‘হে উৎসব’ কেন বাংলা একাডেমীতে?
আমরা কয়েকজন মিলে এবারের ‘হে উৎসব’-এর বিরোধিতা করেছি। বিরোধের কারণ অন্য ভাষার উৎসব বাংলা একাডেমীতে হচ্ছে এর জন্য নয়। বাংলা একাডেমী চত্বরে অন্য ভাষার বই বিক্রি হবে। অন্য ভাষার লেখক আসবেন। তাদের নিয়ে আলোচনা হবে অন্য ভাষার বই অনূদিত হবে। বাংলা বা অন্য ভাষায় অনূদিত হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে–এর বিপক্ষে দাঁড়ানোর মানুষ আমরা নই। তবে এই আয়োজন বাংলা একাডেমীকে করতে হবে। এর জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কেন? ব্রিটিশ ইংরেজদের হে উৎসব নয়, আমরা চাই আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব হোক বাংলা একাডেমীতে। আমি ব্যক্তিগতভাবে শ্রাবণ প্রকাশনীর প্রকাশক হিসেবে বিশ্বের সেরা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় জার্মান সরকারের আমন্ত্রণে ২০০৭-২০০৮ ও ২০০৯ সালে পরপর তিনবার অংশ নিয়েছি। বিশ্বসাহিত্য বইয়ের বাজার অনেক খ্যাতিমান লেখক সাহিত্যিকের বক্তব্য শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাসের সঙ্গে বেশ কিছু সময় কাটিয়েছি। তুর্কি কথাশিল্পী ওরহান পামুক সম্পর্কে জানা শোনা ছিল আমার। তাঁর ইস্তাবুল উপন্যাস আমার পড়া থাকায় তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করি। প্রায় ৪০ মিনিট ওরহান পামুক তার উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ হওয়া, নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিষয়ে বক্তব্য রাখেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায়। ইস্তাম্বুল উপন্যাসটি ওরহান পামুক তার মাতৃভাষায় লেখেন। এই উপন্যাসের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য ইংরেজি অনুবাদককে ৮০% কৃতিত্ব দিয়ে ওরহান পামুক কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন। আন্তর্জাতিক আসর মানে ইংরেজি ভাষার হই হই রব নয়, পৃথিবীর অনেক ভাষা যদি প্রতিনিধিত্ব করে তখনই কেবল তাকে আন্তর্জাতিক বলা যাবে। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় আরবি ভাষা, স্পানিস, জার্মান, ল্যাটিন, ফরাসী, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুষ্ঠান হয়। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জার্মান চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেলকে জার্মান ভাষায় বক্তব্য রাখতে দেখলে এ দেশের ব্রিটিশ হতে চাওয়া, মেরুদণ্ডহীন ইংরেজি জানা অধ্যাপকরা হয়তো তাকে অশিক্ষিত, মূর্খ বলে প্রচার করতেন। এঞ্জেলা মার্কেল থেকে শুরু করে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জার্মান সংস্কৃতি মন্ত্রী, ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার চেয়ারম্যান সকলেই তার মাতৃভাষায় বক্তব্য রাখছিলেন। এক ঝাক ইন্টারপ্রেটার তাদের বক্তব্য ইংরেজি থেকে স্প্যানিস, স্প্যানিস থেকে ইংরেজি, চীনা ভাষা থেকে ইংরেজি করে সবার জন্য শোনাচ্ছেন। এর নাম আন্তর্জাতিকতা। এর নাম জাতীয়তা, এর নাম শিকড়ে থাকা সাহিত্য।
এই গল্প আপনাদের শোনালাম যে কারণে তাহলো সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘হে উৎসব’ আয়োজন করে জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী তার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আন্তর্জাতিক সাহিত্য আসরের নামে তিনটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলা একাডেমী তার অর্জনের সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করেছি শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষার এজেন্ট সাহিত্য হে উৎসবের নয়, বরং কর্পোরেট সাহিত্য চর্চারও আমরা মেনে নিতে চাইনি। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের তিন লেখক আনিসুল হক, কাজী আনিস, তাহমিমা আনামের ‘সাহিত্যে কৃতির’ আয়োজনে, প্রচারে ও প্রসারে বাংলা একাডেমীকে জড়িয়েছেন। ট্রান্সকম গ্রুপ-জ্যামকন গ্রুপের ছেলেমেয়েরা এবং একটি বিশেষ পত্রিকার একজন লেখকের জন্য এতো বিশাল আয়োজনে জনগণের সম্পদ-জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী কেন যুক্ত হবে? বাংলা একাডেমীর শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহার করা হয়েছে (ত্রয়ী) সাহিত্যিক বন্দনার জন্য, বাংলা একাডেমীকে হে উৎসবের নামে অপব্যবহার করার জন্য। ঐ প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের অপসারণ দাবি করা অযৌক্তিক নয়।
হে উৎসবের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ বেনিয়া পৃথিবীর ছোট ছোট ভাষার রচিত সাহিত্যকে ধ্বংসের নতুন চক্রান্ত করছে। সারা পৃথিবীতে এই উৎসবের বিরোধিতা হয়েছে। একটি দেশের জাতীয় ভাষায় রচিত সাহিত্যের অবমূল্যায়ন করে ওই ভূখণ্ডের শিকড় ছাড়া ইংরেজি ভাষার গুটিকয়েক লেখকদের নিয়ে আয়োজিত হে উৎসবে মূলত মাতৃভাষার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা ছড়ানো হয়। ক্ষুদ্র ভাষার প্রবহমানতাকে নষ্ট করার এই আয়োজন আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যের কর্পোরেট মহাজন ট্রান্সকম গ্রুপের তত্ত্বাবধানে সুশীলদের আয়োজনের সাথে দেশের মূলধারার সাহিত্যের কোনো যোগাযোগ নেই। নেই জাতীয় অর্জন। একজন বিক্রম শেঠের কাছে নতজানু হয়ে বসে থাকা দেশের প্রথম সারির লেখকদের দেখে সত্যিই ব্যথিত হয়েছি। বাংলাদেশের সাহিত্য বাংলা ভাষার লেখকদের সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য বাংলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বইটি বরং, অনুবাদ করে বাংলা একাডেমীতে ছাপার কথা, বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ বইগুলো ইংরেজি করার কথা। এক সময় বাংলায় একাডেমী থেকে অসংখ্য ভালো অনুবাদ বই প্রকাশিত হতো। এখন এসব কেবলই স্মৃতি, কেবলই ইতিহাস। গত দুই দশকে বাংলা একাডেমী নিম্নমানের বই প্রকাশের রেকর্ড গড়েছে। আর এসব ব্যর্থতা ঢাকতে বইমেলা, সাহিত্য মেলা, হে উৎসবের নামে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে এক ধরনের বিকৃত মজা লুটছে। বাংলা একাডেমী পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্য একাডেমীর চেয়ে স্বতন্ত্র। তার কারণ এর জন্ম হয়েছে ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। বাংলা ভাষাকে হে উৎসবে দরিদ্রভাষা হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য এর জন্ম হয়নি বাংলা ভাষার শিকড় ছাড়া ইংরেজি লেখকদের কর্পোরেটগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের টাকার বিনিময়ে দেশের জনগণের সামনে সাহিত্যিক বানানোর জন্য আমাদের বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা হয়নি।
শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক এই কর্পোরেটদের ভিন্ন ভিন্ন পুরস্কার রয়েছে। সাহিত্যের ভিন্ন শাখায় তারা সাহিত্যের প্রবীণ পুরস্কার-সাহিত্যের তরুণ পুরস্কার দিয়ে মূলত শিল্প সাহিত্যকে কারওয়ান বাজারের পণ্যে পরিণত করছে। তরুণ লেখকদের বিভ্রান্ত করছে, তার অর্জন সংগ্রামের সব পথ বন্ধ করে টাকার বিনিময়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের দাসে পরিণত করছে। এই চক্রের হাত থেকে আমাদের শিল্প সাহিত্যকে বাঁচাতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই অন্ধকারের বিরোধিতা করা জরুরি। আগামীতেও এসবের বিরোধিতা করতে হবে।


একমাত্র একুশে বইমেলা ছাড়া বাংলা সাহিত্য বিকাশে বাংলা একাডেমী সারা বছর কোন কাজ করে বলে দৃষ্টিগোচর হয় না। সাহিত্যের নাই কোন পৃষ্ঠোপোষকতা, নাই প্রচার, নাই তরুণ লেখকদের জন্য সামান্য প্লাটফর্ম। জাতির স্বনামধন্য একটা প্রতিষ্ঠান এখন আর চারটা সরকারী প্রতিষ্ঠানেরই মতো অকেজো হয়ে পড়ছে। লেখকদের পরিচিতি এখন লেখাতে নয় বরং মিডিয়া, টক শো আর বাণিজ্যিকরণে।
শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক এই কর্পোরেটদের ভিন্ন ভিন্ন পুরস্কার রয়েছে। সাহিত্যের ভিন্ন শাখায় তারা সাহিত্যের প্রবীণ পুরস্কার-সাহিত্যের তরুণ পুরস্কার দিয়ে মূলত শিল্প সাহিত্যকে কারওয়ান বাজারের পণ্যে পরিণত করছে। তরুণ লেখকদের বিভ্রান্ত করছে, তার অর্জন সংগ্রামের সব পথ বন্ধ করে টাকার বিনিময়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের দাসে পরিণত করছে। এই চক্রের হাত থেকে আমাদের শিল্প সাহিত্যকে বাঁচাতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
এই চক্রের হাত থেকে আমাদের শিল্প সাহিত্যকে বাঁচাতে না পারলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই অন্ধকারের বিরোধিতা করা জরুরি।
এই যেন পূর্ব পাকিস্তান আমলে ধর্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বাঙালি চিত্র শিল্পিদের মার্কিন মুল্লুকে বিমূর্ত চিত্রকলার শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্যে বৃত্তি প্রধান ! যেহেতু আমাদের একান্ত ঘরের শিল্পে মূর্তায়নের অনুষঙ্গগুলি তদানীন্তন পাকিস্তানি সরকারী ইসলাম অনুমোদন প্রধান করে না! আমার এই সত্যায়িত বক্তব্যের আলোকে আমি ‘হে’বা হেই ফেস্টিভ্যাল’কে দেখি তদ্রূপ ! পার্থক্য হল তা এখন ঘরের দরজায় বৃত্তি নিয়ে যেন ঢোকা দিয়ে গেলো! তা বলে বর্ধমান হাউসে? আমাদের সাহিত্য কে গ্লোবাল নেটওয়ার্কে আনতে হবে অর্থাৎ মার্কিনী আধুনিক আবস্ট্রাকশন এর মতোন বিমূর্ত আর্ট ফর্মে আসতে হবে! আহা কি আন্তর্জাতিক হওয়ার কি পরাকাষ্ঠা ! আমাদের কি চিত্রকলা, কি সাহিত্য এই বাংলার মাটি থেকে এই বাংলার বর্ণনাক্রম থেকে, এই কথ্যভঙ্গি থেকে, এই যাত্রা থেকে, এই প্রাচীন পুরাণ থেকে, এই লোকাচার থেকে, এই লোক সংগীত থেকে এই সমকালীন থেকে উঠে আসবে, তা এই মাটিতে প্রোথিত ! পশ্চিমের বাজার ধরার তাগিদে যদি সাহিত্য হয়, তাহলে তো দস্তেয়েভস্কি, তলস্তয়, গুন্টার গ্রাস, তানিযাকী, সুসাকো এন্ডো, মার্কেজ, কার্পেন্তিয়ার, মাচ্চা দ্যু আসিস, খুয়ান গোইতিসলো, পেসাওয়া, পামূক, মুকারামি, ইলিয়াস কউরি, তাহের বেন যেল্লুন, আব্দুর রাহমান মুনিফ, কোর্তাজার, এই নাম গুলোর বিস্তৃতি হতো না ! এই নাম গুলো আমাদের শ্রদ্ধেয় শামসুজ্জামান ও জানেন , আমরাও জানি! তারা যা দিয়েছে তা কি অ্যাংলো এন্ডিয়ান সাহিত্য দিতে পেরেছে কিছু মুষ্টিমেয় অমিতাভ ঘোষ ছাড়া ! কিন্তু তা সত্ত্বে ও বুঝতে পারছিনা কি করে বাণিজ্য কুবের’দের সহযোগে বাইরের প্রতিষ্ঠান ঘরের চাবি খুলে দিলো!
সুহৃদ,
আপনার সুলিখিত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আমার নিজের তো বটেই। আফসোস হচ্ছে এই ভেবে যে, আমাদের বাংলা জর্নালের আসন্ন সংখ্যার বিষয় “বাংলায় পুনরুপিনবেশায়ন” অর্থাৎ বাঙালির ইংরেজিয়ানা নিয়ে লেখার জন্য আপনাকে কেন বলতে পারলাম না।
প্রীতি জানিয়ে,
ইকবাল করিম হাসনু
টরন্টো, কানাডা
প্রিয় রবিন ভাই,
এই চক্রের (নব্য East-India Company) হাত থেকে আমাদের শিল্প সাহিত্যকে বাঁচাতে আপনার প্রতিবাদের মিছিলে আমরাও থাকব সবসময়।
জয় মানুষ।
ধন্যবাদ রবীন, আরো কিছু তথ্য জানান দে’য়ার জন্য। প্রতিবাদ আরো উচ্চকিত হোক। ঘুম কাতুরে বাঙ্গালীর ঘুমের রাজ্যে আপনাদের মত অগ্রসর চিন্তক-সমাজ যেভাবে এগিয়ে এসছেন, আশা করি ( আশা করতে দোষ নেই) ঘুম ভাঙ্গবে।
যৌক্তিক বক্তব্য। চমৎকার লেখনির জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।
robin vhai apnar lekhar sathe amio ekmot. Amra chaina bangla ekademite onno vhasar boi othoba onno vhasar lekhokder niey somalochona hok. Thank u brother.