কুয়াকাটা : সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত

নূরুল আনোয়ার | ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২ ৯:২৯ অপরাহ্ন


খুব বেশিদিনের কথা নয় কুয়াকাটা নামটি মানুষের তেমন জানাশুনা ছিল। এখন এই নামটি নিয়ে যেভাবে ঘাটাঘাটি হচ্ছে অল্প ক’ বছর আগেও কেউ বেশি ভাবেনি। ভ্রমণপিপাসু মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের চিরপরিচিত পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নতুন নতুন জায়গা যোগ হচ্ছে। কুয়াকাটা ইতোমধ্যে ভ্রমণপিপাসু মানুষের চিত্ত জয় করে ফেলেছে।
কুয়াকাটা সম্পর্কে আমার জানাশুনা ছিল অতি অল্প। এটার অবস্থান কোথায় সেটাও আমার জানা ছিল না। এতটুকু আমি জেনেছি, যেখানেই হোক এটার অবস্থান সাগড়ের পাড়ে। আমি যতবারই চোখ বন্ধ করে কুয়াকাটার কথা ভেবেছি কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের মত একটা চেহারা তার মধ্যে দেখতে পেয়েছি। কল্পনা করতে দোষ কি? ভেবেছিলাম এখানে বিশাল বিশাল ঢেউ পাড়ে এসে আছড়ে আছড়ে পড়ে। পর্যটকেরা ওখানে নেমে স্নান করে। তারা লাফঝাঁপ করে। শ’য়ে শ’য়ে স্পিড বোট শাঁ শাঁ করে ছুটে চলে। সাগড়ের পাড়ে আছে ঘন অরণ্য। বন-বনানী। সেখানে আছে নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলি। ঝাউগাছের পাতায় পাতায় বাতাসে শিহরণ। তার সঙ্গে শোঁ শোঁ শব্দ। ছায়াশীতল গাছের নিচে বসে কপোত কপোতিরা বসে প্রেমের আলাপ করছে। তারা একে অপরের সঙ্গে নানারকম খুনসুটি করে চলেছে। আছে বড় বড় মার্কেট। তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে সেখানে ছুটে চলছে কেনাকাটা করতে। সত্যি বলতে কি, আমি এরকম একটি পরিবেশ কল্পনা করে এঁকে নিয়েছিলাম এবং সত্যি সত্যি ধরে নিয়েছিলাম জায়গাটি এরকম।
আমি যখন যেটা ভাবি সেটার শেষটা না দেখে ছাড়ি না। আমি মনে মনে স্থির করে ফেললাম আমাকে কুয়াকাটা যেতে হবে। সেই দু’ বছর আগে থেকে এ ভাবনা ভেবে আসছি। সময় এবং সুযোগের একটা ব্যাপারও ছিল। কিন্তু দুটোকে কোনভাবে আমি এক করে মেলাতে পারছিলাম না। আরও একটা সমস্যা ছিল, কোথা থেকে কিভাবে আমি কুয়াকাটা যাব তাও আমার জানা ছিল না। আমি নানাজনের পরামর্শ নিয়ে যেতে থাকলাম। কেউ কেউ আমাকে এমনভাবে ভয় ধরিয়ে দিল ওই জায়গায় আপাতত যাওয়া সম্ভব নয়। পটুয়াখালি পর্যন্ত লঞ্চ কিংবা বাসে সহজভাবে যেতে পারলেও তার পরের পথের অবস্থা ভয়াবহ। সিডরে আক্রান্ত হয়ে রাস্তা মাঝে মাঝে ধানি জমির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। শুকনো মৌসুমে যেমন তেমন বর্ষাকালে তার প্রশ্নই উঠে না। সত্তর আশি কিলোমিটারের পথ যেতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। আর ওই পথের বাসগুলোও লক্করঝক্কর মার্কা। তাছাড়া রয়েছে তিন তিনটে ফেরিঘাট।
ফেরিঘাটের কথা উঠতেই আমার শরীরে যেন জ্বর এসে গেল। ফেরিঘাটের ভোগান্তির কথা আমার কাছে অজানা নয়। আরিচা, পাটুরিয়া, মাওয়া ফেরিঘাটের অভিজ্ঞতা আমার আছে। একসময় মেঘনা, গৌমতি ফেরিঘাটেও আমি কষ্টের পরীক্ষা দিয়েছি। একবার আরিচা ফেরিঘাটে আমি চব্বিশ ঘণ্টা আটকেছিলাম। পাটুরিয়াতে ছিলাম বার ঘণ্টা। পটুয়াখালি থেকে কুয়াকাটা যেতে প্রায় আশি কিলোমিটার পথ যেতে তিনটি ফেরি পার হতে হবে শুনে আমি ভেতর থেকে চুপসে গেলাম। কিন্তু আমি তো প্রেমে পড়ে গিয়েছি। প্রেমের তো একটা মূল্য আছে। শুনেছি প্রেমিকাকে একনজর দেখার জন্য অনেকে সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিতে দ্বিধা করে না। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, তিনটা ফেরিঘাটের দুর্দশার কথা ভাবলে আমি প্রেমের মূল্য দেব কিভাবে।
সমস্যা দাঁড়াল এক জায়গায়। আমি কোথাও একা যেতে অভ্যস্ত নই। সঙ্গ দেয়ার মত একজন মানুষ তো আমার দরকার। ঢাকা শহরে কাকের চে’ আমার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা অল্প নয়। আমি অনেকের কাছে ধর্ণা দিলাম আমাকে কেউ যেন সঙ্গে করে কুয়াকাটা নিয়ে যায়। আমি যাদের কাছে গেলাম তারা সময় এবং অর্থের ব্যাপারটিকে বড় করে দেখল। আমি কাউকে দোষ দেই না। ঢাকা শহরে সকলকে একভাবে না একভাবে ব্যস্ততার মধ্যে কাটাতে হয়। অর্থকষ্টের কথা নাই-বা বললাম। যাহোক, কেউ যদি কোনদিন আমাকে আপনা-আপনি যেচে এসে বলে, চল, তোমার সঙ্গে আমি কুয়াকাটা যাব, সেদিনই হয়ত আমার যাওয়া হবে। এ ছাড়া আমার প্রেমিকার জন্য নিরন্তর অপেক্ষা ছাড়া উপায় কি!
গত বছর আমি সুন্দরবনে গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম সুন্দরবন হলিডেজ ট্যুরসের মাধ্যমে। সেই সুবাদে এ প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার বাবুল সাহেবের সঙ্গে আমার একটি সুসম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেছে। তিনি আমাকে বললেন, সামনে পঁচিশ ডিসেম্বর কুয়াকাটায় একটা ট্যুর আছে। প্রায় পঞ্চাশ ষাটজনের ডাক্তার নিয়ে তারা ওখানে যাবেন। ওখানে তারা আমাকে অতিথি হিসেবে বরণ করে নেবেন। তাতে করে আমার যাওয়াটা সহজ হবে।
আমি তার দাওয়াতটা সানন্দে গ্রহণ করলাম। আমি মনে মনে স্থির করলাম, সুযোগটা আমি নেব।
কিন্তু দিনক্ষণ হিসেব করে দেখলাম ডিসেম্বরে নড়াচড়া করার মত সেই সুযোগ আমার নেই। ওই সময়টা আমাকে নানারকম ব্যস্ততার মধ্যে থাকতে হবে। সুতরাং আমাকে যদি যেতে হয় তার আগেই একটা কিছু করতে হবে। আমি যেখানে যাই অন্তত বউ-বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেষ্টা করি। রাস্তাঘাটের যে হাল তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করাটাই অবান্তর। আরও একটা বড় কারণ ছিল আমি দ্বিতীয়বার বাবা হতে চলেছি। আমার বউকে যতটুকু নিরাপদে রাখা যায় সেটাও আমার একটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমি আবার বাবা হতে যাচ্ছি এটি আমাকে একরকম উৎফুল্ল করে রেখেছিল। আমি আমার আনন্দে আরও অধিকতর করার জন্য গত কোরবানির ঈদে কুয়াকাটা যাবার মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম। আমার সঙ্গে যোগ দিলেন অনুজপ্রতীম এক বন্ধু। তার নাম রবি। রবি বলল, আপনি যদি আমাকে নিয়ে যান আমার বউ-বাচ্চাসহ আপনার সঙ্গী হব।
এতদিন এধরনের একটা আকাক্সক্ষা আমি মনে মনে পোষ করে আসছিলাম। রবিকে বললাম, আমি তো ঈদের ঠিক পরদিন যেতে চাই। তোমার কোন আপত্তি আছে?
রবি বলল, আমার কোন আপত্তি নেই। আপনি যখনই যেতে চাইবেন আমি আপনার সঙ্গে আছি।
ঈদ আসতে আরও দশদিন বাকি। বাবুল সাহেবকে ফোন করলাম, আপনার বিভিন্ন লঞ্চের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। আমাকে দুটো কেবিনের ব্যবস্থা করে দিন না? ঈদের ঠিক পরের দিনই যাব।
তিনি বললেন, এখন তো ঈদের মৌসুম। টিকেট পাওয়া একটু কষ্টকর। তারপরেও আমি আপনার কথা রাখব।
আমি বললাম, আপনি আমাকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে জানান।
আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। বাবুল ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে জানালেন, লঞ্চে টিকেটের ভয়াবহ সংকট। তারপরেও আপনার জন্য দুটি টিকেটের কথা বলেছি। টাকা একটু বেশি গুণতে হবে। আপনাকে একটা নম্বর দিচ্ছি। ওখানে ফোন করে আমার কথা বলবেন। ভদ্রলোকের নাম গাজি।
আমি নম্বরটা লিখে গাজি সাহেবকে বললাম, আমি বাবুল সাহেবের লোক। আমার দুটি টিকেটের দরকার। একটা ডাবল, আরেকটা সিংগ্যাল।
গাজি সাহেব বললেন, আগামীকাল এসে টিকেট নিয়ে যেতে হবে।
আমি বললাম, কত টাকা দিতে হবে?
তিনি বললেন, সিংগ্যাল এক হাজার, ডাবল দুই হাজার। লঞ্চের নাম রেডসান ৫।
কথা শেষ হলে রবিকে বললাম, আমি তো সব ঠিক করে দিলাম, এখন টিকেট কেটে আনার দায়িত্বটা তোমাকে নিতে হবে।
সে বলল, ওই ব্যাপারে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আমার লোক পাঠিয়ে টিকেট নিয়ে আসব।
আমি একরকম স্বস্তি পেলাম।
পরের দিন রবি নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে দুটি টিকেট কেটে আনাল। আমাকে ফোনে জানাল, আনোয়ার ভাই, টিকেট নিয়ে এসেছি। টিকেটে লেখা দুপুর বারটার সময় উপস্থিত থাকতে হবে। কিন্তু লঞ্চ কটা বাজে ছাড়বে তার কোন উল্লেখ নেই।
আমি বললাম, যতটা বাজে ছাড়ে ছাড়–ক। আমরা বারটা বাজে গিয়ে বসে থাকব।
আমরা কুয়াকাটা যাচ্ছি, এটা পাকাপোক্ত হয়ে গেল। অপেক্ষা করতে থাকলাম দিনটির জন্য। কিন্তু বেশি খুশি সুখের হয় না। আমার একটা বিপদ ঘটে গেল। ঈদের দুদিন আগে আমার স্ত্রী শিল্পী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। সে আমাকে এমন একটা সংবাদ দিল আমার চোখ ফেঁটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। দুজনের একসঙ্গে কান্না করা তো শোভা পায় না। বিপদে কারও না কারও শক্ত থাকতে হয়। আমি অনেকক্ষণ পাথরের মত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নিজের কষ্টকে গোপন রেখে তাকে বুঝাতে চাইলাম আমাদের তো একটা সন্তান আছে। অনেকেরও তো তাও নেই। নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা কর।
মনের দিক থেকে না হয় শক্ত হল; কিন্তু শরীরের দিক সামাল দেব কিভাবে। তার যেভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে আমি কোনভাবে স্থির থাকতে পারছিলাম না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আমার কিছুই করারও ছিল না। গাইনি বিশেষজ্ঞ যিনি তাকে নিয়মিত চেক আপ করতেন তাকে ফোন করলাম। তাঁকে পাওয়া গেল না। জানা গেল তিনি ছুটিতে গেছেন। আরও নানা জায়গায় খোঁজ নিলাম কোথাও ডাক্তার নেই। আমার বন্ধু ডাক্তার ইকবাল কবিরকে ফোন করলাম। তিনি এ ব্যাপারে কোন রকম পরামর্শ দিতে পারলেন না। শুধু বললেন, সোজা শুয়ে থাকতে বল। বাথরুম ছাড়া আর কোথাও যাওয়া আসা করা যাবে না।
মনে হল আমি ব্যাপারটিকে যে রকম জটিলভাবে দেখছি তিনি ওটাকে সেভাবে নেননি। সুতরাং আমার দেখে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকল না। প্রাকৃতিক নিয়মে যা হবার হয়ে যেতে থাকল। সকালে উঠে মাতুয়াইল মাতৃসদনে গেলাম। ওখানে ভালমত চিকিৎসা পাই ওরকম কোন ডাক্তার নেই। তারপরেও ওরা বলল, বাইর থেকে আল্ট্রাস্নোগ্রাম করে নিয়ে আসুন। তারপর আমরা দেখব কি করা যায়।
বাসায় এসে আমার পরিচিত একটা ল্যাবে ফোন করলাম আল্ট্রাস্নোগ্রাম করা যাবে কি না। ওরা জানাল, এক ঘণ্টার মধ্যে নিয়ে আসুন, পরে ডাক্তার পাওয়া যাবে না। তারপর আরও চারদিন পর।
সকলের মধ্যে ঈদের ছুটিতে যাবার ব্যস্ততা। এই এক ঘণ্টা যদি কাজে না লাগাই পরে আরও বিপদে পড়ে যাব। আমি তাকে নিয়ে ল্যাবে ছুটলাম। আল্ট্রাস্নোগ্রাম করানো হল। টেকনিশিয়ান শিল্পীকে বাইরে যেতে বলে আমাকে বললেন, আপনি একটু বসুন।
আমি বললাম, খারাপ কিছু!
তিনি বললেন, আপনার কি সন্তানাদি আছে?
আমি বললাম, আমার একটি ছেলে আছে।
তিনি বললেন, মন খারাপ করবেন না। অনেকের তো তাও নেই। আমি অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলাম বাচ্চার কোন হার্টবিট পাইনি। আমার ধারণা বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি পারলে কোন হাসপাতালে নিয়ে যান।
আমি বললাম, কোথায় নিয়ে যাব।
তিনি বললেন, এমন একটা সময় এখন তো কোন ডাক্তার পাবেন না। সকলে ঈদের ছুটিতে চলে গেছে। আপাতত বাসায় নিয়ে যান। আমার সিক্স সেন্স বলছে আপতত রোগির কোন রকম অসুবিধা হবে না।
আমি তাকে বাসায় নিয়ে গেলাম। গাড়ির ঝাঁকুনির কারণে তার ব্যথা আরও প্রচণ্ড আকার ধারণ করল। তাকে শুইয়ে দিলাম। সারারাত তার ঘুম হয়নি। আমিও জেগে আছি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ব্যথায় সে অস্থির। আমিও সুস্থ থাকি কিভাবে। আমার বুঝতে বাকি নেই দ্বিতীয়বার বাবার হবার সেই সুযোগ শেষ হয়ে গেছে।
ঈদের দিন। ইকবাল ভাইকে ফোন করলাম। তাঁকে বিস্তারিত জানালাম। তিনি বললেন, যা হবার হয়ে গেছে। ওসব নিয়ে আর চিন্তা করে লাভ নেই। আমি একটা এন্টিবায়োটিকের নাম বলছি। ওটা দিনে দুবার খাওয়াবেন।
ওষুধের নামটি লিখে নিলাম। তারপর নানা জায়গায় ছুটতে থাকলাম। এত দামি ওষুধ যে মহল্লার ছোটখাটো দোকানগুলোতে তা পাওয়া গেল না। তাছাড়া সব জায়গায় দোকান বন্ধ। মাথায় ঢুকল একমাত্র শাহবাগে পাওয়া যাবে। না, আমাকে শাহবাগে যেতে হয়নি। যাত্রাবাড়িতে দু তিনটা দোকান খোলা ছিল। তার একটিতে ওষুধটি পেয়ে গেলাম।
যেই ঝড়-ঝাপটা আমাদের ওপর দুদিন ধরে বয়ে চলল রাতে মনে হল অনেকটা শান্ত হয়েছে। শিল্পী বলল, তোমার তো সকালে কুয়াকাটা যাওয়ার কথা।
আমি বললাম, তোমাকে এভাবে রেখে কি করে যাই।
সে বলল, আমার মন বলছে আর কোন সমস্যা হবে না।
আমি বললাম, হতে কতক্ষণ?
সে বলল, তুমি একটুতেই ভেঙে পড়। তুমি না গেলে তোমার সঙ্গে যারা যাবে তারা তো যাবে না।
আমি বললাম, কথাটা মন্দ বলনি। সকাল হোক তারপর দেখা যাবে।
রাতে আমরা বেশ ঘুমালাম। বোধকরি আগের রাতের নির্ঘুমের কারণে এটা হয়েছে। শিল্পীর শরীর বেশ দুর্বল। রবি ফোন করেছে আমার যাওয়া হবে কিনা। আমি বললাম, তোমরা গিয়ে ঘুরে এস।
রবি বলল, তাহলে কারও যাওয়ার দরকার নেই।
শিল্পী বলল, বলে দাও তুমি যাচ্ছ।
আমি আর না করতে পারলাম না।

মন ভাল নেই। তারপরেও মনের ওপর জোর খাটিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। যাত্রাবাড়ি এসে দেখি রবি বউ-বাচ্চা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তাদের সঙ্গে এসেছে হৃদয়। হৃদয় রবির অনুজপ্রতীম। কাছাকাছি থাকে। সে লঞ্চের টিকেট কাটা থেকে আরম্ভ করে আরও নানাকাজে সাহায্য করে চলেছে। আজও এসেছে সে আমাদের সদরঘাট পর্যন্ত পৌঁছে দেবে এ ভরসা নিয়ে। কৈশোরুত্তীর্ণ যুবক, গায়ে বেশ শক্তি রাখে। তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে এক বিশাল লাগেজ। লাগেজের শরীর দেখে বুঝে নিতে একটুও কষ্ট হল না ছোটখাটো একটা পরিবারের যা যা দরকার তার মধ্যে সবই আছে। আরও একটা ছোট ব্যাগ রবি কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছে। আমার বোধগম্য নয় এতকিছু তারা কী নিয়ে যাচ্ছে। রবিকে জিজ্ঞেস করলাম, রবি, এত বড় লাগেজ, তার সঙ্গে ব্যাগ। এত কিছু কি নিয়েছ?
রবি জবাব দিল, খাবার-দাবার, কাঁথা-কম্বল কোন কিছু বাদ রাখিনি। ঢাকায় একটু একটু করে শীত পড়তে আরম্ভ করেছে। গ্রামের কথা ভাবুন, ওখানে কি দশা হবে অনুমান করতে পারবেন। তবে এসব আমার কর্ম নয়। সবই শুক্তির কাজ।
আমি হেসে শুক্তির উদ্দেশে বললাম, নারীরা আছে বলেই আমরা এখনও বহাল তবিয়তে আছি।
শুক্তি হাসল।
হৃদয় নিজে উদ্যোগী হয়ে দুটি রিকশা ঠিক করে ফেলল। সোজা সদরঘাট। রবি বউ-বাচ্চা নিয়ে একটা রিকশায় উঠে পড়ল। আমি আর হৃদয় অপরটিতে। কিন্তু দেখা গেল রিকশায় বসার পর লাগেজ রাখার জায়গা থাকল না। হৃদয় জোর খাটিয়ে বিশাল লাগেজটাকে কোলের ওপর তুলে নিল। লাগেজের অনুপাতে আমার ব্যাগটা ছিল একেবারে বাচ্চাগোচের। সুতরাং আমার অসুবিধা হবার কথা নয়। আমিও তাই করলাম।
ঈদের পরদিন রাস্তাঘাটে মানুষ একেবারে নেই বললে চলে। রাস্তা একেবারে ফাঁকা। রিকশা শাঁ শাঁ করে ছুটে চলল। এধরনের ফাঁকা ঢাকা শহরে রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। কিন্তু আমার মনে অবস্থা ভাল নেই। শিল্পীর জন্য মনটা উড়– উড়– করছিল। বারবার একটা জিনিস মাথায় কাজ করছিল কিছু একটা ঘটে যাচ্ছে না তো!
রিকশা সদরঘাটের রাস্তায় এসে থামল। গেটের পাশে একজন হকার জাম্বুরা বিক্রি করছিল। শুক্তি আস্ত একটা জাম্বুরা কিনে নিয়ে কোয়াগুলো খুলে খুলে নিল। তারপর ওগুলো একটা টিফিন বক্সের মধ্যে ভরল। পুরো দায়িত্বটা বিক্রেতাই পালন করল। আমি শুক্তিকে বললাম, এত জাম্বুরা কি করবে?
সে বলল, আপনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাব। আপনি চাইলেও দেব না।
আমি বললাম, এরকম নিষ্ঠুর হওয়া ভাল?
সে বলল, মাঝে মাঝে নিষ্ঠুর না হলে চলে না।
আমরা ভেতরের দিকে যেতে থাকলাম। ঢুকতে গিয়ে দেখলাম টাকা দিয়ে আমাদের গেট পাশ করিয়ে নিতে হল। টাকা কামাই করার অভিনব পদ্ধতি। হয়ত এ পদ্ধতি আগে থেকে ছিল। হৃদয়কে মনে হল সে আমাদের দলনেতা। সে সবকিছুতে অগ্রণি ভূমিকা পালন করে চলেছে। সে বিশাল লাগেজটা টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আর আমরা তার পিছু পিছু ছুটছি। লঞ্চঘাট লোকে লোকারণ্য। আমার ধারণা ছিল ঈদের পরদিন বলে লঞ্চঘাট রাস্তার মত ফাঁকা থাকবে। আমার ধারণা মিথ্যে প্রমাণিত হল।
আমাদের লঞ্চের নাম ছিল রেডসান ৫। আমরা লঞ্চটি খুঁজছি। হাঁটতে হাঁটতে লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করি রেডসান ৫ লঞ্চটি কোথায়। তারা আঙুল প্রসারিত করে সামনে এগিয়ে যেতে বলে। আমরা বেশ কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে রেডসানের দেখা পেয়ে গেলাম। তখন ঘড়ির কাঁটা বারটার ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। আমরা লঞ্চে উঠে পড়লাম। লঞ্চে ঢুকার পথে চোখে পড়ল একটা টেবিল সামনে দুটি ছেলে বসে আছে। টেবিলের ওপর বেশ কিছু চাবি। আমাদের বুঝতে বাকি থাকল না এগুলো কেবিনের চাবি। আমি বললাম, উনিশ এবং বিশ নম্বর কেবিনের চাবিগুলো দাও।
একজন চাবি বের করে দিল। আমি বললাম, কেবিনগুলো দেখিয়ে দেবে না?
একজন বলল, তিন তলায় যেতে হবে।
আমাদের সঙ্গে যেতে একজন রাজি হল। সে আমাদের তিন তলায় নিয়ে গিয়ে কেবিনগুলো দেখিয়ে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, লঞ্চ কখন ছাড়বে?
সে জানাল, লোক হয়ে গেলে ছেড়ে দেবে।
আমি বুঝে উঠতে পারলাম না কখন লোকজন হবে। পুরো লঞ্চটিতে মানুষ গিজ গিজ করছে। পা চালানোর জায়গা নেই। তারপরেও আরও মানুষ আসবে ভাবতেই কেমন জানি বোধ করলাম। তার সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলা অবান্তর।
লঞ্চ যখনই ছাড়ুক, পটুয়াখালি পর্যন্ত যাওয়ার একটা নিশ্চয়তা আমাদের হয়ে গেছে। কিন্তু ওখান থেকে ফিরব কিভাবে সেই নিশ্চয়তা আমরা এখনও পাইনি। লঞ্চের লোকজনকে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম পটুয়াখালি থেকে ফেরত টিকেট কিভাবে পাব। তারা কেউ আমাকে সঠিক জবাবটা দিতে পারেনি। তাদের কথা ছিল, ওখানে গিয়ে যে কোন কাউন্টারে যোগাযোগ করলেই টিকেট পেয়ে যাব। আমি ছেলেটিকে বললাম, তোমাদের এখানে ঢাকায় ফেরত আসার টিকেট দেয় না?
ছেলেটি জানতে চাইল, আপনারা ক’ তারিখ ফিরবেন?
আমি বললাম, এগার তারিখ।
সে জবাব দিল, না স্যার, এগার তারিখ কেন, তার পরের দুদিনেরও কোন টিকেট নেই।
আমি বললাম, এখানে লঞ্চের দায়িত্বে আছে কে? আমি তার সঙ্গে কথা বলব।
সে বলল, কথা বলতে পারেন, কোন কাজ হবে না।
আমার ভেতরটায় একটা অজানা ভয় কাজ করতে থাকল। তাহলে কি আমরা সময়মত ফিরতে পারব না? ছেলেটি কেবিনের দরজা খুলে দিল। ভেতরে ঢুকে দেখি চুলোর মত গরম, এখনি বেরিয়ে যেতে পারলে বাঁচি। ওপরে ছাদ। ছাদের ওপর খাড়া সূর্য তপ্ত আলো ঢেলে দিয়েছে, যে কারণে কেবিনগুলোর এ দশা। আমি তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলাম। সূর্য না ডুবার আগে এ তাপ শেষ হবে বলে মনে হল না। আমার পাশে ছিল রবিদের কেবিন। তারাও কেবিন নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারল না। আমরা স্থির করলাম কেবিনের বাইরে গিয়ে সময়টা পার করিয়ে দেব।
শুক্তি বলল, আমি তো সবার জন্য রান্না করে নিয়ে এসেছি। কেবিনে যে গরম এ খাবার তো একটু বাদে নষ্ট হয়ে যাবে।
কথাটা ভুল বলেনি। আমি বললাম, খাবারগুলোও বাইরে নিয়ে এস। বাতাসে থাকলে নষ্ট হবে না।
হৃদয় খাবারটা নিয়ে নিল। আমরা জাহাজের একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখানকার বাতাস ভারি শীতল। মন্দ লাগছে না। আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম তা মোটামুটি ফাঁকা ছিল। একটা কাঁথা কে যেন দলামোচড়া করে রেখে দিয়ে গেছে। আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। আজ থেকে পনের বছর আগের কথা। একবার আমার বন্ধু ড. চিন্ময় এবং তাঁর মা আমাকে সঙ্গে করে বরিশালে তাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন লঞ্চ সম্পর্কে আমার কোন ধারণা ছিল না। প্রথম আমি লঞ্চে চড়তে যাচ্ছি, তাই আমার ভেতরে এক রকম আনন্দ ঢেউ খেলছিল। আমরা বিকেলের দিকে লঞ্চের দিকে রওয়ানা দিয়েছিলাম। পথ চলতে চলতে চিন্ময়কে জিজ্ঞেস করছিলাম, আমাদের টিকেট কি কাটা হয়েছে?
চিন্ময় বলল, লঞ্চে টিকেট লাগে না।
আমি বললাম, আমরা যদি গিয়ে সিট না পাই?
চিন্ময় পুনরায় বলল, ভয় পাবার কোন কারণ নেই। আমাদের সিট ঠিক করা আছে। আমি দুপুরে গিয়ে সব ঠিক করে এসেছি।
আমি তাঁকে বললাম, এরই মধ্যে তুমি এই কাজও করে ফেলেছ? অদ্ভুদ লোক তো তুমি!
চিন্ময় হাসল, কিন্তু কোন কথা বাড়াল না।
আমরা ঠিক সময়ে গিয়ে লঞ্চে উঠলাম। এক তলার একটি লঞ্চ। তবে বেশ প্রশস্ত এবং লম্বা। চিন্ময় আমাদের লঞ্চের ছাদে নিয়ে গেল। আমি তো দেখে অবাক! পুরো ছাদটিতে রশি টানানো। আমার মনে হয়েছিল এটা একটা বড়সড় মাকড়সার জাল। চিন্ময়কে বললাম, এখানে এত রশি টানানো কেন?
সে জানাল, রশি টানিয়ে মানুষ জায়গা দখল করে রাখে। যে যতটুকু দখল করেছে ওই জায়গায় কেউ আর দখলে নিতে পারবে না। আমি এরকম একটা জায়গা রশি টানিয়ে রেখে গিয়েছি।
আমি বললাম, আমরা কি এখানে বসে যাব?
সে বললেন, হ্যাঁ, লঞ্চে মানুষ এভাবে যায়।
আমি বললাম, তুমি যে জায়গা দখল করেছ সে জায়গাটি যদি অন্যকেউ দখল করে ফেলে তোমার কিছু করার থাকবে?
চিন্ময় হেসে বলল, বরিশালের মানুষ খুবই ভাল। তারা একজনের জায়গা আরজনের দখল করে না।
সত্যি চিন্ময়ের রশি টানানো জায়গা কেউ দখল করেনি। সে তাঁর ব্যাগ খুলে একটা চাদর বের করে সেখানে বিছিয়ে দিল। তারপর আমাকে বলল, এখন ইচ্ছে করলে তুমি বসে থাকতে পার, আবার শুয়েও থাকতে পার।
আমরা গৌরনদীর লঞ্চে উঠেছিলাম। ওইদিন আমি দুটি জিনিস আবিষ্কার করেছিলাম। ঢাকা শহরে বরিশালের মানুষের আধিক্য কেন? আরেকটা হল তারা ঢাকা আসার সময় গাঁটরি নিয়ে আসে কেন? প্রথমটার জবাব হল লঞ্চে ভাড়া অনেক কম; দ্বিতীয়টা হল লঞ্চে শোয়ার জন্য কাঁথা-কম্বল তারা গাঁটরিতে করে নিয়ে আসে।
আমি লঞ্চে চড়ায় অভ্যস্ত ছিলাম না। সন্ধের পর পর সবাই দেখি সঙ্গে করে নিয়ে আসা খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমাদের সেই বালাই ছিল না। আমরা খেয়ে গিয়েছিলাম।
সেদিন ছিল চাঁদনি রাত। সকলে ঘুমালেও আমি ঘুমোতে পারছিলাম না। তার মানে আমি এসবে অভ্যস্ত ছিলাম না। আমাদের পাশে ছিল এক তরুণ দম্পতি। তারা তাদের জায়গা চারপাশে লম্বা শাড়ি দিয়ে ঘিরে নিয়েছে। এধরনের দৃশ্য চোখে পড়ার মত ছিল। তারা সারারাত পর্দার আড়ালে গল্প করে চলছিল, যা আমার কানে এসে বাজছে। আমি একরকম অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে উঠে অন্যত্র সরে যাব সেই উপায়ও আমার ছিল না। এক সময় বুঝলাম তারা ওখানে বাসর রচনা করে ফেলেছে। অপদার্থ কাকে বলে!
এর পরে আমাকে আরও কয়েকবার লঞ্চের যাত্রী হতে হয়েছে। যতবার গিয়েছি কেবিনের ব্যবস্থা করেই গিয়েছি। পাটাতনে যারা শুইয়ে শুইয়ে যায় তাদের কারও পা কারও মাথার সঙ্গে লেগে আছে। কারও পা কারও শরীরের ওপর উঠে গেছে। লঞ্চের এপাশ থেকে ওপাশে গেলে কারও শরীরের সঙ্গে পা না লাগিয়ে হাঁটব তেমন উপায় নেই। কিন্তু মানুষগুলোর সহ্যক্ষমতা অসাধারণ। তারা রাগে না। কাউকে গালমন্দ করে না। তবে জায়গা দখল নিয়ে দুয়েকটা ঝগড়া যে হয় না তেমন কিন্তু নয়।
পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটলাম এ কারণে, লঞ্চের যাত্রীদের রুচির বোধহয় পরিবর্তন ঘটেছে। আমি কোথাও একটা রশি টানানো দেখলাম না। বোধকরি দখলদারিত্ব এখন কেউ মানে না। যে আগে আসে সেই নিজের ইচ্ছেমত পছন্দসই জায়গাটা দখল করে নেয়। কিন্তু এখানে কাঁথার বোচকা কেন? কেউ কি জায়টি দখলে নিয়েছে? হতে পারে। আমি কাঁথার বোচকাটির উপর বসে পড়লাম। হৃদয় খাবারের বক্স দুটি আমার পাশে রাখল। মজার ব্যাপার হল সব জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আছি সেটা কেউ দখল নিতে আসছে না। সকলে ধরে নিয়েছে এ জায়গাটা আমাদের। আমাদের মধ্যে যদি লোভ জিনিসটা কাজ করত এটা বিক্রি করে দিয়ে গোপনে কিছু পয়সা কামাই করে ফেলতে পারতাম। একজন মহিলা এসে বললেন, এ জায়গাটা কি আপনাদের?
আমি বানিয়ে বললাম, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, আপনাদের পাশে আমাদের একটু জায়গা দেবেন?
আমি বললাম, একটা শর্তে দিতে পারি। আপনি যেই চাদরটা বিছাবেন ওটাতে আমাদের বসতে দিতে হবে।
মহিলা খুশি মনে রাজি হয়ে গেলেন। তিনি চাদর বিছিয়ে দিলে আমরা তাতে বসে পড়লাম। আমরা আরাম করে বসার সুযোগ পেয়ে গেলাম। মহিলার ছেলেমেয়ে কম নয়। সকলে আমাদের পাশে বসল। এক সময় দেখলাম প্রায় কালো কালো আটার রুটি বার করে সকলে চিবুচ্ছে। শুক্তি বলল, এগুলো কিসের রুটি?
রবি বলল, এগুলোও আটার। আটাগুলো লালচে ধরনের হয়।
ঘড়িতে দেখলাম দেড়টা বাজে। লঞ্চ ছাড়ার কোন নাম নেই। পেটে খিদে জানান দিয়েছে। শুক্তিকে বললাম, তুমি অনুমোদন দিলে তোমার খাবারটার সদ্ব্যবহার করতে চাই।
রবি বলল, আমারও খিদে পেয়েছে।
হৃদয় ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। রবিকন্যা মাহিয়াকে বললাম, তোমার খিদে পায়নি?
সে বলল, আমি খাব না।
এ মেয়েটার খাবারে প্রতি তেমন একটা আগ্রহ নেই, যেমন নেই আমার পুত্র আপনের। শুক্তি জাম্বুরার বক্সটা খুলে সবাইকে দিতে থাকল। নিজেও কিছুটা মুখে নিল। আমাকে বলল, আপনাকে তো দেয়ার কথা নয়।
আমি বললাম, আপত্তি নেই। তবে দিলে আখেরে মঙ্গল হবে।
আমিও তাদের সঙ্গে ভাগ বসালাম। জাম্বুরাটা খেতে বেশ লাগল। টকের চে’ মিষ্টির আধিক্যই বেশি।
শেষ পর্যন্ত আমরা জায়গাটা মহিলাকে ছেড়ে দিয়ে কেবিনে চলে এলাম। দরজা জানলা খুলে দিলাম যাতে একটুখানি ঠাণ্ডা অনুভব করি। শুক্তি খাবার বার করল। কিন্তু খাব কিসে? আমাদের তো কোন থালা বাটি নেই। সে একটা ব্যবস্থা করে ফেলল। বক্সগুলো ছিল মোটামুটি বড়সড়। দুটি বক্সের একটির ঢাকনা আমাকে দিল, অপরটির রবিকে। সেই ফ্রাই রাইচ নিয়ে এসেছে। আমি ভেবেছিলাম রুটি জাতীয় কিছু হবে। একটা মুরগি আস্ত, আরেকটা টুকরো টুকরো করে ভেজে এনেছে। বলা যায় কাবাবের মত। আস্ত কয়েকটা শসাও ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এল। শুক্তি ওগুলো টুকরো টুকরো করে কাটল। আমাকে বলল, এখন কি আস্ত মুরগি খাবেন, নাকি পিসটা খাবেন?
আমি বললাম, আস্তটা আগে খেয়ে ফেলা ভাল। ওটা নষ্ট হয়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি।
শুক্তি বলল, তাই হোক। পিস মুরগিটা রাতে খাওয়া যাবে।
আমি বললাম, ততক্ষণ যদি ভাল থাকে।
আমরা আসার সময় বড় একটা পানি কন্টেইনার এবং কয়েকটি বোতল কিনে নিয়েছিলাম। এগুলো এখন বেশ কাজে দিচ্ছে। আমরা বোতলের পানি দিয়ে সব পরিষ্কার করলাম। রাঁধুনি হিসেবে শুক্তি মন্দ নয়। মনে হল সে পাকা রাঁধুনি। কোন জায়গা কোন ধরনের খাবার গ্রহণযোগ্য তারও একটা ধারণা তার আছে। আমরা তৃপ্তিসহকারে শুক্তির খাবার ভক্ষণ করলাম।
সময় কাটে না। সেই যে বারটায় এসে বসে আছি লঞ্চ ছাড়ছে না। আমাদের কোন কাজ নেই। আমরা নানারকম গল্পগাছি করে যাচ্ছিলাম। আমাদের লঞ্চটি ছিল তিন তলার। ছাদ থেকে আরম্ভ করে প্রতিটি জায়গায় মানুষের জন্য তিল ধারণের ঠাঁই নেই। চলাফেরা করার জন্যও তো একটুখানি জায়গার দরকার। সেটাও তারা রাখেনি। টয়লেটে যাব সেই সুযোগও নেই। আমাদের কেবিনের সামনে একটা টেবিল ছিল। এক সময় দেখি সেটি সরিয়ে নিয়ে গেছে। চেয়ারগুলো স্টিলের। লঞ্চের পাটাতনের সঙ্গে ঝালাই করা। সুযোগ থাকলে ওগুলোও সরিয়ে ফেলত। আমরা অনেক বাদ-প্রতিবাদ, ঝগড়াঝাটি করে আমাদের কেবিনের দরজার সম্মুখভাগটি খালি রাখার চেষ্টা করতে থাকলাম। কিন্তু সেটি কতক্ষণ? একজন মহিলাকে দেখে খুবই খারাপ লাগল। এ ধরনের মানুষকে করুণা করা যায়, দয়া করা যায় না। মহিলার বয়স বিশ বাইশের বেশি নয়। তার তিনটা বাচ্চা। একটা হাতে, একটা কোলে, একটা পেটে। কোথাও একটু বসতে পারলে মনে হল আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে যাবে। স্বামীটা গোবেচারা ধরনের। নিজে উদ্যোগী হয়ে কিছু করতে পারবে সেটা মনে হল না। আমি মহিলাকে বললাম, এখানে বসুন। তবে একটু জায়গা খালি রাখার চেষ্টা করবেন, যাতে আমরা চলাফেরা করতে পারি।
আমার অনুমতি পেয়ে একখানা চাদর বিছিয়ে মহিলা বাচ্চাগুলো নিয়ে বসে পড়ল। আমরা একরকম কেবিনের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়লাম। কেবিনের ভেতরের জায়গাটাও সহজভাবে বসার মত নয়। কেবিনগুলোকে বাইর থেকে দেখলে কবুতরের খুপরির মত দেখায়।
বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ লঞ্চ ছেড়ে দিল। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এক কাপ চায়ের অভাব বোধ করছিলাম। চায়ের একটা দোকান আছে। সেটা নিচে। কিন্তু যাব কিভাবে? রবিকে বললাম, রবি, চা খাবে?
রবি বলল, খেতে পারলে ভাল লাগত।
আমি বললাম, চল যাই।
আমরা জুতো জোড়া হাতে নিয়ে শুয়ে থাকা মানুষের শরীর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে নিচে চলে গেলাম। নিচে আরও ভয়াবহ অবস্থা। এখানে ওপরের চে’ চার গুণ মানুষ শুয়ে আছে। চায়ের দোকানটা ওপ্রান্তে। ওপ্রান্তে যেতে হলে মানুষের শরীর ডিঙানো ছাড়া উপায় নেই। আমরা তাই করে গেলাম। আরও অনেকে একাজ করছে। সুতরাং আমাদের বাধা কোথায়। কতজনের শরীরের সঙ্গে আমাদের পা লাগছে তাতে কোন লেখাজোখা নেই। শুধু কি পুরুষ? পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও শুয়ে আছে। কার মেয়ে, কার মা, কার বোন তার হিসেব কে রাখে? পুরো লঞ্চের লোকজন যেন একই পরিবারের সদস্য। কারও কোন অন্যায় কর্মে কারও কোন প্রতিবাদ নেই। এটাই নিয়ম, এটাই নিয়তি।
আমরা অনেক কষ্টে দোকানে গিয়ে চা খেলাম। তারপর একই কায়দায় আমাদের ফিরে আসতে হল। ক্যামেরাটা সঙ্গে ছিল বলে দুয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। কেউ আপত্তি করল না। হাজার হাজার মানুষ। কোন কারণে যদি লঞ্চটা মাঝ নদীতে ডুবে যায় তখন কি হবে। ভাবতে শরীরটা আমার শিউরে উঠল।
কেবিনে এসে টেলিভিশন দেখার ইচ্ছে হল। টেলিভিশন খুলে দেখি কোন চ্যানেলই কাজ করছে না। কেবল ভিডিও চ্যানেলটা খোলা। ভিডিওতে ডিপজলের ‘রিকশাওয়ালার ছেলে’ সিনেমাটি চলছে। আমরা সেটি দেখছি। মাঝে মাঝে যেমন অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে নিদান কাটাতে হয়, আমাদের অবস্থাও হল অনুরূপ। সময় কাটানোর একটা উপায় তো আমাদের বের করতে হবে। এই সিনেমাটা সেই সুযোগ তৈরি করে দিল। শুক্তি বলল, ভাই, খাবেন না? খাবারটা এতক্ষণ ঠিক আছে কিনা আল্লাহ মালুম।
আমি বললাম, কটা বাজে?
রবি জানাল, আটটা বাজে।
আমি বললাম, খেয়ে ফেলাই উত্তম।
আমি ভরসা পাচ্ছিলাম না খাবারটা এতক্ষণ ঠিক আছে। আমি পুনরায় বললাম, আগে পরখ করে দেখ খাওয়ার মত আছে কিনা।
শুক্তি খাবারের বক্স বের করে একটা করে মাংশের টুকরো সবাইকে দিল। সেও একটা নিল। না, মাংশ নষ্ট হয়নি। আঙুলে কটা ভাত তুলে নিয়ে মুখে দিয়ে দেখলাম বেশ ভালভাবে সদ্ব্যবহার করা যাবে।
রাতের খাবার শেষ করার পর দেখতে দেখতে দশটা বেজে গেছে। লঞ্চের প্রায় সকলে ঘুমে বিভোর। পুরো লঞ্চটাই সুনসান। সুতরাং আমাদের জেগে থেকে লাভ কি?

সকালে রাওয়ালিয়া নদীর বুক চিরে লঞ্চ পটুয়াখালি ঘাটে গিয়ে ভিড়ল। লঞ্চ থেকে নামার জন্য মানুষের তড়িঘড়ির শেষ নেই। ছোট সিঁড়ি দিয়ে নামতে ধাক্কাধাক্কি লেগে গেছে। আমি রবিকে বললাম, আগে মানুষের ভিড় কমুক, তারপর আমরা নামব। তার আগে বাথরুমে গিয়ে একটু ফ্রেস হতে চাই।
রবি বলল, বাথরুমে লাইন লেগে আছে।
আমি বললাম, একটু পরে সেটা থাকবে না।
আমাদের গুছিয়ে নিতে প্রায় আধা ঘণ্টা লেগে গেল। ইতোমধ্যে মানুষের ভিড় অনেকটা কমে গেছে। আমরা ব্যাগ নিয়ে লঞ্চ থেকে বেরিয়ে এলাম। তখন দিনের আলো ফুটতে আরম্ভ করেছে। ঘাট থেকে বেরিয়ে এসে দেখি অটোরিকশা এবং রিকশার ভিড় লেগে আছে। যেই যেভাবে পারছে ছুটছে। রবি বলল, আমরা এখন কোথায় যাব?
আমি বললাম, সেটা পরের কথা। আমরা এগার তারিখ কিভাবে ঢাকায় ফিরব সেটা আগে ভাবি।
আমরা দীপরাজ ২ নামের একটা লঞ্চ কাউন্টারে গেলাম। ওখানে একজন লোক বসে আছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের লঞ্চে এগার তারিখের কোন কেবিন হবে?
তিনি জবাব দিলেন, সেটা সম্ভব নয়। আমরা কেন কেউ দিতে পারবে না। এগার তারিখের আগে কেবিন বুক হয়ে গেছে।
আমি তাকে অনুনয় করে বললাম, কোনভাবে ব্যবস্থা করে দিতে পারলে খুবই উপকার হয়।
তিনি একই জবাব দিলেন, সেটা সম্ভব নয়। বরঞ্চ আপনারা বার তারিখ যান আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি। তবে সেক্ষেত্রে টাকার অংকটা বেশি গুণতে হবে। আপনাদের কেবিন ক’টা?
আমি বললাম, একটা সিংগ্যাল, একটা ডাবল।
তিনি বললেন, সিংগ্যাল দেড় হাজার এবং ডাবল আড়াই হাজার টাকা।
আমি বললাম, একটু কমানো যায় না?
তিনি একটা কাগজ দেখিয়ে বললেন, দেখুন, চার হাজার টাকায়ও অনেকে টিকেট কিনতে রাজি আছে।
আমি তাকে বললাম, আমরা কি পটুয়াখালি কিংবা কুয়াকাটা গেলে বাসে টিকেট পাব?
তিনি বললেন, সেটা পেলে তো আপনাদের লাভ। আপনারা একটা রিকশা নিয়ে একজন পটুয়াখালি বাস টার্মিনাল থেকে খোঁজ নিয়ে আসুন। তাতে আপনাদের অনেক সুবিধা হবে।
ভদ্রলোকের কথাটা আমার মনে ধরল। শুক্তিকে বললাম, তুমি এখানে বসে ব্যাগ পাহাড়া দাও, আমরা গিয়ে বাসের খবর নিয়ে আসি।
শুক্তি অমত করল না। আমি আর রবি রিকশা দরদাম করতে লেগে গেলাম। রিকশাওয়ালা সত্তর আশি টাকার কমে যেতে রাজি নয়। বুড়োমত এক রিকশাওয়ালাকে বলে কয়ে পঞ্চাশ টাকায় রাজি করালাম। পটুয়াখালি যেতে আমাদের পনের মিনিটের মত লাগল। রিকশাওয়ালার ভাড়া পরিশোধ করতে গেলে তিনি বেঁকে বসলেন, ষাট টাকার নিচে তিনি নেবেন না। তিনি পঞ্চাশ টাকায় রাজি হয়ে কেন ষাট টাকা দাবি করছেন আমাদের বোধগম্য নয়। আমি কোন যুক্তি খুঁজে পেলাম না তাকে কেন ষাট টাকা দিতে হবে। একজন বুড়ো মানুষ ওখানে দাঁড়ানো ছিলেন। তিনি বললেন, আপনারা কত ভাড়া দিয়েছেন?
আমি বললাম, উনার সঙ্গে আমরা পঞ্চাশ টাকা দর করে এসেছি। এখন উনি ষাট টাকা দাবি করছেন।
বুড়ো লোকটি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, তোমাকে বিশ টাকার ভাড়া পঞ্চাশ টাকা দিচ্ছে। তুমি আরও দশ টাকা দাবি করছ কেন। তোমাদের জন্য এলাকার বদনাম হয়ে গেছে।
রিকশাওয়ালা আর কোন কথা বাড়াল না।
আমরা ঢাকার বাসের কাউন্টার খুঁজতে লেগে গেলাম। তখনও একটা কাউন্টারও খুলেনি। বুড়ো চাচা বললেন, আমি একটা বাসের কাউন্টারে কাজ করি। আপনারা পনের তারিখের আগে কোন বাসের টিকেট পাবেন না। এখন বাসের টিকেটের বড়ই সংকট যাচ্ছে। আপনারা বরং লঞ্চে করে যাবার চিন্তা করুন।
রবিকে বললাম, টাকা বেশি গেলেও আমাদের লঞ্চে যেতে হবে।
রবি বলল, তাই করি।
লঞ্চের লোকজন বলেছিল তাদের হাতে মাত্র দুটি কেবিন খালি আছে। বিলম্বে ওগুলো হারাবার সম্ভাবনা আছে। স্টাফ কেবিন আছে। ভাড়া কম। বাড়তি আয়ের লোভে স্টাফরা ওগুলো যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে। ওই কেবিনগুলো একেকটা বাক্সের মত। দরজা বন্ধ করে দিলে কবরের মত দেখায়। হাসপাতালের মরচুয়ারিতে যেভাবে লাশ ঢুকানো হয় এই কেবিনগুলোতেও ওভাবে ঢুকতে হয়। স্টাফ কেবিনের কথা চিন্তা করতেই গা শিউরে উঠে। রবিকে বললাম, আমি এখানে অপেক্ষা করি। তুমি একা গিয়ে টিকেট দুটোর ব্যবস্থা করে শুক্তি এবং মাহিকে নিয়ে চলে এস। এখানে একসঙ্গে নাস্তা সারব।
রবি একটা মোটর সাইকেলের পেছনে বসে চলে গেল। এখানে মোটর সাইকেল ভাড়ায় খাটে। এধরনের মোটর সাইকেল চোখে পড়ার মত। পটুয়াখালি লঞ্চঘাটে যেতে তারা পঞ্চাশ টাকার কমে যায় না। রবি চলে গেলে বাস টার্মিনালে ঘুরে ঘুরে আমি কুয়াকাটার গাড়ির সন্ধান করতে থাকলাম। কাউন্টারে গিয়ে জানলাম এখান থেকে আধা ঘণ্টা পর পর কুয়াকাটার বাস ছাড়ে। বাসগুলো খুবই নিম্নমানের। যেই মানের হোক আমরা যেতে পারব সেই নিশ্চয়তা আছে।
ইতোমধ্যে রবি একটা অটোরিকশা নিয়ে বউ-বাচ্চাসহ চলে এসেছে। সে চার হাজার টাকা গুণে দিয়ে দুটো কেবিন নিয়েছে। আমাকে সে টিকেটখানা দেখাল। কাঁচা হাতের লেখা। অনেক ভুলভাল। কিন্তু টিকেটের গায়ে কোথাও টাকার অংকটা উল্লেখ নেই। কেবল একটা শব্দ আড়াআড়িভাবে লিখে দিয়েছে ‘পেইড’। প্রতারণা কাকে বলে! তারপরেও আমরা নিশ্চিত হলাম একদিন পরে হলেও ঢাকায় ফিরতে পারব।
নাস্তা সেরে আমরা কুয়াকাটা বাসের টিকেট কাটতে গেলাম। তখন সাড়ে আটটা বাজে। আমরা তিনটা টিকেট কাটলাম। বাসে গিয়ে দেখি আমাদের সিট পড়েছে একেবারে সামনে চালকের পাশে যেখানে মহিলারা বসে। ইঞ্জিন বক্সের ওপরও সাত আটজন বসা। আমরা যেখানে বসলাম চারজন বসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু হেলপার বারবার বিরক্ত করতে থাকল এখানে পাঁচজন বসবে। সে একজন মহিলাকে নিয়ে এল আমাদের সঙ্গে বসার জন্য। আমরা চুপচাপ বসে আছি। মহিলা ঠায় দাঁড়িয়ে। তিনিও বুঝে উঠতে পারছেন না কোথায় বসবেন। হেলপার নাছোড়বান্দা। যেভাবে হোক ওখানে বসতে হবে। হেলপারকে বললাম, তুমি বসিয়ে দেখিয়ে দাও কিভাবে তিনি বসবেন।
আমরা হেলপারের সঙ্গে কথা চালাচালি করছিলাম, আর বাসের যাত্রীরা হাসাহাসি আরম্ভ করে দিলেন। তারা বললেন, তোমার কাঁধে দুজন তুলে নাও। ড্রাইভারের কাঁধে দুজন তুলে দাও। তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
যাত্রীদের চেঁচামেচিতে হেলপার নিরস্ত হল। পুরো গাড়িতে যাত্রীদের এমনভাবে ভরা হল যেভাবে ইলিশ মাছ ভাঁজ করে রাখা হয়। কারও নড়াচড়া করার জায়গা নেই। ছাদেও একই দশা। এমন অদ্ভুদ বাস ভ্রমণ আমি আর কোনদিন করিনি। বাসের লোকজনের চাপাচাপিতে আমরা আশি টাকার ভাড়া এক শ’ বিশ টাকা গুণতে বাধ্য হলাম।
সাড়ে নয়টায় গাড়ি ছাড়ল। গাড়ি যাত্রীদের ভারে এমনভাবে গোঁ গোঁ করতে থাকল যেন প্রসববেদনা শুরু হয়ে গেছে। গাড়ি ধীরগতিতে চলছে। কলাপাড়া পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা মোটামুটি ভাল। আঁধার মানিক নদীর ফেরিঘাট পার হওয়ার পর আমরা টের পেতে থাকলাম রাস্তা কাকে বলে। এ রাস্তাকে কিসের সঙ্গে তুলনা করব আমার জানা নেই। মাঝে মাঝে রাস্তা সংস্কারের কাজ চলছে। তার মানে সুরকি ফেলেছে। সেই আর কত! হতে পারে দু তিন কিলোমিটার। তারপরের অবস্থা তো ভয়াবহ। সিডরে সেই যে ভেঙেচুরে নিয়ে গিয়েছে তা আর মেরামত করা হয়নি। জায়গায় জায়গায় এমন গর্ত গাড়ি চাকা সহজে চলতে চায় না। রাস্তার ধুলোবালিতে আমরা একরকম একাকার হয়ে গিয়েছিলাম।
কলাপাড়া থেকে তিনটা ফেরিঘাট পাড়ি দিতে হল। পটুয়াখালি থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে আমাদের চারটি ঘণ্টা লেগে গেল। আমরা যখন গাড়ি থেকে নামলাম ঘড়িতে দেড়টা বাজে। যে জায়গাটিতে আমরা নামলাম তারও একই দৈন্যদশা। আমি মনে করতে পারিনি এটাই কুয়াকাটা। আমার ধারণা ছিল যেখানে নেমেছি এখান থেকে অন্য বাহনে করে আমাদের কুয়াকাটা যেতে হবে। একজন ভ্যানওয়ালাকে বললাম, যাবে?
সে জানতে চাইল, কোথায় যাবেন?
আমি বললাম, কুয়াকাটা।
সে হেসে বলল, এটাই তো কুয়াকাটা। কোন হোটেলে যাবেন সেটা বলেন?
আমি থতমত খেয়ে বললাম, তাই তো!
আমি কুয়াকাটাকে যেভাবে কল্পনা করেছিলাম এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কোনভাবে তাকে মিলাতে পারছিলাম না। ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা। ঝুপড়ি ঝুপড়ি দোকানঘর। তবে জায়গায় জায়গায় বড় বড় আবাসিক হোটেল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে মন্দ লাগল না। কিন্তু আমি কোন হোটেলে যাব? ঢাকায় আমার বন্ধু চিত্রশিল্পী শহিদ আহমেদ মিটু তাঁর এক বন্ধুর ফোন নাম্বার দিয়েছিলেন। তাঁর নাম শাহ আলম। আমি ঢাকা থেকে মিটু ভাইয়ের পরিচয় দিয়ে আলম সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন কুয়াকাটা পৌঁছে যেন তাঁকে ফোন করি। কথা দিয়েছিলেন যত রকম সাহায্য-সহযোগিতা দরকার তিনি আমাদের করবেন। আমি তাঁকে অনুরোধ করেছিলাম, আগেভাগে একটা হোটেলে দুটা রুমের বুকিং দেয়া যায় কিনা। তিনি জানিয়েছিলেন, সেটার দরকার পড়বে না। এখানে হোটেল মোটেলের শেষ নেই।
আমি আলম সাহেবকে ফোন করলাম। বললাম, আমি ঢাকা থেকে এসেছি, চিনতে পেরেছেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ ভাই, চিনেছি। কিন্তু আমি তো একটু অসুস্থ। দুদিন ধরে গরু মাংশ খেয়েছি তাই বিছানা থেকে উঠতে পারছি না। আপনি প্রেসক্লাবে যান। ওখানে তুষার নামের একজন সাংবাদিক আছেন। আমি তাকে বলে দিচ্ছি। উনি আপনার সব ব্যবস্থা করে দেবেন।
আমি আশেপাশের লোকজনের কাছ থেকে প্রেসক্লাবের লোকেশনটা জেনে নিলাম। রবিকে বললাম, চল প্রেসক্লাবে যাই। ওখানে গেলে হয়ত একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
প্রেসক্লাব খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র দু মিনিটের পথ। আমরা ওখানে গিয়ে তুষার সাহেবের খোঁজ নিলাম। তুষার সাহেব নেই। তিন চারজন লোক বসে আছেন। সকলের সঙ্গে পরিচিত হলাম, তাঁরা সাংবাদিক। তাঁরা চা দিয়ে আপ্যায়ন করতে চাইলেন আমি অপারগতা জানালাম। একজন বললেন, আপনারা তো আজকে হোটেল পাবেন না। কোন হোটেলে সিট খালি নেই। ঈদ এবং রাসমেলা দুটো একসঙ্গে হওয়ায় কুয়াকাটায় মানুষের ঢল নেমেছে। আপনারা আগে হোটেলের বুকিং দেননি কেন? এখন যদি কোথাও সিট পান ভাড়া চার পাঁচ গুণ বেশি দিতে হবে।
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম, আমি আলম ভাইকে ফোন করেছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন এখানে হোটেলের কোন সংকট হয় না।
তিনি বললেন, রাসমেলার চাপ থাকবে সেটা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। এত ঘাবড়াবার কোন কারণ নেই। আপনি তুষারের কাছে যান, একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। এখান থেকে তিন মিনিট সামনে গেলে তার অফিস। নাম কেডিএস। কুয়াকাটা ডেভেলাপমেন্ট সোসাইটি।
আমরা আবার পথ চলতে থাকলাম। রবি বোধকরি কিছুটা বিরক্ত। সুক্তি হতাশ। কিন্তু আমার কিছু করার নেই। কেডিএস অফিসে গিয়ে তুষার সাহেবকে পেয়ে গেলাম। তাঁর কাছে আলম সাহেব ফোন করেছেন। তারপর থেকে তিনি বিভিন্ন হোটেলে হোটেলে ফোন করে চলেছেন। বীচ হ্যাভেন নামের একটি হোটেলকে তিনি ফোনে চেপে ধরেছেন দুটি রুম যেভাবে হোক ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কিভাবে বলতে পারব না বীচ হ্যাভেন দুটি রুমের ব্যবস্থা করেছেন। ভাড়া অনেক বেশি। সিংগ্যাল দেড়, ডাবল আড়াই হাজার টাকা। টাকার অংক শুনে আমরা ভেতরে মরে গেলাম। তুষার সাহেব বললেন, থাকার ব্যাপারে আপনাদের কোন বাজেট আছে?
আমি বললাম, বাজেট তো একটা থাকেই। কিন্তু করবটা কি?
তিনি বললেন, আপনারা নিজেরা গিয়ে দুয়েকটা হোটেল ঘুরে দেখুন না? যদি পেয়ে যান এত টাকা দিয়ে থাকার দরকার কি?
কথাটা মন্দ বলেননি। শুক্তিকে বললাম, তোমরা এখানে বস। রবি আমার সঙ্গে চল। আমরাও একটু চেষ্টা করে দেখি।
রবি না করল না। দুয়েকটা হোটেল ঘুরার পর মনে হল এসব বৃথা চেষ্টা। মোহনা হোটেল ইন্টারন্যাশনাল আমাদের কিছুটা আশ্বস্ত করেছিল। পরে জানাল সম্ভব নয়।
আমরা আবার তুষার সাহেবের কাছে ফিরে এলাম। বললাম, আপনি কথা বলুন, আমরা ওই হোটেলেই উঠব।
তুষার সাহেব ফোনে জানালেন, আমার লোক যাচ্ছে রুম ঠিক করে রাখুন।
আমরা বীচ হ্যাভেনে গিয়ে উঠলাম। রবিকে বললাম, আপাতত একটা রাত এখানে থাকি। অন্যকোথাও যদি সুযোগ পাই তখন চলে যাব।
আমরা যে হোটেলটায় উঠলাম তা বেশি দিনের পুরনো নয়। এখনও সব কাজ শেষ করে উঠতে পারেনি। অধিক মুনাফা লাভের আশায় তারা লোকজনকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
আমার মেজাজ ছিল খিটখিটে। শরীরে ছিল ক্লান্তি। গোশলটা সারা অতিশয় জরুরি মনে করলাম। আমি গোশলখানায় ঢুকে দাড়ি কাটলাম। তারপর মাথায় শেম্পু মেখে দেখি গোশল করার ঝর্ণা কাজ করছে না। পড়ে গেলাম ভীষণ বিপদে। একটা বালতি থাকলেও কোন রকমে সারা যেত। সেটাও নেই। রুমে কোন ফোনের ব্যবস্থা নেই। বয়টা যাওয়ার সময় একটা ফোন নাম্বার রেখে গেল। দরকার পড়লে তারে যেন ফোন করি। আমি আধা ভেজা শরীরে গোশলখানা থেকে বেরিয়ে বয়কে ফোন করলাম। মেজাজ এত তিরিক্ষি ছিল যে শালীনতাবোধ কাকে বলে সেটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। বয় তড়িঘড়ি করে দৌড়ে এল। বললাম, এখানে কোন ভদ্রলোক থাকতে পারে? কোন একটা কল ঠিক নেই, পানি নেই, তোমরা আমাদের এখানে উঠালে কেন?
আমার আচরণ দেখে বয় ভয় পেয়ে গেল। বলল, স্যার, আমি এখনি বালতি এনে দিচ্ছি।
আমি আর উচ্চবাচ্য করলাম। বালতি এনে দিলে আমি পুনরায় গোশলখানায় ঢুকে গোশলটা সেরে নিলাম। বেরিয়ে শুনি রবিদের কক্ষেও একই অবস্থা। নিয়তিকে অপরাধী করা ছাড়া উপায় কি!
খিদের জ্বালায় পেট চুঁ চুঁ করছে। কিন্তু বাইরে এক পাও যেতে ইচ্ছে করল না। বোতল থেকে ডগডগ করে পানি খেয়ে খানেকটা শুয়ে নিলাম। বেশ লাগছিল। বোধকরি জীবনে এর চে’ আরাম আর কোনদিন উপভোগ করিনি। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি, হঠাৎ কেন জানি মনে হল, ঈশ্বরের নিয়ম মেনে স্বর্গে যাওয়া যত সহজ কুয়াকাটা আসা তত নয়।

বিকেল সাড়ে তিনটা নাগাদ আমরা খেতে বেরুলাম। কিন্তু খাবার হোটেল কোথায় আছে আমাদের জানা ছিল না। আমরা হোটেলের দিকে না গিয়ে উল্টো পথে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। পথে এক লোককে জিজ্ঞেস করলাম, এদিকে খাবার হোটেল কোথায় আছে?
তিনি বললেন, যেদিকে যাচ্ছেন ওদিকে গেলে খিদে বাড়বে, কিন্তু খাবার পাবেন না। যদি খেতে চান সোজা উল্টোদিকে যান।
আমরা তার কথা মেনে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। কুয়াকাটায় কোন রিকশা নেই। যতদূর যেতে হবে হেঁটেই যেতে হবে। পাঁচ মিনিট হাঁটার পর আমরা হোটেল পেয়ে গেলাম। একসঙ্গে পাঁচ সাতটা হোটেল। পছন্দ করার মত হোটেল এগুলো নয়। টিনের ছাউনির হোটেলগুলো বাইর থেকে দেখলে ঝুপড়ির মত দেখায়। এগুলো ছাড়া কুয়াকাটায় আর কোন হোটেল নেই। হোটেলগুলোতে লোকজনের প্রচণ্ড ভিড়। আমরা ভিড় ঠেলে একটা হোটেলে ঢুকে পড়লাম। রাসমেলার লোকজন পর্যটকদের আনন্দকে একেবারে ম্লান করে দিয়েছে। আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা টেবিলে জায়গা পেলাম। হোটেল বয় এলে জিজ্ঞেস করলাম, তরকারি কি আছে?
বয় বলল, কি আছে বলে শেষ করা যাবে না। তার চে’ আপনারা একজন রান্নাঘরে গিয়ে পছন্দ করুন কি খাবেন।
রবিকে বললাম, সেটা মন্দ নয়। চল দুজনে গিয়ে দেখে আসি।
গিয়ে দেখি দশ বার পদের তরকারি। তার বেশির ভাগই মাছ। রবি বলল, এখানে শুধু মাছই খাব। কোন মাংশ চলবে না।
আমি বললাম, আমিও তাই মনে করি।
মাছের মধ্যে রয়েছে ইলিশ, কোরাল, রূপচাঁদা, বাইলা, চিংড়ি, টেংরা আরও নানাজাতের। আমরা কোরাল মাছটা পছন্দ করলাম। সঙ্গে ডাল এবং সবজির কথা বললাম। মাহিয়ার জন্য বলা হল ইলিশ।
যথাসময়ে খাবার এসে গেল। খিদে যখন পেটে জ্বালা ধরিয়ে দেয় তখন যে কোন অখাদ্যও অমৃতের মত ঠেকে। আমি উপলব্ধি করলাম এখানকার মাছ রান্না একেবারে বাজে। মাছগুলো এমনভাবে ভেজে নিয়েছে খানেকটা তিতে হয়ে গেছে। অনেক সময় অরাঁধুনিদের হাতে রাঁধা রুইমাছেও স্বাদ পাওয়া যায় না। এ মাছটারও তাই হয়েছে। কিন্তু আমরা খাচ্ছি। গোগ্রাসে গিলছি। এ অবস্থায় আমরা যা পাব তাই খেতে পারব।
খাওয়ার পর আয়েশ করার মত হোটেল এগুলো নয়। এখানে খাবার শেষ না হতে উঠিয়ে দিতে পারলে তারা বাঁচে। মানুষের এমন ভিড় আমাদের টেবিল ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা উঠলেই তারা বসে পড়বে। বিল পরিশোধ করতে গিয়ে দেখি প্রায় সাত শ’ টাকার মত বিল এসে গেছে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে এসে রবিকে বললাম, এখন কি করবে?
শুক্তি বলল, হোটেলে গিয়ে ঘুমাব। তারপর সন্ধেবেলা সূর্যাস্ত দেখব।
আমি বললাম, এখন কটা বাজে খবর আছে? চারটের ওপরে বাজে। ঘুমোতে গেলে আর সূর্যাস্ত দেখা হবে না।
রবি বলল, হোটেলে যেতে আসতে সূর্য ডুবে যাবে। তার চে’ সী বীচে চলে যাই।
আমরা একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে সী বীচের দিকে চলতে থাকলাম। রাস্তার ডান পাশে বেশ বড় একটা মেলা বসেছে। এটাই রাসমেলা। তার পাশে একটা ঝিনুক মার্কেট। মার্কেট দুটিতে পর্যটকদের কেনার মত তেমন কিছু নেই। সেখানে স্থানীয় লোকজনের আধিক্যই বেশি লক্ষ করলাম। তারপরেও পুরো মেলাটায় আমরা একটা চক্কর দিলাম। নিত্যদিনের ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্তর এবং বাচ্চাদের খেলনা ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। আর থাকবেও বা কি।
রাস্তার বাঁ-পাশে রয়েছে পুজো মণ্ডপ। পাশাপাশি তিনটে। একটাতে রাধা-কৃষ্ণ, একটাতে দুর্গা, আরেকটিতে কালি। মণ্ডপের সামনে শত শত মানুষ। মাইকে কীর্তন বাজছে। রাতে কীর্তনের আসর বসবে থেকে থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে চলেছেন ঘোষক। আমি খানেকটা ঘুরে ঘুরে মণ্ডপগুলো দেখলাম। দিনের বেলা বলে মণ্ডপগুলোতে কোন চাকচিক্য নেই। রাতে যখন রঙিন বাতি ঝিলিক হানবে তখন হয়ত তার জৌলুস বাড়বে। আমি মনে মনে স্থির করলাম রাতে কীর্তন শুনতে আসব।
সূর্য ডুবতে বেশি বাকি নেই। আমরা সৈকতে চলে গেলাম। আমি হতাশ না হয়ে পারিনি। কুয়াকাটাকে আমি অন্তত কক্সবাজারের কাছাকাছি ধরে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কক্সবাজারের মতে এখানেও একটা সুন্দর সৈকত আছে। আর তাতে সাগরের ঢেউ আছড়ে আছড়ে পড়ছে। ঢেউগুলো বাঘের মত গর্জন করছে। সাগরের চরিত্রটা আমার কাছে অন্যরকম ঠেকল। কিন্তু সাগর এত নিশ্চল হয় কিভাবে? বোম্বে বসে আমি আরব সাগরকে এরকম দেখেছিলাম। আরব সাগরকে আমি কোনমতেই পছন্দ করতে পারিনি। সাগরের নিশ্চলতার কারণে কুয়াকাটাও আমার মনে দাগ কাটতে পারল না। এত পরিশ্রম, অর্থ, সময় নষ্ট করে আমি এখানে এসেছি। ভেবেছিলাম এখানে এসে আমি সব পুষিয়ে নেব। একি আমার নিয়তি!
কক্সবাজারের সৈকতের বালি স্বচ্ছ। আর এখানে দেখলাম বালির সঙ্গে খানেকটা কাদা মিশে আছে। মাঝে মাঝে কচুরির দল চরে এসে আটকে আছে। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা তো আছেই। পর্যটকদের বসার জন্য কাঠের তৈরি দীর্ঘ ইজি চেয়ারের সারি। তার ওপর রঙ-বেরঙের বড় বড় ছাতা। কিন্তু পর্যটকেরা তেমন এক বসছেন না। সাগরের পাড়ে রয়েছে বেশি কিছু নারকেল এবং তালগাছ। গাছগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে মন্দ লাগে না। কিছু গাছপালাও আছে। তবে ওগুলো পরিকল্পিত নয়।
রাসমেলা এবং ঈদের ছুটির কারণে সৈকতে মানুষের ঢল নেমেছে। কিন্তু কেউ পানিতে নামছে না। মানুষ সুন্দরের পূজারি। যে সাগরে কোন চাঞ্চল্য নেই সেখানে মানুষ নামবে কেন? পশ্চিমাকাশ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সূর্য অনেকটা সাগরের কাছাকাছি চলে এসেছে। একটু বাদে তা পানিতে তলিয়ে যাবে। আমি প্রায় পাঁচ মিনিট অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তার অস্ত যাওয়ার দৃশ্য দেখলাম। অদ্ভুদ দৃশ্য। সূর্যটি একটু একটু করে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। যত তলিয়ে যেতে থাকল আমার মনটাও হাহাকার করতে থাকল। হায়, আমার জীবনটাও তো এভাবে তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। একদিন দেখব এই অস্তমান সূর্যের মত আমিও নেই। শুক্তি বলল, এখানে থাকার আর কি দরকার আছে?
আমি বললাম, মোটেই না।
আমরা সকলে ক্লান্ত। রবিকন্যা মাহিয়া আরও বেশি কাহিল হয়ে পড়েছে। মেয়েটা কেমন করে নিজেকে ধরে রেখেছে বলতে পারব না। তাকে বিশেষ কিছু খেতে দেখি না। তারপরেও দেখি সে বেশ দিব্যি আছে। রবি বলল, রাতে খাবারটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই। আপনার কোন আপত্তি আছে? আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে শুইলে আর উঠতে পারব না।
আমি বললাম, এত সকাল সকাল খাবার নিয়ে গেলে ওগুলো তো খেতে পারবেন না। আপনারা কি রুটি খাবেন?
শুক্তি বলল, আপনার মত থাকলে আমি রাজি। তবে মাহির জন্য ভাত লাগবে। সে রুটি খেতে চায় না।
আমরা হোটেলে গিয়ে ভাত, রুটি, সবজি, ডাল নিয়ে নিলাম। মাহির জন্য এক পিস ইলিশ মাছ নিতেও আমরা ভুল করিনি।
ফেরার সময় আমরা হোটেল মোহনা ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তাদের কাছে জানতে চাইলাম আমাদের দুটি রুম দিতে পারে কিনা। তারা জানালেন, একটা ডাবল বেডের রুম খালি আছে। পনের শ’ টাকা দিতে হবে। দরকার মনে করলে দেখতে পারেন। সিংগ্যাল রুম কয়েকদিনের মধ্যে পাওয়া যাবে না।
আমরা রুমটা দেখতে গেলাম। পছন্দ না হওয়ার মত রুম নয় এটি। বেশ বড়সড়, টাইলস করা। রুমের দুপাশে দুটি খাট পাতানো। আমি রবিকে বললাম, বীচ হ্যাভেনে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে ওখানে থাকার কোন মানে হয় না। আপনারা এখানে উঠে পড়েন।
রবি বলল, আপনি কোথায় থাকবেন?
আমি বললাম, আরেকটা ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত আপাতত ওখানে থাকব।
রবি বলল, সে কি করে হয়? আমরা এক হোটেলে থাকব, আপনি আরেকটাতে। দেখতেও তো খারাপ দেখায়। আপনি কিছু মনে না করলে একটা কথা বলব?
আমি বললাম, বল।
সে বলল, এখানে তো দুটি খাট আছে। আপনি একটা খাটে থাকবেন, অন্যটাতে আমরা থাকব।
আমি বললাম, সেটা কি করে সম্ভব?
রবি বলল, ভাই বোন কি একসঙ্গে থাকে না? ধরুন না আপনি আমাদের অতিথি।
আমি রবির কথায় একরকম অস্বস্তি বোধ করছিলাম। আবার তাকে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছিলাম না। সে বলল, আপনি আমাদের সঙ্গে থাকছেন, সেভাবে আমি হোটেলওয়ালার সঙ্গে কথা বলছি।
রবি হুটহাট কথা বলে হোটেল ম্যানেজারকে দুদিনের ভাড়া অগ্রিম দিয়ে বলল, আগামীকাল আমরা দুপুর বারটায় আপনার এখানে থাকতে আসব।
ম্যানেজার না করল না।
বীচ হ্যাভেনে ফিরে এলাম। রুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম। রবিরা তাদের ঘরে।
আমরা এমন একটা হোটেলে উঠলাম যেখানে একটা টেলিভিশন নেই, যা দেখে সময় কাটাতে পারি। মনটা খুব ছটফট করছিল। শিল্পীকে অসুস্থ অবস্থায় রেখে এলাম। আপনের কথা বেশি করে পড়ছে। তারা সঙ্গে থাকলে আমার এ কুয়াকাটা ভ্রমণ অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু পরিস্থিতি আমার অনুকূলে ছিল না। এলেও দুর্ভোগ বাড়ত। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা মনে করলে শিউরে না উঠে পারি না। একথা সেকথা ভাবতে ভাবতে কোন সময় ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পেলাম না।
হঠাৎ দরজার ঠকঠক শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ধীর পায়ে উঠে দরজা খুলে দেখি রবি দাঁড়িয়ে। বলল, ভাই, ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? রাত দশটা বাজে। খেয়েদেয়ে তারপরে ঘুমান।
আমি দরজা লাগিয়ে তাদের ঘরে গেলাম। ইতোমধ্যে শুক্তি সব খাবার বের করে বিছানায় বিলিয়ে রেখেছে। আমরা রুটি চিবুতে থাকলাম। সবজিটা নষ্ট হওয়ার পথে। তাতে আমরা গা করলাম না।

পরের দিন ঘুম ভাঙল দেরিতে। রাতে কীর্তন শুনতে যাব সেটা হয়নি। সকালে সাগরে স্নান দেখতে যাব ভেবেছিলাম সেটাও হয়ে উঠেনি। রাসমেলা আমি দুবলার চরে দেখেছি। এ নিয়ে আমার আফসোস নেই। তাছাড়া এখানার পূজার আয়োজনটা দুবলার চরের চে’ অনাড়ম্বর। সকালের গোশল সেরে যখন নাস্তা করতে গেলাম তখন ন’টা বাজে। পরোটা দিয়ে পেট ভরে নাস্তা করলাম। হোটেলে, মাঠে-ঘাটে কেবল মানুষ আর মানুষ। রাস্তায় মানুষ ধরছে না। সকলে ঘরমুখি।
আমরা সৈকতে চলে গেলাম। সকালে ঝলমলে আলোতে বেশ কিছু ছবি তুললাম। তখনও দেখলাম অনেকে সমুদ্রকে প্রণাম জানাচ্ছে। কেউ কেউ গোশলও করছে। এ সময়টাতে কক্সবাজারের সৈকতে গোশল করার ধুম লেগে যায়, কুয়াকাটায় তেমনটা চোখে পড়ল না।
আমরা ঘুরে ফিরে ঘণ্টা দুয়েক কাটালাম। সূর্য তেতে উঠেছে। সৈকতে অনেকে ডাব নিয়ে বসেছে। একেবারে টাটকা ডাব। পটুয়াখালিতে আসার পর থেকে এ জিনিসটা বেশ তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছি। দামও ঢাকার চে’ খানেকটা কম। সৈকতের পাশে কয়েকটা শুটকির দোকান রয়েছে। ঘুরে ফিরে ওগুলো দেখলাম। লইট্টা, পোঁয়া, ছুরি, পইল্লাসহ নানাজাতের শুটকি। তবে পর্যাপ্ত নয়। রবি বলল, কিছু শুটকি কিনতে হবে।
আমি বললাম, যেদিন যাব ওইদিন কিনব। এখন কিনে হোটেলে রাখলে গন্ধে টেকা যাবে না।
ঘড়িতে যখন এগারটা বাজে আমরা বীচ হ্যাভেনে চলে এলাম। আমরা ব্যাগ গুছাতে লেগে গেলাম। বারটার মধ্যে হোটেল ছাড়তে হবে। গিয়ে হোটেল মোহনায় উঠব। যখন ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে এলাম হোটেল ম্যানেজার বললেন, স্যার, আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে জানি, তাই বলে চলে যাবেন?
আমি বললাম, আমরা না থাকলেও তো অন্যকেউ এসে থাকবে। আবার যখন আসব আপনাদের এখানে থাকব। ততদিন ভাল থাকবেন।
শুকতি আবদার করল যেন কয়েকটা ছবি তুলে দেই। আমার আনাড়ি হাতে ক্যামেরায় তার কিছু ছবি তুললাম। নতুন আস্তানায় যাচ্ছি এজন্য আমাদের মধ্যে একরকম আনন্দ কাজ করছিল। হ্যাভেন বীচে পানি না থাকায় রবি গোশল সারতে পারেনি। সে হোটেল মোহনায় গিয়ে প্রথমে গোশলটা সেরে নেবে। তার কথাবার্তায় মনে হচ্ছিল বড় একটা মুশকিল থেকে সে উদ্ধার পেতে যাচ্ছে।
হোটেল মোহনায় গিয়ে বাকি দিনগুলোতে কি করব তার একটা ছক তৈরি করে ফেললাম। কিন্তু কাজগুলো কিভাবে সম্ভব করে তুলব তার কোন নির্দেশনা আমাদের কাছে নেই। গত সন্ধ্যায় সৈকতে একজন মোটর সাইকেলওয়ালার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তারা সব স্পট ঘুরিয়ে আনবে প্রতি মোটর সাইকেলে সাড়ে পাঁচ শ’ করে নেবে। তাদের কাছে স্পটগুলোর ছবিসহ একটা তালিকা রয়েছে। সূর্যোদয়, বৌদ্ধমন্দির, কুয়া, রাখাইন পল্লী, শুটকি পল্লী, লাল কাঁকড়া ইত্যাদি তারা দেখিয়ে আনবে। তারা ব্যাপারটা আমাদের এমনভাবে বুঝিয়েছিল একেকটা স্পট থেকে অন্যটা কয়েক কিলোমিটার দূরে। কুয়াকাটা সৈকত থেকে সূর্যোদয় দেখতে গেলে নাকি নয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ব্যাপারটা আমাকে খানেকটা হলেও চমকে দিয়েছিল। মনে মনে ধরে নিলাম ওসব দেখে আর কি হবে, যেখানে কুয়াকাটা সৈকত আমাকে আপ্লুত করতে পারেনি। ওগুলো তো আর এর চে’ আহামরি কিছু নয়।
বিকালে বেরুবার সময় হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললাম। তার কাছে জানতে চাইলাম, কুয়াকাটাতে দেখার জিনিস কি কি আছে?
তিনি বললেন, মোটর সাইকেলওয়ালাদের পাল্লায় পা দেবেন না। ওরা প্রতারণা করে টাকা কামাই করে। আর ওসবের দায়-দায়িত্ব হোটেলওয়ালাদের নয়। আপনারা খুব ভোরে উঠে একখানা ভ্যান নিয়ে ঝাওবনে চলে যাবেন। আমি আপনাদের একখানা ভ্যানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
হোটেল বয় রাস্তায় গিয়ে একজন ভ্যানওয়ালাকে ডেকে নিয়ে এল। ভ্যানওয়ালার সঙ্গে ম্যানেজার সাহেব কথা বললেন। তার কাছে জানতে চাইলেন, ভোরে আমাদের ঝাওতলায় নিয়ে যাবে কত টাকা নেবে।
ভ্যানওয়ালা বললেন, অনেকে দেড় শ’ টাকায় যায়। আপনারা এক শ’ টাকা দেবেন।
আমরা তার সঙ্গে কোন দরদাম করলাম না। বললাম, সূর্য কটায় উঠে?
ভ্যানওয়ালা বললেন, সেটা তো স্যার আমি বলতে পারব না।
আমি বললাম, যতটা বাজে উঠুক, আপনি সকাল সাড়ে চারটায় এখানে এসে উপস্থিত হবেন। এখন কি আপনি আমাদের বৌদ্ধমন্দির নিয়ে যেতে পারবেন?
তার জবাব দেয়ার আগে ম্যানেজার সাহেব বললেন, ভ্যানের দরকার পড়বে না। এখান থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। আপনারা হেঁটে চলে যান।
তারপরেও আমি ভ্যানওয়ালাকে বললাম, আপনি ভ্যানে করে আমাদের চিনিয়ে দিয়ে আসেন।
ভ্যানওয়ালা দু’ মিনিটের মাথায় আমাদের বৌদ্ধমন্দিরের সামনে নামিয়ে দিলেন। তখন পাঁচটা বেজে গেছে। ভ্যানওয়ালাকে দশ টাকা দিয়ে বললাম, আপনার নাম কি?
তিনি বললেন, নূরুল ইসলাম।
আমি বললাম, আপনার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে যান।
নূরুল ইসলাম মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে চলে গেলেন। আমরা যখন বৌদ্ধমন্দিরে সীমানা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলাম গেটের দারোয়ান আমাদের আটকে দিলেন। বললেন, সময় শেষ হয়ে গেছে। এখন ভেতরে যাওয়া যাবে না।
আমি হেসে বললাম, চাচা মিয়া, সত্যি সত্যি আমরা চলে যাব?
দারোয়ান হেসে বললেন, যান। আসার সময় আমাকে কিছু চা পানির পয়সা দেবেন।
আমরা না করলাম না। ভেতরে ঢুকতেই বাঁদিকে সেই ঐতিহাসিক কুয়াটা আমাদের চোখে পড়ল। চারদিকে গ্রিল। ওপরে টিনের ছাউনি। পাকা বৃত্তকার ছোট্ট এই কুয়াটার আয়তন পঞ্চাশ ফুটের বেশি নয়। তার গভীরতা পনের বিশ ফুটের মত। কুয়ার ভেতর এক আধটু পানি রয়েছে। এ কুয়াতে নামার কোন কায়দা নেই। রশি বেঁধে বালতি দিয়ে ওখান থেকে পানি তোলা সম্ভব। হয়ত কোন কালে এভাবে পানি তুলত। এখন তা আর প্রয়োজন পড়ে না। এখানে একটা জিনিস আমাকে অবাক করে তুলল কুয়ার পানিতে বেশ কিছু টাকা ভাসছে। খুব সম্ভব কেউ কেউ মানত করে এখানে টাকা ফেলে।
মন্দিরটা একটা টিলার ওপর। আমরা পাকা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলাম। মন্দিরটা বেশ সুন্দর। আমরা হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরে চলে গেলাম। বারান্দায় গিয়ে জানলা দিয়ে দেখলাম একটা বড়সড় একটা ধ্যানী বৌদ্ধমন্দির। দরজা বন্ধ। ভেতরে ঢুকার কোন উপায় নেই। আমরা জানালা দিয়ে দুয়েকটা ছবি তুললাম। বারান্দায় একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। তার পাশে একজন তরুণ। জানা গেল বৃদ্ধের নাম মংচিন প্র“। তিনি এ মন্দির দেখাশুনা করেন। প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছর আগে তাঁর পূর্ব-পুরুষেরা এ মূর্তিটি বার্মা থেকে এনে এখানে স্থাপন করেছিলেন। এ মন্দিরটার সামনে টিনের বানানো আরও একটি মন্দির রয়েছে। ওখানে শোয়া অবস্থায় একটি বুদ্ধর্মর্তি আছে। এ মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ছত্রিশ ফুট। এটা দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। আমরা যাবার আগে মন্দিরটির দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মংচিন জানালেন, মন্দিরের চে’ সামনের কুয়াটা আরও বেশি পুরনো। এক সময় এ এলাকায় সুপেয় পানি পাওয়া যেত না। কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করে মানুষ তা পান করত। এজন্য জায়গাটার নামকরণ হয়েছে কুয়াকাটা।
আমরা যখন মন্দির থেকে বেরিয়ে এলাম তখন সূর্য ডুবে গেছে। আজ আমাদের সূর্যাস্ত দেখা হল না। আমরা রাখাইন মার্কেটে ঘুরে ঘুরে কিছু কাপড়চোপড় কিনলাম। একটা বড় মাঠ। এই মাঠকে সামনে রেখে চারপাশে গড়ে উঠেছে মার্কেট। রাখাইন মার্কেট নাম হলেও এর বেশির ভাগ দোকানের মালিক বাঙালি। দোকানে রাখাইনদের তৈরি কাপড়চোপড়ও অল্পস্বল্প। এ মার্কেটের কাপড়চোপড় বেশির ভাগ এসেছে কুমিল্লা এবং সিলেট থেকে। পথ ভেঙে এসব কাপড়চোপড় এখানে আসার কারণে দামও খানেকটা বাড়তি। দরদাম না করে জিনিস কিনলে আপনাকে ঠকতে হবে।
মার্কেট ঘুরে বেরিয়ে আসতে রাত প্রায় আটটা বেজে গেছে। আমরা আগের দিনের মত রুটি এবং তার সঙ্গে আরও কিছু খাবার দাবার নিয়ে হোটেলে ফিরে গেলাম।

আধা ঘণ্টার মত সময় হাতে রেখে আমরা ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠলাম। সাড়ে চারটায় আমাদের বেরুতে হবে। এই সময়ের মধ্যে আমাদের তৈরি হতে হবে। ঘড়িতে যখন চারটে বাজে আমি নূরুল ইসলামকে ফোন করলাম। নূরুল ইসলাম বললেন, আমি গেটে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছি।
আমি ভাবতেও পারিনি তিনি আগে থেকে এসে দাঁড়িয়ে থাকবেন। নূরুল ইসলামের দায়িত্ববোধের পরিচয় পেয়ে তার প্রতি আমার একরকম শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হল। বাঙালির সময়জ্ঞানের বড় অভাব। সেদিক থেকে নূরুল ইসলামকে আমার কাছে ব্যতিক্রম মনে হল। একজন ভ্যানওয়ালার কাছ থেকে এর চে’ আর বেশি কী আশা করতে পারি।
দারোয়ান গেট খুলে দিলেন। আমরা ভ্যানে গিয়ে বসলাম। বাইরে ঘন কূয়াশা। হালকা শীতও অনুভব করতে থাকলাম। ঘরের মধ্যে তা একটুও টের পাইনি। হালকা শীতের কাপড় হলে মন্দ হত না। নূরুল ইসলাম ভ্যান চালাতে আরম্ভ করলেন। রাস্তার অবস্থা ভাল নয়। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। মাঝে মাঝে গর্ত। আকাশে গোলাকার চাঁদ। চাঁদের আলোতে রাস্তায় প্রচণ্ড ধুলোবালির অস্তিত্ব আমি টের পেতে থাকলাম। কূয়াশার কারণে আমরা ধুলোর উৎপাত থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেয়ে গেলাম। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছগাছালি। কেউ যদি ওৎ পেতে থেকে আমাদের ওপর অতর্কিতে হামলা করে বসে কিছু করার থাকবে না। নূরুল ইসলামকে বললাম, নূরুল ইসলাম, রাস্তায় কোন সমস্যা টমস্যা হয় না তো?
নূরুল ইসলাম বললেন, স্যার কি চোর ডাকাতের কথা বলছেন? ওই রকম সমস্যা এখনও পর্যন্ত হয় নাই। আপনারা কোন রকম ভয় করবেন না।
নূরুল ইসলাম বিশ মিনিট ভ্যান চালিয়ে আমাদের ঝাওবনে নামিয়ে দিলেন। এখনও ঘন অন্ধকার। মনে মনে ভাবলাম আরও পরে রওয়ানা দিলে আমাদের চলত। কিন্তু আমরা জানতাম না কটা বাজে সূর্য উঠে। ভ্যান যেখানে আমাদের নামিয়ে দিল সেখানে দু তিনটি দোকান রয়েছে। হয়ত এখানে চা-বিস্কিট বিক্রি হয়। দোকানগুলো এখনও খুলেনি। ঘন ঝাওবনে গা একরকম ছমছম করছিল। নূরুল ইসলাম বললেন, চলেন, আমরা চরে চলে যাই।
আমি বললাম, আপনার ভ্যান কি করবেন?
তিনি বললেন, ভ্যান কেউ ধরবে না।
মসজিদ থেকে আজান ভেসে এল। আমরা সৈকতের ওপর দিয়ে সোজা দক্ষিণদিকে হাঁটতে থাকলাম। চাঁদের আলোতে বেশ লাগছিল। কুয়াকাটা সৈকত থেকে অনেকে হেঁটে হেঁটে এদিকে আসছে। উদ্দেশ্য একটাই, তারাও সূর্যোদয় দেখবে। বাতি জ্বালিয়ে মোটর সাইকেলও ছুটে আসছে। মোটর সাইকেলওয়ালা টাকাটা হালাল করার জন্য আরোহীদের আমাদের এখানে না নামিয়ে দূরে আরও বহু দূরে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা নূরুল ইসলামের কাছে জেনে গিয়েছি সূর্যোদয় দেখতে হলে এর চে’ বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই।
ধীরে ধীরে সকালের আলো ফুটতে আরম্ভ করেছে। মানুষের আনাগোনাও অনেক বেড়ে গেছে। মোটর সাইকেলের সংখ্যাও বেড়ে চলল। আমরা হাঁটছি আর হাঁটছি। নূরুল ইসলাম ব্যস্ত আমাদের লাল কাঁকড়া দেখানোর জন্য। এখানেও লাল কাঁকড়া আছে, তবে কদাচিৎ দেখা মেলে। তিনি কাঁকড়া ধরার জন্য কয়েকটা গর্ত বরাবর হাত দিয়ে বালি কুঁড়তে আরম্ভ করলেন। যতবারই তিনি বালি কুঁড়তে থাকলেন ততবারই ব্যর্থতার পরিচয় দিলেন। অনেক চেষ্টা করেও তিনি লাল কাঁকড়ার সন্ধান করতে পারলেন না। এ নিয়ে আমার কোন দুঃখ নেই। আমি কক্সবাজারের মহেশখালিতে প্রচুর লাল কাঁকড়া দেখেছি। রবি এবং শুক্তি লাল কাঁকড়া দেখার জন্য বেশি উৎসাহী ছিল। মাহি ছিল আরও এক ধাপ এগিয়ে। শেষ পর্যন্ত আমরা একটা মরা কাঁকড়া চরে কুড়িয়ে পেলাম। এটা নিয়ে তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হল।
আকাশ একেবারে ফর্সা হয়ে গেল। পুব আকাশে সূর্য রক্তিম আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। আকাশটা একরকম টকটকে লাল হয়ে আছে। সূর্যের দেখা মিলতে আর বেশি দেরি নেই। ঘড়িতে যখন ছ’টা বার মিনিট বাজে সূর্যের দেখা পেয়ে গেলাম। একটু একটু করে সূর্যটা পানির ভেতর থেকে মূতিমার্ন হয়ে উঠছে। চমৎকার একটা দৃশ্য। কিন্তু সেটি খুব বেশি সময়ের জন্য নয়। পুরো সূর্যটা গোলাকার হয়ে দেখা দিতে এক মিনিট সময়ও নিল না। আমরা কয়েক মিনিট সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এমন রক্তিম সূর্যের দেখা খুব কম মানুষের ভাগ্যে জোটে। সূর্য যখন পানি থেকে কয়েক ফুট ওপরে উঠে গেল তখন তার তেজ বেড়ে যেতে থাকল। আমরা আর তার দিকে তাকাতে পারলাম না।
সূর্যাস্ত যত সময় ধরে উপভোগ করা যায় সূর্যোদয় ওভাবে সম্ভব নয়। অস্তমান সূর্যের দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকানো যায়, কিন্তু উদয়মান সূর্য ওইটুকু সময় দিতে নারাজ।
কুয়াকাটার সন্নিকটের সমুদ্র সৈকত থেকে ঝাওবন সৈকত অনেক সুন্দর। এখানকার ঝাওবনের দৃশ্য অপূর্ব। বেশ কিছু নারকলে গাছও এখানে রয়েছে। সকালের শিশু সূর্য যখন আলো ঢেলে দিল পুরো দৃশ্যটা যেন ঝলমলে উঠল। সৈকতে রয়েছে অনেকগুলো নৌকো। হয়ত জোয়ার এলে ওগুলো পানিতে নামায়। একসঙ্গে এতগুলো নৌকার সৌন্দর্যটাই আলাদা। পুরো সৈকতটা মাঝে মাঝে সাদা হয়ে আছে এক ধরনের সাদা ঝিনুকে। কেউ এগুলো কুড়াতে আসে না। পর্যটকেরা কেউ কেউ সখের বশে কিছু কিছু কুড়িয়ে নিয়ে যায়। এ ধরনের দৃশ্য কক্সবাজারে সাধারণত চোখে পড়ে না। প্রথম দিন সৈকতে গিয়ে আমি নিজের ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়েছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম আমার সাধনা ব্যর্থ। এখন মনে হল আমার সাধনায় ফল ফলেছে। ঝাওবন সৈকতে এসে আমি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অনেকাংশে খুঁজে পেয়েছি। কুয়াকাটা এসে আমি একেবারে ব্যর্থ হয়নি। আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু অর্জনও কম নয়।
চায়ের দোকানগুলো খুলেছে। আমরা সকলে মিলে চা খেলাম। আমরা ক্ষুধার্ত ছিলাম। তার কিছুটা লাঘব করার জন্য এটা ছিল একটা ছোট্ট প্রয়াস। আমরা পুনরায় ভ্যানে চেপে বসলাম। নূরুল ইসলাম ভাঙাচোরা রাস্তা ভেঙে ভেঙে আমাদের খাবার হোটেলের সামনে এনে নামিয়ে দিল। নাস্তা সেরে যখন হোটেল মোহনায় ঢুকলাম ম্যানেজার সাহেব বললেন, কেমন দেখলেন?
আমি বললাম, চমৎকার!
তিনি বললেন, চমৎকার বটে! এমন সমুদ্র সৈকত বিশ্বে কোথাও পাবেন না। জাপানে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটো একসঙ্গে দেখা যায়। তাও এক জায়গায় নয়। সূর্যোদয়ের জায়গা থেকে সূর্যাস্ত দেখতে গেলে সেখানে আপনাকে বায়ান্ন কিলোমিটার যেতে হবে। কিন্তু কুয়াকাটা ব্যতিক্রম। মাত্র আড়াই কিলোমিটারের ব্যবধানে দুটো জিনিস একই জায়গা থেকে দেখা যায়। কিন্তু সমস্যা একটা আছে। এখানে গ্রীষ্ম মৌসুমে সূর্যোদয় দেখা যায় না। শীতের আকাশে সূর্যটা দক্ষিণ আকাশে হেলে থাকে বলে সেই সুযোগটা আমরা পাই।
দুপুরে একটু দেরিতে খেতে গেলাম। প্রতিদিনই মাছ খেয়ে চলেছি। রান্না রুচিসম্মত তো নয়ই, স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। তারপরেও আমরা খাচ্ছি। আজকে আমরা চিংড়ি মাছটা পছন্দ করলাম। চিকিৎসকের নিষেধ মেনে অনেকদিন আমি চিংড়ি খাই না। মাঝে মধ্যে খেলে এমন কি আসে যায় এই ভরসা ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল। তাই চিংড়িটা খাদ্য তালিকায় রাখলাম। লাউ তরকারি এবং ডালের কথা বলতেও ভুল করিনি। লাউ তরকারিটা খেয়ে যখন চিংড়ি মুখে দিলাম দেখলাম বালির জন্য চিবানো যায় না। বয়কে ডেকে বললাম, মাছে এত বালি কেন?
মাছে বালি আছে বয় বিশ্বাস করতে চাইল না। সে বলল, সকলে তো খাচ্ছে, কেউ তো অভিযোগ করল না। আপনাদের বালি হতে যাবে কেন?
আমি নানাভাবে বুঝাতে চাইলাম সে বিশ্বাস করতে চাইল না। রবি বলল, অন্য কোন মাছ নেব?
আমি বললাম, অন্য মাছও যে ভাল হবে তার নিশ্চয়তা কি। কোন রকমে খেয়ে ফেলি।
রবি বলল, কোন কিছু অভক্তি রেখে খেলে পেট খারাপ হয়।
আমি বললাম, খারাপ জিনিস সব সময় খারাপ। এখানে ভক্তি অভক্তির প্রশ্ন আসবে কেন?
কোনভাবে খেয়ে আমি রেরিয়ে এলাম। খাবারটার প্রতি এত বিতৃষ্ণ ছিলাম যে আমি বিল পরিশোধের কথাও ভুলে গেলাম। রবি নিজের থেকে বিল পরিশোধ করল। ঠিক করলাম পুরো বিকেলটা সৈকতে কাটাব। আগামীকাল চলে যাব। সুতরাং আজকের দিনটার একটু সদ্ব্যবহার করা দরকার।
কুয়াকাটা সমদ্র সৈকতে সারাদিন তেমন একটা মানুষ থাকে না। বিকেলের দিকে কোথা থেকে মানুষের ঢল নামে। আজকের সাগরটা একটু ভাল লাগল। সাগরের মর্জিই বলতে হবে, আজকে কিছুটা ঢেউয়ের দেখা পেলাম। অনেকে বলল এ সময়ে এটা ব্যতিক্রম। কয়েকজন জেলে একটা নৌকো ঠেলে ঠেলে কুলে নিয়ে এল। আর চিৎকার দিয়ে বলতে থাকল, বড় ইলিশ, বড় ইলিশ।
বড় ইলিশ দেখার জন্য আমরা দৌড়ে গেলাম। নৌকোয় একটি মাত্র ইলিশ মাছ। আর ছোট ছোট কয়েকটা পোঁয়া। সবগুলো মাছের দাম চাইল দেড় হাজার টাকা। আমরা তো মাগনা দিলেও নেব না। সুতরাং তাদের দাম চাওয়া নিয়ে মাথা ঘামালাম না।
সূর্য ডুবতে বসেছে। আমরা চোখ ভরে তা উপভোগ করতে থাকলাম। একজন বুড়ো দম্পতিকে দেখলাম সূর্য দেবতাকে করজোরে প্রণাম করতে। বুড়োর নাম মণিরাম মিস্ত্রি। তিনি একজন স্কুল শিক্ষক। বাড়ি বরিশাল। বয়স আশি ছাড়িয়ে গেছে। তার স্ত্রী বয়সের ভারে এমনভাবে নুয়ে পড়েছে যে তাকে ছোটখাটো একটা উটের মত দেখায়। আমি কৌতুহল বশত তাদের একটা ছবি তুললাম। তখনই ঘটল এক কাণ্ড। বুড়ি আমার কাছে এগিয়ে এসে পায়ে পড়ে প্রণাম করল। আমি খানেকটা পিছিয়ে গিয়ে বললাম, আপনি এটা কি করলেন?
তিনি বললেন, যে আমার ছবি তুলল সে তো একটা দেবতা।
আমি বুড়ির ব্যবহারের কোন আগা মাথা খুঁজে পেলাম না। রবি বলল, চলুন, আজকে একটু সিটিং প্যালেসে গিয়ে বসি। তারপর কিছু খাই। সে চটপটির অর্ডার দিল। এমন সময় একজন বুড়ো মানুষ একতারা বাজিয়ে ছুটে চলেছেন। তার পেছনে পেছনে একটা মেয়ে হাঁটছে। রবি ডাক দিল, চাচা, গান শুনাবেন?
বুড়োর কোন কথা নেই। তিনি আমাদের পাশে এসে বসলেন। তার পাশে বসল মেয়েটা। তারা বাপ বেটি। দুজনে মিলে গান ধরলেন, ‘মিলন হবে কতদিনে আমার মনের মানুষের সনে’। গানটা শেষ হওয়ার পর আবার বললেন, আপনারা বলেন আর কোন গান শুনতে চান।
আমি বললাম, আপনার ইচ্ছেমত গেয়ে যান।
তারা আরও দুটো গান গাইলেন। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, আরেকটা গাইলেন ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান’। রবি বলল, চাচা, আজ থাক। অন্যদিন আবার শুনব।
সে বুড়োকে পঞ্চাশটি টাকা দিয়ে বিদায় করল। তারপর বলল, চলুন যাই।
আমি বললাম, কোথায় যাব।
সে বলল, খাবারটা নিয়ে একেবারে হোটেলে।
আমি অমত করলাম না।
রাতের খাবারটা সকাল সকাল খেয়ে নিয়েছিলাম। শরীরে ক্লান্তি ভর করছিল। শুয়ে পড়লে বাঁচি। পরের দিন আমাদের চলে যেতে হবে। পথের ভীতিকর অবস্থার কথা মনে পড়তেই শরীর শিউরে উঠল। উপায় নেই তারপরেও যেতে হবে।
খুব সকালে ঘুম ভাঙল। শরীরে কেন জানি কোন রকম শক্তি পাচ্ছি না। পেটে প্রচণ্ড ব্যথা। এক ঘণ্টার মধ্যে তিনবার টয়লেটে যেতে হল। বুঝতে বাকি নেই আমি পেটে পীড়া বাধিয়ে ফেলেছি। আমি এমনভাবে শঙ্কিত হয়ে পড়লাম এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেব কিভাবে। রবি বলল, তাড়াতাড়ি বেশি করে স্যালাইন খান।
শুক্তি ব্যাগ থেকে দুটো ওর-স্যালাইন বার করে দিল। আমি অল্প সময়ের মধ্যে দুটি স্যালাইনই খেয়ে ফেললাম। কিন্তু আমার টয়লেটে যাওয়া বন্ধ হল না। রবি বলল, পেট খালি রাখা যাবে না। চলুন, নাস্তা করে আসি।
আমি কোন কিছুতে না করি না। তাদের সঙ্গে গিয়ে আমাকে নাস্তা করতে হল। আসার সময় ফ্ল্যাজিল ট্যাবলেট কিনে নিলাম। একসঙ্গে দুটো ট্যাবলেট গলা দিয়ে চালান করে দিলাম।
আগের রাতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম খুব সকাল সকাল বেরুব। শুক্তির এক আত্মীয় পটুয়াখালিতে দুপুরে আমাদের খাওয়াবেন। ওই আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করা তাদের জন্য বড় জরুরি ছিল। কিন্তু আমার এমন দশা হয়ে গেল ইচ্ছা করলেও আমরা সহসা বেরুতে পারছিলাম না।
সকাল আটটা বেজে গেছে। পেটের ব্যথা কিছুটা কমেছে। আমরা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গাড়িতে চড়তে গিয়ে দেখি উপস্থিত গাড়ির টিকেট নেই। তারপরের গাড়ি বেলা এগারটায়। ওটাতেও প্রায় শেষ। টিকেট কাউন্টারে অনুনয় করে বললাম, চারটি টিকেটের ব্যবস্থা করা যায় কিনা।
বাইর থেকে একজন দালাল বলল, একেবারে পেছনে চারটি সিট আছে। ভাড়া দেড় শ’ করে দিতে হবে। দেরি করলে এগুলোও হারাবেন।
না, আমাদের দেরি করা চলবে না। বেলা তিনটায় যদি লঞ্চ ধরতে হয় এর কোন বিকল্প নেই। আমি কোন রকম বিলম্ব না করে চারটে টিকেট কিনে ফেললাম। তারপর দুই ঘণ্টা একটা গাছের নিচে বসে রইলাম। রবি একটা ডাব কিনে এনে দিল যদি তার কল্যাণে আমি সুস্থ হই। ডাব খেয়ে কিছুক্ষণ বাদে আমি আবার হোটেলে ছুটলাম। ম্যানেজারকে বললাম, আমার টয়লেটে যাওয়া দরকার।
তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে দিলেন। ব্যথা কিছুটা কমেছে বটে, কিন্তু একেবারে নিস্তার পেলাম না। এগারটা বাজতে আর বেশি বাকি নেই। আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। যতগুলো মানুষ বসে আছে তার দ্বিগুণ মানুষ দাঁড়িয়ে। ছাদে তো আছেই। ওসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমি নিজেকে নিয়ে চিন্তায় অস্থির। রবিবে বললাম, পথে যদি কোন অঘটন ঘটে তখন উপায়?
রবি বলল, পথেরটা পথে দেখা যাবে। এখন মন থেকে ওসব ঝেড়ে ফেলুন। গতকাল চিংড়ি মাছটা খাওয়া আপনার ঠিক হয়নি। অভক্তি রেখে খাবার খেলে এরকম হয়।
কাঁটায় কাঁটায় এগারটায় বাস ছেড়ে দিল। পথে আমার তেমন কোন অসুবিধা হয়নি। আড়াইটা বাজে আমরা পটুয়াখালি বাস টার্মিনালে গিয়ে নামলাম। নেমে দেখি শুক্তির আত্মীয়া ওখানে দাঁড়িয়ে। তিনি আমাদের খাওয়াতে নিয়ে যাবেন। রবি বলল, সেটা তখন সম্ভব লঞ্চ যদি দেরিতে ছাড়ে। তিনটা বাজে লঞ্চ ছাড়ার কথা। সুতরাং সময় বেশি নেই। এদিক সেদিক হলেই লঞ্চ হারাব।
আমরা একটা অটো রিকশায় উঠে বসলাম। সঙ্গে শুক্তির আত্মীয়াও। আমাদের সময় নেই দেখে তিনি মুখ ভার করে আছেন। তার কথা হল আমরা ইচ্ছে করলে কি আরেকটু আগে আসতে পারতাম না? সেটা তাকে কি করে বুঝাই। ঘাটে গিয়ে যখন পৌঁছাই লঞ্চ ছাড়ে ছাড়ে অবস্থা। আরেকটু এদিক সেদিক হলে লঞ্চের দেখা পেতাম না। তাড়াতাড়ি আমরা লঞ্চে গিয়ে বসলাম। রবি বলল, ভাই, আর চিন্তা নেই। ধরে নিন আমরা এখন ঢাকায়।
আমি বললাম, এত আশ্বস্ত হওয়ার কোন কারণ নেই। গতকাল চাঁদপুরে একটা লঞ্চ ডুবে গেছে।
রবি বলল, ওরকম যদি হয় একা তো মরব না, সকলে একসঙ্গে মরব।
শুক্তি বলল, ওসব অলক্ষুণে কথা বলবে না।
আমি মনে মনে বললাম, তাই তো! আমাদের জন্য অনেকে তো পথ চেয়ে বসে আছে। আমরা খামোকা মরতে যাব কেন?

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন SOPON — ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১২ @ ৬:০৭ অপরাহ্ন

      BUT LOVE KUAKATA FOR SUN.THANKS

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন warsi — ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০১২ @ ১:৫৭ অপরাহ্ন

      Nice experience, I am interested to go there. So I read it, I think, it will be needful for me. thank u

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন mehedi — ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১২ @ ৩:০৯ পূর্বাহ্ন

      আমার অভিজ্ঞতাও অনেকটা এরকম. শুধু আপনার সাথে রবি এবং তার পরিবার ছিল আর আমরা ২জন বন্ধু ছিলাম. আপনার লেখাটা খুব ভাল হয়েছে। ধন্যবাদ..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাসুদুজ্জামান — ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১২ @ ৭:৩৭ অপরাহ্ন

      ভাই স্ত্রীকে এ অবস্থায় রেখে আপনার আনন্দভ্রমণে যাওয়া একদম ঠিক হয়নি। আমরা রুদ্ধশ্বাসে তাঁর সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য লেখাটি পড়েছি। সে সংবাদটিও শেষ পর্যন্ত পেলাম না। একজন পিতা ও স্বামী হিসেবে নিজেকে খুব ছোট লাগছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nurul Anwar — ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১২ @ ৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

      মাসুদুজ্জামান ভাইকে অভিনন্দন লেখাটি পড়ার জন্য। আপনি নিশ্চয় লেখাতে পড়েছেন আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার মত অবস্থা আমার ছিল না। তাছাড়া কুয়াকাটা যাওয়ার পথঘাট তেমন ভাল নয় আমি আগে থেকে অবগত ছিলাম।
      আমি বাংলাদেশের আটটি পর্যটন কেন্দ্র নিয়ে লিখেছি। বর্তমান লেখাটি লিখেছি একেবারে শেষে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম আটটি জায়গা সম্পর্কে লিখে একটা বই করে ফেলব। ফলে সময়ের অভাবে বউ-বাচ্চাকে নিয়ে সময় করে কুয়াকাটা যাব সেটা একেবারে সম্ভব ছিল না, উপায়ও ছিল না। ‌‌হক্কল জাগা পুরি খাইলাম’ এই শিরোনামে খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি থেকে একটি ভ্রমণ কাহিনির বই বেরিয়েছে। এই বইয়ের প্রায় সব লেখাতে আমার বউ-বাচ্চার কথা এসেছে, তারা আমার সঙ্গে ছিল। বইটি সংগ্রহ করলে খুশি হব। ভাল থাকবেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com