পথে, প্রদেশে

মাসুদ খান | ৭ এপ্রিল ২০১২ ১১:১৫ অপরাহ্ন

(৩য় পর্ব)

১ম ও ২য় পর্বের লিংক: http://arts.bdnews24.com/?p=1537
http://arts.bdnews24.com/?p=4310

কত যে রহস্যজড়ানো, কুহকজাগানো ঘটনায় ভরা মহাস্থানগড়ের এই ছোট্ট অঞ্চলটুকু! প্রিয় পাঠকপাঠিকা ভাইবোনবন্ধুগণ, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে এর আগে হকসেদে নামে একজনের কথা বলেছিলাম অল্প একটু। এই যে হকসেদ খোজা (খাজা নয়, খোজা, হকসেদ খোজা), অদ্ভুত এক রহস্যমানব। ভাঙাচোরা পোড়া-পোড়া মেছতাপড়া চেহারা, কাইস্টা পাটের দড়ির মতো দীর্ঘ পাকানো শরীর, তার ওপর সে খোঁড়া, আবার খোজাও, পেশায় ছিচকে চোর, খুচরা লুচ্চামি-লাম্পট্যে ওস্তাদ, কিন্তু মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত। ‘খোজা’ ছাড়াও আরও অভিধা আছে তার। কেউ কেউ তাকে বলে ল্যাংড়া হকসেদ আবার কেউ বলে হকসেদ পণ্ডিত। দুনিয়ার সব বাঘা-বাঘা পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ তার। নোম চমস্কির কাছ থেকে চিঠি আসে তার কাছে। এই কিছুদিন আগে জাক দেরিদা চিঠি দিয়েছে ফরাসি ভাষায়। অনেক জ্ঞান হকসেদ পণ্ডিতের, ভাষাও জানে অনেকগুলি। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, রামায়ণ, মহাভারত, বেদ-উপনিষদ…, জেনবাদ থেকে সঞ্জননী ব্যাকরণ, শ্রেণিসংগ্রাম থেকে ক্ষমতাকাঠামো, ভার্ব-বেইজ্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে কসমোলজি, ভাষার ডিপ-স্ট্রাকচার ডিবেট থেকে মহা-মন্দার ডেরিভেটিভ থিয়োরি, কালাজাদু থেকে কমোডিটি ফেটিসিজম, স্ট্রিং থিয়োরি থেকে সেক্স অ্যান্ড ক্রাইম ইন্ডাস্ট্রি, আসমান-জমিন, আন্ডারগ্রাউন্ড-ওভারগ্রাউন্ড…কমবেশি সবকিছুরই হালনাগাদ খবরাখবর আছে তার কাছে।

বগুড়ার অনেক ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করে দেশবিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে। গরমের ছুটিতে ঘরের ছেলেমেয়ে ফিরে এসেছে ঘরে। একদিন দেখি, গণ-উন্নয়ন গ্রন্থাগারের সামনে হকসেদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে। হকসেদ তাদের সঙ্গে ক্ষমতা-র বিবর্তন ও গতিবিধি নিয়ে কথা বলছে, পাওয়ার কী ক’রে গড়াতে গড়াতে ফ্রম প্রিস্ট টু প্রিন্স টু প্রেসিডেন্ট টু মার্কেট-প্লেসে এসে দাঁড়াল কালে-কালে, তার ইতিবৃত্ত। তর্ক তুলেছে দুতিনজন তরুণ। এক পর্যায়ে হকসেদ বলছে, “কী সব ডিপ-সিটেড স্টেরিও-টাইপ কথাবার্তা কও-না তোমরা! ভার্সিটিগুলাতে যে কী শেখায়! যত্তোসব ভেড়ার অণ্ডকোষ!” তার কথায় তরুণ-তরুণীরা বিব্রত হচ্ছে দেখে সে আবার বলতে থাকে, “শোনো, রাগ কইরো না, দ্যাখো, হামি হইলাম গিয়া অশিক্ষিৎ মানুষ, দূষিত রক্ত, হামার কথার মধ্যে না-হয় রাসটিসিটি আছে, কিন্তুক ইয়াং শিক্ষিত পোলামাইয়াগো মগজে যে রাস্ট ধইরা গেছে-গা, তার কী? কী আর কমু, অবিদ্যা! অবিদ্যা! স-ব বিদ্যার দোষ!………..” মুগ্ধ হয়ে হকসেদের কথা শুনছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রছাত্রী। মুগ্ধতা ও টান-টান উত্তেজনায় এই গরমের দিনে তাদের মাথা ও কান আরো গরম হয়ে উঠছে।

কেমনে এতকিছু জানে হকসেদ, কী বৃত্তান্ত, কেউ বুঝতে পারে না। থাকে ভাঙা ঘরে, কম্পিউটার নাই, ইন্টারনেট নাই। বিদ্যুতের কানেকশনই নাই ঘরে, তার আবার কম্পিউটার ইন্টারনেট! কিন্তু কেমনে এত পড়াশোনা, কীভাবে এত যোগাযোগ! এও কী সম্ভব! কেমনে কী! দুশ্চরিত্র আর রহস্যময় স্বভাবের কারণে লোকজন খুব একটা ঘেঁষে না তার কাছে। তবে গ্রামে দারোগাপুলিশ ঘোরাঘুরি করতে দেখলে এলাকাবাসী হকসেদকে নিয়ে যায় তাদের কাছে। হকসেদ তখন থাকে টপ গিয়ারে। ফুটফাট ফরাসি, ইংরেজি আর গুরুগম্ভীর বাংলায় তত্ত্বকথা ব’লে ভড়কে দেয় দারোগাকে। যে তেজ ও বেগ নিয়ে দারোগা এলাকায় ঢোকে, নিস্তেজ হয়ে যায় তার অনেকটাই। দারোগা পরেরবার এলে খোঁজ পড়ে যায় হকসেদের। তার কাছ থেকে জ্ঞানের কথা শুনতে চায় পুলিশ। হকসেদ তো আর কিছুতেই কাছে ঘেঁষে না। দূরে দূরে থাকে। বলে, “না ভাই, যাই-গা, পুলিশের ভালবাসা, গেরস্তের মুরগি পোষা…।”

জ্ঞাতিগোষ্ঠী বলতে কেউই নাই হকসেদের। কোত্থেকে সে এসেছে কেউই বলতে পারে না। কেউ বলে, দূরের কোনো জঙ্গল থেকে এসেছে। কেউ বলে, ওই যে ভাঙা রাজবাড়ির লাগোয়া করতোয়ার খাড়া পাড়, যেখানটায় কয়েকশো বছর আগে বিধর্মী হার্মাদের স্পর্শ বাঁচাতে জহরব্রত পালন ক’রে রাজকুমারীরা ঝাঁপ দিয়েছিল করতোয়ায়, সেই খাড়া পাড় বেয়ে উঠে এসেছে হকসেদ, জলবাঁদরের মতো ঘেঁষটে ঘেঁষটে। গায়ে তার মেছো গন্ধ। আর নামটাও দ্যাখেন কেমন! হকসেদ। মোকসেদও না, বাসেদও না, আক্কাসও না, ঝাক্কাসও না, আবার মদের দেবতা ব্যক্কাসও না। মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে যায় সে বেশ কিছুদিনের জন্য। জনশ্র“তি আছে, ওই সময়টায় সে চলে যায় দূরের কোনো শহরে। লাইব্রেরিতে বসে বই আর ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে থাকে একটানা কয়েকদিন। হকসেদের বয়স কত বোঝা মুশকিল। দাড়ি-গোঁফ-চুল কিচ্ছু নাই, এক্কেবারে মাকুন্দা সাফ-সাফ্ফা, মাথাটা আদ্যোপান্ত গড়ের মাঠ। জাহাঙ্গীরনগরের নৃতত্ত্বের মাহবুব আর মোস্তফা বেশ গবেষণা করে-টরে শনাক্ত করেছে, হকসেদ পণ্ডিত হলো ভেড্ডিড ও মঙ্গোলয়েড নৃগোষ্ঠি আর সেইসঙ্গে পুরাণপ্রসিদ্ধ বায়স পক্ষিগোষ্ঠির সঙ্কর। সময়, ইতিহাস আর ভূগোলের বাইরে থেকে যেন উঠে আসা এই এক প্রহেলিকা-মানব!

একবার সিঁদ কেটে চুরির কাজ সেরে বের হয়ে দৌড়ে পালাবার সময় হকসেদ নিজেরই খুঁড়ে রাখা সিঁদের গর্তে পড়ে পা ভেঙে ফেলে। সেই থেকে সে হকসেদ খোঁড়া। যখন সে অপরাধ করে, কেউই তাকে ধরতে পারে না ঠিকই, কিন্তু কীভাবে যেন আপনাআপনি প্রাকৃতিক ইনসাফ ঘটে যায় তার বেলায়। একবার এক অন্ধকার ঝড়বৃষ্টির রাতে গামছায় মুখ ঢেকে ঢুকেছিল প্রোষিতভর্তৃকা এক গৃহবধূর ঘরে। মাটির ঘর, স্বামী দারোয়ানের চাকরি করে ঢাকায়; পাহারা দেয় অন্যের বাড়ি, এদিকে নিজের বাড়ি হকসেদের হাওলায়। কী হয়েছিল তা জানা যায়নি, তবে জানালা ভেঙে পড়িমরি প্রাণ-হাতে লাফিয়ে বাইরে এসে পড়েছিল হকসেদ। পড়েই হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড় জঙ্গলের দিকে। পরে, জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে পেশাব করছিল হকসেদ। এদিকে টিপটিপ বৃষ্টির ভেতর কোলাব্যাং ধরতে নিচেই ওৎ পেতে ছিল এক খাটাশ। খাটাশটা কোলাব্যাঙের বদলে খাবলা দিয়ে সোনাব্যাং ছিঁড়ে নিয়ে দৌড়…সেই থেকে হকসেদের নাম হকসেদ খোজা।

মানুষদের মধ্যে নরসুন্দর, প্রাণীদের মধ্যে শৃগাল, আর পাখিদের মধ্যে কাকেরা খুব বুদ্ধিমান ও চালাকচতুর হয়। শোনা যায়, বিদূষী বাক্সিদ্ধা খনা মারা যাবার পর তার জিহ্বাটা নাকি ভাগাভাগি করে খেয়ে নিয়েছিল শৃগাল ও কাক। সেই থেকে তাদের এত বুদ্ধি। বলা হয়ে থাকে, শিয়ালেরা হাইপার-অ্যানিম্যাল আর কাকেরা, অ্যান্টিবার্ড। তো, পণ্ডিত হকসেদ মানুষের ভাষা শেখাত প্রবাদপ্রসিদ্ধ সেই শৃগাল আর কাকদের। বেশ কিছু কাক ও শৃগাল ইতোমধ্যে রপ্ত করে ফেলেছে ভাঙা-ভাঙা বাংলা। প্রবীণ এক শৃগাল আর এক বায়স তো এখন গ্রামের নানান শালিশ-বৈঠকেও উপস্থিত থাকে। মূল্যবান মতামত দেয় তাদের সেই পাশবীয় বাংলা আর রপ্ত-করা ইশারা ভাষার মিশাল দিয়ে। বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম মানবকুলের বৈঠকে শিয়াল ও কাকের কার্যকর অংশগ্রহণ। কাক বসে উঁচু এক টুলের ওপর আর বড় একটি চেয়ারের ওপর উঠে বসে শিয়াল। শিয়াল প্রথম-প্রথম লেজ পেছনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বসতো, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে দুষ্ট পাবলিক লেজে চিমটি কাটে, এখন তাই লেজ সামনের দিকে রেখে বসে। পণ্ডিত হকসেদকে কেউ মানে না বটে, কিন্তু তার ওই দুই পাশব সাগরেদ- শিয়াল আর কাক- তাদেরকে ঠিকই মাতবর মানে পাবলিক।

একবার হলো-কি, হকসেদের এক অপকর্মের বিচার বসেছে। শালিশে অন্যান্য মাতবরের সঙ্গে হাজির আছে হকসেদেরই একনিষ্ঠ সাগরেদ ওই শিয়াল আর কাক। হকসেদকে ধরে এনে বেঁধে রাখা হয়েছে কলাগাছের সাথে। এই প্রথমবারের মতো সে ধরা খেয়েছে। অন্যসময় তো অকাম করেই লাপাত্তা হয়ে থাকে বেশ কিছুদিন। পরে সবকিছু যখন ঠাণ্ডা হয়ে আসে, এলাকায় হাজির হয় সে। অবশ্য খুব বড় ধরনের অপরাধ সে করে না, এই ধরেন, ছ্যাঁচড়া চুরিচামারি, খুচরা লুচ্চামি এইসব। তো যাই হোক, হকসেদের বিচারে নানাজনের নানা মত। শেষে সাব্যস্ত হয় হকসেদকে ধোলাই দেওয়া হবে আচ্ছামতো। ঘোড়াঅলা দানেছ মল্লিকের ঘোড়া-চাবকানো চাবুক দিয়ে চাবকানো হবে। গুনে গুনে ২৯ চাবুক। এর মধ্যে হঠাৎ করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শিয়াল মাতবর তার ভাঙা-ভাঙা হুক্কাহুয়া বাংলায় উঠল, “খোজাটারে এমন মাইর দেওনের কাম যে খোজা খাড়া-ই থাকবে, খোজার জান থাকবে না।” শিয়ালের কথা শুনে পাবলিক তো থ, কেউ কেউ হাসতে হাসতে খুন হবার জোগাড়। রাগের চোটে হকসেদের চোখ বড় হতে হতে ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম। আরে! শালা ইবলিশটা কয় কী! তাজ্জব-কি-বাত! গজগজ করতেই থাকে হকসেদ, “শালার শিয়ালটারে তো মানুষ বানাইতে পারলাম না! কীর’ম হাড়ে-হারামজাদা দ্যাখ্ দিনি! বজ্জাতের হাড্ডি কোনহানকার! ওস্তাদের ওপর ওস্তাগরি, না?” পরে অবশ্য একটা মিলমিশ করে দেবার অভিপ্রায়ে শিয়াল মাতবরসহ আরো কিছু মাতবর হকসেদকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ব্যাটা ইল্লৎ, মাফ চা, অকাম করছোস, মাফ চা মুরুব্বির কাছে।” হকসেদ আত্মপক্ষ সমর্থনও করে না, মাফও চায় না। রাগে খালি গরগর করতে থাকে আর কটমট করে তাকায় শিষ্য ইবলিশটার দিকে। অবশ্য যখন দ্যাখে যে, উপায় নাই, সত্যি-সত্যি পড়েছে এবার মাইনকার চিপায়, তখন হরু মির্জার কাছে গিয়ে বলে, “মুরুব্বি, ভুল হইছে, মাফ কইরা দ্যান।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার গোমর ভাব পুরাপুরি অটুট। হরু মির্জা মাফ করে না তো করেই না। অনেক্ষণ হাতজোড় করে সাধ্যসাধনা করে আসামি হকসেদ, অবশেষে বিরক্ত হয়ে একসময় উষ্মামেশানো স্বরে বলে ওঠে, “মাফ দিলে দ্যান, না দিলে তা-ও কন, মাফ কেমনে পাওন লাগে তা ভালো কইরা জানি।” আরে, দ্যাখ্ তো কারবার, মাফও নেবে দেখছি মাস্তানির মাধ্যমে। চোরের মায়ের বড় গলা/ লাফ দিয়া খায় গাছের কলা। এদিকে আবার এরই মধ্যে কিছু লোকজন হরু মির্জার ওপর বিরক্তও হতে শুরু করেছে, বলে, “হরু মির্জার খালি বেশি-বেশি, পোংটা পণ্ডিতটা এত কইরা মাফ চাইতেছে, মাফ কইরা দিলে কী হয়।” পরে অবশ্য অবস্থা বেগতিক দেখে হকসেদকে মাফ করে দেয় হরু। ছাড়া পাবার পর, লোকজনদের বলে কী জানেন? বলে, “দ্যাখ্ তো কিত্তিখান! হামাক লিয়া বানছে গিয়া কলাগাছের সাথোত। কী কমু খালি হাসি আইসলো দেইখা, তা নাইলে এইসব কলাগাছ-মলাগাছ এক্কু ঝাঁকিত উপড়ায়া ফেলায়া কখন যাইতাম গিয়া পলায়া, হামাক আর পায় কেডা! প্রত্যুত্তরে একজন আবার বলে ওঠে, “ও, ওই যে মেনি মাছ না ভ্যাদা মাছ, কি জানি এক মাছ আছে না, জালে আটকা পইড়া নাকি কয়- ফৌজদারি জাল ছিঁড়তে পারি/লাগে আমার এক তুড়ি//কিন্তু যেই মাথা দেই জালের ফাঁকে/অমনি আমার খালি-খালি হাসি লাগে//। হকসেদের হইছে-গিয়া হেই দশা।”

হকসেদ খোজাকে এই দেখা যায় মহাস্থানগড় এলাকায়, তো পরক্ষণেই বগুড়া শহর। তার কায়কারবারই অন্যরকম, মহা-তেলেসমাতি। একদিন পড়–য়া-র সামনে জাহাঙ্গীরনগরের ‘শান্তি ও সংঘর্ষ’ ডিপার্টমেন্টের চৌকস ছাত্র রাশেদ তর্ক করছে বিশ্বরাজনীতির জিওগ্রাফি ও কেমিস্ট্রি নিয়ে, বুশ-ব্লেয়ার-লাদেন-সাদ্দাম নিয়ে, তার সাথে ফুকো, দেরিদা, লাকাঁ, ডেলুজ, হাইপার মডার্নিটি, ইডিওলজি ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রোপাগান্ডা মেশিনারি, সাবঅলটার্ন, জৈন ও সুফিপ্রভাব…আরো কত কী মিশিয়ে-টিশিয়ে বকে চলেছে অনর্গল। পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে হকসেদ, শামীম, অসিত, আরজু …। রাশেদের বাকবিভূতির টানে শামীম, অসিত আর আরজু যেই যাওয়া ধরেছে পড়–য়ার দিকে, অমনি হকসেদ ঠাস করে বলে ওঠে, “সাবধান! কাছে যাইস না, দ্যাহোস-না কেমন বদহজম হইছে রাশেদের, বমি-উমি ছিট্যা আইসা গায়ে লাগবো কইলাম। এঃ, বেবাক বিদ্যা এক্কেরে খায়া লইছে একসাথ!” তারপর বলে, “ও, কাল তো কী জানি একটা সেমিনার আছে না? ফাটাফাটি বক্তৃতা দিবো রাশেদে…বুর্জোয়া, জঙ্গি, সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেটারি…সবগুলারে একধারসে খালি ধ্যান-ধ্যানা-ধ্যান কচুকাটা করবো, হের লেইগা দ্যাহোস-না জিব্বায় ক্যাংকা ধার দিতাছে, আর দ্যাখ্ দ্যাখ্ ভোদাই পাবলিক হা কইরা তা-ই শুনতাছে! আর কইস-না, যত্তোসব পান-জর্দা আঁভা-গার্দা! ‘বিস্ফোরণ’ কইয়া জোরে আওয়াজ মারলেই কি আর বিস্ফোরণ হয়? বিস্ফোরণ ঘটায়া দেখাইতে হয়।”

আরো আছে। হকসেদ যাচ্ছে বাদুড়তলার মধু মোহন্তের ভুসিমালের দোকানের পাশ দিয়ে। সঙ্গে ফিরোজ, ফারুক, অশোক, রন্টি। দোকানে কালার টিভি লাগিয়েছে মধু মল্লিক, তাতে ডিশের কানেকশন। সন্ধ্যার পর দোকানে বসে টিভি দেখছে দত্তবাড়ির শাহীন, পেয়ারা পাকা লেনের স্বপন, বৃন্দাবনপাড়ার রফিক, ঠ্যাঙ্গামারার বাপ্পি…আরো অনেক লোকজন। টিভিতে ডাকসাইটে এক বহুজাতিক কোম্পানির শানদার বিজ্ঞাপন। নতুন এবং ফাটাফাটি। স্বপন, শাহীন, রফিক, বাপ্পি ও আরো কয়েকজন যুবক…বিজ্ঞাপনটার নান্দনিক নানা দিক নিয়ে আলাপ করছে, তারিফও করছে বেশ। তারা বেশ উচ্চকিত, উচ্ছ্বসিত। হকসেদ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিরোজ-ফারুকরাও দাঁড়িয়ে গেল। একটুখানি দেখল বিজ্ঞাপনটা। তারপর যুবকদের উচ্ছ্বাসের ওপর বেমক্কা ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়ে খর্খরে গলায় বলে উঠল হকসেদ, “কেডা জানি কইছিল-না, বিজ্ঞাপন হইল-গিয়া পুঁজির ধর্ষণ। তয় বেশ আর্টিস্টিক কইরা ধর্ষণ করে তো, হের লেইগা ধর্ষণে আমরা বেশ মজাই পাই, ভালোই এনজয় করি! আর খালি মিঠা-মিঠা মিছা কথা! ফলনা মাখলে ফর্সা, দখনা মাখলে লম্বা, থুক্কু, দখনা খাইলে লম্বা! শা-লা! কোটি-কোটি টাকা চুইষা নিয়া বিদেশ পাচার করিচ্ছে নয়া জমানার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলান, আর এইদিকে দ্যাখ্ অ্যাকটিং করলে কয় টাকা দিবো-না-দিবো হের লেইগা, টিভিতে চেহারা একটু দেখাইব-কি-দেখাইবো-না হের লেইগা পোলা-মাইয়া জুয়ান-বুড়া সবতে মিল্যা কীর’ম নাচন-কোঁদন করিচ্ছে বিস্টি-ক্যাদা-প্যাঁকের ভিতরে, ঝাঁকে-ঝাঁক… এই একবার বিলের ধারোত, আরাকবার লঞ্চের উপরোত, আরে! লঞ্চটা উল্টায়া যাইবো তো! ফের দ্যাহো দ্যাহো যায়া উঠছে গাছোত, আবার-ফির হাইরাইজের ছাদোত! কত কিত্তি! আর নেটকি-ভেটকি করিচ্ছে কতর’ম…ওই দ্যাখ্ দ্যাখ্ কোট-টাই-পরা চান্দিছিলাটারে দ্যাখ্, ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার লাহান ক্যাংকা তিড়িংবিড়িং ফাল পারিচ্ছে খালি। বাঃ! বাঃ! ফের দ্যাখ্ দ্যাখ্ দ্যাখ্ ঘাড়গর্দান-এক-হয়া-যাওয়া গণ্ডারটারে দ্যাখ্, না পারে ঘাড় ঘুরাইতে, না পারে মাঞ্জা লড়াইতে, তা-ও দ্যাখ্ নাচিচ্ছে ক্যাংকা! আহ! কী জেল্লা! আর জোশ দ্যাখ্ কত! আর এইহানে বইসা বিজ্ঞাপনের অ্যাসথেটিকস নিয়া এইসব অ্যাজলা পোলাপান, বোঝে-না-সোঝে-না, গ্যাঁজলা তুইলা ফালাইচ্ছে মুখোত।”

ঘুমঘুম উদাস দুপুর। সমস্ত চরাচর যেন ঝিমাচ্ছে নিঃশব্দে। ফসলের মাঠে, গাছের পাতায়, করতোয়ার জলে বাতাসের যে হল্লা, হাওয়ার যে গুলতানি ছিল সকালবেলার দিকে, থেমে গেছে সব। কলহপরায়ণ সাতভাই পাখির দল, কলহ থামিয়ে চুপচাপ বসে আছে গাছের ডালে ডালে। চোখের আড়াল হওয়া বাছুরটির জন্য গাভীর যে ঘনঘন ডাক, তা-ও আর শোনা যাচ্ছে না এখন। পাখির কূজন নাই, পাখসাট নাই, শ্যামরঙা ভ্রমরের গুঞ্জন নাই, গাভীর হাম্বারব নাই…সব স্থির, শান্ত, সমাহিত…। এমন সময় হঠাৎ সমস্ত নীরবতা ভেঙে বেজে উঠল ভাটির দিকে বয়ে যাওয়া এক মহাজনি নৌকা…“আমার কাঙ্খের কলসি/ গিয়াছে ভাসি/ মাঝি রে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়া রে/ মাঝি রে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়া//… ধীরে ধীরে মাঝি যদি সাগর দিতে পাড়ি/ তবে কি কলসিখানা ভাসিত আমারই?//। চরাচরজোড়া নিস্তব্ধতা ভেঙে বেজে ওঠা এই গান তার তীক্ষè সুরসহ তিরের মতো এসে বিঁধল নদীর পাড়ে একা-একা ঘুরতে-থাকা গানপাগলা, বংশীবাদক তপন মল্লিকের কলিজা বরাবর। সুরের প্রহারে শিউরে উঠল তপন। আস্তে আস্তে দৌড়াতে লাগল নদীর ধার ধরে, সুরের পিছে পিছে।

যান্ত্রিক গোলযোগে নাকি খেয়ালি মাঝির হঠাৎ খেয়ালে, ঠিক বোঝা গেল না, তবে গান থেমে গেল সহসা। ফের বেজে উঠল, থামল আবার। অসহ্য লাগছে তপনের। এক পর্যায়ে সে দুই হাতের তালুকে চোঙা বানিয়ে মুখের কাছে এনে ডাক পাঠাল মাঝির উদ্দেশে, “হেই মাঝি ভাই, ওই যে ওই গানটা বাজান-না ভাই একবার… কী জাদু করিলা/পিরিতি শিখাইলা…। তপনের কথা শুনতে পেয়েছে কি পায়নি, ‘কাঙ্খের কলসি’ জলে ছেড়ে দিয়ে বেজে উঠল, “কী জাদু করিলা/পিরিতি শিখাইলা/থাকিতে পারি না ঘরেতে, প্রাণ সজনী/ থাকিতে পারি না ঘরেতে//”। প্রেমের লোকায়ত এই গানখানি যে-ই শুনেছে, আমার ধারণা সে-ই মজেছে… গানের কথা আর তার আধো-রাখালি আধো-ভাটিয়ালি সুরের মধ্যে রয়েছে কী যেন অচেনা এক মায়া ও আবেশ, অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখে ভেতরে-বাহিরে। “আমারো লাগিয়া/ নিরলে বসিয়া/ তোমারে যতনে গড়িল বিধি” কিংবা ওই যে “পড়ে গো ঢলিয়া/ঢলিয়া ঢলিয়া/তোমারো মুখেতে পূর্ণশশী”…কথাগুলি এগুতে থাকে ধীর লয়ে, এগুতে এগুতে ওই যে “তোমারে যতনে” কিংবা “তোমারো মুখেতে” পর্যন্ত গেয়ে চূড়ায় উঠিয়ে নিয়ে যখন ছেড়ে দেয় ক্ষণিকের জন্য, এবং ফের ধরে ফেলে… তখন সুরবিরতির ওই ক্ষুদ্র ক্ষণ-অবকাশের মধ্য থেকে ঘটে রুপালি অগ্ন্যুৎপাত সুরের আকাশে…আর নদীপৃষ্ঠার ওপর দিয়ে জলীয় বাষ্প শুষে নিয়ে নিয়ে সেই সুর যখন ভাটি থেকে ভেসে আসে উদার অবারিত অববাহিকার দিকে, মর্মী মানুষ কেমন মোহিত হয়ে যায় তখন, ভুতগৃহীতের মতো হাঁটতে থাকে সুরের পিছে পিছে, রসজ্ঞ ভিজে যায় রসে, উদাসী মানুষ হয়ে ওঠে আরো উদাসীন। সুরপাগলা তপনেরও আজ হয়েছে তা-ই। ভাটির দিকে বয়ে যেতে যেতে আস্তে আস্তে কখন মিলিয়ে গেছে সুর, কিন্তু বেজেই চলেছে রেশমি রেশটুকু তার। ওই উদাস আনন্দময় সুর আজ সারাটাদিন ঘুরিয়ে মেরছে তপনকে, বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে…

সন্ধ্যার পর ওই সুর গানপাগলা বংশীবাদকের অন্তর্গত সাতমহলার নানা অলিগলি ঘুরে ঘুরে, বর্ণাঢ্য সব আঙরাখা কিংখাব ছুঁয়ে ছুঁয়ে উঠে এলো অধরোষ্ঠে। নদীর ধারে, বর্ষীয়ান সেই অশথ গাছের নিচে, পা মেলে বসে আঁড়বাশিতে সুর তুলল রসিক বাঁশরিয়া…“কী জাদু করিলা…পিরিতি শিখাইলা…থাকিতে পারি না ঘরেতে…।” আহ! বাঁশির সুর। সকল বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে এই বাঁশিই হচ্ছে সবচেয়ে অর্গানিক! অনেকক্ষণ ধরে ধীর লয়ে, প্লুত স্বরে বেজে চলল বাঁশি। অদ্ভুত বিরহমধুর সুর। তারপর কিছুক্ষণ বিরতি। বাঁশি আর বাজছে না দেখে অদূরে আলো-অন্ধকারে পাটশোলার বেড়ার আড়াল থেকে কাবিল কারিগরের ত্রিশোর্ধ বউ আম্বিয়া উনুনে রান্না তুলে দিয়ে কিছুটা আহত গলায় বলে উঠল, “ও মল্লিকের ব্যাটা, বাঁশি থামায়ে দিলেন যে! তোলেন-না ফের ওই গানটা, শুনি।” বাঁশরিয়া আবার হাতে তুলে নিলো বাঁশি। একাগ্রচিত্তে, প্রাণমন উজাড় করে দিয়ে সুর তুলল উথালপাথাল। ফিনকি দিয়ে দিয়ে ছুটছে সুরের স্ফুলিঙ্গ, ছড়িয়ে যাচ্ছে আগুন সমগ্র চরাচরে… গাছে গাছে, শস্যে শস্যে, ছনের ছাউনিতে আর ধনচে-শোলার বেড়ায় বেড়ায়। এখন আর কোনো শব্দ নাই, সুরের সূক্ষ্ম স্বনন ছাড়া। সব শব্দ গিয়ে মিশে গেছে যেন এক নিঝুম নৈঃশব্দ্যে। এইবার যা ইচ্ছা তা-ই হোক ওই দূরে, দূরে দূরে,… যত মারণকলের কলরব, পরাক্রমীদের দূরাগত তর্জনগর্জন, সার্কাসের লোম-ওঠা বৃদ্ধ সিংহের গোঙানি, সঙ আর জোকারদের নিভৃত নৈশকান্না… এইবার দুনিয়ার যত আঙুর ও কামরাঙা, ভরে উঠুক সব হর্ষবিষাদ রসে, চণ্ডাল ভুলে যাক চিতা-সাজানোর কারিগরি, আক্ষেপ জেগে উঠুক শশ্মানপতির, উ™£ান্ত হয়ে যাক নবীন মৌমাছির ঝাঁক বানডাকা সর্ষেফুলের রূপে, গোরস্তানের পেশাদার রোদনকারী ভুলে যাক রোদন হঠাৎ; দুষ্ট শিশু ধরা খাক, খেয়ে বলতে থাকুক সোনালি-রুপালি মিথ্যা অনর্গল; বাবুই ভুলে যাক বয়নসূত্র আর দাঁড়কাকের ডানায় ভর করে নেমে আসুক আলকাতরার মতো অন্ধকার…আর…ঢেকে দিয়ে যাক স-ব…তারপরও হতে থাকুক…আরো যা যা হয়…

বাঁশি থেমে গেছে। অনেক রাত করে গঞ্জ থেকে বাড়ি ফিরেছে কাবিল কারিগর। খেতে বসেছে। একে তো ঠাণ্ডা ভাত, তার ওপর তরকারিতে নাই লবণ। আলুনি সালুন খেয়ে রাগ চড়েছে কাবিলের। ভাত ফেলে উঠে গিয়ে বকাঝকা করেছে আম্বিয়াকে, দুচারটা ঠোনাও মেরেছে হয়তো। রাতের দ্বিতীয় যামে অস্পষ্ট সুর তুলে কাঁদছে আম্বিয়া। কালা-র প্রাণ-উতলা আনন্দমেদুর সুরের পর, হায়, রাধাকেও তুলতে হয় বিষাদবিধুর ধুন- এটাই সংসারের বিধি। পিরিতিসুরের সর্বনাশা বিস্তারের পরপরই দহনসুরের ঝালা। রাধিকার নেপথ্যে হয়তো তখন বেজে চলেছে- “উনানে রান্না তুলে/নুন দিতে যাই যে ভুলে/কালা, তোর কারণে নষ্ট হতে আর কী বাকি?// কালা, তোরই পানে আড়নয়নে চেয়ে থাকি//”

কত অলৌকিক ঘটনা ঘটে এই লৌকিক দুনিয়ায়! বাস্তবতার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয় কত অবাস্তব নাটক! কিন্তু মহাস্থানগড়ের এই এলাকাটুকুতে মাঝেমধ্যে এমনসব ঘটনা ঘটে যেগুলি একাকার করে দিয়ে যায় লৌকিক-অলৌকিকতার ভেদরেখা। পেরিয়ে যায় বাস্তব-অবাস্তবের সংজ্ঞা ও সীমানা। এইসব অবাক-অচেনা ঘটনায় লোকে এতটাই বেকুব বনে যায়, হয়ে পড়ে এতটাই বিহ্বল যে, ওগুলিকে তারা ঠিক কোথায় ঠাঁই দেবে- সংবাদে, ইতিহাসে, রূপকথায়, নাকি কিংবদন্তিতে- স্থির করতে পারে না। তাই তারা মহাস্থানের চালু ইতিহাস আর প্রচল কিংবদন্তির আড়ালে ঢেকে রেখে দেয় এইসব অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাপ্রবাহকে। এমনকি বগুড়ার বাইরে থেকে যারা আসে, পর্যটন, প্রশাসন বা গবেষণার কাজে, তারাও কী এক অজ্ঞাত কারণে বেমালুম চেপে যায় সবকিছু। মনে হয় কখনো কিছুই ঘটেনি, আর আমরাও দেখিনি কিছুই।

একবার প্রকাশ্য দিবালোকে আকাশ অন্ধকার করে নেমে আসে পাখির বিশাল বিশাল ঝাঁক। আবাবিল পাখি নয়, তবে তাদের মতোই ছোট ছোট, অসংখ্য, অগণিত। বৃষ্টির মতো তারা ঝেঁপে পড়ল লালে-লাল হয়ে থাকা মরিচের মাঠে। পাখিদের ঠোঁটগুলি লাল, ডানায় ছোপছোপ লালের মাঝে সবুজ-সবুজ পালক। মাথায় ছোট্ট সবুজ ঝুঁটি। মরিচ খেতের মরিচ লাল, পাতা সবুজ। পাখি আর মরিচগাছের এক অদ্ভুত ম্যাচিং। রঙের অভূতপূর্ব ঐকতান। প্রতিটি মরিচগাছে অন্তত তিনচারটি পাখির ডানা ঝাপটানো আর দ্রুত ঠুকরে ঠুকরে লঙ্কাভক্ষণ…। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী এই কায়নেটিক আর্ট। পাতাঝলমলে তুঁতগাছে তুঁতপোকা ছেড়ে দিলে যেমন মুহূর্তের মধ্যে সব ডালপালা পুরোপুরি নাঙ্গা, নিষ্পত্র হয়ে যায়, তেমনই এই নব্য আবাবিলের ঝাঁক কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ মরিচশূন্য করে ফেলল মাঠকে মাঠ। তাজ্জব ব্যাপার! তবে তাজ্জবের আর দেখলেন কী! আরো তো বাকি। মরিচখেত সাবাড় করে ঝাঁকের পর ঝাঁক উড়ে গিয়ে পড়ল পাশের পাকা ধানের খেতে। লঙ্কাকাণ্ডের পর এবার ধান্যকাণ্ড। ধানখেতে গিয়েই পাখিগুলি সব হাই তুলতে শুরু করে দিল চঞ্চুব্যাদান করে। বগুড়ার মরিচ- এত ঝাল যে, পাখিদের চঞ্চু আর জিহ্বা থেকে ছুটল ছোট-ছোট আগুনের ফুলঝুরি। নিমেষে আগুন ধরে গেল পাকা ধানের মাঠে। পাখির ঝাঁক উড়ে উঠল ফের। আকাশটা যেন ছেয়ে গেল ঘন কালো মেঘে। নেমে এল রাহুগ্রাসের অন্ধকার…সেই অন্ধকারের মধ্যে মাঠের ধানপোড়া ভস্মের ভেতর ফুটে উঠল অজস্র শাদা-শাদা খই। লোকে ভাবল শেষ হলো বোধহয় এই গজব-নাট্য। কিন্তু না, এ-দৃশ্যও ক্ষণদৃশ্য; ঝাঁক আবার নেমে এলো মাটিতে। নেমেই খুঁটে খুঁটে সাফ করে খেয়ে ফেলল সব খই। ভুরিভোজের পর পাখিদের খানিকক্ষণ বিরতি। তারপর আবার উড়াল। এবার সত্যি-সত্যি বিদায়। রাহু কেটে গেল, হেসে উঠল আলো। পরে একসময় দিনের আলোও নিভে এল। সন্ধ্যা নামল। মহাস্থানের মানুষ দাঁড়িয়ে রইল মহাস্তব্ধ হয়ে, মাঠ ঘিরে, অর্ধবৃত্তাকারে। তেলেসমাতির মতো মাঠকে মাঠ লাল মরিচ, পাকা ধান, নিমেষে সব ফৌত হয়ে গেল একবারে! গুঁড়িয়ে-দেওয়া, গায়ে-হিমধরানো ভয়মেশানো বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই গ্রামবাসীদের আবার অবাক হবার পালা। সেদিন ছিল প্রতিপদ। প্রতিপদের সময় লোকে শোলক কাটে, ত্র“টিপূর্ণ ছন্দে- আইজ প্রতিপদ কাইল দ্বিতীয়া/চান উঠব আসমান গুতিয়া। তো, সেই প্রতিপদের রাতে, অন্ধকারের মধ্যে তারা তাজ্জব তাকিয়ে দ্যাখে, মাঠভর্তি ছাইয়ের ভেতর ছোট্ট ছোট্ট অসংখ্য রতœদানার মতো কী যেন সব জ্বলজ্বল করছে। ভয়ে ভয়ে কাছে যায়, দ্যাখে- অজস্র হিরার টুকরা। হীরকবিন্দুগুলি থেকে অন্ধকারেই বিচ্ছুরিত হচ্ছে বহুতল বর্ণালী-বর্ণমালা। পাখি খেয়ে গেল মরিচ আর ধানপোড়া খই, রেখে গেল রতœদানা, পুরীষ আকারে। কেমনে কী, কী বৃত্তান্ত কিছুই না বুঝে মহাস্থানের বিস্ময়জব্দ মানুষেরা অন্ধকার রাতে পোড়া মাঠে ছড়িয়ে-থাকা ছাইয়ের ভেতরে রতœ কুড়ানো শুরু করে দেয়।

ওগুলি আসলেই হীরকখণ্ড। কিন্তু কীভাবে? মাজেজাটা জানা গেল পরে। রহস্যময় ওইসব পাখি যখন আহার করে, তখন তাদের পেটের ভেতর ঘটতে থাকে এক জটিল আন্ত্রিক আলকেমি। মাটির গভীর নিচে তাপে চাপে নিষ্পেষণে দিনে দিনে বৃক্ষের কার্বন হয়ে যায় কয়লা, আরো-আরো তাপে চাপে আরো বহুকাল পরে ওই কালো-কুচ্ছিৎ অঙ্গারই ফের রূপান্তরিত হয় জ্বলজ্বলে হীরকে। সেই একই সিলসিলায়, একই প্রক্রিয়ায় পাখির পাকস্থলির রসায়নের দাপটে এমন তাপ ও চাপের সৃষ্টি হয় যে ওই মরিচের কার্বন, খইয়ের কার্বন সব রূপান্তরিত হয়ে যায় কাঁচা হিরায়। তবে ভূগর্ভে যে-প্রক্রিয়া চলে হাজার-হাজার বছর ধ’রে, পাখির পেটে তা ঘটে যায় বড়জোর আধা-ঘন্টায়। রহস্য-পাখির পেটে-পেটে যে এত রস রহস্য রসায়ন, এত তেলেসমাতি, কে জানত! শোনা যায়, এরকম ঘটনা নাকি ওই একবারই ঘটেছে দুনিয়ায়।

এরপর থেকে দেখা গেল মহাস্থানের বউঝিদের নাকফুলে, কানের দুলে হিরার কুচি। ভেরুয়া টাইপের আলসে ঘরজামাইদেরও আংটিতে হীরকদানা… এমনকি ঠিকমতো খেতে পায় না, কিডনি বেচে ঋণ শোধ করে মহাজনের, এমন ফ্যামিলিতেও আছে হিরার অলঙ্কার। হিরার টুকরাগুলি খনিজ হিরার মতোই বহুতল। বিচ্ছুরণও হয়, কিন্তু কেমন যেন দুইনম্বরি-দুইনম্বরি ভাব, অতটা শক্ত নয়, কাচ কাটা যায় না ঠিকমতো। এই হিরা তাই অলঙ্কারে সচল, কিন্তু বাজারে অচল। অচল হিরার জাগে সচল রতœরীতি দিকে দিকে…।

এ অঞ্চলে যে কত মধু ও বিষাদের ঐকতান, বেদনা ও হাসাহাসির অর্কেস্ট্রা, ইয়ত্তা নাই তার। ওই যে কার্তিকের জ্যোৎস্নায় শিশিরভেজা নাড়ার খেত মাড়িয়ে হেঁটে চলেছে অসমবয়সী দুই মানবসন্তান। পিতাপুত্র। পিতা ছাত্তার। পুত্র ডেভিড। ছেলেবেলার নাম মোস্তফা। বহুবছর পর দৈবাৎ দেখা বাবায়-ছেলেতে। ফিরে-পাওয়া পুত্রকে নিবিড় অপত্য স্নেহে ভিজিয়ে একাকার করে দিতে চাইছে পিতা। দেখা হবার পর থেকেই একনাগাড়ে ভাবাবেগ দিয়ে, বাৎসল্য দিয়ে কতরকম চেষ্টা করছে পুত্রের ভেতর রিশতাভাব জাগিয়ে তুলতে। শৈশবের কত কথা, কত স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চাইছে পুত্রের মনে। কিন্তু যোগাযোগ হচ্ছে না কিছুতেই। অচেনা বেদনায় বিমর্ষ হয়ে পড়ছে বৃদ্ধ বাবা, তবু হাল ছাড়ছে না। খুব ছোটবেলা থেকেই ছেলে বিদেশে, পড়ালেখা করেছে অনেক, তাই হয়তো সমীহাবশত হাইস্কুল-পাশ বাবা শুদ্ধ ও প্রমিত বাংলায় ছেলের সঙ্গে খুব মিস্টি করে কথা বলছে। অবশ্য মাঝে-মধ্যে ছুটে যাচ্ছে তার প্রমিত ভাষাভঙ্গি। ছেলেকে মোস্তফা না ডেভিড বলে ডাকবে, আপনি বলবে না তুমি বলবে, এইসব দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে ছাত্তার অবশেষে… “আহা! কতদিন পর দেখা হলো! এতকাল কোথায় থাকা হলো বাবা, কীভাবে আসা হলো, পথে কষ্ট হয় নাই তো” এভাবে কথা বলতে থাকল ভাববাচ্যে। পরক্ষণে আবার ছেলের সঙ্গে আপনি-আপনি করতে লাগল। ছেলে বলে উঠল, “আব্বা, আমি মোস্তফা, হারিয়ে যাওয়া ছেলে আপনাদের, বহুকাল পর পালিয়ে ছুটে এসেছি… এইভাবে কথা বলছেন কেন, আব্বা, আমার সাথে?” পুত্রের আন্তরিকতায় পিতা একটু একটু করে ভাববাচ্য থেকে সম্বোধন বাচ্যে আর আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুই-য়ে নেমে এল।

ডুগডুগির মেলা থেকে ছাত্তার মিয়া ঘুরিয়ে নিয়ে এলো ছেলেকে। “তোর কি মনে পড়ে বাবা, তুই যখন ছোট, তোকে একটা শোলক শিখায়েছিলাম, ধাঁধা দিয়া শোলক..! তোর মা যখন তোর নানির পেটে, তুই তখন কোথায় ছিলি, বল তো?… পারলি না? মা যখন নানির পেটে/ আমি তখন ডুগডুগির হাটে//। এই হলো সেই ডুগডুগির হাট। একবার হলো কি, মেলায় খুব ভিড়। তুই আমার পিছন পিছন। হঠাৎ কী হলো, আমি হারিয়ে ফেললাম তোকে। মনে পড়ে, মোস্তফা? সন্ধ্যা পার হয়-হয়। বহুৎ দূরের পথ। মেলার মধ্যে আমি তোকে খুঁজি, তুই আমাকে…কেউ কাউরে পাই না… পাই না তো পাই-ই না। পরে, এই মেলার মধ্যে ওই যে অর্জুন গাছ, ওইটার তলায় বসে তুই কাঁদছিস আর আ-ব্বা আ-ব্বা…বলে জোরে জোরে ডাক পাড়ছিস। তখন ইল্লৎ হকসেদ- মনে আছে নাকি বাবা, হকসেদের কথা?- মেলার মধ্যে কোত্থেকে-না-কোত্থেকে এসে তোকে দেখে বলে, “কীরে, আব্বা-আব্বা কইয়া ডাক পাড়তাছস, মেলার মধ্যে তো কত আব্বা! ছা-ত্তা-র… ছা-ত্তা-র… কইয়া জোরে জোরে ডাক দে, দেখবি তর বাপ তরতরায়া ঠিকই আয়া পড়বো।” আর তুই বাবা হকসেদের কথামতো আমার নাম ধরে ডাকতে শুরু করেছিস আর আমি পেছন থেকে এসে তোর কান মলে দিয়েছিলাম আচ্ছা ক’রে। হা হা হা… তখন তোর সে কী কান্নামিশানো লজ্জা! মনে পড়ে, মোস্তফা?”

চাঁদনি রাতে হেমন্তের আকাশে দুচারটি হালকা শাদা মেঘের চিলতে। অনেক দূরে দূরে। আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাবা নামিয়ে আনছে সেই মেঘ ছেলের মাথার ওপর। এক তুড়িতে শাদা মেঘকে নীল করছে, ফের নীল মেঘকে লাল বেগনি কমলা…। রঙিন মেঘের ছেঁড়া-ছেঁড়া ছ্যাঁকড়া-ছ্যাঁকড়া অংশ ক্যান্ডি ফ্লসের মতো আটকে থাকছে রাংচিতা ঝোপের ওপর। কিছুটা আটকে থাকল খেসারি-খেতের কাঁটা-কাঁটা কুসুম্বা ঝাড়ের বেড়ার ওপর। আর কিছুটা ছেলের চুলে। প্লাবিত জ্যোৎস্নালোকে খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সওয়ারবিহীন এক জাদুর গালিচা। বাবা তা লাফ দিয়ে ধরে নামিয়ে এনে তার ওপর ছেলেকে উঠিয়ে নিয়েছে। বাতাসের ঢেউয়ে দুলে দুলে গালিচা ভেসে চলেছে বড় পিরের ধাপ থেকে নিতাই ধোপানির পাট…। গালিচা এক্সপ্রেস। ধোপানির পাটে এসে নেমে পড়ল পিতাপুত্র। গালিচা সাঁই করে উড়ে জ্যোৎস্নাকুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেল দূরে। ছেলে খুব অবাক হচ্ছে, পুলক বোধ করছে, কিন্তু কেমন-যেন ঠিক যোগাযোগ হচ্ছে না।

ওই যে লম্বা এক তালগাছ, পাশে জিন্না ভাইদের বাড়ি, যুদ্ধের সময় মিলিটারিরা প্রথম এসেই এখানে একই বাড়ির সাত-সাতজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেছিল, চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল মহাসন্ত্রাস। পাশেই প্রাচীন এক বৌদ্ধ গুম্ফার ধ্বংসাবশেষ। লোকে বলে, বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘর। যুগ-যুগান্তরের ইতিহাস ও কিংবদন্তির ধূলি আর ঘাস জমে জমে রূপান্তরিত হয়েছে বিশাল এক ¯তূপে, ছোটখাটো টিলার মতো। বাবা বলছে, ‘তোর মনে পড়ে, মোস্তফা, একবার পাল্লা দিয়েছিলাম তুই আর আমি, দেখি কে আগে উঠতে পারে ওই টিলার উপর। মনে আছে, মোস্তফা? আমি আগে উঠে পড়েছিলাম। তুই ছোট্ট-ছোট্ট হাত-পা দিয়ে টিলার ঢাল বেয়ে উঠে আসছিস আর কাঁদছিস। হেরে গিয়ে তোর সে-কী রাগ! কাঁদতে কাঁদতেই বলছিলি তুই, “বড় হই আগে, তখন দেখো তোমাকে ঠিক হারায়ে দেবো। বাবা, আজ তুই কত বড় হয়েছিস! আমাকে তো একদম গো-হারা হারায়ে দিয়েছিস রে বাবা। এক্কেবারে মহাজব্দ হয়ে বসে আছি!” বাবার কথা শুনে ছেলের ভালো লাগছে, ছেলে খুশি হচ্ছে, স্মিতমুখ বালকের মতো তাকাচ্ছে বাবার দিকে বারবার, কিন্তু ঠিক যোগাযোগ হচ্ছে না।

ভালো থাকবে, ভালো খাবে, মানুষের মতো মানুষ হবে এই আশায় বুকে পাথর বেঁধে এনজিও-র এক বিদেশিনীর হাতে শিশুপুত্রকে তুলে দিয়েছিল দারিদ্র্যজর্জর বাবা-মা। আর তুলে দেবার পরপরই এক অবাক অচেনা নিঃসঙ্গতা, এক অদ্ভুত বোবা ব্যথায় যারপরনাই কাতর হয়ে পড়েছে বাবা-মা। ছেলেকে ফিরিয়ে আনার জন্য কত কান্নাকাটি, কত কাকুতিমিনতি…। বিদেশিনী তো পালকপুত্রকে নিয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে জার্মানি। অসহায়, পাগলপ্রায় মা-বাবা ঠিকানা জানে না, পথ চেনে না…তবুও উদ্ভ্রান্তের মতো হাহাকার করতে করতে জলাজংলা ঝোপঝাড় কাঁকর কাঁকড়া ক্যাকটাস আর ফাটাফাটা ভূগোল পেরিয়ে ঢাকার জাহাজঘাটা পর্যন্ত চলে এসেছিল, একজনকে হাতেপায়ে ধ’রে। কিন্তু ছেলেকে পেল না অল্পের জন্য। অ্যালুমিনিয়ামের এক বিশাল পাখি তার পেটের মধ্যে ছেলেকে উঠিয়ে নিয়ে উড়ে চলে গেল এক না-ফেরার দেশে, বেশ কিছুক্ষণ আগে। যারা দেখেছে পুত্রহারা মা-বাবার সেই ব্যথাজর্জর কাতরতা, কিছুটা হলেও তারা জানে বেদনার মাত্রা হতে পারে কতটা তীব্র!

সন্তান ক্ষয়ে ঝরে গেলে মনকে তবু প্রবোধ দেওয়া যায়, কিন্তু নিজের দোষে অল্পের জন্য চিরতরে হারানোর ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না কিছুতেই। আহা! ছোট্ট আদর-কাড়া মায়া-মায়া চেহারার ছেলেটা মা-মা ব’লে না-জানি কতবার কাতরে উঠেছে, কাঁদতে কাঁদতে পেছন ফিরে তাকিয়েছে কতবার! বিচ্ছেদ ও অনুশোচনার তাপে মা-টা কিছুদিনের মধ্যেই পাথর হয়ে গেল একেবারে। শোকে, তাপে, ভগ্নহৃদয়ের অসুখে কয়েক মাসের মধ্যেই মারা গেল শোকাতুরা মা। হৃদয়ে জখম নিয়ে আধপাগলা হয়ে বেঁচে থাকল বাবা।

তারপর, বহুদিন পর শিকড় খুঁজতে খুঁজতে জার্মান থেকে নানা দেশ ঘুরে উড়ে এসেছে ছেলে। সন্ধানও পেয়েছে তার আকাক্সিক্ষত ছেঁড়া শিকড়বাকড়ের। পেয়েছে বাবাকে, কিন্তু পায়নি মাকে। ছেলে আজ বড় হয়েছে, ‘মানুষের মতো মানুষ’ হয়েছে। কিন্তু বাবায় ছেলেতে যোগাযোগে গোলযোগ! মর্মে-মর্মে পুড়ে যাচ্ছে বাবা, হয়তো ছেলেটাও…

free counters

প্রতিক্রিয়া (৭) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুজিব মেহদী — এপ্রিল ৮, ২০১২ @ ৪:১২ অপরাহ্ন

      এ কী পড়িলাম বাহে!

      অসামান্য বলিলেও কম বলা হয়। ভাষা তো নহে যেন জাদু। মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া রাখিল এই এ…ত…এ…ত… পথ।

      আর, অবশ্যই হকসেদকে ভালোবাসিয়া ফেলিলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গৌতম চৌধুরী — এপ্রিল ১০, ২০১২ @ ১:৪৭ অপরাহ্ন

      “রহস্য-পাখির পেটে-পেটে যে এত রস রহস্য রসায়ন, এত তেলেসমাতি, কে জানত!” - সেই রহস্যময় আলোর ছটায় সকল ভাঙা মন জুড়ে যায় গো। লেখকের সোনার দোয়াত কলম হোক্‌।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মনির হোসাইন — এপ্রিল ১৩, ২০১২ @ ৩:৩৫ পূর্বাহ্ন

      রহস্যময় ওইসব পাখি যখন আহার করে, তখন তাদের পেটের ভেতর ঘটতে থাকে এক জটিল আন্ত্রিক আলকেমি। মাটির গভীর নিচে তাপে চাপে নিষ্পেষণে দিনে দিনে বৃক্ষের কার্বন হয়ে যায় কয়লা, আরো-আরো তাপে চাপে আরো বহুকাল পরে ওই কালো-কুচ্ছিৎ অঙ্গারই ফের রূপান্তরিত হয় জ্বলজ্বলে হীরকে। সেই একই সিলসিলায়, একই প্রক্রিয়ায় পাখির পাকস্থলির রসায়নের দাপটে এমন তাপ ও চাপের সৃষ্টি হয় যে ওই মরিচের কার্বন, খইয়ের কার্বন সব রূপান্তরিত হয়ে যায় কাঁচা হিরায়। তবে ভূগর্ভে যে-প্রক্রিয়া চলে হাজার-হাজার বছর ধ’রে, পাখির পেটে তা ঘটে যায় বড়জোর আধা-ঘন্টায়। রহস্য-পাখির পেটে-পেটে যে এত রস রহস্য রসায়ন, এত তেলেসমাতি, কে জানত!

      অদ্ভুত এক ভালোলাগা । গদ্যের যে মেদহীন প্রাণবন্ত বর্ণনা তা বাংলা গদ্যের আরেক ইঙ্গিত আরেক পথকেই সুগম করে । এ যে জাদু-বাস্তবতার বাবা । ধন্যবাদ মাসুদ খানকে । চলুক সঙ্গেই আছি ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mizan mallik — এপ্রিল ১৪, ২০১২ @ ১১:১৯ অপরাহ্ন

      আমি রীতিমত মন্ত্রমুগ্ধ। কথার জাদু এমন পরবশ করতে পারে!…তাজ্জব হয়ে গেলাম। এত জটিল সব বিষয়-আশয় এমন এক জাদুকরী ভাষায় প্রকাশ করা যায়…সত্যি আচানক. আর হকসেদ পন্ডিত! আমাদের কথিত পন্ডিত (যাদের কেউ কেউ এখন চন্ডালি ভাষা ছেড়ে সাধু ভাষার ঠিকুজি করছেন…আর যে মহাজন ভাব বোঝাতে গিয়ে ভূমিকাতেই গলদঘর্ম, আর খালি কুষ্ঠ কাঠিন্য) ঠাসকি খায়া যাবে…হকসেদের মুরিদ হবে…
      প্রিয় মাসুদ খান।
      চালিয়ে যান, আছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sagor — এপ্রিল ১৬, ২০১২ @ ৯:০৭ অপরাহ্ন

      অলস বসেছিলুম। কিছুই ভাললাগছিল না। পথে- প্রদেশে। শিরোনামে এতো ভাললাগেনি। হাল্কা নজরে পড়া শুরু করলুম। ঝিম ঝিম চোখ দুটো একটু বড় হলো। নিজেকে বহনকারী চেয়ারটা আরো সামনে নিয়ে এলুম। ওমা! বর্ণনার যাদুতে চোখ দুটো ছানা বড়া!হঠাত করেই খিল খিল হেসে ফেললাম। মুহূর্তেই ভাবনার জগতে গুরুগম্ভীর হতে হল। আমি কি উঠতে পারলুম পড়া শেষ না করে?…… চমৎকার! মাসুদ খান ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nurunnabi Shanto — এপ্রিল ২৩, ২০১২ @ ১০:২৬ পূর্বাহ্ন

      ঘোর লেগে যায় মাইরি! কী লেখছেন এইটা, মাসুদ ভাই? যাদু!

      নূরুননবী শান্ত

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খাতুনে জান্নাত — মে ২৫, ২০১৩ @ ৪:৪৫ পূর্বাহ্ন

      কিভাবে বলা যায়?
      বর্ণনার চমৎকারিত্বে, ভাবের গভীরতায়, ভাষার মাধুর্যে ভরপুর। এলেখা শতবার পড়িলেও মিটিবে না তিয়াস।
      দীর্ঘ জীবন পান আর লিখুন আরও অনেক অনেক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us  |  Bangla Font Help

© bdnews24.com