র‌্যাডক্লিফের সুতো

মণীশ রায় | ১২ আগস্ট ২০১২ ১১:৪৮ অপরাহ্ন

শান্তিরঞ্জন যখন তার ছোটোভাই কমলরঞ্জনকে মোবাইলে ধরার জন্যে পাগলের মতো বোতাম টিপছে তখন ওর মা চৌকির উপর চিত হয়ে শোয়া, প্রায় জ্ঞান-শূন্য অবস্থা, হঠাৎ হঠাৎ চোখ খুলে চারপাশে তাকাচ্ছে আর প্রবাসী বড় ছেলের নাম ধরে গায়েবী স্বরে কঁকিয়ে উঠছে,‘ শান্তি, কইরে বাপ? অহনতরি আওনের সময় অইল না তর?’
এসময় মায়ের রক্তাক্ত চোখ দুটো ঘুরপাক খেতে থাকে ঘরের চারপাশে। যেন বড় ছেলেকে নিরন্তর খুঁজে চলেছে মা দময়ন্তী।
এরই মধ্যে বার কয় মুখে গঙ্গাজল পড়েছে । থুতনি বেয়ে সেই জল গড়াচ্ছে এখন। হুশ জ্ঞান কিছু নেই। ডাক্তার গতরাতেই আশা ছেড়ে দিয়ে মন শক্ত রাখার পরামর্শ দিয়ে গেছেন।
তবু অস্পষ্ট স্বরে বড় ছেলে শান্তি রঞ্জনের নাম জপে যাচ্ছে দময়ন্তী ।
সবাই ভাবছে বড় ছেলে শান্তিরঞ্জনকে এক ঝলক দেখার জন্যেই বুঝি বুড়ির দমটুকু আটকে আছে। ছেলেটাকে দেখতে পেলেই বুড়ি শান্তিতে চোখ বুঁজবে ।
পাড়া প্রতিবেশীসহ আত্মীয় স্বজন সবাই সেই মাহেন্দ্র ক্ষণটির অপেক্ষাতেই বসে আছে ধৈর্য ধরে।
শান্তিরঞ্জনের ছোটো ভাই কমলরঞ্জনের বউ শেফালি বুড়ির মুখ থেকে গড়ানো জল পরিষ্কার গামছার খুট দিয়ে অতি যত্ন মুছে দিচ্ছে।
মাথার কাছে মুঠো মুঠো আগরবাতি জ্বলছে আর তা ধোঁয়া হয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে।
দময়ন্তীর সারামুখ তিলক চর্চিত, করবী ফুলের একটি মালা কে যেন সকাল বেলায় পরিয়ে দিয়ে গেছে গলায়। সেটি এই দুপুর বেলায় শুকিয়ে চিমসে গেছে।

মেঝের উপর শতরঞ্চি পাতা। তাতে বশে কজন মহিলা গোল হয়ে বসে সুর ধরে নাম সংকীর্তন শুরু করেছে। উদ্দেশ্য একটাই। পৃথিবী থেকে বিদায় নেওযার সময় যেন দময়ন্তী ভগবানের স্পর্শ পায় চারপাশে।
কমলরঞ্জন এই কাজটাই মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পিতার মৃত্যর সময় সে ছিল মাইনর। কিছুই বুঝত না তখন। শুধু কান্না করত। বড় ও একমাত্র ভাই শান্তিরঞ্জনকে তখন বাবার বাজে মালের ব্যবসা দেখা থেকে শুরু করে পান সুপারি কেনা পর্যন্ত সব একা একা সামাল দিতে হয়েছে।

তাদের ব্যবসা তখন আখাউড়া বাজারে। বাংলাদেশের রেলওয়ে জংশন শহর। নিরিবিলি জায়গা । এক অর্থে একে গ্রামও বলা চলে। কেননা, গ্রামের শান্ত সমাহিত পরিবেশ বলতে যা যা উপকরণ প্রয়োজন তার সবই এখানে আকাতরে মেলে। কমলরঞ্জন চোখ বুঁজলে সেসব দৃশ্য দেখতে পায়। যে দামাল কিশোরটি বাবার মৃতৃর পর ক্লাস এইটে পড়া অবস্থায় ত্রিপুরায় এক পিসির কাছে চলে এসেছিল নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভেবে, চোখ বুঁজলে কমলরঞ্জন এখনো সেই কিশোরটিকে টের পায় নিজের ভেতর । বড় হয়ে যতবার আখাউড়া গেছে ততবার হাতড়ে ফিরেছে সেইসব অজানা অপ্রকাশিত স্মৃতির গন্ধমানিক , যা চোখ বুঁজলে ওর নাকে আসে, ওকে বিবশ করে তোলে, এখনো ।

ওদের বসত বাড়িটা ছিল রাধানগরে। একপাশে রাণীর দীঘি অন্য পাশে ধান ক্ষেত। সবুজের ছড়াছড়ি।
জংশনের পাশ ঘেঁষে ওদের বাড়ি। ওরা সময় টের পেত রেল গাড়ির হুইসেলের শব্দে। বিকাল তিনটার দিকে কর্ণফুলী ঢাকার উদ্দেশ্যে আখাউড়া ছাড়ে। চিটাগং থেকে যখন ওদের বাসার সামনে দিয়ে জংশনে গিয়ে থামত তখন সবাই টের পেত তিনটার কর্ণফুলি স্টেশনে এল।
কেউ রেলগাড়ি ধরতে স্টেশনে গেলেও একই অবস্থা। যে পর্যন্ত গাড়ি এসে স্টেশনে না থামছে সে পর্যন্ত বাড়ি থেকে রওয়ানা হওয়া বারণ। যে কেনো গাড়ি জংশনে অন্তত আধঘন্টাখানেক হলেও দাঁড়াবে । সেই হিসাব কষে তারপর বাড়ি থেকে রওয়ানা দেবে সবাই।

গভীর রাতে ঘুমটুমগুলোও ওদের ছিল ট্রেন নির্ভর। রাত বারটার সুবর্ণা কিংবা রাত তিনটার তূর্ণা নিশীথা ট্রেনগুলো ওদের জানান দিয়ে যায় রাত এখন কত। অদ্ভুত মাদকতায় ভরা ছিল সেই সকল রাত ও দিনগুলো।
কমল রঞ্জনের মনে হয় তখন সে এক ঘোরের ভেতর বসবাস করত। মানুষগুলোর ভালবাসা , আন্তরিকতা ও মমত্ববোধ এখনো ভাবলে স্বপ্নের মতো লাগে। চোখ বুঁজলে দীঘির টলটলে জলের মতো সেগুলো চোখের সামনে ভাসে। বুক ভরা হাহাকার আর ক্রন্দন নিয়ে স্বপ্নের সেই দীঘিটার জলে ডুব দিতে চায় ওর উপোসী মন ।

আজ আখাউড়া থেকে দাদা শান্তিরঞ্জনের আসবার কথা । কতদিন দাদার মমতা মাখানো মুখখানা দেখা হয় না। আজ দেখা হবে। ভাইর সাথে ভাই। রক্তের সাথে রক্ত। হাজারটা কাজে ব্যস্ত থাকার পরও মন নেচে উঠছে। কত যে স্মৃতি ,
চড়ুই পাখির মতো এখান ছেড়ে ওখানে বসতে চাইছে।
নৌকা বাইচের স্মৃতিটা তো মনে হচ্ছে সেদিনের কথা। তিতাশের জলে নৌকাবাইচ দেখতে যাওয়াটা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর স্মৃতির একটি। একটার পর একটা নৌকা ছুটছে, মাঝিদের মুখে মুখে ফিরছে জারি -সারি গানের বুলি। নান জায়গা থেকে প্রতিযোগীরা অংশ নিতে এসেছে এখানে।

রাধানগরের একটা কুশা নৌকা অজিত মাঝির নেতৃত্বে নৌকা বাইচে অংশ নিচ্ছে। কখনোই জেতার ইতিহাস নেই ওর। তবু ওরা দুই ভাই সহ সকল রাধানগরবাসী অজিত মাঝিকেই গলা ফাটিয়ে উৎসাহ দেয়।
এই প্রতিযোগিতা দেখতে গিয়ে দাদা ওকে নানা কিছু কিনে দিত । কখনো তা ছিল পেঁয়াজ মরিচ মাখা চানাচুর, কখনো শন-পাঁপড়ি, আবার কখনো বা কাজীপাড়ার লম্বা গোপাইলার হাতে ভাজা ক্ষুদে ক্ষুদে পেঁয়াজু । দুই ভাই মিলে সেগুলো খেত আর চোখ ভরে নৌকা বাইচ দেখত। চোখ থাকত রাধানগরের অজিত মাঝির নৌকার উপর। কোনোক্রমে নৌকাটা সামান্য এগোলে উত্তেজনার সীমা পরিসীমা থাকত না। দাদা জিহ্বা আর দাঁতের কারসাজি করে তীক্ষ্ণ হুইসেলের শব্দ করতে পারত। ওর সেই শব্দ ছড়িয়ে পড়ত নদীর পাড়ে দাঁড়ানো সকল দর্র্শনার্থীদের ভেতর।
কমল গর্ব ভরা চোখে ভাইকে দেখত। চেষ্টা করত মুখ থেকে এরকম শব্দ বের করতে , পারত না। যত ব্যর্থ হত, তত শ্রদ্ধা বাড়ত দাদার প্রতি।

সেই দাদা আসছে আজ। সর্বশেষ মোবাইলে যোগাযোগ হয়েছে সকাল দশটায়।
‘কমল, আমি আইতেছি। তুই চিন্তা করিছ না। মার শরীর অহন ক্যামন ? ’
‘বালা না রে দাদা। তোর জন্যই দমটা আটকাইয়া রইছে। একটু পর পর খালি তোর কথা বলতেছে, শান্তি অহনতরি আইলি না বাপ? ’বলে চুপ হয়ে যায় কমল।
ওপাশ জুড়ে নীরবতা। শান্তির গলায় কোনো কথা নেই। অস্পষ্ট কান্নার শব্দ শুনতে পেল কমলরঞ্জন। লাইনটা কেটে গেল।
দ্বিতীয়বার রিং এল বর্ডার এলাকায় পৌঁছে। খুব প্রাণবন্ত মনে হচ্ছিল দাদার কন্ঠস্বর ।
‘হ্যারে , কত বছর পর মায়েরে দেখতে যাচ্ছি? ’
‘৫ বছর । অমার মেয়ের বিয়েতে আইছিলা। ওই তো শেষ। ’
‘অ। তোর নাতনির বয়স কত হইল রে?’ শুধায় শান্তি রঞ্জন।
‘চাইর বছর এক মাস। ইশকুলে যায়। চঞ্চল।’ কমল সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়।
কমলের মুখ ফস্কে বেরিয়ে যাচ্ছিল,‘ তোমার মেয়ে শ্বেতার খবর কি?’ পরক্ষণেই থেমে যায়। চোখের সামনে ভাসে দাদার একমাত্র মেয়ের গলায় ফাঁস দেয়া লাশের দৃশ্য। নিজেকে সম্বরণ করে নেয়।
‘বা: বড় হয়ে গেছে। জানিস মায়ের জন্য মনটা বড় আকুল হয়ে আছে। কখন যে মাকে দেখব। ’
‘মা-ও তোমার কথা বলছে। হয়তো.তোমার জন্যই মা আপেক্ষা করতেছে। আস দাদ।’। কমলের গলা আবেগে বুঁজে আসে।
লাইনটা কেটে যায়।

পাশ থেকে দালাল হারূণ বলে ওঠে,‘ কাকু, এইকানে মোবাইল বাইর কাইরেন না। সতর্ক থাকিয়েন। ’
শান্তিরঞ্জনের শরীর শিরশির করে ওঠে অজানা আশঙ্কায়। অবৈধ পথে ওর যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না আগরতলায়। বরাবরই নিরিবিলি শন্তিপ্রিয় মানুষ সে। কোনো হুজ্জোতির ধারে কাছে নেই। এমন কি , নিজের একমাত্র মেয়ের আত্মহত্যা নিয়েও সে কোনোদিন কারো কাছে নালিশ করেনি। যে বখাটে ছেলের কারণে শ্বেতা গলায় ফাঁস দেয়, গ্রামবাসীর হাজারটা অনুরোধ সত্বেও পুলিশের কাছে সেই নামটি পর্যন্ত বলেনি।

মেয়ের মৃত্যু নিয়ে কেউ কিছু বললেই সে মাথার উপর আকাশে বসে থাকা ভগবানকে দেখায় , তারপর নিজের কপালে আঙুল ছুঁইয়ে বলে ওঠে,‘ সব কপালে আছিল। কপাল কি খন্ডানো যায়?” এসময় ওর চোখ ভরে আসে জলে।
সেই মানুষটি হারূণকে বলে,‘ কোনো অসুবিধা হইব নাত হারূণ? ’
‘আপনি কুনু চিন্তাই করবেন না কাকা। আদঘন্টার মইদ্যে হেইপার গিয়া ভাত ছালুইন খাইবেন। কুন চিন্ত নাই। ’
হারুণ বুক ফুলিয়ে কথাগুলো বলে।
ওরা দুই পুরুষ ধরে লোক আনা-নেয়া করে এপার-ওপারে। আখাউড়া বাজারে লোকদেখানো একটা পান-বিড়ির দোকান রয়েছে। সেখানেই যত লেনদেন হয় এসবের।

শান্তিরঞ্জন হারূণের বাবার সাথে ওপারে গেছে বেশ কবার। ছেলের সাথে এই প্রথম।
‘আমি আমার মায়েরে গিয়া শেষ দেখটা দেকবার পারুম তো। ?’ আর্তি ঝরে শান্তিরঞ্জনের কন্ঠে।
‘কিতা যে কন , কাকু। তুমারে আমি নিজে লইয়া আইছি। মেইনবর্ডার দিয়া নিয়া যামু বইলা। তুমার মা কি আমরার মাসিমা না? চুপ থাক। আমি ভিতরে তো যাই। ’ বলে সে মিলিয়ে যায়।
শান্তিরঞ্জন একা দাঁড়িয়ে থাকে । ওর চোখের সামনে বারবার করে মায়ের মুখখানা ভেসে উঠছে।
যত সময় এগোচ্ছে একটাই প্রশ্ন বুকের ভেতর সুঁচ বেঁধাচ্ছে, শেষ দেখাটা হবে তো মায়ের সাথে?
মায়ের মুখখানা মনে হবার সাথে সাথে মেয়ের ঢলঢল আহ্লাদি চেহরাটাও বিদ্যুৎ ঝলকের মতো চোখের সামনে চলে আসে।
‘বাবা, প্রেসারের ওষুদডা যে খাইলা না? লও, ওষুদডা লও।’ বাবাকে প্রতিবার মনে করিয়ে ওষুদ খাওয়ানোটা শ্বেতার নিয়মিত দায়িত্ব ছিল। মৃত্যুর একদিন আগেও কলেজ থেকে ফিরে বাবার দুপুরের ঘুম ভাঙিয়ে ওষুদ খাইয়েছিল।
শান্তি রঞ্জন স্পষ্ট দেখতে পায় নিজের মেয়েকে। সেই মেয়ে একটা রাস্তার ছেলের কথা সহ্য করতে না পেরে গলায় দড়ি দিল?
শান্তিরঞ্জনের দুচোখ ভরে আসে জলে । যেন মাকে নয় , নিজের মেয়েকে আজ দেখতে যাচ্ছে আগরতলার ধলেশ্বরে!

২.
নাম ওর হারূণ-উর রশীদ। বর্ডার এলাকায় ওর পরিচিতি দালাল হিসাবে। দালালি বলতে এখানকার লোকজন বোঝে মানুষকে এপার-ওপার করা।
মুনশীর গলা দিয়ে রক্ত ঝরছে। আখাউড়া সদর হাসপাতাল বলেছে – আল্লা – আল্লা কর।
মুনশী অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। তার ছেলেরা আব্বার শেষ চিকিৎসাটা ভালভাবে করবে বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাইলে কী করা? হারূণকে খবর দাও, সে-ই আগরতলার নামকরা সরকারী হাসপাতল জিবিতে রোগীকে ভর্তি করিয়ে দেবে। এতে চিকিৎসাটাও ভাল হবে আবার খরচাপাতির ধাক্কাটাও তেমন বুকে বাজবে না।
মেয়ের বিয়ে । ভাইদের হাতে সৌদি রিয়েল, কেনাকাটাটা কোথায় করবে? কেন , আগরতলার হকার্স কর্ণার তো আছে। দিনে দিনে ফেরা যায়। হারূণকে বলে সেরকম ব্যবস্থা করে নিলেই হয়।

এসব আশির দশকের কথা । পায়ে পায়ে শপিং মল হয়নি , মফস্বলগুলো বিল্ডিং-বিল্ডিং-এ ছেয়ে যায়নি, রাস্তায় রাস্তায় যানজট তৈরি হয়নি, প্রাইভেট কার, সিএনজি আর বাস -ট্রাক মিলে এক ভজঘট পরিবেশ কেউ চিন্তাও করত না তখন । কারণ, মানুষের হাতে অত কাঁচা পয়সা ছিল না। শান্ত স্নিগ্ধ গাছগাছালি ঘেরা এক একটি মফস্বল শহর। মানুষের জীবন শান্তিময় ও নিরূপদ্রব, পদ্মদীঘির টলটলে জলের মতো অপরূপ ও মালিন্যহীন।
তখন আখাউড়া থেকে এই বর্ডার এলাকায় আসতে হত রিক্সায়। উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো রাস্তা। এই কাত হয় তো পরক্ষণে চিত।
হারূণ সবে কিশোর তখন। বাপের সাথে শিঙ্গারবিল এলাকায় কাজ করে। লোকজনদের জড়ো করা, নিজেদের বাড়িতে বসতে দেয়া এবং ওপারে নিশীথ ঘোষের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা চিনিয়ে পৌঁছে দেয়া ওর কাজ । এ-বাড়ি ও-বাড়ির ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে চলে আসতে হয় ওপারে। সাইকেল নিয়ে লাইনম্যান ঘোরাঘুরি করে বর্ডার এলাকায়। ও সবার সাথে সম্পর্ক রেখে চলে। ওর ইশারা পাওয়ার অর্থ হচ্ছে সব ঠিক আছে। তোমরা এবার লোকজনদের নিয়ে ওপারে যেতে পারো। আবার ওপার থেকে ফেরার সময় দলবদ্ধ লোকগুলোকে নিশীথ ঘোষের লোকজন রাস্তাা চিনিয়ে নিয়ে আসে এপারে।
এরকম আনা -নেয়া করতে গিয়ে দালালিতে হাতে খড়ি হারূণের। । এখন তো সে-ই সর্বেসর্বা।
আখাউড়া বাজারে ওর পান -সিগারেটের দোকান রয়েছে। সে সবকিছু পরিচালনা করে এই দোকানে বসে। শান্তিরঞ্জন বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তার মা অসুস্থ জেনে সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,‘ কাকু, আপনি চিন্তা কইরেন না। মেইন বর্ডার দিয়া আপনেরে নেওনের ব্যবস্থা করুম। চিন্তা কইরেন না। ’
‘ডর করেরে হারূন। অহন বয়স অইছে তো, তর বাপের আমলে তো সূর্য ঘরে সিনেমা দেখতে কত গেছি। শোলে দেখতে পাঁচবার গেছি। আহারে, হেই কথা মনে অইলে অহনো মনডা য্যান কী করে। অহন ডর করে। বড় ডর।’
‘ডরাইলেই ডর। বাদ দেন। আমি যামু আপনেরে লইয়া। কুনু চিন্তাই কইরেন না।’ হারূণ উত্তর দেয়।
একথায় বড় আর্দ্র হয়ে ওঠে শান্তিরঞ্জনের মন। চোখের সামনে মায়ের ফ্যাকাশে রূগ্ন চেহারাটি ভেসে ওঠে।
শান্তিরঞ্জন হারূণের হাতটা চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করে,‘ মায়েরে শেষ দেহাটা দেখবার পারুম তো হারূণ?’
‘কাকা, আমরা বাপের আমল থেইক্যা এই লাইনে আছি। আমি নিয়া যামু আপনেরে। ভয় পাওনের কী আছে? আপনি রাজার মতো মেইন বর্ডার দিয়া বেডার মতন হাঁইটা যাইবেন। আমার সেই লাইন-ঘাট করা আছে। ডরানের কি আছে?’ পুনরায় আশ্বস্ত করে শান্তিরঞ্জনকে।

এখন হারূণ ওকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ভেতরে গেছে লাইন তৈরি করতে। ঘন্টাখানেক হল তবু ফেরার নাম নেই।
শান্তিরঞ্জন একাকী রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে বর্ষার হাওয়া খাইছে। যত সময় গড়াচ্ছে তত মায়ের জন্যে উৎকন্ঠা বাড়ছে। এরই মধ্যে কমল ওকে দুবার মোবাইল করে ফেলেছে। দাদা, তোমার আর কদ্দুর। মার নি:শ্বাস ঘন ঘন হচ্ছে। বারবার কঁকিয়ে উঠছে তোমার নাম বলে। তাড়াতাড়ি কর।
শান্তিরঞ্জন পিছন ফিরে খোঁজ করে হারূণের । কোথাও হদিস নেই তার।
হয়তো ওরই জন্যে তদ্বির করে চলেছে ভেতরে।
‘স্যর লোকটা হিন্দু মানুষ। শান্তিপ্রিয় , বাপদাদার ব্যবসা রয়েছে আখাউড়া বাজারে। ভাই আর মা থাকে আগরতলায়। মা মরণাপন্ন। এখুনি দম যাবে। একটু মেহেরবানি করে যদি তারে ওপারে যাইতে দেয়া অয় তো সে তার মায়েরে
শেষ দেখাটা দেখতে পারে। একটু অনুমতি যদি দ্যান।’
‘কিভাবে?’
‘আপনে একটু ওইপারের লোকজনেরে কইয়া দিবেন। আপনারা তো সবাই সবাইরে চিনেন। মানবিক কারণ। ’
‘আমি ? তুমি আমার চাকুরিডা খাইতে চাও? যাও তো যাও। কাজের সময় ডিসটার্ব কইরো না। আজ সব সীল মারা । সম্ভব না ’ লোকটি মুখ ঘুরিয়ে নেয়। যেন এই প্রথম এ ধরনের আজগুবি কথা শুনল। যদিও কদিন আগে ডিসি সাহেবের শালার বিয়ের বাজার আগরতলা থেকে করা হয়েছিল, সেগুলো যাতে নির্বি্ঘ্নে সম্পন্ন হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়েছিল তাকেই। কোনো ঝামেলা হয়নি। ডিসি সাহেবের পিএস রিং করে গলা ভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেছিল , ‘থ্যা্কং য়ূ। ’খুবই আনন্দিত হয়েছিল সেই সময়। তবে এসব উদাহরণ স্রেফ ব্যতিক্রম। সবার বেলায় মোটেই প্রযোজ্য নয়, হতে পারে না।
‘অনেক আশা কইরা আইছিলাম। বয়স্ক মানুষ। মারে দেখবার চায়। রহম করেন।’ হারুণ শেষবারের মতো অনুরোধ করে অফিসারকে।
‘ঘ্যানর ঘ্যানর করো নাত কানের সামনে। একটু পর ঢাকার একটা ফুটবল দল আসবে। ওরা আগরতলায় শুভেচ্ছা সফরে যাচ্ছে । দুই দেশের সম্পর্ক যাতে আরো জোরদার হয় সেজন্যে। আমরা দুই দেশের লোকজন তাদের প্রটোকল দেয়া নিয়ে ব্যস্ত। একটু এদিকে সেদিক হলে চাকুরি নাই। আর তুমি আসছ তোমার কোন লোকের জন্য তদ্বির করতে। ভাগ ভাগ। ’ লোকটি হারূণকে তাড়াবার চেষ্টা করছে। ওরা এসবে অভ্যস্ত। এইসব অফিসারদের করুণা নিয়েই ব্যবসা চালাতে হয়। এদেও খ্যাপানো আর নিজের পেটে নিজের লাথি মারা সামন কথা।

তবু সে আব্দারের সুরে বলে ওঠে,‘ হেরে ফুটবল দলের ভিত্রে ঢুকাইয়া দেওন যায় না?’
‘তুই কি বেশি ট্যাকা খাইছস ওই হিন্দু লোকটার কাছ থেকে?’
‘জ্বে না। ছোটবেলা থন চিনি তো। তাই।’
‘তাইলে ভাগ। চাইর ধারে ডিবি এসবি ডিজিএফআই ঘুর ঘুর করতাছে। ধরা খাইলে তুই আমি সব শেষ। ভাগ্ ।’ রীতিমতো জোর করে তাড়িয়ে দেয় হারূণকে লোকটি।
হারূণ চলে যাওয়ার পর লোকটি আসনের পিছনে দেয়ালে সেঁটে থাকা আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে। একসময় ব্যাক পকেট থেকে চিরুনি বের করে টাকভরা মাথার একমাত্র সান্ত্বনা ক-গাছ চুল পরম আদরে আাঁচড়াতে গিয়ে নিজেকে নিজে বলতে থাকে, ‘একটু পছন্দ করি বলে কত বড় আব্দার নিয়ে চলে আসছে। চাকরি খাওয়ার যড়যন্ত্র। ’ পরক্ষণেই কী ভেবে প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ নিয়ে টাকা গুনতে শুরু করে। একটু পর পিয়নকে ডেকে চাপা গলায় বলে উঠল , ‘হারূণ হারামজাদাটাকে ডাকো তো। পকেটে তো পয়সা কড়ি বলতে নেই। চলব কি করে? ’
হারূণ ততক্ষণে শান্তিরঞ্জনের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। সে কীভাবে ওর ব্যর্থতার কথা শান্তিবাবুকে জানাবে তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। একবার মনে হচ্ছে পা ধরে বলে উঠবে, ‘কাকা আমি পারলাম না। আমারে মাফ করেন। মানুষ মানুষের কষ্ট বোঝে না। ’
কিন্তু এত মানুষের সামনে কিভাবে এরকম নাটক করবে তা ভেবে সে বড় লজ্জা বোধ করতে লাগল। যদিও ওর মনের ভেতর কাজটি না-পারার কারণে এক ধরনের হতাশা ও শূন্যতাবোধ কাজ করছে তবু সে সবকিছু ঝেড়ে ঝুড়ে শান্তিরঞ্জনের সামনে এসে সোজসাপ্টা করে বলে ফেলল,‘ কাকা, আইজকা এ্যাই পথে ভিআইপিরা যাইব। যাওন সম্বব না। বর্ডার এক্কেরে সীল মাইরা দিছে। শিঙ্গারবিল দিয়াও যাওন সম্ভব না। ’

শান্তিরঞ্জনের কানে লাগানো মোবাইল। কমলরঞ্জন রিং করছে বারবার। বর্ডার এরিয়া হওয়ায় কথাগুলো কেটে যাচ্ছে । বোঝা যাচ্ছে না কিছুই। হ্যালো হ্যালো বলে কেবল চড়ছে কন্ঠস্বর , কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
শান্তিরঞ্জন একবার ঘাড় বেঁকিয়ে হারূণের দিকে তাকায়। কিন্তু মোবাইলের কথায় পুরো মনোযোগ থাকায় ওর কথাগুলো কানে ঢোকেনি।

কান থেকে মোবাইল সরিয়ে শান্তিরঞ্জন সেটি পকেটে পুরে। তারপর হারূণের দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে বলে ওঠে,‘কাজ শেষ । চল এবার। ’ বলে রওয়ানা দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
হারূণ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়‘, কাকা, আমারে মাফ করেন। আইজ বর্ডার সীল করা। ভিআইপিরা যাইব। মাফ করেন। ’
শান্তিরঞ্জন কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে বৃক্ষের মতো। হারূণ কী বলছে বোঝার চেষ্টা করে। ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে ডানদিকের নো-ম্যান্স ল্যান্ডের দিকে চোখ রেখে বলে ওঠে,‘ এ্যাই তো সামান্য রাস্তা। পাঁচ -ছয় মিনিটি লাগবো বড় জোর।’
‘কাকা, আমাারে মাফ করেন। যাওন সম্বব না। নামী ফুটবল দল যাইবো একটু পর। আগরতলার মাডে তারা খেলবো। একটু পরই তারা আইসা পড়বো। সব ব্যস্ত তাগোরে নিয়া।’
‘তাইলে শিঙ্গারবিল দিয়া চল। কতক্ষণ আর লাগবো। চল। ’ ভাবলেশহীন চেহারা, কন্ঠস্বর শীতল। মাঝে মাঝে মোবাইলের বোতাম টিপছে। হয়তো কমলের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে।
‘কাকা, পুরা বর্ডার আইজ সীল করা। স্পেশাল ফোর্স নামছে। ঢাকা থেইক্যা বড় ফুটবল দল যাইতাছে আগরতলার মাডে খেলতে। তাগো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিছে দুই দেশ। ’ শান্তিরঞ্জনকে বোঝাবার চেষ্টা করে।
‘উপায়?’ আরো নির্মোহ শোনায় শান্তিরঞ্জনের কন্ঠস্বর। প্রায় ছ ফুটের মতো লম্বা মানুষ শান্তি রঞ্জন। দূর থেকে চোখে পড়ে। সেই তুলনায় হারূণ নেহায়েত বামন আকৃতির, ভাঙাচোরা শরীর স্বাস্থ্য। মাথা তুলে তাকিয়ে দেখতে হয় তাকে।
‘কাইল একটা ব্যবস্থা অইব কাকা। আফনে চিন্তা কইরেন না। ’
‘কিন্তুক আমার মা যে আমারে অহনই দেকবার চায়। কী আকুল অইয়া ডাকবার লাগছে তার বড় ছেলেরে। এ্যাই ডাক তো কাইল পর্যন্ত থাকব না। দ্যাখ তুই। ’ বলে শান্তিরঞ্জন হারূণের ডান হাতটা নিয়ে নিজের বুকের বাঁদিকটায় চেপে ধরে রাখে।
হারূণ কিছু বুঝতে না পারলেও একটা শিহরণ খেলে যায় ওর ভেতর। সে ছুটে যায় সেই অফিাসারের ঘরে, শেষ বারের মতো অনুরোধ জানাতে শান্তিরঞ্জনের জন্যে।

৩.
আজ প্রকৃতি সকাল থেকেই হাওয়া-জলে স্নাত। বর্ষার শ্যামল রঙ জড়িয়ে রয়েছে সমস্ত গাছ-গাছালি আর লতা- পাতায়। এত ঘন আর চক্ষুবান্ধব এই সবুজ যে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।
অনেক্ষণ হল কড়–ই গাছতলায় দাঁড়ানো শান্তিরঞ্জন। প্রকৃতির এই মেঘলাবরণ রূপটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। একটা নরোম শীতল অনুভব মায়ের মতো ওকে আঁকড়ে রেখেছে অনেক্ষণ থেকে।
সে বার বার কমলকে ধরতে চাইছে মোবাইলে । কিন্তু হ্যালো বলতেই লাইনটা কেটে যাচ্ছে। এজন্য মহাবিরক্ত সে। হাত থেকে মোবাইলটি ছুঁড়ে ফেলে দেবার ইচ্ছে জাগছে মনে। পারছে না , কারণ এই মোবাইলটি হাতছাড়া হলে কমলের কন্ঠের হ্যালোটুকু আর শোনা হবে না এই বর্ডার প্রান্তরে।

সে অগত্যা মোবাইলটি পকেটে পুরে চারপাশের পরিবেশ পরখ করে দেখতে থাকে।
ওর চোখ পড়ে সার বেধে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরকুচি ভরতি ট্রাকগুলোর উপর। প্রায় দেড়মাইল লম্বা লাইন। মেঘালয় থেকে জলে ভেসে আসা বোল্ডারগুলো ক্রাশ হয়ে এরকম কুচিতে পরিণত হয়। গতবার সে জাফলং বেড়াতে গিয়েছিল। তখন সে দেখেছে এই কর্মযজ্ঞ। স্বচ্ছ পানি থেকে কিভাবে শিশু-কোশোর -নারী -পুরুষ সবাই মিলে বড় ছোট পাথরগুলো কুড়িয়ে নৌকায় তুলে নিচ্ছে। শত শত নৌকা ভাসছে পিয়াং নদী জুড়ে। নদীর বুক খালি করে যত পাথর তীরে উঠছে তত মুনাফা, তত ভালভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।

শান্তিরঞ্জন মুচকি হাসল । ভারতে থেকে ভেসে আসা পাথর আবার ভারতের কাছেই বিক্রয় হচ্ছে ভেবে সে বড় পুলক বোধ করতে থাকে । পরিচিত এক গানের কলির কথা মনে পড়ে গেল, শান্তিরঞ্জন তা অনুকরণ করে গেয়ে ওঠে, ‘পরানের পাত্থর রে, কই থেইক্যা কই চইল্যা যাও’ ।
আর ঠিক তখনি হারূণ এসে ওকে জানাল সে আজ মাকে দেখতে যেতে পারবে না। সামান্য পাথর কুচি যেতে পারলে সে একটা মানুষ হয়ে কেন যেতে পারবে না?
সে চেঁচিয়ে ওঠে,‘ আবার যাও। টাকা বাড়ায়া দিমু। ’
হারূণ শান্তিরঞ্জনের চোখে মুখে এমন কিছু দেখতে পাচ্ছিল যা ওকে ভীত করে তোলে। সে কোনো কথা না বাড়িয়ে ফের ছুটে যায় সেই পরিচিত অফিসারের কক্ষের দিকে।
কিন্তু তখন অফিসারের কক্ষে মিটিং বসে গেছে। সবাই ব্যস্ত ফুটবল টীমটির সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা নিয়ে। এরা সবাই ভিআইপি, দেশের সম্পদ। তারা যাতে নির্বিঘ্নে ওপারে গিয়ে খেলে আসতে পারেন তাই নিয়ে সবার মাথাব্যথা। নো-ম্যান্স ল্যান্ডে এই নিয়ে তিনবার বৈঠক হয়েছে দুদেশের কর্মকর্তাদের ভেতর। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ চলেছে তাদের ভেতর। এখন সেগুলোই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
একটু পর ফুটবল দলটিকে নিয়ে একটি এসি বাস পৌঁছাবে এখানে। এর অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছে ছোট বড় কর্মচারী কর্মকর্তা সবাই।

শান্তিরঞ্জন অত কিছু বোঝে না। সে দ্রুত মায়ের কাছে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে চায়,‘ মা আমি শান্তিরঞ্জন । আইসা পড়ছি। তুমি এ্যাইবার ভালা অইয়া যাবা। ’
একথা মনে হতেই সে মোবাইলটার বোতাম টিপতে শুরু করে দেয় । তেরছা করে তাকিয়ে দেথে বর্ডার এলাকাটুকু। মাত্র কয়েকগজ দূরত্ব। রাস্তার দুপাশে সারি সারি মাথা উঁচু গাছ। বেশ নিরিবিলি সুনসান জায়গা। সামান্য দূরে দুজন বিএসএফ জওয়ান দাঁড়ানো। হাতে মারণাস্ত্র। এদের অতিক্রম করতে পারলেই অভিশপ্ত র‌্যাডক্লিফের সুতো পেরনো যাবে। এটুকুই কষ্ট, তবু কী যে যন্ত্রণা। গাছের নীচে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও এটুকু জায়গা অতিক্রমের ছাড়পত্র মিলছে না। দরকার হলে আজই ফিরবে সে। তবু মাকে দেখার সুযোগ চায়। ভিটেবাড়ি বন্ধক দিয়ে হলেও সে মাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে চায় । মা, আমি আসছি। তুমি অপেক্ষায় থাকো। এই তো আর কিছুক্ষণ , তারপরই আমি তোমার কোলে মাথা রাখব।
এমনি আকুলি বিকুলি ভরা ওর অন্তর।
সে হারূণকে অনুরোধ করে,‘ তুমি কও কার হাত পা ধরন লাগব। আমি ধরুম। একটু ব্যবস্থা কইরা দ্যাও। যা যা মুচলেকা দেওয়া দরকার আমি করব। দরকার অইলে আইজ গিয়া আইজই ফিরব। তবু একটা ব্যবস্থা কর। আমার মা বাঁচব না।’ শেষ কথাটা বলার সময় ওর কন্ঠ ধরে এল।
হারূণ ফের একবার ভেতরে ঢুকে বের হয়ে এল।

এসময় পুলিশের একটি গাড়ি সিঁটি বাজাতে বাজাতে বাংলাদেশের কাস্টমস অফিসের সামনে এসে থামল। এর ঠিক পিছনে একটি ঝাঁ-চকচকে বড় মাইক্রেবাস। ভেতরে বসে রয়েছেন বাংলাদেশের ফুটবল তারকারা।
ভিআইপি খেলোয়াড়েরা ভেতরে বসে এসির বাতাস খাচ্ছেন আর জানালার ভেতর থেকে হাঁ করে বর্ডার এরিয়ার প্রকৃতি দেখছেন।
শান্তিরঞ্জন ওদের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আহা! কী সৌভাগ্য তাদের। মাটিতে পা পর্যন্ত রাখতে হয় না। তাদের ওপারে পৌঁছে দিতে সবাই কেমন মরিয়া হয়ে উঠেছে। ও যে দুই ঘন্টা ধরে পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে আর রোদে পুড়ছে, ঠিক গাছের মতো, কেউ তা ধর্তব্যের ভেতর আনছে না। সে এক ঝলক মাকে দেখবে বলে সেই সকাল থেকে না খেয়ে না নেয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে তা কেউ গ্রাহ্যও করছে না।
শান্তিরঞ্জনের ঈর্ষা হতে থাকে ওদের দেখে।

এসময় দুটো নেড়ি কুকর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নো-ম্যান্স ল্যান্ড পেরিয়ে ওপারে চলে গেল। কেউ তাকিয়ে দেখল না পর্যন্ত।
দুজন বিএসএফ জওয়ানের সামনে দিয়েই হেঁটে পার হেয় গেল কুকর দুটো। কোনো ভিসা নেই , কোনো পাসপোর্ট নেই। তবু গদাই লস্করি চালে দুই বন্ধু ওপারে হেঁটে গেল।
জওয়ান দুজন নিজেদের ভেতর গল্পে মগ্ন। শান্তিরঞ্জন এপার থেকে সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
ওর ভেতর হাহাকার দানা বাঁধে। চোখের সামনে দিয়ে হাজার হাজার ট্রাক যায় , জন্তু জানোয়ার পাখি সব একে একে চলে যেতে পারে। কেবল ওর বেলায় হারূণ ওকে ঠেকিয়ে রাখছে। একবার বলছে বর্ডার আজ স্পেশাল সিকিউরিটি চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে। একটা পিঁপড়ে পর্যন্ত এপার থেকে ওপারে যেতে পারবে না। এমনি সতর্ককা ভিআইদের জন্যে।
অথচ ওর চোখের সামনে দিয়ে বীর দর্পে চলে গেল কুকর যুগল । ওরা কি বন্ধু নাকি প্রেমিক-প্রেমিকা? শান্তিরঞ্জন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে।

পাশের খাল দিয়ে একটি ঢোড়া সাপকে জলের উপর সাঁতার কেটে বর্ডার পাড়ি দিতে দেখল সে। একটা বেজি পর্যন্ত ঝোপ ঝাড়ের ফাঁক ফোকর গলিয়ে এপার থেকে ওপারে সুড়–ৎ করে চলে গেল।
বিষাদ আর হতাশায় ভরে উঠল ওর মন। সে পিছন ফিরে তাকিয়ে খোঁজ করতে লাগল হারূণকে।
কিছুক্ষণ বাদে হারূণ এসে সামনে দাঁড়াল। মুখ কাঁচুমাচু, মাথা নীচু।
‘পারলাম না কাকু। মাফ করেন। ’
‘কারণ?’
মাথা নীচু করে থাকে হারূণ । সমস্ত ব্যর্থতার দায় যেন ওর মাথার উপর। সেই বোঝা এতটাই ভারি যে মুখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছে না সে।
কেনো উত্তর নেই ওর বন্ঠে। কারণ, সে খেটে খাওয়া মানুষ। বাপের আমল থেকে সে এই লাইনে রয়েছে।
তবু সে এর কারণ বলতে পারবে না। বৈধ -অবৈধর সংজ্ঞা ওর কাছে অজানা বিষয়।
সে কেবল শিখেছে বড়দের কাছে কোনো অপরাধ করলে মাথা নুয়ে থাকতে হয়। রাগ পড়ে গেলে বড়রা ঠিকই বুঝতে পারে নিজেদের ভুল। তখন আর কেনোকিছু আটকায় না। সব ঠিকঠাক আগের মতোই চলতে থাকে।
একটু আগে ফুটবল খেলোয়াড়েরা মাইক্রোবাস নিয়ে নির্বিঘ্নে ওপারে চলে গেছেন। এ উপলক্ষ্যে সামান্য হৈ চৈ যা হয়েছিল তাও থেমে গেছে। এমনিতেই এই স্থল বন্দরটি দিনের বেশির ভাগ সময় নিশ্চুপ বসে থাকে। কার্যোপলক্ষ্যে যারা এখানে এসে পড়েন কদিন কাটতে না কাটতেই একে শাস্তি ভাবেন এবং কবে এখান থেকে বের হবেন সেই চেষ্টায় এতটাই মশগুল থাকেন যে প্রায়ই অফিস কামাই করতে হয় তাদের।

এরকম এক জায়গায় দিনের বেলাতেও তক্ষক ডাকবে তাতে অবাক হবার কী আছে?
হারূণ শান্তিরঞ্জনের রাগ পড়ে গেছে ভেবে চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। সে দেখতে পায় লোকটি অদূরে একটি বাধা ষাড়ের সামনে ঝুঁকে কিছু একটা করতে চাইছে।
ষাড়টির উপর একটি কাক বসে রয়েছে। শান্তিরঞ্জনের মতিগতির ঠিক নেই ভেবে সে উড়াল দিয়ে পাশের একটি কাঁঠাল গাছের মগডালে আশ্রয় নেয়।
ষাড়টি কাঁচা ঘাস খাওয়ায় মগ্ন। শান্তিঞ্জনের দিকে তার কোনো দৃষ্টি নেই।
হারূণ চেঁচিয়ে ওঠে‘, কাকা চলেন । বাড়িৎ যাই। চলেন। আমি দোকান ফালাইয়া আইছি। ’
এসময় শান্তিরঞ্জনের মোবাইলটা সশব্দে বেজে ওঠে। সে ত্রস্তে সেটি কানে লাগায় এবং চীৎকার দিয়ে ওঠে‘, মার কথা বন্ধ। মা নাই। আমার মা নাই। ’ বলে হো:হো: করে কেঁদে ওঠে শান্তি।
আশেপাশের ওটোরিক্সাওলা, ট্রাকওলা , সাধারণ যাত্রি সবাই কাজ রেখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে এই বুড়ো লোকটির দিকে। কী ঘটছে ঠিক বুঝতে পারছে না।

হারূণ তাকে সান্তনা দেওয়ার জন্যে কাছে আসতেই শান্তিরঞ্জন বলে উঠল,‘ পারলি না তো। দ্যাখ আমি কী করি। ’ বলেই সে ছুটে গিয়ে ষাড়টির রশি খুলে দিয়ে প্রচন্ড জোরে পেটে গুঁতো বসায়।
গুঁতো খেয়ে ষাড়টি ছুটতে শুরু করে দেয় সামনের দিকে। এর পিছন পিছন গরুর মালিক সেজে শান্তিরঞ্জন দৌঁড়াতে শুরু কওে দেয়।
ষাড় ছুটছে, পিছু পিছু শান্তিরঞ্জন।
চারপাশের সবাই হৈ-হৈ করে ওঠে এরকম এক অসাধারণ দৃশ্য দেখে।
যে-দুজন বিএসএফ জওয়ান এতক্ষণ নিজেদের ভেতর গল্প করছিল তারা এবার অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে যে যার পজিশন নিয়ে ফেলে। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে তারা স্থির করে নেয় তাদের কর্মপন্থা।
হারুণের নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে উত্তেজনায়। সে স্পষ্ট দেখতে পায় ষাড়টি দ্রুত বিএসএফের সশস্ত্র বেড়া পেরিয়ে গেছে। কিন্তু শান্তিরঞ্জন তা পারে না। ওর ছুটন্ত পায়ের মাঝখানে বন্দুক ঢুকিয়ে দেয় একজন বিএসএফ জওয়ান। সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় পীচের রাস্তায়।
হারূন চোখ বন্ধ করে ফেলে। এই বুড়ো মানুষটির এই বয়সে রাস্তায় পড়ে বন্দুকের বাটের নিষ্ঠুর মার খাওয়ার দৃশ্যটি কিছুতেই সহ্য করতে পারে না সে।
ওর কানে ভেসে আসে ‘মা, মাগো ’ বলে শান্তিরঞ্জনের করুণ আর্তনাদ।
হারূণ দ্রুত ফিরে চলে আখাউড়ার উদ্ধেশ্যে। সে কোনো হুজ্জোতিতে জড়াতে চায় না।

free counters

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hamim — আগস্ট ১৪, ২০১২ @ ২:৪৫ পূর্বাহ্ন

      Dear Manish, a superbly written story. Mesmerizing again!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mehedi Hasan Tipu — আগস্ট ১৪, ২০১২ @ ১১:২৪ পূর্বাহ্ন

      This is a great story. this story actually pick up our present scenario.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Krishnendu Saha — আগস্ট ১৯, ২০১২ @ ৬:০৯ অপরাহ্ন

      Dear Monish Roy,

      It was a great pleasure reading this story.
      Could you please mention some of your publications?
      I would very much like to read them.

      Kindest Regards,
      Krishnendu

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sushanta Kar — আগস্ট ২১, ২০১২ @ ১:০১ পূর্বাহ্ন

      দারুণ গল্প। সময়ের গল্প। যখন ভারত জ্বলছে এই বিষয় নিয়ে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সপ্তর্ষি বিশ্বাস — আগস্ট ২৪, ২০১২ @ ৭:৩৭ অপরাহ্ন

      একটা উপন্যাসের ভ্রূণ …। বিস্তারিত হতে পারতো … তথাপি ভালো লাগলো। – সপ্তর্ষি বিশ্বাস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন prokash biswas — অক্টোবর ২৮, ২০১২ @ ৮:৫৭ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগলো ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com