এই উদ্‌ভ্রান্তি মানবের, এই স্বপ্ন ফড়িঙের

তাপস গায়েন | ৩১ আগস্ট ২০১২ ৮:৪৬ অপরাহ্ন

‘আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে….।’ সেই কারণে ‘এ(ই) আকাশ নয় আজিকার….।’ এইসব পাখি যাহারা আজ ধলেশ্বরীর চরে ডানা ভাসাইয়াছে ক্রমেই অনুমানে আসিবে, ‘পাখিগুলো কিছুতেই আজিকার নয় যেন….।’ তবু আকাশ জাগিয়া ওঠে ; দহের বাতাসে রাতভর নক্ষত্রের গুঞ্জন কানে আসিয়া বাজে, যদিও দুপুরের বাতাসে, মেঘের আচ্ছাদনে সেইখানে ‘বাদলের কোলাহল’ ছিল । রাতের গভীরে ‘ভিজে পেঁচা শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে (আছে) কদমের বনে….।’ আর ‘নদীটির জল …. বিশালাক্ষী মন্দিরের ধূসর কপাটে আঘাত করিয়া যা(য়) ভয়ে ভয়ে….।’ প্রকৃতি-গভীরে যখন ‘পাট …. পচে অবিরল’ তখন রাতের সান্নিধ্যে লক্ষীপেঁচার বিস্মিত চোখ দেখিয়া আমরা এই আকাশকে ‘….শ্রাবণের বিস্মিত আকাশ’ বলিয়া শরীরের অনুভবে আনিব এবং একইসাথে জানিয়া লইব– ‘এ(ই) নদীও ধলেশ্বরী নয় যেন….।’ এই নদী ধানসিড়ি কিংবা ধলেশ্বরী যাহাই হউক, আমরা অনুভবে মানি, ‘….এই নদী নক্ষত্রের তলে সেদিনো দেখিবে স্বপ্ন….।’ এই স্বপ্ন যাহা আজিকার হইয়াও বর্তমানকে অতিক্রম করিয়া সময়ের মধ্যে পরিব্যাপ্ত এবং যাহা কোনো একদিন বিদ্যমান ছিল কিংবা যাহা সেইদিনে হইয়া উঠিবে, তাহাকে বাতাসের মতো ব্যাপ্ত ভাবিয়া আমাদের অনুভবে উহাকে একইসাথে ক্ষণকালীন এবং সর্ব্বকালীন ধরিয়া লইব। সময়ের ভিতরে প্রকৃতি ব্যাপ্ত না কী প্রকৃতির মধ্যে সময়ের জন্ম হয়– এই দ্বন্দ্বের সমন্বয় সাধন না করিয়া এই স্বপ্ন এবং স্বপ্নযাত্রার মধ্যে নিহিত সৌন্দর্যবোধে যাহারা অনুপ্রাণিত, আপ্লুত, মুগ্ধ এবং আমরা যাহারা এই অনুভবের আত্মীয়তায় আস্তিক হইয়া উঠিয়াছি, তাহারা মধ্যরাত অতিক্রম করিয়া আমাদের প্রিয় কবির উদ্‌ভ্রান্তির, তাঁহার স্বপ্নযাত্রার সঙ্গী হইয়া উঠিব ।

সময়ের ভিতরে ব্যাপ্ত, অনির্দ্দিষ্ট এই যাত্রা– যাহা দৃশ্যালোক হইতে অদৃশ্যালোকে, শ্রুতি হইতে বিশ্রুতির দিকে, লৌকিকতা থেকে অতিলৌকিকতার দিকে, রাত হইতে রাত-অতিক্রান্ত অন্য এক পৃথিবীর দিকে ক্রমশ গড়াইয়া চলিয়াছে । এই স্বপ্ন যেইহেতু পূর্বকথিত নয়, সেই নিমিত্তে এই স্বপ্নযাত্রার কোনো অভিমুখ নেই, তবু আমরা ভাবনার আলস্যে জানিয়া লইব যে যাত্রাশেষে স্বপ্ন তাহার উৎসবিন্দুতে ফিরিয়া আসিবে, যদিও তাহা এইক্ষণে স্থিরীকৃত হইয়া উঠে নাই । নক্ষত্রময় এই রাতে যাহারা স্বপ্নযাত্রায় সম্মিলিত হইয়াছেন, সময় তাহাদের নির্দ্দিষ্ট মুখাবয়বকে ক্রমে ক্রমে আকারহীন করিয়া তুলিতেছে, কারণ স্বপ্ন যখন অতিদীর্ঘকাল ধরিয়া ব্যাপ্ত, তখন স্বপ্নদর্শীর মুখাবয়ব ক্রমশ দৃশ্যাতীত হইয়া জলের সাদৃশ্যে সর্ব্বাকারে ব্যাপ্ত হইয়া পুনরায় দৃশ্যেরই অর্ন্তগত হইয়া ওঠে ; মানুষের অবয়বকে তখন নিতান্তই নক্ষত্রের মুখ বলিয়া মনে হয় । নক্ষত্রের মধ্যে নিহিত আমাদের গল্পসমূহ তখন রাতভর জোনাকির পাখনায় চিত্রিত হইতে থাকে । আমরা পাঠকেরা সময়ের এইক্ষণে সেই গল্পেরই সঙ্গী হইয়া উঠিয়াছি ।
jd.gif
‘আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে’ ঠিক সেইক্ষণে আমাদের অতিপ্রিয় কবি সাঁকো পাড়ি দিয়া লোকালয় হইতে শ্মশানের মধ্যে আসিয়া ভিড়িয়াছেন ; এবং তিনি তাঁহার অন্যমনস্কতায় দেখিলেন, ‘কল্কাপেড়ে শাড়ি প’রে কোনো এক সুন্দরীর শব চিতায় চড়ে(ছে) ।’ ‘কখন কাহারা’ আসিয়া আমকাঠের এই চিতা সাজাইয়া রাখিয়া গিয়াছে, তাহা আমাদের অজানাই থাকিয়া যাইবে । সময়ের এইক্ষণে কবির অন্যমনস্কতা হয়তো কবির অগোচরেই থাকিয়া গেল, ফলে ‘রামপ্রসাদের …. শ্যামা’ কখন যে এলোচুলে তাঁহার পার্শ্ব হইতে চলিয়া গিয়াছেন, তাহা তিনি অনুমানেও বুঝিতে পারিলেন না । অন্যদিকে, সময়ের গভীরে আমরা জানিতে পারি নাই সকল স্বপ্নযাত্রী কখোন যেন শ্মশানযাত্রী হইয়া উঠিয়াছে এবং কখোন হইতে যে তাহারা ‘সুন্দরীর শব’কে ঘিরিয়া রাখিয়াছে, তাহার খোঁজ রাখাও আমাদের জন্য অনাবশ্যক হইয়া উঠিয়াছে । সময়ের এইক্ষণে সকল স্বপ্নযাত্রীদের মুখাবয়ব অস্পষ্ট হইতে অস্পষ্টতর হইয়া উঠিতেছে, ফলে তাহারা আনন্দিত না কী বিষাদগ্রস্থ তাহার কিছুই অনুভবে আসিল না । কারণ প্রকৃতি নিজেকে নিরন্তর বদল করিয়া চলিয়াছে, আর নম্র আবেগে ধানসিড়ি নদীটির জল শ্মশানের প্রান্তকে স্পর্শ করিয়া কোন্‌ উদ্দেশ্যে যেন বহিয়া চলিয়াছে ! নদী যেখানেই ধাবিত হউক, নদী নির্জনে ভাসানের গান শুনাইয়া চলিয়াছে, যদিও অদূর হইতে বাদুড়ের ডানা ভাসাইবার ধ্বনি বাতাসে ভাসিয়া আসিতেছে । দুপুরের বৃষ্টি রাতের এই প্রকৃতিকে আর্দ্র করিয়া রাখিয়াছে, এবং ভাসমান জলকণার মধ্যে দৃষ্টি যদিও দূরগামী হইয়া উঠে না, কিন্তু নিকটবর্তী জলাশয়ে কলমীর দাম হইতে উদ্ভুত (অলীক) প্রেতিনীর কান্না স্বপ্নগ্রস্থ কবির কানে আসিয়া বাজিতেছে । ‘আকন্দ বাসকলতা ঘেরা’ ভগ্নপ্রায় ‘এক নীল মঠ’ বাঁকা চাঁদের আলোয় মনে হয় ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে, যাহাকে আমরা প্রকৃতি গভীরে স্বপ্রাণ-প্রকৃতির আশ্চর্য উচ্ছ্বাসের অংশমাত্র ভাবিয়া লইব । প্রকৃতির এই যখন দশা, তখন স্বপ্নযাত্রীদের মনের অবস্থা আমরা জানিয়া লইবার প্রয়াস করিব, কারণ মন এবং বস্তু–উভয়ই–প্রকৃতপ্রস্তাবে বিশ্বপ্রকৃতির এক অবিভাজ্য সত্তার দুই ভিন্ন উৎসারণ হইয়া অনন্তর বহিয়া চলিয়াছে ।

রাতের অন্ধকারে মন বাঁকাইয়া যায়, যেইভাবে আলো ব্লাকহোলে বাঁধা পড়িয়া থাকে । কীভাবে বিষন্নতার উন্মেষ হয়, যাহা সকল বস্তুপুঞ্জকে নিজের কাছে টানিয়া আনে এবং দৃশ্যমান বস্তু– যাহা অনুধ্যানের বিষয়– তাহার উপর অস্বচ্ছ পর্দা টানাইয়া দেয়, ফলে দৃশ্যমান জগৎ ক্রমান্বয়ে অদৃশ্যমান হইয়া উঠে এবং গতির বিপরীতে স্থবিরতার জন্ম হয়, যাহাকে আমরা ঘুম বলিয়া বুঝিয়া লইব, যদিও বাংলার এই রাত পেঁচার চোখে বিধৃত হইয়া আছে, অর্থাৎ ঘুম এবং জাগরণের মাঝে পেঁচা এবং উন্মাদপ্রায় কবি– উভয়ের সত্তায় মধ্যরাত অতিক্রান্ত হইয়া সময় বহিয়া চলিয়াছে ।

স্বপ্নগ্রস্থ কবির সত্তায় আমরা জানিয়া লইব যেইভাবে বর্ষাশেষে দিনের আলোয় রঙধনু জাগিয়া উঠিয়া পুনরায় হারাইয়া যায়, মৃত নক্ষত্রের শীত আসিয়া আমাদের শরীরকে জড়াইয়া ধরে, একইভাবে শ্মশানচিতায় সুন্দরীর শব ছাই হইয়া উঠিতেছে— যেন অতীত নক্ষত্রের ছাই কবিকে ঘুম এবং জাগরণের মাঝে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে । অর্ধদগ্ধ কাঠ, ভাঙ্গা কলসি, ছাই– ইত্যাদি যাহা শ্মশানে ইতঃস্তত পড়িয়া রহিয়াছে তাহাই যেন তিনি তাঁহার স্বপ্নযাত্রায় দেখিতে পাইলেন । অর্থাৎ আমাদের অতিপ্রিয় কবির চোখে সাঁকো জাগিয়া উঠিয়া পুনরায় ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে আর তাহা হইতে উত্থিত শব্দ রাতের নিস্তদ্ধতাকে উচ্চকিত করিয়া তুলিতেছে–যেন মহানগরীর উন্মত্ততায় তিনি আবার জাগিয়া উঠিতে চাহিতেছেন, কিন্তু তাঁহার শরীর নিস্তেজ হইয়া আসিতেছে, এবং তিনি আরও বুঝিতে পারিলেন যে তাঁহার শরীরের রক্ত মহানগরীর রাস্তাকে প্লাবিত করিয়া ধানসিড়ি নদীর ক্ষীণপ্রবাহকেই যেন জাগাইয়া তুলিতেছে । সময়ের এইক্ষণে আমরা যাহারা স্বপ্নযাত্রী তাহারা কবির বিশেষ একটি ভাবনাকে জানিয়া লইব, ‘আমার তরুণ দিন তখনো হয়নি শেষ….।’ এবং তাঁহার বোধ সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হইবার আগেই তিনি বুঝিলেন, নাগরিক কোলাহলকে দীর্ণ করিয়া একটি এম্বুলেন্স তাঁহার অতি নিকটে আসিয়া ভিড়িয়াছে এবং মানুষের চিৎকার এবং ক্রন্দন অতিক্রম করিয়া তাঁহার স্বপ্নযাত্রায় শেষ দৃশ্যটি যেন তাঁহারই চোখের পর্দায় ভাসিয়া উঠিতেছে– তিনি কিশোর হইয়া একটি ফড়িঙ্গের পিছনে তীব্র ছুটিয়া চলিয়াছেন, কিন্তু শান্ত বাতাসের প্রবাহে ফড়িঙ্গটি উহার বর্ণময় উজ্জ্বল পাখা ভাসাইয়া জঙ্গল-গভীরে সবুজের পানে ছুটিয়া চলিয়াছে, যাহা আমাদের প্রিয় কবির দৃষ্টিতে আবছা হইয়া ক্রমান্বয়ে দৃশ্যাতীত হইয়া উঠিতেছে, এবং ছোট্ট নদীর সাঁকোটি যাহা রঙধনু হইয়া উঠিয়াছিল, তাহাও ক্রমে ক্রমে অদৃশ্যমান হইয়া উঠিতেছে । বোধ-বিলুপ্তির ঠিক এইক্ষণে কবির মনে হইল– তাঁহার জীবন ছিল নিতান্তই উদ্‌ভ্রান্তির, আর দিগন্তের পানে ধাবিত এই ফড়িঙ্গের স্বপ্ন লইয়া পৃথিবী এখনও আপন বৃত্তে ঘূর্ণায়মান, যখন সময় সরলরেখায় সম্মুখপানে দ্রুতই ছুটিয়া চলিয়াছে !

নিউইয়র্ক/ আগষ্ট ২৫, ২০১২

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চয়ন খায়রুল হাবিব — সেপ্টেম্বর ১, ২০১২ @ ৫:১৭ পূর্বাহ্ন

      আমিতো ‘মানব’কে বলি ‘খেকো’!তাকে ‘কবিতাখেকো’ করবার একটা মরনপণ আন্তরিকতা এখানে পাই। যুক্ততার পরেও একটা না বোঝা পরিসরঃ লেখকের নয়, পাঠক হিসাবে আমার। সেই না-বোঝা একটা দুরত্ব তৈরি করে, একটা সম্ভ্রম দাবি করেঃ তবে যুক্ততার দায় শোধ করে পুরাপুরিঃ ”রাতের অন্ধকারে মন বাঁকাইয়া যায়, যেইভাবে আলো ব্লাকহোলে বাঁধা পড়িয়া থাকে ।”…একটা দেউলিয়া, আক্ষরিক অর্থেই অর্থহীন সাহিত্যসভায় অনেক, অনেক পরমার্থের ইন্ধনও যোগায়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চয়ন খায়রুল হাবিব — সেপ্টেম্বর ১, ২০১২ @ ৩:৩০ অপরাহ্ন

      আরেকটা মনে হ’লোঃ দুই বাংলার সামাজিকতা, রাজনীতি, সংস্কৃতি ব্যাক্তির নিউরোলোজির গহন কি প্রাথমিক পর্বেও পৌঁছাতে পারে নাই, উৎসাহিও নয়! ফলে বারবার ব্যাক্তিত্বের সাথে সমাজের বিকাশের একটা দ্বন্দ এবং গুম! জীবনানন্দের ক্ষেত্রে যা অন্যমনস্কতার আড়াল! যোগসূত্রের দুয়ারগুলা এই বয়ানে সুখবোধ্য এবং স্বচ্ছ হলেও ফড়িং, স্বপ্নের… অনোমেটাপাইগুলা প্রলম্বিত ক্রিয়াপদে প্রায়ই বর্নচ্ছটা হারিয়েছে!তবে নিউরোলজি এবং নৈবেদ্য’র সাযুজ্য তৈরির প্রয়াসটা অত্যন্ত সাহসী, অভিনন্দনযোগ্য এবং লক্ষ্যভেদি!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মিঠেল রোদ — সেপ্টেম্বর ২, ২০১২ @ ১২:১০ অপরাহ্ন

      চমত্কার কবিতা ভাল লাগল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taposh Gayen — সেপ্টেম্বর ২, ২০১২ @ ১১:০০ অপরাহ্ন

      প্রিয় চয়ন,

      শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাঁইজী লালন, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, জগদীশ্চন্দ্র বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, এস এম সুলতান–বাংলার এই প্রধান পুরুষদের নিয়ে আমার পূর্ব-প্রকাশিত ‘গদ্য-স্বপ্ন-কবিতা’ সিরিজের এইক্ষণের নৈবেদ্য কবি ‘জীবনানন্দ দাশ’ । এখানে ‘জীবনানন্দ-কে’ নিয়ে আপনার সামাজিক তথা ভাষিক পর্যবেক্ষণকে আমি গভীরভাবেই লক্ষ্য করছি । ভবিষ্যতে আমি আমার সচেতনতায় হাত রেখে এই লেখার কিছু ‘এডিট’ করব বলে আশা করছি ।

      আপনার ভাষার মাধুর্য, কথনের জটিলতা এবং পরিশেষে তার বিচিত্রগামিতা আমাকে মুগ্ধ করে । শুভেচ্ছাসহ, তাপস/ নিউইয়র্ক ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন hasan shahriar — সেপ্টেম্বর ৪, ২০১২ @ ২:১০ পূর্বাহ্ন

      একজন মানুষ তার অস্তিত্বের প্রকাশ দেখে তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে, তার কাজের মূল্যায়নে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা সব জায়গার মত ভারতবর্ষকেও বিধ্বস্ত করেছিলো।চারিদিকে দুর্ভিক্ষ, বেকারত্ব,দারিদ্রতা! কবি জীবনানন্দ দাশ সে সময় ইংরেজী সাহিত্যে মাষ্টার্স করে কলকাতার সিটি কলেজে মাস্টারি শুরু করেন। এই রকম একটা প্রতিভা আচমকা তার চারপাশে দেখলেন অজস্র নপংসুক! তার ‘অন্ধকার’ যেনো একটা আর্তনাদ। “সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি কোটি শুয়োরের আর্তনাদে উৎসব শুরু করেছে/ হায়, উৎসব/ হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে/ আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি/ অন্ধকারের স্তনের ভিতর যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মত মিশে থাকতে চেয়েছি/ কোনোদিন মানুষ ছিলাম না আমি/ হে নর,হে নারী/ তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনোদিন/ আমি অন্য কোনো নক্ষত্রের জীব নই/ যেখানে স্পন্দন,সংঘর্ষ,গতি,যেখানে উদ্যম,চিন্তা,কাজ/ সেখানেই সূর্য,পৃথিবী,বৃহস্পতি,কালপুরুষ,অনন্ত আকাশগ্রন্থি/ শত শত শূকরের চিৎকার সেখানে/শত শত শূকরীর প্রসববেদনার আড়ম্বর/এইসব ভয়াবহ আরতি”! কবির ‘বোধ’ কি তার আত্মপ্রকাশের তীব্র আকাংখা নয়? “আলো-অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরে / স্বপ্ন নয়,-কোন এক বোধ কাজ করে!/ স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়- ভালোবাসা নয়/ হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়” ! ……… “ আমি চলি,সাথে সাথে সেও চ’লে আসে/ আমি থামি-/ সে-ও থেমে যায়” । আবার কখনো কখনো কবির কাছে একে মনে হয়েছিলো বিপন্ন বিস্ময়! “জানি-তবু জানি/ নারীর হৃদয় –প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি/ অর্থ নয়,কীর্তি নয়,স্বচ্ছলতা নয়-/আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে/ আমাদের ক্লান্ত করে/ ক্লান্ত-ক্লান্ত করে/ লাশ কাটা ঘরে/ সে ক্লান্তি নেই/ তাই/ লাশকাটা ঘরে / চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের প’রে” (আট বছর আগের একদিন )। এই বোধ, এই বিপন্ন বিস্ময় কবিকে করেছিলো নিঃসঙ্গ; ‘বনলতা সেন’র মত একটা মেটাফিজিক্সে কবি পেয়েছিলেন ‘দুদন্ড শান্তি’! আরেক কবি লর্ড বায়রন এই বিপন্ন বিস্ময় হয়ত খুঁজে পাননি কিন্তু তিনি প্রকৃতির মাঝে নয়, মানুষের মাঝেই দেখেছিলেন নিঃসঙ্গতা(solitude)! “ to sit on rocks, to muse o’er flood and fell,/ to slowly trace the forest’s shady scene,/ where things that own not man’s dominion dwell,/ and mortal foot hath ne’er or rarely been;/
      to climb the trackless mountain all unseen,/ with the wild flock that never needs a fold;
      Alone o’er steeps and foaming falls to lean;/
      this is not solitude, ’tis but to hold/ converse with Nature’s charms, and view her stores unrolled./

      but midst the crowd, the hurry, the shock of men,/ to hear, to see, to feel and to possess,/ and roam alone, the world’s tired denizen,/ with none who bless us, none whom we can bless;/ minions of splendour shrinking from distress!/ none that, with kindred consciousness endued,/ if we were not, would seem to smile the less/ of all the flattered,followed, sought and sued;/ this is to be alone; this, this is solitude!”

      প্রিয় তাপস গায়েন, আপনার এই অসাধারন পর্যবেক্ষনটির সাথে আপেক্ষিকভাবে হলেও এই প্রশ্নটা যোগ করতে চাই;কবির অথবা আমাদের এই উদভ্রান্তির মূল কোথায়?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taposh Gayen — সেপ্টেম্বর ৫, ২০১২ @ ৬:৩২ পূর্বাহ্ন

      প্রিয় হাসান শাহরিয়ার,

      মানুষের জৈবসত্তার মূলেই রয়ে গেছে তার ‘উদ্‌ভ্রান্তি’–যা তার অস্তিত্বেরই সমাঙ্গ–জীবনানন্দ যাকে বোধকরি ‘বিপন্ন বিস্ময়’ হিসেবে জেনেছেন, যাকে আমি আমার বর্তমান লেখায় ‘মানবের উদ্‌ভ্রান্তি’ বলে আখ্যায়িত করেছি । আপনি কবি লর্ড বায়রনের বয়ানে আমাদের জানিয়েছেন– the world’s tired denizen/ with none who bless us, none whom we can bless!
      বিংশ শতাব্দীর কোয়ান্টাম তত্ত্বের অন্যতম প্রধান পুরোহিত, বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ, ঠিক এমনটি বলেছেন, “for the first time in the course of history modern man on this earth now confronts himself alone.” সেই কারণেই এই স্বপ্নযাত্রায় শ্মশান-যাত্রীদের মুখাবয়ব আকৃতিহীন, অস্পষ্ট ! ফ্রয়েড দিচ্ছেন একই অভিমত তাঁর “Civilization and Its Discontents” গ্রন্থে ।

      অনেক শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসাসহ, তাপস গায়েন/ নিউইয়র্ক

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com