সূর্য সেন, হে কাণ্ড ও বাঙালির বিবেক

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ১৬ নভেম্বর ২০১২ ৪:২৩ অপরাহ্ন

গত বছর ২০১১ সালে যখন ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রাঙ্গণে হে ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হয়, তখন আমরা কেউ এর বিরোধিতা করিনি। বস্তুত এবারেও এই ফেস্টিভ্যাল আয়োজনে আমাদের বিরোধিতার কোনো কারণ ছিল না, যদি এটি ব্রিটিশ কাউন্সিল বা অনুরূপ কোনো ভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হতো। আমাদের বিরোধিতার মূল কারণ এই নব্য-উপনিবেশবাদী, ভাষিক বৈষম্যমূলক ও সম্প্রসারণবাদী অনুষ্ঠানটি স্বাধীন সার্বভৌম জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীতে আয়োজিত হচ্ছে। এর ফলে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী আমাদের প্রিয় জাতিরাষ্ট্রের এই অদ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটির স্বকীয়তা, ভাবমূর্তি, অনন্যতা ও পবিত্রতা পদদলিত হচ্ছে । গত ৫৭-বছর ধরে বাংলা একাডেমী নানামাত্রিক হুমকি ও বিপর্যয়ের মধ্যেও এই স্বকীয়তা অক্ষুন্ন রেখেছে। আর আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সরকার ক্ষমতাসীন থাকাকালে কী কারণে তা পদদলিত হচ্ছে, সেটি আমাদের বোধের অতীত।

একজন কর্তা ব্যক্তির মনোভাবের কারণে বা কোনো অমনোযোগী কর্তৃপক্ষের ভ্রমাত্মক সিদ্ধান্তে যদি তা হয়, তাহলে সচেতন জনগণের দায়িত্ব হচ্ছে তার প্রতিবাদ ও প্রতিহতকরণ। আমরা প্রথমত এরকম সরল যুক্তিতেই বাংলা একাডেমীতে এই উৎসব অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করছি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের মর্যাদাবান ও আত্মসচেতন প্রত্যেক লেখকের কর্তব্য হচ্ছে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই আত্মবিধ্বংসী প্রক্রিয়া প্রতিহত করা। আমাদের সচেতন তরুণরা তা-ই করছেন। তাই আমরা আমাদের উত্তর-প্রজন্ম সম্পর্কে আশান্বিত।

উল্লেখ্য, হে ফেস্টিভ্যাল বৃটিশের রান্নাঘরে তৈরি একটি নব্য-উপনিবেশবাদী, সম্প্রসারণবাদী এবং ভাষিকভাবে বৈষম্যমূলক সাহিত্যিক আগ্রাসন। এটিকে বাংলায় হে কা- বলাই অধিক সমীচীন। বৃটিশ কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত পর্যায়েক্রমে বিভিন্ন দেশের মোট ১৫টি শহরে এই কা-টি আয়োজিত হয়েছে বলে জানা যায়। এই আয়োজনের মূল কারণ ঐসব দেশে ইংরেজি সাহিত্যের চর্চাকে জনপ্রিয় ও মুখ্য করে তোলা। এর ফলে দেশজ ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে কালে কালে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বহুদেশে এমনটি ঘটেছে। বাংলাদেশের মতো মাতৃভাষা-আশ্রয়ী ও জাতিসত্তাকেন্দ্রিক দেশে এই ধরনের আগ্রাসী কা- কেবল অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং তা আমাদের সৃষ্টিশীলতার জন্যে আত্মঘাতী বলে প্রতিভাত হতে পারে। যারা স্বেচ্ছায় এই মরণফাঁদে পা দিতে উদ্যত, আমরা তাদেরকে সতর্ক করতে চাই। পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করাও আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। তা নাহলে আমরাও বৃটিশদের ঘৃণ্য দোসর মীর জাফরের বংশধর বলে প্রতিভাত ও কলঙ্কিত হবো।

মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা শেখা ও চর্চায় আমাদের আপত্তি বা বিদ্বেষ নেই। তবে বৈষয়িক প্রয়েজনে একটি ভাষা শেখা বা চর্চা করা এক কথা, আর মাতৃভাষার অভিব্যক্তিমূলক ঐশ্বর্যকে ত্যাগ করে অন্য ভাষার কাছে ভিখিরিসুলভ হাত পাতা আরেক কথা। বাংলা ভাষার প্রথম আধুনিক মাইকেল মধুসূদন দত্তের শিক্ষা ও স্বীকারোক্তি কি আমরা বিস্মৃত হয়েছি? অন্য ভাষার সাহিত্যকে পঠন-পাঠনের মাধ্যমে স্বীকরণ ও নিজের ভাষার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অন্য ভাষায় অনুবাদ করা প্রয়োজনীয় হলেও ভিন্ন ভাষায় মৌলিকধর্মী সৃষ্টিশীল চর্চা সমানুপাতিকভাবে আবশ্যকীয় নয়। আর এতে চর্চাকারীরও তেমন লাভ হয় না। এই ধরনের চর্চাকারী খুব কম ক্ষেত্রেই মাতৃভাষার লেখকদের সমপর্যায়ে আসতে পেরেছেন। আমরা সাহিত্যের ইতিহাস থেকেই এমন শিক্ষা নিয়েছি।

গতবারের হে কা-ে বাংলা ভাষার লেখকরা ছিলেন চরমভাবে উপেক্ষিত। অনুষ্ঠানটিও ছিল দায়সারা গোছের। আর এবারের আয়োজনে দেশি-বিদেশি ইংরেজি লেখকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের লেখকদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই আমন্ত্রণের তালিকা বার বার বদল হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এই তালিকা ক্রমেই বড় হয়ে উঠেছে। একমাত্র বিক্রম শেঠ ছাড়া বিদেশি প্রায় সব লেখকই আমাদের অপরিচিত। তারা গৌণ লেখকের দলে। আর বাংলাদেশের মুষ্ঠিমেয় যারা ইংরেজি লেখক তাদের অবস্থান সমকালীন ইংরেজি সাহিত্যে কেবল গৌণতরই নয়, বরং তা নির্ণয়েরও অযোগ্য। অথচ সেই গৌণ বা গৌণতর লেখকদেরকেই সমধিক গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের মূল স্রোতের প্রধান প্রধান কবি-লেখকদেরকে সাক্ষীগোপালের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যেখানে ষাটের দশকের প্রধান বাঙালি কবিরা প্রতেকে (যেমন নির্মলেন্দু গুণ বা বেলাল চৌধুরী) হয়তো দুমিনিট করে কবিতা পড়বেন, সেখানে বাংলাদেশের একজন প্রায়-অপরিচিত ইংরেজি ভাষার কবি এক-ঘন্টারও বেশি সময় ধরে কবিতা শোনাবেন ও বাতচিত করবেন। অনুষ্ঠান বিন্যাসে এই ধরনের বৈষম্য প্রায় প্রতিটি অধিবেশনেই প্রকটিত হয়েছে। এই বৈষম্যও প্রমাণ করে এটি ভাষিকভাবে একটি আগ্রাসী উৎসব। দেখে-শুনে মবে হয়, এখানে বাংলা ভাষার লেখকদের লোক-দেখানো আমন্ত্রণ না জানিয়ে কেবল ইংরেজি ভাষার দেশি-বিদেশি লেখকদের আমন্ত্রণ জানালেই তা উৎসবের লক্ষ্যের সঙ্গে অধিকতর সঙ্গতিপূর্ণ হতো। আর এটি যে আদপে কোনো আন্তর্জাতিক উৎসব নয়, তা প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। কেননা বাংলা ভাষার বাইরে কেবল ইংরেজি ভাষার লেখক ছাড়া অন্য কোনো ভাষার লেখক এখানে নেই।

আয়োজকরা বলেছেন, এই উৎসবের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্য বহির্বিশ্বে পরিচিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটিও সত্যের চাতুর্যপূর্ণ অপলাপ। কেননা হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠাংশ অনূদিত হওয়ার বিষয়টি ১৯৮৮ সনে সৃষ্ট এই হে কাণ্ডের অপেক্ষায় থেমে ছিল না। আমাদের সমকালীন অনুবাদকরাও এই উৎসবের আগেই তাদের সৃষ্টিশীল অনুবাদ প্রকাশ ও প্রচারের কাজ করে চলেছেন। একালে প্রফেসর কবীর চৌধুরী বা প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ বা প্রফেসর ফখরুল আলম বা প্রফেসর কায়সার হক বা কবি সাজেদ কামাল বা অন্য অনুবাদকরা নিজেদের অন্তর্গত তাগিদেই রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরীসহ হাল আমলের কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক ইত্যাদি অনুবাদ করে চলেছেন। বাংলা একাডেমীর কাজ হচ্ছে তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করা, আর সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে এই কাজ অব্যাহত রাখা। উপরন্তু, নিয়মিত বিরতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার প্রতিনিধিত্বশীল লেখকদের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলনের আয়োজন করা। কেবল আর্থিক বছরশেষে অব্যয়িত অর্থ ব্যয়ের অছিলায় লোক-দেখানো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে বাহবা কুড়াতে চাইলেই আসল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না।

এবার আসা যাক, অনুষ্ঠান পরিকল্পনায়। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ ব্যবহার করা হলেও অনুষ্ঠান বিন্যাসে বাংলা একাডেমীর কোনো সাহায্য বা পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। আমন্ত্রণ জানানো হয়নি একাডেমীর সম্মানিত ফেলো, সদস্য বা ঊর্ধতন কর্মকর্তাদেরও। এমনকি সংস্কৃতি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সচিবদেরকেও দেখা যায়নি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। দেখে-শুনে মনে হয় বাংলা একাডেমী এই অনুষ্ঠানের চতুর্থ শক্তি। অর্থাৎ বিশেষ প্রাণীর বাড়তি বাচ্চার মতো লাফানোতেই তার তুষ্টি। প্রথম তিন আয়োজক শক্তির নাম যথাক্রমে ডেইলী স্টার, প্রথম আলো, ব্রিটিশ কাউন্সিল। তারপর যাত্রিক নামক আরেকটি নাম, যা কার্যত ডেইলি স্টারের সম্পূরক প্রতিষ্ঠান। তাদের ইচ্ছার কাছে বাংলা একাডেমী নতজানু। অনুমান করি, বাকি আয়োজক শক্তিরা বাংলা একাডেমীকে কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে বশংবদ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। না, এতে আশ্চর্য হওয়ারও তেমন কিছু নেই। কেননা গুজব আছে, এই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারই এক-এগারোর মতো গণতন্ত্র-বিধ্বংসী ঘটনার পরিকল্পক ও বাস্তবায়নকারী।

হে উৎসবের এদেশীয় আয়োজকরা সবাই কর্পোরেট কালচারের প্রবক্তা ও পৃষ্ঠপোষক। তাদের পোষ্য প্রতিষ্ঠান প্রথম আলো, ডেইলী স্টার ইত্যাদি বাংলাদেশের সাহিত্যকে কলুষিত করে অর্থ ও শক্তিবলে মালিকদের পুত্রকন্যা ও কোটারীভুক্ত লেখকদের পুরস্কৃত ও মহিমান্বিত করার যে কূটকৌশলে লিপ্ত, তা আমাদের দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিবেশকেও চরম বিষিয়ে তুলছে। একটি গ্রন্থ লিখতে না লিখতেই একজন লেখককে শীর্ষ লেখক বানানো হচ্ছে। এতে আমাদের সাহিত্যের ভারসাম্যময় বিকাশ রুদ্ধ হচ্ছে। আর তারই ধারাবাহিকতায়, ঠিক এই মুহূর্তে ট্রান্সকম গ্রুপ তার বিভিন্ন অঙ্গীভূত প্রতিষ্ঠান আর মিডিয়া ব্যবহার করে জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর কর্তৃত্বও কিনে নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলা একাডেমীর ইতিহাসে আত্মবিক্রয়ের এমন ন্যক্কারজনক উদাহরণ আর একটিও নেই।

আমরা জানি, এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরো বিস্তর বিতর্ক অপেক্ষা করছে। যা হোক, এই মুহূর্তে বাংলা একাডেমীর এই আত্মঘাতী পরিণতির জন্যে কে দায়ী তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সহজেই অনুমেয়, এসবের মূল দায়িত্ব নির্বাহী প্রধান হিসেবে বর্তমান মহাপরিচালকের উপর বর্তায়। ভাবতে অবাক লাগে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের দ্ব্যর্থহীন সমর্থক হিসেবে খ্যাত বর্তমান মহাপরিচালক জনাব শামসুজ্জামান খানকেই এর দায়ভাগ গ্রহণ করতে হচ্ছে। কেননা বাংলা একাডেমীতে হে ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে একাডেমীর ইতিহাসে যে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে, তার দায়িত্ব তিনি নিজেই নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন। তিনি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি বাণীমূলক নিবন্ধে হে ফেস্টিভ্যালকে অমর একুশে গ্রন্থমেলার সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করেছেন এবং বাংলা একাডেমীতে তা চিরস্থায়ীরূপে আয়োজনের কথা বলেছেন। আসলে কোনো বিষয়ে আগাম সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার তাঁর বা কোনো মহাপরিচালকের থাকতে পারে না। তাই এটি একটি চরম অবিবেচনাপ্রসূত উক্তি। এই উক্তি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের মৌলিক চেতনারও পরিপন্থী। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক অপরাধের শামিল।

এই মানসিকতার বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক বাঙালির সংগ্রামী বিবেক । হে কা- বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ থেকে চিরতরে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হোক। বঙ্গবন্ধুর জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ ও তার প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর অনন্যতা অমর হোক। জাতির বিবেকের প্রতীক বাংলা একাডেমীকে কলঙ্কিত করার এখতিয়ার আমাদের কারো নেই। বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হলে, সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবেন, এটিই আমাদের কাম্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন, এটিই আমাদের বিনীত প্রার্থনা।

সবশেষে বলতে চাই, আমরা হে ফেস্টিভ্যাল সম্পর্কে শুরু থেকে যে কথা বলে আসছি, বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে জবরদস্তিমূলকভাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালায় তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ফেস্টিভ্যালের আমন্ত্রণ পেয়ে ভারতের নান্দনিক চলচ্চিত্র পরিচালক বেদব্রত পাইন ‘চিটাগাং’ শীর্ষক তার সদ্য সমাপ্ত ইতিহাসাশ্রয়ী চলচ্চিত্র নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই চলচ্চিত্রের মূল থিম উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্নিযুগের অগ্নিপুরুষ মাস্টার-দা সূর্য সেন। তিনি কিভাবে স্কুল ছাত্র ও তরুণীদের সংগঠিত করে বৃটিশরাজের দুটি অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেছিলেন, তারই বিপ্লবী কাহিনী এই চলচ্চিত্র। আয়োজকরা সচেতন লেখকসমাজের হে-ফেস্টিভ্যাল-বিরোধী আন্দোলনে চরমভাবে আতঙ্কিত হয়ে এটি প্রদর্শন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেননা এতে সা¤্রাজ্যবাদী বৃটিশের ঔপনিবেশিক চরিত্র ও নির্যাতনের চিত্র উন্মোচিত হবে। পরিচালক পাইন এহেন হঠকারী সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়ে যা বলেছেন তার মর্মার্থ হচ্ছে, শুরুতে আয়োজকরা কার্যত হাতে-পায়ে ধরে তাকে এখানে আসতে রাজি করিয়েছিলেন। অথচ এখন তারা তার সঙ্গে যে প্রতারণা করছে, তা চরমভাবে অসৌজন্যমূলক ও অবমাননাকর। এই অবিবেচনামূলক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলা একাডেমীর বর্তমান মহাপরিচালকও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট রূপে আবির্ভূত হলেন। আসলে, হে ফেস্টিভ্যালকে নব্য-সাম্রাজ্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী ও ভাষিক বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করার মাত্র একদিনের মধ্যেই প্রমাণিত হলো, প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য শতকরা একশ ভাগ সত্য।

অমরা জানি, শুধু একটি ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করে বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস, তার মুক্তিসংগ্রাম আর জাতিসত্তার অনন্যতাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙালিকে কেউ চিরকাল দাবিয়ে রাখতে পারেনি। আমরা বিস্মৃত হইনি, বঙ্গবন্ধুর অজেয় সতর্ক-ধ্বনি, ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’। কেননা আমরা সূর্যসেনের উত্তরসূরী, আমরা তিতুমীরের বংশধর, আমরা জাতিপিতা বঙ্গবন্ধুর অজেয় মুক্তিযোদ্ধা। আমরা সশস্ত্র সুন্দর। আমাদের প্রতেকের বুকে-মুখে অবিনাশী সশস্ত্র শব্দবাহিনী। সালাম বরকত তিতুমীর সূর্যসেন আর অগণিত শহীদ-গাজীর এই অজেয় মাটি অবশ্যই পরাস্ত করবে হে-গে বা তজ্জাতীয় অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন।

আমরা কি বাংলা ও বাঙালির সেই সুদিনের প্রত্যাশায় বুকে বুকে জ্বালিয়ে রাখবো না আমাদের বিবেকের শিখা চিরন্তনী?

১৫-১৬.১২.২০১২

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (১১) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Binoy Barman — নভেম্বর ১৬, ২০১২ @ ১০:৩০ অপরাহ্ন

      মুহম্মদ নূরুল হুদা বাঙালি জাতিসত্তার কবি। তিনি বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ব্যষ্টিক পর্যায়ের ওয়াচডগ। “সূর্য সেন, হে কাণ্ড ও বাঙালির বিবেক” লেখায় বাংলাদেশে চলমান হে ফেস্টিভ্যাল নিয়ে তিনি কিছু আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর আশঙ্কা চিন্তাউদ্রেককারী। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে তিন দিনব্যাপী হে উৎসব (যাকে তিনি রসিকতা করে বলেছেন ‘হে-কাণ্ড’) চলছে, সেটি কি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য আসলেই অবমাননাকর ও হুমকিস্বরূপ? এটি কি সত্যিকার অর্থেই কোনো নব্য ভাষিক-সাহিত্যিক আগ্রাসন? জনাব হুদার আশঙ্কা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলা একাডেমির এ ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন বা সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। বরং তিনি যে পরামর্শ দিয়েছেন, বাংলা একাডেমি বিভিন্ন দেশের ও ভাষার প্রতিনিধিত্বশীল লেখকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন আয়োজন করতে পারে। এটি বরং অনেক বড় কাজ হবে, একাডেমিসুলভ কাজ হবে। এ সমস্ত হে-ফের চেয়ে।
      লেখাটিতে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জনাব হুদার প্রাজ্ঞ মতামতের প্রকাশ ঘটেছে। তবে একটি জায়গায় একটু খটকা লেগেছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সঙ্গে ওয়ান-এলিভেনের যে সংশ্লিষ্টতার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন (“এই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারই এক-এগারোর মতো গণতন্ত্র-বিধ্বংসী ঘটনার পরিকল্পক ও বাস্তবায়নকারী”), তা এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ইস্যু। আমার ধারণা তিনি পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ হাতে রেখেই কথা বলেছেন। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে তিনি হয়তো সেগুলো হাজির করবেন। আশা করি ব্যাপারটি আদালত পর্যন্ত গড়ালে তিনি তা সামাল দিতে পারবেন। জনাব হুদার বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তবে তা জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় দুঃসংবাদ। রাজনীতিতে মিডিয়ার একাংশের এতোটা প্রভাব সত্যিই বিস্ময়কর (অপ্রত্যাশিত বলেই)। মিডিয়া কি এতোটা শক্তিশালী যা কিনা (পরোক্ষভাবে নয়) প্রত্যক্ষভাবে একটি দেশের রাজনৈতিক উত্থানপতন ঘটিয়ে ফেলতে পারে? গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার চতুর্থ পিলারটি যদি প্রথম পিলার হিসেবে আবির্ভূত হয়, তবে তা জনগণকে উদ্বিগ্ন না করে পারে না।
      আমি লেখককে ধন্যবাদ জানাই বুদ্ধিজীবি হিসেবে তার সাহসী উচ্চারণের জন্য। কবি বলেই তিনি হয়তো এতোটা সাহসী!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — নভেম্বর ১৬, ২০১২ @ ১১:২০ অপরাহ্ন

      আপনার প্রতিবাদী লেখা ও প্রতিবাদের সাথে একাত্ব হয়ে আপনাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি সঠিক উপলব্ধির জন্যে। আমি মনে করি প্রতিবাদ যতোই সামান্য হোক একদিন তা’ নিশ্চয়ই আকাশকে ছূঁয়ে দেবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলমগীর ফরিদুল হক — নভেম্বর ১৭, ২০১২ @ ১২:২৩ পূর্বাহ্ন

      আজকের সময়ের টপিক্যাল ইস্যূ নিরিখে হুদা ভাইয়ের লিখাটি সত্য ভাষণে সাহসী লেখা। এমনিতে আমাদের উত্তর ঊপনিবেশবাদী মনোজগতে নিজেদের সমস্যা অনেক রয়েছে, এর উপরে বাইরে থেকে প্রভূর প্রতাপ! ওদের নিজেদের কৃষ্টি প্রচারে এবং একটা ভাষিক দ্বন্দ্ব তৈরির কী অর্থ হতে পারে। আজকের যুগে তাদের যা কিছু ঘটে যাচ্ছে সবই গোয়েন্দা শক্তির বলয়ে একটা ডিস্পারিটি বা বৈষম্য তৈরী হচ্ছে ক্রমাগত , সে রাষ্ট্র যন্ত্র কি শিল্পযন্ত্র সর্বত্র ! এ কথা আজ যে কোন অন্ধ বুদ্ধিজীবিও বুঝতে পারে! আমাদের রাজনীতি যে ভাবে দূষিত হয়েছে, দোহাই আপনাদের আমাদের গরীব ঘরের ছেলে মেয়েরা গরীব হতে পারে কিন্তু মনন মেধায় গরীব নয় ! তাদের বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়, যে গ্লোবাল পলিটিক্স কোন কোন রন্দ্রে রন্দ্রে প্রেবেশ করে , কি বিভাজণই না তৈরি করে পারে!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হানযালা হান — নভেম্বর ১৭, ২০১২ @ ৭:০৫ অপরাহ্ন

      হে উৎসব বাংলা একাডেমীতে না হওয়াই ভালো ছিল। এবার যেহেতু হয়েই গেছে, ভবিষ্যতে যাতে আর না হয় সেদিকটা এখনই বিবেচনায় আনা দরকার।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rahman Mofiz — নভেম্বর ১৭, ২০১২ @ ৭:২৭ অপরাহ্ন

      এই লেখাটির মধ্য দিয়ে আপনাকে আরেকবার নতুন করে জানলাম। অনেক বিষয়ে আপনার অকুণ্ঠ ও সাহসী উচ্চারণ সত্যিই এ পর্যায়ে মুগ্ধ ও আশাবাদী করে তুলেছে আমাকে। ‌‌’হে কাণ্ড’ র ঘৃন্য অপতৎপরতা রুখে দাঁড়াতে হবে একটি সংগঠিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচির মধ্য দিয়ে। আর সে কর্মসূচিতে আমাদের অংশগ্রহন থাকবেই। আপনাকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বপন মাঝি — নভেম্বর ১৮, ২০১২ @ ৪:২৩ পূর্বাহ্ন

      বাংলিশ আচরনের শুরুটা কে বা কারা, কেন প্রবল উৎসাহে শুরু করেছিল, এবং তাকে এক বিশেষ মর্যাদায় জারী রেখেছে; খুব করে ভাবা দরকার।
      শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ নূরুল হুদা-র লেখা পড়ে মনে হচ্ছে, তলে তলে জল অনেকদূর গড়িয়েছে। অর্থাৎ শেকড় উপড়ে ফেলার আয়োজন। ঘুমাও বাঙ্গালী, ঘুমাও। কুম্ভকর্ণের ঘুম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Anwar Kamal — নভেম্বর ১৮, ২০১২ @ ১০:২৩ পূর্বাহ্ন

      আমাদের প্রিয় প্রাণের প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর এমন অবমাননাকর সংবাদ মোটেই সহ্য করা যায় না। সবাই প্রতিবাদ করুন। ধন্যবাদ লেখককে সাহসী উচ্চারণের জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইমতিয়াজ মাহমুদ — নভেম্বর ১৮, ২০১২ @ ৩:৪২ অপরাহ্ন

      যে সব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গ বাণী….

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন DEYA MAHBUB — নভেম্বর ১৮, ২০১২ @ ৩:৪৫ অপরাহ্ন

      I like your opinions. Writers can not be made , they are born. The Corporate monsters kill the real writers and give birth to a class of writers who are made writers by them.
      Thank you.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন salam saklain — নভেম্বর ২৩, ২০১২ @ ১:১৩ পূর্বাহ্ন

      kobi nurul huda thik bolechen. amra take shamorthan kori.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোঃ আলী আজম — নভেম্বর ২৩, ২০১২ @ ২:৪৪ অপরাহ্ন

      যথার্থ বলেছেন কবি নুরুল হুদা। তাঁর চেতনা সবার মধ্যে সংক্রামিত হোক। কর্পোরেট কারবারীরা ধান্ধাবাজিতে লেগে থাকবেন এটাই তাদের ধর্ম। আমরাও আকাশ পানে তাকাবো তবে কোন অবস্থাতেই শেকড় বিচ্যুত হয়ে নয়।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com