সিডনির পথে পথে (৯)

আবু সুফিয়ান | ২১ december ২০১১ ১০:১০ অপরাহ্ন

hb8.jpg
বিয়ের ছবি তোলার সেশন হচ্ছে। ওপর থেকে তোলা ছবি।

সিডনির পথে পথে ১ | সিডনির পথে পথে ২ | সিডনির পথে পথে ৩ | সিডনির পথে পথে ৪ | সিডনির পথে পথে ৫ | সিডনির পথে পথে ৬ | সিডনির পথে পথে ৭ | সিডনির পথে পথে ৮

(গত সংখ্যার পর)

রাস্তা হারানো আমার জন্য নতুন কোনো বিপদ না। দেশে এবং বিদেশে বহুবার এই ঘটনা ঘটেছে। কচু গাছ কাটতে কাটতে মানুষ ডাকাত হয়। পথ হারিয়ে আমি পথ চিনি। তবে আজ খানিক সুবিধাজনক আবস্থায় আছি। কারণ সাবৃনা সাথে নেই। স্ত্রীর কাছে এই ধরনের ‘কেলাসপনা’ স্বামীদের বড় ধরনের অযোগ্যতার প্রমাণ।

মোবাইল ফোনে সময় দেখলাম। বেলা একটার মধ্যে বাসায় ফিরতে হবে। একসাথে খাবো। বাড়ির রাস্তা খুঁজে পাওয়ার জন্য এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় হাতে আছে।

আমি হাঁটা শুরু করলাম।

সিডনির ফুরফুরে উজ্জ্বল আবহাওয়া বড়ই মনোরম। একটা সুখ সুখ ভাব হয়। রাস্তায় গাড়ি যথেষ্ট। কিন্তু পথে হাঁটা লোকজনের সংখ্যা কম। দু-একজন যাও পাই, তারা আমার চেয়েও মহককল। ঠিকানা জিজ্ঞেসা করলে ঠোঁট উল্টানি দেয়। অর্থাৎ চেনে না।

hb7.jpg
সিডনি হারবার ব্রিজের কাছে বাড়িঘর, সাথে লাগোয়া সমুদ্র।

সামনে মোটা মতো এক ভদ্র মহিলা অপেক্ষা করছেন, রাস্তা পার হবেন। বয়স্ক। হাতে বাজারের ব্যাগ। সম্ভবত স্থানীয়। তাকে ঠিকানা দেখিয়ে জিজ্ঞেসা করলাম, এই রাস্তাটা কোথায়? তিনি যে উত্তর দিলেন, সেই ডিরেকশন ফলো করলে দুপুরে আমাকে বাইরে খেতে হবে। মহিলা বললেন, সামনে ৫০ গজ গিয়ে ডানে টার্ন করবে। তারপর ত্রিশ থেকে চল্লিশ স্টেপ যাবে। তারপর আবার টার্ন করে স্ট্রেইট হাঁটবে… কিছুদুর গেলে একটা পাম্প দেখবে…

উনার ডিরেকশন যতক্ষণ শুনবো, সেই সময়টাই নষ্ট। ‘বিশেষ ধন্যবাদ’ বলে আমি কেটে পড়লাম।

সামনে বেশ কিছু স্টেশনারি জাতীয় ছোট দোকান আছে। ফোন কার্ড রিচার্জ করা দরকার। আমার কাছে ‘লিবারা’ সীম কার্ড। বাংলাদেশে কথা বলার জন্য এই কার্ড তুলনামূলক শস্তা। কিন্তু অন লাইনে পাঞ্চাশ ডলারের কম টপ আপ করা যায় না। আমি লোড করবো দশ ডলার।

ছোট্ট এক দোকানে ঢুকেছি। দোকানদার চাইনিজ। এশিয়ন হিসাব দেশি মানুষ। তবে চাইনিজরা ব্যবসা ছাড়া কিছু বোঝে না। দুনিয়ার নানা দেশে একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। তার সাথে ব্যবসায় আলাপ করলাম। ঠিকানা জিজ্ঞেসা করার আগে কার্ড রিচার্জ করেছি। দশ ডলারের বাণিজ্য ডান। যেহেতু সে স্থানীয় দোকানদার, এবার তাকে ঘটনা বললাম। দোকানি তরুণ। তার ইংরেজি দুর্বল। ঠিকানা দেখিয়ে জানতে চাইলাম, কীভাবে যাবো একটু পথ বলে দাও প্লিজ।

চাইনিজ অবাক নয়নে ক্ষণিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর বললো, এই ঠিকানো তো দূরের কথা, এই দোকানের বাইরের পথ ঘাটই আমি চিনি না। সকালে লোক এসে আমাকে দোকানে দিয়ে যায়। আবার রাতে এসে নিয়ে যায়। সিডনিতে নতুন এসেছি। ভেরি নিউ কামার।

এই কথার কোনো জবাব চলে না। এর দোকানে সওদা করাই বৃথা।

বাসায় ফোন দেয়া যাচ্ছে না। আমার স্ত্রী ঘটনা শুনেই প্রথম জবাব দেবে, ‘উচিত শিক্ষা হযেছে। বাইরে একটু ঘুরুক। তেল কমুক।’ বাইরে বেরুনোর ব্যাপারে সে কয়েকবারই অনুরোধমূলক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো। পাত্তা দেইনি। তেল কিছু কমা উচিত। আল্লাহ-রসুলের নাম নিয়ে আন্দাজের উপর হাঁটা শুরু করলাম।

কিছুদূর এগিয়ে আরেক রাস্তায় উঠলাম। এখানে ওয়েস্ট রাইড লাইব্রেরির অবস্থান। মন চনমন করে উঠলো। ঢাকায় এলাকা ভিত্তিক লাইব্রেরির প্রচলন উঠেই গেছে। নেই বললেই চলে। সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় প্রতি এলাকাতেই এরকম লাইব্রেরি আছে। এই তথ্য জেনেছি পরে।

লাইব্রেরিতে ঢুকলাম। ভেতরটা খুবই সুন্দর। ছিমছাম শান্ত পরিবেশ। মেরুণ রঙের শেলফে থরে থরে বই সাজানো। দেখলেই লোভ হয়। ইতিহাস, এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, সাইন্স ফিকশন, নন ফিকশন হরেক রকম বইয়ের বাহার। বসে পড়ার জন্য টেবিল চেয়ার আছে। অনেকে কম্পিউটারে বসে কাজ করছে। আমি বসে দেখছি। বাচ্চাদের জন্যও প্রচুর বইয়ের আয়োজন আছে। এন্ট্রান্স-এর বাম দিকে তাদের জন্য আলাদা জায়গা। দরজা বরাবর কাউন্টার।

সবুজ টিয়া কালারের টী শার্ট পরা এক বাচ্চা এলো তার মায়ের সাথে। শাদা বাচ্চা। স্বর্ণালী চুল। এর বয়স পাঁচ-ছয় এর বেশি হবে না। তিন থেকে সাড়ে তিন ফিট তার উচ্চতা। বই ধার নেওয়া বা ফেরত দেওয়ার কাউন্টারের উইন্ডো তার চেয়ে উঁচু। বাচ্চাটি তার কাঁধের ব্যাগ থেকে তিন চারটা বই বের করলো। মা খানিক দূরে দাঁড়ানো। শিশুটি পাশে রাখা একটি টুল জাতীয় চৌকি কাউন্টারের কাছে এনে সেখানে উঠে দাঁড়ালো। নিজের বইগুলো লাইব্রেরিতে ফেরত দিলো। আমি মুগ্ধ চোখে দৃশ্যটি দেখছি। মনটা জুড়িয়ে গেছে। কোনো জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা পেতে এই চিত্রটি অনেক বড় ইন্ডিকেটর। এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যটি অস্ট্রেলীয়দের প্রতি আমাকে নতুন করে আকৃষ্ট করলো।

সিডনিতে বেশ কিছু বাঙালি বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কেউ যখন কারো বাসায় নিমন্ত্রণে যায়, কিছু গিফট নিয়ে যেতে হয়। আমার নতুন প্রকাশিত বই জীবনযাপনে রসুলুল্লাহ স.এর বাণী বইটি উপহার হিসাবে নিয়ে গেছি। বই দেখে দাওয়াতকারীদের বড় অংশ মহা বিপদে পড়ে গেছেন। কারণ ওসব বাড়িতে কেউ বই রাখে না। বই পড়ে না। মর্মান্তিক বিষয় হলো এদের অধিকাংশই একাডেমিকালি উচ্চ সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত। শিক্ষিত। পেশাজীবি। এসব কিছু নিয়ে ‘সিডনির বাঙালিরা’ অংশে বলার ইচ্ছা রইলো।

লাইব্রেরির শিশুদের অংশের শেষ প্রান্তে মায়েদের বিশ্রাম বা অপেক্ষা করার জন্য আলাদা কক্ষ রয়েছে। কেউ কেউ কোলের বাচ্চাও সাথে নিয়ে এসেছেন। গল্প করছেন। ছবি তুলতে চেয়েছিলাম। প্রাইভেসির কারণে এখানে ছবি তোলা ঠিক না বলে জানালেন একজন লাইব্রেরি স্টাফ।

ঘুরে ঘুরে সমস্ত লাইব্রেরির শেলফ দেখেছি। হাতে সময় বেশি নেই। নিজের সেফটির কথা ভেবে কাকুকে ফোন করে জানিয়ে রাখলাম কী অবস্থায় আমি কোথায় আছি। চিন্তার কিছু নেই।

পুরো লাইব্রেরি ঘুরে বাইরে এলাম। ঠিকানা সহজে মনে রাখার জন্য উলওর্থস মাথায় ছিলো। লাইব্রেরির মূল দরজার কাছে একজনকে জিজ্ঞেসা করলাম উলওর্থস-টা কোথায়?

সে পথের নির্দেশনা বলে দিলো। একটি গলি এবং গাড়ির পার্কিং জোন ক্রস করে উলওর্থস-এর পেছেনের কম্পাউন্ডে পৌছলাম। তখনই আফসু ফোন করে জানতে চাইলো, তুমি কোথায়? আসো না?

আমি স্বাভবিক কনফিডেন্ট কণ্ঠে বললাম, এখনই আসবো। ওলওর্থস-এর কাছে আছি। এখানে থেকে কোনদিক দিয়ে আসলে তাড়াতাড়ি হবে একটু বলে দাও তো।

আফসু বললো, তুমি মেইন রোডের কাছে ‘আকেরা বাকেরা কাবাব হাউজ’-এর কাছে এসে রোড ক্রস করো। তাহলে ইজি হবে।

hb5.jpg…….
ব্রিজের পেছনে নিচের পোর্টে ক্রুজ শিপ ভিড়েছে।
……..
পথের কিউ পেয়ে গেছি। লোকজনকে জিজ্ঞেসা করে ‘আকেরা বাকেরা কাবাব হাউজে’র কাছে চলে এলাম। রিলাক্সড মুডে বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার খেলাম। আফসু মাছ-মাংস-সবজি বহু কিছু রান্না করেছে। তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বারামুন্ডি মাছও মেনুতে আছে। মুরগির গোশত দেখিয়ে বললো, দেখো তো মুরগি রান্না মায়ের মতো হয়েছে কি-না?

আমার ভোজনপ্রীতির খবর স্বজনরা সবাই জানে। এটা এখন একটি বাড়তি বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রান্না করে সে চায় সবকিছুই যেন খাই। কোনো কিছু না খেলে বা কম খেলে মন খারাপ করে, ভাবে রান্না ভালো হয়নি। ফলে আমাকে দাওয়াত করে গৃহস্থের মন যেন খারাপ না হয় সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হয়। আফসুর রান্না সত্যি সত্যিই মজাদার হয়েছে। সে ভালো রান্না শিখেছে।

মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি সব বাঙালী ছেলেমেয়েরই একবার হলেও কিছু সময় বিদেশে এসে থাকা দরকার। দরকার বললে হালকা বলা হয়, থাকা আবশ্যক। যারা দেশে গ্লাসে পানি ঢেলে খেতো না, তাদেরও অনেকে বাইরে এসে ‘এ’ ক্যাট্যাগরির রান্না শিখে যায়। বলা বাহুল্য রান্না হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শিল্প। এই শিল্পের কদর বাঙালী নর-নারী এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি।

পারভেজ অফিস থেকে এলো বিকেল বেলা। আলো পড়ে যাওয়ার আগেই আমরা বেরিযে গেলাম। উদেশ্য লা-পেরোজ (La Perouse) যাবো। মাঝপথে সাবৃনা মত বদলালো। বললো, মিন্টোতে ফিরবে।

লা-পেরোজ-এর কাছে এসে এক জায়গায় নামলাম। সিডনিতে অসংখ্য সী বীচ। সাবৃনা গাড়িতে বসে আছে। সমুদ্র পাড়ে বাতাস প্রচণ্ড। রীতিমত শীত করছে। ছোট্ট সৈকত। হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ আছে। ঐ অর্থে লোক নেই। এক মহিলা কুকুরের সাথে টেনিস বল দিয়ে ছোড়াছুড়ি খেলছে। মানুষের এমনই আকাল। তিনজনের একটা দল তাঁবু হাতে ঘোরাঘুরি করছে। সাথে মদের বোতল। বোধহয় ক্যাম্প করবে।

ঠাণ্ডা বাতাসে থাকা কষ্টকর। সন্ধ্যার কিছু পরেই আমরা মিন্টো ফিরে এলাম।

সিডনিতে ঘুরছি, অথচ এখনো বিশ্ববিখ্যাত হারবার ব্রিজের ওপর ওঠা হয়নি। কারণ সাবৃনা। সে বলেছে ব্রিজের ওপর আমার সাথে একত্রে উঠবে। তার মতি-গতির ঠিক নেই। তন্ময়ের সাথে কথা বলে ঠিক করলাম দ্রুতই হারবার ব্রিজের উপর উঠতে হবে।

সিডনি হারবার ব্রিজ
হারবার ব্রিজে রওয়ানা হওয়ার আগে সাবৃনা আবার মত বদল করলো। বললো, লোহা লক্করেরর ওপর উঠে নাচানাচি করার মধ্যে কী আছে? আইফেল টাওয়ারে উঠেছো না–একই। দুটাই লোহার জিনিস। এখন আমার হারবার ব্রীজে ওঠার মুড নেই। তুমি যাও।

আমি বললাম, আচ্ছা।

ওয়ার্ক ডে-তে সার্কুলার-কী বা হারবার জোনে কার পার্কিং পাওয়া দুষ্কর। পার্কিং-এর বিষয় বিবেচনা করে ভ্রমণের সময় ছুটির দিন ঠিক করেছি।

আজ শনিবার। ৫ মার্চ ২০১১।

তন্ময়ের গাড়িতে আমরা হারবার ব্রিজের কাছে চলে এলাম। পার্কিং খুঁজছি। এখনও ভিড় পুরো লাগেনি। রাস্তার পাশেই একটা পাওয়া গেলো। সেখানে মেশিন বসানো এবং লেখা আছে:
Pay & Go Meter.
Not Ticket Issued.
Mobilet+Credit Card+Coin.
Parking Harbour.

পশ্চিমা দুনিয়া বা সভ্য দেশে সবখানেই গাড়ি পার্কিং-এর জন্য ফি দিতে হয়। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে রাস্তার যেখানে ইচ্ছা ফ্রিস্টাইল এবং বিনা ফি কিংবা বিনা জরিমানায় গড়ি পার্ক করা যায়। কলকাতা বা দিল্লীতেও দেখেছি গাড়িচালকরা যেখানে সেখানে গাড়ি রাখে না। ভয় পায়। রাখলে ট্রাফিক বিভাগের রেকার এসে মুহূর্তে গাড়ি তুলে নিয়ে যায়। ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা কুয়ালালামপুরে ড্রাইভাররা দৌড়ের ওপর থাকে। ইউক্রেনে অননুমোদিত জায়গায় গাড়ি রাখার অপরাধে কিছুদিন আগে ট্যাংক এনে মার্সিডিস গাড়ি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এবং এই গুড়িয়ে দেয়ার কাজটি করেছেন মেয়র সাহেব স্বয়ং। এতে করে সব গাড়িঅলাদের কাছে যথাযথ মেসেজ পৌঁছে গেছে।

সিডনিতে স্থানভেদে বিভিন্ন জায়গায় ১৫ বা ৩০ মিনিট ফ্রি পার্কিং পাওয়া যায়। হারবারের এই পার্কিং-এ গাড়ি যতক্ষণ থাকবে সে অনুযায়ী মিটারে চার্জ হতে থাকবে।

তন্ময়কে বললাম, আমরা তো ব্রীজের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাবো, সময় লাগবে। তোমার পার্কিং চার্জ বেড়ে যাবে না?

সে উত্তর দিলো, কোনো সমস্যা নাই।

এর আগে সিডনির বিশ্ববিখ্যাত ফক্স স্টুডিওতে গেছি। তন্ময় ফ্রি ভেবে এক জায়গায় গাড়ি পার্ক করলো। ফেরার সময় জানলো ওটা ‘ফ্রি’ না। ছয় ডলার ফাইন দিতে হয়েছে। আমি বললাম, তোমার সতর্ক থাকা উচিত ছিলো। সে বললো, কোনো সমস্যা নাই।

আমরা ব্রিজের দিকে হেঁটে আসছি। চারদিক দারুণ গোছানো। মন ভালো হওয়ার মতো পরিপাটি। ছিমছাম। কী যে সুন্দর!!

ব্রিজের ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে। সিঁড়ির কাছে চলে এসেছি। এক লোক সাইকেল কাঁধে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। টার্ন করে উঠতে যাবো, তন্ময় বললো, আমাদের উঠতে হবে সামনের সিঁড়ি দিয়ে। এটা সাইকেলের জন্য।

সাইকেলের জন্য মানে?

হারবার ব্রিজের পশ্চিমপাশে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন রয়েছে। অর্থাৎ যারা সাইকেলে যাবে তারা উঠবে এই সিঁড়ি দিয়ে। পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট লেন হচ্ছে পূর্ব দিকে।

আমরা পুব দিকের ওয়াকিং লেনে ওঠার সিঁড়ির কাছে এসেছি। প্রশস্ত সিঁড়ি। খানিকটা খাড়া। জগিং করতে করতে দুজন আমাদের ক্রস করে গেলো। অনেকেই ওপরে উঠছে। এক বয়স্ক জুড়ি নেমে আসছেন। সম্ভবত এরা পর্যটক। মহিলার গলায় ক্যামেরা ঝোলানো। ভদ্রলোকের মাথার চুল শাদা। পরনে শাদা টী শার্ট। তিনি মহিলার হাত ধরে সতর্কতার সাথে ধীরপায়ে নামছেন। সম্ভবত তারা স্বামী-স্ত্রী।

আমরা সিঁড়ি ভেঙে উঠছি।

hb1.jpg…….
গ্রানাইট পাথরে মোড়ানো চার পিলারের ওপর দাড়িয়ে আছে বিখ্যাত সিডনি হারবার ব্রিজ। ব্রিজে লেখকের প্রথম দিনে তোলা ছবি।
……
লন্ডনের টেমস নদীর উপর লন্ডন ব্রিজ কিংবা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের মতো সিডনির হারবার ব্রিজও দুনিয়ার উল্লেখযোগ্য ল্যান্ডমার্ক। দি আমেরিকান সোসাইটি অফ সিভিল এনজিনিয়ারস ১৯৮৮ সালে এটিকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হিস্টরিক সিভিল এনজিনিয়ারিং ল্যান্ডমার্ক’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে । দুনিয়াবাসীর কাছে আস্ট্রেলিয়ার সিম্বল এই সিডনি হারবার ব্রিজ ।

ছুটির দিনে প্রচুর পর্যটক থাকার কথা। লন্ডন ব্রিজ বা প্যারিসের আইফেলের ক্ষেত্রে যেটা হয়। তুলনামূলকভাবে এখানে টুরিস্ট সংখ্যা নগণ্য।

আমরা ব্রিজের ওপরে চলে এসেছি। হাঁটার জন্য সুন্দর পথ আছে। পাশে লোহার রেলিং। নিচে সমুদ্রের নীল জলরাশি। জাহাজ যাতায়াতের জন্য ব্রিজের উচ্চতা অনেক বেশি। হঠাৎ করে তাকালে ভয় করে। মাথা ঘুরানি দেয়।

তন্ময়কে বললাম ছবি তোলো।

হারবার হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টীল স্ট্রাকচার ব্রিজ। সবচেয়ে দীর্ঘ ব্রিজটি রয়েছে আমেরিকায় নিউ রিভার জর্জ-এর ওপর।

আমরা এগুচ্ছি। ওয়াকিং লেনের পাশেই গাড়ির লেন। দুই লেনের মাঝখানে রেলিং। হেভি কাঁটাতারের বেড়া। যাতায়াতের জন্য খানিক দূরে দূরেই গেট আছে। সব গেট তালা মারা। একটু পরে পরেই নোটিশ বোর্ড লাগানো। সবগুলোই সতর্কতামূলক। যেমন: Warning: An unauthorised climbing Fine 2200A$ । অর্থাৎ কেউ মাঝের এই বেরিক্যাড অনুমতি ছাড়া ডিঙাতে গেলে দুই হাজার দুইশ ডলার জরিমানা দিতে হবে। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা ফাইন।

পোশাক পরা সিকিউরিটির লোক হেঁটে হেঁটে পাহারা দিচ্ছে।

শা-শা করে গাড়ি যাচ্ছে। মটরযান চলাচলের জন্য এখানে রয়েছে আটটি লেন। গাড়ির গতির সাথে ব্রিজেও এক ধরনের কম্পন হচ্ছে। হিসাব বলছে প্রতি মিনিটে ব্রিজের ওপর দিয়ে যাতায়াত করে প্রায় তিনশ গাড়ি। দুই প্রান্তে রয়েছে দুইটি রেল লাইন। একটু কাঁপাকাঁপি না করলে কেমন হয়!

১৯৩২ সালের ১৯ মার্চ হারবার ব্রিজ উদ্বোধন হয়। তখন ঘোড়া এবং ঘোড়ার গাড়িও চলাচল করতো। সে সময় মটরকারের জন্য টোল ছিলো ৬ পেনি। ঘোড়ার জন্য ৩ পেনি, পথচারীদের জন্য হাঁটাপথ ফ্রি। কোনো টেলে দিতে হয় না। ঘোড়ার গাড়ি চলাচল বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।

১৯৯২ সালে চালু হয়েছে হারবার টানেল। পরিসংখ্যান বলছে এখন প্রতিদিন প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার গাড়ি হারবার ক্রস করে। টানেল হওয়ার আগে এই সংখ্যা ছিলো আরো বেশি, ১ লাক্ষ ৮২ হাজার। ব্রিজ পারাপারে গাড়ি প্রতি টোল মাত্র ৩ আস্ট্রেলিয়ান ডলার। সেটিও দিতে হয় কেবল দক্ষিণ তীরগামী গাড়ির জন্য।

আমরা থেমে থেমে হাঁটছি। খানিকক্ষণ বাদে বাদে বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। এখান থেকে সমুদ্রের নীল জল, চলমান বোট, ফেরি দেখা যাচ্ছে। ক্রুজ শীপ দাড়িয়ে আছে হারবার পোর্টে। দূরে লুনা পার্ক এবং সিডনি অপেরা হাউজের ভিউ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। নিচে বিয়ের ছবি তোলার জন্য বিরাট এক দল এসেছে। ওপর থেকে দেখতে ভারি চমৎকার লাগছে।

hb4.jpg…….
ব্রিজের ওপর থেকে পেছনে সিডনি অপেরা হাউস।

অধিক সুন্দর কোনো কোনো মানুষ সহ্য করতে পারে না। যেমন আইফেলে টাওয়ারের ১০৮১ ফুটের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে অনেকেরই অসহ্য লাগে। তখন লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা ঠেকাতে এখন সেখানে নেট দিয়ে ঘেরাও করে দেয়া হয়েছে। হারবার ব্রিজেও লোহার রেলিং-এর ওপর বাড়তি নিরাপত্তামূলক শক্ত নেট বসানো আছে। এখানেও আত্মহত্যার কাহিনী আছে কিনা কে জানে!

ভূমি থেকে ওপর দিকে ঠাণ্ডা বেশি। বাতাস শরীরে সূইয়ের খোঁচার মতো বিঁধে। প্যারিসে আইফেলে ওঠার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি জ্যাকেট সাথে নিয়ে এসেছি। হারবার ব্রিজের উচ্চতা সমুদ্রের পানি থেকে প্রায় ৫১ মিটার ওপরে। অর্থাৎ দেড়শ ফুটেরও বেশি। কিন্তু এখানে ঠাণ্ডা তো দূরের কথা জ্যাকেট পরে এখন রীতিমত গরম লাগছে। এর মূল কারণ সিডনির তপ্ত রোদ। এখানকার রোদ এবং সূর্যরশ্মি খুবই তেজস্বী। রেডিয়েশন হাই। আগে টেলিভিশনে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ম্যাচে প্লেয়ার এবং দর্শকদের মুখে ঠোঁটে আলগা ক্রীম মাখানো দেখে বিরক্ত হতাম। ভাবতাম এটা কোন ধরনের খাচরা ফ্যাশন!

সিডনিতে এসে বুঝলাম রোদের তাপ কাকে বলে। এই তাপে যে শুধু মানুষের চামড়াই আক্রান্ত হয় তা না। লোহালক্করও এর থেকে নিরাপদ না। সিডনি হারবার ব্রিজ নির্মাণের সময় তাই সিডনির রোদ্রতাপকে বিবেচনায় রেখে স্ট্রাকচারে প্রচুর সংখ্যক কবজা ব্যবহার করা হয়েছে। এমন রঙ ব্যবহার করা হয়েছে যেন হিটের কারণে ডিসকালার হয়ে না যায়। সেটা করতে গিয়ে প্রথম দফায় তিন কোট রং লেপন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই তিন কোট রঙের পরিমাণ ছিলো ২ লক্ষ ৭২ হাজার লিটার।

তন্ময়কে জিজ্ঞেসা করলাম, ব্রিজে যে ক্লাইম্বিং করে, কখনো উঠেছো?

না।

ও ওপর দিকে তাকিয়ে বললো, ঐ যে দেখেন। ক্লাইম্বাররা…

আমি তাকিয়েছি।

পর্যটকরা ক্লাইম্বিং করছে। সমুদ্র থেকে এর উচ্চতা দেড় হাজার ফিটেরও বেশি। আরোহীদের লিলিপুটের মতো দেখা যাচ্ছে।

hb2.jpg…….
লেখক তাকিয়ে আছেন ক্লাইম্বিংরত টুরিস্টদের দিকে, যাদের লিলিপুট আকৃতির দেখা যাচ্ছে।
……
হারবার যে শধু উঁচু ব্রিজ, তা না। এর মাথার ওপর লোহার খনি। রেকর্ড অনুযায়ী এই ব্রিজ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ৫২,৮০০ টন স্টীল। যার ৭৯ ভাগ আমদানি হয়েছে ইংল্যান্ড থেকে। ২১ ভাগ স্থানীয়। ব্রিজের জয়েন্টের কাজে ব্যবহার হয়েছে ৬০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান রিবেট। বৃটিশ কম্পানি ডরম্যান লং (Dorman Long) এটির নির্মাণ কাজ করেছে। সেই সময়ে ব্যয় ধরা হয়েছিলো ৪২ লাখ ১৭ হাজার ৭২১ পাউন্ড।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটি ফলকের কাছে চলে এসেছি। হারবার ব্রিজের ৭৫ তম বার্ষিকী উপলক্ষে এটিা লাগানো হয়েছে। ১৬ জন শ্রমিকের সম্মানে তাদের নাম লেখা রয়েছে। ব্রিজের নির্মাণকালে নানা দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছিলো।

hb6.jpg…….
ব্রিজের ৭৫তম বার্ষিকীতে নির্মানকালে মারা যাওয়া ১৬ জন শ্রমিকের নামের ফলক স্থাপন করা হয় তাদের আত্মার প্রতি সম্মান দেখিয়ে।
……
ব্রিজে উঠে বাঙালী মক্কেল হিসাবে শুধু আমি যে ছবি তুলছি, তা না। এক নববধু বিয়ের গাউন পরে ফটো সেশন করছে। বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছে। এগিয়ে গিয়েছি ভালো করে একটু দেখার জন্য। সমুখে আরেকটি ওয়ার্নিং নোটিশ বোর্ড ঝোলানো। এখানে ফাইন আরো বেশি, ৩ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার।

আমরা হারবার ক্লাইম্বিং টিকেট কাউন্টারের এন্ট্রান্স-এর কাছে এসেছি। দরজার কাছে সিঁড়ি আছে। সিঁড়ির কাছে এক বুড়ি বসে হাপাচ্ছে। শ্বেতাঙ্গিনী। পরনে নীল রঙের জার্সি। আমাদের দেখে বললো, বাবারে ওপরে যেয়ো না। পায়ের ব্যথায় মরে যাবা। আমি শেষ… আমি শেষ…। বলতে বলতে সে নেমে গেলো।

এখানে একটি টিকেটের রেট দেওয়া আছে। সাধারণ টিকেট সাড়ে নয় ডলার। সিনিয়র সাড়ে ছয় ডলার। ৮-১২ বছর বয়সী বাচ্চাদের টিকেট চার ডলার। ৭ বছরের নিচে হলে ফ্রি।

হাঁটতে হাঁটতে ১১৪৯ মিটার দীর্ঘ ব্রীজের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে এসেছি।

তন্ময়ের কাছে জানতে চাইলাম, এদিক দিয়ে নামলে গাড়ির কাছে পৌঁছাতে আমাদের সমস্যা হবে কি-না?

ও বললো, অনেক ঝামেলা। যাওয়া যাবে না। আমাদেরকে আগের জায়গাতেই ঘুরে হেঁটে যেতে হবে।

আবার উল্টোদিকে রওয়ানা হলাম। অর্থাৎ ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন।

ব্রিজের উপর থেকে খানিক দূরে নানা রকম বাড়িঘর দেখা যায়। কিছু কাঠের বাড়িও আছে। কোনো কোনো বাড়িতে সবুজ ডিজাইন করা পাতাকা উড়ছে। আস্ট্রেলিয়ান পতাকা ছাড়া এই পতাকা ওড়ানোর মানে কী কে জানে?

তন্ময় বললো, এগুলো আদিবাসীদের পতাকা।

এই এলাকায় আদিবাসীদের বসবাস ছিলো। ইতিহাসে লেখা আছে ব্রিজ নির্মাণকালে এখানকার ৮০০ আদিবাসীকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। যাদের কোনো ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি।

আমরা ব্রিজের পিলারের কাছে এসে গেছি। অস্ট্রেলিয়ার আইকনিক এই বিশাল স্ট্রাকচার হারবার ব্রিজ চারটি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একেকটি পিলারেরর উচ্চতা ৮৯ মিটার বা ২৭০ ফিটের বেশি। পিলারগুলো কনক্রিটের তৈরি। গ্রানাইট পাথরে মুখ মোড়ানো। এই পাথর আনার জন্য তিনটি বিশেষ নৌযানও তখন তৈরি করা হয়েছিলো। অস্ট্রেলিয়া, স্কটল্যান্ড এবং ইটালিসহ তিন দেশের ২৫০ জন রাজমিস্ত্রী তাদের পরিবার নিয়ে অস্থায়ীভাবে এখানেই আবাস গেড়েছিলো।

ছয় বছরের নির্মাণ কাজ শেষে ব্রিজটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং। উদ্বোধনের দিন হাজির হয়েছিলো ৩ থেকে ১০ লাখ লোক।

আমরা সিঁড়ির কাছে চলে এসেছি। এই জীবনে অস্ট্রেলিয়ায় আবার আসা হবে কি-না জানি না, তন্ময়কে বললাম, নামার আগে আরেকটা ছবি তুলে দাও।

ব্রিজ থেকে নেমে আলফ্রেড স্ট্রীটের পাশে কিম্বারলি ক্লিয়ারেন্স হাউস ক্রস করে খাবারের দোকানে ঢুকলাম। দুজন আলোচনা করে ঠিক করলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হবে লা পেরোজ (La Perouse)।

গুডবাই সিডনি হারবার ব্রিজ!

(চলবে)

—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: আবু সুফিয়ান
ইমেইল: abusufian18@gmail.com

ফেসবুক পেজ । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নিটোল — december ২৬, ২০১১ @ ৯:১২ অপরাহ্ন

      বরাবরের মতোই এ পর্বটাও যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক হয়েছে…….তবে হারবার ব্রিজের আরো ছবি দিলে ভাল হতো,আরেকটু জানতে পারতাম আরকি।

      অপেরা হাউসটাতে কি গিয়েছিলেন? তাহলে অবশ্যই ওটা নিয়ে লিখবেন কিন্তু।
      ভাল থাকবেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন AKM haque — জানুয়ারি ২০, ২০১২ @ ৯:৫০ অপরাহ্ন

      nice story…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাদিক আল মাহাদি — জুন ৫, ২০১৩ @ ২:৪৩ অপরাহ্ন

      খুব ভাল লাগল…………

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com