উপন্যাস (কিস্তি ৪)

শতকিয়া

সাগুফতা শারমীন তানিয়া | ১৭ নভেম্বর ২০১১ ৮:৪৮ পূর্বাহ্ন


লিংক: শতকিয়া কিস্তি ১

চতুর্থ পর্ব

দেখা গেল, বলির ভাগ্য আমি করিয়া আসি নাই। মুর্শিদাবাদে ফিরিয়া গিয়া আমাদের পিতা এক গুটিবসন্ত আক্রান্ত সহকর্মীর সেবা করিয়াছিলেন, নিজে যেই টীকা দিয়াছিলেন–তাহা ক্ষীণশক্তি

অলংকরণ: সাগুফতা শারমীন তানিয়া

হইয়া থাকিবে, তাঁহার গায়ে লাল স্ফোটক দেখা দিল। একপক্ষকাল অত্যন্ত রোগভোগের কষ্ট করিয়া তিনি মৃত্যুবরণ করিলেন। মৃত্যুর খবর লইয়া তার আসিল, আমাদের সংসারের সন্তোষ-প্রীতিপ্রফুল্লতার দীপখানি এক ফুঁয়ে নিভিয়া গেল। বাবার মাহিনা এমন কিছু দোহারা ছিল না, কিন্তু মুর্শিদাবাদ শহর হইতে বাড়ি আসিলে তাঁহার ট্রাংক হইতে মায়ের জন্য এসেন্সের শিশি এবং হিমানীর কৌটা বাহির হইত, বাহির হইত লক্ষীবিলাস তৈল, আমাদের পড়িয়া শুনাইবার জন্য ইংরেজী ও উর্দ্দু পুস্তক। সবুজ তোষাপাটের নধর শীর্ষ আর হলুদ সরিষার আকাশ অধিকার করিয়া নেওয়া সুমিষ্ট গন্ধ মিলিয়া দক্ষিণ মুশুরির যে অন্নপূর্ণা মূর্তি–বাবা তাহাতে বুঁদ হইয়া কয়েকদিন নিস্তরঙ্গ জীবন কাটাইতেন, শহরের শান বাঁধানো ভুঁই তাঁহার প্রাণের শাঁসজল শুষিয়া ফেলিত, সেই ক’টি দিন তিনি যেন শ্যামলিমা মাখিয়া নূতন জীবন ফিরিয়া পাইতেন। যুবাপুরুষেরা জলের ধারে মাচা বাঁধিয়া মাছ মারিত, তিনি সেখানে বসিয়া পাড়ের দিকে চাহিয়া মুড়ি চিবাইয়া সময় কাটাইতেন, মা ভাজনাখোলায় ক্ষেতের চালের টাটকা মুড়ি ভাজিয়া দিতেন। বেলা চড়িলে নদীতে নাইয়া আদুরগায়ে বাড়ি আসিয়া ভাত-তরকারি খাইতেন। আমার নানী তাঁহার মায়ের শৈশবের সই ছিলেন, মায়ের মৃত্যুর পর আমার নানীই তাঁহার প্রতিপালন করিয়াছেন–বাবা থাকিবার সেই দিনগুলিতে নানী আমাদের টানাটানির সংসারেই কিছু সুখাদ্য তৈয়ার করিতেন। হিন্দুর মেয়েরা সূর্যোদয়ের আগে ভাদরখ্যাপায় স্নান করিয়া আসিয়া মাঘমণ্ডলের ব্রত করিত। সফেদা-কাঠকয়লা-সুরকি ইত্যাদি দিয়া আলপনা দিত আর ছেলেপুলেরা ভিড় করিয়া উঠানের বাহিরে দাঁড়াইয়া দেখিত। তাহাদের সহিত মিলিয়া আমরাও দূরে দাঁড়াইয়া দেখিতাম। বাড়ি আসিতেই বাপের উত্তম-মধ্যম জুটিত। গোঁড়া বৈদ্যবাড়ির ছেলেরা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের শ্লোক মুখস্থ করিতেছে, মুনশীজির কাছে ফারসী শিখিতেছে। বৈশ্য ও কায়স্থর ছেলেপুলেরা শিখিতেছে শতকিয়া-পণকিয়া, কাঠাকালি-বিঘাকালি। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উপক্রমণিকা ব্যাকরণ ও ঋজুপাঠ, পরবর্তীতে তাহারা সংস্কৃতে কুমারসম্ভব পড়িবে–রঘুবংশ পড়িবে–আর আমরা কেবল নানীর মুখে পুঁথি শুনিব, গোলে বাকাউলির কিচ্ছা শুনিব–এইসব নিয়া তক্‌দিরকে দোষারোপ করিতে করিতে বাবা আমাদের পিটাইতেন। সেইসব দিনের দুপুরগুলি ছিল বিভীষিকাপূর্ণ। বাবা মিঠাকুমড়ার মাচান বাঁধিতে বাঁধিতে আমাদের সরলগণিত আর চলিতনিয়মে হিসাব কষা শিখাইতে বসাইতেন, ইংরেজিজ্ঞান পরখ করিতেন। মানকচু লাগাইতে লাগাইতে ছুটিয়া আসিয়া দু’ঘা দিয়া ফিরিয়া গিয়া আবার মাটি কোপাইতেন। সন্ধ্যায় উঠানের বেলগাছতলার চৌকিতে শুইয়া গামছা ঘুরাইয়া নিজেকে বাতাস করিতেন এবং আমাদেরকে নিজের পঠিত সাহিত্য গল্পের আকারে শুনাইতেন, রামায়ণ-মহাভারত হইতে বাইবেল হইতে গল্প বলিতেন, তাঁহার আহৃত তাবত ভূগোল ও ইতিহাসবিদ্যা আমাদের মুখস্থ করাইবার চেষ্টা করিতেন–শুনাইতেন, তৈমুর লঙ জয়লাভ করিবার পর বিজিতদের করোটি দিয়া সৌধ তৈয়ার করাইতেন, নাদের শাহও তাঁহাকে গুরু মানিয়া করোটিসৌধ নির্মাণ করাইয়াছিলেন। টিমটিমে আলো জ্বালিয়া খড়ির আগুনে নানী থালকচু সিদ্ধ করিতে করিতে নীচুগলায় বংশোদ্ধার করিতেন, ছেলেপুলেকে সূর্যাস্তের পর গাছতলায় যাইতে দিতে তাঁহার আপত্তি ছিল, খালি শয্যায় নানী নারিকেলপাতার ঝাড়ু রাখিয়া দিতেন। বাবা নানীর খিস্তি শুনিতে পাইতেন না, পাশে বসাইয়া শুনাইতেন–আগুল্‌ফলম্বিত কেশধারী কে এক কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে কহিল–পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ? অথবা, ব্যাটল অফ নাইলে ক্যাসাবিয়াঙ্কা নামের এক তেরবৎসরের কিশোর পিতার আদেশের অপেক্ষায় জ্বলন্ত জাহাজের উপর দাঁড়াইয়া রহিয়াছে–কখন পিতা ডাকিয়া বলিবেন “তোমার কর্তব্য পুরা হইয়াছে, চলিয়া আইস”… অন্ধকারে ক্যাসাবিয়াঙ্কার জাহাজের মাস্তুলে আগুন ধরিয়া যাইত, ঝিঁঝির ডাক পাওয়া যাইত আর থাকিয়া থাকিয়া বাবার শূন্য উদর শব্দ করিয়া ডাকিয়া উঠিত। এহেন বিদ্যোৎসাহী মানুষ আমি জন্মিয়া অব্দি দেখি নাই।

করুণাসিন্ধুবাবুর পিতামহ দুর্গারামবাবুর নবাবদত্ত উপাধি ছিল রায়। রায়বাড়ি ছাড়া গ্রামের বসতি-অঞ্চলে পাকাবাড়ি নির্মাণ নিষিদ্ধ ছিল। পাকাবাড়ি কেবল জমিদারবাবুর একচ্ছত্র অধিকার, তাহার বাড়ির বিশাল চৌহদ্দি ঘিরিয়া দোলমঞ্চ, শিবালয়, দুর্গাবাড়ি। চৈত্র-বৈশাখ মাসে আগুন লাগিলে মুশুরি, পাষাণখোলা, কাঁসারীপাড়া, দোকাটি, কেষ্টপুর, জোড়শিমুলতলা, খরিশা, মাধবদিহি ইত্যাদি গাঁয়ের বারজাতের মানুষের ঘরগুলি অগ্নিদেবের ভোগে যাইয়া খাক হইত। সেইবার চৈত্রমাসে আমাদের ঘর পুড়িল, আমরা কাজেমদের ঘরে আশ্রয় লইলাম। একে দারুণ দারিদ্র তায় নিত্যি মহাফেজের তাগাদা। বাড়িতে থাকিয়া আর কত রোরুদ্যমানা জননীর মুখ দেখিব– কত আর অদৃষ্টকে গালাগালিরত নানীর কাছে পড়িয়া থাকিব। বাহির হইয়া দেখিতাম–ভাদরখ্যাপা বৈশাখের রৌদ্রে পারার মতন গলিতে গলিতে জ্বলিতে জ্বলিতে চলিয়াছে। তটভূমি হইতে জলে ঝুপঝুপ করিয়া ভোঁদড় নামিতেছে–পানকৌড়ি অল্প জলের উপর দিয়া যিশুর মতন পার হইয়া যাইতেছে। পরপারে নিদাঘ-সূর্যের প্রভাবে শষ্পের আচ্ছাদন লঘু হইয়াছে–কশাড়ের জঙ্গল বিবর্ণ। রৌদ্রের প্রভাবে ভাঁটঝোপগুলি হইতে জংলী গন্ধ বাহির হইতেছে। শ্মশানবাড়ির কাছে আমাদের সেই কুটীরে আসিয়া দাওয়ায় শুইয়া থাকিতাম। অশ্রুশূন্য চোখে দেখিতাম, চালের খড় পচিয়া যাইতেছে। চাঁচারিতে ঘুন ধরিয়াছে। কুটীরের পিছনের বাঁশবন হইতে শুনসান দুপুরে কীসে ডাকিত–টাক্কো! টাক্কো!

সেইখানে সেই পাতার কুটীরে একদিন ভাগ্যলক্ষী আমার দিকে চাহিয়া হাসিলেন, যদিও হাস্যপরিহাসে সে ঘটনার শুরু হয় নাই। এইখানে প্রথমে একটু বিষয়ান্তরে যাইব, জমিদারবাবুর অন্দরের গল্প বলিব। সাতকড়ির মুখে শুনিয়াছিলাম, বহুকাল হয় এক পহেলা বৈশাখে কপাল দেখিয়া এবং হস্ত গুনিয়া গনকঠাকুর করুণাসিন্ধুবাবুর বড় তরফে সন্তানভাগ্য লিখা আছে বলিয়াছিলেন, বলিয়াছিলেন সেই বৎসর সুরঙ্গমার সন্তান জন্মিবে। তৎকালে জমিদারবাবু নিঃসন্তান ছিলেন। ঠাকুরমশায় তো পাখোয়াজ লোক, বৎসরের ভাগ্য বলিয়া চালের কাঠা ও পয়সা লইয়া চলিয়া গেলেন। জমিদারবাবুর স্ত্রী সুরঙ্গমার আর দিন কাটে না। কত আর পাতাবাহার চিরনি দিয়া তুলিয়া চুল বাঁধিবেন, ঝামা ঘষিয়া আলতা পরিবেন, হলুদ মাখিয়া স্নান করিয়া পুষ্করিনীর জল কটু করিবেন, বসিয়া বসিয়া শিশুর পায়ের মল আর কোমরের গোট বানাইবেন আর বিগ্রহকে সোনার তুলসীপত্র উপহার দিয়া পূজা দিবেন। বাড়িতে রাধাগোবিন্দজীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। আহারনিদ্রা বিলুপ্তপ্রায় সুরঙ্গমা পূজার ফুল তুলিতেন। চন্দন ঘষিতেন। বেতনভূক পূজারী ব্রাহ্মণ আসিয়া বিগ্রহের পূজা করিত। সুরঙ্গমা চরণামৃত লহিতেন। নৈবেদ্যের চিনি-কলা গ্রহণ করিতেন। এদিকে করুণাসিন্ধুবাবুর বোটে এতদঞ্চলে পাচক বামুন সুলভ নয় এই ওজরে মোসলমান বাবুর্চি রাখা হইয়াছিল, সে পোলাও রাঁধিত–রামপাখির ঝোল রাঁধিত, তাহাতেই ইয়ারদোস্ত-মোসাহেব পরিবৃত রাজার উদরপূর্তি হইত। মেয়েবউদের সাথে মিলিয়া সুরঙ্গমা স্নান করিয়া ষষ্ঠীতলায় সমবেত হইয়া পূজার যোগাড় দিতেন, পূজান্তে ষষ্ঠীর পাঁচালি শুনিয়া স্নেহভাকদের মাথায় ধানদূর্বা দিয়া উপবাস ভাঙিতেন–আর রাজার বোটে কলকাতার মুন্নিজান-পিয়ারীজান নাচিত। স্বামীর আয়ুক্ষয়ের ভয়ে সুরঙ্গমা দিনের বেলায় স্বামীসন্দর্শন করিতেন না। দৈবাৎ দেখা হইয়া গেলে একগলা ঘোমটা দিয়া সরিয়া যাইতেন। রাত্রিকালেও রাজার দর্শন কদাচিৎ মিলিত। পুরুষমানুষ তো শিমুলগাছ নয় যে সংবৎসর নিজের নিয়মেই ফাটিয়া যাইবে আর তুলার বীজ চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িবে (এইখানে নষ্ট বুড়া সাতকড়ি একটি অশ্লীল কথা বলিয়াছিল, তাহা অনুক্ত রহিল।)! মোটের উপর, জয়দেবের গীতগোবিন্দ পুরা করিবার জন্য ঈশ্বরের যত চেষ্টা দেখা গেছিল, এইবেলা তাহা দেখা গেল না, করুণাসিন্ধুবাবুর মূর্তি ধরিয়া ঈশ্বর আসিয়া তাঁহার অসম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত করিয়া গেলেন না। অতএব, সুরঙ্গমার সে বৎসর সন্তান জন্মিল না। তাহাতেও হইলো না, রাজা বৎসর ঘুরিলে আরেকটি বিবাহ করিলেন। এইবারের বধূটি নিতান্ত দরিদ্রঘরের পরমাসুন্দরী কন্যা। তাহার নাম সরযুবালা।

সরযুবালাও আসিল, সুরঙ্গমারও সন্তানসম্ভাবনা দেখা দিল। যে সন্তানকামনাকে কেন্দ্র করিয়া সুরঙ্গমার দিবসযামিনী এক হইয়া গিয়াছিল–তাহা যখন সত্যই আসিয়া ধরা দিল, তখন সুরঙ্গমার স্বামী দখল হইয়া গিয়াছে, তাঁহার খাসদাসী মাধী দাঁড়াইয়া থাকে রাজাবাবুকে সুরঙ্গমার ঘরে পৌঁছাইয়া দিবার জন্য, তিনি আলগোছে নববধূর মহলে ঢুকিয়া যান–গিয়া সরযুর পুতুলখেলার সঙ্গী হইয়া আমোদলাভ করেন। হিন্দুর ঘরে কন্যাজন্ম লাভ করিয়াছেন, গায়ের ঝাল গায়ে মরিতে দেয়া ছাড়া সুরঙ্গমার আর কোনো উপায় রহিল না। কাচকড়ার পুতুল অবশ্য সরযু বেশিদিন খেলিতে পাইলো না। কেই বা পায়! অল্পবয়স হইতে সরযু দেখিল, রাজার ঘরে তাহার বিবাহ হইয়াছে, স্বামী তাহার বশ, মুখ হইতে বাক্য খসিবার আগে চপলাদাসী তাহাকে নাওয়াইয়া দেয়, সরোদাসী সাজাইয়া দেয়, ক্ষেমাদাসী হীরামোতির বেলকুঁড়ি দিয়া খোঁপা গাঁথিয়া দেয়, চাইনা বলিয়া খেলেনা ছুঁড়িয়া দিবার অপেক্ষামাত্র–নতুন খেলার পুতুল জুটিয়া যায়। সে রাজাকে লইয়া খেলিল, খেলিয়া ক্লান্ত হইয়া দুয়ার দিয়া দিল। রাজাবাবু দোর হইতে ফিরিয়া গেলেন–তাঁহার কতটা পরিতাপ হইয়াছিল বলা যায় না, সুরঙ্গমা ততদিনে এস্টেটের ভাবী অধিকারীর জন্ম দিয়াছেন, মোহনকান্তি রায় নাড়ুগোপালকে উৎখাত করিয়া মায়ের কোল জুড়িয়া বসিয়াছে, চাঁদের কলার মতন দিনে দিনে বাড়িতেছে।

মোহনকান্তি রাজার দুলাল। তাহাকে চোখে চোখে রাখা হয়–কুবের চাকর আসিয়া দুধ সন্দেশ খাওয়াইয়া যায়। সহিস-বেহারা সাথে যায় সর্বত্র। তাহার মা সারাবেলা নিজে দাঁড়াইয়া থাকিয়া তাহার জন্য ষোড়শ ব্যঞ্জন তৈয়ার করেন। তাহার জন্মোৎসবগুলিতে সরকারী শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ উচ্চপদস্থ ইংরেজ সাহেবরা উপস্থিত থাকেন। বলে কি না, কপালে জলে-ডুবিয়া মরণ থাকিলে স্বয়ং নিয়তি কুমীরের বেশ ধরিয়া আসিয়া টানিয়া নিয়া যায়। সেই ছেলের করুণাসিন্ধুবাবুর বোটের দিকে বড় ঝোঁক, বোটে করিয়া দূর দ্বীপে যাইয়া উইনচেস্টার রাইফেল দিয়া রাজা পাখি শিকার করেন, বোটে সুবেশা গণিকাসমাগম ঘটে, বোটে নিষিদ্ধ খাদ্য পরিবেশিত হয়–মোটের উপর মোহনের বোটের প্রতি অল্প বয়েসেই অত্যন্ত অনুরাগ জন্মে। রাজনন্দনকে কুপথে লইবার জন্য মন্ত্রণাদাতার কখনই অভাব ঘটে না, মোহনেরও সে অভাব হইল না। রাজার অজান্তে সে অবাধে বোটে যাতায়াত করিতে পাইল। সে জল বড় ভালবাসিত–বোট হইতে জলে ঝাঁপাইয়া সাঁতার দিত–কৃষ্ণধামপুরের চরে গিয়া হাঁস মারিত। এমনই একবার সে সবার অলক্ষ্যে সাঁতার দিতেছিল, তখন ভাদ্রমাসের ভরা নদী দুকূল ছাপাইয়া কলকল করিয়া ছুটিয়া চলিয়াছে, ঝুপঝুপ করিয়া পরপারে গ্রামগুলির তীর ভাঙিতেছে–মোহন ডুবসাঁতার দিয়া উঠিতে গিয়া দামে আটকাইয়া গেল। ভাগ্যক্রমে তখন আমি নদীর জলে নামিয়াছি–ভাই পরানের সাথে সমারোহ করিয়া সাঁতরাইতেছি। পরান তাহাকে প্রথম দেখিল–দামে আটকাইয়া আঁকুপাঁকু করিতেছে। তাহাকে জল হইতে বিস্তর কায়িক শ্রম করিয়া তুলিয়া কুটীরের দাওয়ায় আনিয়া ফেলিলাম। শ্বাসক্রিয়া শুরু করিবার চেষ্টায় চাপড় দিলাম। ওয়াক তুলিয়া একসময় সে দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। চোখ মেলিল।

এতকাল দূর হইতে বড়তরফের কুমারকে দেখিয়াছি, এইবার মনে হইল তাহার মোহনকান্তি নামখানা সার্থক। রাজার দুলালই বটে। ততক্ষণে রাজার লোকের কাছে খবর গিয়াছে। তাহারা চক্ষের পলকে আসিয়া পাল্কী করিয়া মোহনকে লইয়া গেল। মনে ভয় হইল, আমাদের না জানি বাঁধিয়া লইয়া যায়। তাহা হইল না দেখিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলাম, তবে সেই স্বস্তি দীর্ঘায়ু হইল না। সন্ধ্যায় আমাদের ডাক পড়িল। মহিষাসুরের মতন দেখিতে হলধর আলো হাতে আসিয়া ধানক্ষেতের বিস্তারের ভিতর দিয়া হাঁটিয়া আমাদের জমিদারের সেরেস্তায় লইয়া গেল। জাতে মোসলমান বলিয়া ফরাস সরাইয়া আমাদের জন্য জায়গা করা হইল। নায়েবমশাই আমাদের ডাকিয়া কিছু কাঁচাপয়সা হাতে ধরাইয়া দিলেন–নাচিতে নাচিতে বাড়ি ফিরিলাম। মা অপ্রসন্ন মুখে বলিলেন–জান বাঁচাইয়া পয়সা নিলি তোদের শরম করিল না ইত্যাদি। আমাদের নানী বিনাবাক্যব্যয়ে পয়সাগুলি তুলিয়া রাখিয়া শিকা হইতে ভাত-তরকারী নামাইয়া আমাদিগকে খাইতে বসাইলেন–মায়ের সৌজন্যশিক্ষা তাঁহার কাছে অপ্রয়োজনীয় বোধ হইত।

(চলবে)
—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: সাগুফতা শারমীন তানিয়া
ইমেইল: shaguftania@yahoo.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গৌতম চৌধুরী — নভেম্বর ১৭, ২০১১ @ ২:৪৬ অপরাহ্ন

      লেখাটিতে সবকিছু এত সাবলীল আর বিশ্বাসযোগ্যভাবে এগিয়ে চলেছে যে, ভালো না লেগে উপায় নেই! সাগুফতা শারমীন তানিয়া-কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন!!
      গৌতম চৌধুরী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন motiar — অক্টোবর ৩১, ২০১২ @ ২:২৮ অপরাহ্ন

      খুব ভাল লাগলো। ভালো থাকুন। আপনি। মতিয়ার রহমান, ঢাকা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rajanta Mitra — জানুয়ারি ৩, ২০১৩ @ ৭:৫৪ অপরাহ্ন

      আপনার লেখাটি পড়ে খুব ভাল লাগলো। পরবর্তী অংশের অপেক্ষায় রহিলাম। লেখাটি সত্যিই খুব ভাল হচ্ছে।
      ধন্যবাদ।
      রজন্ত মিত্র।
      কলকাতা। ০৩ / ০১ / ২০১৩

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com