রাঙামাটির পথে

নূরুল আনোয়ার | ১১ december ২০১১ ১:০৯ অপরাহ্ন

nar_11.jpg………
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র
……..
রাঙামাটির কথা শুনে আসছিলাম একেবারে ছোটকাল থেকে। আমাদের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় পরিবার-পরিজন নিয়ে ওখানে থাকতেন। শুনতে পাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা বেশ সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছেন। প্রথমে ব্যবসায়, পরে ভূ-সম্পত্তিতে বিস্তার লাভ করেছিলেন। পরে তাদের জায়গা-জমি সব পানিতে ডুবে গেছে। তারা পথে বসেছেন। কাপ্তাই বাঁধের পানি তাদের জমি-জমা, বাড়ি-ঘর সব পানির নিচে তলিয়ে দিয়ে একরকম অভিশপ্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও পরে শুনলাম কাপ্তাই বাঁধের পানি অভিশপ্ত বটে, কিন্তু সম্পদ হিসেবেও এর জুড়ি নেই। কাপ্তাই বাঁধের পানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। আবার সেই পানির মৎস্যসম্পদ জনসংখ্যার এক বিরাট অংশের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে। সবচে’ বড় কাজ যেটি হয়েছে সেটি হল এই বাঁধ একটা বিস্তীর্ণ জলরাশি সৃষ্টি করছে। এই জলরাশি একরকম নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার হিসেবে সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলে রাঙামাটির সৌন্দর্য অবলোকন করতে।

কাপ্তাইর পানি তো মানুষকে একরকম নিঃস্ব করে দিয়েছে। তারপরেও দেখতাম আমাদের এলাকার মানুষ রাঙামাটির দিকে ছুটছে। আমিও স্বপ্ন দেখতে থাকি রাঙামাটি যাবার। কিন্তু বহুদিন সেই স্বপ্ন আমার পূরণ হয়নি। পত্রপত্রিকায়, ক্যালেন্ডারে যখন রাঙামাটির সেই টানা ব্রিজের ছবিটা দেখতাম তার সৌন্দর্য আমাকে একরকম আলোড়িত করত। আমি এই টানা ব্রিজটাকে মনে রেখে আমার কল্পলোকে রাঙামাটিকে আরও নানাভাবে সাজিয়ে নিতাম।

nar_07.jpg………
রাঙামাটি বৌদ্ধবিহার
……..
দুই হাজার এক সালে আমার কাকা আহমদ ছফা সাহেব যখন সহসা ধরাধাম ত্যাগ করলেন আমি অনেকদিন কোনো কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারিনি। সব সময় আমার ভেতর একটা অজানা ব্যথা ক্রিয়া করত। স্বস্তি কী জিনিস আমি একরকম ভুলে গিয়েছিলাম। তাঁর পালকপুত্র সুশীল চাকরিসূত্রে খাগরাছড়িতে থাকত। আমার মনের অবস্থা সে টের পেয়ে গিয়েছিল। সে আমাকে বলল, তুমি কিছুদিন খাগড়াছড়িতে এসে আমাদের সঙ্গে থাক। সে এ-ও জানাল, বাইরের আলো-বাতাস গায়ে লাগলে মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠতে পারে।

খাগড়াছড়িতে আমি কোনোদিন যাইনি। এ এলাকা সম্পর্কে আমার ধারণাও অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুধু এটুকু জানি খাগড়াছড়ি পাহাড়ি এলাকা। সুতরাং পাহাড় কি আমার মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে? আমি তো একরকম পাহাড়ি কীট। তারপরেও আমি রাজি হয়ে গেলাম। সামনে কোরবানি ঈদের ছুটি। ওই ছুটিটাকে আমি কাজে লাগাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কীভাবে যাব। খাগড়াছড়িতে তেমন একটা ভাল গাড়ির যাতায়াত নেই। আমি সুশীলের পরামর্শ মেনে কমলাপুর বিআরটিসি বাস টার্মিনালে গেলাম। তার আগে কোনোদিন আমি এই বাস টার্মিনালে যাইনি। যাওয়ার দরকারও পড়েনি। আমি ওখানে গিয়ে একখানা টিকিট কেটে বিআরটিসি বাসে উঠে বসলাম।

আমি রওয়ানা দিয়েছিলাম সকালে। খাগড়াছড়ির পথঘাট সম্পর্কে আমি পরিচিত নই। আমার ধারণা ছিল আমি চট্টগ্রাম শহর হয়ে খাগড়াছড়িতে যাব। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। ফেনী পার হবার পর গাড়ি মিরেশ্বরাই গিয়ে পুবদিকে মোড় নিল। আমি ফটিকছড়িতে পৌঁছে উঁচু পাহাড়ের দেখা পেয়ে গেলাম। গাড়ি যখন উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠল বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকাকে একনজর দেখার সুযোগ আমার হয়ে গেল। এই এলাকাটির সঙ্গে বান্দরবান পাহাড়ের কিছুটা মিল রয়েছে। বান্দরবানেও একটা পাহাড়ে উঠে অসংখ্য পাহাড় দেখার সুযোগ হয়। কিন্তু এখানকার পাহাড় তেমন লাবণ্যময়ী নয়। অর্থাৎ পাহাড়গুলোতে তত সবুজের সমারোহ নেই। বড় ধরনের গাছপালাও খুব একটা চোখে পড়ে না। খুব সম্ভব খাগড়াছড়ি যাবার পথে এই একটা জায়গায় বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা দেখার সৌভাগ্য হয়।

ফটিকছড়ির পাহাড় পার হবার পর পুরো জায়গাটাকে সমতল মনে হয়। কিছু কিছু পাহাড় আছে, ওগুলোকে পাহাড় না বলে টিলা বলাই শ্রেয়, যেগুলোতে মনুষ্যবসতি রয়েছে। আমরা রামগড় দিয়ে যাচ্ছিলাম। রামগড়ের পাশ ঘেঁষে ভারতের সীমানা। তখন কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। ছিল না এখন যে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চা বাগান গড়ে উঠেছে সেসব।

খাগড়াছড়ি যাবার পথে বিশাল রাবার বাগানটি বড়ই মনোমুগ্ধকর। কয়েক কিলোমিটার এই রাবার বাগানের ভেতর দিয়ে গাড়ি চলে। পুরো রাস্তাটিকে রাবার গাছের ছায়ায় সুশীতল করে রেখেছে। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যাবার পথে যতটুকু পথ আমি পাড়ি দিয়ে এলাম রাবার বাগানের ভেতর দিয়ে চলা পথটি আমার মনে এখনও গেঁথে আছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার পর আমার শরীরে ক্লান্তি নেমে এসেছিল। রাবার বাগান দিয়ে যাওয়ার পর আমার শরীরের সেই ক্লান্তির ছায়া একরকম কেটে গেল। গাছের ছায়া যে কত মায়াময়ী হতে পারে আমি এই রাবার বাগান পাড়ি দেয়ার সময় অনুভব করেছিলাম।

রাবার বাগান পেরিয়ে আমাদের আরও কিছু পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। কিন্তু ওই পথটুকু আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়নি। আমরা যখন আলুটিলা পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছলাম পুরো জায়গাটি আমার কাছে অন্যরকম ঠেকল। এটি এক অপূর্ব সুন্দর জায়গা, যেটির সৌন্দর্য বয়ান করা আমার লেখনী দিয়ে সম্ভব নয়। আলুটিলা থেকে খাগড়াছড়ি শহরের দূরত্ব সাত কিলোমিটার। তার কয়েক কিলোমিটার পথ সবুজে সবুজে ঢাকা উঁচু পাহাড়। আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে এই পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে এক সময় খাগড়াছড়ি শহরে এসে পৌঁছলাম।

খাগড়াছড়ি কোনো জনাকীর্ণ শহর নয়। তার অবয়বটা অনেকটা গ্রাম্য বাজারের মত। পরের দিন ঈদ, ফলে শহরটা আরও ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। যানজটের ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে এধরনের শহরে এলে মনটা আপনা-আপনিতে ভাল হয়ে যায়। সেই প্রভাবটা আমার দেহ-মনে কিছুটা হলেও রেখাপাত করতে পেরেছিল। ছোট শহর বলে এখানকার যে-কোনো জায়গা বা প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের নখদর্পনে। আমি সুশীলের অফিসে যাব। সুশীল আগেই আমাকে তার অফিসের লোকেশনটা জানিয়ে দিয়েছিল। তারপরেও দুয়েকজনের কাছে সেটাকে আরও পরিষ্কার করার চেষ্টা করলাম। সুশীলের কর্মস্থলে যাবার পথটা আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি একটা রিকশায় উঠে রিকশাওয়ালাকে বললাম, আনন্দ অফিসে নিয়ে যান।

রিকশাওয়ালা কোনো রকম আপত্তি করল না। ফাঁকা রাস্তা ধরে রিকশা হেঁকে চলল। এক সময় ছোট শহরটি পেছনে ফেলে রিকশা অনেকটা পাড়ার ভেতরে চলে গেল। তারপর খোলামেলা কিছু ধানক্ষেত। তার মাঝখান দিয়ে সরু একটা মেঠো রাস্তা। রাস্তাটির মাথায় ছিমছাম একটি পাকা বাড়ি। আমি ঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছি, তা চিনতে আমার একটুও কষ্ট হল না। রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বিদায় করে দিলাম। আমি গেটের কড়া নাড়তে লাগলাম। কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া গেল না। ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে তিনটে বাজে। ধরে নিলাম খেয়ে-দেয়ে আয়েশি ঘুম দিচ্ছে। তখনও আমি মোবাইলের জগতে প্রবেশ করিনি। আর মোবাইল থাকলেও কী। পার্বত্য এলাকায় তখনও মোবাইল চালু হয়নি। যদি মোবাইলের সুযোগ থাকত আমি ফোন করে জানাতে পারতাম। বলতাম, এসে গেট খুলে দিয়ে যাও।

অনবরত গেটের কড়া নেড়ে যেতে থাকলাম। এক সময় বিশ বাইশ বছরের একজন তরুণ এসে গেট খুলে দিল। সে বলল, সুশীলদা আমাকে গেট খোলা রাখতে বলেছিল। কিন্তু কোন সময় যে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝে উঠতে পারিনি।

সে আমার ব্যাগটা উঠিয়ে নিল। আমার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সে গা করল না। ইতোমধ্যে সুশীল আমার আগমন টের পেয়ে গেল। সে বেরিয়ে এসে বলল, দুঃখিত, আমার বাস স্ট্যান্ডে যাওয়ার দরকার ছিল। কোনো অসুবিধা হয়নি তো?

আমি বললাম, অসুবিধা হওয়ার মত শহর খাগড়াছড়ি নয়। এখানকার রিকশাওয়ালাকে কোনো কিছু ভেঙে বলতে হয় না। এখানে কোথায় কী আছে সব ওদের চেনা জানা।

সুশীল বলল, এখন কোনো কথা নয়। আগে হাত-মুখ ধুয়ে নাও। তারপর খেতে বস।

আমি কোনো রকম উচ্চবাচ্য করলাম না। ভদ্রতার খাতিরে বলা উচিত ছিল খেয়ে এসেছি। কিন্তু দরকার কী, আমি তো কিছুই খাইনি। খিদেয় আমার পেট চোঁ চোঁ করছে। যে তরুণটি গেট থেকে আমার ব্যাগ বহন করে নিয়ে এল সে রান্নাবান্নার দায়িত্ব পালন করে এবং সেই সঙ্গে এ বাড়ি দেখাশুনা করার ভারও তার ওপর ন্যস্ত। তরুণের নাম সুমন। সে যখন রান্নাঘরে গেল সুশীল আমাকে তার সম্পর্কে স্পষ্ট করল।

এ বাড়িটি অফিস। এ অফিসে যারা কাজ করে তারাও এখানে থাকে। আজ সুশীল এবং সুমন বাদে সকলে ঈদের ছুটিতে বাড়ি চলে গেছে। সুশীলও চলে যেত। আমি আসব সেটা তার মাথায় ছিল। আমি গোসলখানায় ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। ততক্ষণে সুমন টেবিলে খাবার দিয়ে দিয়েছে। খুবই সাদামাটা খাবার। তবে তৃপ্তিসহকারে খেলাম। সুশীল বলল, এখন একটু বিশ্রাম নাও। সন্ধের সময় আমরা বেরুব।

সুশীলের কথা মেনে আমি বিছানায় শরীর ছেড়ে দিলাম। ঘণ্টাখানেক আমি হালকা ঘুমিয়ে নিলাম। সুমন এক কাপ চা এনে দিল। চা পান করার পর শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে উঠল। সুশীলকে বললাম, চল বের হওয়া যাক। সুশীল বলল, তাই করি।


আমরা যে বের হব, কোথায় যাব তা ঠিক করিনি। আমার মাথায় কাজ করছিল শহরটা ঘুরে ঘুরে দেখব। বের হওয়ার পর সে বলল, চল, তোমাকে আমার এক আমলা বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে যাই। বড় ভাল লোক। কথা বললে তোমার খারাপ লাগবে না।

আমি তার পেছনে পেছনে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। সে আমাকে এমন একটা পথ দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তার দু’পাশে সব আসবাবপত্র তৈরির দোকান। এখানে দেখলাম সেগুন কাঠের যথেচ্ছ ব্যবহার। ঢাকা শহরে সেগুন কাঠ প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি মেপে খরচ করে। কিন্তু এখানে তার বালাই নেই। কাঠের যে অংশটা মনে ধরছে সেটিই তারা কাজে লাগাচ্ছে। বাকিটা তারা কোনো দরকারই মনে করে না। সুশীলকে বললাম, এত কাঠ নষ্ট করার অর্থ কী?

সে বলল, এখানে কাঠ খুবই শস্তা। এই যে স্তূপ করা কাঠগুলো দেখছ ওগুলো সব জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

প্রতিটি তৈরীকৃত আসবাবপত্র বড় লোভনীয়। আমার ইচ্ছে হয়েছিল এখান থেকে কিছু আসবাবপত্র কিনে নিয়ে যাই। সুশীল বলল, সেটা সম্ভব নয়। এখান থেকে কাঠজাত কোনো জিনিস বাইরে যাবার নিয়ম নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখানে এসে ইচ্ছেমত ফার্নিচার বানায়। তারপর বদলি হবার সময় ট্রাক ভরে ওসব ফার্নিচার নিয়ে যায়। তাদের বেলায় কেউ আপত্তি করে না। কিন্তু তোমাকে নানারকম ভোগান্তিতে পড়তে হবে।

সুশীল আমাকে তার বন্ধুর বাসায় নিয়ে গেল। বন্ধুটির নাম এখন আমার মনে আসছে না। আমরা ওখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক গল্পগাছা করে কাটালাম। সন্ধের নাস্তাটা এখানেই সারলাম। ভদ্রলোককে আমার খুবই অমায়িক মনে হল। আমি যতটুকু জানি, যারা নানা অপকর্ম বা সরকারি রোষানলে পড়ে তাদেরই খাগড়াছড়ি কিংবা পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় বদলি করে পাঠায়। এ পদক্ষেপ অনেকটা শাস্তিমূলক। আমি ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী অপরাধ করেছেন, আপনাকে খাগড়াছড়িতে পাঠাল?

nar_09.jpg………
আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র
……..
তাঁর জবাব, আপনার কি মনে হয় খাগড়াছড়ি খুব খারাপ জায়গা? জানি না, কোনো অপরাধের কারণে আমাকে এখানে পাঠিয়েছে কি না। তবে চাকরিসূত্রে বাংলাদেশে যত জায়গায় গিয়েছি তাতে করে মনে হয়েছে খাগড়াছড়ি সবচে’ আরামদায়ক জায়গা। এখানে আমার বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে। আমি চাই না আমাকে বদলি করে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিক।

সত্যি তাই। খাগড়াছড়ি আরামদায়ক শহর। এখানে কোনো যানজট নেই। নেই মানুষের কোনো অতিরিক্ত কোলাহল। ভদ্রলোক যে বাড়িতে থাকেন সেটি সরকারিভাবে প্রাপ্ত। খানিকটা পাহাড়ের ওপর গাছপালা ঢাকা বাড়িটির আলাদা একটা সৌন্দর্য আছে। সাধারণত এধরনের জায়গায় সৌখিন মানুষ বাংলো বানিয়ে অবসর যাপন করতে আসেন। জায়গাটা আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেল।

ভদ্রলোকের বাইরে যাবার তাড়া ছিল, তাই বিশেষ সময় দিতে পারলেন না। তিনি আমাদের এক বেলা খাবারের দাওয়াত দিলেন। আমার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সময় করে উঠতে পারিনি।
আমরা বেরিয়ে পড়লাম। সুশীল ছোট্ট শহরখানা আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল। আদিবাসীদের হস্তশিল্পের দোকানে নিয়ে গেল। এসব দোকানে মেয়েরাই বিক্রেতা হিসেবে কাজ করে। এখানকার নারীরা সব কাজের কাজি। বাজার সদায় থেকে আরম্ভ করে নারীরাই সব করে। পুরুষদের ওসবের ধারেকাছেও দেখা যায় না।

খাগড়াছড়ি শহরটাতে আমার মনে হয়েছিল আদিবাসীরা সর্বত্র গিজগিজ করে। কিন্তু তা নয়। ওখানে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বাঙালিদের দখলে। ওখানে কোনো আদিবাসীকে রিকশা চালাতে দেখা যায় না। নোয়াখালী, বিশেষ করে ফেনীর লোকজন খাগড়াছড়ি এলাকাটাকে দখলে নিয়ে নিয়েছে। নোয়াখালীর লোকজন বেশি হওয়ার কারণ ফেনী থেকে একধরনের মিনি বাস প্রতিনিয়ত ওখানে গতায়াত করে। ওই বাসের ভাড়া তত বেশি নয়। খুব সম্ভব পঞ্চাশ টাকার মত। এ গাড়িগুলো অন্য গাড়ির চে’ চলেও দ্রুত।

সেসব কথা থাক। খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত কিছু আশা করে আমি আসিনি। আমি সুশীলের কথা রক্ষা করতে এসেছি। তাছাড়া সে আমাকে রাঙামাটি ভ্রমণে নিয়ে যাবে। সুতরাং খাগড়াছড়ি থেকে আমি যতটুকু আদায় করতে পারব সেটা আমার বাড়তি পাওনা। সুশীল আমাকে বলল, খাগড়াছড়ি শহর দেখে তোমার তেমন মন ভরেনি। তোমাকে কালকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব। তখন তুমি অবাক না হয়ে পারবে না।

আমি বললাম, জায়গাটা কি খুব দূরে?

সে বলল, দূরে-কাছে এসব নিয়ে ভাবছ কেন? ঘুরতে এসেছ ঘুরে যাবে।

পরদিন ছিল ঈদ। খাগড়াছড়ি শহর একেবারে ফাঁকা। দোকানপাট সব বন্ধ। লোকজন হঠাৎ চোখে পড়ার মত। সুশীল আমাকে বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে গেল। বাসস্ট্যান্ডেও তেমন লোকজন নেই। একটা গাড়িতে কিছু যাত্রী বসে আছে। তারা ফেনী যাবে। সুশীল বলল, আর কিছু লোক পেলে গাড়িটা ছেড়ে দেবে। চল আমরা গাড়িতে গিয়ে বসি।

সুশীলকে বললাম, আমি তো রাঙামাটি যেতে চাই। অযথা সময় নষ্ট করার অর্থ কী।

সুশীল বলল, তুমি ইচ্ছে করলেও এখন রাঙামাটি যেতে পারবে না। জানোই তো আজ ঈদ। দুপুরের পর ছাড়া রাঙামাটির গাড়ি ছাড়বে না।

আমরা ফেনীর গাড়িতে উঠে বসলাম। কিন্তু সুশীল আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে সে আমাকে কিছু বলছে না। সে আমাকে বারবার বলে যেতে থাকল তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দিতে চাই। আগে যদি বলে দেই তাহলে মজা থাকবে না। আমি সুশীলের সারপ্রাইজের আশায় বসে রইলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। যে পথ দিয়ে আমি খাগড়াছড়িতে এসেছি ওপথ ধরে গাড়ি চলতে আরম্ভ করল। পনের বিশ মিনিট পর গাড়ি আলুটিলায় গিয়ে থামল। আমি খাগড়াছড়িতে আসার সময় আলুটিলায় একটা সাইনবোর্ড দেখেছিলাম। সুতরাং এ জায়গাটি সম্পর্কে অল্প সময়ের একটা পরিচয় আমার আছে। এটা একটা পর্যটন এলাকা।

আমরা যেখানে নামলাম জায়গাটি বড়ই ছায়াশীতল। বিশাল একটা বটগাছ গেটের পুরো জায়গাটি ছেয়ে আছে। গ্রীষ্মের ভরদুপুরে এ জায়গাটা কত আরামদায়ক হবে আমি কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারি। আমরা টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। জায়গাটা পাহাড়, কিন্তু ভেতরে দেখতে অনেকটা খোলামেলা মাঠের মত। এই মাঠে দাঁড়িয়ে দূর-দূরান্তের ছোটখাটো পাহাড়গুলোর দেখা মেলে। পুরো এলাকাটা অপূর্ব সুন্দর।

গেটের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল একজন মানুষ কাঁচা বাঁশের চোঙা দিয়ে মশাল বানিয়ে বিক্রি করছে। বাঁশের চোঙার ভেতরে পাটের রশি ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারপর চোঙাগুলোতে কেরোসিন ভরে খাঁড়া করে রাখছে। সুশীল দশ টাকা দিয়ে একটা মশাল কিনে নিল। আমি তখনও বুঝে উঠতে পারিনি এই মশাল কী কাজে আসবে। আমাদের সঙ্গে আরও আট দশজন ছিল। প্রায় সকলে তাই করল। আমরা সকলে পাহাড়ের চূড়া বেয়ে পুবদিকে ছুটলাম। কিছু দূর যেতে বিশাল এক গুহা এবং গুহাতে নামার জন্য খাঁড়া দীর্ঘ পাকা সিঁড়ি। আমরা দশ বারজন ছিলাম। সুশীল বলল, এদের সঙ্গে নিচে নেমে যাও। এখানে বিশাল একটা সুড়ঙ্গপথ আছে। বাংলাদেশে তুমি আর কোথাও এধরনের সুড়ঙ্গ পাবে না। এই সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে তুমি পাহাড়ের এপাশ থেকে ওপাশে চলে যেতে পারবে। নিচে নেমে মশালটা জ্বালিয়ে নিয়ো। ভেতরে বেশ অন্ধকার। কোনো কারণে আলো নিভে গেলে বেরিয়ে আসতে খুব কষ্ট হবে। অনেকে সাহসের অভাবে এ সুড়ঙ্গে ঢুকতে চায় না।

সুশীলের কথায় আমি শিউরে উঠলাম। আমি তাকে বললাম, তুমি যাবে না?

সে বলল, আমার যাওয়া সম্ভব নয়। ভেতরের পানি বেশ ঠাণ্ডা। কদিন ধরে আমি কিছুটা অসুস্থ। ওই ঠাণ্ডা পানি গায়ে লাগলে অসুখটা বেড়ে যেতে পারে।

আমি তাকে আর সাধাসাধি করলাম না। দরকারও মনে করিনি। আমার সঙ্গে তো আরও আট দশজন আছে। আমরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। সুড়ঙ্গের মুখে বড় বড় পাথর। পাথরগুলো এমন, একটা থেকে আরেকটায় লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে হয়। সুড়ঙ্গের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোনো কিছু ঠাহর করে ওঠা বড়ই কঠিন। আমার নেপালের পোখরার সেই মহাদেবের গুহাটার কথা মনে পড়ে গেল। ওই গুহাটিই অবিকল এই রকম। ওখানে ঢোকা এবং ছবি তোলা নিষেধ। কিন্তু আলুটিলার এই গুহায় ঢোকা অথবা ছবি তোলা কোনোটারই বালাই নেই।

আমরা সকলে মশাল জ্বালিয়ে নিলাম। তারপর বড় বড় পাথর ডিঙিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লাম। মশালের আলোয় সুড়ঙ্গপথ আলোকিত হয়ে গেল। তবে সেটা বেশি দূর পর্যন্ত নয়। সুড়ঙ্গের ভেতরে মাঝে মাঝে বাঁক আছে, যে কারণে মশালের আলো বেশিদূর প্রসারিত হতে পারছিল না। সুশীল ঠিকই বলেছে, ভেতরে বেশ ঠাণ্ডা। আমরা কখনও পাথর ডিঙিয়ে, কখনও পানি মাড়িয়ে সামনের পথ চলছিলাম। আমরা যারা ছিলাম সকলে চিৎকার করছিলাম। আমাদের চিৎকারের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। মশালের আলোর দেখা পেয়ে সুড়ঙ্গে বসবাসরত চামচিকাগুলো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ছিল। সে এক রোমাঞ্চকর অভিযান। জীবনে অনেক আনন্দের স্বাদ আমি পেয়েছি। অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতাও আমার আছে। কিন্তু একসঙ্গে এমন আনন্দ এবং ভয়-ভীতিপূর্ণ পরিবেশ আমি কখনও পাইনি। দশ মিনিটের মাথায় আমরা পাহাড়ের ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ততক্ষণে আমাদের মশালও প্রায় নিভু নিভু। বেরিয়ে এসে দেখি সুশীল ওখানে দাঁড়িয়ে। সে বলল, কেমন সারপ্রাইজ দিলাম।

আমি বললাম, চমৎকার! এমন একটা সুন্দর জায়গা এখানে আছে আগে বলবে না?

সে বলল, সব কিছু বলে দিলে মজা থাকে না। এখন পাহাড়ের ওপরে সিটিং প্যালেসে বসে দূরের পাহাড় দেখ, নইলে গেটের বাইরে চল।

আমি বললাম, এলাম যখন আরেকটু থাকি।

আমরা ঘণ্টাদুয়েক ছিলাম। একজন আদিবাসীকে জিজ্ঞেস করলাম, এ পাহাড়ের নাম আলুটিলা হল কেন?

তিনি বললেন, এ পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর আলু হত। এখনও হয়। একেকটা আলু চার পাঁচ কেজি ওজনের। মানের দিক দিয়েও আলুগুলো ভাল। আলু জন্মায় বলে পাহাড়টির নাম হয়েছে আলুটিলা।

আমরা সুশীলের ডেরায় ফিরে এলাম। সুমন রান্না করে রেখেছে। সুশীল বলল, খেয়ে নাও। তারপর ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ব।


আড়াইটার দিকে আমরা রাঙামাটির উদ্দেশ্যে বাসস্ট্যান্ডে গেলাম। ঈদের দিন বলে তেমন গাড়ি নেই। সারাদিনে একটা গাড়িই যাবে। গাড়িখানা স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো। লোকজন কেউ কেউ উঠে বসেছে। বাঙালি যাত্রী তেমন একটা নেই বললেই চলে। যাত্রী বলতে আদিবাসীরা। আমরা সামনের দিকে সিট না পেয়ে খানিকটা পেছনে গিয়ে বসলাম। পুরো গাড়িতে যাত্রী ভরপুর না হলেও চালক গাড়ি ছেড়ে দিল। সন্ধের আগে আগে রাঙামাটি গিয়ে পৌঁছতে হবে সেটাই বোধকরি তার মাথায় কাজ করছিল। গাড়িখানা লক্করঝক্কর মার্কা। ঢাকা শহরের সেই আমলে যে গাড়িগুলোকে মুড়ির টিন বলা হত অনেকটা তার মতই।

গাড়ি ধীরগতিতে ছুটে চলল। চলার মধ্যে তেমন একটা প্রাণ নেই। নিচু পাহাড় থেকে উঁচু পাহাড়ে ওঠার সময় মনে হয় যেন গাড়িটার দম আটকে আসছে। তখন তার গোঁ গোঁ শব্দ শুনে মনে হতে থাকে–আর পারছি না। চালক সাহেব হয়ত গাড়িটার আর্তি বুঝতে পারেন না। তাই জোর খাটিয়ে গাড়িটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যখন উঁচু পাহাড় থেকে নিচু পাহাড়ে গাড়িটা নামতে থাকে তখন গোঙানি বন্ধ হয়ে যায়। তখন হয়ত প্রাণ ফিরে পেয়ে বলে, বাবা, বাঁচা গেল।

আমরা পাহাড়ি রাস্তা ধরে যাচ্ছিলাম। তার মাঝে মাঝে হালকা লোকালয়ের দেখা পেলাম। ওসব জায়গায় গাড়ি থামল। যাত্রী উঠানামা করল। আমরা একটা লোকাল গাড়ির যাত্রী হয়েছিলাম। তাই আমাদের সময়ও লাগছিল বেশি। তারপরেও সন্ধের আগে আগে রাঙামাটি গিয়ে পৌঁছলাম। সুশীল রাঙামাটি শহরের এক-আধটু চেনে। তবে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নয়। রাঙামাটি শহরেও খাগড়াছড়িরর মত লোকজন নেই। প্রায় সব মানুষ গ্রামে চলে গেছে। মানুষ নেই তাই শহরটার তেমন প্রাণ খুঁজে পেলাম না। আমরা গাড়ি থেকে নেমে পথ হাঁটছি, যদি সামনে কোথাও একটা ভাল হোটেল চোখে পড়ে সেটিতে উঠে পড়ব।

আমরা রিজার্ভ বাজারের দিকে পথ চলছিলাম। ওখানে আমাদের এলাকার অনেক মানুষ থাকে। তাদের কাছে রিজার্ভ বাজারের কথা এত শুনেছি যে না দেখেও চোখের সামনে তার একরকম ছবি ভেসে উঠল। যদি কোথাও একজন পরিচিত মানুষের দেখা হয়ে যায় সেটাকে আমি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম। না, আমাকে রিজার্ভ বাজারে যেতে হয়নি। আধা পথে একটা হোটেল চোখে পড়ল। নতুন বানিয়েছে বোধকরি। বাইরের দিকটা দেখতে বেশ খানদানি মনে হল। হোটেলটার নাম এ মুহূর্তে আমার মনে আসছে না।

ঈদের দিন বলে পুরো হোটেলটা একরকম ফাঁকা। আমরা হোটেলের প্রায় কক্ষগুলো ঘাটাঘাটি করে তার একটা নিয়ে নিলাম। আমি গত জীবনে অনেক হোটেলে থেকেছি, কিন্তু এমন সুন্দর পরিবেশে কোনোদিন থাকিনি। আমাদের কক্ষটা ছিল একেবারে লেকের পাশ ঘেঁষে। লেকের বিস্তৃত জলরাশি সহজে আমাদের নজরে আসছিল। তার ওপাড়ে উঁচু পাহাড় চোখ এড়াবার মত নয়। অনেক দূরের পাহাড়গুলোকে ছায়ার মত দেখায়।

আমি দু’টি ঋতুকে বেশ পছন্দ করি। শরৎ এবং বসন্ত। বসন্তকালে আমার ভেতরে ভেতরে মনমাতানো সুর গুণ গুণ করে বেজে যায়। তখন আমার মনের ভেতর একধরনের উৎফুল্লতা কাজ করে। কিন্তু শরৎটা তার বিপরীত। শরৎ আমার মনের ওপর অন্যধরনের প্রভাব বিস্তার করে। তখন প্রকৃতি থাকে শীতল। নদী-নালা বর্ষার মত না হলেও ভরযৌবনা। কাশফুল এবং আকাশের সাদা মেঘ দুটোই অন্যধরনের চমক জাগায়। তখন আমি আমার ভাবনার জগৎকে প্রসারিত করার সুযোগ পেয়ে যাই।

বাতাসের তোড়ে লেকের পানি ছলাৎ ছলাৎ করছিল। আমি তার মধ্যে একরকম তাল খুঁজে পাচ্ছিলাম। ঈদের দিন, তারপরেও জেলেরা নৌকা ভাসিয়ে লেকে মাছ ধরছে। আমরা দুটো চেয়ার নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। পুব আকাশে একটা রংধনু স্পষ্ট থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারই কারণে কিনা বলতে পারব না পুবের পাহাড়গুলো নির্মল আলোয় ঝলমল করছে। প্রকৃতি এত সুন্দর হয় কী করে!

আমরা সন্ধ্যাবধি হোটেলের বারান্দায় বসে কাটালাম। তারপর হাঁটতে বেরুলাম। পরের দিন আমরা নৌকাভ্রমণে বেরুব। আগে থেকে নৌকা ঠিক করে রাখার প্রয়োজন বোধ করলাম। আমরা লামা বাজারের ঘাটে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের দেখে অনেকে ছুটে এল। খুব সম্ভব আমাদের মত নতুন মানুষের আগমনের অপেক্ষায় তারা বসে থাকে। তাদের একজন বলল, নৌকা লাগিব না? (নৌকা লাগবে?)

আমি বললাম, একখান নৌকার দরকার আছিল। (একটা নৌকার দরকার ছিল।)

লোকটি বলল, হডে হডে যাইবান? (কোথায় কোথায় যাবেন?)

আমি বললাম, অনারা কন, হডে হডে যাইত পারি? (আপনারা বলুন, কোথায় কোথায় যাওয়া যায়।)

সে বলল, গেলে তো বওত জাগাত যওন যায়। শুভলং, রাজবাড়ি, পর্যটন–অনারা হডে যাইবান? (গেলে তো অনেক জায়গায় যাওয়া যায়। শুভলং, রাজবাড়ি, পর্যটন–আপনারা কোথায় যাবেন?)

আমি বললাম, যাইবার জাগা যেডে যেডে আছে বেউগ্যা যাইতাম চাই। হ টেঁয়া পরিব? (যাবার জায়গা যেখানে যেখানে আছে সব জায়গায় যেতে চাই। কত টাকা লাগবে?)

সে বলল, শুভলং, রাজবাড়ি, পর্যটন ঘুরাই আইন্যম ন শ টেঁয়া দেয়ন পরিব। (শুভলং, রাজবাড়ি, পর্যটন ঘুরিয়ে আনব নয় শ’ টাকা দিতে হবে।)

টাকার অংক শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আমি বললাম, এত টেঁয়া চাইলে তো যওন যাইত নয়। আঁই বেশিত বেশি তিন শ টেঁয়া দিত পাইরগ্যম। (এত টাকা চাইলে তো যাওয়া যাবে না। আমি বড়জোর তিন শ’ দিতে পারব।)

সে বলল, এত কম দিলে কি যওন যাইব না? আর এক্কেনা বাড়াই দেওন। (এত কম দিলে কি যাওয়া যাবে? আর একটু বাড়িয়ে দিন।)

আমি বললাম, আর পঞ্চাশ লইওন। তার বেশি অইলে যাইত পাইরতাম নয়। (আর পঞ্চাশ টাকা নেবেন। তার বেশি হলে যেতে পারব না।)

লোকটি রাজি হয়ে গেল। বলল, ঠিক আছে। কিছু অগ্রিম দি যও। তেল কিনন পরিব। আর কটা বাজে যাইবান ইয়ানও কই দেওন। (ঠিক আছে। কিছু অগ্রিম দিয়ে যান। তেল কিনতে হবে। আর কটা বাজে যাবেন সেটাও বলে দিন।)

আমি বললাম, সকাল আটটায়।

তাকে এক শ’টি টাকা অগ্রিম দিয়ে দিলাম। যাক, আমরা নিশ্চিন্ত হলাম পরের দিন সকালে ঘুরতে যাচ্ছি। আমরা আরেকটু ঘোরাফেরা করে একটা হোটেলে ঢুকে রাতের খাবার খেয়ে থাকার ঘরে চলে এলাম। রাত খুব বেশি হয়নি। তথাপি আমরা বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম। কোন সময় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম একটুও টের পাইনি। ক্লান্ত শরীরে ঘুম সহজে ভর করে এটা আমার নিত্যদিনের ঘটনা। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

ভোর হওয়ার খানিকটা বাকি। হঠাৎ আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। আমরা বিছানার ওপর খাড়া হয়ে বসলাম। কে যেন হোটেলের কোন দরজায় জোরে জোরে লাথি মারছে, আর চিৎকার করে অশ্লীল ভাষায় গালি দিচ্ছে। আমি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। সুশীল বলল, দরজা খুলবে না।

আমি সুশীলের কথায় গা করলাম না। খুব সতর্কভাবে আমি দরজার ছিটকিনি খুললাম যাতে কোনো রকম শব্দ না হয়। তারপর দরজা ফাঁক করে মাথাটা খানিক বার করে দেখলাম, একটা মেয়ে আমাদের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমি কোনো কিছু আঁচ করার আগে সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আমাদের ঘরে ঢুকে পড়ল। তারপর বলল, দরজা বন্ধ করুন। জানতে পারলে ওরা এখানে চলে আসবে।

আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। মেয়েটি ঘরে ঢুকে খাটের নিচে চলে গেল। সুশীল আর আমি দু’জনে হতভম্ব। এ তো বড় বিপদ! কেউ যদি এসে দেখে আমাদের ঘরে মেয়েমানুষ তাহলে তো কেলেঙ্কারির সীমা থাকবে না। কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না। সুশীল বলল, চুপচাপ শুয়ে থাকুন। কেউ দরজা নাড়লেও খোলা যাবে না।

সুশীলের পরামর্শ ফেলে দেয়ার মত ছিল না। আমি তার কথা মেনে চুপচাপ শুয়ে রইলাম। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে আরম্ভ করেছে। তার ক্ষীণ আভা ঘরের মধ্যেও এসে পড়েছে। ইতোমধ্যে বাইরের হট্টগোল থেমে গেছে। যখন ভোরের আলোটা স্পষ্ট হয়ে উঠল আমি অতি সন্তর্পনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম কাছাকাছি কোনো মানুষজন নেই। আমি সেই সুযোগে হোটেলের পুরো করিডরটা ঘুরে এলাম। কোথাও কোনো লোকজনের দেখা না পেয়ে মনে মনে আশ্বস্ত হলাম মেয়েটাকে এই সুযোগে বের করে দিতে হবে, নইলে আমরাও বিপদে পড়ে যেতে পারি। আমি পুনরায় ঘরে চলে এলাম। তারপর মেয়েটাকে খাটের নিচ থেকে ডেকে বের করলাম। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার এই অবস্থা কেন বলুন তো?

সে জানাল, ওরা আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। ওরা ওকে মারধর করেছে। ওরা বলছে আমার স্বামী পরনারী নিয়ে হোটেলে অবস্থান করছে। বিশ্বাস করুন, ওই আমার স্বামী।

আমি বললাম, ওরা কারা?

সে পুনরায় জানাল, কথাবার্তায় মনে হল হোটেল-মালিক। ওরা সকলে মাতাল।

তার কাছ থেকে সব কিছু শোনার পর মনে হল তাকে আমরা আশ্রয় না দিলে হয়ত ভয়ানক কিছু ঘটে যেতে পারত। আমাদের ঘাড়ে আপনা-আপনি একটা দায়িত্ব এসে পড়ল কীভাবে মেয়েটাকে নিরাপদে হোটেল থেকে বের করে দিতে পারি। কিন্তু হোটেলে গেট বন্ধ। রিসিপশনে একজন লোক শুয়ে আছে। অনুমান করলাম তার কাছে চাবি থাকবে। আমি মেয়েটাকে নিচের তলায় নিয়ে গেটের কাছে দাঁড় করালাম। তারপর লোকটাকে ডেকে তুলে বললাম, তোঁয়ার কাছে চাবি আছে না? এক্কেনা বাইরে যাইত চাইলাম দে। (তোমার কাছে চাবি আছে? একটু বাইরে যেতে চেয়েছিলাম।)

আমার কথায় লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসল। আমি তাকে হাতে ধরে শুইয়ে দিলাম। তারপর বললাম, তুঁই শুই থাগো। আঁই গেট খুলি আইয়েরে তোঁয়ারে চাবি দি দিয়ম। তোঁয়ার কষ্ট গরন লাইগদ্য নয়। (তুমি শুয়ে থাক। আমি গেট খুলে এসে তোমাকে চাবি দিয়ে দেব। তোমার কষ্ট করা লাগবে না।)

কথায় কাজ হয়েছে। লোকটা তেমন বাড়াবাড়ি করল না। বরং সে খুশিই হল। এত সকাল সকাল দরকার না পড়লে কে ঘুম থেকে উঠতে চায়? আমি চাবিটা নিয়ে গেট খুলে মেয়েটাকে তাড়াতাড়ি বের করে দিলাম। তারপর বললাম, যতদূর সম্ভব এখান থেকে দূরে কোথাও চলে যান।

সে জানতে চাইল, আমার স্বামী?

আমি বললাম, আপনার স্বামী কোথায় আমি তো বলতে পারব না। আগে নিজেকে রক্ষা করুন, তারপর স্বামীর খবর নেবেন। আমার ধারণা তিনি আশেপাশে কোথাও আছেন। আপনি এক ফাঁকে এসে রিসিপশনে খবর নিয়ে যাবেন। আমার মনে হয় না তখন কোনো বিপদ হবে।

মেয়েটা ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল। আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

গেটের কাছাকাছি আমি কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে কাটালাম। তারপর ভেতরে ঢুকে লোকটাকে চাবিটা গছিয়ে দিয়ে আমার ঘরে গেলাম। সুশীল পুরো ব্যাপারটা নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছিল না। আমি যখন কক্ষে ফিরে এলাম সুশীল বলল, কিছু একটা করতে পেরেছ?

আমি বললাম, গেটের বাইরে পৌঁছে দিয়েছি। কেউ টের পায়নি।

সে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, আপদ গেল। এখানে বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। যেভাবেই হোক আজকেই আমাদের এখান থেকে বিদায় নিতে হবে।

আমি বললাম, এ ছাড়া উপায় নেই।


আমরা গোসলাদি সেরে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। ঘড়িতে মাত্র সাতটা বাজে। একটা হোটেলে ঢুকে নাস্তা সেরে নিলাম। নৌকাওয়ালার সঙ্গে কথা হয়েছে আটটা বাজে যাব। তার আরও খানিকটা বাকি। তারপরেও আমরা হাঁটতে হাঁটতে ঘাটে চলে গেলাম। না, নৌকাওয়ালা আগে থেকে হাজির। আমরা আর দেরি করার প্রয়োজন বোধ করলাম না।

এলাকা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। সুশীলের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করলাম। সে নৌকার মাঝিকে বলল, আগে শুভলং নিয়ে চলুন। তারপর দেখা যাবে কোথায় যাব। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভটভট শব্দ তুলে সোজা পুবদিকে ছুটে চলল। সূর্যের আলো তখনও তেমন একটা তেতে ওঠেনি। সকালের রোদ লেগে লেকের পানি চিকচিক করছে। অনেক জেলে নৌকা ভাসিয়ে লেকে জাল দিয়ে মাছ ধরছে। পানিতে ঈষৎ ঢেউ আছে, কিন্তু সেটা চোখে পড়ার মত নয়। এই জলরাশির মাঝে মাঝে পাহাড়ের মাথার টিকিটির দেখা মেলে। পানি ওপরের এই অংশটিকে অনেকটা টিলা পাহাড়ের মত দেখায়।

কাপ্তাই বাঁধের আগে এগুলো ছিল উঁচু উঁচু পাহাড়। তার পাদদেশে ছিল আবাদি জমি। ছিল রাজার বাড়ি। সবকিছু এখন পানির নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। এগুলো এখন ইতিহাস। কোনো বছর যদি শুকনো মৌসুমে পানি কমে যায় তখন সেই রাজার বাড়ির উপরদিকটা ভেসে ওঠে। এসব তথ্য মাঝি নিজের থেকে বয়ান করল।

আমাদের নৌকা পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে যেতে থাকল। আমরা যতই সামনের দিকে এগুতে থাকলাম পাহাড় এবং পানির সম্মিলনে প্রকৃতির একরকম সৌন্দর্য আমি উপলব্ধি করতে লাগলাম এবং দূরের উঁচু পাহাড়গুলো আমার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকল। প্রকৃতি যখন আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তখন তার মধ্যে কোনো রকম কার্পণ্য থাকে না। রাঙামাটির সৌন্দর্যটা অন্তত আমাকে তাই মনে করিয়ে দেয়।

আমরা বিস্তীর্ণ জলরাশি পেরিয়ে পাহাড়রাজ্যে প্রবেশ করলাম। শীর্ণকায় একটি নদী। তার দু’পাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। প্রথমে এ নদীকে কর্ণফুলি বলে ভ্রম হয়েছিল। কিন্তু কর্ণফুলি তো এত শীর্ণকায় হওয়ার কথা নয়। পরে জানলাম এ নদীর নাম কাচলং। আমার ক্ষুদ্র জীবনে বাংলাদেশের অসংখ্য নদী দেখার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু কাচলংয়ের মত এত সুন্দর নদী কখনও দেখিনি। তাছাড়া কাচলং নামের একটি নদী আছে সেটিও আমি জানতাম না। পরে আহমদ ছফার একটি কবিতায় আমি প্রথম কাচলং নদী সম্পর্কে জেনেছিলাম। তাঁর এক সময় গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। সেই সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন লেখায় বিভিন্নভাবে লিখেছেন। সেখানকার কঠিন জীবনযাত্রার কথা নানাভাবে বয়ান করেছেন। কিন্তু তাঁর গদ্যে লেখা এসব রচনায় কোথাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে আপ্লুত করেছে এধরনের তথ্য আমি পাইনি। অর্থাৎ সেদিকে তিনি পা বাড়াননি। তাঁর রচিত ‘পাহাড়ি স্মৃতি’ নামের একটি ছোট কবিতা দেখতে পাই। সেখানে কাচলং সম্পর্কে তিনি কিঞ্চিৎ ধারণা দিয়েছেন এভাবে :

‘কাঁচলং বয়
কাঁইচামতী বয়
পথ কেটে বয়
পথ বেঁধে বয়
কেটে কেটে শিলা
পাথুরে পাহাড়
পাহাড় কঠিন;
ক্ষুরধার স্রোতে
পাহাড় ভাঙা স্রোতে
স্রোতে বয়ে যায়
একটানা অবিরাম
কাঁচলং বয়
কাঁইচামতি বয়।’

কাচলং নদীর প্রশস্ততা দু’ শ’ ফুটের বেশি নয়। দু’পাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড় বলে নদীটাকে অনেক গভীর দেখায়। পাহাড়গুলো পাথুরে। কিন্তু সবুজের কোনো কমতি নেই। পাথুরে পাহাড়গুলো খাঁড়া দেয়ালের মত। যে কারও দেখলে মনে হবে করাত দিয়ে কেটে পাহাড়ের মাঝখানে এ নদী বানিয়ে দেয়া হয়েছে। বর্ষাকালে কাচলংয়ের পানি কতদূর বৃদ্ধি পায় পাহাড়ের খাঁজ দেখলে অনুমান করা যায়। শরৎ মৌসুমের স্রোত দেখে আমি বুঝে নিলাম বর্ষাকালে এ নদীর স্রোত কত ভয়াবহ হবে। তখন কোনো নৌকা নিয়ে ওই দুর্গম পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব কিনা আমি কল্পনা করে ভেবে পাইনি।

রাঙামাটি ভ্রমণের মজাটা এ জায়গায়। এত অপূর্ব সুন্দর জায়গা রাঙামাটির আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। সূর্য মাথার ওপর খাড়া না হওয়া পর্যন্ত কাচলং নদী সর্বত্র আলোকিত হয় না। বানরের লাফালাফি সর্বত্র চোখে পড়ার মত। তাদের চেঁচামেচি, নানা কিসিমের পাখির কলকাকলি এ নির্জন এলাকায় যত স্পষ্টভাবে কানে এসে বাজে সেটার বিকল্প বাংলাদেশে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। নৌকার ভট ভট শব্দ আমাকে একরকম বিরক্তি ধরিয়ে দিয়েছিল। আমি মাঝিকে বললাম, তোঁয়ার নৌকার ইঞ্জিন দশ মিনিটের লাই বন্ধ গড়। আঁই কিছুক্ষণ চুপচাপ থাইকতাম চাই। (তোমার নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ কর। আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকতে চাই।)

মাঝি আমার কথার অন্যথা করল না। সে নৌকাখানা নদীর একপাশে নিয়ে দাঁড় করাল। আসলে অনাবশ্যক কোনো শব্দ ভাল লাগে না। আমি প্রকৃতিকে আরও কাছে থেকে অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম।

সুশীল বলল, তুমি এখানে থেকে যাও।

আমি বললাম, থেকে যেতে পারলে ভাল হত। এর চে’ সুন্দর এবং সুখময় জায়গা আর কোথায় আছে বল? আমার যদি পুনর্জন্ম হয় আমি এধরনের জায়গাকে বসতি হিসেবে বেছে নেব।

মাঝি বলল, এডে বই থাগি লাভ নাই। সামনে শুভলং ঝর্না। এডে যাইরে বইয়ুন। (এখানে বসে লাভ নেই। সামনে শুভলং ঝর্না। ওখানে গিয়ে বসুন।)

সুশীল বলল, তাই কর।

নৌকা পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করল। দশ পনের মিনিটের মাথায় আমরা শুভলং ঝর্নার কাছে পৌঁছে গেলাম। আমি শুভলং ঝর্নার কথা অনেক শুনেছি। অনেকে সুযোগে পেলেই ঝর্নাটি দেখতে যায়। সত্যি তাই। ঝর্নার ধারা আপনাকে যত না আপ্লুত করবে, তার চে’ এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনার ভেতরটাকে আরও বেশি করে নাড়া দেবে। ঝর্নার ধারাটি কিছুটা ক্ষীণ। লোকজন বলাবলি করছে, বর্ষার মৌসুমে না এলে এ ঝর্নার সৌন্দর্য বেশি করে অবলোকন করা সম্ভব নয়। শুকনো মৌসুমে এর ধারা আরও কমে আসে। মনে হল ঝর্নাটির এখন করুণ দশা চলছে। বর্ষাকালে রাস্তা ডুবে গিয়ে এপাশের পানি ওপাশে গড়িয়ে পড়লে এর চে’ বেশি সুন্দর দেখায়। তারপরেও কথা থেকে যায় এটা পাহাড়ি ঝর্না, টিনের চাল থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির পানি নয়। কয়েকজন তরুণ শক্তি খাটিয়ে ঝর্নার প্রায় কাছাকাছি চলে গেছে এবং হনুমানের মত চিৎকার আরম্ভ করে দিয়েছে। তারা ঝর্নার সৌন্দর্যে আভিভূত হয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে তা কিন্তু নয়। ভাল লাগুক আর না লাগুক তারুণ্যের উচ্ছ্বাস কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়। এখানে যা ঘটছে সেটারই নামান্তর।

আমরা ওখানে ওখানে কিছুটা সময় খরচ করে নৌকা নিয়ে উজানে ছুটে চললাম। উদ্দেশ্য অল্প দূরে একটা সেনা ছাউনি আছে সেটা দেখে আসা। এ জায়গাটিও শুভলংয়ের একটা অংশ। ওখানে সচরাচর কেউ যায় না। যাওয়াটাকে অনেকে সময়ের অপচয় হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু সব জিনিসের যে একটা মূল্য আছে সেটা আমার কাছে একেবারে ফেলনা নয়। ওখানে যাবার পথে আমি যে অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে দেখে যাব তার মূল্য আমি কোন মাপকাঠিতে ফেলব। আমরা যখন সেনা ছাউনির কাছাকাছি চলে এলাম আমি একরকম ভয় পেয়ে গেলাম। দুজন সেনাসদস্য আমাদের নৌকার দিকে অস্ত্র তাক করে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু নৌকার মাঝিকে একটুও অপ্রস্তুত মনে হল না। সে তার মত করে নৌকা চালিয়ে ছাউনির কাছাকাছি চলে এল। আমরা যখন হেঁটে ওপরে গেলাম একজন সেনাসদস্য আমাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। আমরা নিজেদের পরিচয় দিলাম। তারপর বললাম, আমরা কি এখানে এসে আপনাদের খুব বেকায়দায় ফেলে দিলাম?

তিনি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কেন বলুন তো?

আমি বললাম, আমাদের নৌকা যখন এদিকে আসছিল আপনারা অস্ত্র তাক করে রেখেছিলেন।

তিনি বললেন, এটা আমাদের নিয়মের মধ্যে পড়ে। আমরা তো জানি না কারা আসছে। আমাদের সব সময় সতর্ক হয়ে থাকতে হয়।

আমি বললাম, আমরা কি চলে যাব?

তিনি হেসে বললেন, যাবেন কেন? আমাদের এখানে কেউ আসলে আমরা খুশি হই। ওখানে বসার জায়গা আছে। ইচ্ছে করলে আপনারা ঘুরে ঘুরে জায়গাটি দেখতে পারেন।

আমরা সেনাসদস্যটির পেছনে পেছনে নদী থেকে ওপরে চলে এলাম। ছিমছাম গুছানো একটা জায়গা। সেনাবাহিনীর মধ্যে যে শৃঙ্খলাবোধ কাজ করে এ জায়গাটা তারই একটা নমুনা। পাহাড়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত তাদের স্থাপনাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম। প্রতিটি স্থাপনার ওপরে ছনের চাল, চারপাশে মুলিবাঁশের বেড়া। কোনোটাই একটুও বেমানান নয়। একটা মিনি চিড়িয়াখানাও রয়েছে সেখানে। একটি খাঁচার মধ্যে বেশ কয়েকটি বানর। পাশের খাঁচায় একটি ভালুক। সেনাসদস্যরাই তাদের দেখাশোনা করেন। নিয়মিত তাদের খাবার খাওয়ান। এটা তাদের কাজের একটা অংশ। মনের প্রশান্তির জন্য তারা এসকল প্রাণীদের লালন-পালন করছেন।

এখানে বেশ কয়েকজন সেনাসদস্য আছেন যারা পাঁচ সাত বছর ধরে পাহাড়ি এলাকায় রয়েছেন। সেনাবাহিনীর নিয়ম মেনে প্রতিটি সদস্যকে একবারের জন্য হলেও পাহাড়ি এলাকায় বদলি হয়ে আসতে হয়। এজন্য নির্জন এলাকায় দায়িত্বরত সদস্যরা এটাকে শাস্তি মনে করেন না। সেনাসদস্যদের ব্যবহার আমাদের এত মুগ্ধ করেছিল যে আমরা এক ঘণ্টার অধিক সময় কাটিয়ে দিলাম। পাশে শুভলং বাজার। আমি সেখানে ঘুরতে গেলাম। বাজারটা বেশ বড়। তবে লোকজনের সমাগম কম। হয়ত দুপুরবেলা বলে এই অবস্থা। পাহাড়ি কলা দেখে আমি লোভ সামলাতে পারিনি। পাহাড়ি কলার আলাদা একটা মর্যাদা রয়েছে। এখানকার কলা খুবই মিষ্টি। আমি খাওয়ার জন্য বেশ কটি কলা কিনলাম।

আমাকে দেখে একজন বাঙালি চলে এল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এখানে থাকেন?

সে জবাব দিল, আমি বউ-বাচ্চা নিয়ে বেশ ক’ বছর ধরে এখানে আছি।

আমি বললাম, আপনার বাড়ি কোথায়?

সে জবাব দিল, বরিশাল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখানে থাকতে কোনো অসুবিধা হয় না?

সে বলল, আমরা এখানে পাহাড়ি-বাঙালি মিলেমিশে থাকি। তাছাড়া কাছে সেনা ছাউনি রয়েছে, তেমন একটা সমস্যা হয় না। তারা সব সময় আমাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখেন।

আমি অবাক হয়ে ভাবতে থাকলাম, সুদূর বরিশাল থেকে এসব লোক এখানে এল কীভাবে? কে তাদের পথ বাতলে দিয়েছিল এ গহীন অরণ্যে এসে বসবাস করার জন্য? আমি কোনো জবাব খুঁজে পেলাম না।

আমরা ইচ্ছে করলেও বেশি সময় ব্যয় করতে পারছিলাম না। আমাদের আরও দুয়েকটি জায়গায় যেতে হবে। তারপর হোটেল ছেড়ে খাগড়াছড়ি।

আমরা নৌকায় গিয়ে বসলাম। মাঝি নৌকা ছেড়ে দিল। আসার সময় আমরা স্রোতের বিপরীতে এসেছিলাম। তাই নৌকার গতি নিয়ে চলতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল। এবার সেই বালাই নেই। আমরা একই পথে চলতে আরম্ভ করলাম। কাচলং নদী পেরিয়ে আমরা রাঙামাটি লেকে গিয়ে পড়লাম। তারপর নৌকা দক্ষিণ-পশ্চিমে ছুটতে থাকল। এবার আমরা যাব রাঙামাটি পর্যটনে। আমরা যখন লেকের মাঝামাঝি চলে এলাম পর্যটনের নিশানার দেখা পেয়ে গেলাম। দূর থেকে একটা গাছকে দেখলাম ধবধবে সাদা। কোনোদিন এধরনের সাদা গাছ আমার চোখে পড়েনি। মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, ইবা কী গাছ? (ওটা কী গাছ?)

সে বলল, কী গাছ কইত পাইত্তাম নয়। তয় ঐ গাছত এত বোগা থাগে ইয়ুন হাগতে হাগতে গাছ ধলা গরি ফেলাইয়ে। (কী গাছ বলতে পারব না। তবে ওই গাছে এত বক থাকে, তারা মল ত্যাগ করতে করতে গাছ সাদা করে ফেলেছে।)

আমরা যখন গাছটার কাছাকাছি চলে এলাম তার নমুনা পেয়ে গেলাম। ওই গাছের ওপর অনেক সাদা সাদা বক মাথা উঁচু উঁচু করে বসে আছে। গাছের পাতা এবং বকের শরীর দুটোই যেন এক হয়ে আছে। আমরা অল্প সময়ে মধ্যে পর্যটন এলাকায় চলে এলাম। এলাকাটি আসলে মনোরম। আমরা ঝুলন্ত ব্রিজের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। এ ব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখা যায় বিস্তীর্ণ লেকের জলরাশি, আরেকদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাহাড়। আমরা ব্রিজের অপর পাড়ে গিয়ে একটা গাছের নিচে গিয়ে বসলাম। ঝুলন্ত ব্রিজটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম এ জায়গার জন্য ওটি বেশ মানানসই। আমি এ ব্রিজটি ছবিতে দেখেছিলাম। ছবি এবং বাস্তবতা কখনও এক হতে পারে না সেটা আমাকে নতুন করে ভাবতে হল।

আমাদের সময় দ্রুত গড়িয়ে যেতে থাকল। সময় আমাদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে দাঁড়াল। আমরা দেরি না করে সময়ের মূল্য দিতে চেষ্টা করলাম। নৌকা নিয়ে আমরা রাজবাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম। রাজবাড়ি বেশি দূরে নয়। ওখানে যেতে আমাদের আধা ঘণ্টার মত লেগেছিল। ওখানাকার বৌদ্ধ মন্দিরটা ভারি চমৎকার। লেক থেকে পাকা সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের ওপর উঠতে আমার নিশ্বাস ভারি হয়ে আসছিল। বৌদ্ধ মন্দিরের কাছে যেতে বাঁশের তৈরি কিছু শৈল্পিক গেট আমাদের পাড়ি দিতে হল। ধর্মকর্মে আমার বিশেষ মতি নেই। কিন্তু ধর্মীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে গেলে আমার মনটা অতিমাত্রায় পবিত্র হয়ে ওঠে, আমি টের পাই। রাঙামাটি বৌদ্ধমঠে এসে সেটা বুঝতে আমার বাকি থাকল না। আমি জুতো খুলে মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করলাম। আমাকে কেউ বাধা দিল না। আমি বৌদ্ধমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকটি ছবি ওঠালাম। আমার মনে হতে থাকল, আমি ছবি তুলব এজন্য বুদ্ধ মশায় অনেক আগে থেকে তৈরি হয়ে বসে আছে।

এখানে সব চে’ সুন্দর হল মন্দিরটা। পুরো মন্দিরটাই যেন একটা শৈল্পিক নিদর্শন। আমরা কিছু সময় ওখানে ঘুরাফেরা করে কাটিয়ে নৌকায় চলে এলাম। মাঝি বলল, মন্দির ত দেইখ্যন। রাজার বাড়িত ন যাইবান। (মন্দির তো দেখেছেন। রাজার বাড়ি যাবেন না?)

আমি বললাম, লই যন। (নিয়ে চলুন।)

আমাদের আবার লেক থেকে পাশের পাহাড়ে রাজবাড়িতে যেতে হল। রাজবাড়িতে গেলাম বটে, কিন্তু রাজকীয় কোনো জৌলুস দেখতে পেলাম না। তবে জায়গাটা মনোরম, গাছপালায় ঢাকা। আমার ইচ্ছে হয়েছিল কিছুক্ষণ থাকি। সুশীল বলল, দেরি করা যাবে না। যদি গাড়ি না পাই তাহলে আরও এক রাত এখানে কাটিয়ে দিতে হবে।

হোটেলের গত রাতের ঘটনা আমার মনে পড়ে গেল। আমি বললাম, সেটা সম্ভব নয়। আমাদের আজকেই খাগড়াছড়িতে পৌঁছতে হবে। এখানে থাকাটা নিরাপদ নয়।

সুশীল বলল, ভয় থাকা ভাল।

মাঝি দশ পনের মিনিট নৌকা চালিয়ে আমাদের রিজার্ভ বাজারের ঘাটে এনে নামিয়ে দিল।


দুই বছর আগে আমার বউ-বাচ্চাকে নিয়ে আবার রাঙামাটি গেলাম। এখন ঢাকা থেকে কিছু বিলাসবহুল গাড়ি রাঙামাটিতে যায়। আমরা গিয়েছিলাম শ্যামলী নামের বাসটিতে চড়ে। রাতে রওয়ানা দিয়ে আমরা সকালে গিয়ে পৌঁছেছিলাম। তারপর রিজার্ভ বাজারের কাছাকাছি মাঝারি মানের একটি হোটেলে উঠেছিলাম। হোটেলটির নাম আনিকা। এই হোটেলটি পছন্দ করার কারণ হল এটির অবস্থান একেবারে লেকের পাশে। আমরা যাতে হোটেলে বসে পুরো লেকটা নজরে আনতে পারি এজন্য পুবপাশের একটি কক্ষ আমাদের দেখে নিতে হল। দিনের বেলা আমরা নানা জায়গায় ঘুরাঘুরি করতাম, আর সন্ধের পরে রান্দায় বসে বসে লেক দেখতাম।

আমি আমার বউ-বাচ্চাকে রাঙামাটি ঘুরিয়ে দেখাব বলে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা প্রথমে গিয়েছিলাম শুভলং। শুভলংয়ের দৃশ্য আমার চিত্তে গেঁথে আছে। সুতরাং ওখানে প্রথমে না গিয়ে উপায় কী। আমার বউ শিল্পী রাঙামাটি আসার পক্ষপাতি ছিল না। কে যেন তাকে বলেছে রাঙামাটিতে কিছুই দেখার নেই। আমি তাকে অনেকটা জোর করেই নিয়ে গিয়েছিলাম। শিল্পী যখন রাঙামাটি লেক পেরিয়ে পাহাড় ঘেরা কাচলং নদীতে গেল তখন সে উচ্ছ্বসিত না হয়ে পারেনি। আমার পুত্র আপনের বয়স অল্প। শুভলংয়ের দৃশ্য তাকেও দেখলাম নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে বানরের ছুটোছুটি, দল বেঁধে তাদের চলাফেরা বাচ্চাদের জন্য এটা বাড়তি আনন্দ তো বটেই। আমাদের নৌকার মাঝিটা ছিল খুবই চমৎকার। সে সব সময় আমাদের সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা করত। যখন সে দূর থেকে বানর দেখতে পেত আপনকে আনন্দ দেয়ার জন্য নৌকাটা থামিয়ে দিত। বানরের দল দেখে আপন আনন্দে লাফাতে থাকত।

nar_17.jpg……..
লেকের পানিতে নৌকায় লেখক
……..

আমরা শুভলংয়ের ঝর্না দেখলাম। তারপর গেলাম সেই সেনা ছাউনিতে। এখানে এলে আমার খুব ভাল লাগে। যে কেউ এলে সেনাসদস্যরা তাদের আপন করে নেন। ওখানে তাদের যা কিছু আছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখাতে তারা আনন্দ বোধ করেন। খাঁচায় বন্দি বানরগুলো আপনের খুব প্রিয় হয়ে গেল। আমি তাকে কিছু কলা কিনে দিয়েছিলাম। সে দাঁড়িয়ে থেকে সব কলা বানরকে খাওয়াল। আসার সময় যে বানরের দলকে সে দূরের থেকে দেখেছে সেই বানরকে কাছে পেয়ে সেও একরকম বাদরামি আরম্ভ করে দিল। তার আনন্দে আমরাও আনন্দিত।

শুভলংয়ে আমরা দীর্ঘ সময় কাটালাম। রাঙামাটির অন্যান্য এলাকা আমার কাছে মুখ্য নয়, শুভলং আমার যতখানি প্রিয়। তারপরেও আমাকে যেতে হবে। শিল্পী এবং আপন আমাকে ছাড়বে কেন? তারা তো অন্যসব জায়গা দেখেনি। সুতরাং আমরা নৌকায় উঠে বসলাম। নৌকা বেগ নিয়ে চলতে আরম্ভ করল।

আমাদের নৌকা কাচলং নদী পেরিয়ে রাঙামাটি লেকে এসে নামল। আমরা কিছুদূর পথ পাড়ি দেয়ার পর ডানপাশে পাহাড়ের ওপর একটি বেসরকারি পর্যটন কেন্দ্র চোখে পড়ল। কেন্দ্রটির নাম টুকটুক ইকো ভিলেজ। ওখানে প্রচুর মানুষের আনাগোনা। নিচে সারি সারি নৌকা বাঁধা। আমার মন চাইল এটি দেখে যাই। মাঝিকে বললাম, নৌকা ভিড়াও। আমরা না আসা পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা কর।

আপনকে নিয়ে পাহাড়ে উঠতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হল। জায়গাটা বেশ ছিমছাম। আমার কাছে জায়গাটি নতুন হলেও অনেকের কাছে এটা অচেনা নয়, নইলে এত মানুষের সমাগম ঘটবে কেন? এখানে দাঁড়িয়ে একপাশে পাহাড়, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ লেকের জলরাশি দেখার অপূর্ব সুযোগ রয়েছে। একটুখানি ঘুরাফেরা করে কেন্দ্রটি সম্পর্কে আমার একটা ধারণা জন্মাল এখানে থাকা-খাওয়া দুটিরই ব্যবস্থা আছে। আমার কেন জানি মনে হল, দিনের বেলায় এ জায়গাটিকে যতখানি সুন্দর দেখাচ্ছে পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে এটি আরও মনোরম হয়ে উঠবে। মনে মনে বললাম, যদি কোনোদিন সুযোগ হয় এখানে এসে একরাত থেকে যাব।

এখাকার স্থাপনাগুলোর ওপরে ছনের ছাউনি, পাশে মুলিবাঁশের বেড়া। শৈল্পিক চিন্তাভাবনা মাথায় রেখে স্থাপনাগুলো বানানো হয়েছে। স্থাপনাগুলো পাকা বাড়ির চে’ শীতল। রেস্টুরেন্টে ঢোকার পর আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে।

দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছিল। আমরাও একরকম ক্ষুধার্ত ছিলাম। শিল্পীকে বললাম, আমরা এখানে একবেলা খেয়ে যাই?

সে বলল, কেন নয়?

প্রায় প্রতিটি টেবিল লোকজনের দখলে চলে গেছে। আমরাও একটা টেবিল দখলে নিলাম। টেবিলে রাখা খাবারের তালিকা দেখে আমি সাদা ভাত, মুরগি এবং বাঁশকোরলের অর্ডার দিয়ে দিলাম। বাঁশকোরলের নামটি আমি অনেক শুনেছি। পাহাড়িদের কাছে এটি অতি প্রিয় একটি সবজি। পাহাড়ি বাজারগুলোতেও এর বেশ উপস্থিতি লক্ষ করেছি। বাঁশকোরলটা হল মুলিবাঁশের পাশে আরেকটা বাঁশ যখন গজিয়ে ওঠে ওটি পাহাড়িরা এক দেড় ফুট পর্যন্ত বেড়ে ওঠার আগে কেটে নিয়ে আসে। পাহাড়িদের প্রতি আমার একটা নালিশ আছে, বাঁশবন যে আশঙ্কাজনক হারে উজাড় হয়ে যাচ্ছে তার একটা প্রধান কারণ নির্বিচারে এই বাঁশকোরল সংগ্রহ।

কোথাও গেলে নতুন কিছু আমার চোখে পড়লে তার প্রতি আমি ভীষণ রকম আকৃষ্ট হই। বাঁশকোরলের প্রতিও আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। আমি কেন বাঁশকোরল খাবারের তালিকায় রাখলাম এটি শিল্পীর পছন্দ হয়নি। একটা অজানা খাবার কেন আমাদের খেতে হবে এটাই তার আপত্তি।

আমি বললাম, এটা তো মানুষেই খায়। সুতরাং আমাদের খেতে আপত্তি কোথায়?

সে কথা বাড়াল না। যথাসময়ে খাবার চলে এল। আমি প্রথমেই বাঁশকোরল খেতে আরম্ভ করে দিলাম। বাঁশকোরলটার ভেতরে বাঁশের মত একটা খালি জায়গা রয়েছে। ওই খালি জায়গাটা মশলা মাখা চিংড়ি দিয়ে ভরে দেয়া হয়েছে। বাঁশকোরলের আলাদা কোনো স্বাদ আছে বলে আমার মনে হয়নি। আমি চিংড়ির স্বাদটা বেশ ভালভাবে অনুভব করছিলাম। আমি প্রথমে একটুখানি মুখে দিয়ে দিয়েছিলাম। আমার খারাপ লাগেনি। তারপর আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে ওটা খেতে লেগে গেলাম। শিল্পী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত সে আমার মুখের ভঙ্গিটা লক্ষ করছিল। ব্যাপারটা এরকম–এক বরই বিক্রেতাকে এক ক্রেতা জিজ্ঞেস করল, তোমার বরই টক না মিষ্টি?

বিক্রেতা বলল, খেয়ে দেখুন।

ক্রেতা বলল, আমার খেয়ে কাজ নেই। তুমি খাও। আমি তোমার খাওয়া দেখে বুঝে নেব।

বিক্রেতা একটা বরই খেতে গিয়ে চোখ-মুখ বিকৃত করে ফেলল। তখন ক্রেতা বলল, তোমার মুখের ভেটকি দেখে বুঝে ফেলেছি তোমার বরই টক না মিষ্টি।

আমি স্বাচ্ছন্দ্যে খাচ্ছি দেখে শিল্পী একটা বাঁশকোরল তুলে নিল। তারপর খেতে খেতে বলল, খারাপ তো লাগে না।

আমি বললাম, ভাল-খারাপ বুঝি না। একটা নতুন খাবার খাচ্ছি এটাই বড় কথা।

টুকটুক ইকো ভিলেজে আহার সেরে আমরা নৌকায় চলে এলাম। এবার আমরা গেলাম পেদা টিং টং। এই পর্যটন কেন্দ্রটি বালুখালিতে। টুকটুক ইকো ভিলেজ থেকে মাত্র দশ মিনিটের পথ। পেদা টিং টং টুকটুকের মত নয়। এটা পানি থেকে খানিকটা উঁচু জায়গায়। এখানকার স্থাপনাগুলোতে নতুনত্ব আছে, কিন্তু জায়গাটা বেশ রুক্ষ। ভর দুপুরে এই রুক্ষতা বেশ ভালভাবে টের পাওয়া গেল। আমি অন্য কারও কথা বলব না। কোনো রুক্ষ পরিবেশে আমি নিজেকে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারি না। পেদা টিং টং ওই রকম একটা জায়গা মনে হল। তারপরেও আমরা কিছুটা সময় ব্যয় করলাম।

আমরা দুপুরের খাঁড়া রোদে একরকম অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। নৌকায় ফিরে না গিয়ে আমাদের উপায় ছিল না। আমাদের নৌকাটার ওপরে ছাউনি ছিল। দেখতে ছোটখাট একটা লঞ্চের মত। নৌকা যখন গতি নিয়ে চলতে থাকে তখন বেশ বাতাস লাগে। তখন শরীরে এক ধরনের শিহরন খেলে যায়।

আমরা রাঙামাটি পর্যটন কেন্দ্রে ছুটে চললাম। পর্যটন কেন্দ্রের মূল আর্কষণ তো ওই টানা ব্রিজটাই। এ ব্রিজটা দুই পাহাড়ের মধ্যে একটা সংযোগ তৈরি করে দিয়েছে। রাঙামাটিতে যারা বেড়াতে যায় সকলে একবার এ ব্রিজটা দর্শনে যাবেই। এখানে না গেলে মনে করে আসল জিনিসটাই দেখা হল না। মনে করার কারণ রাঙামাটির এই পর্যটন কেন্দ্র সরকার নিয়ন্ত্রিত। এখানে সরকারি সুযোগ সুবিধা রয়েছে বেশ। পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য এখানে ছবির মত ফুটে আছে। আমরা বড় একটা সময় এখানে ব্যয় করলাম। ঘন গাছের শীতল ছায়ায় যখন সিমেন্টের তৈরি চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম আমাদের আর নড়তে ইচ্ছে করছিল না। তারপরেও আমাদের উঠতে হল। বিকেল ফুরিয়ে যেতে বসেছে।

আমাদের শেষ গন্তব্য বন রাজ বিহারে। এই জায়গা তো আমি একবার ঘুরে গিয়েছি। উঁচু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠার পর আমার আর পা চালাতে ইচ্ছে করছিল না। তারপরেও বউ-বাচ্চাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য তাদের নিয়ে চললাম। শিল্পীর ইচ্ছে হল বৌদ্ধ মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করার। আমি মন থেকে সায় পাচ্ছিলাম না। ওখানে যেতে হলে আমাকে জুতো খুলতে হবে। তারপর খালি পায়ে যাওয়া। এটা আমার জন্য ছিল একটা অস্বস্তিকর। আমি শিল্পীকে বললাম, তুমি একা গিয়ে ঘুরে এস। আমরা বাপ-বেটা এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।

শিল্পী আপত্তি করল না।

আসলে কোথাও ঘুরতে গেলে একটু সময় নিয়ে যাওয়া দরকার। আমরা একদিনে এতসব জায়গা ঘুরছি। শরীরে ক্লান্তি নেমে এলে অনেক সময় সুন্দর জিনিসটাও সুন্দর হয়ে ধরা দেয় না। আর সময় নিয়ে সব জিনিস ভালভাবে দেখাও হয় না।

শিল্পী এসে বলল, চমৎকার। তুমি তো গেলে না।

আমি বললাম, আমি আগে একবার গিয়েছি। আবারও যাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু মন থেকে সায় পাচ্ছি না। চল হোটেলে যাই।

শিল্পী বলল, তাই কর। আপনের শরীরটা মনে হয় ভাল নেই।

আপনের কথা কী বলব। আমি নিজেও সুস্থবোধ করছিলাম না।

ওইদিন ছিল দশমী। প্রতিমা বিজসর্জনের দিন। আমরা যখন নৌকায় করে ঘাটের কাছাকাছি চলে এলাম, লোকজন অনেকগুলো প্রতিমা একসঙ্গে লেকের পানিতে বিসর্জন দিয়ে চলেছে, আর শত শত মানুষ আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছে। মন্দ লাগল না। আমার পুত্র এ দৃশ্য কোনোদিন দেখেনি। সেও আনন্দে লাফাতে আরম্ভ করল। পুরো প্রতিমা বিসর্জনের ব্যাপারটি আমার কাছে এরকমই–খেলার শেষে গানের মত। বাড়তি পাওনা আর কি!

টীকা
বছরখানেক আগে আমি একটা গবেষণা কাজে রাঙামাটি গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন আমার সহকর্মী জয়ন্ত পাল। আমাদের যেতে হবে বালুখালি ইউনিয়নের একটি গ্রামে। গ্রামটির নাম ত্রিপুরা পাড়া। এই গ্রাম সম্পর্কে আমাদের জানা ছিল না। রাঙামাটি শহরে কিছু বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজন আমার আছে। আমি আমার বন্ধু সাত্তারের শরণাপন্ন হলাম। সে সম্পর্কে আমার ভাগ্নে। আমরা দুজন একসঙ্গে মাধ্যমিক পাশ করেছিলাম। সাত্তারকে আমি বললাম, বালুখালির ত্রিপুরা পাড়ায় যাব। তোর কি জানাশুনা আছে?

সে জানাল, জায়গাটা তো নিরাপদ নয়। কেন যাবি? না গেলে কি নয়?

আমি বললাম, না গিয়ে উপায় নেই। আমাদের গবেষণার কাজে যেতে হবে।

সাত্তার বলল, ইঞ্জিন বোট ভাড়া করে তারপরে যেতে হবে।

আমি বললাম, সেটা করা যাবে। কিন্তু তুই আমাদের একটু সঙ্গ দিবি।

সাত্তার আমার কথায় রাজি না হয়ে পারেনি।

আগের দিন আমরা একটা বোট ভাড়া করে রেখেছিলাম। বোটওয়ালা এক হাজার টাকা দাবি করেছিল। আমরা ছয় শ’তে রাজি করালাম। পরের দিন সকাল সকাল আমরা বোটে গিয়ে বসলাম। ত্রিপুরা পাড়া যেতে আমাদের ঘণ্টাখানেক লেগেছিল। যেতে যেতে সাত্তার বলল, পার্বত্য এলাকা এখনও নিরাপদ নয়। ইচ্ছে করলেই যে-কোনো জায়গায় যাওয়া যায় না। আমরা যে যাচ্ছি, এখানে যে কোনো অঘটন ঘটবে না এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।

সাত্তারের কথাগুলো আমাদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। তারপরেও আমাদের যেতে হবে। ত্রিপুরা পাড়া পাহাড়ের মাথায় ছোট্ট একটা গ্রাম। আদিবাসী হলেও তারা জাতে হিন্দু। শূকর পালন এবং লেকে মাছ ধরা তাদের পেশা। আমরা যখন তাদের ওখানে গেলাম তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের আচার-ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। কিন্তু সাত্তার কেন বারবার সংশয়ের কথা বলল? আমি মন থেকে সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে দিলাম। আমরা দিব্যি কাজ করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি সেনাবাহিনীর লোকজন এসে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলেছেন। আমি কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে দুজন সেনাসদস্য অস্ত্র তাঁক করে আমার দিকে ছুটে এলেন। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তারা আমার কাছে পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি আমার পরিচয় দিলাম। তারা বললেন, কাজটা তো ভাল। কোথাও ইনফর্ম করেছেন?

আমি বললাম, এখানে এলে যে ইনফর্ম করতে হয় সেটা আমাদের জানা ছিল না।

তারা বললেন, আমাদের দায়িত্ব আপনাদের নিরাপত্তা দেয়া। আমরা খবর পেয়ে ছুটে এসেছি। আপনারা তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করুন। পাহাড়ের কোনো এলাকা নিরাপদ নয়।

তাদের নির্দেশ মেনে আমাদের কাজ করতে হল। আমরা যতক্ষণ না কাজ শেষ করেছি তারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। পাহাড়ের এসব শান্ত স্বভাবের মানুষ আমাদের জন্য কেন নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়াবে আমি কোনোভাবে হিসেব মেলাতে পারিনি।


রাঙামাটি ভ্রমণের ছবি
(বড় আকারে দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন।)

লেখকের অন্য রচনা
ছফামৃত (ধারাবাহিক রচনা)
সেন্টমার্টিন: দইরগার চরত বেরাই টেরাই হনো মজা ন পাইবা…
কক্সবাজার: হক্কল জাগা পুরি খাইলাম ন পাইলাম চাডিয়ার নান!
সিলেটে
সুন্দরবন: এক সবুজ বস্ত্রখণ্ড!

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: নূরুল আনোয়ার
ইমেইল: nurulanwar1@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন tanzin — december ১৩, ২০১১ @ ৬:৪৭ অপরাহ্ন

      ভাল লাগল।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com