হে উৎসব : একটি আয়োজন ও জানা-অজানা প্রশ্ন

খন্দকার সোহেল | ১৯ নভেম্বর ২০১২ ১:২৮ অপরাহ্ন

সম্প্রতি শেষ হলো হে উৎসব। এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন সাহিত্যে আমাদের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল হে উৎসবে যাবার। ব্রিটিশ কাউন্সিলের কড়া নিরাপত্তা বেস্টনীর ভেতরে ভাব-গম্ভীর পরিবেশের বদলে মধ্যবিত্ত বাঙালির চিরচেনা বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বরে আয়োজন করা হয়েছিল এই উৎসব। ভাগ্য সহায় ছিল, একাডেমিতে প্রবেশের উপর তেমন কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। বাংলা একাডেমীর পুরো চত্বরটিকেই উৎসব চত্বর বানানো হয়েছিল। একাডেমীর বর্ধমান হাউস, বিক্রয়কেন্দ্র, নতুন ভবন, প্রশাসনিক ভবনের ইট-পাথরের বিল্ডিংগুলোর মাঝে সবুজ চত্বর জুড়ে ছড়ানো-ছিটানো বাঁশ-বেত-খড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট ছাউনিঘর। ঘরগুলোতে লাগানো কয়েকটি ব্যানার দেখার চেষ্টা করলাম। প্রথমা, অমনি বুকস, ডেইলী স্টার, কাজি এন্ড কাজি টি, ইউপিএল, যাত্রিক…। দু-একজনকে টিপ্পনী দিতেও শোনা গেল: বাহ্ বাহ্, ঠিক যেন চত্বর জুড়ে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কতিপয় ব্রিটিশ উপনিবেশ!

বিচ্ছিন্নভাবে উৎসব সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করলাম উৎসবে আসা নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে। তাদের মন্তব্য ছিল এরকম: বিশ্বের বিখ্যাত বিখ্যাত সব ইংরেজি ভাষার লেখক-কবি-সাহিত্যিকরা এসেছেন এই উৎসবে। আমাদের দেশের সাহিত্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার এই আয়োজন একটি সুবর্ণসুযোগ বলেই মনে করছেন তারা। তাদের কাছেই জানা গেল, আমাদের দেশের তাহমিমা আনাম আর কাজী আনিসের খোঁজ তো আপনারা রাখেন না। আন্তর্জাতিকভাবে এরা বাংলাদেশের সাহিত্যকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরছেন। তারা আশাবাদী এদের হাত ধরেই হয়তো বাংলাদেশে আসবে বুকার কিংবা নোবেল পুরস্কার।

হে উৎসব নিয়ে ট্রান্সকম গ্রুপ এ্যান্ড গং যে পরিমান প্রচার-প্রপাগাণ্ডায় নেমেছেন তার উদ্দেশ্যটা খুঁজে পেতে চাচ্ছিলাম। মনে পড়ে গেল গত ঈদুল আযহার আগে রাজধানীর পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে ‘ঈদ বই উৎসব’ শীর্ষক একটি বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় অংশ নিয়েছিল অনন্যা, অন্যপ্রকাশ, আগামী প্রকাশনী, সময় প্রকাশন, ঐতিহ্য, কাকলী প্রকাশনী, অ্যাডর্ন, পাঠক সমাবেশ, র‌্যামন পাবলিশার্স, সূচিপত্রসহ দেশের প্রথমসারির ২৬টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। সাতদিনব্যাপী এই বইমেলার মূল উদ্দেশ্য ছিলো ঈদের মতো বড় উৎসবগুলোতে বইও হোক ঈদ আনন্দের সঙ্গী। শুধু বইমেলাই নয় আয়োজনে ছিল তরুণ ও নবীনদের জন্য লিখন-পঠন কর্মশালা, কবিতাসন্ধ্যা, লেখক-প্রকাশক-পাঠক ভাবনাবিনিময়, ছড়াপাঠ, শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কনসহ আরও নানান আয়োজন। গভীর হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, বদলে দাও বদলে যাও স্লোগানধারী প্রথম আলোর সংস্কৃতি পাতায় একটি শব্দও ছাপা হয়নি এই বইমেলা সম্পর্কে। অথচ ২৫ বছর আগের সুদূর যুক্তরাজ্যের একটি শহরের একটি বইমেলাকে কেন্দ্র করে আজকে এই হৈচৈ… এর কারণ তাই আমাদের কাছে অজানাই রয়ে গেলো।

অনেকের মতো একটি প্রশ্ন আমারও। সুদূর ব্রিটেন থেকে উড়ে আসা এই মেলা বাংলা একাডেমীতেই কেন? আমাদেরও তো ইচ্ছা হয় বাংলা একাডেমীতে বইমেলা করার? একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে স্টল পাবার জন্য যে পরিমান কাঠ-খড় পোড়াতে হয় বাংলাদেশের প্রকাশকদের, তা প্রকাশকমাত্রই জানেন। অনেক প্রকাশককে হা-পিত্যেস করে বাধ্য হয়েই মেলা করতে হয়। অনেক প্রকাশক-সংগঠককে বলতে শুনেছি, বার বার উদ্যোগ নেয়া সত্ত্বেও একুশে বইমেলার বাইরে স্বতন্ত্র একটি বইমেলা করার জন্য বাংলা একাডেমী চত্বর ব্যবহারের কোনো অনুমতি বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ কাউকে দেয় নাই। অথচ প্রথম আলো-ডেইলী স্টারের বেলায়? প্রথম আলো যেভাবে বাংলা একাডেমীকে গ্রাস করে চলেছে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রচারমাধ্যমগুলোর কাছে একটি দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীমহল যখন মাথা বিকিয়ে বসে থাকেন তখন আম-জনতার আর কিছুই বলার থাকে না।

গণমাধ্যমের তকমা এঁটে প্রথম আলো-ডেইলী স্টার-এবিসি রেডিও-সাপ্তাহিক ২০০০-এর মতো প্রচারমাধ্যমগুলো আজ গণমানুষের পরিবর্তে নিজস্ব করপোরেট পুঁজির বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পিৎজা হাট আর কেএফসির আলো-ঝলমলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের চার দেয়ালে বন্দি করে মুক্ত সংস্কৃতিচর্চার হাত থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে আমাদের নতুন প্রজন্মকে। হাতিয়ে নিচ্ছে প্রচুর অর্থ। আর এই অর্থের পাহাড়সম উচ্চতায় বসে দেশের স্বপ্ন, সাহস আর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলা মানুষদের স্বপ্ন, কল্পনাগুলো দুমড়ে-মুচড়ে সেখানে তারা রচনা করে চলেছেন তাদের বন্ধ-দরজার ভেতরে নিরন্তর চালিয়ে যাওয়া গুমোট সংস্কৃতিচর্চার নয়া নয়া অধ্যায়।

এবারের হে উৎসবের বাস্তবায়নকে অনেকে চিহ্নিত করেছেন দেশি বোতলে বিদেশি মদের সঙ্গে। গতবছর ভিনদেশী একটি সংস্কৃতিকে বাজারজাত করতে গিয়ে প্রথম আলো গং যেসব ভুল করেছিল তা থেকে এবার উৎরাতে পেরেছেন অনেকটাই। দেশীয় লেখকদের সম্পৃক্ত করেছেন, বাংলা একাডেমীকে করায়ত্ত করেছেন। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক তো আনন্দে উদ্বেলিত। এরইমধ্যে তিনি নাকি ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিবছর এই উৎসব উদযাপনের। বাড়তি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান। অনুপ্রেরক হিসেবে কাজ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ।

শাহযাদ ফিরদাউসের ‘ব্যাস’ উপন্যাসের একটি জায়গায় পড়েছিলাম ‘সৃজনশীল হলেন সেই ব্যক্তি যার দু’পা মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ মাটি থেকে জারিত রস থেকেই সৃষ্টি হয় শিল্প। হাজার বছরের বয়ে চলা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে এই সৃজনশীলতার ছাপ। মাটির সঙ্গে লড়াই করে অত্যন্ত শিল্পকুশলতায় কৃষক তার শ্রম আর ঘামে উৎপাদন করেন ফসল। তাই কৃষকই হলেন প্রকৃত শিল্পী। আর এই শিল্পমহিমায় উদ্ভাসিত কিছু সৃজনশীল মানুষ তাই শিল্পসন্ধানে চষে বেড়িয়েছেন পথ থেকে পথে, মাঠ-ঘাট, বন-বাদাড়ে। শিকড়সংশ্লিষ্ট সেইসব নান্দনিক মানুষরাই একসময় হয়ে উঠেছিলেন লালন, হাসন, এস. এম. সুলতান, সেলিম আল দীন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাঙালির সমৃদ্ধ সাহিত্যসুষমার গণ্ডিকে অস্বীকার করে, অবজ্ঞা করে হুট করে ধার করা পাশ্চাত্য-ব্রিটিশ বুর্জোয়াদের এইসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘হে’ উৎসব আপাতদৃষ্টিতে সফল মনে হলেও আদতেই এর কোনো ফসল ঘরে তুলতে পারবে না ট্রান্সকম প্রচারবাদীরা–এটি আমাদের বিশ্বাস। একটি ধ্বংস থেকেই নতুন প্রাণের তাগিদ তৈরি হয়। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-অর্থনীতি কিংবা রাজনীতির বর্তমান ধ্বংসস্তুপ থেকেই নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে– এই আশাবাদ আমরা তাই লালন করি প্রতিনিয়ত।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (৬) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ahmad basir — নভেম্বর ১৯, ২০১২ @ ৪:০৩ অপরাহ্ন

      গণমাধ্যমের তকমা এঁটে প্রথম আলো-ডেইলী স্টার-এবিসি রেডিও-সাপ্তাহিক ২০০০-এর মতো প্রচারমাধ্যমগুলো আজ গণমানুষের পরিবর্তে নিজস্ব করপোরেট পুঁজির বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। পিৎজা হাট আর কেএফসির আলো-ঝলমলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের চার দেয়ালে বন্দি করে মুক্ত সংস্কৃতিচর্চার হাত থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে আমাদের নতুন প্রজন্মকে। হাতিয়ে নিচ্ছে প্রচুর অর্থ। আর এই অর্থের পাহাড়সম উচ্চতায় বসে দেশের স্বপ্ন, সাহস আর প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলা মানুষদের স্বপ্ন, কল্পনাগুলো দুমড়ে-মুচড়ে সেখানে তারা রচনা করে চলেছেন তাদের বন্ধ-দরজার ভেতরে নিরন্তর চালিয়ে যাওয়া গুমোট সংস্কৃতিচর্চার নয়া নয়া অধ্যায়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shaheen — নভেম্বর ১৯, ২০১২ @ ৫:১৯ অপরাহ্ন

      লেখাটি পড়ে ভালোই লাগল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলমগীর ফরিদুল হক — নভেম্বর ১৯, ২০১২ @ ৬:০৯ অপরাহ্ন

      আশ্চর্য হবার কিছু নেই! আমাদের উপমহাদেশে মনোজগতের উপনিবেশবাদ ত্যাগ করবে কি করে, পশ্চিমের কানাকড়িতে বাঙ্গালীর লেখ্য সাহিত্যের যদি সৎকার হয়!
      ওই মনোজগতে লালসা ওই ঘরের লোকেদের মনমজ্জায়, ফলে ওদের কাছে যত সুখ তা ওই পাড়ে! তাদের কাছে ওই বাংলার প্রকাশনা ও সাহিত্য প্রসার আর মৌলিকত্ব একটা জাতির জন্যে কি মূল্যবান ! এবং এর ক্ষতি হলে একটি দেশের কৃষ্টির কি ক্ষতি , এ সকল ডায়ালেক্টিস তাদের মাথায় ঢোকার কথা নয়! একটা মিশ্র আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় থেকে আমরা বঙ্গভঙ্গ ও দ্বি জাতিতত্ব এর বিভাজন থেকে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারিনি, ফলে আমাদের বুদ্ধির জগতকে যদি একটা মেরুকরণ করা যায়?বাংলার মাটিতে সাহিত্য মার্গে কেনো এই হেন পাঁয়তারা একটা হে ফেস্টিভ্যাল তা একদিন সময় বলে দেবে ! যখন আমাদের সকল কিছু যখন নষ্টদের কাছে হারিয়ে যাবে তখন আমাদের বোধোদয় হবে তখন বলে দেবে বিশ্বায়নের পশ্চিমী ডায়ালেক্টিস, এর চরম রাজনীতির খেলা ! কাজেই সাবধানতা প্রয়োজন , কিছু ঘটে যাওয়ার প্রারম্ভে নেতির দিকে স্বর যেন দীর্ঘ হয়, যেন আমরা আমাদের সামন্ত্যবাদী মনন’কে অতিক্রম করতে পারি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফারহানা মান্নান — নভেম্বর ১৯, ২০১২ @ ৮:২৫ অপরাহ্ন

      “একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রচারমাধ্যমগুলোর কাছে একটি দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীমহল যখন মাথা বিকিয়ে বসে থাকেন তখন আম-জনতার আর কিছুই বলার থাকে না।” চমৎকার বলেছেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Omar Faisal — নভেম্বর ২০, ২০১২ @ ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

      Wonderful write up. Carry on Sohel bhai.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বপন মাঝি — নভেম্বর ২০, ২০১২ @ ১১:৫২ পূর্বাহ্ন

      “পিৎজা হাট আর কেএফসির আলো-ঝলমলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের চার দেয়ালে বন্দি করে মুক্ত সংস্কৃতিচর্চার হাত থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে আমাদের নতুন প্রজন্মকে।”
      ঠিক তাই। আরো সত্য হলো -
      “করপোরেট পুঁজির বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।”
      আর এটা করতে গিয়ে আক্রমণটা চালাতে হয় ভাষা ও সংস্কৃতির উপর।
      বাংলা একাডেমি এত কিছু পারে অথচ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা, সেলিম আল দীনের চাকা অনূবাদ করতে পারেনা? পারে, হয়তো। করবে না। ‘হে-কান্ড’ এর কান্ডজ্ঞান সরবরাহ-ই মেরুদন্ডহীন আত্মকেন্দ্রিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটাই তাদের মূল কর্ম-যজ্ঞ। এর মধ্য দিয়ে কি অর্জন হবে এ বোধ-বুদ্ধি থাকলে তারা হয়তো চাকরিটাই পেতেন না।
      প্রতিবাদ হোক, আরো আরো ঢেউ উঠুক, গর্জে উঠুক
      বাঙ্গালী।
      “চিটাগাং” যে প্রাঙ্গনে নিষিদ্ধ, সে প্রাঙ্গনে নিষিদ্ধ হোক ‘হে-কান্ড’।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com