অন্তরের নীলাভ আলো দিয়ে মুদ্রিত হোক নবীন ছবিমালা

নূরুল আলম আতিক | ২৯ নভেম্বর ২০০৭ ১১:৪৫ অপরাহ্ন

roopban.jpg
রূপবান; এক সময় দর্শকরা এখানকার ছবিগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন

১.
হ্যাঁচ্চো –
ভাড়ুই পাখি
চোখের আড়ালে।
– ইআউ

চলচ্ছবির ম্যাজিক পূর্বকালে অনেক বেশি কার্যকর ছিল, ইহকালে এই ম্যাজিক অনেকটাই ম্লান হয়ে আসছে এবং পরকালে কী হবে, আল্লা-মালুম। ম্যাজিক আয়নাতেও আছে, তবে সিনেমারটা ‘লার্জার দ্যান লাইফ’। আমাদের অভিজ্ঞতায় ইদানিং সিনেমা আয়নার সমতুল মাত্র। কারণ আমরা বেশিরভাগ মানুষ এখন সিনেমা দেখি টিভিতে, ঘরে বসে কম্পিউটারে, ডিভিডিতে। সিনেমার সেই জৌলুস, স্বপ্নময়তা, মুগ্ধতা, ম্যাজিক সকলি খোয়া যাচ্ছে। একসঙ্গে অনেক মানুষ অন্ধকার হলঘরে ছবি দেখার রিচুয়ালটাও কমে আসছে দিনকে দিন। অন্তত আমাদের দেশে।

ইদানিং ডিজিটাল সিনেমা প্রসঙ্গে ইতিউতি নানা কথা বলতে শোনা যাচ্ছে। সিনেমা ত সিনে-মা ই। ছবি তো মুখেরই ছবি। তবু কেন ডিজিটাল-অ্যানালগ সমাচার? দর্শকরা সিনেমাটা-ই দেখতে চাই, ডিজিটাল-অ্যানালগ বুঝতে চাই না। প্রতিদিন নতুন নতুনতর সিনেমা দেখতে চাই। এই সিনেমা কীভাবে আমরা পাবো, কার কাছ থেকে পাবো? আসুন পাঠক আমরা এইসব প্রশ্নের উত্তরমালা খুঁজে বের ক’রে নিজেদের সিনেমা নিজেরাই দেখি।

২.
তরমুজ খেতে
চোর আর শেয়ালে
ঠোকাঠুকি।
– তাইগি

দিন কতক আগে ঢাকার জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, গ্যেটে ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে দিনব্যাপী ডিজিটাল মুভির একটি আয়োজন করেছিল ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ। তাদের এই আয়োজনে শামিল হয়েছিল প্রায় শ’দুয়েক চলচ্চিত্রপ্রেমী। এই প্রোগ্রামে ছিল দেশে তৈরী ৫টি ডিজিটাল মুভির নমুনা ও নতুন ছবির সম্ভাবনা নিয়ে নির্মাতা ও দর্শকদের আলোচনা।
next-gen-digital-movie-came.jpg
নেক্সট জেনারেশন ডিজিটাল মুভি ক্যামেরা; ডিজিটাল মুভিমেকিং দিনকে দিন সহজ পথে এগিয়ে যাচ্ছে

অনুষ্ঠানের একটি উদ্দেশ্য ছিল, সেটা হল – বাংলাদেশের দর্শক ও নির্মাতারা আদৌ ডিজিটাল ফর্মাটে সিনেমার কথা ভাবছেন কিনা, ভাবলে সেটার চেহারাটা কী, তা জানা এবং প্রচলিত সিনেমা আর টিভি ইন্ডাস্ট্রির বাইরে কী করে ইনডিপেনডেন্ট ছবি নির্মাণ করা যায় নির্মাতা আর দর্শক মিলেমিশে তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়ে তার একটা রাস্তা তালাশ করা।

অপার বিস্ময়ের সাথে আবারো আবিষ্কার করলাম আমাদের দেশের মানুষের সিনে-মা-প্রেম। অবাক হয়েছি, টেলিভিশনের কথা মাথায় রেখে বানানো প্রোডাকশনগুলো সারাদিন ধরে সিনেমার নামে তারা শুধু ধৈর্য্য সহকারে দেখলেনই না, একেকটি প্রদর্শনী শেষে প্রশ্ন-উত্তর পর্বে অংশ নিলেন এবং সবশেষে মূল মতবিনিময় সভাতেও হাজির থাকলেন। আমার বিশ্বাস ওইদিন দর্শকসারিতে বসে ছিলেন বেশকিছু সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্রকার, যারা হয়তো চলচ্চিত্রের বীজ মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, জমিটুকু পেলেই পুঁতে দেবেন সেই বীজ।

কী গভীর মমতায় তারা তাকিয়ে ছিলেন স্টেজে ব’সে থাকা নির্মাতাদের দিকে; যারা ইতোমধ্যে নির্মাণকর্মে শরিক হয়েছেন, দু’একজন আবার বেশ ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু হায়, সম্ভাবনাময় নবীন পথিকদের সামনে কোনো প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাই সেদিন হাজির হলো না। তাদের বিভ্রান্ত মুখের উপর নিজেদের সাফল্যের জল ছুঁড়ে দিয়ে আমরা আবারো তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। অথচ ওইদিনই সম্ভব ছিল নতুন সিনেমার সূত্রপাঠ।

এমনতর কেন ঘটলো? প্রথমত, যারা ওইদিন কথকের ভূমিকায় হাজির ছিলেন তারা আসলে ততটুকু পরিবর্তন চান, যতটুকু তার নিজের প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কেবল কথা কথা কথা। কত কত কথা যে আরো শুনতে হবে ইহজীবনে, অহেতুক কথামালা বারবার ফিরে ফিরে আসে। এই চৌকস বক্তাদের কথার ফুলঝুড়ি ফোটানোর কারণটা অস্পষ্ট থাকেনি, সেটা হল দাদাগিরি। নিজেদের আরো একটু গুছিয়ে নিতে নতুনদের ব্যবহার করবার একটা নিরবচ্ছিন্ন ফ্যাক্টরি চালু রাখা। তৃতীয়ত সাফল্যের আস্ফালন – ওই ব্যাটা অফ যা! কারণ, তুই নেই, তাই আমি আছি। হাঃ হাঃ, কী হাস্যকর এই মোড়লপনা। নতুন সিনেমার আকাক্সক্ষায় হাজির হওয়া মানুষের মুখে ছাই গুঁজে দেবার এই রীতি বন্ধ হবে কবে? ফিরে যাই মূল প্রসঙ্গে। ডিজিটাল ছবির দরকারটা কেন হচ্ছে?

কারণ, আমাদের সিনেমার ক্ষুধা। পাঠক এতোক্ষণে হয়ত লক্ষ করেছেন আমি একবারের জন্যও ‘ফিল্ম’ শব্দটি উচ্চারণ করিনি। মুভি, চলচ্চিত্র, সিনেমা এইসব প্রতিশব্দ ব্যবহারের কারণ – আমরা আর একটি মাত্র ফর্মাটে বন্দি থাকতে চাই না। সিনেমা হবে থার্টি ফাইভ মি. মি. ফিল্ম ফর্মাটে, ১৬ মি. মি.-এ এই সনাতন ধারণার বাইরে না গেলে নতুন সিনেমার মুক্তি নেই। এইটা জ্ঞান করেই এই শব্দ-প্রতিশব্দের বেড়াজাল এড়িয়ে যেতে চাই।

বাংলাদেশের রেগুলার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে দুই প্রজন্মের অনুপস্থিতিই প্রথমত দেশাল সিনেমা-ইন্ডাস্ট্রির বেহাল অবস্থার মূল কারণ এবং এদেশে এই মুহূর্তে সিনেমার সম্ভাবনা হলো ভিডিও ফর্মাটের নির্মাতারা। যারা স্বল্পব্যয়ে টিভি নাটক নির্মাণের নামে তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ-আকাঙ্ক্ষাকে প্রশমিত করছেন। বলছিলাম, আমাদের মতো আনাড়ি তরুণতর নির্মাতাদের কথা, যারা সিনেমা ভাবি, সিনেমা দেখি আর করি টিভি-নাটক কিংবা করে খাই টিভিঅ্যাড। হাঃ হাঃ হাঃ।

আমরাও নির্মাতা এই দেশে!…এখানে যে দুই কলম লিখতে জানে সেই লিখক, যে সা-সা গা-গা করতে পারে সেই গাতক, যে দুইহাত উঁচিয়ে ফাঁকাবুলির সাথে টাকার ঝুলি ছুঁড়তে পারে সে দেশনেতা। হায় স্বাধীনতা! আমাদের সকলের এই অপার স্বাধীনতার কালে সিনেমার দর্শকও সুযোগ বুঝে তার ভাগের স্বাধীনতাটুকু খুঁজে নিয়েছেন। উনি এখন নিজ ঘরেই ছবি দেখেন, টিভি চ্যানেলের সুবাদে বিজ্ঞাপন বিরতির সুযোগে একটু একটু সিনেমা-ছবি দেখা। মাংশের মধ্যে আলু না আলুর মধ্যে মাংশের টুকরা তা এই দর্শকও জানেন এবং পরিতৃপ্তির সাথে তা-ই খান; কারণ, ‘না খেলে নাই কোনো সুখ…।’

আমার বছর বারো ফিল্ম সোসাইটি অ্যাকটিভিজম আর অর্ধযুগের ব্যর্থ নির্মাণ-চেষ্টা থেকে বলছি, এই মিডিয়ামে আসা মানুষগুলোর অধিকাংশই মূর্খ, ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াহীন মূক-বধির; শারীরিকভাবে মূক-বধির মানুষদের কাছে ক্ষমা চাই এই প্রতিতুলনার জন্য। হ্যাঁ, জানি নিজেদের ব্যক্ত করবার আকাক্সক্ষায় আপনারা প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। এদিকে এঁরা, অডিওভিজুয়াল করিয়েরা ভাবেন, দর্শকই কিচ্ছু বোঝে না; আমি যা করবো, দর্শক তাই দেখবে আর হাত্তালি দিবে। এই দাবিটাও যেন তাদের বার্থ-রাইট।

কিন্তু হায়, ওই তথাকথিত দর্শকও আসলে একই রকম লাউ-কুমড়া। তাই কোনো রা’ না ক’রে ঘরে বসে রিমোটের বাটন চেপে চক চকে হিন্দি ছবির নায়িকার মিষ্টিমধুর নাচ দেখেন। কিংবা ডিভিডি প্লেয়ার, কম্পিউটার খুলে ইউরোপ-আমেরিকার পাইরেটেড ডিভিডিতে চলচ্চিত্রের স্বাদ নেন। এদিকে এই সুযোগে দেশে-বিদেশে গণ-স্বীকৃতি বা অ্যাওয়ার্ড-অনুদান আদায়কারী নির্মাতার দঙ্গল যা-তা ক’রে এই দর্শকের কাঁধে ভর করেই স্থবির ঢ্যালা মাটির মতো পড়ে থেকে ক’রে খাচ্ছেন মাত্র। হ্যাঁ, আমিও জানি, একটা ভালো ছবি তৈরি হওয়া বা করা এতোটা সহজ নয়। এতোটা সহজ হলে পাঠক, আমাকে এই লেখা না লিখে ছবি নির্মাণে সময়টা ব্যয় করতে দেখতেন।
fass-alexande.jpg
বার্লিন আলেকজান্ডার প্লাত্জ,ফাজবাইন্ডারের টিভিসিরিজ

ইদানিং টিভি-ই এদেশের সিনেমার মূল প্যাট্রন। দেশের মূলধারার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির বিপন্নতার সুযোগে টিভি দেশোদ্ধারের মতো সিনে-মা-উদ্ধার করে যাচ্ছে। এ অনেকটা মায়ের চেয়ে মাসির দরদের মতো। ওইদিনের সেমিনারে উপস্থিত প্রধান বক্তাকে টিভি-চ্যানেলের ক্যামেরার উপস্থিতি দেখেই জার্মান চলচ্চিত্রকার ফাসবাইন্ডার-এর বার্লিন আলেকজান্ডার প্লাত্জ-এর কথা উচ্চারণ করতে শুনি। এই উল্লেখ তিনি হাজির করেন, জার্মান টিভি ফাসবাইন্ডারের মতো ডিরেক্টরকে দিয়ে কত ভালো সিরিয়াল বানিয়েছে সেটি জানান দেয়ার জন্য। আর সেই সাথে টিভি ক্যামেরার সামনে এটিও স্পষ্ট ক’রে দেয়া যে, ‘হে মহান টিভি, আমি তো তোমার কথাই বলছি।’ হ্যাঁ, পোলিশ টিভি ডেকালগ তৈরি করিয়েছিল কিস্লওস্কিকে দিয়ে। এইচবিও, বিবিসি-চ্যানেল ফোর অনেক ছবি নির্মাণ করে থাকে। এদেশেও টেলিভিশন প্রোডিউসড ছবির কথা আমাদের জানা। প্রশ্নটা হলো অ্যাটিচ্যুড। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গে হ্যাঁ/না বিবেচ্য নয়। এদেশে টিভি কোম্পানি সিনেমার প্রোমোটার ততটুকু, যতটুকু তাদের রেগুলার বাণিজ্যের বাইরে আরো কিছু উপরি কামাই। এতসব বিষোদগারের পরও আমি টিভির পক্ষপাতিত্ব করি, তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাজির আছি। কিন্তু অশ্লীলভাবে টিভি ক্যামেরা দেখেই সিনেমা প্রসঙ্গে টিভির দান-অনুদানের গুণগান গাইতে রাজি নই। টিভি কখনোই সিনেমাকে উদ্ধার করেনি।
kieslowskis-decalogue.jpg
ডেকালগকিসলওস্কির ১০টি টেলিফিল্ম

মুখ ঘুরিয়ে আমি বরং বলবো, ইদানিং সিনেমার (মূলধারা এবং অন্য যা কিছু) চেয়ে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোই এই দেশে অনেক বড় সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৃতাত্ত্বিক ভূমিকা পালন করে আসছে। এটিও নতুনতর গবেষণার বিষয়। উল্টো এদেশে গত দুই যুগে সিনেমা যত নিগেটিভ ভূমিকা রেখেছে তাও আমাদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনেকে বলবেন, দেশের অলটারনেটিভ ছবি আর বিদেশের অ্যাওয়ার্ড। আমি এক কথায় সবকিছু নস্যাৎ করার এক্তিয়ার রাখি না, কিন্তু ইতিহাস একদিন ঠিকই নির্দেশ করবে।

অলটারনেটিভ ছবি যতটা আমাদের দর্শকদের মূলস্রোত থেকে দূরবর্তী করেছে, বিদেশে প্রশংসিত বা বিদেশের পয়সায় নির্মিত ছবি আমাদের নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিচয়কে বিদেশীদের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে দিয়েছে তারও চেয়ে বেশি। এটা এমন একটা গুলামগিরি যা দেশের অশ্লীল ছবির জোয়ারের চেয়েও বেশি প্রাণঘাতি। এটার কুফল গিয়ে বর্তাবে আমার সন্তান সাধুর ওপর। তাই আমি এ বিষয়ে এখনি সোচ্চার, নিজেকে বিপন্ন হতে দেখেও। বিদেশনির্ভর ও ফেস্টিভ্যাল ভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ-প্রক্রিয়া ছোট ছোট দেশের বড়-ছোট নির্মাতাদের সম্ভাবনাকে একটা চোরাস্রোতের মধ্যে টেনে এনেছে হরহামেশাই। অসংখ্য উদাহরণ আছে পৃথিবীব্যাপী।

এতোসব বাজে কথা বলার মূল কারণ আর কিছু না, দেশের দর্শককূল। তাদের ভেড়া বানানোর দিন শেষ হোক। বরং তারাই হয়ে উঠুক লক্ষী আর স্বরস্বতীর স্মারক। এদেশের মাটিতে এক সময় যে পরিমাণ ছবি নির্মাণ হয়েছে, এই দেশেরই দর্শকের পয়সায়, সেটা পৃথিবীর দশ-বারোটির বেশি দেশে হতো না। তবে আজ আমাদের এই হাহাকারের পেছনে কারণটা কী? সেটাই আমাদের বিবেচ্য।

একটু খোলাসা করে বলি। সিনেমা তা সে অ্যানালগই হোক আর ডিজিটালই হোক। শুধু আমার কেন, বোধ করি পাঠক আপনারও তাতে কোনো বিরোধ নাই। আমি বরং বলব নির্মাতার কথা, তার ক্ষুধার কথা। একজন নির্মাতা খুব শখ করে থার্টিফাইভ-ফিল্ম ফর্মাট এইসব ছেড়ে ডিজিটাল ছবির কথা ভাবে? আমি অন্তত ভাবিনি। এখনো ভাবি না। কিন্তু আমি কবে কীভাবে প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা পাবো ছবি নির্মাণের জন্য সেজন্য আমি বসে থাকবো? সিমেনার ক্ষুধা-ই আমাকে এমনতর ভাবনায় টেনে এনেছে, এবং আরো অনেককেই। আচ্ছা ধরুন, আপনি ক্ষুধার্ত। খাবার খেতে পয়সা লাগে। খাবার ঘর আছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, দেশি-বিদেশী মেনুতে ঠাসা; আবার রাস্তার পাশের গলিতে গাবতলি টাইপের হোটেল। আপনার পকেটে আছে বিশ-পঞ্চাশ টাকা আপনি কি শেরাটন সোনারগাঁ ছাড়া খাবো না ব’লে গোঁ ধরে বসে থাকবেন? না পেটের তাড়ানায় ওই গলিঘুঁপচিতেই বসে যাবেন? আসলে ওঁরা নিজেরা খাবেন শেরাটনে-সোনারগাঁতে আর আপনাকে তার দোরগোড়ায় অভুক্ত রাখতে চাইবেন। এইজন্য আমি নতুন নির্মাতাদের এই সওয়াল-জওয়াবের মধ্যে টেনে আনতে চাচ্ছিলাম ওই সেমিনারে। কিন্তু ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া…।’

নতুন নির্মাতা, এঁদের চিনে রাখুন, আর অতি অবশ্যই আমাকেও। কারণ, একই সুরে কথা আমি ইঁহাদেরকেও বলিতে শুনিয়াছি। হ্যাঁ।

digital-movie-camera.jpg
সনি এইচডিভি ক্যামেরার ছবি; ডিজিটাল মুভি – স্পষ্ট করে বললে ভিডিও। সেটা ডিভি হোক, ডিভিক্যাম হোক আর এইচডিভি ফর্মাট…

নতুন প্রজন্ম যারা টিভি-নাটক, বিজ্ঞাপন বানিয়ে যাচ্ছেন, টিভি-চ্যানেলে চাকুরি করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেমা নিয়ে পড়ছেন, কিংবা এসবের কিছুই না, শুধু সিনেমার পোকা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে প্রবাস থেকে ফিরে এসেছেন নিজদেশে সিনেমায় কিছু করবেন বলে…এইসব নতুন প্রাণ সত্যিসত্যিই স্বল্পব্যয়ের আধুনিক টেকনোলজির সহায়তা নিয়ে আমাদের ছবির চেহারাটাকে পাল্টে দিতে পারেন। এবিষয়ে প্রয়োজন বিস্তারিত কথা চালাচালি আর একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ। যেখানে নির্মাণ টেকনজির সাথে সাথে নির্মাণব্যয়, দর্শক ও প্রজেকশন হল, প্রোডিওসার-ডিস্ট্রিবিউটর ও নির্মাতার নতুনতর চিন্তার সমন্বয়…ইত্যাকার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে একটি পথরেখা নির্ণয়। ওই সেমিনারে আমরা এইসব আলাপচারিতার রাস্তায় হাঁটতে পারিনি, স্থূল ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে।

৩.
জোনাকিরা
ঢুকছে আমার ঘরে;
না, ওদের যেন তাড়িয়ো না।
– ইসা

sirajdulla.jpg
নবাব সিরাজউদ্দৌলা; এক সময় যে পরিমাণ ছবি হয়েছে দর্শকের পয়সায়, সেটা বেশি দেশে হতো না

বাংলাদেশের একটি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আছে যার নাম এফডিসি (ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন)। সিনেমার ম্যাজিশিয়ানদের দেশাল ফ্যাক্টরি। এক সময় এই দেশের দর্শকরা এখানকার নির্মিত ছবিগুলো (আসিয়া, সুতরাং, নবাব সিরাজুদ্দৌলা, রংবাজ, রূপবান, বেহুলা, অনন্তপ্রেম, সুজনসখী ইত্যাদি) মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন, সিনে-ম্যাজিকের মোহে আচ্ছন্ন হয়েছেন। আবার নিজের দেশ, মানুষ ও তার সংস্কৃতির সাম্প্রতিক দোলা অনুভব করেছেন (জাগো হুয়া সাবেরা, কখনো আসেনি, নদী ও নারী, কাঁচের দেয়াল, জীবন থেকে নেয়া, পালঙ্ক, তিতাস একটি নদীর নাম, ধীরে বহে মেঘনা, মেঘের অনেক রং, সূর্যদীঘল বাড়ি ইত্যাদি) নানা ছবিতে। বলছিলাম এর পরবর্তী দৃশ্যের কথা। ইন্ডাস্ট্রিতে শুভবুদ্ধি টিকতে না পারার কথা। আর সেই সব বুদ্ধিমানদের কথা যাঁরা ইন্ডাস্ট্রির দিকে ফিরেও তাকাননি, তাদের নিজস্ব গরিমায়। এক মহান সাংস্কৃতিক দায় কাঁধে নিয়ে বাইরেই থেকে গেলেন; ইতিউতি দু’চারটি নমুনা ছবি (আগামী, চাকা, মাটির ময়না) নিয়ে, যার সাথে দেশের মূলস্রোতের কোনোই সম্পর্ক থাকলো না। আমি নিজেকেও এই ভিন্নস্রোতে ভেসে আসা খড়কুঁটো ছাড়া বিশেষ কিছুই ভাবি না। কিন্তু আজ ভাবি, এটা ছিল কালস্রোত।

দুই প্রজন্মের ওই ইন্ডাস্ট্রিতে অনুপস্থিতির সুযোগে পুরো ফ্যাক্টরিটাই একটা সংবেদনহীন, দেশকাল-ভাবনাবিহীন, দুই নম্বরীর আখড়ায় পরিণত হলো। এদিকে এখানেও তৈরি হল না সত্যিকারের প্যারালাল কোনো স্ট্রিম। সবকিছু চড়ায় এসে ঠেকেছে। কেউ কেউ এই নতুনতর ডিজিটাল চলচ্চিত্রের কথামালাকেও সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটা চক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন। হ্যাঁ, অবকাশ অবশ্যই আছে। কে কেমনভাবে এই ভাবনাকে ব্যবহার করবেন, তার ব্যবহারবিধির ওপর নির্ভর করবে এর গুণাগুণ। এটা সময়ের দাবি। দাবিটা এলো কোত্থেকে?
matir-moyna.jpg
এর বাইরে আছে দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি আর বিদেশীদের দৃষ্টি-আকর্ষণী বিষয়-আশয়ের খোঁজ

প্রথমত টাকা-পয়সার মামলা। আমাদের সিনেমার বুড়িয়ে যাওয়া ম্যাজিশিয়ানরা হয় মৃত নয় অবসরভোগী। আর নতুন ট্যান্ডলরা মূলত অশিক্ষিত, নোংরা। সিনেসাসংলগ্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ঠাসা নিম্নরুচির মানুষে। একটা সুন্দর মানবিক সম্পর্কজাত যৌনতাকে তারা নিতে পারেন না অথচ অসুস্থ যৌনাচার আর নৃশংস ভায়োলেন্সকে দিব্বি চাউড় করে দিলেন পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে। যেকোনো উপায়ে টাকা কামাতে হবে, নতুবা কালো টাকার পরিমাণ কমাতে এই সিনে-ইন্ডাস্ট্রিতে চালান করে দিতে হবে। তাই আজ যিনি ছবির কথা ভাবছেন তার পক্ষে এফডিসিতে গিয়ে ওই পরিবেশে থার্ড কিংবা ফোর্থ অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়ার চাইতে নিজেই ভিডিওতে নির্মাণ-যজ্ঞে হাজির হওয়াটাই বরং স্বাস্থ্যকর। আর অলটারনেটিভওয়ালাদের কথা তার আগেই বাদ দেয়া প্রয়োজন, কারণ তাঁরা অতি উচ্চ-শিক্ষিত। সিনেমার অধ্যাপক একেকজন। তারা কেবল মুক্তিযুদ্ধ আর দারিদ্রের গল্পই বলছেন। আহা, যদি একটি পরিচ্ছন্ন গল্প বলার ক্ষমতাটুকুও তাদের থাকতো। এর বাইরে আছে দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি আর বিদেশীদের দৃষ্টি-আকর্ষণী বিষয়-আশয়ের খোঁজ। এই ধরনের অক্ষম খোঁজা-খুঁজির খপ্পরে সাধু-পুরুষ লালন ফকিরও রেহাই পাননি। কী পরিমাণ স্পর্ধা! কতটা ভালো হলো, কতোটা আলো ছড়ালো আমাদের সিনেমা? আর দৈনিক কাগজগুলো ফলাও ক’রে ভুয়া কিংবা বানোয়াট কতকগুলো ব্যক্তিগত একক সাফল্যকে সার্বিক জনগোষ্ঠীর কাঁধে চাপিয়ে দেবার দায়টুকু নিয়ে বসে থাকলো। এটিও এক্ষুনি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

সিনে-বাণিজ্যের আকালের কারণ হয়ত মিডিয়াবুম, টিভি-ভিসিপি, হাল আমলের ডিভিডি, ইন্টারনেট, মুভিক্যামেরাসহ সেলফোন ইত্যাকার নানান নতুন অনুষঙ্গ। তারচেয়েও বেশি যেটা, তা হল আমাদের এদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পালাবদল। যে সমাজকাঠামোয় আমরা আর সামাজিক ঐক্য স্থাপনের জন্য একত্রিত হই না। ঘরে ঘরে আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি আমাদের বিচ্ছিন্নতার এই মিষ্টি সুযোগটি করে দিয়েছে। যদিও সকলে জানি, একত্রে অন্ধকার ঘরে বড় পর্দায় ‘লার্জার দ্যান লাইফ’-এর অভিজ্ঞতার সাথে এর কোনোটাই তুলনীয় নয়। কিন্তু তবু কেন হলে যাই না আমরা? হলের পরিবেশ, রাস্তার যানজট, বাইরে নানা ধরনের দুর্বৃত্তের হাতে পড়বার আশঙ্কা এবং সর্বোপরি রুচিশীল ছবির অভাবের কথা বারবার উচ্চারিত। সিনেমার ম্যাজিকের কথা কিন্তু আমরা সকলেই স্বীকার করি। তবু আমাদের সিনেমা হয় না। সিনেমা দেখা হয় না। কারণ আমরা সবকিছুই অনায়াসে পেতে চাই, পেতে অভ্যস্তও।

তাহলে কী উপায়? একসময় রসিকতা করে লোকেরা বলতেন, দেশে কাকের সংখ্যা বেশি না কবি’র। আজ হয়ত বলবেন সিনেমাকরিয়েদের কথা। ছবি আমাদের তৈরি করা হোক বা না হোক, ছবি বানাতে চান এধরনের মানুষের সংখ্যাও অগুন্তি। এটাই সম্ভাবনা। সমসাময়িক টেকনোলজি এই সম্ভাবনাকেই আরো সম্প্রসারিত করছে প্রতিদিন। যার উদাহরণ হলো ওই মোবাইল ফোনে ভিডিও ক্যামেরা। কম্পিউটারে এডিটিং সফট্ওয়্যার। আমি এখানে মোবাইলছবির কথা বলছি না, বলতে চাই – ছবি বানানোর জন্য একমাত্র উপায় ৩৫মি.মি. কিংবা এফডিসি, মাদ্রাজের প্রসাদল্যাব কিংবা মুম্বাই-ব্যাংককের পোস্ট-প্রোডাকশন হাউজগুলো না। আবার ইউরোপ-আমেরিকার অনুদানে উনাদের মনপছন্দ ছবিও না। ছবি যেকোনো রকম, কোনো একমাত্র মাপকাঠিতে তাকে ছাঁটলে হবে না।

ছবি বানাতে টাকা লাগে জানি। আবার এও জানি, ছবি বানাতে কোটি কোটি টাকা লাগে না, কোটি টাকার ক্যামেরাও লাগে না, ভিডিও ক্যামেরাতেও ভালো ছবি নির্মাণ সম্ভব। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ-এর সোনার বেড়ি, ইয়াসমিন কবির-এর পরবাসী মন, স্বাধীনতা, মাইগ্রান্ট সোল কিংবা তারেক শাহরিয়ার-এর কালিঘর যার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ছবি বানানোর জন্য চাই মস্তিষ্কে প্রয়োজনীয় ঘিলু, তারও বেশি চাই হৃদয়ের আকুতি – সিনেমার জন্য, মানুষের জন্য, দেশের জন্য।

‘নতুন সিনেমা : অগণন কুসুমের দেশে নীল গোলাপ’ এই শিরোনামে পূর্ববর্তী লিখনে (সমকাল, ২১ জুন সংখ্যা) আমি যে সকল অনুষঙ্গ হাজির করেছিলাম এখানে তার পুনরাবৃত্তি করবো না, তবে প্রাসঙ্গিক ভাবেই তার জের টেনে আবারো বলছি – এদেশে নতুন ছবি নির্মাণ করবে এই প্রজন্মের ভিডিওর নির্মাণ কর্মীরা; আর তারা যদি নিজের আখের গোছানোতেই ব্যস্ত থাকেন তো আগামী প্রজন্ম। প্রচলিত ইন্ডাস্ট্রির সাথে কোনো রকম বিরোধের প্রয়োজন পড়বে না তার জন্য। ডিজিটাল স্টিল ক্যামেরা আসবার পর যেভাবে এনালগ ক্যামেরা হাপিস হয়ে যায়নি। কিংবা সিনেমা আসবার কারণে থিয়েটার। অথবা টিভির উপস্থিতিতে মুভি।

এই নন্দনকাননে অগণন কুসুমের মধ্যে আমরা খুঁজে নিতে চাই শুধু নীল গোলাপ; অন্তরের নীলাভ আলো দিয়ে মুদ্রিত ছবিমালা।

৪.
বাচ্চারা, মেরো-ধরো না
পোকাদের,
বাচ্চা হবে।
– ইসা

সিনেমার জন্য এই জাতির ব্যাকুলতাই নতুন সিনেমার সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। দেশে প্রতিবছর অসংখ্য নির্মাতা, নারীপুরুষশিশু-চিত্রী নতুনতর চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হবেন এমনটাই স্বপ্ন দেখি। অনেকেই বলবেন সারা পৃথিবীর সিনেমাই এখন এক দুঃস্বপ্নের পথের পথিক। তবু আমি আশাবাদী। এটা কেবলই আবেগায়িত উচ্চারণ নয়। আমাদের সিনেমার পোকাটা গর্ভবতী হয়েছে সময়ের দ্বারা। সময়টা একটু বিশ্লেষণ করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। হলিউড-এর দাপটে পুরো লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি চুপসে গেছে। কোথায় গেল লাতিন আমেরিকার সিনেমা-নোভো, ইতালিয়ান নিউ-ওয়েভ, ফরাসি নুভেল-ভাগ, কোথায় গেল নিউ জার্মান সিনেমা? এশিয়া আর আফ্রিকার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হিন্দিছবির পীঠস্থান মুলিউডের দখলে। এরপরও আমরা নতুন ছবির সন্ধান পাচ্ছি প্রতিদিন, ইরান থেকে, কোরিয়া, তাইওয়ান, চাদ কিংবা চায়না অথবা মেক্সিকো থেকে। বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকার ছোট ছোট দেশ থেকে।

সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু এই দেশে ডিজিটাল ছবির সম্ভাবনাটা কেন হাজির হলো?

নবীন চলচ্চিত্রকার, আপনি যদি সিনেমার সনাতন ধারণা থেকে একটু সরে এসে সময়ের পাঠ নেন তবেই আপনি সম্ভাবনার হৃদস্পন্দনটুকু টের পাবেন। সিনেমার পুরো সেটাপটাই এখানে পাল্টে ফেলা সম্ভব। বড় বড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আছে, এরকম দেশগুলিতে যেটি এতটা সহজে ঘটা সম্ভব না। কিন্তু এখানে সম্ভব, কারণ বাই ডিফল্ট আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ধ্বসে যাচ্ছে, সিনেমা হলগুলো পাল্টে যাচ্ছে মার্কেটে। দর্শকরা বেশিরভাগ ঘরমুখি কিংবা নিজস্ব রুচির ছবি খুঁজে নিচ্ছেন অন্য উপায়ে। এমতাবস্থায় এদেশের সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবলে যে পথরেখাটা স্পষ্ট হবে তা হলো ডিজিটাল মুভি; স্পষ্ট করে বললে ভিডিও। সেটা ডিভি হোক, ডিভিক্যাম হোক আর এইচডিভি ফর্মাটই হোক। কেন এই ধরনের বিষয়-আশয় সিনেমার কাঁধে চেপে বসছে? ভিডিও তো টিভি মিডিয়ামের বিষয় বলেই জানি। হ্যাঁ, আমরা এখনো তাই জানি। কিন্তু ডিজিটাল মিডিয়াম আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য সম্ভাবনার কোন দুয়ারটা খুলবে শুনি?

প্রথমত, আবারো বলছি, আমাদের রেগুলার ইন্ডাস্ট্রির দুরবস্থা।

দ্বিতীয়ত, এই ফর্মাটেই দেশের নতুনতর সিনে ইন্ডস্ট্রির কর্মীরা হাত পাকাচ্ছেন নতুন চিন্তা নিয়ে, আপাতত টেলিভিশনে কাজ করেই।

তৃতীয়ত, সিনেমা বানানোর জন্য যে টাকাকড়ি লাগে তা এই ক্ষেত্রে অনেক কম বিধায় অর্থদাতার গুলামগিরি করা লাগবে না। অর্থাৎ সহসাই ফর্মুলামুভি না বানালেও চলবে।

চতুর্থত, ভবিষ্যৎ টেকনোলজি। ডিজিটাল মুভিমেকিং দিনকে দিন সহজ পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের অন্যসব অনুষঙ্গের মতো এটিও সহজলভ্য হওয়ায় সিনেমাও বনেদী জমিদারি হাবভাব ছেড়ে গণমানুষের কাতারে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রাখে। এক্সপেরিমেন্টেশনের অপার সম্ভাবনা। জাঁ কঁকতো যেরকমটা আশা করেছিলেন, ছবি তৈরির ব্যাপারটা কাগজ-কলমের মতোই শস্তা হতে যাচ্ছে। অন্তত এই ডিজিটাল ফর্মাটে।

পঞ্চমত, স্বল্পব্যয়ের ডিজিটাল প্রজেকশনের সম্ভাব্যতা। নতুন প্রজন্মের দর্শককূলকে টেনে আনার জন্য তাদের গমনাগমনের জায়গাতেই ছবি প্রদর্শনের ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাফে, সাইবার ক্লাব, জিম, শপিং মল ইত্যাকার নানা জায়গায় ছোট ছোট প্রজেকশন হল।

ষষ্ঠত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হল প্রোডাকশন ও পোস্ট-প্রোডাকশন এক্সেসরিজের প্রাপ্তির জন্য নানান হাঙ্গামার প্রয়োজন নেই আর। ক্যামেরা, কম্পিউটার ও অন্যান্য এক্সেসরিজ আর মহার্ঘ কিছু নয়; এটি মোবাইল ফোনসেটের চেয়ে বা ল্যাপটপ কম্পিউটারের চেয়ে খুব বেশি দূরের নয় আর। আবার ছবির তুলনামূলক ভালো প্রিন্টের জন্য ভিন দেশে দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন নেই।

নবীন পরিচালকের কাছে দর্শক কী চায়?

প্রথমত, আবারো সেই পুরোনো কথাটিই, নতুন সিনেমায় থাকতে হবে অন্তরের নীলাভ আলোয় মুদ্রিত ছবিমালা। ছবি দেশের ও তার মানুষের অন্তরাত্মাকে উন্মোচিত করবে। শিল্পীর নিজস্ব একটি দায় থাকে, সেটি তার নিজের কাছে। এই নিজস্ব দায়টুকু চিহ্নিত করবার ক্ষমতা থাকবে এই নতুন নির্মাতার।

চাই তৃতীয় নয়ন। যার আগে চাই, দুই চোখ মেলে দেখবার মানসিকতা। যেন একচোখা না হই আমরা। চলচ্চিত্রের নতুন নির্মাতাকে ভাষাভঙ্গিতেও নতুনতর মাত্রা যোগ করতে হবে। দর্শকের কাঁধ থেকে সিনেমার পুরনো ভূত নামানোর দায়িত্ব নিতে হবে এই নবীন নির্মাতাকে। ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মানুষকে দেখা যাক আমাদের নতুন সিনেমার সমগ্র অস্তিত্বে। রিপুর তাড়নাকে উস্কে দেবে না, শয়নভঙ্গির মতো সহজ স্বাভাবিক জীবনের রূপায়ন ঘটবে এই সব ছবিমালায়। আগে নিজ দেশ আর তার মানুষের অন্তরস্পর্শ, তারপর হোক দেশান্তরের অভিযান।

৫.
আমার বাড়িতে
ইঁদুরেরা, জোনাকিরা
মেলে মেশে।
– ইসা

ছবি তো ছবিই। আর ছবি তো মুখেরই ছবি; অন্তরের প্রকাশ যেই মুখচোখ, ভেতর-বাহিরের অবাধ চিত্রমেখলা।

লংফিল্মের বদলে শটফিল্ম, কমার্শিয়ালের বদলে আর্ট ফিল্ম, ফিচারফিল্মের বদলে ডকুফিল্ম, থার্টি ফাইভের বদলে টেলিফিল্ম এইসব কুতর্ক দর্শক শুনতে চায় না। সকলের একটাই চাওয়া সেটা সি-নে-মা।

কুতর্কের বিষয় ছেড়ে আমাদের প্রয়োজন অন্যকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজের অপকৃতির হাত থেকে আত্মাকে রেইাই দেয়া আর সম্ভাবনার মাটিতে প্রোথিত করবার মতো বীজটুকু সংরক্ষণ। কিন্তু এমনই হাভাইত্যা জাতি – সামনের বছরের ফসলের বীজটুকুও না খেয়ে বসে থাকি!…এই আশঙ্কাটুকু তবু থেকেই যায়? অতএব এই আশঙ্কামুক্তির জন্য প্রয়োজন ধৈর্য্য আর কমিটমেন্ট।

নতুন ছবির দর্শক কারা হবেন? দর্শকরাই বা কোথায় দেখতে পাবেন এই সব ছবিমালা?

আমি নিশ্চিত আমাদের মা-খালা, মামা-চাচা’রা আজ আর নিয়মিত ছবি দেখেন না সিনেমা হলে গিয়ে। এবয়সী যে দু’চারজন যদিওবা হলে যান তারা যান বিশেষ কোনো উপলক্ষে এই যেমন, হুমায়ূন আহমেদের ছবি বা বিশেষ আওয়াজ তুলেছে এরকম দু’একটি ছবি, যদিও তা দুর্লভ। তাহলে হলে গিয়ে ছবি দেখেন কারা? ছবি দেখেন খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষজন, দেখেন মফস্বলের মাস্তান প্রকৃতির তরুণেরা। আর দেখেন স্কুলকলেজের ছাত্রছাত্রী, তাও বাংলা ছবির করুণ দশা দেখে ইয়ার্কি আর আদিরসের কুৎসিত সংস্করণটুকুর নমুনা চর্মচক্ষে ধারণ করে পরবর্তী কয়েকটি দিন বন্ধুদের আড্ডায় তা বয়ান করার রসদ হিসেবে। যে দুই প্রজন্মের অনুপস্থিতির কথা বলছিলাম তাদের কিংবা তাদের পরবর্তীদের নির্মিত ছবির দর্শক তাহলে কারা হবেন? দর্শক হবেন সেই তরুণ-তরুণী যারা প্রেমের জন্য উপযুক্ত জায়গা পান না তার শহরের কোথাও, সিনেমার জন্য যে তরুণের প্রেম ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, যে তরুণ বিদেশী ছবির পাইরেটেড ডিভিডি কিনে কম্পিউটারের ছোট্ট মনিটরে বসে দেখেন কিন্তু চলচ্চিত্রের রিচুয়ালটুকু মিস করেন, ফার্স্টফুড শপে বা শপিংমলে বন্ধুবান্ধবীর সাথে অহেতুক কথামালা দিয়ে সময় পার করে যেসব তরুণ-তরুণী অর্থনাশের সঙ্গতি রাখেন – যে মূলত অ্যাপলিটিক্যাল কিংবা নন-পলিটিক্যাল। যিনি এখনও ছাত্র এবং অতি অবশ্যই তরুণ, যিনি জীবনের অন্যতর অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এই তরুণ-তরুণীরাই হবেন নতুন ছবির মূল দর্শক। আর হ্যাঁ, বাংলাদেশের সিনেমার পালাবদলের জন্য এদেশের তরুণরা যে মুখিয়ে আছেন তা আর নতুন করে বলবার প্রয়োজন নেই। পাঠক, আপনি নিজেও কি আক্ষেপ করেন না? সিনেমার এই?বেহাল অবস্থা দেখে কি দু’একটা পরামর্শও হাজির করেন না বন্ধু মহলে? তাহলে?

নতুন ছবির দর্শকরাও হবেন নবীন (তবে নবীন দর্শককূল এমনতর দেশজ ছবি দেখতে চায় কিনা তার জরিপ প্রয়োজন, প্রয়োজন আরো নানাবিধ লেখালেখি)। আর তাদের জন্য প্রয়োজন নতুন ধরনের ছোট ছোট ডিজিটাল প্রজেকশন হল নির্মাণ। এইসব হলগুলো হবে ১৫০-২০০ সিটের। আর তার সঙ্গে থাকবে কফি বা পিজা শপ, থাকবে ইন্টারনেট, থাকবে ডিভিডি ও মিউজিক সেন্টার। টিকিটের মূল্য হবে কম। কোথায় হবে এই সব হলগুলো? যেকোনো বড় কিংবা ছোট শহরেই এ ধরনের ছোট্ট হল নির্মাণ করা যেতে পারে। আর আমাদের নবীন নির্মাতারা যদি ধারাবাহিকভাবে ডিজিটাল ছবি নির্মাণের পথে হাজির থাকেন তাহলে এই মিনি-থিয়েটারগুলোতে দেশীয় ছবির কোনো অভাব থাকবে না। ক্রমে এটিই হয়ে উঠতে পারে সমকালীন দেশাল চলচ্চিত্রের মূলধারা। আধুনিক দর্শকের জন্য আধুনিক প্রজেকশন থিয়েটার।

আর কোনো ব্যবসায়ী যদি ফার্স্টফুড শপ, সাইবারক্যাফে, শপিংমল ইত্যাদির সাথে এন্টারটেইনমেন্ট বিজনেস মনে করে এই প্রক্রিয়াটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন আমি নিশ্চিত তার সাথে অন্তত ডজন কয়েক নির্মাতা এক্ষুনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত, তার ও গোত্রের সামষ্টিক প্রয়োজনেই। এখন শুধু প্রয়োজন দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের। এবং যত দ্রুত এটি সিঙ্ক করে, মানে একসাথে ঘটে তত মঙ্গল। কারণ অপচয়ের জন্য আমাদের হাতে অতটা সময় নেই। এখনি মাহেন্দ্রক্ষণ ঘণ্টাধ্বনির।

৬.
নারী –
কী গরম চামড়ায়
ছাওয়া।
– সুতে-জো

সকলি পণ্য একালে। বোতলে পানি বিক্রি করতে দেখেছে আমার বাপ-দাদারা? আমি পানি কিনে খাই। এই পানির জন্য কারবালার যুদ্ধের একটা রূপ আমরা জানি; ভয় হয়, না জানি কবে পানীয় জলের জন্য বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ভালোবাসা বিনোদন সম্পর্ক সকলি পণ্য এখন। দেশপ্রেমও যেখানে পণ্য বিপণনের মাধ্যম সেখানে উল্লিখিত কথামালা কেবলই স্বপ্নের বয়ান হিসেবেই না থেকে যায়! সিনেমার পণ্যায়নে প্রেম, নারী, যৌনতা ও রাজনীতি গরম গরম বিষয়। একে আড়ালে আবডালে রেখে কোন লাভ কি হলো আমাদের? সেই তো বিদেশী টিভি, ডিভিডি এবং সর্বোপরি ভোগবাদী জীবন-যাপন প্রক্রিয়ার মধ্যে ওইসব অনুপান হাজির হলো। লাভের মধ্যে হল ঘোমটার নিচে খেম্টা নাচ। যার ফলশ্রুতিতে আমাদের প্রচল সিনে ইন্ডাস্ট্রি অচল সেক্সের পসরা সাজিয়ে বসলো। এও এক রকমের সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের সজাগ থাকবার দরকার। শুধু চোখের ময়লাটুকু পরিষ্কার করলে চলবে? ‘মনের ময়লা কেবা দূর করে?’

অতএব, সাধু সাবধান।

৭.
ভাবো –
সাধু চলে গেল
চাঁদ ওঠার আগে।
– শিকি

পাঠক, আপনি যদি ওইদিন সেমিনারে হাজির হয়ে থাকেন তো নিজের চোখে দেখেছেন, বাজারচলতি আর সার্বিক সাফল্যের শো ডাউন। চামচা ভক্তরা তার প্রিয় সফল-ব্যক্তির জন্য এটাসেটা করবার, তাদের সিনেমার জন্য এটা-ওটা দিয়ে দেবার আওয়াজ তুলে হাত্তালি নিয়ে চলে গেলেন। ফাজিল-ধান্দাবাজ ইহাঁদেরও চিনে নেবার প্রয়োজন। যারা মূল লক্ষকে বিভ্রান্ত করবার জন্য হঠাৎ কোত্থেকে এসে নাজেল হবেন। আর এদিকে তাদের আস্ফালনের প্রাথমিক উত্তেজনাতে আমরাও মূক-বধির সেজে বসে থাকবো। ভদ্রতার খাতিরে বসে না থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে কবে যে আমরা বলতে শিখবো – ‘না। এভাবে চলবে না।’

প্রিয় পাঠক, মূক-দর্শক থাকবার দিন শেষ হোক আমাদেরও। ‘ছবি বানাতে চাও তো, আসো আমাদের অ্যাসিস্ট করো…’ এই ফাঁদে পা না দিয়ে নিজের বোধবুদ্ধি আর নিকটজনের টেকনোলজির সাহচর্যে শুরু হোক নবীন নির্মাতার নতুন ছবিটা।

অন্যকে দোষারোপের চাইতে বেশি জরুরি প্রত্যেকের জেনে যাওয়া –

প্রথমত, সময় নাই।

দ্বিতীয়ত, এখনই সময়।

তৃতীয়ত, তুমি না থাকলেও ব্যাপারটা ঘটবে, তবু তোমাকেই চাই।

চতুর্থত, পথের শেষ কোথায়? কেউ জানি না, তাই বলে পথ চলা থেমে থাকবে? ‘পথ যদি হারাইয়াও থাকি’, আসুন নতুন-ছবি-নির্মাতা, ফের পায়ে পায়ে রচনা ক’রে নিই নিজস্ব পথটুকু।

দেখা হবে বন্ধু।

[জেন কবিতার অনুবাদের কৃতজ্ঞতা, বীতশোক ভট্টাচার্য’র প্রতি]

ঢাকা ২৪/১১/২০০৭

nurulalamatique@yahoo.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (11) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফাহমিদুল হক — নভেম্বর ৩০, ২০০৭ @ ৮:১৬ পূর্বাহ্ন

      মুগ্ধতাসহ পড়লাম। ভালো লেখা। কবিতা লেখার মতোই আজ অনেকে চলচ্চিত্র করতে চান। সকলে না হোক, কেউ কেউ চলচ্চিত্রকার হবার ক্ষমতা রাখেন। এখন ‘সিঙ্ক’টা হওয়া দরকার। কী-পদ্ধতিতে হবে, এই লেখায় কিছু পরামর্শ এসেছে।

      ডিজিটাল সিনেমা প্রজেকশনের জন্য ছোট হলরুমের পাশাপাশি প্রফেশনাল বৃহৎ থিয়েটারের কথাও ভাবা যায়। যেসব সিনেমা বেশি দর্শক পাবে, সেসব সিনেমা ঐসব প্রফেশনাল প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হতে পারে। 35-এ কনভার্ট করার দরকার হবে না।

      আতিক ভালো নির্মাতাই নন, ভালো লেখকও। তার ভাষা দারুণ। ধন্যবাদ নির্মাতা-লেখককে। আরো লেখা কামনা করি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লিটন কর — নভেম্বর ৩০, ২০০৭ @ ২:১৩ অপরাহ্ন

      অনুপ্রাণিত হলাম, এগিয়ে যাবার সাহস পেলাম…জয় হোক এ পথের।
      ধন্যবাদ লেখককে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শোহেইল মতাহির চৌধুরী — নভেম্বর ৩০, ২০০৭ @ ১০:৩৪ অপরাহ্ন

      ‘তৃতীয়ত: তুমি না থাকলেও ব্যাপারটা ঘটবে, তবু তোমাকেই চাই।’

      আমাদের দেশের চলচ্চিত্র বলে পরিচয় দেয়ার মত কোনো ছবি আমরা পাই কালেভদ্রে। মধ্যবিত্ত দর্শকরা শুধু হলে যাওয়াই ভুললো না এফডিসি-তে কী হয় তার খোঁজখবর রাখতেও ভুলে গেলো। তারা তেজগাঁও পযর্ন্ত না গিয়ে শাহবাগে বসে ছোট-দৈঘের্র স্তুতি শুরু করলো।

      প্রায় দশ বছর মানে এক যুগ পরে এখন আবার সবার হয়তো সিনেমার কথা মনে পড়ছে। এটা আশার কথা। হয়তো সবার এই নড়া-চড়ার মধ্য দিয়ে নতুন হাওয়া বইতে শুরু করবে। বাংলাদেশের সিনেমা-র একটি পুনর্জন্ম হবেই হবে এবার…।

      নূরুল আলম আতিক-কে চমৎকার লেখাটির জন্য শুভেচ্ছা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চয়ন খায়রুল হাবিব — নভেম্বর ৩০, ২০০৭ @ ১১:১৭ অপরাহ্ন

      প্রিয় আতিক, অনেক দিন ধরে দেখা ও শোনার ভিত্তিতে এই লেখাটির প্রতিক্রিয়া জরুরি বলে মনে করি।

      ১.
      আমার আঠার-উনিশ বছরের সময় ঢাকায় দীপ মেহমুদ নামে এক ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছিল। দীপ `জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ’ নামে একটি ফোরাম করেছিল। দীপ আমার ওপর আদুরে ভঙ্গিতে খ্যাপা ছিল। কারণ ওর ফোরামে সদস্য হইনি এ বলে যে এক ঘন্টার ছবি দেখতে তিন ঘন্টা বক্তৃতা শোনবার কোনো দরকার নাই।

      একই সময় আবৃত্তিকর্মী কাম নাট্যকর্মী কাম চলচ্চিত্রকর্মী সোহেলের সাথে আমার ও বন্ধু অপু চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা হয়। একদিন আমি ও অপু আড্ডা মারছি, সোহেল ‘জহির রায়হান…’-এর এক দাওয়াতপত্র হাতে ধরিয়ে দিল। দীপের কথা জিগ্যেশ করতে জানাল, ‘ও দীপ, ওকে তো আমরা ভাগায় দিসি। অপু বেশ সুনির্দিষ্ট ভাবে ঘটনাটির তিরস্কার করে। কোনো এক অজুহাত দেখিয়ে আমরা অন্যখানে চলে যাই। পরে অপু আমাকে বলে, ওদের অনেক রকম প্রক্সি লড়াই আছে। খামাখা।

      সেমিনারের নামে আমরা কি এরকম এক প্রক্সি লড়াই-এর সূত্রপাত এখানে দেখছি? বর্তমান লেখক আতিকের শিক্ষক এবং আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন সৈয়দ জামিল আহমেদকেও এ-ধরনের তিক্ত ‘ভাগায় দিসি’ আচরণের মুখোমুখি হতে শুনেছি।

      ২.
      ক্যান্টনমেন্টে গ্যারিসন প্রেক্ষাগৃহে বিজ্ঞাপন দেয়া আছে ‘লুঙ্গি পরে প্রবেশ নিষেধ’। একটি অনুচ্চারিত ‘প্রবেশ নিষেধ’ যেন ঢাকার তথাকথিত চলচ্চিত্র আন্দোলনের সমস্ত ব্যানারে শোভা পাচ্ছে। আর সাধারণ মানুষের সাধারণ জ্ঞানকে হেয় করে কোনো ধারাই ‘আন্দোলন’-এর ব্যাপ্তি পেতে পারে না। এটিকে তখন কাল্ট বলা যুক্তিসংগত।

      ৩.
      আতিক বাংলাদেশের ছবির জগতে ‘দু-প্রজন্মের’ দূরত্ব উল্লেখ করেছে। আমি এখানে সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই বাংলাদেশের সাহিত্যে কখনো পরম্পরাগত এবং প্রজন্মগত কোনো দূরত্ব তৈরি হয় নাই। অন্তত এমন পরিস্থিতি নয় যে মিডিয়ার লোকদের থেকে ভাষার দিক নির্দেশনা আসতে হবে। সতীর্থ সুমন রহমান সম্প্রতি এর বেশ জোরালো জবাব দিয়েছে। ইইঈ’-র মত শক্তিশালী মিডিয়া সংস্থা সমকালীন ভাষার দিক নির্দেশনা নিতে চলচ্চিত্র পরিচালকদের ডাকে না। ডাকে সাহিত্যিকদের। আমি শুনিনি অ্যাটেনবোরো ভ্রাতৃদয় বা পোলানস্কি বা ডগমে ইশতাহার রচয়িতারা তাদের স্ব স্ব ভাষার ওপর নিবন্ধ লিখেছেন বলে। শুধু নিজেদের ইন্ডাস্ট্রির সাথে নয় তথাকথিত বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র মহলের দূরত্ব তৈরি হয়েছে নিজেদের সাহিত্যের সাথেও। সেলিম আল দিনকে আবিষ্কারের কোনো কীর্তি নেই। বরং এটা দেউলিয়াত্বের নজির।

      ৪.
      সম্প্রতি ব্রিটিশ অভিবাসন আইনে ফ্রান্স, জার্মানির সাথে সঙ্গতি রেখে ইইঈ-র নয়া সদস্য বুলগেরিয়া, রোমানিয়ার নাগরিকদের অবাধ শ্রম বাজারে প্রবেশের ওপর নিশেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বৈষম্যমূলক কি? হতো যদি এ-তিনটি দেশ তাদের নাগরিকদের কর বুলগেরিয়া, রোমানিয়ার অবকাঠামো খাতে না খরচ করত। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ওই দুটি দেশের কমিউনিস্ট পার্টি যথেচ্ছভাবে একে-তাকে এই সনদ সেই সনদ দিয়েছে, যার মান ইইঈ-র সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পোল্যান্ডের, ভারতের ক্ষেত্রে এটা বলা হচ্ছে না। চলচ্চিত্রকর্মীদের ক্ষেত্রেও এটা প্রয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বামপন্থীরা তাদের রাজনীতিকে যেমন সাফল্যের সাথে গনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, একই ঘটনা কি চলচ্চিত্রেও ঘটছে?

      ৬.
      এটা ঠিক নয় যে হলিউডের বাইরে ব্রিটেন, ফ্রান্স তথা পশ্চিম ইউরোপে ইদানিং ভাল ছবি হচ্ছে না, আর ভাল ছবি আসছে ইরান, আফ্রিকার ছোট দেশগুলো থেকে। আমি আর আমার স্ত্রী নীতিগতভাবে সেই এক যুগ আগে থেকে কক্ষনোই টিভির মালিক নই। পুরোপুরিভাবে সপ্তাহান্তে হলে গিয়ে ছবি দেখায় অভ্যস্ত এবং নেশাগ্রস্ত। আমরা অনবরত ব্রিটিশ, ফরাশি, স্প্যানিশ, ডেনিশ, ইটালিয়ান ছবি পাচ্ছি। ঢাকায় বিদেশী সংস্কৃতিকেন্দ্রগুলো এর কিয়দংশও দেখাতে পারছে না নিশ্চিত স্থানীয় মনোভঙ্গির কারণে। আলমোদোভার, হানিফ কুরেশি ঢাকায় কেন পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি পাড়ায় দেখানোও মুশকিল। আর ইরান থেকে ছবি আসছে, এটা কি অত্যুক্তি নয়? বিশাদগ্রস্ত একটা লোক গড়িতে ঘুরে ঘুরে আত্মহত্যার জায়গা খুঁজছে। বোরিং এইসব ছবি একবার দুবার কিছু পুরস্কার পেলে তাতে ওই একটা দুটো ছবি কি প্রবহমান ধারার দাবিদার হতে পারে?

      ৭.
      ম্যানচেস্টারে কয়েক বছর আগে সাইদুল আনাম টুটুলের উপস্থিতিতে ওঁর আধিয়ার ছবিটি দেখেছিলাম। ৩০০ আসনের হলঘরে আমরা ছিলাম ৭ জন দর্শক। বন্ধু অপু এ-নিয়ে শ্বেতাঙ্গ সংগঠকদের বেশ তিরস্কার করেছিল। সংগঠকেরা প্রচারের কার্পণ্য করেনি। আমার স্ত্রী তখন ফ্রান্সে। আমি তখন অপুকে বলি যে ওরা কেউ ওদের স্ত্রীদের কেন সাথে নিয়ে আসেনি? হল ভরানোর মত বিপুল সংখ্যক বাঙালী অবশ্যই ম্যানচেস্টারে রয়েছে।

      টুটুল ভাই পরে বলেছিলেন যে উনি নায়েব চরিত্রে প্রথমে যাকে চেয়েছিলেন তিনি নাকি নির্বাচনে দাঁড়ানোর অজুহাতে, আর নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় নির্বাচনে ভোটাররা নাও পছন্দ করতে পারে এ-কারণ দেখিয়ে অভিনয়ে রাজি হন নি।

      ইদানিং মনিকা আলির ব্রিকলেন ছবিটির শুটিং বাংলাদেশি কমিউনিটির অভিভাবকেরা ‘স্থানীয় কমিউনিটিকে হেয় করা হয়েছে’ অভিযোগে খোদ ব্রিক লেনে আটকে দিয়েছিল। এই হচ্ছে ছবি নিয়ে ঢাকার মধ্যবিত্ত আর বাইরের ডায়াসফরার দৃষ্টিভঙ্গি।

      ৮.
      বিষফোড়ার ভেতর বসে পূজের সংক্রমণ এড়ানো মুশকিল। এজন্য বাইরের চিকিৎসক দরকার। আমি বলছি না, বিদেশী পরামর্শকের কথা। সুমনের মত সমকালীন সাহিত্যিককে চলচ্চিত্র আন্দোলনকারীরা ধার নিতে পারেন।

      চয়ন খায়রুল হাবিব
      লন্ডন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অলৌকিক হাসান — december ৩, ২০০৭ @ ২:২১ পূর্বাহ্ন

      আতিক ভাইয়ের লেখাটা খুব ভালো লাগল। এখন সময় এসেছে সিনেমা বানানোর, সেটা যে ফরম্যাটেরই হোক না কেন। এক্ষেত্রে বেসরকারি টিভি স্টেশনগুলোকে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। ডিজিটাল সিনেমা বানানোর যে প্রসঙ্গ ইদানিং চলছে সেটা আরো প্রসার পাবে যদি প্রদর্শনের উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা থাকে। ভাড়া করা হলে ডিজিটাল সিনেমা উৎসব পালন করতে হলে আখেরে লাভ হবে না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনোয়ার শাহাদাত — december ৩, ২০০৭ @ ৭:৫০ পূর্বাহ্ন

      ভাদ্র মাসের গরমের কোনো এক সন্ধ্যায় দুই বন্ধু সহ শাহবাগের আজিজ মার্কেট থেকে হাঁটতে-হাঁটতে অ্যালিফেন্ট রোড এলাকার (সম্ভবত) কোনো এক অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় নক করলে জানা যায় কাক্সিক্ষত ব্যক্তি নেই, অতএব অনাকাক্সিক্ষত আড্ডা আর হয় না, সেদিন তিনি অর্থাৎ ওই লোক যার খোঁজে যাওয়া তিনি থাকলে হয়তো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে তখনই জানা হতো তার মনোভাব। যা অনেকদিন পরে জানা গেল বিডিআর্টের প্রধান রচনায়। তার লেখা পড়ে মনে হয়েছে তিনি প্রধানত মেধাহীন লোকদেরই দায়ী করেছেন বাংলাদদেশের চলচ্চিত্রের এ হালের (সে যে হালই হোক না কেন!) কারণ হিসেবে।

      আমার অনুরোধ তিনি যেন তার এই বিশ্লেষণকে (অর্থাৎ ‘মেধাহীন-সমাবেশ’ বিরোধী অবস্থান) বার বার বিভিন্ন ফোরামে উপস্থাপন করেন। তাতে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপকার হবে বলে ধারণা করা খুব বেশি হবে না। তার এই ধরনের স্পষ্ট, সৎ ও সাহসী মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গী খুবই কার্যকরী হবে চলচ্চিত্রের মত জটিল শিল্পটির দুর্দশা থেকে মক্ত হতে। তার মতো (নূরুল আলম আতিক) এমন করে কথা হয়তো অনেকেই বলেন কিন্তু চলচ্চিত্রকে (সিনেমা, মুভি, ফিল্ম, মোশন পিকচার) বুঝে বলেন এমনটি খুব সহসা মেলে না। অতএব অনুরোধ, নূরুল আলম আতিক যেন তার কণ্ঠস্বরটি উচ্চকিতই রাখেন। শভ কামনায়।

      আ. শা.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kazi dilruba Akter Lina — december ৮, ২০০৭ @ ৪:৩৮ অপরাহ্ন

      আমাদের চলচ্চিত্র কত অসাধারণ ছিল অথচ আজ তার কী করুণ দশা। কত মন ছুঁয়ে যাওয়া গান…কী সংবেদনশিলতা…। জানি না আবার কবে আমরা দল বেঁধে সিনেমা হলে ছুটে যাব। যেসব সিনেমা আজ হলে চলে তা কতটা বোদ্ধারা বা সংবেদনশীল মানুষ দেখে তা দেখার বা অনুধাবন করার কে আছে। মনে হচ্ছে চলছে খেলা চলুক না যার যা খুশী বলুক না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মৃদুল আহমেদ — মার্চ ১৯, ২০০৮ @ ৭:২৬ অপরাহ্ন

      আমার নিজের কাছে কিন্তু মনে হয়, সামনে যে দিন আসছে, তা অনেক সুন্দর। যে কোনো তরুণেরই সেটা মনে হয়, ভবিষ্যতকে নিয়ে রোমান্টিক চিন্তা কে না করে? কিন্তু এ কথা সত্য, চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবনা করার লোক কিন্তু এদেশে কখনো কমতি পড়ে নি। চলচ্চিত্র নিয়ে অনেকেই ভেবেছে এবং ভালোবেসেই ভেবেছে। কিছু করার চিন্তা করেছে। পার্থক্যটা এখানে, আগে ব্যাপারটা এত বেশি খরচের ছিল যে, ভাবনাটা মাথাতে নেয়াই যেত না! এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্যামেরা এসে যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, সেটি হচ্ছে, খরচের চিন্তাকে নিয়ে ততটা মাথায় না নিয়ে, ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে’ বা ‘পথের কলাগাছ কাঁধে তুলে নিয়ে’ দু-চারটে নাটক কি বিজ্ঞাপন-এ হাতেকলমে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে অনেক তরুণ।

      সবাই শিক্ষা নিতে আসে না, আসে তাড়াতাড়ি নাম আর পয়সা কুড়াতে–এটা যেরকম সত্য, তার পাশাপাশি এটাও সত্য যে, কেউ কেউ কিন্তু কাজ শিখতে, অভিজ্ঞতা নিতে আসে। প্যাকেজ নাটক বানাচ্ছে যারা, এদের মধ্যে কি কোনো পলাতক, জন্ম নিতে না পারা চলচ্চিত্রকার নেই? তাদের ভেতরে কিন্তু ঠিকই স্বপ্ন পোরা আছে যে, একদিন একটা সাঙ্ঘাতিক চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলব! ভবিষ্যতের সেই ‘সাঙ্ঘাতিক’ চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট হয়ত সে প্রতি রাতেই ঘুমোতে যাবার আগে দু-লাইন সংশোধন করে ঘুমোতে যায়! যারা চলচ্চিত্র বানিয়ে নাম বা সাফল্য কুড়োচ্ছেন, তাদের অনেকেই কিন্তু নিয়মিত প্যাকেজ নাটক নির্মাতা ছিলেন এবং এখনো আছেন!

      মানে বলছি, যে বাতাবরণটি তৈরি হয়েছে, তার অনেক সম্ভাবনাময় দিক আছে। সেই সম্ভাবনাগুলো কতটুকু কাজ করবে তা নির্ভর করছে আমাদেরই ওপর!

      আমার এই কথাগুলোকে কি বেশি স্বাপ্নিকতা মনে হচ্ছে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, কথার ফুলঝুরি ছোটানো ঐ ‘বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার’রা যতই সভা ভণ্ডুল করুন না কেন, যে স্বপ্ন দেখছে, সে কিন্তু ঠিকই বেড়ে উঠছে তার নিজের মতো করে! এবং ‘উহাদের বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে!’

      আমাদের মূল সমস্যা বোধহয় একজন সত্যিকার নেতার। যার অমিত মেধার পাশাপাশি একটা প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেবার মতো ব্যক্তিত্ব এবং শিক্ষা আছে। অথবা একটা শক্তিশালী গোষ্ঠী, যার ভূমিকা একজন ব্যক্তির মতোই। নইলে ব্যক্তিরা একলা একলা এগিয়ে যাবেন ঠিকই, কিন্তু একটা শক্তিশালী চলচ্চিত্র প্রজন্ম কিন্তু দানা বেঁধে উঠবে না।

      আর আমার নিজের এত কথার ফুলঝুরি শেষ করি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এই অতি বাস্তব কথাটি দিয়ে, যার প্রমাণ নিজের জীবনেই অনেকবার পেয়েছি, ‘বুদ্ধিমানেরা তর্ক করে, প্রতিভাবানেরা এগিয়ে যায়!’

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রন্টি চৌধুরী — জুলাই ১৩, ২০০৮ @ ৮:০৫ পূর্বাহ্ন

      লেখা অত্যন্ত ভাল লাগল। একেবারেই মনের কথা।

      আমাদের দেশে সিনেমা অবকাঠামো প্রায় ধসে গেছে, এখন নতুন করে আবার গড়ার পালা, আমাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা প্রথাগত সনাতন ধারাই আবার শুরু করব নাকি নতুন ধারায় বিপ্লব ঘটাব। সনাতন ধারা শুরু করার চেয়ে নতুন ধারায় বিপ্লব ঘটানোই সহজ হবে।

      সিনেমা তৈরিতে ৩৫-এর অপরিহার্যতা ভুলবার সময় এসেছে। কিন্তু সমন্বয় দরকার নির্মাতা আর ব্যবসায়ীর মাঝে। কেউ একজনকে এগিয়ে আসতে হবে ডিজিটাল চেইন হল নির্মাণে।

      রন্টি চৌধুরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গোলাম মাওলা — ফেব্রুয়ারি ৪, ২০০৯ @ ৯:১৫ অপরাহ্ন

      লেখা অত্যন্ত ভাল লাগল। একেবারেই আমার মনের কথা।

      – গোলাম মাওলা

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com