কবিতাগুচ্ছ

উত্তম দাশ | ১৪ আগস্ট ২০১২ ১২:১৭ পূর্বাহ্ন

বিদ্যাসুন্দর

খবরের কাগজ অর্থ তা হলে
কালীঘাট ব্রিজে শীত-গ্রীষ্মে
সারাদিনমান দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েমানুষ,
টিভির বাংলা চ্যানেলগুলো আরেকটু রঙিন
ভদ্রপাড়ার শৌখিন ফ্ল্যাটের
জীবনমুখী ব্যবসা, ভারতীয় রাজনীতি
সোনাগাছির বাবুদের
ঘর পাল্টে পাল্টে কচি মাংসে
মুখ পালটানো- সনাতন
আমি তাহলে কার ঠাঁই যাব?
সেই চর্যাপদের সময় থেকে
যে পাহাড়তলিতে বাস করছি
তার চারদিকে সবুজ, বর্ষায় নতুন করে
ঢল নামে, আকাশে আকাশে বাজে
বিশুদ্ধ টোড়ি, আহারে মানব জন্মের
এত পুরস্কার, ভুসুকো সেই যে মাংসের
কথা বলেছিল, সেই মাংসের নেশাই
এ সভ্যতাকে শেষ করেছে – সনাতন
আমি আর শহরে যাব না।
হায় গ্রাম, সমাজবাদী ছোকড়ারা
তার আত্মাকে খেয়েছে, তারপরে নানাবিধ
দল-উপদল, মদনমোহনের
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
বালকরা ভোর থেকে সব শহরে চলেছে
ময়দানে দ্রব্যমূল্য কমানো হবে
নতুন বাজার জন্য বক্তৃতা হবে
দেশোদ্ধার হবে, পাখি সব করে রব

হায় গ্রাম, শেষমেশ সভ্যতার এই অর্থ
তোমার কপালে, নিজের সকল ফেলে
ফড়েদের ভালোবাসায় কপাল পোড়ালে?

ভুসুকো মূঢ়দের আর কি বোঝাবে
অপনা মাংসে হরিণা বৈরী
কথাটার অর্থ কালীঘাট ব্রিজে
মেয়েগুরো অনেকক্ষণ ভিজছে
আজ ময়দানে মিটিং মিছিল হয়নি
দিনশেষে মাসিরা খেতে দেবে না,
মাংস দেখিতে আর কত দিন
বাংলা কাগজ আর টিভি চ্যানেল
খদ্দের সামলাবে, আমাদের দেশে
ভারতচন্দ্র উদয় হয়েছেন,
তিনি বিদ্যাকে শেখাবেন
শরীর হলো এক ধর্মের নাম
সুন্দর একমাত্র সেখানেই উদিত হন।


এই রণসজ্জা

সেই রণসজ্জা পাণিপথ থেকে
তালিবানের হৃৎকমলে, মহাপ্রাণ অশোকের
কলিঙ্গ থেকে সুলতান মামুদের ভারত জয়,
বাবরের কামান গর্জন আর পলাশীর আমবাগান
ভিয়েৎনাম থেকে ইরান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
আর ট্রেড সেন্টারের বিস্ফোরণ, সেই
একই রণসজ্জা, দেশকালেবাহিত সেই একই
জিনের আলোছায়া, সেই একই বীর্য
জরায়ু থেকে জরায়ুতে সেই একই রণসজ্জা।

গৌতম বুদ্ধ কত যুদ্ধবিরতির কথা
বলেছেন কত শান্তির, একালের মহাত্মা
করমচাঁদ কি হলো তাতে কি হলো
এই মানবজাতির, স্বয়ং যীশু দেয়ালে দেয়ালে
তাঁর মৃত্যু টাঙিয়ে রেখেছেন কতদিন,
নতুন প্রফেট হজরত কি কঠিন বাস্তবতার
মধ্যে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ভালোবাসো।
আমাদের ভারতবিভাগ বলে গেছে
চেঙ্গিজ খানের রণসজ্জা কত সনাতন,
কয়েক লক্ষণ নারীর জরায়ু জানে কাকে বলে
স্বাধীনতা, কার জন্য মহাত্মাজী চিতায়
পুড়ে ছাই – রণসজ্জা মানব প্রজাতির
একমাত্র সত্য ইতিহাস, সেই জিন
নারী থেকে নাড়িতে বাহিত
তা হলে কেন এ আকাশ এই নীলিমার স্তূতি
এতদিন, এ তরণ্য সবুজে সবুজ মেলে শুষ্রুষার
এতকথা এতদিন, সমুদ্রের ‘তোহে জনমি পুন
তোলে সমায়ত’ এই সুন্দরের ধ্যান, মানুষ
তোমার জন্য এতদিন।

একদিন এই গ্রহ লুপ্ত হয়ে যাবে
মানুষের সব প্রেম হারাবে সঞ্চয়
দর্শনের বই থেকে শান্তিবার্তা
ব্রহ্মাণ্ডে বহমান কণামাত্র, মানুষ তুমিও এক কণা
বহমান ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আছো,
স্মৃতিহীন, প্রেমহীন, রণসজ্জাহীন
মানুষ এখন তুমি এক মৌল কণা
ব্রহ্মাণ্ডের কালো গুহা তোমার আশ্রয়

মানুষ তোমার সেই যুদ্ধবাজ পোষাক কি
পালটানো যাবে না
সামনে দেখো কালো গুহা
মানুষের সব অবসান
তখনো কি মানব নিজেকে পালটাবে না?

কালিদাস এসব জানতেন

এই সত্তরেও যে প্রেম উপজাত হয়
কালিদাস আপনি তার খোঁজ কখনো রাখেননি।
আমাদের রবীন্দ্রনাথ রাখতেন, তাঁর মতো প্রেমিক
ভারতবর্ষে কখনো জন্ম দেয়নি।
শরীরের কথা বললে আপনারা বিচলিত বোধ করেন
অথচ শরীর ছাড়া দৃশ্য-স্পর্শময় আর কোন
উপাদন আপনার সংগ্রহে নেই, প্রেমের যে কথা বলেন
ভালোবাসা, যুগযুগান্তর ব্যাপী যা অলৌকিক
দৃশ্যমালা তৈরি করে তারও তো শেষ অবলম্বন
এই শরীর, তাকে আপনি মারুন আর কাটুন
অস্তিত্বের সেই একমাত্র সম্বল, রবীন্দ্রনাথের
যে প্রেমের গান, বিন্দুমাত্র বায়বীয় নয়
শরীর তার মূল উপাদান, ভীরুরা তাতে
পরমাত্মা যোগ করে, উপনিষদ উসকে দেয়।

মাত্র একটি চুম্বন দান্তেকে বলতে পারে
এই মাত্র বিয়াত্রিচের সঙ্গে কথা বলে এলুম
লরাকে দেখলুম চোদ্দটি সন্তান নিয়ে
হিমশিম খেতে কিন্তু এই জিনঘটিত
যে আবেগ তাকে তুমি শরীর ছাড়া আর
কি দিয়ে ব্যাখ্যা করবে, সেই সহজ দাহ্য
শরীর, ক্রিমির সহজ খাদ্য, মৃত্তিকা তাকে
একাত্মা করে নেয় কারণ তার শরীর ছাড়া
অন্য কোন উপাদান নেই

শরীরের এই উৎস খুঁজতে খুঁজতে এতদূর
রবীন্দ্রনাথ আপনার কবিতার কোন রহস্য
আমি স্পর্শ করতে পারতুম না
শরীরের সেই আদিম রহস্য বিন্দুটির
সন্ধান না পেলে, সেই এক মৌল
আলোক কণিকার মতো যা আইনস্টাইনকে
কোন দিন ঘুমুতে দেয় নি,
রবীন্দ্রনাথকে দেয়নি, কালিদাসকে দেয় নি
শেক্সপিয়র আপনি তো কোন দিন
ঘুমুতে জানতেন না, অরডেন অরণ্যের সেই
অরণ্যঘর আর অ্যানা হ্যাথওয়ে
একে তুমি শরীরতৃষ্ণা ছাড়া কি বলবে,
সপ্তাহ শেষে গ্লোব থিয়েটার ছেড়ে রাতের ফিটন
স্ট্রাটফোর্ড অন এভনের দিকে যাচ্ছে
প্রতিদিন আপনি রবীন্দ্রনাথ নতুন বউঠানকে
যে গান শোনাচ্ছেন এ সবই তো
দৃশ্যময় শরীরের মহিমা

কালিদাস এসব জানতেন
নইলে মেঘদূত কখনো লেখা হয়?

ডাকে

ডাকে, শক্তিদার চিতাকাঠ নয়
বিদ্যুৎ-উনান। রাজপুরে
যেতে আসতে দেখে যাই
মাঝে মাঝে ডাকে,
পদ্মপুকুরের এই সবুজ অরণ্য
এই দিঘি, আদিগঙ্গার কিছু অবশেষ
বসে থাকলে ডাকে,
শৈশবের সদাব্রত ঘাট
চৈতন্য মহাপ্রভূর স্নানে পুণ্য
ডাকে, আধুনিক বিদ্যুৎ-উনান।
বুকভরা কত অভিমান, হে কাতরতা
কত প্রেম, মারিষার ফকলু দাঁত
পেছনে রয়েছে, তবু ডাকে

যেতে যেতে তোমাদের দেখে নিই,
একজন বন্ধুর মুখ খুব মনে পড়ে
একজন শত্র“র মুখ আরো মনে পড়ে
প্রেমিকার স্তনের বন্ধন মনে পড়ে
আহারে, মায়ের সর্বপাপহর তাপহর
মুখম-লের হে অভিসার মনে পড়ে,
পদ্মার ভাঙন মনে পড়ে
বাবাকেও খুব মনে পড়ে
তুমি তো সর্বার্থ সাধক হয়ে প্রাণময়
তবু সেই ডাক শোনা যায়
যেন আন্দামান থেকে ফিরছি
হর্ষবর্ধনের সেই সাগর ফাটানো ডাক
ছেড়ে যাচ্ছি আন্দামান, ছেড়ে যাচ্ছি সেলুলার
ছেড়ে যাচ্ছি জাড়োয়ার, ছেড়ে যাচ্ছি
আদিম সেই উপবন,

ডাকে,
কবিতার জন্য কিছুদিন
আমাকে দেবে না
ধর চন্দন কাঠের বনে তুমুল বাদল
ধর বিদ্যুৎ বিকল,
শক্তিদার চিতাকাঠ
আধুনিক বিদ্যুৎ-উনান
অপেক্ষায় থাকে,
মারিষার ফকলু দাঁতের হাসি
প্রেমিকার স্তনে মৃদু শিহরণ
আমাকে ডেকেছে
থাকি, আরো কিছু কাল?


কক্সবাজার কবির টঙে কবিতাপাঠ

বাঁদিকে লাবণী সৈকত ডানদিকে ইনানী
নীচে টানা রাস্তা, সামনে তিনি নীলের সমারোহে-
লাবণীতে থৈথৈ গ্যালিভারের লিলিপুট দেশের
মানুষজন, ঝাউবনে বাজছে ধনপতি সদাগরের দোতারা,
আমরা দূর পর্যবেক্ষণে ভারত-বাংলার একগুচ্ছ কবি
কবিতা পড়বো কি, সামনে মহাকাব্য রচিত হয়ে রয়েছে।
এ মহাকাব্যের কোন লেখক পরিচিতি নেই, সেই আদিম কালের…

প্রকৃতির কাছে আমরা কবিরাও বড় অসহায়
তার রচনাকে লিপিতে কখনো অনুবাদ হয়
আমরা শুধু দেখতে পারি, বধির না হলে শুনতে
আমাদের শরীরের স্পর্শ-ইন্দ্রিয় শুধু জানে
সেই স্পর্শের মায়াজাল কেন এত অভিমানী

সুন্দরের কোন উপমা হয় না
ভাষাকে সে শুধু প্রত্যাখ্যান করে
কবির টঙে আমরা কবিতা পড়তে গিয়ে চন্দ্রাহত হয়ে আছি

পাহাড়ি গাছের ডাব এলো
কোমল শাঁসের ঘেরে বন্দী জল
আহারে কতদিন আমি মায়ের কোলে শুইনি,
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা
পাহাড় থেকে ঝোলানো এত বড় র‌্যাপারে দরিয়ানগর
আপনার স্বপ্নের মতো দুলছে
কবির টঙে এই কবিসভা
শীতের এই রোদে আমলকির মতো মনে হচ্ছে

আমি এখন শৈশব খুঁড়ছি
জারিরদোনার কুমিরের মুখ থেকে
যারা আমাকে উদ্ধার করেছিল
তাদের দিকে তাকিয়ে আমার পুরুষসিংহ পিতা
চোখ ফাটিয়ে কেঁদেছিলেন

সত্যি কবিরা কি অসহায় প্রকৃতির সামনে
কক্সবাজারে কবির টঙ থেকে
বঙ্গ-উপসাগর তার মহিমা ছড়াতে ছড়াতে
সে কথা বলে চলেছে অনর্গল।

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Chandrima Dutta. — আগস্ট ১৪, ২০১২ @ ৮:৪৯ পূর্বাহ্ন

      Akebare-e onyorokom kobita Aapnar uttamda. Ei somoy, somaj r tar neel-jontrona aabar o bisonno kore, kantar moto bidhe r bole– J tumi pathok sei tumi manush o to, ei bish-bish Lona samoyk shusrusa koro……. Kobita aasole tokhon-e kichhu daye mane pathok k jagaye onyo bodhe, onyo aaloy R Kobir Shrijoner sarthokota hoye to akhanei. Obosyo-e a sompurno aamar motamot. Aapnar Coxbazer……. kobitati aamake o bohudur niye gelo…… Ei sundar kobitagulir jonyo dhnyobad Kobik, Dhnyobad Sompadok mohasoyk o. Chandrima Dutta. Silchar. Assam.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুমার দীপ — আগস্ট ১৪, ২০১২ @ ১:০৩ অপরাহ্ন

      কবিতার কথাগুলো সত্য ও সুন্দর, ভাব ও ভাবনাতে আছে সুন্দরের ছাপ; কাব্যেও বেশ। কবিকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী — আগস্ট ১৪, ২০১২ @ ৪:৫৩ অপরাহ্ন

      এ এক নতুন জন্ম, অনন্য বৈভব
      এ এক সমুদ্রশস্য, সুপ্ত কলরব।

      উত্তম দাশ শ্রদ্ধাস্পদেষু,
      কলিকাল বড়ই তঞ্চক, আবার উপেক্ষা করাও বিপদ। মধ্যপথে যাঁহারা হাঁটেন, তাঁহাদের কেউ-কেউ লক্ষ্মনরেখার মধ্যস্থলেই রাবণ-বধের কার্যটি সম্পাদন করিতে পারঙ্গম। আপনাকে অভিনন্দন।
      গুণমুগ্ধ
      হাবীবুল্লাহ সিরাজী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন wali — আগস্ট ১৫, ২০১২ @ ১২:০৮ অপরাহ্ন

      kobi-ke ojosro shubhechchha… chamatkar kobita porha holo…kolkata gele oboshshoi baruipur-er padmapukur par-e jabo dekha korte…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mrinal basu chaudhuri — আগস্ট ১৯, ২০১২ @ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ন

      60 dashaker kobi Uttam Das amar priyo kobi o priyo manushder akjon….tar kobita khub sahaj saralvave hriday sparsho kare….ei kobitaguli akebarei annyarakam…gavir jibonbodher sange mishe ache tar anupam kabyabhasa….protiti kobitar madhye ache indriyatit ek banjona ja uttamdar kalome khub anayasei ase jai….ek sange 10ti amon ascharya kabita upohar debar janya uttamda o sampadakke shraddha janai

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com