রশীদ করীমের দুটি সাক্ষাৎকার

| ৩০ নভেম্বর ২০১১ ২:১১ অপরাহ্ন

ভূমিকা: ব্রাত্য রাইসু
প্রথম বার যখন রশীদ করীমের সাক্ষাৎকার আমরা নিতে গেলাম–আমি আর সাজ্জাদ ভাই–তখন রশীদ ভাই অনেক ঝলোমলো, প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসে ভরিপুর লেখক। তিনি তাঁর প্রাণের বন্ধু শামসুর রাহমানরে বাসায় আইনা বসাইয়া রাখছেন যাতে আমরা দুই নাম্বারি করতে না পারি। রাহমান ভাইয়ের সামনেই সাক্ষাৎকার নিতে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে। তো যদিও ঠিক করা ছিল রশীদ করীমের সাক্ষাৎকারই আমরা নিব কিন্তু দেখা গেল শামসুর রাহমানও অল্প অল্প ঢুকতেছেন। শামসুর রাহমানের কবিতা ব্যাপারে আমার একটা হার্শ মন্তব্যরে বিষয় কইরা সাক্ষাৎকার প্রকাশের সপ্তাহ খানেক পরে ভোরের কাগজে একটা কলামও লিখছিলেন রশীদ ভাই, প্রতিপাদ্য ছিল তরুণদের বেয়াদবি। এ ঘটনার কিছুদিন পরে সাহিত্যিক-বড়ভাই ও আশির দশকের কবি ফরিদ কবিরের বিয়ের অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমানের লগে দেখা হইলে তিনি হাঁটা না থামাইয়াই আমারে বলেন “ল্যাং মারার সুযোগটা ছাড়তে পারলেন না?” আমি বুঝতে পারতেছিলাম না যে কেন আমার এতে লজ্জা পাইতে হবে কিন্তু রাহমান ভাইয়ের জিজ্ঞাসায় তেমন আহ্বান থাকায় আমি সাহিত্যিক ভঙ্গি সহকারে নিরব থাইকা যাই। রাহমান ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা আবদুস সামাদ আজাদ। তিনি আমারে হাত চাপড়াইয়া ঈষৎ স্নেহ কইরা দিলেন। পরে রাহমান ভাইয়ের ইন্টারভিউ আমি আর রাজু আলাউদ্দিন নিছিলাম বাংলাবাজার পত্রিকার জন্য। রশীদ করীমের বাসায় সৃষ্ট অসন্তোষ বোধকরি কারুর মাথায়ই আর ছিল না।

দ্বিতীয় ইন্টারভিউটা ২ বছর পরে আমি একলাই নেই। তখন রশীদ ভাই পক্ষাঘাতে ধরাশায়ী। কথা বলতে কষ্ট হয়, হাঁটাচলায় সমস্যা। তো তিনি ঠিক করছেন রেকর্ডারে ইন্টারভিউ দিবেন না। কারণ কী না কী বইলা ফেলেন। তো উনি বলছেন ও উত্তর শুইনা শুইনা আমি লিখছি। এর পরও আমি কয়েকবার রশীদ ভাইয়ের বাসায় গেছি। তিনি লিখতে বা ইন্টারভিউ দিতে একদমই অরাজি থাকতেন। ৬ নম্বরে গণস্বাস্থ্যের হাসপাতালে আমি সম্প্রতি গেছিলাম এক (নারী) বন্ধুর সঙ্গে তার (নারী) বন্ধুর অসুস্থতা দেখতে। তখন উল্টা দিকে রশীদ ভাইয়ের বাড়ি দেখলাম উপরের দিকে উঠতেছে। নির্মীয়মান বাড়ির কাছেই কোনো একটা বাড়িতে তিনি থাকতেন। আমি ভাবতেছিলাম, যাক রশীদ ভাই এখনো বাঁইচা আছেন। ফোন করতে হবে। কিন্তু পরের দিনই তিনি মারা গেলেন। তার যত্নে গড়া সাহিত্য আমাদের সাহিত্য সমাজে দীর্ঘস্থায়ী হউক।

rk_222.jpg

১. সাক্ষাৎকার ১৯৯২

অংশগ্রহণ: শামসুর রাহমান
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সাজ্জাদ শরিফব্রাত্য রাইসু

সাজ্জাদ শরিফ: উপন্যাস লিখতে গিয়ে ল্যাংগুয়েজের প্রবলেম ফিল করেন কখনো? এক্সপ্রেশনের দিক দিয়ে?

রশীদ করীম: আমি যখন লিখতে বসি তখন আমার মনের মধ্যে কতকগুলো সবকিছু-ছাপিয়ে-ওঠা অভিজ্ঞতা এবং চরিত্র কাজ করতে থাকে। সেই অভিজ্ঞতা ও চরিত্র তাদের নিজেদের ভাষা খুঁজে নেয়।

ব্রাত্য রাইসু: প্রসন্ন পাষাণ আপনার দ্বিতীয় উপন্যাসটি লিখেছেন এক প্রৌঢ়া মহিলার জবানীতে।

রশীদ করীম: এখানে উপন্যাসের নায়কের সঙ্গে সেই নায়িকা যিনি আত্মকাহিনী বলছেন, তাদের বিচ্ছেদ ঘটে গেছে অনেক আগে। কারণ মহিলার বিয়ে হয়েছে আরেকজন পুরুষের সঙ্গে। সেই বিবাহিতা মহিলা সংসারে সুখী হয়েছেন বলে কল্পনা করছেন এবং বস্তুত তিনি বঞ্চনার অনুভূতিতে সচেতনভাবে পীড়িত হচ্ছেন না। বহু মেয়ের জীবনেই এরকম ঘটনা ঘটে এবং তারা মোটের ওপর স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করে। কিন্তু এই নায়িকাটি আর দশজন মেয়ের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন ছিলেন। তাঁর বিবাহোত্তর জীবন সম্পর্কে একজন মহিলা কী মনে করছেন, তা একজন মহিলাই সবচাইতে ভালো বুঝতে পারবেন। সে কারণেই সম্পূর্ণরূপে একটি মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই উপন্যাসটি লেখা হয়েছে।

ব্রাত্য রাইসু: সাধারণ লোকের কাহিনীতে উপনাসের নায়িকা যখন আরেকজনের সঙ্গে চলে যায়, তখন আপনি তাঁর নাম বদলে দিয়েছেন।

রশীদ করীম: কারণটা তো পরিষ্কার দেয়া আছে ওখানে; প্রথমত, ওরা দুজন মহিলা নন—একজনই।

ব্রাত্য রাইসু: কিন্তু পাঠক মনে করবে…

রশীদ করীম: পাঠক মনে করুক। এখানে দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছে বোধহয়—বিয়ে হলো না প্রথম স্বামীর—তার মায়ের নাম আর তার স্ত্রীর নাম এক ছিল—ফাতেমা না আসেমা। সে যখন স্ত্রীকে আদর করছে তখন হঠাৎ তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তখন সে অপরাধী বোধ করে। সেই সংকট থেকে উদ্ধারলাভের জন্য সে তার স্ত্রীর নতুন নাম রাখল। তার দ্বিতীয় স্বামী কিন্তু আসল নামটাই ব্যবহার করছে। কারণ তার সেরকম কোনো সমস্যা ছিল না। উপন্যাস শুরু হয়েছে তার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে জীবনযাত্রা নিয়ে। উপন্যাসের একেবারে শেষ পর্যায়ে জানা গেল যে আসেমা ও ফাতেমা একই ব্যক্তি।

ব্রাত্য রাইসু: নাম নিয়ে তাহলে আপনিও ভাবেন; মানে, ভেবেছেন আগে। সৈয়দ হকও কিন্তু নাম নিয়ে ভাবেন।

রশীদ করীম: নাম নিয়ে ভাবি মানে কী, উপন্যাসে তুমি অনেক পরে জানতে পারবে যে, এই মহিলা আর ওই মহিলা একই ব্যক্তি।

ব্রাত্য রাইসু: তাই আপনি চেয়েছেন?

রশীদ করীম: তাই আমি চেয়েছি; তা তো বটেই, তাই আমি চেয়েছি। অন্য দুটো নামও হতে পারত এটা, ভেবেচিন্তে যে এই নামটি আমি বেছে নিয়েছি তা আমি করিনি। এটা অবশ্য করতেন—দুজন করতেন। চার্লস ডিকেন্স করতেন। ওনার একটা অদ্ভুত প্রতিভা ছিল। উনি এমন নাম দিতেন যে, ওই নামটা শুনেই চরিত্রটা অনেকটা নামের মধ্যে দিয়েই ফুটে উঠত। আমি ঠিক অতটা সচেতনভাবে নাম ব্যবহার করি নি। তবে হয়তো আমার অবচেতন থেকে চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে একটি নাম উঠে আসে।

সাজ্জাদ শরিফ: কিন্তু বিষয়টি ওইভাবে না বলে অন্যভাবে দেখি, যেমন ওই যে নাম নিয়ে একধরনের ইলিউশন তৈরি করা হয়—পাঠককে অচেতন রেখে পরে গিয়ে একটা ধাক্কা-দেয়া, কারণ দুটো নামের মহিলা আসলে একই। সৈয়দ হকের উপন্যাসেও নামের ব্যাপারটা দেখা যায়।

রশীদ করীম: না, আমার উপন্যাসে তো এটা খুবই পরিকল্পিতভাবে করা। এ দুটো মেয়ে যে একই মেয়ে, এটা আমি পাঠককে জানতে দিতে চাই নি। একেবারে শেষ মুহূর্তে এটা জানতে দিই। সারপ্রাইজে আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না, কিন্তু সারপ্রাইজ যদি বিশ্বাসযোগ্যতাকে আঘাত না করে ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে অনিবার্যভাবে আসে তাহলে সেটাকে আমি একটা গুণই মনে করি। যেমন, মোপাসা এবং ও হেনরির গল্পে আমরা দেখতে পাই।

সাজ্জাদ শরিফ: আপনার তো কবিতা পড়ার বিপুল অভিজ্ঞতা আছে। তো এই কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা আপনাকে উপন্যাস লেখায় সাহায্য করে কি?

রশীদ করীম: সমগ্রভাবে সাহিত্যপাঠ যার মধ্যে কবিতাও আছে, আমার মানসিকতা এবং হৃদয়ের স্পর্শকাতরতাকে সেতারের মৃদু ঝংকারের মতো তৈরি করেছে। তোমাদের কী মনে হয় জানি না, আমার উপন্যাসের উপমাগুলিতে এবং ভাষাব্যবহারে কবিতার লক্ষণ আছে। আমার উপন্যাসের বহু অংশেই এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে যেগুলিকে লাইন ভেঙে সাজালে তুমি দেখবে যে ছন্দ, মাত্রা, মিল রক্ষিত হয়েছে।

সাজ্জাদ শরিফ: অনেকে যে বলেন, কথাসাহিত্যে কবিতার প্রভাব খুব ভালো লক্ষণ নয়।

রশীদ করীম: এরকম ধারণা ঠিক নয়। চট করে বলতে পারি, জয়েসের ইউলিসিস এবং ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাসগুলিতে কবিতার লক্ষণ খোলা চোখেই দেখা যায়। কবিতা জিনিসটা কী? আমার কাছে তো এই মনে হয় যে শিল্পীর শ্রেষ্ঠ—সবচাইতে গভীর ও সবচাইতে পরিশীলিত মুহূর্তের প্রকাশ। সেটা উপন্যাসেও থাকতে পারে। উপন্যাস কখনো বলে না, ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী।’

ব্রাত্য রাইসু: আপনার প্রিয় বই কোনটা, আপনার লেখা?

রশীদ করীম: আমার লেখা? বলা মুশকিল। কোনোটাই কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। আমি আমার কোনো বই-ই দ্বিতীয় বার পড়ে দেখি নি। এই যে ধরো, প্রুফ দেখেই আমি খালাস, তারপর আমি আমার উপন্যাস দ্বিতীয় বার পাঠ করি নি।

ব্রাত্য রাইসু: আপনার চরিত্ররা বেশিরভাগই একটু আভিজাত্য পছন্দ করে।

রশীদ করীম: আভিজাত্য পছন্দ করে মানে; অভিজাত জিনিসটা—মানে কী?

ব্রাত্য রাইসু: মানে একটু হাই সোসাইটির লোক।

রশীদ করীম: হাই সোসাইটি জিনিসটা কী?

ব্রাত্য রাইসু: উচ্চবিত্ত ফ্যামিলি।

রশীদ করীম: উচ্চবিত্ত ফ্যামিলি কী দেয় মানুষকে?

ব্রাত্য রাইসু: নিরাপত্তা দেয়।

রশীদ করীম: অনেক কিছু দেয়। তোমাকে ভালো গান শোনার মতো সম্পদ দেয়, তোমাকে ভালো থিয়েটার দেখবার সুযোগ দেয়। তোমাকে দেশ-বিদেশ ভ্রমণের সুবিধা দেয়, তোমাকে ভালো বই পড়বার সুবিধা দেয়, তোমাকে সজ্জন রুচিবান লোকদের সঙ্গে মিশবার দরজা খুলে দেয়, সুতরাং এটা তো কোনো খারাপ কিছু না।

সাজ্জাদ শরিফ: না, না, খারাপ কিছু না।

রশীদ করীম: অভিজাতকে নাবিয়ে নিচে টেনে না এনে নিচের লোককে একটু ওপরে তুলে আনাই কাম্য।

সাজ্জাদ শরিফ: না, এখানে কোনো অভিযোগ নাই।

রশীদ করীম: আভিজাত্য—মনের আভিজাত্য কোনো ধিক্কারের বস্তু নয়।

শামসুর রাহমান: সে অভিযোগ করে নি।

রশীদ করীম: অনেকে করে তো, আমার এখানে মজুর নাই, তোমার মিছিল নাই, সমাজসচেতনতা নাই, জীবনবোধ নাই।

সাজ্জাদ শরিফ: তবে আমাদের এখানে তো এটাও ঠিক যে বাংলা ভাষায়—বাইরেও হয়েছে অনেক, যে, শ্রমিকদের কথা লিখতে হবে, গরিবদের কথা লিখতে হবে বলে এক ধরনের খুব কেজো এবং বানানো গল্প লেখা হয়েছে; এক্সপিরিয়েন্স নেই যেসব জিনিসপত্রের, সেসব লেখা হয়েছে। যাচ্ছেতাই, এগুলোও আছে।

রশীদ করীম: আমাদের সাহিত্যের একটা অর্বাচীনতা তোমরা জান যে, দারিদ্র্য-লাঞ্ছনা সম্বল না করে মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হয় না।

সাজ্জাদ শরিফ: বিলাস এক ধরনের, দারিদ্র্যবিলাস।

রশীদ করীম: দারিদ্র্য মানুষের মনকে ক্ষুদ্র ও নীচ করে। গ্রিক নাটক বা শেক্সপিয়ার কিংবা কোনো মহাকাব্য দরিদ্রদের নিয়ে লেখা হয় নি। তাছাড়া দরিদ্র সম্পর্কে লিখবার জন্য আমাকে তাদেরই সম্প্রদায়ের লোক হতে হবে। কিন্তু হলে, সৃজনশীলতা লাভ করার মতন শিক্ষাই আমার থাকবে না।

শামসুর রাহমান: এখানে আমি একটা কথা বলতে চাই, বোধ হয় এটা সব সময় ঠিক না, সবার ক্ষেত্রে ঠিক না—কোনো কোনো লেখক আছেন যারা দরিদ্র কিংবা সর্বহারাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাদের কথাটা জানাতে চান।

ব্রাত্য রাইসু: দুটোর কোনোটাই তো খারাপ না।

রশীদ করীম: না, খারাপ ভালোর কথা না, এখানে কথা হচ্ছে…

ব্রাত্য রাইসু: কিন্তু আপনি যখন মহত্ত্বের কথা আনছেন তখন কিন্তু খারাপ-ভালো নির্ণয় করেন, যখন বলেন, দরিদ্রদের নিয়ে তেমন মহৎ সাহিত্য হতে পারে না।

রশীদ করীম: না, আমি তা বলি নি। আমি বলেছি, দারিদ্র্য জিনিসটা দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু মহৎ কোনো জিনিস না।

শামসুর রাহমান: যেমন নজরুল লিখেছেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।’

রশীদ করীম: এত খারাপ লাইন নজরুল খুব কম লিখেছেন। আমি বোধহয় ভুল বললাম। কারণ কাজাঁ জাকিস-এর উপন্যাসে সেই ফ্রান্সিস অব অ্যাসিসি নিজেই দারিদ্র্য বেছে নিয়েছিলেন এবং সেটি একটি মহৎ উপন্যাস হতে পেরেছে। এ প্রসঙ্গে হেসের সিদ্ধার্থর কথাও স্মরণ করতে পার। আরো আছে।

ব্রাত্য রাইসু: ভাবতে হবে জিনিসটা। দারিদ্র্য জিনিসটা কী? মহানও না, না-মহানও না। দারিদ্র্য হচ্ছে দারিদ্র্য।

রশীদ করীম: দারিদ্র্য হচ্ছে জীবনের একটা অবস্থা।

শামসুর রাহমান: দারিদ্র্য মানুষকে অনেক নিচু করে, বঞ্চিত করে।

রশীদ করীম: তোমরা বোধহয় লক্ষ্য কর নি, আমার প্রায় প্রতিটি উপন্যাসে শ্রেণীবৈষম্যের কথা আছে। উত্তম পুরুষ, প্রসন্ন পাষাণ, আমার যত গ্লানি, সোনার পাথরবাটি এবং অন্যান্য উপন্যাসেও যেখানে নায়ক-নায়িকার মিলন ঘটতে পারে নি, সেটা এই কারণে যে, নায়ক-নায়িকা দুই ভিন্ন শ্রেণীর পাত্রপাত্রী। উপন্যাসগুলোতে দেখানো হয়েছে অবস্থাপন্ন পরিবারের লোকেরা সূক্ষ্মভাবে এবং প্রায়ই স্থূলভাবে তাদের চাইতে নিম্নবিত্তের লোকেদের কীভাবে ধিক্কারের চোখে দেখছেন এবং সেই স্বল্পবিত্তেরা শিক্ষিত পরিবারের লোক হয়েও সেই ব্যবহারের সম্মুখীন হয়ে কীভাবে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছেন।

আমার তো মনে হয় শ্রেণীবৈষম্যের চিত্র আমার উপন্যাসের একটি প্রধান লক্ষণ। শ্রেণীবৈষম্যের চিত্র মায়ের কাছে যাচ্ছি উপন্যাসে খুব বড় আকারে উপস্থিত হয়েছে। একটা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করি, এই উপন্যাসে তওফিক বলে একটি চরিত্র আছে, যিনি শেষ পর্যন্ত উন্মাদ হয়ে যান। উপন্যাসে দেখানো হয়েছে যে শ্রেণীবৈষম্যের চাপে খুব মেধাবী ব্যক্তি হয়েও তিনি কীভাবে অবহেলিত, উপেক্ষিত ও কোণঠাসা হয়ে সেই বৈষম্যের প্রভাবেই তাঁর সেই করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে গেলেন।

সাজ্জাদ শরিফ: আপনার উপন্যাসের চরিত্রগুলো প্রায়ই আজগুবি ও উদ্ভট মানসিকতায় ভোগে।

রশীদ করীম: আমার যত গ্লানি, বড়ই নিঃসঙ্গ এবং মায়ের কাছে যাচ্ছি—বিশেষ করে এই তিনটি উপনাসের একটা প্রধান দিক হচ্ছে, রেজিমেন্টেড সোসাইটি ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অধীনে স্পর্শকাতর শিক্ষিত এবং মানবতাবাদী সুস্থ মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা কীভাবে ধীরে ধীরে নানা বাস্তব ও কল্পিত আতঙ্কের কারণে নিজেরাই মানসিক দিক দিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই তিনটি উপন্যাসে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের বিরোধটা দেখানো হয়েছে। সেইজন্যই উপন্যাস তিনটির নায়কদের বিভিন্ন আচরণ বিভিন্ন সময়ে একটু উদ্ভট, খাপছাড়া ও আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক মনে হয়। এর কারণ হচ্ছে যে, সত্যিকার আতঙ্কের কারণ তো আছেই। তার ওপর পরিবেশের চাপে যেখানে আতঙ্কের কারণ নেই, সেখানেও তারা বিপদ দেখতে পায়।

এখন রাইসু তুমি তো আমার উপন্যাসগুলি পড়ার পীড়ন স্বীকার করেছ, তো তোমাকে জিজ্ঞেস করি, সামগ্রিকভাবে আমার উপন্যাস সম্পর্কে কী মনে হয়।

ব্রাত্য রাইসু: সমালোচকের মতো করে তো বলা সম্ভব না। আমাদের এখানে যেসব বই আমি পড়েছি কিন্তু ভালো লাগে নি দেখা যায় সে বইগুলি একটি কেন্দ্রীয় সমস্যা দিয়ে আবর্তিত… মনে হয় লেখক অনেক কষ্ট করে একটভ প্লট আবিষ্কার করেছেন আর এই প্লটের কোনো জায়গাই তিনি ফাঁকা রাখতে রাজী নন। আপনার উপন্যাস প্রতিটিই আলাদা রকম, উপন্যাসের চরিত্রদের সমস্যাগুলি অন্য কোনো সমস্যার উপজাত। তাদের প্রত্যেকেরই মনস্তাত্ত্বিক দিকটি আপনি ভালোভাবে উপস্থাপন করেন, বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করেন, তারা যে খুব একটা উচ্চকিত এমন নয়। আপনার উপন্যাস পড়া যায় বেশ অনায়াসে, ঔৎসুক্যও থাকে আর উপন্যাসের শেষে থাকে একটা বিস্ময় এবং তা পাঠককে পাঠের শেষে, উপন্যাসটি পুণরায় স্মরণ করতে বাধ্য করে আর এভাবেই, বলা যায় আপনার প্রত্যেকটি উপন্যাসই আমি দু’বার করে পড়ি।

আচ্ছা, আপনাদের সমসাময়িক যারা ছিলো বা কিছু পরের, তাদের সঙ্গে আপনারা কীভাবে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করেন?

শামসুর রাহমান: প্রশ্নটা বুঝলাম না।

ব্রাত্য রাইসু: তাদের সঙ্গে আপনাদের সাহিত্যিক সম্পর্কটা কী রকম?

শামসুর রাহমান: সাহিত্যিক সম্পর্ক বলতে আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার জেনারেশনের বা পরবর্তী জেনারেশনের লেখা পড়ি। এবং কারো কারো সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবেও সম্পর্ক ভালো, কারো কারো সঙ্গে সাহিত্য নিয়েও আলোচনা হয়, কারো কারো সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সংযোগ নেই; আগে ছিলো, এখন নেই।

সাজ্জাদ শরিফ: রশীদ ভাই তো বোধহয় খুব একা একা থাকতে পছন্দ করেন?

রশীদ করীম: মানে?

সাজ্জাদ শরিফ: মানে, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে বোধহয় আপনার যোগাযোগটা একটু কম, না?

রশীদ করীম: তরুণ কেন, তরুণ এবং প্রবীণ, আমি চিরকালই খুব গুটিকয়েক লোকের সঙ্গেই আমার ওঠাবসা ছিলো, খুবই সীমিত একটা বৃত্ত। আমি সভাসমিতিতে যাই না, আমাকে কেউ পাত্তাও দেয় না, সুতরাং আমার তেমন যাওয়ার কোনো সুযোগও হয় না, তরুণদের সঙ্গে আমার খুব একটা ওঠাবসা নেই, তরুণই বলো আর সমবয়স্কই বলো আমি যে কেউ আছি এটা তারাও মনে করে না। সুতরাং তাদের সঙ্গে আমার কোনো কম্যুনিকেশন নেই।

সাজ্জাদ শরিফ: রশীদ ভাই, তরুণীদের ক্ষেত্রে বোধহয় এটা প্রযোজ্য নয়। তরুণীদের…

রশীদ করীম: আমি জানি না, তরুণী…। তরুণীদের আমার ভালোই লাগে, কিন্তু আমার একার ভালো লাগাতে তো আর হবে না—

ব্রাত্য রাইসু: তরুণদের এত মূল্য দেয়ার কি আদৌ দরকার আছে? যেমন চারপাশ থেকে তরুণদের মূল্য দেয়া হয়, যেমন বলা হয় তারুণ্য সৎ, বা তারুণ্য উচিত, বা তারুণ্য দরকার, বা তরুণদের দরকার—এগুলো কেন?

শামসুর রাহমান: সেটা স্বাভাবিক, কেননা একসময় যারা দেয়… আমরা, যেমন ধরুন, আমরাও একসময় তরুণ ছিলাম এবং একটা নিউ ফেজ তো আসবেই এবং এই নিউ ফেজটাকে আমাদেরও দায়িত্ব আছে টু নার্স দেম। এখন তরুণদের বিরোধিতা করার আমি কোনো কারণ দেখি না, একসময় আমরাও তরুণ ছিলাম এবং আমাদের পরে যারা তারাও তরুণ ছিলেন এবং আপনারাও তরুণ। আপনাদের পরেও তরুণরা আসবে। যারা আসবে সবাই-ই কিছু সৃষ্টি করবে না, কিন্তু একজনও যদি থাকে, তাকে তো একসেপ্ট করা উচিত। তার সম্পর্কে বলা উচিত, অ্যাজ এ হোল তারুণ্য একজন বৃদ্ধের মধ্যেও তারুণ্য দেখা যায়।

ব্রাত্য রাইসু: সেক্ষেত্রে, যদি বৃদ্ধের মধ্যে তারুণ্য থাকে, তাহলে তো তরুণদের কথা আর আলাদাভাবে উল্লেখ করার দরকার নেই।

সাজ্জাদ শরিফ: না, তাঁর অভিজ্ঞতা আছে এবং তাঁর তারুণ্যের সমন্বয় আছে।

শামসুর রাহমান: কিন্তু সবার মধ্যে থাকে না তো। মেইনলি আমরা এক্সপেক্ট করি তরুণদের মধ্যে তারুণ্য আছে। আবার অনেক তরুণ আছে যারা বৃদ্ধের চেয়েও…

ব্রাত্য রাইসু: হুমায়ুন আজাদ যেমন বলেন…

রশীদ করীম: হুমায়ুন আজাদের লেখায় অনেক আওয়াজ আছে, অনেক রাগ আছে, কিন্তু সব সময় সামঞ্জস্য নেই।

সাজ্জাদ শরিফ: আচ্ছা কিছুদিন আগের যে আমাদের ভোরের কাগজে সাক্ষাৎকার দিলেন, কথাসাহিত্য বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন, ওগুলো সম্পর্কে আপনার কী মতামত?

রশীদ করীম: ওগুলো সম্পর্কে আমার মত হচ্ছে এই যে, তার যা মত তিনি প্রকাশ করেছেন, আমি তোমাকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে একটা কথা বলি, কারণ তাঁর উল্লেখ আছে ওখানে। উনি বলেছেন যে কি ওই চিলেকোঠার সেপাই সম্পর্কে কিছু মন্তব্য, যে কথা আমি আজ থেকে ছ’মাস আগে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম, উপন্যাসটি আমার সেরকম ভালো লাগেনি। এটা তোমরা ছাপবে আমি বলে দিচ্ছি, আমি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে বলছি, কাউকে চটাবারও আমার উদ্দেশ্য নয়, কারো মন রক্ষা করে কথা বলবার বয়েসও আমার নেই। আমি আমার কথা বলি। ’৬৯-এর আন্দোলন নিয়ে নাকি উপন্যাসটা। ’৬৯-এর আন্দোলনের কোনো পরিবেশই আসে নি।

ওখানে কী দেখেছি? একটা পুরানো ঢাকার কতগুলো অলিগলির নাম, রিকশা মিছিল করে ওখানে ঢুকছে, ভয় পেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বারবার এইসব ঘটনা দেখছি। একই বাড়িতে দুটো একই রকমের কারণে একই রকমের গর্ভপাত দেখছি। এই কি উনসত্তরের আন্দোলন! আন্দোলনের কোনো পরিবেশই সেখানে ছিল না।

ব্রাত্য রাইসু: হুমায়ুন আজাদ যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তাতে ঔপন্যাসিক হিসেবে আপনার উল্লেখ নাই। এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

রশীদ করীম: কী আর বলব। তিনি তাঁর মত দিয়েছেন। সে অধিকার তাঁর আছে; সে অধিকার একজন স্কুল-বালকেরও আছে।

সাজ্জাদ শরিফ: বাংলা ছোটগল্পের দিক থেকে হাসান আজিজুল হককে কীভাবে দেখেন?

রশীদ করীম: তিনি পাঁচ-ছ’টি ভালো গল্প লিখেছেন। কিন্তু তিনি দীর্ঘকাল কিছুই লেখেন নি। তাকে আমার একটু অতিপ্রশংসিত মনে হয়। এই কারণে যে, তিনি যা লিখেছেন, তার তুলনায় তিনি যা লেখেন নি, সেজন্যে প্রশংসা লাভ করেন বেশি।

সাজ্জাদ শরিফ: সৈয়দ হক?

রশীদ করীম: সৈয়দ শামসুল হকও কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য গল্প লিখেছেন। তাছাড়া তাঁর কবিতা মনোযোগ লাভের দাবি করে। তিনি সার্থক নাটকও লিখেছেন।

সাজ্জাদ শরিফ: হাসনাত আবদুল হাই?

রশীদ করীম: …আমি তাঁর কথাও বলতে চাচ্ছিলাম। তিনিও কিছু স্মরণীয় গল্প লিখেছেন। তাছাড়া একটি অসামান্য জার্নাল লিখেছেন। তোমরা জান কি না জানি না, তিনি নাটক ও উপন্যাসও লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে তো বলাই বাহুল্য যে তিনি সব মিলিয়ে আমাদের একেবারে শীর্ষস্থানীয় সংস্কৃতিসেবীদের অন্যতম। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও খুব অল্পই লিখেছেন, কিন্তু তাঁরও কোনো কোনো গল্প স্থায়ী দাগ রেখে যায়। আরো অনেকের সম্পর্কে বলা যায়, কিন্তু সেজন্যে অনেক সময় আবশ্যক। কিন্তু আমরা ঢাক পিটিয়ে একবার একে আরেকবার ওকে খুব সহজেই সাহিত্যসম্রাট বানিয়ে ফেলি। আসলে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভুবনটাই ঘোঁটপাকা অবস্থায় আছে। পানি স্থির না হওয়া পর্যন্ত বোঝা যাবে না, কে কোথায় অবস্থা করছে।

ব্রাত্য রাইসু: আবু রুশদ ও শওকত ওসমানের কথাসাহিত্য সম্পর্কে কী মনে করেন?

রশীদ করীম: আমাদের কথাসাহিত্যে আবু রুশদ ও শওকত ওসমান পথিকৃৎ-এর কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁদের অস্ফূট সম্ভাবনা পরিস্ফূট হয় নি। আবু রুশদই মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজ নিয়ে প্রথম গল্প-উপন্যাস রচনা করেন। শওকত ওসমান গ্রাম্যজীবন নিয়ে লিখেছেন। এবং আমি আজ পর্যন্ত এই দেখেছি যে, যারা গ্রাম্যজীবন নিয়ে লিখেছেন, তারাই—গ্রাম্যজীবন নিয়ে লিখেছেন বলেই বাজিমাত করেন। শওকত ওসমানের খ্যাতির প্রধান কারণ আমার কাছে রাজনৈতিক বলে মনে হয়। আমি শওকত ওসমানের লেখার সেরকম অনুরাগী হতে পারি নি।

আচ্ছা, শামসুর রাহমানের গত পাঁচ-ছয় বছরের কবিতা সম্পর্কে কেউ কেউ কিছু কিছু কথা বলেন। কী কথা বলেন আমি বলব না; তোমাদের কী মনে হয়েছে?

ব্রাত্য রাইসু: রাহমান ভাইয়ের কবিতা আমি খুব বেশি পড়ি নি।

সাজ্জাদ শরিফ: আমাদের এখানকার কবিতার ডিকশন প্রায় পুরোটাই তাঁর হাতে তৈরি, আমার মনে হয়েছে। অল্প কারো কারো প্রভাব থাকতে পারে, কিন্তু ম্যাক্সিমাম যে প্রভাবটা সেটা হচ্ছে রাহমান ভাইয়ের। এবং রাহমান ভাইয়ের জন্য যেটা সুবিধা হয়েছে, তিনি বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ভাষা তৈরি করে দিয়েছেন। এটা যেমন তার জন্য প্লাস পয়েন্ট, একইসঙ্গে মুশকিল হয়েছে যে, তাঁর কাছাকাছি মাপের কবি ওভাবে ছিল না। সেই সময়ে তাঁর ইনফ্লুয়েন্স এত প্রবলভাবে পড়েছে সে সমস্ত কবি একই রকম কবিতা লিখতে শুরু করলেন। এবং সেটা রাহমান ভাইয়ের ভাষায়। আমার মনে হয় রাহমান ভাইয়ের কবিতার জন্য এটা হয়তো প্লাস পয়েন্ট, কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের কবিতার জন্য এটা ক্ষতিকর হয়েছে। বিভিন্ন স্রোতগুলো থাকলে হয় কী যে এক ধরনের সচলতা থাকে। তো রাহমান ভাইয়ের পরের দিকে এসে, লাস্ট ছয়-সাত বছর কি আট বছর হবে, তিনি যেই কাব্যভঙ্গি তৈরি করেছেন, যেই প্যাটার্ন তৈরি করেছেন, যে রকমভাবে ভাবছেন কবিতার ক্ষেত্রে, ওখানেই তিনি ঘুরছেন, নিজেকে অনুকরণ করেছেন, ওখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারছেন না। মনে হয়েছিল, এরকমই চলছিল, কিন্তু গত বছর দু-এক ধরে আবার তার কবিতার মধ্যে… তার মানে এই নয়, মাঝখানে যে কবিতা লিখেছেন ভালো কবিতা হয় নি। সেখানেও ভালো কবিতা হয়েছে, হয় নি তা নয়। আমি টোটাল ট্রেন্ডটার কথা বলছি।

ব্রাত্য রাইসু: সামাজিক একটা দায়িত্ব উনি হয়তো বোধ করেন। ফলে ঐ দায়িত্ববোধ থেকে হয়তো কিছু কবিতা ওনার লিখতে হয়। যেগুলো পারপাজ সার্ভ করে।

সাজ্জাদ শরিফ: আরেকটা ব্যাপার, রাহমান ভাই যখন কবিতা লিখতে যান আমার মনে হয় তখন যেন তিনি ফিল করেন, তার চারদিকে লোক বসে আছে, তার ঘাড়ের পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে।

রশীদ করীম: এগুলো একটা নেতিবাচক দিক, ঠিক আছে। যে কথা আমরা শুনলাম, যে এই যদি সব হয়, তো শামসুর রাহমান আমাদের এত বড় কবি কীসের জন্য হবেন?

সাজ্জাদ শরিফ: ওই তো বললাম, আমাদের এখানকার কবিতার ভাষা তিনিই প্রায় তৈরি করে দিয়েছেন।

রশীদ করীম: ভাষা তৈরি করে দিয়েছেন বলেই বড়।

সাজ্জাদ শরিফ: না, এবং তাঁর ক্ষমতা ছিল তো, বড় কবিতার ক্ষমতা এবং এখনও তো আমরা অবাক হই তার রৌদ্র করোটিতে পড়লে, তাঁর নিরালোকে দিব্যরথ পড়লে, এমনকি জীবনানন্দের প্রভাব বলেন অনেকে, তবু আমি বলি প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে পড়লে এখনও… এমনকি পরের অনেক বই, প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে পড়লে, মাতাল ঋত্বিক… আমি তো তাকে খুব একনিষ্ঠভাবে পড়েছি। তো গত দু’বছর ধরে মনে হয় রাহমান ভাইয়ের কবিতার মধ্যে আরেকটা বাঁক চলে এসেছে।

ব্রাত্য রাইসু: অনেকটা আমাদের কবিতার কাছাকাছি।

সাজ্জাদ শরিফ: আমরা তো ব্যক্তিগতভাবে কবিতাচর্চা করি, লিখতে চাই এবং একধরনের নতুন, অন্যভাবে লেখা যায় কি না, লেখার চেষ্টা করছি আমরা অনেকে, সেদিক থেকে দেখছি যে অন্য অনেক প্রবীণ কবিরা এগিয়ে আসতে পারেন নি, পেছনে পড়ে রয়েছেন। কিন্তু রাহমান ভাইয়ের মধ্যে দেখেছি যে একটা বদল ঘটেছে।

রশীদ করীম: শামসুর রাহমানের কবিতার মৃত্যুঞ্জয়ী দিক কোনটা? অবিনাশী দিক কোনটা?

সাজ্জাদ শরিফ: কতগুলো দিক বলতে পারি, আঙ্গিকের দিক বলতে পারি, বিষয়ের দিক বলতে পারি। আঙ্গিকের দিক থেকে বলতে গেলে, ছন্দের দিকে আসি; স্বরবৃত্তে এবং মাত্রাবৃত্তে লিখে একজন কবির কণ্ঠস্বর তৈরি করা, যে একজন কবির নিজস্ব চরিত্রটি কী, খুব কঠিন, আর রাহমান ভাই অক্ষরবৃত্তে একটা নিজস্ব ভঙ্গি তৈরি করেছেন, এরকম দেখাই যায় না। যেমন রফিক আজাদের অক্ষরবৃত্ত ধরা যাক, রাহমান ভাইয়ের মতো… একেবারে…

রশীদ করীম: শামসুর রাহমানের অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত—সবগুলিতেই আছে, দেখো লোকে লাইনের সঙ্গে অন্ত্যমিল দিয়ে লেখে, বাক্যটা সেখানেই শেষ হয়ে যায়, শামসুর রাহমানের একটা বৈশিষ্ট্য এই নয় কি যে অন্ত্যমিল থেকেও গড়িয়ে নিয়ে দিয়ে আবার অন্ত্যমিল থাকছে… এই যে প্রবহমানতা আর কারো কবিতায় এরকম দেখেছ?

সাজ্জাদ শরিফ: রাহমান ভাইয়ের প্রভাবটা পড়েছে পরবর্তীকালে। রাহমান ভাই পাইয়োনিয়ার এসব ব্যাপারে। আর সবচেয়ে বড় কথা আমি যেটা মনে করি, অন্ত্যমিল যদি চোখেই দেখা যায়, তাহলে বোধহয় এটার আকর্ষণটা হারিয়ে যায়। কিন্তু এই যে লাইনটা প্রবহমান থাকছে এবং এর মধ্যেই অন্ত্যমিলগুলি তৈরি হচ্ছে।

রশীদ করীম: অন্ত্যমিলও থাকছে আবার অন্তর্মিলও থাকছে, এবং অন্ত্যমিলেই বাক্যটি শেষ হচ্ছে না।

ব্রাত্য রাইসু: এটাও হতে পারে যে মানুষ না বুঝে রাহমান ভাইকে বড় মাপের কবি বানিয়ে ফেলেছে।

রশীদ করীম: তুমি খুব একটু হস্টাইল মনে হচ্ছে, বুঝলে। তুমি তোমার সৎ মতই দেবে, বুঝলে। এই যে লোকে শামসুর রাহমানকে বড় বানিয়ে ফেলেছে…

ব্রাত্য রাইসু: তা নয়, যেহেতু বানিয়ে ফেলেছে এখন আর নামাতে পারে না। এটা না বুঝে অনেকে বানিয়েছে হয় তো।

রশীদ করীম: আল মাহমুদের কবিতা তোমাদের কেমন লাগে?

ব্রাত্য রাইসু: ভালো, আল মাহমুদের কবিতা আমার ভালোই লাগে। তিনি এখন যে কবিতাগুলি লিখছেন মিথ্যেবাদী রাখাল বা এই গদ্যধর্মী কবিতাগুলি ভালো।

সাজ্জাদ শরিফ: আল মাহমুদের সোনালী কাবিন সম্পর্কে যেরকম বলা হয় তত আমার ভালো লাগে না। বরং অন্য কবিতাগুলো…।

ব্রাত্য রাইসু: রাহমান ভাইকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। রাহমান ভাই, আপনাকে যে প্রধান কবির আসন দেয়া হয়েছে, কারণ কী?

সাজ্জাদ শরিফ: আপনার কী মনে হয়?

শামসুর রাহমান: আমি জানি না।

রশীদ করীম: ও তো আর নিজেই নিজেকে আসন দেয় নি; যারা দিয়েছে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর।

ব্রাত্য রাইসু: এভাবে একটা আসন যদি কাউকে দেয়া হয়, সেটা যদি তাকে গ্রহণ করতে হয়, তাহলে কবিতা লেখা, কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাজ্জাদ শরিফ: ধরা যাক আপনার কাছে তো একধরনের আশা তৈরি হয়, তখন আপনি যখন লিখতে যান কোনো চাপ অনুভব করেন না?

শামসুর রাহমান: একটা কথা, আমি কখনো, যা ফিল করি নি, তা কখনো লিখি নি।

ব্রাত্য রাইসু: যা-ই ফিল করবেন তা-ই বা লিখবেন কেন?

শামসুর রাহমান: সব তো লিখি নি।

ব্রাত্য রাইসু: যখন আপনি নূর হোসেন মারা যাওয়ার পর লিখছেন, তখন মনে হয় আপনি একধরনের সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে লিখছেন এবং এটা হয়েছে ওই যে আপনি প্রধান কবি।

সাজ্জাদ শরিফ: আচ্ছা রশীদ ভাই, আপনার কবিতার প্রতি বেশ আগ্রহ। যেমন আপনার উপন্যাসে মাঝে মাঝে কবিতা ব্যবহার করেছেন।

রশীদ করীম: তুমি কি জান, এক-আধটা যা পড়ি লাগিয়ে দিই আর কি, এতে পাঠকরা খুব ইমপ্রেসড হয়।

সাজ্জাদ শরিফ: আপনি কবিতা অনুবাদ করেও লাগিয়ে দেন, যেটি লাগাতে গেলে প্রথমে কবিতাটি অনুবাদ করতে হয়। আমি দেখেছি ফ্রস্টের কবিতার বেশ ভালো অনুবাদ আপনি করেছেন।

রশীদ করীম: রবার্ট ফ্রস্ট আছে, আর একটা অনুবাদ স্টিফেন স্পেনডারের ফল অব দ্য সিটি—এটা যে কী করে হলো, আমি ছন্দ সম্পর্কে পাকা কিছু জানি না…

সাজ্জাদ শরিফ: বিশুদ্ধ মাত্রাবৃত্তে।

রশীদ করীম: বিশ্বাস করবে না, এক ধাক্কার মধ্যে অনুবাদ করেছি। আমার ওখানে পড়ার ঘরটা খুব ভালো ছিল। সেদিন বোধহয় স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়াও করেছি। ওখানে গিয়ে বসেছি। এক ধাক্কায় ওটা।

সাজ্জাদ শরিফ: স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করলে কি ক্রিয়েটিভিটির মাত্রা বেড়ে যায়।

রশীদ করীম: তবে ফ্রস্টের অনুবাদে আমি তোমাকে বলব…

শামসুর রাহমান: আমার মনে হয়, উনি কবিতা যথেষ্ট পড়েন। ভালো লাগলে সেটা বলতে দ্বিধা করেন না। সে একেবারে নামজাদাও হতে পারেন, অখ্যাতও হতে পারেন। এবং আমার ধারণা উনি খুব ভালো কবিতা বোঝেন।

সাজ্জাদ শরিফ: আমারও তাই ধারণা।

রশীদ করীম: একটা জিনিস হচ্ছে যে ফ্রস্টের অনুবাদগুলো, আমার বিশ্বাস খারাপ হয় নি, কিন্তু ফ্রস্টের এই অনুবাদগুলির জন্য আমি কিন্তু শামসুর রাহমানের কাছে ঋণী। শামসুর রাহমান যদি ফ্রস্টের অনুবাদগুলি আগে না করতেন, যদি আমি লেগেসি হিসাবে না পেতাম তাহলে আমি এই অনুবাদগুলি করতে পারতাম কি না খুবই সন্দেহ। তবে ওইটা, স্পেন্ডারের ওটার জন্য আমি শামসুর রাহমানের কাছে কোনোদিক দিয়েই ঋণী নই।

সাজ্জাদ শরিফ: আপনি গোপনে গোপনে কবিতাচর্চা করেন বা করতেন?

শামসুর রাহমান: গোপনে লিখলে আমি জানতাম।

ব্রাত্য রাইসু: রাহমান ভাই সেটা জানতেন কীভাবে! আপনারা কি আর গোপনে একসঙ্গে লিখতেন?

শামসুর রাহমান: কবিতা লিখলে কাউকে না কাউকে তো জানাতে হবেই।

ব্রাত্য রাইসু: আপনারা দু’জন তো খুব ভালো বন্ধু, না?

শামসুর রাহমান: আশা করি।

রশীদ করীম: আশা করি।

১৪ মে ১৯৯২, ভোরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত

২. সাক্ষাৎকার ১৯৯৪

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: রাত্য রাইসু

rk333.jpg
ধানমণ্ডির বাসায় স্ত্রী সালিমা মুরশেদের সঙ্গে রশীদ করীম; ছবি. নাসির আলী মামুন ২০০৬; PHOTOSEUM

রেকর্ডারে সাক্ষাৎকার দিতে আপনার আপত্তি কেন?

এইজন্য যে, আমি আমার অসুখের কারণে অনেক উল্টোপাল্টা কথা বলি। এ ছাড়া রেকর্ডারে তোমাকে বহুবার ভুল সংশোধন করতে হতো।

আপনি লেখালেখি করেন না কত দিন?

প্রায় দু’বছর। যখন থেকে আমি স্ট্রোকের শিকার হয়েছি। তার আগে দু’ তিন কাগজে সাপ্তাহিক কলাম লিখতাম। খুব মন্দ হতো না কিন্তু কলামগুলো।

লিখতে পারছেন না যে, আপনার অনুভূতি কী এতে?

এতে অনুভূতি এই যে, আমি সম্পূর্ণ নিষ্ফল মানুষ। আমি একথা বলব না যে, শুধু লেখার জন্যই বেঁচে ছিলাম। কারণ নিসর্গ আছে, মানুষের ভালোবাসা আছে–ইত্যাদির মূল্য অনেক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখাই আমার প্রিয়তম বিষয় ছিল।

শারীরিক অসুস্থতার পরেও তো অনেকে লেখালিখি করেন। আপনি ডান হাতে লিখতে পারছেন না, সেক্ষেত্রে বাঁ হাত বা অন্য কারো সাহায্যে তো লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারতেন। আপনি কী মনে করেন?

আমার বন্ধু শামসুর রাহমান এবং সৈয়দ আলী কবীর প্রায়ই আমাকে বলেন, শারীরিক অক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে আবার লিখতে। তাঁরা মনে করেন যে, শরীরটা শুধু অবশ হয়েছে কিন্তু চেতনা আমার সঠিক ও সজাগ আছে। কিন্তু তাঁরা জানেন না যে, সকাল বেলার পরেই আমি একেবারে অথর্ব হয়ে যাই। সকাল বেলা তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় হয়তো মোটামুটি ঠিকই বলি। কিন্তু সাহিত্য করবার জন্য চিন্তার যে সংলগ্নতা আবশ্যক তা দু’চার মিনিটের বেশি আমি রক্ষা করতে পারি না। শুধু সাহিত্য কেন, সব বিষয়েই এ রকম হয়।

আপনি তো বেশ অনেকক্ষণ উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। এতে তো কোনো অসংলগ্নতা দেখছি না?

কোনো কোনো দিন আমার মাথা বেশ স্বচ্ছভাবে কাজ করে। তাও কিছুক্ষণের জন্য। তোমাদের প্রশ্নগুলো এতই সুপরিচিত যে উত্তর দিতে বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু এই চিন্তা যদি আমাকে সংলগ্নভাবে করতে হতো তাহলে আমি ব্যর্থ হতাম। আমি আমার স্ত্রীর নাম ভুলে যাই; কন্যার নাম ভুলে যাই, মনের মধ্যে অনেক কথা আকুলি-বিকুলি করে প্রকাশের জন্য, কিন্তু চুপ করে থাকি। কারণ কী ভাষায় তা প্রকাশ করব সেটাই মনে থাকে না। আমার শরীর তো যথেষ্ট হলো, আর কী?

বইপত্র পড়েন?

খবরের কাগজ আমি পড়ি না। খুব ইম্পোর্টেন্ট খবরের প্রতি আমার স্ত্রী আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এবং সেই খবরের হেডিং এবং কিছু অংশ কোনোমতে পড়ে নিই। স্ট্রোকের পর গোড়ার দিকে আমি বহু কষ্ট করে হলেও কতকগুলো উপন্যাস পড়ে ফেলেছি। এখনও শামসুর রাহমানের কলাম আমি পড়ে ফেলি; তারপর সারাদিন চোখের ব্যথায় ভুগি।

সাহিত্যকে আপনি এখন কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করছেন?

জেনারেশন গ্যাপ বলে একটা জিনিস আছে। বর্তমান জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা সাহিত্যকে যেভাবে দেখে অথবা হয়তো সাহিত্যের কেয়ারই করে না। আমাদের বেলায় তা ছিল না। আমরা যেসব সাহিত্যিককে বড় মনে করেছিলাম বর্তমান ছেলেমেয়েরা তা করে কিনা ভেবে দেখতে হয়। এমনকি বয়স্ক কবি-সাহিত্যিকরা ভেবে দেখতে পারেন যে, তাঁদের বাণী বর্তমান প্রজন্মের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে কি না কিংবা আদৌ পৌঁছাচ্ছে কি না। কিংবা তাঁদের বাণী কি তার যথার্থতা এখন হারিয়ে ফেলেছে? আমি সত্তর স্পর্শ করতে চলেছি। সেই পুরনো যুগের লোক। আমার মন তো বাঁধা আছে সেই পুরাতন মূল্যবোধে।

আপনার প্রিয় লেখাগুলো সম্পর্কে যে ধারণা আপনার ছিল যখন আপনি সক্রিয় লেখক-পাঠক এখন তার কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে কি? ঘটলে কী রকম? সেই পরিবর্তনটা আপনি কীভাবে নিচ্ছেন?

আমার প্রিয় লেখকরা তাঁদের সময়কার মূল্যবোধ অবলম্বন করে গল্প উপন্যাস লিখেছেন। আমিও সেই সময়কার লোক। এখন ছেলেমেয়েরা বদলে গেছে, এমনকি সমাজও বদলে গেছে। সুতরাং তখনকার সৃষ্ট সাহিত্যের যে আবেদন আমার কাছে ছিল তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে নেই, আমি অলসভাবে চিন্তা করি, আমরা ঠিক নাকি তারা ঠিক। জেনারেশন গ্যাপ বস্তুটি আজকাল যে রকম দ্রুত হচ্ছে আমাদের আমলে হতো না। তার প্রধান কারণ টেলিভিশন ও অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার প্রতাপ।

আপনার মনে কি নতুন কোনো উপন্যাসের বীজ আছে? যা খুব চেষ্টা করলে আপনি লিখে ফেলতে পারেন?

সঠিক অর্থে বীজও নেই এবং পরিকল্পনাও নেই। তবে কোনো কোনো দৃশ্য ভাসমান হয়ে আসে। কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই তা পলাতক হয়। তবে সেই দৃশ্যগুলো ছেঁড়া-ছেঁড়াভাবে অনেকগুলো আসে। সেগুলো আমার পূর্বের উপন্যাসের মতো নয়। সেগুলি অনেক বেশি বর্তমানকালের রিয়ালিজম আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু স্বল্পকালীন তাদের মেয়াদ বলে তা লেখায় চিরস্থায়ী হতে পারে না।

প্রসন্ন পাষাণ উপন্যাসটি একজন মহিলার জবানিতে লেখা। মহিলার জবানিতে লিখতে গিয়ে পুরুষ হিসেবে কী সমস্যায় আপনি পড়েছেন?

আমি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে একটি মেয়ে হিসেবে কল্পনা করেছিলাম। সুতরাং সমস্যা তেমন দেখিনি এবং কল্পনা করা যাক যে, মেয়েটি লেখকের কাছে খুবই পরিচিত। সুতরাং তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লেখকের খুব জানা। এইজন্য আরো নিজেকে মেয়ে হিসেবে কল্পনা করা সহজ হয়েছে। তবে সত্যি কতটা হয়েছে তা তো বিচার করবে পাঠকরা। বিশেষ করে পাঠিকারা।

নারী বিষয়ে প্রশ্ন করি। মেয়েদের প্রতি আপনার অনুরাগ কোন বয়সে প্রথম শুরু হয়?

কোনো কোনো মেয়ের প্রতি আমার প্রগাঢ় ভালোবাসা জন্মে আমার অজ্ঞাতসারে। সেই শৈশবস্থা হতে। আমি শৈশবে তিনজন মেয়েকে ভালোবাসি। এবং বয়স হলে একটি মেয়েকে। এদের কারো সঙ্গেই আমার বিবাহ হয়নি। এদের মধ্যে দুজন মৃতা। বাকি দুজন সেই বয়স থেকে আরম্ভ করে আজকে এত বদলে গেছেন যে, তাদের আমি ভালোবাসি বলতে পারি না। তারা সেই বয়সে যেমন ছিলেন, বিবাহিত জীবনে ঠিক সেভাবে ডেভেলপ করেননি। তবে আমি একটি কথা চিন্তা করেছি। একসঙ্গে কি চারটি মেয়েকে ভালোবাসা যায়। উত্তর পেয়েছি যে হ্যাঁ, যায়। কোনো একটি মেয়ের মধ্যে বা দুটি মেয়ের মধ্যে জীবনের সব গুণ থাকে না। বহু গুণ ছড়িয়ে আছে চতুর্দিকে। একেকজন সেই গুণের কিছু অংশ ধারণ করে থাকেন।

এখন কোনো নারীর প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করেন?

এখন আমি কোনো নারীর প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ বোধ করি না। শুধু আমার স্ত্রী ছাড়া। তার মানে এই নয় যে, আমাদের তুমুল ঝগড়াঝাটি হয় না।

পরকীয়া প্রেমকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমরা একটা সমাজে বাস করি। অঙ্গীকার করে একজন মহিলাকে বিয়ে করেছি। আমাদের প্রাণপণ চেষ্টা হওয়া উচিত সমাজের শৃঙ্খলাকে রক্ষা করা। তবে মানুষ অনেক সময় নিরুপায় হয়ে যায়। এসব বিষয়ে সংযত হওয়া ও সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা করা উচিত। হালকাভাবে গা ভাসিয়ে দিয়ে পরকীয়া প্রেম আমি সমর্থন করি না। আর যদি পরকীয়া প্রেম করবই তো বিবাহের শৃঙ্খলার অর্থ কী? অনন্যোপায় হয়ে হয়তো একজন নারী বা একজন পুরুষ তার বর্তমান স্বামী বা স্ত্রীকে অনুমোদন করছে না; তখন তাদের অন্যপথ দেখতে হয়।

আপনার যে অসুস্থতা এটি কি কোনোভাবে আপনার জীবনদর্শনকে প্রভাবিত করছে?

সুস্থ মানুষ আসলে অসুস্থ মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ওঠাবসা করতে পারে না। হয়তো সুস্থ মানুষের ভালোবাসা অসুস্থের জন্য অপরিবর্তিতই থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা আগের মতো সঙ্গ দেন না। এরজন্য তাদের দোষ দেয়া যায় না একেবারে। তাদের জন্য আছে মুক্ত নিসর্গ, ভালোবাসার বিশাল ক্ষেত্র, জীবন উপভোগ করবার বহু রাস্তা। তারা তাহলে এসব বাদ দিয়ে কেন অসুস্থতার সঙ্গে বসবাস করবে? তবে তাদের ভালোবাসা অটুট থাকে।

এই উপলব্ধি কি আপনার মধ্যে কোনো অভিমান তৈরি করে?

না, বিন্দু মাত্র না। জীবন এ রকমই হয়। আমি নিজে হলেও এ রকম ব্যবহারই করতাম। তাদের যেমন আমার প্রতি ভালোবাসা অকৃত্রিম, আমারও সেই রকম।

আমাদের লেখকসমাজ সম্পর্কে কিছু বলবেন?

তোমরা আমার বিষয়ে সংখ্যা প্রকাশ করছ। এ কারণে আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার ঢের আগে শামসুর রাহমানের বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হওয়া উচিত ছিল। এই মাসের ২৩ তারিখে তাঁর জন্মদিন। তাঁর জন্য কিছু করো না। তোমরা আরেকটা মস্ত ভুল করো। বর্ষীয়ান লেখকদের তোমরা ভুলে যাও। আবু রুশদ, শওকত ওসমান, আবুল হোসেন এঁদের বিশেষ সংখ্যা বেরিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তা ছাড়া সৈয়দ আলী আহসানকে ভুলে গেলে চলবে না। কিন্তু আমাদের মুশকিল এই যে রাজনীতি আমাদের ব্যক্তিত্বকে ভুলিয়ে দেয়। তুমি সাধারণভাবে লেখকদের কথা জিজ্ঞেস করেছ। সৈয়দ শামসুল হক আমাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এ ছাড়া আছেন আল মাহমুদ। আছেন শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা প্রমুখ। গল্প লেখকদের মধ্যে সরদার জয়েনউদ্দীন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হাসান আজিজুল হক, হাসনাত আবদুল হাই, মাহমুদুল হক, শওকত আলী প্রমুখ। আমি মনে করি যে, এই মুহূর্তে যাঁরা গল্প লিখছেন তাঁদের মধ্যে হাসনাত আবদুল হাই শ্রেষ্ঠ। আমি এলোপাথাড়ি কতকগুলো নাম বলে গেলাম। হয়তো বহু নাম বাদ পড়ে গেল।

ঔপন্যাসিক সম্পর্কে বলেননি?

আবু রুশদ ও শওকত ওসমান উপন্যাসও লিখেছেন। তা ছাড়া সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আমাদের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর সম্পর্কেও বলা উচিত।

আমাদের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ; তাঁর লেখা পড়েছেন?

হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল লেখক ছিলেন। এখনও তাঁর পথ-পরিবর্তনের সময় আছে। কিন্তু তিনি অজস্র ধারায় এত বেশি লিখছেন যে উপন্যাসগুলোর প্রশংসা করা কঠিন। তা ছাড়া আছেন রাহাত খান, ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, মঞ্জু সরকার এবং কায়েস আহমেদের প্রশংসা শুনেছি শামসুর রাহমানের কাছে, কিন্তু আমি তাঁর লেখা পড়িনি। তা ছাড়া রাজিয়া খান, শামস রশীদ, রাবেয়া খাতুন, রিজিয়া রহমান, সেলিনা হোসেন–এঁরা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন।

তসলিমা নাসরিনের অবদান সম্পর্কে বলুন।

তসলিমা নাসরিনের কবিতা ও কলাম বেশ ভালো লিখেছেন। কিন্তু তাঁর কলামে প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে আমি সবসময় একমত হতে পারি না। কিন্তু দ্বিমত হলেই কি লেখার প্রশংসা করা যাবে না? তাঁর উপন্যাস আমার তেমন ভালো লাগেনি।

আপনার স্ত্রী সম্পর্কে কিছু বলুন।

আমার স্ত্রী সালিমা মুরশেদের মতো কর্তব্যনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মভীরু ব্যক্তি আমি দ্বিতীয়জন দেখিনি। তাঁর ওপর আমি অনেক অত্যাচার করি। তিনি হয়তো সাময়িক রাগ করেন, যেমন আমার নিজের রাগটিও সাময়িক। তার এখন কিঞ্চিৎ বয়স হয়েছে, কিন্তু এককালে তিনি পরমা সুন্দরী ছিলেন। যে কারণে আমার প্রাকবিবাহ প্রেম-অভিজ্ঞতাগুলো ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। যখন তিনি প্রসন্ন মেজাজে থাকেন তখন আমার অসহায় অবস্থা দেখে তিনি কাঁদেন। তা ছাড়া আমাদের মেয়ে নাবিলা, নাতনি তিশনা ও জামাতা মুশাহেদের জন্য নীরব অশ্রুপাত করেন। কারণ তারা দীর্ঘকাল আমেরিকায় বসবাস করছেন। শামসুর রাহমান আমার গত বছরের জন্মদিনে বলেছিল যে আমার স্ত্রীর অক্লান্ত সেবা বস্তুত বাংলা সাহিত্যকে সেবা করা।

আপনার প্রাকবিবাহ প্রেমগুলো কীভাবে নিয়েছেন আপনার স্ত্রী?

আমার স্ত্রী কখনো আলোচনা করেনি। কিন্তু ও-সবই তো বিগত। সেজন্য চিন্তা করে না। অবশ্য এখনো রাগান্বিত হলে তিনি বলেন যে, ওদের একজনকে বিয়ে করলেই তো ভালো করতে।

আপনার এখন ৬৯ বছর বয়স হয়েছে। এই বয়স কি আপনাকে বিচলিত করে?

সুস্থ থাকলে মৃত্যুচিন্তা আমার কাছে অনভিপ্রেত মনে হতো। কিন্তু বর্তমানে আমি উদাসীন।

৭ অক্টোবর ১৯৯৪, বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত

—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: সাজ্জাদ শরিফ
ইমেইল: sajjadsharif_bd@yahoo.com

আর্টস-এ প্রকাশিত লেখা


রোদ্দুরের আয়োজনে কবিদের আড্ডা
মাসুদ খানের সঙ্গে আলাপ, ১৯৯৩

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ব্রাত্য রাইসু
ইমেইল: bratya.raisu@gmail.com

আর্টস-এ প্রকাশিত লেখা


রশীদ করীমের দুটি সাক্ষাৎকার
রোদ্দুরের আয়োজনে কবিদের আড্ডা
মাসুদ খানের সঙ্গে আলাপ, ১৯৯৩
ভাঙা গড়ার রবীন্দ্রনাথ: প্রাচ্যনাট-এর ‌’রাজা …এবং অন্যান্য’
এবারের মেলায় আপনার কী বই বের হলো…
বিষয় ‘‌‌বুদ্ধিজীবী’: আজফার হোসেনের সঙ্গে আলাপ
আল মাহমুদ ও জয় গোস্বামীর সঙ্গে আলাপ
ফয়েজ আহ্‌মদের সঙ্গে আলাপ


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আফসান — december ২, ২০১১ @ ১১:০৪ অপরাহ্ন

      চমৎকার এই দুটি সাক্ষাতকারের জন্য আমার আন্তরিক অভিনন্দন ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কৌশিক আহমেদ — december ৮, ২০১১ @ ৯:০৮ পূর্বাহ্ন

      রত্ন চিনি নাই। বিরলপ্রজন্ম মানুষ। এক সাক্ষাৎকার পড়েই আমি বিমূঢ় হয়ে আছি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com