নজরুলের কৈশোরকাল

জিয়া হাশান | ২৮ আগস্ট ২০১২ ১১:১৮ অপরাহ্ন

প্রাইমারি স্কুলের পাঠ্যবইয়ে নজরুল-জীবনীর প্রথম পাঠ। তাতে ‘দুখু মিয়া’ ছিল শির উঁচু করা। তাঁর শিশুকালের দুঃখময় কালটুকুই মুখ্য। তারপর তাঁর সাহিত্যের সঙ্গে টুকরো টুকরোভাবে বাকী জীবনীর একটা রেখাপথ জানা হয়েছে। তবে তাঁর কৈশোর, সবচেয়ে অনিশ্চিত, অসহায় কাল নিয়ে কোন লেখা কখনো চোখে পড়েনি।
keo-vole-na-keo-vole.jpg
কয়েকদিন আগে শাহবাগে দেখি একটা বই, কেউ ভোলে না কেউ ভোলে। লেখক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। নজরুলের গানের মুকুট পরা দেখে বইটি হাতে নেই। দু‘পাতা উল্টে বুঝি, বইটিতে লেখকের জবানীতে নজরুলের কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তীর্ণের দিনগুলো উৎকীর্ণ।

নজরুলের বন্ধু শৈলজানন্দের দাবি ‘আমার সৌভাগ্য, আমিই নজরুলের একমাত্র বন্ধু যার কাছে তার জীবনের গোপনতম কথাটি পর্যন্ত সে অকপটে প্রকাশ করেছে।’ আর এ হৃদয়ে হৃদয়ে বন্ধুত্বের হাতেখড়ি কৈশোরে। নজরুল তখন ময়মনসিংহ, মাথরুনসহ বিভিন্ন জায়গায় টক্কর খেয়ে শেষে থিতু হয়েছেন বাড়ির কাছে রাণীগঞ্জের শিয়াড়শোলে। মেধাবী হওয়ার সুযোগে স্থানীয় রাজার স্কুলে মাইনে ছাড়া পড়া, বিনা খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। উপরন্তু হাতখরচের জন্যে রাজবাড়ি থেকে সাত টাকা মাসোহারা। যার সিংহভাগ, কোন কোন মাসে পুরোটাই মায়ের নাম করে ছোট ভাই আলি হোসেন এসে নিয়ে যায়।

নজরুলের তখন আবাস রাণীগঞ্জের রায়সাহেবের ফুলবাগানের পাশে ছোট একটি মাটির ঘরে। খড়ে ছাওয়া সে ঘরের নাম ‘মহামেডান বোর্ডিং’। আর শৈলজানন্দ হলেন রায়সাহেবের মেয়ের ঘরের মা হারা নাতি। থাকেন তার প্রাসাদে। দুজনই যেহেতু কবিতায় মোহিত তাই খড়ের ঘর আর রাজপ্রাসাদের মধ্যকার পুরু দেওয়াল তাদের ঘনিষ্টতর হয়ে উঠতে কোন বাধ সাধতে পারেনি। বরং শৈলজানন্দের অবস্থা দাঁড়ায় ‘ইস্কুলের ছুটির পর বইখাতা বাড়িতে রেখে কিছু খেয়েই ছুটতাম ওদের বোর্ডিং হাউসে।’ সেখানে নজরুলের খাটিয়ায় বসে চলত ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা, চা খাওয়া, কখনো বাগানে, নির্জনতার খোঁজে কবরস্থানে ঘোরাঘুরি, এক জনের কবিতা আরেকজনকে শোনানো, একই বিষয় নিয়ে দু‘জনের সদ্য লেখা কবিতা পাঠ ইত্যাদি।

এসবের ফাঁকে ফাঁকে চলে কৈশোরিক নানা কান্ডকীর্তি। যেমন তাদের আরেক বন্ধু পঞ্চু। সে কলকাতা থেকে পার্সেলে নানা রকম শৌখিন জিনিস আনে। তাকে একটা এয়ারগান আনার জন্যে অনুরোধ করে নজরুল। পঞ্চু রাজি হয়ে যায়। নিজের নামের আগে ‘রায়বাহাদুর’ লিখে চটজলদি ব্যবস্থাও করে ফেলে। ব্যস, তা দিয়ে শুরু হয় নজরুলের নিশানায় হাত পাকানোর পালা। প্রথমে ক্রিশ্চান কবরস্থানের নির্জনতায়, তারপর পেঁপে বাগানে। সারিবদ্ধ গাছগুলো একেকটা বড়লাট, ছোটলাট, ম্যাজিস্টেট, এসডিও, ছোট দারোগা, বড় দারোগা হয়ে নজরুলের সামনে দাঁড়ায়। সে একটার পর একটা গুলি চালায়। ‘প্রথম যেদিন গুলি লাগল পেঁপের গায়ে, নজরুলের সেদিন সে কী আনন্দ।’ তারপর একদিন আসে পঞ্চম জর্জের পালা। তখন শৈলজানন্দ বাধ সাধে ‘না না ও বেচারা অনেক দূরে থাকে, ওর সঙ্গে আমাদের কী সম্বন্ধ? নজরুল বললে, ওই তো পালের ধাড়ি। ও তো ফট করে একদিন সবাইকে ডেকে বলে দিতে পারে, ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিয়ে দিলাম। ব্যস, একদিনেই আমরা স্বাধীন।’

কিন্তু পঞ্চম জর্জ তা না করায় ভারতের স্বাধীনতার জন্যে নজরুলকে নতুন পথ খুঁজতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা সে সুযোগ এনে দেয়। বাঙালি পল্টনে যোগদানের ডাক দিয়ে পোস্টার পড়ে রাণীগঞ্জের অলিতে গলিতে। তাজা-প্রাণের নজরুল সে ডাকে সাড়া দিতে উঠেপড়ে লেগে যায়। স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়ে উৎসাহ-উত্তেজনায় ছটফট করতে থাকে দিনরাত। কিন্তু সে তো ইংরেজ বিরোধী, তাদের তাড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাহলে ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধে যেতে তার কেনো এতো উৎসাহ? কারণ ‘নজরুল যুদ্ধবিদ্যা শিখে এসে ভারতবর্ষে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী গঠন করে দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াবে– তার এই গোপন মতলবের কথা সে বলেছিল একদিন।’

আর সঙ্গসুখের আশায় শৈলজানন্দও তাতে গলা মেলায়। তার মনে হয় ‘নজরুল চলে যাবে রাণীগঞ্জ ছেড়ে, আর আমি এইখানে একা পড়ে থাকব, রোজ দশটায় বইখাতা নিয়ে ইস্কুলে যাব, আর বিকেলে আসব– একঘেয়ে নির্বান্ধব এই নিরানন্দ জীবন আমি চাইনি।’ তাই কাউকে না জানিয়ে দুজনে মিলে আসানসোলে গিয়ে এসডিওর কাছে নাম লেখায়। তখন জানাজানি হয়ে যায় রাণীগঞ্জ জুড়ে। তারপর কলকাতায় ফিটনেটস পরীক্ষায়ও দাঁড়ায় দুজন পর পর। কিন্তু রায়সাহেবের কারসাজিতে হোক কিংবা আনফিট হওয়ার কারণে হোক শৈলজানন্দের আর যাওয়া হয় না। কিন্তু নজরুল খাকি হাফপ্যান্ট পরে ট্রেনে চেপে চলে যায় করাচিতে, বাঙালি পল্টনে। তখন আবার দুই বন্ধুতে চলে দীর্ঘ,দীর্ঘতর চিঠি চালাচালি। এক সময় বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে গেলে নজরুল কলকাতায় ফিরলে আবার মিলন হয় দুই বন্ধুতে।

নজরুলের জীবন গল্পময়। তার প্রতিটি বাঁকে ছড়ানো ছিটানো নানা গল্প। তাই গল্পের মতো করে মেদহীন নিটোল ভাষায় লেখা ২১৪ পাতার বইয়ে রয়েছে ঝুমুরের দল ছেড়ে রেলওয়ের গার্ডেসাহেবের বয় হওয়ার কাহিনী, তার কাছ থেকে বিদায়ের নাটকীয় ঘটনার বিবরণ। সর্বোপরি ‘তাঁর অজস্র প্রাণপ্রাচুর্য, অবিশ্বাস্যরকম হৃদয়ের উদারতা, বিদ্বেষ কালিমামুক্ত একটি পবিত্র মন আর নিরাসক্ত সন্ন্যাসীর মতো একটি আপনভোলা প্রকৃতির পরিচয় পাওয়া যায় এ বই-এর প্রতিটি পৃষ্ঠায়।’

free counters

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন MOORAD — আগস্ট ২৯, ২০১২ @ ২:৪০ অপরাহ্ন

      well. I like it.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফাতিহুল কাদির সম্রাট — আগস্ট ৩০, ২০১২ @ ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন

      এটা বইটার আলোচনা বুঝলাম। কারো পড়তে ইচ্ছে করলে কী করবে? বইটার স্থানীয় সংস্করণ প্রকাশের ব্যবস্থা করা গেলে ভালো কাজ হবে। আলোচনাটা সুন্দর হয়েছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mamun ferdous — আগস্ট ৩০, ২০১২ @ ১২:১৭ অপরাহ্ন

      Nice,new information

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com