ক্ষমা করবেন রশীদ করীম

হামিদ কায়সার | ২৮ নভেম্বর ২০১১ ১২:৩০ অপরাহ্ন

rk224.jpg
রশীদ করীম (১৪.৮.১৯২৫- ২৫.১১.২০১১)

ভোর পৌনে চারটার দিকে মোবাইলের কলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। অমনি বুকের ভেতরটা চমকে ওঠলো আমার। এত রাতে তো শুধু শুধু কল আসার কথা নয়। তাছাড়া ঠিক এমন সময়েই কি আরো একটু পরে আরেক কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের চলে যাওয়ার সংবাদটাও শুনেছিলাম এভাবেই মোবাইলের কল থেকে। সেবার খবরটা জানিয়েছিলেন মফিদুল হক ভাই। এবার ফোনটা ধরতেই ওপাশে শুনতে পেলাম নারীকণ্ঠ, ‘আপনি হামিদ কায়সার বলছেন?’ ‘হা’ বলতেই জানালেন, ‘আমি নাবিলা মোরশেদ। রশীদ করীমের মেয়ে!’ তখনই বুঝে গেছি ব্যাপারটা। তবু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ভাবছিলাম তিনি অন্য কথা বলবেন, অন্তত বলবেন যে, রশীদ করীমের অবস্থা খারাপ, আপনি বাসায় চলে আসুন, উনি আপনাকে দেখতে চাচ্ছেন। না, উনি এধরনের কিছুই বললেন না, সেই চরম সত্য কথাটাই জানিয়ে দিলেন, ‘বাবা নেই।’ ‘কখন গেলেন?’ ‘এইতো কিছুক্ষণ আগে। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টারে। আমরা এখন সেখানেই আছি।’ নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম, ‘আসছি আমি।’

rk223.jpg
রশীদ করীম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শামসুজ্জামান খান, ভূঁইয়া ইকবাল ও আনিসুজ্জামান; ১৯৯১, শাহজাদপুর।

শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠলাম। কীভাবে যাবো জানি না। শুধু মনের মধ্যে তীব্র ডাক, যেতে হবে ওখানে। প্রস্তুতি নিতে নিতে হঠাৎ মনে পড়লো ফেসবুক-এর কথা। ওখানেই তো জানিয়ে দেয়া যায় খবরটা। কম্পিউটার অন করার জন্য লাইট জ্বালালাম, এড়ানো গেল না শব্দও। অসময়ে ঘুম ভাঙায় আমার বারো বছরের ছেলে অনির্বাণ বলে উঠল, ‘বাবা। আমার ঘুমে ডিস্টার্ব করছো কেন? জানো না, কাল আমার পরীক্ষা।’ আমি ওকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, ‘বাবা। রশীদ করীম যে মারা গেছেন।’ ওর আর গলার শব্দ পেলাম না। বোধহয় ঘুমানোর চেষ্টা করছে। আমি স্ট্যাটাসে জানালাম খবরটা। চেটিং লিস্টে যাদেরকে পেলাম, চটজলদি তাদেরকেও মেসেজ দেওয়া গেল। ওসব করতে করতেই আবারও শুনলাম ছেলের গলা, ‘বাবা, তুমি কি চাও আমার পরীক্ষাটা খারাপ হোক!’

একটু অভিমানই হলো ওর ওপর। খানিকটা রাগও করে ফেললাম। তারপর সাটাসাট কম্পিউটার, লাইট অফ করে দরোজা খুলে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। নির্জন, ফাঁকা রাস্তা। একটা রিক্সা কিংবা দুটা সিএনজি তো দূরের কথা, রাস্তায় একটা কুকুর পর্যন্ত নেই। গুলশান নিকেতন থেকে প্রায় আধা মাইল হেঁটে আসার পর অবশেষে নাবিস্কোর কাছে রিক্সা মিললো।

ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টারের চারতলায় ভেতরের একটি রুমে প্রাণহীন রশীদ করীম। আর বাইরের করিডোরে উনার প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী সেলিমা মোরশেদ, মেয়ে নাবিলা মোরশেদ, ভাগ্নে অধ্যাপক এস এম হারুনসহ আরো চার পাঁচজন আত্মীয়স্বজন শুভাকাঙ্ক্ষী বসে আছেন, অনেকটাই হতবিহ্বল। এদের মধ্যে সাহিত্য অঙ্গনের কোনো মানুষ নেই, শিল্পাঙ্গনেরও কেউ নেই। প্রথমে স্বাভাবিকই মনে হলো ব্যাপারটা। কেউ হয়তো এখনো সংবাদ পাননি, কেউ হয়তো পেয়েছেন, ভাবছেন আরেকটু আলো-টালো ফুটুক, তারপর না হয় যাওয়া যাবে। কিন্তু আটটা সাড়ে আটটার সময়ও যখন কারোর দেখা পাওয়া গেল না, তখন ব্যাপারটা দৃষ্টিকটুর মতোই বুকের ভেতর খচ খচ করতে লাগলো। এর মধ্যে তো সংবাদটা অনেককেই জানিয়ে দেয়া গেছে। মোবাইলে অনেকের নাম্বারই ছিল। অনেকে সঙ্গে সঙ্গে বেশ আন্তরিকতার পরিচয়ও রেখেছেন। কেউ কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে থাকা বাংলা একাডেমীর ডিজিকে অবহিত করেছেন, কেউ চ্যানেলে চ্যানেলে, পত্রিকা অফিসে, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে খবরটা দ্রুতই পৌঁছে দিয়েছেন।

রশীদ করীম-এর একমাত্র সন্তান নাবিলা মোরশেদ-এর অবশ্য এসব বিষয় নিয়ে কোনো বিকার নেই, উনার একটাই টেনশন, বাবার বিদায়টা ঠিক সম্মানজনকভাবে হবে তো? উনার একান্ত ইচ্ছে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে বাবার কবরটা হোক। কিন্তু কোথায় সে আশার আলো? কীভাবে হবে সে ব্যবস্থা? কেইবা নেবেন উদ্যোগ? কারই বা দায় এসব ব্যাপারে? কেউ তো এখনো পর্যন্ত দেখতেই এলেন না রশীদ করীমকে। রাষ্ট্রপক্ষ, কিংবা সাহিত্যিক মহল কিংবা বাংলা একাডেমীর মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কেউ, কোনো প্রতিনিধি আসা তো দূরের কথা, খোঁজও নিচ্ছেন না। অবশ্য বাংলা একাডেমীর একজন কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক খোঁজ নিচ্ছিলেন। বাংলা একাডেমীর ডিজির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন তিনি। কিন্তু রশীদ করীমকে কোথায় দাফন করা হবে, সে-বিষয়ে তার তেমন করণীয় ছিল না। এই অনিশ্চয়তা দূর হলো মোবাইলে মফিদুল হক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে। উনি নিজের কাঁধে দায়িত্বটা নিয়ে বললেন, ‘আমি ব্যবস্থা করছি।’

নটা পৌনে নটার সময় রশীদ করীমকে নিয়ে যাওয়া হলো ধানমণ্ডি ৬ নম্বর রোডস্থ তার বাসস্থানে। ড্রয়িং রুমে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, আমি তখন একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রায় লিখে ফেলেছি রশীদ করীমের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে, মিডিয়ার প্রতিনিধিদেরকে দেবো বলে। তখনই হঠাৎ নাবিলা মোরশেদ এলেন, হাতে প্লেট, তাতে তিন চারটে ডালপুরি। আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবেগ সামলাতে সামলাতে বললেন, ‘এই যে বাবার প্রিয় ডালপুরি। বাবা আপনাকে খাওয়াতেন। আজ সেই বাবাই নেই। আপনি খান। এখনো তো নাস্তা করেননি।’

নাবিলা মোরশেদ চলে গেলেন, বোধকরি কান্না লুকাতেই। আমি প্রেস বিজ্ঞপ্তি লেখা বাদ দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম ডালপুরির দিকে। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো কত কথা কত স্মৃতি। রশীদ করীমের বাসায় প্রথম আসা, প্রথম দেখা, সব, সব আমি আজো স্পষ্ট মনে করতে পারি। সে আমার পক্ষে কোনোদিন ভুলবার নয়, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যই ভুলবার নয়। সেসব স্মৃতি আমার জন্য অক্সিজেন, আমার নিঃশ্বাস নেয়ার মুক্ত হাওয়া।

আমি তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্প লিখছি আর সাহিত্য চর্চার নানা গ্লানিতে জর্জরিত হচ্ছি। নানা চড়-থাপ্পড় খাওয়ার পর কোনোভাবে ১৯৯৯ সালে আমার ছোটভাই আনিসুর রহমান দিপু আর অগ্রজ কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের চেষ্টায় আমার প্রথম ছোটগল্পের বই কলকব্জার মানুষ বেরিয়েছে। সে বইটারই প্রকাশ-পরবর্তী সময়ে একদিন দৈনিক সংবাদ-এর তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত বললেন, ‘রশীদ করীম-এর সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে? তার বাসায় গিয়েছেন কখনো?’ আমি না জানাতেই আবুল হাসনাত আর বিশেষ কিছু বলতে চাইলেন না। তখন আমি উল্টো তার কাছে আগ্রহ দেখালাম, রশীদ করীমের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই, তার সঙ্গে দেখা হলে আমার খুব ভালো লাগবে, কথাটা উনাকে জোরের সঙ্গেই জানালাম। হাসনাত ভাই তখন কলকাতা থেকে অরুণ সেন সম্পাদিত বাংলাদেশের উপন্যাস-এর একটি সংকলন এবং রশীদ করীমকে নিয়ে তার লেখার একটা কাটিং আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা উনার কাছে একটু পৌঁছে দেবেন।

ঠিকানা নিয়ে সোজা ছুটলাম ধানমণ্ডিতে রশীদ করীমের বাসার উদ্দেশে। তখন তিনি গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের ঠিক উল্টো দিকের বাসাটার এক তলাতে থাকেন। তখন পড়ন্ত বিকেলবেলা। সে বাড়িটায় বিকেল যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠেছে। ড্রয়িং রুমে বসে আমি শেলফের বইগুলো দেখছি, তার উপন্যাসগুলোও থরে থরে সাজানো… উত্তম পুরুষ, আমার যত গ্লানি, প্রেম একটি লাল গোলাপ, সাধারণ লোকের কাহিনী…।

তিনি একটা ক্র্যাচে ভর দিয়ে একা একাই হেঁটে এলেন। দীর্ঘ, সুপুরুষ একজন মানুষ। কে বলবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন বিছানায়। ভাঙা ভাঙা গলায় সালাম গ্রহণ করে বললেন, ‘বসো।’

অরুণ সেনের বইটি পেয়ে খুব খুশি হলেন। তার উপন্যাস রয়েছে দেখে আত্মতৃপ্তি ছড়িয়ে ছিল চেহারাজুড়ে। বার বার আমাকে দিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছিলেন অরুন সেনের লেখা ছোট্ট চিঠিটা। সেদিনই তাকে দেখে মনে হয়েছিল স্বীকৃতির চেয়ে বড় পুরস্কার আর লেখকের কাছে কিছু নেই। বইটিকে কোলের উপর থেকে নামাচ্ছিলেনই না।

তারপর সন্ধ্যে যখন ঘনিয়ে এলো, জ্বলে উঠলো আলো, তিনি জানতে চাইলেন, ‘তুমি কী খেতে ভালবাসো?’

আমি কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। শেষে বলেছিলাম, ‘ঝাল জিনিসই ভালো লাগে বেশি।’

‘ডালপুরি খেতে ভালবাসো?’

আমি হাঁ বলতেই তিনি দরাজদিল কণ্ঠে বুয়াকে ডেকে এনে ডালপুরি ভেজে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। একটা দুটা খেয়ে পার পাচ্ছিলাম না। অন্তত চারটা তো খেতে হয়েছিল মনে আছে। তিনি আমার সে-খাওয়াটা খুব মন দিয়ে দেখেছিলেন। তারপর যতদিন গিয়েছি তার বাসায়, যতবার, ডালপুরি না-খাইয়ে কোনোদিনই ছাড়েননি।

সেদিন চলে আসার সময়, ভয়ে ভয়েই থমকে দাঁড়িয়ে উনার হাতে কলকব্জার মানুষ বইটির একটা কপি তুলে দিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল বইটা উনার হাতে ধরিয়ে দিয়েই পালিয়ে বাঁচবো। কিন্তু উনি রীতিমতো জেরা করতে লাগলেন, ‘তোমার লেখা? বইটা তুমি আগে দিলে না কেন?’ আমি কোনোমতো এটা সেটা বুঝিয়ে চলে এসেছিলাম।

এর প্রায় বিশ-পঁচিশ দিন পরেরই হবে ঘটনাটা। হাসনাত ভাই আমার অফিসে ফোন করে জানালেন, ‘রশীদ করীম সাহেব আপনাকে খুঁজছেন। বার বার আমাকে টেলিফোন করছেন। উনার সঙ্গে দেখা করুন।’

সেদিন বিকেলেই যাওয়া হলো ধানমণ্ডি সে-বাসাটাতে। এত বড় বিস্ময় যে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, তা আমি কল্পনায়ও কখনো ভাবিনি। কারণ, রশীদ করীম যে লেখালেখিই বাদ দিয়েছেন। লিখতে গেলেই তার হাত কাঁপে, মস্তিষ্ক বিদ্রোহ করে ওঠে। সেই মানুষটি আমার কলকব্জার মানুষ নিয়ে ছোটখাটো একটা রিভিউ-ই লিখে ফেলেছেন। তাও আবার আমার সেই কলকব্জার মানুষ বইটার পাতায় পাতায়। শ্রদ্ধায়-ভালবাসায় আমি তার পা ছুঁয়ে সালাম করেছিলাম। কোথাকার মফস্বলের তুই কে… আদব জানস না লেহাস জানস না… চিনস না লিটল ম্যাগাজিন… তর বাবা তরে টিটকারি দেয় সাহিত্য চর্চা করছ বইলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্যারেরা উপেক্ষার পর উপেক্ষা দেখায়… কথাবার্তা বলতে পারস না বইলা অফিসের লোকজনও তরে দয়ার চোখে দেখে… তর কোনো বেল নাই… আদর নাই সমাজে… সেই তরে কী মূল্যায়নটাই না দিল… রশীদ করীমের জীবনের শেষ লেখাটা তরে নিয়া তর বই নিয়া… আমার বুকের ভেতরটায় কী যে দলনপোচন, কী যে আনন্দ আকাশেবাতাসে… রশীদ করীমের নির্দেশ… এটা তুমি সংবাদের হাসনাতের হাতে দেবে। সংবাদে ছাপাবে। পরদিনই অফিসটফিস সব ফেলে বইটা হাসনাত ভাইয়ের হাতে তুলে দিলাম। তিনি বেশ অবাক হয়েছিলেন লেখাটি দেখে, তারপর খুব যত্ন করেই ছাপিয়েছিলেন লেখাটা… ‘এক তরুণ লেখকের কথা…’।

তারপর কতবার যে রশীদ করীমের বাসায় যাওয়া, কত উপলক্ষে, যত না উপলক্ষ তার চেয়ে অকারণেই বেশি… আর যতবারই যাওয়া হয়েছে, অনিবার্য ছিল ডালপুরি, যত ভালো খাবারই হোক, ওটা থাকতই। সেই ডালপুরি পড়ে রয়েছে টেবিলে, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমি খেতে পারছি না। খাওয়ার রুচি হচ্ছে না। সামনে শুয়ে আছেন রশীদ করীম। জীবিত থাকলে এতক্ষণে বেশ কয়েকবারই ধমক দিয়ে ফেলতেন, খাচ্ছো না কেন? আমি যেন তাকে খুশি করতেই একটা তুলে নিলাম হাতে, অসংকোচেই মুখে দিলাম।

এরমধ্যেই এসে গেছেন সময় টিভির একজন রিপোর্টার এবং ক্যামেরাম্যান, তুষার আবদুল্লাহ পাঠিয়ে দিয়েছেন আমার অনুরোধে। ধীরে ধীরে আত্মীয়স্বজনরাও আসছিলেন। মিডিয়ার তরুণ সংবাদকর্মীগণ আসছিলেন। কিন্তু যে সাহিত্যজগতের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন রশীদ করীম, সেই জগতের মানুষগুলোর কোনো দেখা নেই, হাতেগোনার মতো করে ধীরে ধীরে এলেন তার প্রিয়বন্ধু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ইতিহাসবিদ সালাউদ্দিন আহমেদ, লেখিকা সুস্মিতা ইসলাম (যিনি রশীদ করীমের সেই কলকাতাজীবনের শৈশবেরই চেনা), আবুল হাসনাত, মফিদুল হক, সিরাজুল মজিদ মামুন, লেখক ইমতিয়ার শামীম। মফিদুল হক ভাই বাসা থেকে নিয়ে গেলেন তার একুশে পদক-এর ফটোকপি। কবরস্থানের বিশেষ জায়গা পেতে হলে আবেদনপত্রের সঙ্গে এটাও দেখাতে হবে।

উত্তম পুরষ-এর মতো একটি ক্ল্যাসিক উপন্যাস, যে উপন্যাসটিতে দেশবিভাগ-পূর্ব কোলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে, মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুদের সম্পর্কের রসায়ন চিত্রিত হয়েছে বিশ্বস্তভাবে, নারী-পুরুষের সম্পর্কের জটিল ভেদ ধরা পড়েছে সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্বববিদের নিপুণতায় এবং যে উপন্যাসটিকে দেশেবিভাগের ওপর একটা সেরা কাজ বলা যায় অনায়াসেই, সে-উপন্যাসের শ্রষ্টাকে কোথায় কীভাবে দাফন করা হবে, বেলা বারোটাতেও তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। শেষে সিদ্ধান্ত হলো ধানমণ্ডিরই বায়তুল আমান মসজিদে জানাজা শেষ করে নিয়ে যাওয়া হবে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অব্যবহিত পরেই বাংলা একাডেমীর সেই কর্মকর্তা রহিমা আকতার কল্পনা, যিনি একমাত্র যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন, তিনি জানালেন, ডিজি শামসুজ্জামান খান অনুরোধ জানিয়েছেন রশীদ করীম সাহেবকে চারটার সময় বাংলা একাডেমীতে নিয়ে যেতে। ওখানে উনার শেষ জানাজা হবে। পরিবারের পক্ষ থেকেও সম্মতি দেয়া হলো এ প্রস্তাবে।

বাংলা একাডেমীর বটতলায় আমরা যখন রশীদ করীমকে নিয়ে উপস্থিত হলাম, তখন শুধুমাত্র প্রথম আলো-র একজন সাংবাদিককে চোখে পড়ছিল। তারপর অবশ্য একসঙ্গেই চারটার আগে আগে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন মিডিয়ার প্রতিনিধিবৃন্দ। প্রায় প্রতিটি চ্যানেল এবং দৈনিকের প্রতিনিধিবৃন্দ এসেছিলেন। অভূতপূর্ব তাদের সাড়া। শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার সঙ্গেই তারা কভারেজ করলেন। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেন বাংলা একাডেমী, তথ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রকাশনী সংস্থা শুদ্ধস্বর। উপস্থিত প্রায় সবাই বাংলা একাডেমীর কর্মকর্তা। কিন্তু যাদের আসবার কথা এখানে, লেখক-কবি, সাহিত্যিক–তাদের কাউকেই চোখে পড়লো না। সাংবাদিক আতাউস সামাদ আর তরুণ সাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামালকেই কেবল দেখছিলাম। অথচ এই বাংলা একাডেমীর ত্রিশ গজের ভেতরেই তো বাস করেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কত অধ্যাপক, ছাত্র। যারা রাতদিন চাষ করেন বাংলা সাহিত্য। মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতার জগতে থাকতে থাকতে তারা যে এখনো মধ্যযুগেই বাস করেন আর রাধাকৃষ্ণ পাঠ করতে করতে যে তারা কেবল ভাবের জগতেই আচ্ছন্ন থাকেন, তার প্রমাণ শুধু এবারই পেলাম না, মাহমুদুল হকের জানাজার সময়ও তাদের কারোর ছায়াটা পর্যন্ত দেখিনি। অথচ এই বাংলা একাডেমীতেই তো সেইসব বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস লিখিয়েরা রাতদিন এসে বসে থাকেন, কত রকমের ধান্দার খোঁজে, কেউ থিসিসটাকে বই বলে চালিয়ে দুটা টাকা তুলে নেবেন, কেউ কোনো সেমিনারে বক্তব্য প্রদান করবেন–কত কারণেই তো তারা আসেন। শুধু সময় হয় না রশীদ করীম, মাহমুদুল হকের মতো আধুনিক সৃষ্টিশীল লেখকদের শ্রদ্ধা জানানোর বেলায়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অন্তত একজন শিক্ষক কিংবা একজন ছাত্রকে উপস্থিত দেখলেও এ ক্ষোভ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতাম।

কেন গুটি কয়জন কবি-সাহিত্যিক ছাড়া বাকিরা আসলেন না রশীদ করীমের বাসায় কিংবা বাংলা একাডেমীতে অথবা মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে? নানাভাবেই আমি তার উত্তর খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করেছি। সেটা কি এই কারণে যে, ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার প্রাবল্যে আমরা বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি। নিজের গণ্ডি নিজের বিবর ছেড়ে আজকাল আমরা কোথাও বেরুতে চাই না। আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি একে অপরের কাছ থেকে? হতে পারে এটা একটা কারণ।

অন্য যে যৌক্তিক কারণ তা হলো, প্রায় সতেরো আঠারো বছর হয়ে গেল রশীদ করীমের কোনো সামাজিক জীবনযাপন ছিল না। তিনি ঘর ছেড়ে বেরুতে পারতেন না। সে-সক্ষমতাও ছিল না। ঘরের ভেতর প্রায় এক বিছানায় কেটে গেছে তার শেষজীবন। বড়জোর ড্রয়িং রুমের সোফাসেট পর্যন্ত ছিল তার দৌড়। সে-কারণেই তার পক্ষে কারোর সঙ্গেই যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভবপর ছিল না। তাই বলে যারা আমরা অন্তত নিজেদেরকে কবি বা সাহিত্যিক বলে আত্মতৃপ্তি লাভের চেষ্টা করি, তাদের কি উচিত ছিল না উনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার? ধরা যাক, সতেরো বছরে একবারও তার খোঁজ নাইবা নেওয়া গেল, কিন্তু তার শেষকৃত্যে উপস্থিত হয়ে কি সে দায় সামান্য হলেও মেটানো যেত না? উত্তম পুরুষ ছাড়াও যে ব্যক্তি লিখে গেছেন প্রসণ্ন পাষাণ, আমার যত গ্লানি, প্রেম একটি লাল গোলাপ, সাধারণ লোকের কাহিনী, একালের রূপকথা, শ্যামা, বড়ই নিঃসঙ্গ, মায়ের কাছে যাচ্ছি, চিনি না, পদতলে রক্ত এবং লাঞ্চবক্স-এর মতো উপন্যাস, প্রথম প্রেম-এর মতো ছোটগল্পের বই।

আধুনিক এবং চিরকালীন আবেদন রাখে এমন সহজ সরল ভাষা আর বিষয়ের অভিনবত্বে তিনি জীবনকে কখনো দেখেছন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কখনো বা সূক্ষ্ম হিউমারের খোঁচায়। চরিত্রচিত্রণে দেখিয়েছেন অসাধারণ পারঙ্গমতা, উত্তম পুরুষের বর্ণনাকারী চরিত্র, মুশতাক, সেলিনা মনস্তাত্বিক জটিলতাকে যেমন ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন অনায়াসে, তেমনি সাবলীল ছিলেন প্রেম একটি লাল গোলাপের কর্পোরেট সমাজের মানুষগুলোর ভেতরের দ্বৈতসত্তাকে আবিষ্কারে। চরিত্রের গভীর ভেতর থেকে মুক্তিযুদ্ধকে তার দেখবার যে বলিষ্ঠ দৃষ্টি তা ফুটে উঠেছে আমার যত গ্লানি উপন্যাসে। তার সেরা সৃষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম মায়ের কাছে যাচ্ছি দার্শনিক মননসত্তার পরিচয়কে তুলে ধরে। তার উপন্যাসের বিশিষ্টতা এবং শৈল্পিক সৌকর্যকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এমন তরুণ সাহিত্য-গবেষকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, এটাই একটা সান্ত্বনার জায়গা।

বাংলা একাডেমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। নাবিলা মোরশেদ তার প্রতিক্রিয়া লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তার কয়েকজন স্বজন কবরের জায়গা দেখে ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। তারা আশা করেছিলেন আরো একটু মর্যাদাসম্পন্ন জায়গায় আরো একটু সম্মানের সঙ্গে দাফনের ব্যবস্থা হতে পারতো রশীদ করীমের। যে মানুষটি সারাজীবন সাহিত্যের স্নিগ্ধ ছায়াতেই থাকতে চেয়েছেন, সে-জগতের মানুষের প্রায়-অনুপস্থিতিতেই আত্মীয়স্বজনের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় মাটির বিছানায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।

তাকে চিরদিনের মতো মাটির ঘরে একা রেখে, একা একা বেরিয়ে এলাম কবরস্থান থেকে বাইরে। গেটমুখে যখন ফেরার জন্য সিএনজি খুঁজে বেড়াচ্ছি, তখনই হঠাৎ চলে গেলো বিদ্যুৎ। বিপুল অন্ধকার এসে গ্রাস করলো আমাকে। মনে হলো বুঝিবা আমিই নেমে আছি গোরের পাতাল অন্ধকারে। সেই অন্ধকারে মনে পড়লো আজ ভোরে আমি আমার ছেলের সঙ্গে খুব রাগ করেছিলাম, ওর ওপর বড় অভিমান হয়েছিল, ও কেন রশীদ করীমের প্রতি আমার আবেগকে মূল্যায়ন করেনি? সে রাগ এবং অভিমানের জন্য এখন নিজের প্রতিই রাগ হলো খুব। ওর বয়স তো মোটে ১২ বছর, আমাদের পূর্ণ-বয়স্ক কবি-সাহিত্যিকরা যদি আত্মমগ্নতার কারণে রশীদ করীমকে সামান্য শ্রদ্ধা জানাতে না-আসার শৈথিল্য দেখাতে পারেন, সেখানে ও শুধু ওর পরীক্ষার কথা ভেবে যদি একটু ব্যাকুলতা প্রকাশ করেই থাকে, কী এমন অন্যায় করলো। অবশেষে আমি নিজেও আমার ছেলের কাছে ফেরার তীব্র আকুলতায় আপনাকে দ্রুত অতি দ্রুত একা ছেড়ে চলে এলাম রশীদ করীম। ক্ষমা করবেন আমার দীনতাকে, আমাদের সংকীর্ণতাকে। আচ্ছা! রশীদ করীম, আপনি ভালো থাকুন।

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: হামিদ কায়সার
ইমেইল: hamid.kaisar@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর — নভেম্বর ২৮, ২০১১ @ ৪:২০ অপরাহ্ন

      লেখাটি পড়ে আবেগাক্রান্ত হয়ে গেলাম। রশীদ করীম শুধু নয়, লেখকসত্তার এমন দীনহীন অবস্থা জেনে, দেখে, জারিত হয়ে আরও খারাপ লাগছে। আসলে লেখালেখির জগতে যে বিসর্জনের পালা শুরু হয়, তা কোনোদিনই যেন শেষ হয় না।
      তার লেখায় রশীদ করীম সংক্রান্ত অনেক বিষয়ই জানা গেল।
      একটা সময় ছিল, সেই আট দশকের কথা বলছি, আমরা রশীদ করীমকে রীতিমতো গিলতাম। তার লেখার সহজাত যাদু আছে। মধ্যবিত্তকে অতি সাদামাটাভাবে গভীরে টানতে জানতেন। তবে সেই নেশা আমাদের অনেকেরই বেশিদিন থাকেনি। তার কারণ মার্কসীয় নন্দনতত্ত্ব। আমরা তখন সবকিছুতেই শ্রেণীহীন সমাজ খুঁজতাম। মানিক-ইলিয়াস-হাসানকে চেখে চেখে দেখতে চাইতাম। এ জন্যই হয়ত সতীনাথ, সুবোধ, রশীদ করীম, মাহমুদুল হকদেরকে খারিজ করতে চাইতাম।
      কিন্তু শিল্পের তো আলাদা বেহিসেবি মেজাজ থাকতে পারে–স্বোপার্জিত ঈশ্বরত্ব থাকতে পারে। হয়ত এ জন্যই, আবারও তাকে পরম-ভাবনায় মনে পড়ছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তারেক আহমেদ — নভেম্বর ২৯, ২০১১ @ ১০:২৩ অপরাহ্ন

      চোখে জল এলো আমার। অপরাধবোধ নিজের মনেও, কারণ সময় মতো না জানবার কারণে তাকে শেষ দেখাটা হয়নি। তবে অবাক হইনি, আপনি যে ক্ষেভের কথা বলেছেন–সে বিষয়ে। ভুলে যাচ্ছেন কেন, প্রচারেই প্রসার। সবকিছুই বিজ্ঞপিত হচ্ছে এখন। এই প্রচারসর্বস্ব বর্তমান থেকে রশীদ করীমের মতো প্রকৃত লেখকরা হারিয়েই যাবেন বইকি। কেবল মহাকালই নির্ধারণ করবে তাদের স্থান। আর, ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’, ‘আমার যত গ্লানি’, ‘প্রেম একটি রাল গোলাপ’-এর মতো উপন্যাসের স্রষ্টা রশীদ করিম তাই পাঠকদের কাছে বেঁচে থাকবেন বহু বহু কাল। ধান্ধাবাজ অধ্যাপক, সাহিত্য সম্পাদক কিম্বা লেখালেখি যাদের উপরে যাবার সিঁড়ি–থাকবেন না কেবল তারা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সরকার আমিন — december ১, ২০১১ @ ১:৩৯ পূর্বাহ্ন

      ঘৃণা সহ্য করা যায়, অবহেলা সহ্য করা কঠিন। দীর্ঘজীবনের সম্ভবত অনেক যাতনা।নিঃসঙ্গতা তো আছেই। আছে মর্মান্তিক অবহেলা। দেহ কথা শোনে না। কান ক্লান্ত, চোখ অবসরপ্রাপ্ত, হৃদয় উদাস। ভাবতে ভয়ই লাগে। হে আল্লাহ, জ্বান কান্দান ডিপার্টমেন্টকে একটু বলে দাও আমি যেন কেবল আমার জন্য সহনীয় ও প্রয়োজনীয় সময়টুকুই টিকে থাকি। মাননীয় রশীদ করীম আমাদের মার্জনা করুন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com