়া হয়েছে পাহাড়ে,জঙ্গলে নয়ত বাধ্য করা হয়েছে শূদ্রের, মেথরের অমর্যাদা মেনে নিতে;স্থানীয়দের ভেতর যারা সেনদের সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে তাদেরকে রাতারাতি ব্রাক্ষন, কায়স্থ, বৈশ্যের বৃত্তিগত মর্যাদা দেয়া হয়েছে!

কাশ্মীরের ব্রাক্ষন বা পণ্ডিত নেহেরু পরিবারের সাথে বাংলার ব্রাক্ষনদের আদলগত পার্থক্যই বলে দেয়, লাখো অজাচার, অনাচার, অত্যাচারের পর সেবাদাসীদের গর্ভজাত অবৈধ পুত্রসন্তানকে বৈধতা দিতে বা অনুগত স্থানীয়দের রাজন্যের দরবারে প্রবেশের অনুমতি দিতেই সেনরা বর্ণাশ্রমকে বাংলায় প্রয়োগ করেছে!বল্লাল সেনের জেনোসাইডও য্যামন হতদরিদ্র বৌদ্ধিক বাঙ্গালি ভুলে নাই, সেরকম আচরিক বর্ণাশ্রমের যাঁতাকলে পেষা বাঙ্গালি এতটুকু মাথা ঘামায় নাই যখন ইখতিয়ার খলজির মাত্র ৭ ঘোড়সওয়ারের ক্ষুরধ্বনির মুখে লক্ষণ সেন বাংলা ছেড়ে পালিয়েছে!

১৯৭১-এ পাকিস্তানিরা বহু বুদ্ধিজীবী নিধন করলেও সমস্ত বুদ্ধিজীবীকে নিকাশ করতে পারে নাই।কিন্তু সেনরা নিষ্ক্রান্ত হবার পর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার একসময়কার গরিষ্ঠের ধর্ম অর্থাৎ বৌদ্ধিক একজনও বুদ্ধিজীবী পাওয়া গেলনা, যারা আবারো সেন-নিষ্ক্রান্ত-কৌমকে জাতকের বানি শোনাবে!এ-থেকেই সেনদের প্রশাসনিক-সাম্প্রদায়িক শুদ্ধিকরণ বা এথনিক ক্লিন্সিং এর তীব্রতা বোঝা যায়!চেপে বসা রাজার বিদায়ের পর প্রজন্মান্তরে হিন্দুত্বের একেবারে নিচের তলায় ঠাই পাওয়া আড়ালে লুকানো বৌদ্ধিকেরাই প্রাক ধর্মের নির্দেশকদের না পেয়ে দলে, দলে মুসলমান হলো!এর ভেতর পদ, পদবির নাম বদলের সাথে ক্রিয়াপদের অদলবদলও হচ্ছে বহিরঙ্গে!কিন্তু আগে উল্লেখ করা মুর্শিদি গায়েন রায়হানের গানে বারবার ”নাথ” শব্দের ব্যবহার বলে দেয় যে অতীষ দীপঙ্করের দেশি ভাই-বোনেরা অন্তরঙ্গে কখনোই তাদের আদিধর্ম সাঙ্খ্য এবং যোগের প্রভাবকে ভুলে যায় নাই!

হঠযোগ, প্রাচীন পেষা এবং ধুত্যরি ছাই:
হঠ’এর হ’ সূর্য এবং ঠ বলতে চাঁদ বা সোম!সোজা বাংলায় হঠযোগ হবে চান-সুরুজের যোগ বিদ্যা! ‘হঠকারী’ও সম্ভবত এই চর্চাকারিদের কাছ থেকেই এসেছে!জয়ীরা সবসময়েই পরাজিতের চর্চিত শব্দ, প্রবচন, বাগধারার অবমূল্যায়ন, বিকৃতি সাধন করেছে!বাংলা থেকে বৌদ্ধিক সিদ্ধাদের উচ্ছেদের সাথে, সাথে যোগ, সাঙ্খ্যের সাথে জড়িত ‘হঠকারী’ জাতিয় গরিষ্ঠের বেশুমার প্রকাশভঙ্গী নেতিবাচক অর্থ ধারণ করেছে!

ধরা যাক ‘ধুত্যরি ছাই’ বিরক্তিসুচক শব্দ বন্ধনীটার কথাই!ধুত্যরি এবং ধুতুরা শব্দ দুটি কিন্তু কাছাকাছি শব্দ!প্রাচীন কি আধুনিক সমাজেও রোগ প্রতিষেধক বানাতে বিভিন্ন রকম বিষতত্ত্বের ভূমিকা আছে।হতে কি পারে না যে বৈদিকেরা তাদের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রকে গ্রহণযোগ্য করতেই স্থানীয় সাধারন্যের অর্জিত জ্ঞানগুলো প্রথমে অবজ্ঞা করেছে এসব ‘ধুত্যরি ছাই’ বলে এবং একই সমান্তরালে যারা সেই ধুতুরা-বিদ্যায় ওয়াকিবহাল মন্দিরে তাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে! প্রাচীনতমও একটা সামাজিক ক্রিয়া হচ্ছে চিকিৎসা!আয়ুর্বেদ শাস্রজ্ঞদের শেকড় সমাজে গাড়তেই কি কোল, মুন্ডা, ওরাও ওঝাদের ওপর শাস্ত্রপাঠের নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছিল?মুসলিম আমলে যেমন হেকিমের চল, ব্রিটিশ পরবর্তী চল ডাক্তারি!অবজ্ঞা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রায় সবসময়েই একসাথে কাজ করেছে পদ, পেষা,ক্রিয়া এবং ক্রিয়াপদের পতনে এবং উত্থানে!

ক্রিয়াকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও যে ক্রিয়াপদের অন্তস্থ সেতুবন্ধন বন্ধ করা যায় না,তার বড় প্রমাণ সাধারন্যের পালি বুলিতে লেখা যোগ সিদ্ধাদের উন্মোচনগুলো!বৌধ্ব সহজিয়া পদ,বৈষ্ণব সহজিয়া গান,বাউল সঙ্গীত,যোগীর গান, যুগীর কাচ একান্তভাবেই বাংলার সম্পদ; ধাপে ধাপে এ-পথ ধরেই নিরক্ষর কিষান রায়হানের মানসে অতীষ দীপঙ্করের সাম্যতা-সিঞ্চিত-নাথ-নির্জিত ক্রিয়াপদগুলো আপনের দর্পণ হয়ে গেছে!

গোরক্ষনাথের এবং মংগোলয়েড গোর্খাঃ
ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে সিদ্ধাদের জীবন-সিঞ্চিত পদগুলা ভক্তিবাদে বিকৃত।এই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই ময়নামতিতে গিয়েছিলেন হাড়িসিদ্ধা, উড়িষ্যাতে কানুপা, কামরূপে মীননাথ, উত্তর-পশ্চিম ভারতে গোরক্ষনাথ!এই সিদ্ধাদের কেউই উঁচু বর্ণের ছিলনা।যে তাতি, তেলী, কৈবর্ত,ডোম, হাড়ি, চাঁড়াল, জেলে, কামার, কুমোর বৃত্তি বা সামাজিক স্তরভেদ থেকে এরা এসেছিল তার নিঃসঙ্কোচ বুলিই স্থান পেয়েছে এদের বাধা পদে এবং চর্চিত ক্রিয়াপদে!বলাই বাহুল্য যে জৈন মহাবীর এবং ক্ষত্রিয় কুমার গৌতমের বর্ণাশ্রম বিরোধী বিপ্লবী বানি এতে প্রভাব ফেলেছিল:

”ভণত গোরখনাথ মছিংদ্রনা পুতা(শিষ্য) জাতি হমারি তেলী
পীড়ি কোটা কাড়ি লীয়া পবন খলি দীয়া ঠেলী।
বদত গোরখনাথ জাতি মেরী তেলী
তেল গোটা পীড়ি লীয়া খুলি দিবি মেলী।”
(গোরখ বানী পৃঃ ১১৭)

উপরের পদ এবং ক্রিয়াপদগুলোই বাঙ্গালি কৌমের সাধু এবং সংস্কৃত পার হবার মন্ত্রগুপ্তি!গোরখনাথের আচরিক প্রভাব, ভাষিক আবেদনের সহজিয়া স্মারক ছড়িয়ে আছে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে!ধারনা করা হয় নেপালি গোর্খা সম্প্রদায়ের নাম এসেছে গোরখনাথের প্রতি অর্ঘ্য হিসেবেই।বৈদিক আচরিকতার ঊষা পর্বে আদি কৈলাস, মানস সরোবর তির থেকে ইরানি আর্য বা খাস যাযাবরদের আগ্রাসনের মুখে যেরকম বিতাড়িত হয়েছিল মৃগয়াজীবী স্থানীয় মুন্ডারা; সেরকম অশোক পরবর্তী রামানু্য আচার্যদের পুরান-প্রয়োগ আমলে ব্রাক্ষন্যবাদি রাজন্যদের খাড়া নেমে আসে নাথপন্থি নেপালিদের ওপর!বাংলার প্রাচীন অস্ট্রিক এবং নেপালের প্রাচীন মংগোলয়েডরা বৌদ্ধিক বিপ্লবে যেসব সামাজিক সমতাশ্রয়ি ক্রিয়াপদ আত্মস্থ করে নিয়েছিল, সঙ্ঘ নির্জিত সেসব ক্রিয়া এবং ক্রিয়াপদের বিনাশই ছিল নবায়িত পিতৃতান্ত্রিক ব্রাক্ষন্যবাদের মুল লক্ষ্য।

ক্রিয়াপদ: মাতৃতান্ত্রিকতা বনাম পিতৃতান্ত্রিকতাঃ
বেশ্যাবৃত্তি কি আদপেই সবচেয়ে প্রাচীন বৃত্তি?সবচেয়ে প্রাচীন বৃত্তিতো শিকারির বৃত্তি!দেখা যাবে যে মৃগয়ানির্ভর বা যাযাবর সমাজের কৃষিজীবী সমাজে বদলের সময় তার দৈব নিয়ন্ত্রকের লিঙ্গান্তর হয়েছে এবং প্রাক মাতৃতান্ত্রিক ঈশ্বরীর অবমূল্যায়ন হয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে পুরোপুরি মর্জাদালোপ হয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যের ইব্রাহিমি দর্শন থেকে আসা ইহুদীবাদ, খ্রিস্টধর্ম এবং,ইসলামে যেভাবে প্রাচীন সুমেরীয়, ব্যাবিলনিও দেবীদের উচ্ছেদ করে পুরুষের আদলে দেব-নাম জারি করেছে; বৈদিকেরাও লুটেরা ইন্দ্রকে দেবাদিদেব বানাতে স্থানীয় মনসা, বাসুলী’র অবমূল্যায়ন করেছে আর রাধা, পার্বতী’দের অবস্থান নামিয়ে এনেছে বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতারের প্রেমিকা হিশেবে।বাংলাতে শাকম্ভরী বা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, তারা, বাসুলী, মনসার জনপ্রিয়তাই বলে দেয় যে এ-অঞ্চল ছিল মাতৃতান্ত্রিক।আর এই দেবীরা বাঙ্গালি মানসে শেকড় গাড়া সেই অনার্য মহেঞ্জোদারো, হরপ্যা, ওয়ারী বটেশ্বওয়ার আমল থেকে!

বৈদিকেরা চাষাবাদ শিখেছে অনার্যদের থেকে, তারপর এই সামাজিক পালাবদলের রূপক এঁকেছে রামায়ণ, মহাভারতে: রাম যে সীতাকে গ্রহণ করছে তা লাঙ্গলের ফালের প্রতীক, যে অহল্যাকে প্রাণ দিচ্ছে সে হচ্ছে হল না পড়া জমি!ইরান থেকে আমদানিজাত আহোর বা অসুর ক্রমান্বয়ে অরি, মিত্র, দেব, ইন্দ্র এবং বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতারের নাম পরিগ্রহ করলেও প্রাচীন বাঙ্গালি তার প্রাচীনতমও ক্রিয়া ‘চাষবাস’কে কেন্দ্র করেই তার পূজা, পার্বণ, ক্রিয়াপদের দ্বন্দ্বগুলো সম্পন্ন করেছে! এই ক্রিয়াগুলোতে হাটে, মাঠে, ক্ষেতে, খামারে নারী-পুরুষ যোগ দিয়েছে একই কাতারে। দেখা যাবে যে পিতৃতান্ত্রিক সমস্ত ধর্মই সেবাদাসী এবং আরো উসিলায় নারীর প্রাচীনতমও বৃত্তি পতিতাবৃত্তি এহেনো প্রবচনগুলো আরোপ করেছে!

খ্রিস্ট ধর্মে দেখা যাবে সন্ত পল বার বার পতিতা ম্যাগডালেনের যিশুর পা ধুয়ে দিয়ে শুদ্ধতাপ্রপ্তির খবর দিচ্ছে; ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলিম তিন কিতাবেই নারীকে প্রাচীনতমও পাপের উৎস হিশাবে দেখানো হচ্ছে; সালমান রুশদি যখন তার ”শয়তানের পদাবলি” গ্রন্থে পরোক্ষে উল্লেখ করলো যে মক্কী, মাদানি সুরাগুলোর কোন, কোনটাতে প্রাক-ইসলামিক-আরব-নারী-দেবীদের বর্ণনা ছিল এবং তাতে পরে অদলবদল ঘটানো হয়েছে পৃথিবী ভেঙ্গে পড়লো তাতে!মানে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সন্ত, সাধু, ঋষি, নবী, পয়গম্বর পুরুষদের পাশে নারী-নাম নেয়া হারাম!খোমেনি যেই ফতোয়া রুশদির উপর জারি করেছিল, ভারতের ইন্দ্র, বিষ্ণু পূজারী পণ্ডিতেরা সেই একই ধরনের ফতোয়ার জোরে হাজার বছর ধরে কোটি, কোটি নারীকে হত্যা করেছে সতীদাহ প্রথার নামে!

পিতৃতান্ত্রিক ধমকের জের ধরে ক্রিয়া এবং ক্রিয়াপদের আবর্তনটা বাংলা থেকে জৈন-বৌদ্ধিক যাপনের অপসারণের আলোকে দেখা যাক।জৈন-বৌদ্ধ সমাজে জীব নির্বিশেষে সবার প্রাণের মর্যাদা এবং জীবিকা গ্রহণ, বর্জনের স্বাধীনতা সমান ছিল।সেন আমলে নবায়িত ব্রক্ষণ্য সমাজে মানুষ অর্জিত মৌলিক অধিকারগুলো হারালো।কৌলীন্য প্রথার অনুসারীদের কাছে তাতি, কামার, চামার,নাপিত, কুমোর, ঝাড়ুদার পেষার দরিদ্রদের উৎপন্ন সেবাসামগ্রী সবাই ভোগ করলেও, সামাজিক পর্যায়ে এদেরকে অভিব্যাক্তিশুন্য করে ফেলা হয়!নাথযোগি তাতি, ধর্মঠাকুরের পূজারী, সহজযানী, মীননাথ, গোরক্ষনাথপন্থী বিভিন্ন শাখার যেসব বৌদ্ধ জেনোসাইড থেকে রক্ষা পায় তারা শূদ্র বা অস্পৃশ্যতার ভাগ্য বরন করে নিয়ে ব্রাক্ষণ্য সমাজের প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসাবে আত্মরক্ষা করে!এই দুর্ভাগ্য বরনকে জন্মদোষ বা কর্মদোষ বলে জায়েজ করা হয়!এদের লেখাপড়ার অধিকার হরণ করা হয়; পুরো চালের ভাত খেতে পারবে না,উচ্ছিষ্ট খাবে, এঁটো না পেলে ক্ষুদ রেঁধে খেতে পারবে; পুরো কাপড় বা নতুন কাপড় পরতে পারবে না, ছেড়া কাপড় পরবে!

অধিকার হারানো, হীনবল, সম্ভ্রম বঞ্চিত এই প্রান্তিকেরা প্রাণধারণের যে অবর্ণনিয় সংগ্রাম বা ক্রিয়াকাণ্ডে নিয়োজিত ছিল তাতে এ-সময়ে ক্রিয়াপদের বিবর্তনটা ছিলো শ্লথ, প্রায় শূন্য, অন্তর্মুখী!সেন শাসকদের আনুকূল্য পাওয়া ব্রাক্ষন, পণ্ডিতদের হাত থেকে অনুশাসনের সংস্কৃত ব্যাক্ষা, অপব্যাক্ষা বাদে বাংলার জনগোষ্ঠী কিছুই পায় নাই বলাটা অবশ্য সত্যের অপলাপ!জীমূতবাহন বৈদিক প্রাচীন উত্তরাধিকার আইন সংস্কারের যে নির্দেশনা তৈরি করেছিলেন, তার মর্মার্থে পৌঁছালে এই ব্যতিক্রমী বাঙ্গালি মনীষার প্রতি হাজার বছর পরেও শ্রদ্ধা জানাবার ইচ্ছাটাই প্রবল হয়।

জীমূতের আইনি সংস্কার এবং নতুন ক্রিয়াপদ:
জীমূতবাহনের জন্ম পশ্চিম বাংলার রাধায়।দিন, তারিখ ক্ষণ সঠিকভাবে জানা না গেলেও সংস্কৃতে লেখা জীমূতের কালজয়ী আইনি শাস্ত্র ‘দায়ভাগ’ এর বিভিন্ন সূত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তার লেখালেখির মুল সময়টা ছিল ১১০০ খ্রিস্টাব্দে বল্লাল সেনের শাসনামলে।মনুসংহিতার আমল থেকে জীমূতের আগে অব্দি হিন্দু পারিবারিক আইনে জন্মমাত্র ছেলে-সন্তান বাবার সম্পদের উত্তরাধিকারী হতো, আর সতীদাহ প্রথার ফলে স্বামীর সম্পত্তিতে মেয়েদের অনধিকার সহজেই অনুমেয়। এই দুই ক্ষেত্রে জীমূতবাহন মৌলিক সংস্কারের পরামর্শ দেন:

১)বাবার মৃত্যু হওয়া ছাড়া ছেলেদের ওপর আপনাআপনি জন্মসূত্রে সম্পত্তির উত্তরাধিকার বর্তাবেনা।

২)বিধবাদের ওপর স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকার বর্তাবে, এমন কি স্বামীর জীবিত ভাই থাকলেও।

সেন আমলে যে বাংলাতে জীমূতের এই সংস্কার প্রয়োগ হয়েছিল তার প্রমাণ মেলে!এই আইন দুটো মনু এবং মিতাক্ষরার বর্ণাশ্রম প্রথার মৌলিকভাবে বিরোধী! বিভিন্ন বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ কুক্ষিগত করে ইতিমধ্যেই শক্তিশালী ব্রাক্ষনদের রাজনৈতিকভাবে আরো প্রভাবশালী হওয়াটা ঠেকাতেই হয়ত বল্লাল রাজ্য বিস্তারের সাথে, সাথে পারিবারিক সম্পত্তি আইন সংস্কারের প্রয়োজন বোধ করে।

‘দায়ভাগ’ গ্রন্থের দীর্ঘমেয়াদী প্রায়োগিক সুরতহাল করলে দেখা যাবে আঠারো শতকের রামমোহন, বিদ্যাসাগরদের তুলনায় ব্রিটিশের হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কারে জীমূতবাহনের প্রভাব সুদূরপ্রসারী।কোলকাতা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হেনরি টমাস কোলব্রুকের হাতে ‘দায়ভাগ’ গ্রন্থটা হাতে আসে ১৮১০ সালে।কোলব্রুক গ্রন্থটির আদ্যপান্ত অনুবাদ করান এবং এর বেশির ভাগ নির্দেশনাকেই হিন্দু পারিবারিক বিচারিক কাজে ক্রমান্বয়ে বিধিবদ্ধ করে নেন।১৮২৯ সালে যখন আইন করে সতীদাহ নিষিদ্ধ করা হয়, বলাই বাহুল্য কট্টরপন্থী হিন্দুদের নিরস্ত করতে জীমূতবাহনের আইনি সংস্কারের দৃষ্টান্ত সামনে নিয়ে আসা হয় কাটা দিয়ে কাটা তোলার কৌশল হিসেবেই।

সতীদাহের বিরুদ্ধে মোঘল বাবর, শাহজাহান একের পর এক ডিক্রি জারি করেও কখনোই পুরোপুরি রোধ করতে পারে নাই!আকবরের আমলে অনুমোদন সাপেক্ষ বিধান করা হয় এবং সুবাদারদের অনুমতি না দিতে নির্দেশ দেয়া হয়।এর থেকে অবশ্য সুবাদারেরা উৎকোচের সুযোগ তৈরি করে নেয়।১৬৬৩ সালে ঔরংজেব ডিক্রি জারি করে একে পুরোপুরি নিষীধ্ব করে!

এমন হতে পারে যে রেনেসার নব্য বাবুদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ সবাই বিভিন্ন সংস্কারের সিলমোহর, তকমা নিজেদের দিকে টেনে নিতে এতরকম কাল্ট, অকাল্ট ব্যবসাতে ব্যাস্ত ছিল যে বিব্রতবোধ ছাড়াও, বিলাতে না যাওয়া হাজার বছর আগেকার পণ্ডিত জীমূতবাহনের উল্লেখে ঐতিহাসিকভাবেই ঈর্ষা বোধ করেছে!ক্ষনার জিব ওপড়ানো, সতীদাহ জায়েজ করা সমাজে জীমূতবাহনের নির্দেশিত বিধাণমতে সম্পত্তিতে নারীর এবং বিধবার অধিকার নিসন্দেহে যুগান্তকারী!সতিদাহের সাথে জড়িত ক্রিয়াপদগূলোর যে জিমুতবাহনি সংস্কারের ফলে অন্তত কস্মেটিক সার্জারি করতে হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য!

সংস্কৃত, অপসংস্কৃতঃ
জীমূতবাহন সূত্রে বলা যায় যে সংস্কৃতের ধারাবাহিকতার সাথে বিচ্ছেদ ঘটানো বা এই ধারাবাহিকতা নিয়ে সচেতনভাবে প্রিটেনশান তৈরি করা বাংলা ভাষার জন্য আত্মঘাতী।পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আণবিক সূত্রাবলী, আইনস্টাইনের প্রবর্তনা বুঝতে য্যামন সত্যেন বোসের আশ্রয় নেয়া ছাড়া উপায় নাই, ভাবে এবং জ্ঞানে বাংলা সাহিত্যের যতই বিস্তার হচ্ছে ততই সংস্কৃত,আশপাশের আঞ্চলিক অপভ্রংশ এবং বিশ্বায়িত ভাণ্ডার থেকে শব্দ এবং শব্দ বানাবার উপায় বাড়ানো দরকার।

অহমীয়া রাজনীতিবিদদের একাংশ বাংলা ও বাঙ্গালির প্রতি বিদ্বেষ,প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে যে নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাতে অহমীয়া সাহিত্যের বিকাশই ব্যাহত হচ্ছে!আবার ভুপেন হাজারিকার মত শিল্পী যখন বাংলা, হিন্দি, অহমীয়াতে সঙ্গীত চর্চা করে তখন ৩ ভাষার ক্রিয়াপদেরই সহন এবং বহন ক্ষমতা দুইই বেড়ে যায়…’দোলা হে দোলা,আঁকাবাঁকা পথে মোরা কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই/রাজা, মহারাজাদের দোলা/আমাদের জীবনের ঘামে ভেজা শরীরের বিনিময়ে পথ চলে দোলা হে দোলা/হেইয়া লো হেইয়া লো…”

ইংরেজি, ফরাসি, জার্মানিকে ভাষায় নৈমিত্তিক পুরানো পণ্যের নামগুলি স্যাক্‌সন, সেল্টিক, ফ্রাঙ্ক, ভাইকিং বা অক্সিটান।এগুলি সব জাতির আদিম স্থাবর সম্পদ।অভিধান দেখলে টের পাওয়া যাবে ইংরেজি ভাষার অনেকটা ফরাসি প্রভাবে গড়া, আবার সেই ফরাসির অনেকটা গ্রীক-লাতিন প্রভাবে গড়া।এই লেনদেনে সংস্কৃত, অসংস্কৃত বলে কিছু নাই!অধিকার, স্বাধিকারের আন্দোলনের পাশাপাশি ক্রিয়াপদের স্বায়ত্তশাসনও থেকেছে স্বতোশ্চালিত!আর সে রাজপথে ক্ষমতাবানের মদদে মানুষ দাঙ্গা হাঙ্গামা, রক্তারক্তি যতই করুক না কেন, ভাষার চলতি মান্যতার ক্ষেত্রে বরং বর্জনের চেয়ে গ্রহনই করেছে বেশি!

বাঙালি বিজয়ী বলেই সংস্কৃতের উত্তরাধিকার নিয়ে তার হীনমন্যতা মানায় না।রাজনৈতিক বিজয়ের বহু আগে ফার্সি, আরবি অনেক শব্দ বাংলা ভাষা অসংকোচে হজম করে নিয়েছে।‘বিদায়’ কথাটা সংস্কৃত নয়,আরবি ‘আলবিদা’ থেকে এসে সংস্কৃত-সুন্দর হয়েছে। ‘হয়রান’-এ ক্লান্তি ও অসহ্যতার মিশেলে যে ভাবটা মনে আসে কোনো সংস্কৃত শব্দে তা হয় না।আদিম খাটি বাংলা নিয়ে এখনকার কাজ যেমন চলে না, খাটি সংস্কৃত দিয়েও আমাদের এতরকমের চাহিদা মিটবে না!এখানে পাক, নাপাকের কোন বিশম্বাদ না থাকাটাই শ্রেয়তরো!বহু ভাষার পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, গিরিশ চন্দ্র সেন এই বিশম্বাদ মনে আশ্রয় দিলে চর্যাপদ এবং কোরানের পাঠসুখকর বাংলা অনুবাদে আরো দেরি হয়ে যেত!

কেউ যখন সহস্রাব্দের মোড়ে দাঁড়িয়ে সাধু’তে ‘হইয়াছে’ বা আঞ্চলিকে ‘হইতেছে’, ‘হইছে’ বলে, তখন তাকে প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদপসরণ বলাটাই সঙ্গত।মধ্যযুগে হাওড়াতে জন্মানো সংস্কৃত, ফার্সি পণ্ডিত ভারত চন্দ্র রায় যেরকম প্রাদেশিক, আঞ্চলিক শিথিলতা সচেতনভাবে বর্জন করে ছন্দ ও ক্রিয়াপদকে সুষমামণ্ডিত করেছিলেন তার ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে, সেরকম সিলেটে জন্মানো সৈয়দ মুজতবা আলিও বা বৃহত্তর ময়মনসিংহ-এ জন্মানো হুমায়ুন আহমেদ তাদের লেখনীতে আঞ্চলিকতাকে এতটুকু প্রশ্রয় দেন নাই!ভারত চন্দ্র মুজতবা আলি, হুমায়ুন ৩ জনেই গরিষ্ঠ বাঙালি পাঠকের কাছে গৃহীত, কিন্তু যেসব ভদ্রলোক তাদের কথিত বিপ্লবী বা প্রতিবিপ্লবী প্রবর্তনা তুলে ধরতে আঞ্চলিকতাকে ব্যাবহার করেন, হালকা-কড়া শত চমকের পরেও তা যে কেবলই পোশাক তা ঠিকই চর্যা থেকে মুজতবা আলি, হুমায়ুনে পর্বান্তরিত পাঠক ধরে ফেলেতে সক্ষম!
সেন শাসনের সমান্তরালে পাকিস্তানি আমল:

১০৯৭ তে কর্ণাটকের বিজয় সেনের হাতে বাংলা পদানত হবার পর থেকে ১১৭৮এ লক্ষ্মণ সেনের রাজত্ব হারানোর মাঝামাঝি সময়ে যেভাবে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার ৯৫% ভাগ গরিষ্ঠ বৌদ্ধিক কৌমকে সংখ্যালঘু প্রান্তিক সীমানায় নিয়ে যাওয়া হয়, বৌদ্ধিক বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস, শাস্ত্র এবং সাহিত্যকে নিশ্চিহ্ন করা হয়; তার সাথে ১৯৭১ এর পাকিস্তানি জুলুমবাজির খুব একটা অমিল নাই!১৯৭১ এর পর আরেকটা প্রজন্ম সময় পেলেই পাঞ্জাবিদের রুদ্র রোষ থেকে মুসলমান হয়েও বাঙ্গালি রেহাই পেত কি না তাতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে!বাঙ্গালির প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের অবজ্ঞা, অজাচার অবাঙ্গালি সেনদের শাসন পদ্ধতিই মনে পড়িয়ে দেয়!

এটা কাঁকতলিও হলেও উল্লেখ্য যে পাকিস্তান আমলে হাড়িফা সিদ্ধার প্রচারখ্যাত ময়নামতি বিহারের পাশে যে BARD প্রতিষ্ঠান তৈরি হয় গ্রাম বাংলার কৃষকের উন্নতির জন্য তার সর্বেসর্বা করা হয় উওর ভারতের এক আমলাকে!প্রতিষ্ঠানটার দফতরি কাজের পুরোটাই চালানো হতো হয় ইংরেজিতে, নয় উর্দুতে!বাংলা ভাষার যে ‘কৃষ্টি’ শব্দটি তারও ক্রিয়াপদগত ব্যুৎপত্তি কৃষি নির্ভর কর্মকাণ্ড থেকে!উর্দু, ইংরেজিতে আমলাদের শিক্ষিত করে কৃষকের কতটুকু লাভ হতো তা যেমন অনুমান নির্ভর, তেমন বাংলা ক্রিয়াপদের বিবর্তনের প্রতি এই শাসকদের সহানুভূতিও ওপর চালাকি বৈ কিছু নয়!একই সময় রবীন্দ্রনাথের স্থাপিত বিশ্ব ভারতীর সমবায়ভিত্তিক কৃষি ও সেচ ব্যবস্থা বোলপুরের গণ্ডী ছাড়িয়ে সারা ভারতে প্রভাব বিস্তার করেছে!সেই বোলপুরেই পৌষ মেলার বাতাবরণে বাউল সঙ্গীতে যোগ হয়েছে অধুনার ক্রিয়াপদ।

ক্রিয়াপদের ধর্মায়ন, ক্ষমতায়নঃ
বাংলার তুর্কি বিজয় ও তার পরের মুসলিম শাসন নিয়ে ব্যাকরণবিদ, ইতিহাসকারদের অনেক অভিযোগ।্ধর্মায়িত ইতিহাসকার ভুলে যান যে শাসকগোষ্ঠী সবসময় আলাদা একটা সত্তা!তাদের কাজ-কারবার প্রথমত এবং মূলত নিজের স্বার্থবুদ্ধি প্রসূত।গণতন্ত্রে উত্তরণ হলে অবশ্য এই স্বার্থবুদ্ধি ক্রমশ পারস্পরিক হতে থাকে।বাংলার মুসলিম শাসকদের অনেকেই সুশাসক ছিল, আবার অনেকেই ছিল নরদানব।দীনেশ চন্দ্র সেন ‘বৃহতবঙ্গে” লিখেছিল, ”এই পাঠান প্রাধান্য যুগে চিন্তাজগতে সর্বত্র অভূতপূর্ব স্বাধীনতার খেলা দৃষ্ট হইল, এই স্বাধীনতার ফলে বাংলার প্রতিভার যেরূপ অদ্ভুত বিকাশ পাইয়াছিল, এদেশের ইতিহাসে অন্য কোনও সময়ে তদ্রূপ বিকাশ সচরাচর দেখা যায় নাই।” এই একই লেখক, একই গ্রন্থে সেন রাজত্ব সম্পর্কে বলেন, , ”শুদ্রমাত্রেরই উচ্চ শ্রেণীর লেখাপড়ার অধিকার কাড়িয়া লওয়া হইল।…এই জনসাধারণ অজ্ঞ ও মূর্খ হইয়া রহিল।”

আধুনিক ভারতীয় ভাষাগুলোর ভেতর বাংলাতেই প্রথম রোমান্স রচিত হয় শাহ মুহম্মদ সগিরের(১৩৮৯-১৪০৯) হাতে, ‘ইয়ুসুফ জোলেখা’ শিরোনামে।হাতে গোনা কয়েকজনের বাইরে অন্যান্য লেখকেরা অবশ্য সংস্কৃত আর ফারসিতেই লিখে যেতে থাকেন!কৃত্তিবাস ওঝা(১৩৮১-১৪৬১) বাংলায় অনুবাদ করে রামায়ণ; আরাকান রাজসভার আশ্রয়ে আলাওল(১৬০৭-১৬৮০) তার সুবিখ্যাত পদ্মাবতী রচনা করে তার আগের শতকের হিন্দি কবি মালিক মুহাম্মদ জায়সির পাদ্মাভাত অবলম্বনে।একই সময়ে আরাকান সভাসদের আশ্রয়ে দৌলত কাজিও হিন্দি থেকে বাংলাতে অনুবাদ করেন!রামায়ণ, ভাগবতের কাহিনী পুনর্বিন্যাস করে ধর্মমঙ্গলকাব্যের পাঁচালি লেখেন ঘনশ্যাম চক্রবর্তী!বাংলাতে লিখলেও বাক্য বিন্যাসে, ক্রিয়াপদের ব্যবহারে এরা চর্যার পদকর্তাদের সার্বভৌম তাদের কাজে দেখাতে পারেন নাই, তুলনামুলকভাবে হিন্দি, ফারসি সমকালীন সাহিত্যের চেয়ে দুর্বল রচনার জন্ম দেন!

চর্যার পদকর্তারা মুখের বুলির প্রতি যতটা পক্ষপাত দেখিয়েছিল, মধ্যযুগের কথিত বাংলা সাহিত্যিকেরা ততটাই এবং কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি দূরত্ব তৈরি করেছিল মুখের বুলির সাথে।এই দূরত্বের দায় ঘোচাতেই য্যানো নতুন পাওয়া আপাত স্বাধীনতার জোরে জন্ম নেয় পল্লি বা লোকসাহিত্য।লালনের গানে মান্য প্রমিতের ব্যাবহার এবং পরে রবীন্দ্রনাথের সেই লোকগানের দেশি তালকে আধুনিক স্বরলিপিতে আত্মস্থ করে নেয়ার দৃষ্টান্ত বলে দেয় যে ধমক দিয়ে, সাংবিধানিক অনুশাসন আরোপ করে ধর্ম আরোপ করা যায় না, ক্রিয়াপদের নবায়ন বন্ধ করা যায় না!

টলেমী, মেগাস্থিনিস রাড়-বাংলার গঙ্গারিডই জাতির যে বর্ণনা দিয়েছে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময়ে সে অনুযায়ী প্রবল এক সেনাবাহিনী রক্ষিত প্রতাপশালী রাজ্য ছিল গঙ্গাতীরের রাড় এলাকায়।দেগঙ্গার চন্দ্রকেতু গড় খনন, ঢাকার অদূরের ওয়ারী বটেশ্বওয়ারের সাথে মহেঞ্জোদারো, হরপ্যাসহ সিন্ধু উপত্যকা এবং গঙ্গাতীরের প্রাক বৈদিক জনপদগুলোকে একটা সূত্রে গাঁথলে বোঝা যায় যে সংস্কৃতিবান, সভ্য হতে বাঙ্গালির বৈদিক,জৈন, বৌদ্ধিক মতবাদ গ্রহণ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট শাসকের শাসনে থাকবার কোন প্রয়োজন ছিলনা!আলেকজান্ডারের আগের সময় থেকেই তাম্রলিপি, পুরস্থল, গঙ্গা, সমন্দর(চিটাগাং) প্রভৃতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবন্দরের খোজ মিলছে!চন্দ্রকেতু গড়ে, পান্ডুরাজার ঢিবিতে পাওয়া গেছে সুদূর ক্রিট দ্বীপের সিলমোহর!বাংলার এখো গুড়, চিনি রোম সাম্রাজ্যে রপ্তানির প্রমাণ মিলেছে।বাণিজ্যিক পণ্যের ঝুড়িতে বাধা থাকতো মাটির ফলক।

ক্রিয়াপদের এবং পদবীধারীদের স্বাস্থ্য:
আলেকজান্ডারের অভিযান প্রতিরোধে যে রাজন্যরা প্রস্তুত ছিল, তারা কেন ক্রমশ উত্তর ভারতের শাস্ত্র, শাসন মেনে নিয়ে ২,০০০ বছর নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ভুলে গিয়েছিল তার মনস্তত্বেও বাঙ্গালির হারানো ইতিহাস এবং ক্রিয়াপদের নবায়নের মন্ত্রগুপ্তি!স্থিতিশীল কৃষি নির্ভর অভিজাতেরা কি নিজেদের শঠতা, কপটতা আড়াল করতেই বার বার বিজাতিয় শাস্ত্র, শাসন ও সংস্কৃতি মেনে নিয়েছে?এই কপটতার পথ ধরেই কি বাঙ্গালি মুর্শিদকুলি,আলিবর্দি, সিরাজোদৌল্লাদের শাসনকে স্বাধীন সুবা মনে করেছে?এই কপটটার যোগসূত্রেই কি উমিচাঁদ, জগতসেঠেরা বাংলার শাসন ক্লাইভের হাতে ন্যস্ত করেছে?

হাজার বছর ধরে এখানকার জনগোষ্ঠী রেশম চাষ করেছে, মসলিন বুনেছে; তা বেচতো বেনেরা, পরতো অন্যরা, লাভ লুটতো ফড়েরা!যারা উৎপাদন করতো তারা পরতো গামছা,কৌপীন, খাটো ধুতি!এখন যেমন চা-বাগানের, গার্মেন্টস শিল্পের মালিকের জীবনের এবং স্বাস্থ্যের সাথে শ্রমিকের জীবন এবং স্বাস্থ্যের আকাশ পাতাল ফারাক!অধুনার জনপ্রিয় বাংলা ব্লগার,ফেসবুকারদের বেশির ভাগ পোস্টই ক্ষমতায়ন কেন্দ্রিক, ক্রিয়াপদগুলো এমন এক চৌকশ ছকে সাজানো হয়, যার সারাংশ দাঁড়ায় ঃ”গার্মেন্টস মালিক, ngo কর্তার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”

আর ন্যায্য মজুরির আশাহত, সম্ভ্রম হারানো শ্রমিকের দাসখত:”পেটে খেলে পিঠে সয়”!

বাবরনামাতে সম্রাট বাবর বলছে, ”বাঙ্গালীরা ‘পদ’কেই শ্রদ্ধা করে।তারা বলে: যিনি সিংহাসন অধিকার করেন, আমাদের আনুগত্য তার দিকে।”…পদঃ ক্রিয়াপদ…পদচ্যুতিঃ ক্রিয়াপদচ্যুতিঃ অন্ত্যজ ক্রিয়াপদে অবনয়ন!

যৌনতাজ্ঞাপক ক্রিয়াপদের বেহাল:
বাংলা সিনেমায় চুমু,সঙ্গম দেখানো যাবে না!বহিরঙ্গে ইত্যাকার না-বাচকতার হিসাব করলেই অন্তরঙ্গে বিকৃতি এবং অবদমনের এক অসুস্থ চিত্র ফুটে উঠে!বাংলা রেনেসাঁ যে ভিক্টোরীয় মূল্যবোধে প্রভাবিত তার শেকড় যেমন কট্টর যৌন-প্রতিক্রিয়াশীল-অবদমনে আক্রান্ত, সেরকম বৈদিক যৌনতার নান্দনিক প্রকাশ যে বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ তাও নারীকে অধস্তন সেবিকার রতিভার দিয়েই দায় সেরেছে; মধ্যপ্রাচ্যের ‘আরব্য রজনী’ বহু রকম যৌন বিবরণে ভরপুর হয়েও শেষতক নারীকে হয় ভোগ, নয়তো দুর্ভোগের জন্য দায়ী করেছে!’আরব্য রজনী’সহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক উপাখ্যান তাদের মুল্যবোধগত রসদ ‘ইদিপাস’ ধরনের গ্রিক নাটক থেকে গ্রহণ করলেও, যৌনাচারের সহনশীলতায় গ্রিক সমাজ সেই শাপ্য, কাভাফির আমল থেকেই অনেক, অনেক এগিয়ে গেছে।

সমকামিতা, উভকামিতার প্রতি সাংস্কৃতিক ভিতিবোধ প্রায়শই ভারতীয় এবং বাঙালি মানসে ককুরভিতির রূপ নিয়েছে!আবারো স্মর্তব্য যে বাঙালি এক চর্যা রচয়িতার নাম ছিলো কুক্কুরিপাদাম, তার সঙ্গী কুকুরের প্রতি ভালবাসার প্রতীক হিসাবে!জিবের অধিকারে যেরকম বাঙালি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান বিশ্বস্ত নয়, সেরকম জিবের বিভিন্নরকম যৌন আবেদনের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল নয়!পুংলিঙ্গ বাচক সোনা, ধন ইত্যাকার শব্দ সামাজিকভাবে আদরণীয় হলেও, স্ত্রীলিঙ্গ বাচক যৌনাত্মক শব্দ হামেশা ব্যাবহার হয় গালাগাল হিসাবে, সঙ্গম বাচক সাধারন্যের চলতি বুলিও আখ্যা পেয়েছে ছোটলোকের বুলি হিসাবে!শিবলিঙ্গ, কুমারী পূজার চল গাঙ্গেয় বাংলাতে শুরু বৈদিক আমলেরও আগে গঙ্গারিডই আমলে, একই সময় পরিসরের মহেঞ্জোদারোর নগ্ন কিশোরী মূর্তির ডৌল দেখেই বোঝা যায় সে-সময়ের দেহছন্দের মুক্ত উদ্ভাসন!

বাংলায় বোরখা বা হিজাব এসেছে অনেক পরে, কিন্তু সমাজকে অপরাধমনস্কতায় বাধবার তোড়জোড় হাজার বছরের!দেহের আগে মন গেছে কুঁকড়ে!অযৌন প্রেমকে অধ্যাত্ম হিশাবে ধার্য করা হয়েছে!এর বিপরীতে সাধুর সাথে ক্ষেপীর সহজিয়া শরীরী অর্পণ!ইসলামি কাব্যকলার নামে বাংলাতে যেরকম খাইয়ামের রুবাইকে যৌনতাশুন্য করা হয়েছে, সেরকম অযৌন, অলৌকিকের খোল নলচে পরানো হয়েছে লালনের লৌকিক যৌনসুত্রে!ডক্টর আহমদ শরিফদের মত অনেক বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন রকম ভাবে সমাজতন্ত্রের পক্ষে গিয়েও,জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দে’র প্রবর্তনাকে দেখেছেন অনাচার হিসাবে!

বাংলাদেশের কথিত উন্নয়ন কর্মীদের যে নারীবাদ সেখানে ‘চেইন’ এবং ‘লিঙ্কের’ অর্থ গুলিয়ে ফেলায় যৌনাত্মক অনেক বিশ্বজনীন আচরণই অপব্যখ্যার অবকাশ পেয়েছে।যৌনশিক্ষাকে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে পর্নোগ্রাফির সাথে!চুমুর ছবিকে, নগ্নতাকে এই একবিংশ শতকেও বাংলাদেশে চমক হিশাবে ধরা হয়!যৌনতার আলোচনায় পুরুষদের ভিড়ে অধিকার সচেতন নারীও আরো সচেতন হয়ে রক্ষণশীল ‘কিন্তু’তে চলে যান, যৌনতা মাত্রেই প্রায় অজাচার এবং কেলেঙ্কারি, আর তার পণ এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মরণ দিয়েই শুধতে হয় নারীকে!সমকামিতাকে লুকানো হয়, ‘চিরকুমার’ এর ছদ্মবেশে।গরিষ্ঠ সংখ্যক নারীকেই যেহেতু হয় স্ত্রী’র মর্যাদা, নয় পতিতার অভিশপ্ত জীবন যাপন করতে হয়ে, সেই একই হেতু স্বাধীন নারীর মর্জাদাজ্ঞ্বাপক যৌন, অযৌন কোন শব্দ এখনো বাংলাতে নাই।

সমাজতান্ত্রিক দেশ ও সংস্কৃতিগুলোতে মানুষের বিভিন্ন রকম যৌনাচার ব্যাক্তির মৌলিক স্বাধিকারের সাথে, সাথে স্বীকৃত হলেও, মার্ক্সবাদী অনুশীলনে নারী, পুরুষের যৌন স্বাধীনতাকে পুঁজিবাদের অবক্ষয়ের সাথে মিলিয়ে সঙ্গমকে নিছক প্রজনন এবং শ্রম হিশাবে দেখানোর প্রয়াস নেয়া হয়েছে।সঙ্গমের, যৌনতার যে শিল্প তা ধর্মবাদি এবং তাত্ত্বিক রাজনীতিতে নিখোঁজ হলেও নৃতাত্ত্বিক মিলন-মিথুন মূর্তি দেখলে বোঝা যায় যে গাঙ্গেয় রাড়ে বিচিত্র যৌনাচার গ্রহণিয় ছিল!বর্তমান প্রেক্ষাপটের ক্রিয়াপদগত অচলায়তন ভাংতে সেই মিথুনমুর্তিদের শিরোনামকেই নবায়ন করে নেয়া দরকার!
মোমের পুতুল:

হাজার বছরের জবরদস্তি চাপিয়ে দেবার পরে ল্যাটিন য্যামন ইয়োরোপের কথন থেকে অপসৃত, ভারতের চলমান বিভিন্ন কৃষ্টিতেও শাসকের অনুগ্রহ স্বত্বেও সংস্কৃত, পালি যাদুঘরের সামগ্রীতে পরিণত।রোমান সম্রাট কনস্টান্টিন খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের পর থেকে ভ্যাটিকানের পতাকাতলে জমায়েত খ্রিস্টীয় রাজন্যরা স্থানীও বিভিন্ন প্রাক-আধিদৈবিক-ধর্মের ওপর যে তাণ্ডব চালায় তার একটা সার্বজনীন লক্ষ্য ছিল,পাগান-নারী-পুরোহিত বা উইচদের খলনায়িকাতে অবমুল্যায়িত করে তাদের জীবন নাশ!পরে এই রিচ্যুয়াল পরিণত হয় যৌন আচরণের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপের স্পিরিচুয়্যালে।ইউরোপের এই তাণ্ডবই সভ্যতা সম্প্রসারণের নামে আমেরিকার সভ্যতাগুলোর বিনাশ ঘটায়।

আরবেরা একই প্রক্রিয়াতে আফ্রিকাতে একের পর এক কৌমের ভাষা, কৃষ্টি ঝাড়ে, বংশে উজাড় করে দেয়!স্পেনের ইসাবেলার হাতে এবং ভিয়েনার তোরণে পরাজয়ের পর আরবদের লক্ষ্য হয় মধ্য এশিয়া এবং ভারতের জনপদগুলো।লক্ষণীয় যে ইরানের প্রাচীন জেন্দাবেস্তা ধর্মকে সমাজচ্যুত, দেশচ্যুত করতে সামর্থ্য হলেও আগ্রাসী আরবেরা পার্সি ভাষা এবং সাহিত্যকে হঠাতে পারে নাই!খাইয়ামের রুবাই আচরিকভাবে নও-ইসলামি প্রবর্তনার বিরোধী হলেও ইরানিরা তার সংরক্ষণ করে নিষ্ঠার সাথেই।ইউরোপে খ্রিস্টান সভ্যতার সাথে রোমান এবং গ্রিক সভ্যতার কেবল প্রত্নতত্ত্বের সুত্রবধ্ব হলেও, প্রাক-ইসলামি রুবাই, শাহনামাকে ইরানিরা তাদের ভাষা, কৃষ্টির চলমান অংশীদার করে নে্য।

বাংলা ভাষার সৌভাগ্য যে এর প্রধান প্রাণপুরুষেরা বিভিন্ন সূত্রে বিদেশি সভ্যতা, সংস্কৃতিতে নির্জিত হবার সুযোগ পেয়েছিল।মাইকেল, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে যে সুযোগ এসেছে পারিবারিক প্রাচুর্যের সুবাদে, নজরুল সেই সুযোগ পেয়েছিল উপনিবেশিক সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে।দরিদ্র নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষা হয় ধর্মীও মাদরাসায়, জীবন শুরুতে পেষা ছিল মুয়াজ্জিনের।সামাজিক, ব্যক্তিক মনস্তত্বে নজরুল কতটা অসাম্প্রদায়িক ছিল তার যাপিত দৃষ্টান্ত স্ত্রী প্রমীলা সেনগুপ্তের সাথে তার আমৃত্যু বৈবাহিক জীবন!এই যাপন বিদেশি সংস্কৃতির আত্মীকৃত আহরণের বাংলা ভাষার ক্রিয়াপদে আত্মস্থ করে নিয়েছিল এবং কোন, কোন তুলনায় ফিরিয়েও এনেছিল হারানো কথ্যক, কথাকলির ছন্দঃ
‘মোমেরও পুতুল, মোমের দেশের মেয়ে নেচে যায়
বিহ্বল চঞ্চল পায়…”

খ্রিস্ট ধর্মের শত তাণ্ডবের পরও যেমন গ্রিক সমকামী নারী কবি শাপ্য’র দ্বিপ নিবাস লেসবোস থেকে লেসবিয়ানিজম ক্রিয়াপদ যোগ হয়েছে সর্বজনীনভাবে পশ্চিমের বিভিন্ন ভাষায়; সেরকম সুপ্ত চেতনা খননের পাশে ক্রিয়াপদের লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার এবং ক্রমাগত বিশ্বায়নের মাধ্যমে ‘মোমের পুতুল’দের ‘বিহ্বলতা’ও এক সময় কেটে যাবে সে-প্রত্যাশায়ঃ এ-নিবেদনের ইতি ঘটানোর আগে মনে করিয়ে দিতে চাই বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রাগ্রসর ক্রিয়াপদ ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটিকে!এর সাথে ‘মুক্তির বুদ্ধ্ব’ সহজ-সমিলের বিস্তার আরেক দিন, আরেক ক্ষনে!

তথ্যসুত্রঃ
১)চর্যাগীতি ঃ” হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
২)’প্রেম পুস্পহার, গজলে রায়হান ঃ রায়হান গায়েন
৩)আজম খান গান সংগ্রহ ঃ আজম খান
৪)বাংলাভাষা পরিচয় ঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫)বাঙ্গালির ইতিহাস, আদিপর্ব ঃ ডঃ নীহাররঞ্জন রায়
৬)বৃহৎবংগ ঃ দীনেশ চন্দ্র সেন
৭)গোর্খ বিজয় ঃ ডঃ পঞ্চানন মণ্ডল
৮)বাঙলা, বাঙালী ও বাঙ্গালীত্ব ঃ ডঃ আহমদ শরীফ
৯)মেগাস্থিনিস, টলেমী, মহেঞ্জোদারো, ওয়ারী বটেশ্বওয়ারঃ ওয়াইকিপিডিয়া
১০)অতীষ দীপঙ্কর পাঠ: ধরমশালা, দার্জিলিং, ভারত।ব্রিটিশ লাইব্রেরি, লন্ডন।কমলাপুর বৌদ্ধ্বরাজিক,ঢাকা।
১১)ক্ষনা, জীমূতবাহন,শাপ্য…ঃব্রিটিশ লাইব্রেরি নোট
১২)ক্ষনার প্রবচন, বিভিন্ন সূত্র
১৩)বাংলায় সুফি প্রভাব: বাংলা একাডেমী
১৪)নজরুল সংগ্রহ, বঙ্কিম রচনাবলী, রামমোহন সংগ্রহ
১৫)ব্রিটিশ কলোনির কাল্ট, অকাল্ট… ম্যাজিস্ট্রেট গেজেটিয়ার, ব্রিটিশ লাইব্রেরি

জুলাই-সেপ্টেম্বার/২০১২
ব্রিটানি, ফ্রান্স

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (২২) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Arun Roy — নভেম্বর ২৩, ২০১২ @ ৩:১৯ অপরাহ্ন

      খুবই সাহসি লেখা!প্রকাশকেরাও সাহস দেখিয়েছেন।আমি দিল্লির প্রবাসি বাঙ্গালি।বাংলা টাইপটা আসে না।আশা করি, তা ক্ষমাসুন্দরভাবে দেখবেন।বাংলা ভাষা নিয়ে আপনাদের ওদিকের (বাংলাদেশের) লেখা জানার সুযোগ পাই নি।এমেরিকার এক বন্ধুর রিকমেন্ডেশানে পড়লাম।অবাক হয়েছি।আমাদের দিককার লেখাগুলো হয় সংস্কৃত-নির্ভর, নয়ত কথিত আধুনিক মার্ক্সবাদি।বৌদ্ধিক অবদানগুলো চোখে পড়ে না।ধর্ম আর ডগমাকে কড়কাতে যেয়ে অব্জেক্টিভিটিটা ধরা ছিল।এটা খুব ভাল দেখিয়েছেন।এতে অনেক খানেই হয়ত বেশ ছড়াতে হয়েছে।জালটা অবস্য গোটানোই ছিল।আবার ফোবিয়াও এনেছেন।চিকিতসক হিশেবে এটা ভাল পেয়েছি।যৌনতাবোধক সব ক্রিয়াপদই সেই ছাত্রাবস্থা থেকে এতদিনের পেষায় বিদেশি শব্দই ব্যাবহার করছি!মিথুন মুর্তির ইশারাটা কাফি!সব মিলিয়ে যা অবস্থা তাতে লেখকদের পাঠকের চেয়ে অনেক পেছানো মনে হয়।এখান থেকে একটা পথ বাতলে উঠবে আশা করি।লেখককে আদাব।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন qudrat elahi — নভেম্বর ২৩, ২০১২ @ ৪:১৯ অপরাহ্ন

      ”মধ্যপ্রাচ্যের ইব্রাহিমি দর্শন থেকে আসা ইহুদীবাদ, খ্রিস্টধর্ম এবং,ইসলামে যেভাবে প্রাচীন সুমেরীয়, ব্যাবিলনিও দেবীদের উচ্ছেদ করে পুরুষের আদলে দেব-নাম জারি করেছে; বৈদিকেরাও লুটেরা ইন্দ্রকে দেবাদিদেব বানাতে স্থানীয় মনসা, বাসুলী’র অবমূল্যায়ন করেছে”
      ” পিতৃতান্ত্রিক ধমকের জের ধরে ক্রিয়া এবং ক্রিয়াপদের আবর্তনটা…”

      জনাব চয়ন, আমরা স্বামি-স্ত্রী দুজনেই মনোযোগ সহকারে পুরো লেখাটা পড়েছি।পরে আলোচনাও করেছি।আমার সাধারণ পাঠে আপনার অনেক ফুকাসের ভিতর মেইন ফুকাস মনে হয়েছে উপরের দুই জায়গা।আপনি অভিযোগ করেছেন এবং সেই অভিযোগ-কে জোর দিতে ”জারি” ”অবমূল্যায়ন” আর ”পিতৃতান্ত্রিক ধমকের জের” ব্যাবহার করেছেন।কিন্তু জনাব, আমি টেনিস খেলার ভক্ত, আপনি উইম্বলডনে গিয়ে দেখেন, সেখানে মেয়েরা
      কম সেট খেলে, প্রাইজ-মানিও কম পায়!এটা বৈষম্য হলেও, প্রয়োজন-ভিত্তিক।প্রাইজ মানি সমান করার অবশ্য একটা জোর দাবি বহাল আছে।লর্ডসের ক্রিকেট ক্লাবেও মেয়েদের স্থায়ী সদস্য করা হলো
      এই সেদিন।এটা খারাপ, ভাল সেই তর্ক করতে চাই না।ব্রিটিশের উদাহরণ দিলাম, কারণ তারা একসময় আমাদের শাসক ছিল।উদাহরণ দিলাম যে সবকিছু হয়ত আপনের কথামত ‘ধমকের জের” হিশাবে হয় নাই।আপনি ক্ষনা, সতীদাহ বলছেন।এগুলা ঠিক আছে।আমি পর্দাপ্রথার সমর্থক না।কিন্তু ব্রিটিশে এখনো মেয়ে-রানি গ্রহণ করলেও মেয়ে-বিশপ গ্রহণ করে নাই।মেয়ে-বিশপ, মেয়ে-মৌলানা গ্রহণ করতে আমার আপত্তি নাই।কিন্তু আপনি সমাজের প্রয়োজনের দিকটা একটু বেশি এড়ায়ে গেছেন।বই আকারে প্রকাশ করলে এই দিকে নজর দিবেন বলে আশা করি।কঠিন একটা লিখা, কিন্তু আপনি
      ভাল কাসুন্দি পাকিয়েছেন।রেসিপিটা মানবিক হিশাবে ভাল, সামাজিক হজমির দরকারটা আশা করি মনে রাখবেন।বাই দা বাই, আমি এবং আমার স্ত্রি আপনের কবিতা পড়ি।আমরা কোনরকম ধমক কি বড়
      আওয়াজও ছেলেমেয়েকে দেই না।মেয়েটা দেখি কি সব হিজাব শুরু করেছে।স্কুলের সাথিদের প্রভাব।কিন্তু ভাই সমাজ থেকেতো আমরা পালাতেও পারছিনা।ভাল থাকবেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Raekha Ehtesham Muller — নভেম্বর ২৩, ২০১২ @ ৫:২১ অপরাহ্ন

      হাই, চয়ন খায়রুল হাবিব, আপনার লেখাটি আমি ক্লাস মেটেরিয়াল হিশাবে ব্যবহার করতে চাই।আশা করি অনুমতি দেবেন।
      আমি জার্মান ও ইংরেজি লিঙ্গুইস্টের কাজ করি ইংল্যান্ড ও ডয়েচল্যান্ডে।আমার বাবা বাংলাদেশি, মা জার্মান।soas এ কয়েক বছর বাংলা অধ্যয়ন করেছি।
      soas এর একজন সহকর্মী এই লেখাটা দেখতে বলেছে।অনেক কিছু আমার আপডেট করে নিতে হবে, বিনা চর্চায় এবং বাবা আর না থাকাতে বাংলাতে একটু রাস্ট পড়েছে।ওরিয়েন্টাল, অক্সিডেন্টাল কমপারেটিভ টিউটোরিয়ালের জন্য আমরা মেটেরিয়াল খুজছিলাম।অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তার লেখার সাথে আমি পরিচিত।যোগাযোগ হলে আমি বাধিত থাকবো।ধন্যবাদসহ, রায়েখা এহতেশাম মুলার।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Monjurul Palash — নভেম্বর ২৩, ২০১২ @ ৭:৫৯ অপরাহ্ন

      অনেক রেফারেন্স যোগাড় করে সেগুলোকে পরস্পর-প্রাসঙ্গিক সংযুক্ত করা, আবার এর মধ্য দিয়ে আসল বক্তব্যটা বর্ণনা করতে পারা সহজ কাজ না! নিজের সতন্ত্র একটা গদ্য চালু রাখাও অনেক দক্ষতার ব্যপার! বাংলা ভাষার যে ব্যক্তিগত চর্চা চলছে তার একটা বিহিতের জন্যে সহযোগিতা করবে এই লেখা! খুব ভালো লেগেছে| চয়নের লেখা পাঠ করা সবসময় আনন্দের এবং প্রয়োজনের…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Farzana Sheikh — নভেম্বর ২৩, ২০১২ @ ৮:৫৮ অপরাহ্ন

      ”সমকামিতা, উভকামিতার প্রতি সাংস্কৃতিক ভিতিবোধ প্রায়শই ভারতীয় এবং বাঙালি মানসে ককুরভিতির রূপ নিয়েছে!আবারো স্মর্তব্য যে বাঙালি এক চর্যা রচয়িতার নাম ছিলো কুক্কুরিপাদাম, তার সঙ্গী কুকুরের প্রতি ভালবাসার প্রতীক হিসাবে!”…এটা একটা দুর্দান্ত পর্যবেক্ষন!অলিভার স্যাক্স প্রায়ই সামাজিক আচরনের সাথে ঐতিহাসিক নিঊরোলজি মিলিয়ে লেখে!এখানে তার ছায়াপাত দেখলাম।এই জায়গা থেকে হয়ত বাংলা ভাষাতে ভবিষ্যতে লেখালেখির একটা বিস্তারিত দিগন্ত খুলে যাবে।আরেকবার ধন্যবাদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taposh Gayen — নভেম্বর ২৪, ২০১২ @ ১১:০৬ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় চয়ন,
      এই পরিশ্রমী লেখাটির মধ্য দিয়ে আপনি পাঠককে নিয়ে বিশ্বের রূপদর্শনে বের হয়েছেন । এইজন্য শুরুতেই আপনাকে অভিনন্দন । এও বলে রাখি– পাঠকের উপর আপনার অগাধ আস্থা দেখে আমি মুগ্ধ ! আশাকরি, ভবিষ্যতে আপনি একগুচ্ছ প্রবন্ধে এই ভাবনাগুলোর বিস্তার রাখবেন এবং আমাদেরকে একটি অনবদ্য বই পড়ার সুযোগ দিবেন । অনেক শুভেচ্ছাসহ, তাপস/ নিউইয়র্ক ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৪, ২০১২ @ ৬:৩২ অপরাহ্ন

      @Arun Roy….সুজনেষু, প্রতিক্রিয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েকবার গিয়েছি, সময় নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছি।বাংলাদেশের বইপত্র আসলেই ভারতে পাওয়া যায় না, কোলকাতাতেও হাতে গোনা কিছু দোকানে, তাও অত্যল্প !বাংলাদেশে আকসার পশ্চিমবঙ্গের বই পাওয়া গেলেও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের লেখালেখি নিয়ে জানা যায় না!খোদ বাংলাদেশে বসে কেউ স্থানীয় সমকালীন লেখকদের নিয়ে জানতে চাইলে তাকেও নাকাল হতে হবে; সংবছরের বই মেলা বাদে বিতরণের অবস্থা অত্যন্ত আগোছালো এবং গোষ্ঠিনির্ভর!নিসন্দেহে লেনদেন এখন পাকিস্তান আমলের চেয়ে ভাল।ভারতীয়, বাংলাদেশি মার্ক্সবাদীরা যাদের নিজেদের ঘরানার লেখক/লেখিকা বলে চিহ্নিত করে তাদের বই আবার বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাতে বেশ অনুদিত হয়!এই কথিত-বামপন্থি-বিতরণটা খুবই একপেশে এবং এদের সত্যায়নের বদৌলতেই প্রচুর মৌলবাদী বইপত্রের একটা অস্বাস্থ্যকর লেনদেন পুরো উপমহাদেশ-জুড়ে বেশ
      রমরমাভাবে চলছে!

      নিজ পেষার সূত্রে পেশাগত বাংলা প্রতিশব্দের অভাবের কথা বলছিলেন।এটার পেছনে আমাদের কৌলীন্য অনেকাংশে দায়ী।বৈদ্য’রা কিন্তু পুরোটাই স্থানীও চলতি প্রতিশব্দ ব্যাবহার করে।হেকিমি প্রচল, তার পর ব্রিটিশের ড্যান্ডি-বাবু কালচার আমাদের অনেক প্রতিশব্দকে নবায়িত হতে দেয় নাই।আবার বাঙালি রেনেসার মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ এবং পরের সংগ্রামগুলো ধাপে ধাপে এই
      নবায়ন, আত্মীকৃত উন্নয়নের দিকেই গেছে।বৈদ্যকে হাতুড়ে বলে নাকচ করে দিলে, তার সাথে জড়িত শব্দও নাকচ হয়ে যায়।এদেরকে পদ্ধতিগতভাবে আধুনিক ব্যবস্থার সাথে জড়িত করা হলে এর থেকে গনায়নের একটা সূত্র তৈরি হতে পারতো।চরণামৃত, ফু দেয়া পানিপড়া এগুলোর জন্য সত্যজিৎ ‘জনতার শত্রু’ বানালেও আমাদের অবকাঠামো এখনোবিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে নাই।আবার দেখুন, এখন কিন্তু সবাই ডায়াবেটিস শব্দটা ব্যবহার করছে, ”বহুমূত্র” নয়!এটাকে ঠিক-বেঠিক তর্কে নেয়াটা সময়ের কাটাকে পিছিয়ে দেবে।তবে সচেতন হলে শব্দভাণ্ডার আরো বাড়ানো যায়, আরো ডাইনামিক করা যায়!দুই একাডেমীর সার্বজনীন ফন্ট ব্যাবহার এবং আনন্দবাজারকে তা ব্যাবহারে বাধ্য করা এ-বাবদে জরুরি।ভাল থাকুন।আপনাকেও আদাব।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৪, ২০১২ @ ৬:৫৯ অপরাহ্ন

      @qudrat elahi…. গেরস্থালীর শত ঝামেলাতেও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়ার জন্য ধন্যবাদ।আপনার মন্তব্যই বলে দিচ্ছে যে আমাদের অনেকের চেয়ে বেশি সামাজিক শর্ত ছাড়িয়ে যাবার সংগ্রাম আপনি জারি রেখেছেন।আপনার দেখার জায়গাটা খুবই ভ্যালিড।সামাজিক দিকটা নিয়ে মনোযোগী হবার পরামর্শ গ্রহণ করলাম।আমার তরফে অনুরোধ একটাই, তা হচ্ছে ”অভিযোগ” হিশেবে না
      দেখে ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ হিশেবে দেখারা!তাতেও মনে হ’লো যে আপনার ছাড় সামগ্রিক ইতিবাচকতার দিকেই!…পারিবারিক পাঠে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে আনন্দিত!পরিবারের সকলকে নিয়ে ভাল থাকবেন।ধন্যবাদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৪, ২০১২ @ ৭:১০ অপরাহ্ন

      @Raekha Ehtesham Muller…প্রিতিভাজনেষু, আপনাদের কাজে আসতে পেরেছি জেনে খুবই ভাল লেগেছে।সানন্দে অনুমতি দিলাম।আমার মেইল: choygypsy@yahoo.com.ভাল থাকুন।ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৪, ২০১২ @ ৭:৪৪ অপরাহ্ন

      @Monjurul Palash…প্রিয় পলাশ, ফিডব্যাকগুলা আসলেও জরুরি।এই লেখাটা শেষ করে প্রচণ্ড একটা ক্লান্তি এসেছে!
      ”বিহিত”…হা হা হা…তার চেয়ে যুক্ত থাকাটাই একটা আনন্দের!নিজের রেফারেন্স-নোঙ্গরও ঝালায় নেয়া আর কি!আন্তরিক ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৪, ২০১২ @ ৭:৪৮ অপরাহ্ন

      @Farzana Sheikh…সুজনেষু, ঠিকই ধরেছেন, নিউরোলজি আমাদের সাহিত্যে নেই বললেই চলে, ফলে চরিত্রায়নেও মাত্রিকতা কম। অলিভার স্যাক্স আমারও প্রিয় লেখক।প্রায় আশিতে পড়লো মনে হয়!এ-বছর প্রকাশিত ”হ্যালুসিনেশান’ টা পড়েছেন?পাঠ প্রতিক্রিয়ায় আন্তরিক ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৪, ২০১২ @ ৮:০৯ অপরাহ্ন

      @taposh gayen…প্রিয় তাপস, যাক আপনার দেখা মিল্ল!”’পাঠকের উপর অগাধ আস্থা” মনে হয় টলে যাচ্ছে, লেখকদেরওপর আস্থা আরো টলায়মান!নিজের উপর আস্থা নবায়নই মনে হয় ”রূপদর্শনের’ সাথে ক্রিয়াপদের ঝাকিদর্শনের অজুহাত!গদ্য চর্চা সাফাই না হয়ে কতটুকু রি-এনফোর্সমেন্ট হতে পারে তার সীমানাটা দেখাও একটা উদ্দেশ্য ছিল।

      আমার প্রবন্ধ সংগ্রহ দেখার ইচ্ছাটার প্রতিধ্বনি করে আমার একটা বাসনা তৈরি হলো, তা হচ্ছে রাজু একটা প্রবন্ধ সংগ্রহ সম্পাদনা করতে পারে কবিতা এবং ভাষা নিয়ে, তাতে আমরা অংশ নিলাম!এই অনুভূতিটা আমার ভাল লাগলো!আপনার সাড়া, সত্যিই ভাল লেগেছে।
      ভাল থাকবেন।আন্তরিক ধন্যবাদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বনি আমিন — নভেম্বর ২৫, ২০১২ @ ৭:৪০ পূর্বাহ্ন

      অনেকদিন পর একটা পাঠযোগ্য প্রবন্ধ পেলাম এ অনলাইন পত্রিকার আর্টস বিভাগে। ছাত্র জীবনে প্রবন্ধ পড়ার এক বাতিক ছিল যার অভাব বর্তমানে দু ক্ষেত্রেই। এর বর্ণনা কাঠামো আমাকে বেশি আকৃষ্ট করলো। আমি এটি আরো ভালোভাবে পড়বো তাই সেভ করে রাখলাম। তবে প্রতিক্রিয়াগুলো এবং লেখকের আবার তার ওপর প্রতিক্রিয়া - পুরো সবার পরিশ্রমটাই সার্থক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Farzana Sheikh — নভেম্বর ২৬, ২০১২ @ ৪:১৭ পূর্বাহ্ন

      @চয়ন …”হ্যালুসিনেশান” এখনো পড়া হয় নি।বেশ কিছু রিভিউ এবং এ-নিয়ে স্যাক্সের বিশাল এক সাক্ষাতকার কিছুদিন আগে পড়লাম!স্যাক্স সাহেব এখানে না কি মাদক নিয়ে তার প্রবল নিরীক্ষা এবং একসময়ের আসক্তি বলা ছাড়াও, আরো অনেক কিছু অকপটে বলেছে! অন্যের মন আর মগজের মুনশি, কিন্তু নিজের মনের গুমটি খুলতে পারলেন কেবল এই সাঝ বেলাতে এসে!…ওহ, আর্টস, বিডি কর্তৃপক্ষ আমার ”বার হাত কাকুরের তের হাত বিচি মার্কা” মন্তব্য দেখলাম অনেকটুকু ছেটে দিয়েছে!যাক এই অবসরে অলিভার স্যাক্স নিয়ে কমন গ্রাউন্ডে আসলাম অন্তত।তাই বা মন্দ কি!ভাল থাকুন।ধন্যবাদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Lubna Yasmin — নভেম্বর ২৬, ২০১২ @ ৫:৩৮ পূর্বাহ্ন

      …”বাংলাদেশের কথিত উন্নয়ন কর্মীদের যে নারীবাদ সেখানে ‘চেইন’ এবং ‘লিঙ্কের’ অর্থ গুলিয়ে ফেলায় যৌনাত্মক অনেক বিশ্বজনীন আচরণই অপব্যখ্যার অবকাশ পেয়েছে।…

      …মার্ক্সবাদী অনুশীলনে নারী, পুরুষের যৌন স্বাধীনতাকে পুঁজিবাদের অবক্ষয়ের সাথে মিলিয়ে সঙ্গমকে নিছক প্রজনন এবং শ্রম হিশাবে দেখানোর প্রয়াস নেয়া হয়েছে।”

      উন্নয়ন কর্মিদের নিতি নির্ধারক হিশেবে আমার মনে হয়েছে যে নারিবাদি লেখকদের বুর্জোয়াজি বলে একটা অপপ্রচার তৃতিয় বিশ্বে বেশ সফলভাবেই চালু আছে।

      ভার্গাস লোসা তার উপন্যাসে প্রমানসহ বলছে যে মার্ক্সের আগেই শিল্পি পল গগ্যার নানি ফ্লোরা ত্রিস্তান শ্রমিক রাজনিতি ইংল্যান্ড, ফ্রান্সে সংগঠিত করেছে এবং ওয়ার্কার্স ইন্টারন্যাশনালের প্রথম ক্রোড়পত্র ফ্লোরার লেখা।এই তথ্য মার্ক্স, এঙ্গেলস কখনো প্রকাশ করে নাই, যদিও প্যারিসের একই প্রেসে ফ্লোরার এবং মার্ক্সের লেখা ছাপানো হয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় নারীবাদী প্রবর্তনাকে বুর্জোয়া বলে দেখানোটা সহজ ছিল বোধ করি ফ্রান্স ভিয়েতনামে অফিয়াসিয়ালি এমেরিকার পক্ষে থাকায়। কিন্তু কামু, সিমন, সার্ত্রে প্রমুখেরা কিন্তু আলজিরিয়া, ভিয়েতনাম নিয়ে সক্রিয়ভাবেই সরকারি নীতির বিরোধিতা করেছে।।

      উপমহাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে মার্ক্সবাদি মহিলা-সংগঠকদের অনেকে অন্যন্যদের চেয়ে বেশি পিতৃতান্ত্রিক-আচরনে অভ্যস্ত!এতে কিন্তু গার্মেন্টস শিল্পের কর্মিরাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।আড়ং জাতিয় প্রতিষ্ঠানে অনেক রকম নিয়ম-নিতি মানা হচ্ছে।কিন্তু সেটাত গার্মেন্টস শিল্পের মুল আয়ের তুলনায় নিছক কস্মেটিক্স!গার্মেন্টস শিল্পে যখন অধিকারভিত্তিক আন্দোলন তৈরি হতে চাচ্ছে সরকার অনেক মহল ভাবছে এখানে ছাড় দিলে, সেটা সমাজতন্ত্রের দিকে চলে যাবে, আর মধ্যবিত্তরা ভাবছে এখানে কড়াকাড়ি না থাকলে অনাচারে দেশ ভরে যাবে।এই সুজোগটা নিচ্ছে কিন্তু মৌলবাদি এবং মার্ক্সবাদি দু’পক্ষ্যই।এই দু’পক্ষ্যই মানবিক অভিব্যাক্তিগুলোকে অভিধানের বাইরে এসে প্রকাশের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে!

      চয়ন, আপনি ক্রিয়াপদ নিয়ে যে-জায়গাটাতে যেতে চেয়েছেন, আমি হাতে কলমে সেখানে গিয়েছি।এই অভিব্যাক্তি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তৈরিও হয়ে গেছে, কিন্তু মিডিয়া, বিনোদন, সংস্কৃতিকে সেখানে যেতেই দেয়া হচ্ছে না।এরকম লেখার আরো দরকার আছে।ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৬, ২০১২ @ ৭:৪২ অপরাহ্ন

      @বনি আমিন …প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।”বর্ণনা কাঠামো”র সাথে যাতে বিষয়ের দাংগা না বাধে সেটাই বোধ করি সব লেখকের ভিতরগত উদ্বেগ!বিষয়ের পারম্পর্জের বেলাতে আমি একটা হেচকা-এবসার্ডিটি থেকে কাজ করি!আশা করি আপনার পাঠে তা বিঘ্ন ঘটায় নাই এবং দ্বিতীয় পাঠে যোগসূত্রগুলো আরো প্রকট হবে।।ভাল থাকবেন।

      @ফারজানা শেখ…ঐ ‘কমন গ্রাউন্ড’টাই আমাদের সৃজনশীল প্রতীতিকে সামনে এগিয়ে দেবে।সবসময় যে আমরা লক্ষ্যভেদী হই তা নয়; কিন্তু ঝুকি নিতে বাধা কোথায়?আপনিও ভাল থকুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — নভেম্বর ২৬, ২০১২ @ ৮:৪৬ অপরাহ্ন

      @Lubna Yasmin …যাদের কাছে মাঠকর্মিরা আসছে, সেই শিক্ষক-পরামর্শক-গবেষকেরা নিজেদের ক্ষমতায়নের স্টেটাস-কোতে ছাড় না দেয়াতেই বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।স্ট্যাটাস-কোর বাইরের লোকদের ‘প্রান্তিক’ বলে আগে থেকে ঠিক করা ছকে চরিত্রায়ন করা হচ্ছে।

      মার্ক্সবাদ প্রসঙ্গে আমি বিস্তারিত হই নাই এখানে।লক্ষ্য ছিল একাডেমীর বাইরের চলকগুলোর পারম্পর্যসুত্র যাচাই করা!

      মার্ক্সকে আসলে কখনোই ফেলে দেয়া যাবে না: ব্যাক্তির হাতে পুঁজি কুক্ষিগত বা বিকশিত হলে তা শ্রেণি বৈষম্য বাড়াতেই থাকে, এটা প্রায়োগিক সত্য…।
      আমার বিরোধের জায়গাটা(যদিও এই লেখাটার তা মুল প্রেমিস নয়) মার্ক্সবাদীদের আক্ষরিক ভাবে জবরদস্তি প্রয়োগের দিক এবং ব্যাক্তি-স্বাধীনতাকে বুর্জোয়াজি বলে প্রচারণার সাথে।এদিকটাও দেখতে হবে যে ঐতিহাসিকভাবে সামন্ত ব্যবস্থাগুলার অবশেষের ওপর যে শিল্প-বিপ্লব; তা থেকে যে ব্যাক্তি পূঁজির বিকাশ; তার উৎকট বৈষম্যের ভেতরেই মার্ক্স, এঙ্গেলসদের জন্ম,
      বিকাশ।তাদের আগে অব্দি শিল্পীরা রাজা, রাজরা, নিস্বর্গ, ধর্মীও অনুষঙ্গ ছাড়া সাধারণ মানুষের ছবি আকতোনা।সেসব পরিপ্রেক্ষিত মিলায়ে মার্ক্সের নির্দেশনাগুলো অবশ্যই বৈপ্লবিক।

      আবার মার্ক্সের জন্ম জার্মানিতে; যেখানে সে অব্দি কোন সামাজিক বিপ্লব হয় নি! উপনিবেশবাদি প্রতিক্রিয়ার মধ্যমণি ইংল্যান্ডে বেশির ভাগ সময় কাটানোতে মার্ক্সের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ফরাসি ডিস্কোর্স্কে এড়িয়ে গেছে!মার্ক্সের প্রায়োগিক চর্চাকারি রাশিয়া আজকে মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত; মার্ক্সের প্রধান পর্যবেক্ষণের জন্মস্থান জার্মানি পুব/পশ্চিমের মেলবন্ধন বলতে বুঝেছে মুদ্রামান-নির্ভর বাজার ব্যবস্থা!এদিকে ফ্রান্স কিন্তু তার বিপ্লবোত্তর শ্রমিক-ইউনিয়ন-ভিত্তিক ডাইনামিজমের নিরীক্ষা এখনো বজায় রেখেছে!এক্ষণ ফ্রান্সে মুল রাজনৈতিক শক্তি সমাজতান্ত্রিক দল; এই আজকে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে মিত্যালের কর্পোরেট-সনদ তারা কেড়ে নেবে এবং ইস্পাত-শিল্পকে আবারো জাতীয়করণ করবে।ফরাসি সমাজতন্ত্রীদের সাথে মার্ক্সের বিরোধ সেই প্রথম আন্তর্জাতিক থেকে।মুক্ত বাজারে থেকেও ফরাসি শ্রমিক এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়াদের দলে; এখানে মুদ্রামান-নির্ভরতার বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামাজিক-সমানাধিকারকে মুল ভিত্তি করা হয়েছে।কিন্তু আবার এর ব্যতিক্রম আছে; মোনাকোররাজ পরিবার এবং তার অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও মেনে নেয়া হয়েছে।সেখানে আবার ভোটাভোটিতে জনতা তাদের এই রাজ পরিবারকে কর দিতেই বার বার সম্মত হচ্ছে, বিদঘুটে বটে!

      লুবনা, আপনার এ-দেখাটা খুব তাতপর্জবহ যে যারা সাধারণকে ক্ষমতায়িত করবে, তারাই আচরণে বেশি পিতৃতান্ত্রিক।লেখা আসলে অনেক হয়েছে, হচ্ছেও, হবেও।কিন্তু মহাঝাকুনিটা মাঠেই ঘটবে!
      ভাল থাকবেন।আন্তুরিক ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাজল শাহনেওয়াজ — নভেম্বর ২৬, ২০১২ @ ৮:৪৮ অপরাহ্ন

      চয়নের ব্যাপক-বিশাল-বিষয় গিলে খাবার নীল তিমির চেষ্টায় পুলকিত হইলাম, মোহিত হইলাম আগ্রহের আতিশয্যে!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন kamruzzman Jahangir — নভেম্বর ২৬, ২০১২ @ ১০:৩১ অপরাহ্ন

      লেখাটি পড়লাম। অনেককিছুরই সমাহার। আলাদা করে-করে লিখলে একটু আরাম নিয়ে পড়া যেত। ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mesbah Alam Arghya — নভেম্বর ২৯, ২০১২ @ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

      বার পড়েছি লেখাটা। নানা অংশ নানা ভাবনা তৈরি করে। আবার সব মিলিয়ে একটা বিশাল ভাবনার রান্নাঘর। লেখকের নিজস্ব রান্নাঘর। পাঠক হিসাবে আমি সেই ভাবনা পুরোপুরি নিজের ভিতর ধারণ করতে পারি কিনা জানিনা। তবে এইটা নিশ্চিত যে রান্নার গন্ধে থমকে দাঁড়াতে হয়, আর কিছু নতুন ভাবনার আনাজপাতি আমার পাকঘরেও চালান হয়ে যায়। তবে এইটাতে সময় লাগে। এই নিবন্ধটি মনে হয় পাঠকের কাছে সময় দাবী করে। বিরাট সময়ের নানা অনুষংগের ব্যপারে আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। আর এই আগ্রহ যে জাগিয়ে তুলছে - সে একটা নিছক শব্দ নিয়ে হোক, কিংবা একটা বিতর্কসাপেক্ষ জটিল ঐতিহাসিক অভিভাব - ওই আগ্রহর তৈরি হয়ে ওঠাটাই আমার কাছে সবচে কাজের জিনিস বলে মনে হয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Choyon Kahirul Habib — december ১, ২০১২ @ ১১:০৪ অপরাহ্ন

      @কাজল শাহনেওয়াজ….হাহ হা হা…নীল তিমিদের সাথে তাদের অভ্যাসগুলাও লোপ পাবার পথে!এজন্য ”’আতিশয্য” মনে হতে পারে!আসলে পটকা মাছদের প্রিটেনশানের বিপরিতে পুটি মাছদের খুটে তোলা শব্দগুলার মামলা!ভাল থাকুন।ধন্যবাদ।

      @kamruzzman Jahangir…সাড়া দেবার জন্যতো বটেই, ‘ব্যারাম’ স্বিকার করে সাড়া দেবার জন্যও আন্তরিক ধন্যবাদ!ভাল থাকবেন।

      @ Mesbah Alam Arghya…রাশিয়ান সেই বাবুস্কা পুতুলার মত!বড়টার ভেতর ছোটটা, ছোটটার পরতে, পরতে বড়টা!কে কতটুকু করছি তা আর আমরা জানি না, কিন্তু আরেকজনের করাটার সম্পুরক হয়ে যাচ্ছি প্রত্যেকবারের একক স্পন্দনে!আন্তরিক ধন্যবাদ।ভাল থাকুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Magdaline Costa — জানুয়ারি ১২, ২০১৩ @ ৯:৪২ পূর্বাহ্ন

      লেখাটা কয়েকবার পড়লাম। খুব ভালো লেগেছে। আত্মস্থ করতে সময় লাগবে। অনেক ধন্যবাদ @Choyon

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 

মাউস ক্লিকে বাংলা লেখার জন্য ত্রিভুজ প্যাড-এর 'ভার্চুয়াল কীবোর্ড' ব্যবহার করুন


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com