রশীদ করীম-এর প্রবন্ধ

সাহিত্যে সেন্টিমেন্টালিজম

| ২৮ নভেম্বর ২০১১ ৩:৫৬ অপরাহ্ন


লেখক যখন পাঠক, কিংবা অপর একজন লেখকের অভিমত প্রার্থী হন, তখন অভিমতের আনুকূল্যই প্রত্যাশা করেন—বিরূপ-মত নয়। অর্থাৎ উক্তি বলতে তাঁরা সদুক্তিই বোঝেন, কটূক্তির অবকাশ অস্বীকার করেন। তাই যখন সমালোচক লেখককে বাধিত করতে পারেন না, তখন লেখক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। লেখকের এই উষ্মা যদি বা স্বাভাবিক হয়, কিন্তু কদাপি শোভন বা সঙ্গত নয়।

কোন কোন লেখক সমালোচনা শুনে এতই বিচলিত হয়ে পড়েন যে, তৎক্ষণাৎ তাঁর শব্দযন্ত্র বিভিন্ন আর বিচিত্র সঙ্কীর্তন শুরু করে দেয়। সমালোচকের মস্তক উদ্দেশ করে ইষ্টক হয়তো নিক্ষিপ্ত হয় না, কিন্তু যেসব সপ্রেম আশীর্বচন ঝরে পড়ে, বলা বাহুল্য, তা শিরোধার্য করবার মতো বস্তু নয়।
—————————————————————–

আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেই কি না জানি না, তাঁদের মধ্যে একটি ব্যাপারে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উভয়েই সেন্টিমেন্টালিজমের রেলগাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন, কিন্তু একটু পর প্রথম স্টেশনেই, রেলগাড়ির কামরা থেকে পা বাড়িয়ে, সাহিত্য বিচারের প্লাটফর্মের উপর নেমে এলেন।

—————————————————————–
ভরসার কথা কেবল এই যে বাক্যবাণে অস্থি বিধ্বস্ত বা চূর্ণ হয় না, বিশেষ করে, যে বাক্যের মর্মে যুক্তি নেই তা কখনই লক্ষ্যভেদ করতে পারে না। হাঁসের গায়ের পানির মতোই তা ঝেড়ে ফেলা সম্ভব।

কোন সাহিত্য সৃষ্টিকে সকলেই একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেন, এমন কোন কথা নেই। দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন এমন কি বিপরীত হলেও, দুটির একটি ঠিক এবং অপরটি ঠিক নয়, যুক্তিশাস্ত্রের এ বিধান সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে গ্রাহ্য নয়। বস্তুত দুটি ভঙ্গিই সমান সত্য বা সমান অসত্য হতে পারে। কারণ সাহিত্য অতি বর্ণাঢ্য ও বহু ব্যঞ্জনাময় এক বস্তু।
—————————————————————–


কোমলতা, অন্তর্মুখিতা আর চিন্ময়তা যদি বাংলা সহিত্যের বৈশিষ্ট্য হয়; তাহলে সেই দিক দিয়ে ইংরাজি সাহিত্যও বাংলার দোসর। এবং অন্তত আমার মতে সে কারণে ইংরাজি বা বাংলা কোন সাহিত্যই দুষ্ট হয়নি, বরঞ্চ সমৃদ্ধ হয়েছে।

—————————————————————–
আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই বিষয়ে আলোচনা করেছেন বলেই কি না জানি না, তাঁদের মধ্যে একটি ব্যাপারে আশ্চর্য মিল দেখা যায়। উভয়েই সেন্টিমেন্টালিজমের রেলগাড়িতে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন, কিন্তু একটু পর প্রথম স্টেশনেই, রেলগাড়ির কামরা থেকে পা বাড়িয়ে, সাহিত্য বিচারের প্লাটফর্মের উপর নেমে এলেন। সেন্টিমেন্টালিজম সম্বন্ধে এঁদের ধারণাও আমার কাছে শাস্ত্রসম্মত মনে হয় নি। তাই সেন্টিমেন্টালিজম-এর দৃষ্টান্ত হিসেবে তাঁরা যে সব উদ্ধৃতি উপস্থিত করেছেন সাহিত্য হিসাবে সেগুলোর উৎকর্ষে ইতর বিশেষ আছে বটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো অন্তত সেন্টিমেন্টালিজম-এর নজির নয়।

প্রথমে, এবং প্রধানত, আবুল হোসেনের প্রবন্ধের কথাই ধরা যাক। আবুল হোসেন বলছেন: “ইংরেজের মন যেখানে বাস্তবমুখী, সত্যানুসন্ধিৎসু, ব্যঙ্গনিপুণ, তত্ত্ব ও তথ্যে উজ্জ্বল, এক কথার জীবনধর্মী, বাঙালী লেখকের মন সেদিকে অল্পই আকৃষ্ট হয়েছে।”

একটু দম নিয়ে আবুল হোসেন পুনশ্চ যোগ করেছেন: “ফরাসীরা যে-দৃশ্য দেখে আঃ উঃ করবে, চিৎকার করবে, ইংরাজরা তাকে ‘মন্দ নয়’ বলে হয়ত একটু ঘাড় বাঁকাবে।”

অর্থাৎ আবুল হোসেন বোধ করি বলতে চান, ইংরেজদের মনের মধ্যে একটি দাড়ি-পাল্লা লম্বমান আছে, তারই নিক্তিতে ওজন হবার পর ইংরেজদের যে হৃদয়াবেগ প্রকাশ পায়, তার মধ্যে হৃদয়ও নেই আবেগও নেই। ইংরেজরা বণিকের জাত, নেপোলিয়নের সেই কুখ্যাত উক্তিই এই ধারণার পেছনে কাজ করছে।

কিন্তু বাঙালী আর ফরাসীর অভিমত যাই হোক, একজন খাস ইংরাজ তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কি বলেন, এবার তাই শোনা যাক্। লর্ড ডেভিড সিসিল ইংলণ্ডে ডিকেন্সের অপ্রতিহত জনপ্রিয়তা সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছেন:
“So that in every country, every walk of life Dickens strikes a responsive chord in the hearts of mankind. And especially in England. The English, the kindly, individualistic, illogical sentimental English, are more than any other people touched by impulsive benevolence: Instructive good nature set a value on homely satisfactions. More than any other people they are repelled by the ruthless and impersonal–in thought, or religion, or administration, or economics—Nor have they much perception of those purely intellectual values that Dickens’ view of life overlooks.”

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইংরাজ সম্পর্কে আবুল হোসেনের ধারণার সঙ্গে লর্ড ডেভিডের ধারণার ঐক্য নেই।

ইংরাজি সাহিত্যে ভাবাবেগের অভাব আছে আবুল হোসেন এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ কথাও বলেছেন। এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি স্মরণীয়। জীবনস্মৃতির ভগ্ন হৃদয় অধ্যায়ে কবি বলছেন:
“তখনকার দিনে আমাদের সাহিত্যদেবতা ছিলেন, শেকসপীয়র, মিলটন, বায়রণ। ইহাদের লেখার ভিতরকার যে জিনিসটা আমাদিগকে খুব করিয়া নাড়া দিয়াছে, সেটা হৃদয়াবেগের প্রবলতা। এই হৃদয়াবেগের প্রবলতাটা ইংরেজদের লোক ব্যবহারে চাপা থাকে কিন্তু তাহার সাহিত্যে ইহার আধিপত্য যেন সেই পরিমাণে বেশী। হৃদয়াবেগকে একান্ত আতিশয্যে লইয়া গিয়া তাহাকে একটা বিষম অগ্নিকাণ্ডে শেষ করা, এই সাহিত্যের একটা বিশষ স্বভাব। অন্ততঃ সেই দুর্দাম উদ্দীপনাকেই আমরা ইংরেজি সাহিত্যের সার বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলাম। রোমিও জুলিয়েটের প্রেমোন্মাদ, লিয়রের অক্ষম পরিতাপের বিক্ষোভ, ওথেলোর ঈর্ষানলের প্রলয় দাবদাহ, এই সমস্তেরই মধ্যে যে একটি অতিশয়তা আছে তাহাই তাঁহাদের মনের মধ্যে উত্তেজনার সঞ্চার করিত।”

অতএব, আমরা এটাও দেখতে পাচ্ছি যে ইংরাজি সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য আর লক্ষণ সম্পর্কেও দ্বিমতের অবকাশ আছে। কোমলতা, অন্তর্মুখিতা আর চিন্ময়তা যদি বাংলা সহিত্যের বৈশিষ্ট্য হয়; তাহলে সেই দিক দিয়ে ইংরাজি সাহিত্যও বাংলার দোসর। এবং অন্তত আমার মতে সে কারণে ইংরাজি বা বাংলা কোন সাহিত্যই দুষ্ট হয়নি, বরঞ্চ সমৃদ্ধ হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের বর্ষামঙ্গল কবিতাটিতে বক্তব্যের স্বল্পতা ও ধ্বনির বাহুল্য আছে বলে, এবং নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটির অর্থ আবুল হোসেনের বোধগম্য নয় বলে, দুটিকেই তিনি সেন্টিমেন্টালিজম-এ দুষ্ট বলে নাকচ করেছেন। প্রথমত বর্ষামঙ্গল নাকচ করবার মতো কবিতা নিশ্চয়ই নয়; দ্বিতীয়ত বক্তব্যের স্বল্পতা ও ধ্বনির বাহুল্যের অপরাধ যতই থাক, সে অপরাধ সেন্টিমেন্টালিজম-এর নয়। বিদ্রোহী কবিতাটি অন্তত আমার কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়নি, এবং কবিতার শেষ দুটি ছত্র সম্বন্ধে আবুল হোসেন আপত্তি করলেও, সেগুলো আমার কাছে সুসম্পৃক্ত বলেই মনে হয়েছে এবং সমগ্র কবিতাটি বুঝবার পক্ষে সহায়ক বলেই মনে হয়েছে। সে যাই হোক, দুরাহতাও সেন্টিমেন্টালিজম-এর লক্ষণ নয়। বাঙালী সেন্টিমেন্টালিজম-এর চারিত্র্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আবুল হোসেন বলেছেন: “মনে করুন সন্ধ্যেয় আপনি ওষুধ কিনতে বেরিয়েছেন। বাড়িতে ছেলের অসুখ। রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন, হঠাৎ চোখে পড়ল আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে, ফিনকি দিয়ে জ্যোৎস্না ছুটছে—আপনি ছেলের অসুখের কথা ভুলে গেলেন, ওষুধ কেনা মাথায় উঠল।”

আবুল হোসেন বর্ণিত চন্দ্রাহত ব্যক্তিটির দৃষ্টান্তে আমরা নিজেরাই বজ্রাহত হয়ে গেছি। প্রতিপাদ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে hypothetical case-এর উত্থাপন সমালোচনা সাহিত্য গ্রাহ্য বটে কিন্তু mental case সম্পর্কেও কি এই কথা খাটে?

এই ধরনের চরিত্র কেবল ননসেন্স লিটারেচারেই শোভা পায়। ননসেন্স লিটারেচারের উল্লেখে সুকুমার রায়ের কথা মনে পড়ে গেল। দর্জির ফিতে থেকে সব রকম চিহ্ন মুছে গেছে, কোনমতে একটুখানি লেগে আছে—সাত ইঞ্চি। দর্জি মাপ নিচ্ছে: কোমর সাত ইঞ্চি, ছাতি সাত ইঞ্চি, হাতা সাত ইঞ্চি, লম্বা সাত ইঞ্চি।

ঠিক স্মরণ নেই, ফিতেয় সাত ইঞ্চির চিহ্নটাই অবশিষ্ট ছিল, কিংবা অন্য কোন এক বিশেষ চিহ্ন। তবে একটিমাত্র চিহ্নই অবশিষ্ট ছিল।

আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও সাহিত্য জরিপ করতে বসে সবখানে সেণ্টিমেন্টালিজম-ই দেখেছেন।

সেন্টিমেন্টালিজম-এর সংজ্ঞা কি এখানে তার আলোচনা প্রয়োজন। পুনরায় লর্ড ডেভিড সিসিল-এর স্মরণ নেয়া যাক। তিনি বলছেন: Pathos can be most powerful of all the weapons in the novelists, arsenal. But it is…dangerous to handle. The reader must feel convinced that the story inevitably demands that a direct attack be made on his tender feeling. It he once suspects that his emotions are being exploited, his tears made to flow by a cold-blooded machination on the part of the author, he will be nauseated instead of being touched…… He tries to wring an extra tear from the situation: he never lets it speak for itself.

লেখক যখন জনপ্রিয়তা কিংবা পসারের লোভে পাঠকের করুণার উদ্রেক করেন তখনই তিনি ভাবালুতার আশ্রয় নিচ্ছেন। অর্থাৎ পাঠকের চিত্তজয় করবার জন্যে তার তূণে যতগুলো বাণ আছে, সেগুলোর মধ্যে সবচাইতে অব্যর্থ হচ্ছে সেন্টিমেন্টালিজম। কিন্তু লর্ড ডেভিড এ কথাও বলছেন, পাঠক যদি ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করে যে তার কোমলতার অন্যায় সুযোগ নেয়া হচ্ছে, তাহলেই সে বেঁকে বসবে—সমস্ত ব্যাপারটাই তার কাছে ন্যক্কারজনক মনে হবে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে: বেঁকেই যদি বসবে, তাহলে লেখক সে অস্ত্র প্রয়োগ করবেন কেন? কিন্তু টম ভিক আর হ্যারি বেঁকে বসে না, বরঞ্চ হাহুতাশ করে কাঁদতে বসে। বেঁকে বসেন Oscar Wilde তাই তিনি বলতে পারেন: “Little Nell-এর মৃত্যু দেখে হাস্য-সংবরণ করতে পারবে না কেউ—অবশ্য তার হৃদয় যদি পাষাণ না হয়।” ডিকেন্স অবশ্য আশা করেছিলেন, পাষাণ হৃদয় না হলে, সে কাঁদতে বসবে।

কিন্তু এই সংজ্ঞার অর্থ এ নয় যে, লেখক যেখানেই কোমলবৃত্তিগুলোর খেলা দেখবে, যেখানেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছটা দেখবে, যেখানেই সহৃদয় সংবেদনশীলতার সিক্ততা দেখবে, সেখান থেকেই সভয়ে পিছপা হবে। অথচ আবুল হোসেন আর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই জিগিরই তুলেছেন। তাহলে তাঁদের কাছে কি সেই রকম জগৎই কাম্য Aldous Huxley A Brave New World-এ যার দুঃস্বপ্ন দেখেছেন?

আবুল হোসেনের প্রবন্ধে কতগুলো স্ববিরোধিতাও চোখে পড়ে। একটি দৃষ্টান্ত দিই।

আবুল হোসেন এক স্থানে বলছেন:
“কথাটা শুনতে যতই খারাপ লাগুক অস্বীকার করার উপায় নেই যে, গত সত্তর-পঁচাত্তর বছর ধরে আমরা যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছি তার সবটাই সমসাময়িক হিন্দু সমাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত।”

এই প্রসঙ্গে আবুল হোসেন মীর মোশারফ হোসেন এবং কাজী নজরুল ইসলামের উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু একটু পর তিনিই বলছেন:
“আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি সেই মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল ইসলামের লেখায় গত একশ’ বছরে যেসব বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই তা ‘একান্ত-ভাবেই’ ইংরেজের কাছে শেখা।”

এখন আমার প্রশ্ন: নজরুল ইসলাম একাধারে সবটাই হিন্দু সমাজের দ্বারা এবং ‘একান্ত-ভাবেই’ ইংরেজ দ্বারা কি করে দীক্ষিত হতে পারেন।

তথ্যের দিক দিয়েও কথা দুটির একটিও অন্তত ‘সবটাই’ এবং ‘একান্ত-ভাবে’ ঠিক নয়।

আবুল হোসেন আরও বলছেন: “আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যে ইংরেজের জয়-জয়কার সে রোমান্টিক ভিকটোরিয়ান যুগের ইংরেজ।” বোধ করি আবুল হোসেন এই বলতে চান, বাংলা সাহিত্য বুদ্ধিনির্ভর হলো না, হৃদয়সর্বস্ব হয়ে থাকল। দৃষ্টান্তস্বরূপ তিনি বুদ্ধদেব বসু ও জীবনানন্দ দাশের নামোল্লেখ করেছেন। কিন্তু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, সমর সেন প্রমুখ পশ্চিম বঙ্গের কবি এবং আমাদের নিজের আবুল হোসেনের কাব্য-প্রচেষ্টাই কি আবুল হোসেনের উক্তির যাথার্থ্য অপ্রমাণ করছে না?

তা’ছাড়া খেলার মাঠ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার মতো ঘটনা এদেশেরই একক অভিজ্ঞতা নয়। ইংলন্ডের ফুটবল মাঠে, আমেরিকার বেসবল ময়দানে এবং ওয়েস্ট ইণ্ডিজে ক্রিকেট পিচেও হামেশাই রক্তারক্তি হয়। আবুল হোসেন বলেছেন—“সদরঘাটে চায়ের কাপে তুফান ওঠে প্রতিদিন।” চায়ের কাপে তুফান ওঠা এই expression-টাই আমরা ইংরাজের কাছে শিখেছি; সুতরাং অনিবার্য উপসংহার এই দাঁড়ায় যে উক্ত ঘটনা ইংরাজের চায়ের টেবিলেও হামেশাই ঘটে।

নজরুল আর শরৎচন্দ্র সম্বন্ধে আবুল হোসেন বলছেন: দুজনেরই সাফল্যের মূলমন্ত্র একই হৃদয়াবেগ।

শরৎচন্দ্র অবশ্যই সেন্টিমেন্টাল শিল্পী। কিন্তু তাঁর সাফল্যের মূলমন্ত্র কেবল তাই কি? সাহিত্যিক উৎকর্ষের দিক দিয়ে কোন কোন বিষয়ে কি তিনি চরমোৎকর্ষের পরিচয় দেননি? তাঁর মতো সংলাপ কি আর কেউ লিখতে পেরেছেন? তা ছাড়া বাল্য আর কৈশোরের যে ছবি আমরা শরৎ সাহিত্যে দেখতে পাই, একমাত্র ডিকেন্স ছাড়া অন্তত ইংরাজি সাহিত্যে তার তুলনা নেই। দেবদাস সেন্টিমেন্টাল এ-কারণে নয় যে, এই সোনার চাঁদ ছেলেটির কাছে চন্দ্রমুখীর প্রেম, বন্ধুর প্রীতি প্রভৃতি মিছে হয়ে গেছে, সত্য কেবল পার্বতীর প্রেম। দেবদাস যদি পার্বতীকে ভুলে, আই-সি-এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, একটি রাঙা টুকটুকে বউ ঘরে নিয়ে আসত তাহলে হয়তো সমাজের প্রভূত কল্যাণ হতো, কিন্তু সাহিত্যের সমূহ ক্ষতি হতো। জীবনের সত্য আর সাহিত্যের সত্য এক পদার্থ নয়।

দেবদাস তখনই সেন্টিমেন্টাল যখন শরৎচন্দ্র বলছেন: “মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে-সময়ে যেন একটি স্নেহ-করস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে—যেন একটিও করুণাদ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও এক ফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।”—এইখানেই শরৎচন্দ্র tries to wring an extra tear from the situation.

Balzac-এর Father Goriot-এর Goriot চরিত্র মনে পড়ছে। কন্যাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে Goriot জীবনপণ করল, মান-অপমান বোধ ভুলে গেল, এবং বন্ধুর প্রীতিও ‘কিছু নয়’ হয়ে গেল, শেষ পর্যন্ত এই বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করল। তাও কিনা নিতান্তই অপদার্থ ও কৃতঘ্ন কন্যাদের জন্যে। কিন্তু Father Goriot বিশ্ব সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে স্বীকৃত—সেন্টিমেন্টাল বলে ধিকৃত নয়। তাহলে কি এই বুঝব, কন্যার জন্যে প্রাণ দিতে পায়, কিন্তু প্রেয়সীর জন্যে নয়!

কোন একটি হৃদয়াবেগ sentimentalism হলো কি না, তার মাপকাঠি হচ্ছে, convincing হলো কি না। একই হৃদয়াবেগ বিভিন্ন কবির হাতে পড়ে কবিকর্মের গুণাগুণের দরুন কখন মহৎ সাহিত্য এবং কখন বা কেবল সেন্টিমেন্টালিজমই হয়। এই প্রশ্নের সঙ্গে সাহিত্যিকের ক্ষমতা-অক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত—যে কথা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর প্রবন্ধের উপসংহারে বলেছেন। কোন একটি বিশেষ হৃদয়াবেগ তার অন্তর্নিহিত ত্রুটির দরুন সেন্টিমেন্টালিজম হয় না—লেখকের treatment-এর ত্রুটির দরুনই হয়। উপন্যাসের সমগ্র পরিবেশের সঙ্গে, চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যদি কোন হৃদয়াবেগ সম্পর্ক শূন্য হয় তাহলেই সেই আবেগ সেন্টিমেন্টালিজম। একটি দৃষ্টান্ত উপস্থিত করলে আমার বক্তব্য পরিষ্কার হবে।

যীশু খ্রিষ্ট যখন বলেছিলেন, তোমার একটি গালে যদি কেউ চড় মারে অপরটিও এগিয়ে দিও, তখন তাঁর উক্তি সেন্টিমেন্টালিজম হয়নি। বরঞ্চ মহাপুরুষের মহৎ বাণীর মর্যাদাই লাভ করেছিল। কিন্তু আমি যদি সেই একই বাণী প্রদান করি তাহলে তা হাস্যোদ্রেকই করবে। কারণ আমার জীবনের পূর্বঘটনার সঙ্গে এই মহৎ সঙ্কল্পের কোন মিল নেই, এবং আমি এ নিশ্চয়তাও দিতে পারি, পরবর্তী ঘটনার সঙ্গেও থাকবে না। সুতরাং আমার মুখে এ ধরনের কথা convincing শোনাবে না—false শোনাবে।

সুতরাং সেন্টিমেন্টলিজম-এর জন্যে হৃদয়াবেগের উপর দোষারোপ করা সমীচীন হবে না—লেখকের অক্ষমতাকে দায়ী করাই সঙ্গত হবে।

বাংলা সাহিত্যে হৃদয়বৃত্তির প্রাধান্য বেশী তাতে অবশ্য সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই কারণে হৃদয়বৃত্তির সাহিত্য সৎ সাহিত্য হয়নি এ ধারণা ঠিক নয়। যে সব রচনা সাহিত্য হয়নি, তার কারণ ভিন্ন। শরৎচন্দ্র বা ডিকেন্স তাঁদের স্বাভাবিক প্রবণতার লাগাম টেনে ধরলে শেষ পর্যন্ত কোন রকম সাহিত্যই সৃষ্টি করতে পারতেন কি না সন্দেহ। শরৎচন্দ্র বা ডিকেন্স কেউই intellectual চরিত্র সৃষ্টি করতে পারেনি—অর্থাৎ সৃষ্টি সার্থক হয়নি। সুতরাং ভাবাবেগপূর্ণ চরিত্র সৃষ্টি থেকে তাঁরা বিরত হলে সাহিত্যের লোকসানই হতো।

তা ছাড়া প্রতি দেশেরই ভূ-প্রকৃতি অনুসারে সেই দেশের নরনারীর চরিত্র গড়ে ওঠে অন্তত প্রভাবান্বিত হয়। সুতরাং আমরা সবাই যদি একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ইংরাজদের আচরণ অনুকরণ করতে চেষ্টা করি সেটাও convincing বা কল্যাণকর কিছুই হবে না। বিভিন্ন দেশের লোকচরিত্রে তার দেশীয় বৈচিত্র্য থাকবেই। গোটা দুনিয়াটাকে একই ছাঁচে ঢেলে সাজাবার চেষ্টা কোন দিক দিয়েই সার্থক হতে পারে না।

আর একটি কথাও মনে রাখবার যোগ্য: কোন মানুষই একটি বিশেষ আদর্শ বা নীতির সরল রেখা ধরে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অগ্রসর হয় না—তা যদি হতো তাহলে মানুষের আচরণ সম্বন্ধে সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব হতো। কিন্তু মানুষ সবার উপরে মানুষ—কোন একটি logic-এর ক্রীড়নক নয়—কোনকালেই হওয়া বাঞ্ছনীয় হবে না। মানুষের আচরণ চিরকালই বহুলাংশে unpredictable থাকবে।

Somerset Maugham বলেছেন, মানুষের আচরণে সঙ্গতি সামঞ্জস্য সব সময় আশা করা যায় না। সেই কারণেই তার নিজের বক্তব্যে ও চিন্তায় সব সময় ঐক্য থাকে না। Somerset Maugham আরও বলেছেন: The intellect is such a pliable and various weapon that man, provided with it, is practically bereft of all others; but it is a weapon of no great efficiency against instinct. সেই কারণেই Maugham আধুনিক কবিতা সম্পর্কে কিছুটা অসহিষ্ণু। তিনি বলেছেন: “Modern poets should be content with less cleverness if only they had more feeling. They make little songs not from great sorrows but from the sober pleasures of a good education.”

এত করে Maugham-এর কথা বলা হলো কারণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর কথা বলেছেন। তা’ছাড়া সাহিত্যে যেমন T. S. Eliot-এর স্থান আছে তেমনি Wordsworth, Shelley-রও আসন আছে। T. S Eliot-এর কবিতার রসাস্বাদনের জন্যে Wordsworth, Shelley-কে অপাংক্তেয় ভাবার কোন প্রয়োজন নেই।

ফেসবুক পেজ লিংক, আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রায়হান রাইন — নভেম্বর ২৮, ২০১১ @ ১০:১৬ অপরাহ্ন

      লেখাটা এখনো পড়ি নি। কিন্তু আমি তো দেখি ‘লাইক’ দিয়ে রেখেছি। কিভাবে সম্ভব?

      লেখার নিচে যে ‘লাইক’ বাটন তা পোস্টের নয়, ফেসবুক পেজ ‘আর্টস :: Arts’-এর ‘লাইক’ বাটন। যারা ‘আর্টস :: Arts’ পেজটিকে ‘লাইক’ করেছেন তাদের ক্ষেত্রে ‘লাইক’ বাটনটি ব্যবহৃত দেখায়। যেহেতু ভুল বোঝার অবকাশ আছে তাই দ্রুত এ বিভ্রান্তি কাটানোর ব্যবস্থা করা হবে। বি. স.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চন্দন আনোয়ার — december ৪, ২০১১ @ ৫:৪১ অপরাহ্ন

      নেতিবাচক সমালোচনা কেউ মেনে নিএত পারে না, এমনকি কবিগুরুও বেনামে সমালোচকের একহাত নিয়েছেন। এই বাস্তবতার বাইরে আসা কঠিন, কেননা লেখক মানুষ। তারপরেও একটা সীমারেখা পরযন্ত মেনে নেওয়া উচিত। রশীদ করিম এই কথাটিই বুঝাতে চাইছেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com