ভাষার মারপ্যাঁচ

বেলাল চৌধুরী | ৫ নভেম্বর ২০১২ ১০:০৪ অপরাহ্ন

সেদিন এমন অসহ্য গরম পড়ছিল যে তা আর বলার নয়। অথচ বিদ্যুত ঘাটতি বাঁচানোর কত না ফন্দি-ফিকিরের কথা রোজই না শোনা যাচ্ছে। আগেকার সরকারগুলোর বিদ্যুত সংক্রান্ত বাগাড়ম্বরের কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গিয়েছিল। নিত্য নতুন একই চর্বিতচর্বণ। ভেতরে ভেতরে শুধু চুরি চামারি নয় ডাকাতি। আর আমাদের মিডিয়াগুলোরও এই সংক্রান্ত চমকপ্রদ সব খবরাখবরে আমরা আমজনতা বার বার শিহরিত হয়ে উঠতাম। তবে বর্তমান সরকার আসার পর তাদের বাস্তবসম্মত কার্যকালাপে কিঞ্চিৎ আশান্বিত হওয়া গেলেও মাঝে মাঝে কিছু খটকা থেকেই যাচ্ছে। আর বিদ্যুত নিয়ে এতকাল যে লুটপাট ঘটেছিল তার ক্রমশ প্রকাশিতব্য এক এক খবর দেখছি আর রীতিমতো শুধু ভিরমিই খাচ্ছি না রীতিমতো দাঁত কপাটি লাগার দশা। এতকাল তাহলে যা দেখেছি যা শুনছি সবই সর্বৈব মিথ্যার ফুলঝুরি ছাড়া আর কিছুই না। এখন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর তাদের সদিচ্ছাজনিত কার্যকলাপে অনেক বাধা-বিপত্তি থাকলেও উন্নতি হবে। প্রতিদিন এরা নিয়ম করে সন্ধ্যা সাতটার পর যাতে বিদ্যুতের অপচয় না হতে পারে তার জন্য কিছু অবশ্য প্রয়োজনীয় দোকানপাট সবই বন্ধ করে দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু এতে কতটা বিদ্যুতের সাশ্রয় হচ্ছে সেটা জটিল অঙ্কের বিষয়।

এই তো সেদিন দুপুরে যখন চৈত্রের অসহনীয় খরতাপে জ্বলছি তখন আমাদের এক প্রয়াত বিজ্ঞজনের লেখা পড়তে পড়তে গলদঘর্ম হলেও নিদারুণ মজা পাচ্ছি বলে তাঁর লেখাটি হুবহু তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারা কঠিন। তাঁর ভাষায় আমাদের কল্পনা খঞ্জ। আমাদের ভাষার চটক নাই। আমরা চারু আভরণ পরাইয়া ভাষাকে হেলাইতে, দুলাইতে, নাচাইতে পারি না। আমরা বড় বড় সুন্দর কথা না বুঝিয়া ব্যবহারে অটুট। বাক্যে অযথা ক্রিয়াপদকে আগাইয়া দিতে গেলে আমাদের হস্ত কাপিয়া ওঠে। ত্রিশটি কথা ব্যবহার করা যেখানে সমীচীন আমরা সেখানে চার কুড়ি শব্দ ব্যবহার করিতে পারি, কিন্তু তিনশ’ কথা ব্যবহার করা আমাদের সাধ্যাতীত। তাই এই পুজোয় যখন পাল্লা-ঝালরওয়ালা অজস্র লেখা কাগজে বাহির হইবে, তখন আমাদের এই নেড়া লেখা যে পাঠক-পাঠিকাদের মনোরঞ্জন করিবে এ দুরাশা আমাদের নেই। কোথায় একশত ডালওয়ালা ফট গ্লাসের ঝাড় আর কোথায় মিটমিটে খাস গেলাম বা দেওয়ানগিরি …. ভাষার বেসাতিতে আমরা কাঙালি।

ওপরের এই রগড়ের চেষ্টার পর বহু বছর কেটে গেলেও তাদের কথা বাদ দিলেও বাংলা ভাষায় এখন ‘বাগাড়ম্বর’ বেড়েছে বই কমেনি। সেই জন্যই লেখায় সংযমের কথাটা আবার তুললে অনুচিত হবে না বলেই মনে হয়। মুখের কথায় বাচালতা দোষের হলেও অনেক সময় তা ক্ষমা করা যায়। কথা বলতে বলতে বিচক্ষণ লোকদেরও অনেক সময় দু চারটে অবান্তর কথা মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়। তখন তা আরও কথা দিয়ে শুধরে নেয়া যায়। কিন্তু লেখায় বাচালতা মাপ করা উচিত নয়। লেখার সময় মানুষ অনেক কিছু লিখে ফেলতে পারে। কিন্তু ভেবেচিন্তে অদরকারি কথা বাদ দিয়ে, ভুল শুধরে, ভাষা ঘষেমেজে নেয়ার সময় থাকে। আমি এখানে বিশেষ করে সেসব লেখার সরলতার কথা বলছি যা সাধারণ পাঠক পাঠিকাদের কোন জিনিস জানবার বা বোঝাবার জন্য লেখা হয়। অর্থাৎ সেই ধরনের লেখা যার মতলব সাহিত্য ‘করা’ নয় তার উদ্দেশ্য যাকে ইংরেজী বলে ‘কমিউনিকেশন’। আর ছোট ছোট কথা দিয়ে সহজভাবে কম কথায় লিখলে এক ঢিলে দু’পাখি মরে। তার মানে আমাদের মতো রামশ্যামরাও বোঝে, বলার দরকার মনে করে না যে তা পন্ডিতরাও বোঝেন। পেঁচিয়ে লিখলে, কথার ফোয়ারা ছুটলে ‘কমিউনিকেশন’ মার খেয়ে যায়।

সহজভাবে বেটে-মেটো-হেঁশেলি কথা দিয়ে গভীরতম কথা সাধারণ লোকের মনের অন্ত:স্তলে পৌঁছে দিতে যার জুড়ি ছিল না সেই রামকৃষ্ণ দেবের অনুসরণ করে আমি এখানে গল্পছলে লেখার কম কথা ব্যবহারের একটা নমুনা দিই। এক মেছো একদিন বাজারে একটা বোর্ড ঝুলিয়ে পথে খড়ি দিয়ে নিচের কথাগুলো লিখে পরম তৃপ্তি লাভ করেন।

এখানে টাটকা মাছ কিনুন।

লোকজন দোকানে আসছে যাচ্ছে, কেউ কিনছে না। এমন সময় এক ভদ্রলোক সেখানে হাজির হয়ে মেছোর লেখা দেখে একটু মুচকি হাসি সহবোগে বললেন : ওহে! তোমার লেখাটা বেশ খাসা হয়েছে। তবে টাটকা লেখার মানে কী তুমি তো আর পচা গলা মাছ বেচছো না।

মেছো ‘তাই তো’ বলে ‘টাটকা’ কথাটা মুছে দিল। তখন ভদ্দরলোক আবার বললেন, না, এবার বেস হয়েছে। তবে ‘এখানে’ কথাটার আবার কী দরকার? তুমি তো এখান ছাড়া অন্য জায়গায় মাছ বিক্রি করছ না? মেছো কথাটা মেনে নিয়ে ‘এখানে’ কথাটা মুছে দিল। বাকি রইল; ‘মাছ কিনুন।’ মেছো তখন ভদ্দরলোককে সুধায় এবার ঠিক হয়েছে তো বাবু? বাবু তখন একটু হেসে বলেন: হ্যাঁ, আগের চেয়ে ভালো। তবে এখনও একবারে ঠিক হয়নি। এই ধরো ‘কিনুন’ কথাটার কী দরকার? তুমি তো আর মাছ দান-খয়রাত করতে বসনি। কথাটা শুনে ভ্যাবাচেবা খেয়ে মেছো তখন, ‘তাই কী বটে’ বলে ‘কিনুন’ কথাটাও বাদ দিয়ে দিল। এখন বাকি রইল ‘মাছ’। তারপর মুচকি হেসে ভদ্দরলোককে বলল, এবার তো আর কিছু বলার নেই, কী বলেন? শুনে ভদ্দরলোকের জবাব, না হে, এখনও ঠিক হলো না। তুমি যে তেল-নুন-লাকড়ি নয় মাছ বেচছো সে তো লোক দেখতে পাচ্ছে। আর শুধু লেখা কেন? বিশগজ দূর থেকে তোমার মাছের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। অতএব তোমার ‘মাছ’ কথাটা লেখারইবা কী দরকার? দূর অব্দি যাওয়ার দরকার হয় না। এতে গল্পটার মধ্য দিয়ে অদরকারী জিনিস ছেঁটে বাদ দেওয়ার ব্যাপারটা যে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে তা নিশ্চয়ই কেউ মানতে গররাজি হবেন না। অতএব অলমিতি বিস্তারণে।

পুনশ্চ: চুরির দায়ে আমার পিন্ডি কেউ চটকাবার আগে আমি কবুল করে ফেলি যে ওপরের গল্পটা বিখ্যাত সাংবাদিক আর এক সময়ে লন্ডন টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড এভান্সের লেখা একটা বই থেকে নেয়া। এখানে এর গল্পের উদাহরণ ছিল। ফ্রেশ ফিশ সোল্ড হিয়ার। আর আমি গল্পটি টুকলিফাই করেছি বাবু শ্রী রাধাপ্রসাদ গুপ্ত প্রণীত সুবর্ণরেখা প্রকাশিত স্থান, কাল, পাত্র গ্রন্থটি থেকে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (২) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হানযালা — নভেম্বর ৬, ২০১২ @ ৩:৩২ অপরাহ্ন

      পড়ে বেশ মজা পেলাম। ধন্যবাদ কবি বেলাল চৌধুরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sayeed — নভেম্বর ১৩, ২০১২ @ ৭:০৩ অপরাহ্ন

      হুমমমমমম
      অতএব অলমিতি বিস্তারণে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com