আবৃত ঈশ্বর

সৈয়দ তারিক | ১৬ জুন ২০১২ ১১:০৩ অপরাহ্ন

১.
এটা আমি নই, এটা সৈয়দ তারিক
আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি;
সে হাঁটে নগরে আর নগরের অনেক আড়ালে
আমি তার বয়ে যাওয়া দেখি।

সৈয়দ তারিক এটা নয়
শূন্যতা ধরেছে আকার;
আমি তার হয়ে ওঠা দেখি
নিভে যাওয়া দেখি আমি তার।

০৪.০১.১১

২.
তুমি দাও পাঠ আমাকে বাৎসায়ণ,
মন্দ্রস্বরে স্তোত্র শোনাই আমি;
পায়েল বাজছে কেন্দ্রের অভিসারে
পরিধি রেখায় ডাকে অন্তর্যামী।

তোমার শরীরে লোকোত্তরের ঘ্রাণ
আত্মা আমার ধূলা মাখে দুনিয়ার;
তুমি অনন্ত মিলনের আহ্বান
আমি শেষহীন বিরহের বুনিয়াদ।

১৮.০২.১১

৩.
চেয়ে দ্যাখো সিম ফুলগুলি
কোমল বর্ণে আবরিত
একজোড়া পাপড়ি ছড়ানো
একজোড়া অবগুণ্ঠিত।

মাঝখানে রয়েছে গোপন
চাঁদবাঁকা সিমের অতীত :
তোমার অধর প্রসারিত
ওষ্ঠে মিলন-সঙ্গীত।

২০.০২.১১


৪.

জান্নাতি ভোজ জাগায় অরুচি
একটু বেগুন-শুঁটকি রাঁধো,
হুর-পরী দেখে ক্লান্ত দুচোখ
ফুল গুঁজে দেব, খোঁপাটা বাঁধো।

গোরখোদকেরা খোঁজ নিয়ে যায়
পড়শিরা চায় স্মারক ভোজ;
একাকী আকাশ, একলা বাতাস
কোথাও মেলে না তোমার খোঁজ।

২০.০৩.১১

৫.
কে জানে কখন কে কোথায় ধরা পড়ে
কে জানে কে ছাড়া পায়,
তোমার আকাশে আমার আঁধার
জ্যোৎস্নায় চমকায়।

কে জানে কেন-বা স্বপ্নখচিত চাঁদে
রক্তের আলপনা
ছেঁড়া কাফনের হাহাকারে কাঁদে :
‘বলবো না, বলবো না।’

০৫.০৪.১১

৬.
সক্রেটিসের উন্মাদনায় সন্ত ডায়োজিনিস,
নিবাস গামলায়;
বাতুল মার্ক্স নিটশে তবে? বুদ্ধির আশ্রমে
জিজ্ঞাসা হামলায়।

বাঁশির হৃদয় কান্নাবিধুর, ঘুরন্ত দরবেশ
প্রশ্ন ভুলে যায়,
সদলবলে পিথাগোরাস গোপন কুঠরিতে
মগ্ন সাধনায়।

১৪.০৪.১১

৭.
বাজে না বাতাসে নন্দিত করতালি,
কাঁপে না হতাশে ঈর্ষাবিধুর প্রাণ,
বুক-পাঁজরের ঘেরাটোপে পাই টের
ফুচকি মারেন শামসুর রাহমান।

সমাধিলিপির মার্বেলে মুখ ঢেকে
নিথর যখন বনানী গোরস্থান
স্মিত মুখ তুলে কবিতা শোনাচ্ছেন
হৃদয়বিহারী শামসুর রাহমান।

১৭.০৮.১১

৮.
আপেল পঁচিয়ে দিতে ভালোবেসে গেছি চিরকাল
মুকুট দিয়েছি ছুঁড়ে ডাস্টবিনে অনায়াস হাতে
আর যত ভালোবাসা – মমতার নিবিড় আঁচল
ছিঁড়েখুঁড়ে পেয়ে গেছি খরতর রোদের কাফন।

নিজেকে ফুরিয়ে দিতে খেলে গেছি আমি চিরকাল
জুয়ার শেষের দানে পণ এ হৃদয়
আয়নায় জেগে ওঠে প্রতিনায়কের মূঢ় হাসি
আর যত হাহাকার – অভিমান – প্রসেনিয়ামের অভিনয়।

১২.০৯.১১

৯.
যেন-বা কখনও আকাশে আপন মেঘ
কেঁপেছিলো থর থর,
যেন জলাশয়ে অতল আবেগে
কেঁদেছিলো অন্তর ;
সাক্ষী ছিলে কি তুমি?
খর রৌদ্রের আবেশে বিধুর আমার মৃত্যুভূমি।

যদি-বা শ্যামল দূর্বায় ঢেকে যায়
শিলায় লিখিত নাম,
হৃদয়ঋণের চক্রবৃদ্ধি
নাই যদি শুধালাম;
অভিমান যদি না করে কখনও ক্ষমা
জন্মে জন্মে ফিরে ফিরে তুমি প্রিয়তর, প্রিয়তমা।

০৭.১০.১১

১০.
না কোনো দিবসে মেলে দেবে ডানা
না আছে রাতের নিভৃত নীড়
শূন্যের মাঝে অসীম নিহিত
অশ্রুবিন্দু সিন্ধুনীর।

বিচ্ছেদে গাঢ় পুরনো প্রণয়,
মিলনে ছিল কি বিরহসুর?
যতটুকু কাছে ছিল দু-হৃদয়
ঠিক ততটুকু ছিল সুদূর।

০৭.১০.১১

১১.
আলো চেয়েছিলো রাতের রাগিনী
তীর চেয়েছিলো স্রোতের সুর
তুমি চেয়েছিলে আসতে নিকটে
ছায়াময় তবু চিরসুদূর।

শোক চেয়েছিলো দরদি হৃদয়
শ্লোক চেয়েছিলো অভিনিবেশ
পেতে দিয়েছিলে সবটা জমিন
হলো না তবু তা উপনিবেশ।

১২.১০.১১

১২.
বাছবার স্বাধিকার আছে সারাক্ষণ :
ভুল অশ্বে বার বার দিগন্ত পেরোই
মায়াবনে হরিণীর উদ্দাম চন্দ্রকলা নাচ
মহুয়ার মদের উল্লাস
আর যত দীর্ঘশ্বাস, দীর্ঘতর করুণ বিলাপ।

বাছবার স্বাধীকার আছে সারাক্ষণ :
ইচ্ছাফুলের ঘ্রাণে বিহ্বল মেধাবী হৃদয়
বুকে টানে, দূরে ঠেলে দ্যায় :
কিছুই কি বাছি আমি?
ওরাই আমাকে বেছে নেয়।

০৩.১১.১১

free counters

প্রতিক্রিয়া (15) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Taposh Gayen — জুন ১৭, ২০১২ @ ১:০৮ পূর্বাহ্ন

      ঈশ্বরপ্রেমে ডুবে কবি সৈয়দ তারিক মানুষের ভীড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন, হয়েছেন মজনু । এইতো বাংলার ভাবুকতা ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hameem Faruque — জুন ১৮, ২০১২ @ ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

      Tariq

      Just mind blowing. You are as genius as ever.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জিয়া হাশান — জুন ১৮, ২০১২ @ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন

      ধন্যবাদ সৈয়দ তারিক। খুব ভালো লেগেছে। মন ভরে পাঠ করেছি

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন fahim ali — জুন ১৮, ২০১২ @ ৩:৪৮ অপরাহ্ন

      excellent one… we all can see the jungle full of lights but we cannot find the “door” to reach the one. my regards to Mr. Syed Tareek.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Abu Sayeed Obaidullah — জুন ১৮, ২০১২ @ ৪:৫০ অপরাহ্ন

      mone rakhar moto kobitaguli barbar porbo. protiti koabitai durdanto. onekdin por abaro Syed Tariq….

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Reaz mazumder — জুন ১৯, ২০১২ @ ১০:৩৩ অপরাহ্ন

      সবটুকু এসেৃছে। এক নিমিষে ঘুরিয়ে এনেছে সুদূর বর্তমান। ভালো লাগলো কবির অভিজ্ঞতাগুলো। এ যেন আমাদেরই আহবান।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন rana zaman — জুন ২০, ২০১২ @ ৮:৫৯ পূর্বাহ্ন

      বেশ ভালো। চিন্তার খোরাক আছে। আরো লিখুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন hanzala — জুন ২০, ২০১২ @ ৩:৪৩ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ কবি, ভালো লাগলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shamsyn Nahar Tarek — জুন ২১, ২০১২ @ ১:৪৭ অপরাহ্ন

      বেশ ভাল লাগলো। নানা রকমের যেসব ভাবনা কবিকে ছুঁয়ে গেছে তা এই কবিতাগুলোয় স্পষ্ট প্রতীয়মাণ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বনি আমিন — জুন ২১, ২০১২ @ ৪:৫৪ অপরাহ্ন

      মেঘদূতটা আবার পড়তে ইচ্ছে হয়, আর এ কবিতাগুচ্ছের …সিমফুল ফুলগুলি …প্রসারিত মিলন সঙ্গীত আরবার পড়ায় উৎসাহ দেয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদ খান — জুলাই ১, ২০১২ @ ৮:৩৯ অপরাহ্ন

      কবিতাগুলি ভালো লেগেছে, তারিক। অভিনন্দন!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রওশন আরা মুক্তা — জুলাই ৩, ২০১২ @ ১০:৪৮ অপরাহ্ন

      এই যেন অভিমান,

      “নিজেকে ফুরিয়ে দিতে খেলে গেছি আমি চিরকাল
      জুয়ার শেষের দানে পণ এ হৃদয়
      আয়নায় জেগে ওঠে প্রতিনায়কের মূঢ় হাসি
      আর যত হাহাকার – অভিমান – প্রসেনিয়ামের অভিনয়।”

      আবার এই যেন অভিনয়,

      “সৈয়দ তারিক এটা নয়
      শূন্যতা ধরেছে আকার;
      আমি তার হয়ে ওঠা দেখি
      নিভে যাওয়া দেখি আমি তার। ”

      সমর্পিত যেন প্রেমে,

      “যদি-বা শ্যামল দূর্বায় ঢেকে যায়
      শিলায় লিখিত নাম,
      হৃদয়ঋণের চক্রবৃদ্ধি
      নাই যদি শুধালাম;
      অভিমান যদি না করে কখনও ক্ষমা
      জন্মে জন্মে ফিরে ফিরে তুমি প্রিয়তর, প্রিয়তমা। ”

      বিরহে কাতর,

      “বিচ্ছেদে গাঢ় পুরনো প্রণয়,
      মিলনে ছিল কি বিরহসুর?
      যতটুকু কাছে ছিল দু-হৃদয়
      ঠিক ততটুকু ছিল সুদূর।”

      রক্তের গান,

      “চেয়ে দ্যাখো সিম ফুলগুলি
      কোমল বর্ণে আবরিত
      একজোড়া পাপড়ি ছড়ানো
      একজোড়া অবগুণ্ঠিত।

      মাঝখানে রয়েছে গোপন
      চাঁদবাঁকা সিমের অতীত :
      তোমার অধর প্রসারিত
      ওষ্ঠে মিলন-সঙ্গীত। ”

      এই যদি হয় আবৃত ঈশ্বর! কীসে আবৃত? আবেগে, অনুভূতিতে, কবিতায় ঈশ্বর তো পাঠককে আবৃত করে ফেলছে এখানে, একটা দোদুল্যমানতার মোড়কে মুড়ে মুড়ে নিশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হতেই আবার এক টানে মোড়ক খুলে দিচ্ছে– কবিতা! কবিতা…

      “গোরখোদকেরা খোঁজ নিয়ে যায়
      পড়শিরা চায় স্মারক ভোজ;
      একাকী আকাশ, একলা বাতাস
      কোথাও মেলে না তোমার খোঁজ। “…

      কবিতার খোঁজ কিন্তু পেয়ে গেলাম ঠিকই… কবিকে অভিনন্দন! শুভকামনা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shamset tabrejee — জুলাই ৪, ২০১২ @ ৩:১০ অপরাহ্ন

      তারিক ভাই, বড় আনন্দ হল, খু-উ-ব।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন tushar das — জুলাই ৫, ২০১২ @ ১২:৫৪ অপরাহ্ন

      Wonderful Tariq!!! Enjoyed a lot your new poems!!!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Subrata Augustine Gomes — জুলাই ৭, ২০১২ @ ১:৪৭ পূর্বাহ্ন

      তারিকের কবিতা, তারিকেরই, আজও। সেই যে একসঙ্গে ক্লাস করবার দিনগুলিতে – যে-তারুণ্য ওর চোখে আর কবিতায় ঝলমল করত, আজও করে, বুড়া হ’ল না ব্যাটাচ্ছেলে… কিছু বানান-ভুল চোখে পীড়া দিল (যথা: বাৎসায়ণ, পঁচিয়ে, স্বাধীকার), এরকমটা তারিকের কাছে অভাবনীয়… নাকি কম্পোজিরের বদান্যতা?

      তারিকের জন্য একটা অবজারভেশন: সুধীন্দ্রনাথের করা হাইনের অনুবাদের গন্ধ কিন্তু ব’য়েই বেড়িয়ে চলেছে তোমার কবিতা… মানে একটু আরও অন্যরকম স্বরেও কথা ব’লে দেখো তো, কেমন শোনায়?

      সুব্রত।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com