গুচ্ছ কবিতা
হিরামন
হিরামন একটি তোতার নাম, তার বাস কোথায়
আমরা জানি না, কোন্ বাঁশবনের উপর দিয়ে
সে উড়ে আসে আমরা জানি না, তবু যখন
কাগজ তৈরির প্রকল্পের সুবাদে হাসনাবাদের
নন্দন পুকুরের পাশের বিশাল বাঁশগুলিকে কেটে
নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, আর সেই কেটে ফেলার
শব্দ ধ্বনিত হচ্ছিল আকাশে বাতাসে এবং
নন্দন পুকুরের আশেপাশেই আরো নানা ছোটো
ছোটে জলাশয়ে, ঠিক সেই সময় নন্দন পুকুর
থেকে উঠে এলো হিরামনের ছায়া, ছায়া হলেও
হিরামনের মতনই বর্ণময়, সবুজে-হলুদে মেশানো।
কুহু
কুহু বহুদিন আসেনি, এখন কোথায় তাও জানি না
কুহু-র শৈশব দেখেছি, বালিকাবেলা দেখেছি, দেখেছি
উদ্ভিদের যৌবন নিয়ে তার বেড়ে ওঠা, কিন্তু তারপর, তারপর সে কোথায় গেল?
সে কি এখন অনেকগুলো বাচ্চা বাচ্চা কুহুদের মাঝখানে
বসে আছে, দীর্ঘ ভেজা চুল শুকোতে বসেছে রোদের দাওয়ায়।
শুনেছি সে কোনো গ্রামে নেই। আছে
কোনো এক শহরের ঝাঁ-চকচকে বিল্ডিং-এ,
যেখানে চুল শুকানোর জন্য রোদের দাওয়ায় বসবার দরকার হয় না।
সেই এক চেনাজানা পুরোনো দিনের কুহু-র ছায়া তবু
এখনো গ্রামের পুকুরঘাটে, ফসলের মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিন্দু
তিল তিল করে তিলোত্তমা, ঠিক তেমনি
বিন্দু বিন্দু করে বিন্দুবাসিনী, নামটা শুনতে
সেকেলে হলেও আসলে তা একালেরও।
বিন্দু আর সিন্ধু দুই ভাই-বোন একসময়
প্রায় রোজই আসতো আমার কাছে, বাচ্চা ছিল তো
তাই এসেই ছেলেমানুষি নানারকম দুষ্টুমি আর
খেলাধুলায় ভরিয়ে রাখতো চারপাশ।
এখন বাতাসে কাপাসতুলো, স্বচ্ছ স্বচ্ছ মেঘের মতো
ভেসে বেড়াচ্ছে। বিন্দুবাসিনীর বন্ধু ছিল তিলোত্তমা
সেই একদিন জানালো বিন্দু এখন অনেক বড়ো
তীরন্দাজ হয়েছে, অলিম্পিকে অংশগ্রহণেরও
একটা ব্যবস্থা করা হচ্ছে তার জন্যেই।
কে এলরে হঠাৎ
রাঙা নৌকা এসে ভিড়েছে নদীর তীরে
শহরে সবাই উদ্গ্রীব কে এল রে হঠাৎ
সে কি কোনো রাজপুত্তুর নাকি দেবদূত
রাঙা নৌকা এসে ভিড়িছে নদীর তীরে
অমল ধবল পালজুড়ে কাঁপে আপন হাওয়া
এরাই নাম কি যাওয়া, যাওয়া নাকি আসা
আশায় আশায় বুক বেঁধেছে শহরের মানুষ
প্রদত্ত
ভেবেছিলাম এটা গোলাপ, কিন্তু হায় গোলাপ
কোথায়, এ যে দেখি এক টগবগে ঘোড়া,
ভেবেছিলাম এটা সিড়ি ভাঙতে-ভাঙতে এসে
পৌঁছেছি আকাশছোঁয়া চিলেকোঠায়
ভেবেছিলাম এটা ঝিরিঝিরি পাতার সজনেগাছ
কোথায় সজনে, এ যে দেখি সাজন দত্ত
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বোঝালো তার এখন কথা
বলবার সময় নেই, সে এখন চলেছে
সাজনার সঙ্গে দেখা করতে, ফিসফিস করে
জিজ্ঞেস করলাম, সাজনা মানে তো শূর্পনখা
আস্তে করেই সে জানালো, না না কোথায়
শূর্পনখা। এর নাম মিনি, মানি প্রদত্ত বলতে পারো।
তাকানো
আজ খুব আনন্দ করবার দিন
আজ খুব ভালোবাসবার দিন
কিন্তু চারদিকের যা অবস্থা
সেখানে আনন্দই-বা করব কীভাবে
আর ভালোবাসবই বা কী করে
তোমাকে একটা কথা বলি
প্রত্যেকে যদি প্রত্যেকের দিকে
ঘুরে না তাকাই, সকলের সমস্যাকে
সমস্যা মনে না করি, তাহলে তো
কোনোদিনই কোনো সুদিন ফিরবে না
হয়তো আজকেই সেই সুদিন
যখন তুমি আমার দিকে চেয়েছিলে
এবং আমি তোমার দিকে চাইলাম
আজন্ম
জন্মের ভিতরে লুকিয়ে আছে যে প্রেম
সেই প্রেমকে মানুষ আমৃত্যু লালন করে
এমনকি শিশু থেকে যখন সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়,
সেও যেন-বা ছায়াছবির মতো সেই
প্রেমকে মূর্ত করে তোলে পর্দায়, যদিও
এক্ষেত্রে কুশীলব আলাদা, এই যে প্রেম
এই প্রেমের কাছে বারবার ফিরে যেতে হয় মানুষকে
যুগ যুগ ধরে এভাবেই মানুষ বয়ে নিয়ে চলেছে
সুদূরের আহ্বান।
যেমন জল, জলের ভিতরে ছলছল করে অনন্ত আকাশ।

