জন হেনরি ম্যাকের কবিতা

নৈরাজ্য

সেলিম রেজা নিউটন | ১৬ নভেম্বর ২০১১ ৮:৪২ পূর্বাহ্ন

বাংলা অনুবাদকের ভূমিকা

জন হেনরি ম্যাকে (৬ই ফেব্রুয়ারি ১৮৬৪—১৬ই মে ১৯৩৩) ছিলেন জার্মান ব্যক্তিতান্ত্রিক নৈরাজ্যবাদী, চিন্তক এবং লেখক। বেশ কিছু গ্রন্থের প্রণেতা। জন্ম স্কটল্যাণ্ডে, বেড়ে উঠেছেন জার্মানিতে। শুরুতে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন গীতিকবি হিসেবে, কিন্তু রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তাঁর আধা-ফিকশন জাতীয় রচনা নৈরাজ্যবাদীগণ (দ্য অ্যানার্কিস্টস) প্রকাশের পর। জার্মান এবং ইংরেজি ভাষায় এটি প্রকাশিত হয় ১৮৯১ সালে। পরে আরো আটটি ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বন্ধু বেঞ্জামিন টাকারের সম্পাদনা করা পত্রিকা লিবার্টি-তে জন ম্যাকের রচনা প্রকাশিত হতো। তাঁর অপর একটি গ্রন্থ স্বাধীনতা-সন্ধানী (দ্য সার্চার ফর ফ্রিডম) ছাপা হয় ১৯২১ সালে। বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর উপন্যাসিকা লিখেছিলেন, ছদ্মনামে প্রকাশও করেছিলেন। বিষয়বস্তু সমকামিতা হওয়ায় সেগুলো অশ্লীল বলে নিষিদ্ধ হয়েছিল। প্রকাশকের বিপুল জরিমানাও হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশক কিছুতেই তাঁর নাম ফাঁস করেন নি। জন ম্যাকে সুপরিজ্ঞাত সমকামী ছিলেন।

makey-2.jpg…….
জন হেনরি ম্যাকে
…….
আজ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবাধ্য, নৈরাজ্যবাদী তরুণদের ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের এই ঐতিহাসিক কালে জন ম্যাকের নৈরাজ্য-কবিতার কথা মনে পড়ল। অনুবাদের চারটা ভাষ্য পড়ে ছিল আমার হার্ডডিস্কের অতল গহীনে। ঝাড়ামোছা করে চূড়ান্তটা দাঁড় করালাম। কবির পরিচিতি লিখলাম ইন্টারনেট ঘেঁটে।

২০০৭ সালে বেচারা গুগল হাজার মাথা কুটেও জন হেনরি ম্যাকে সম্পর্কে একখানা বাক্যও উদ্ধার করতে পেরেছিল না। হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। রীতিমতো সন্দেহ-সংশয় দানা বেঁধে উঠেছিল—কোন ভাগাড় থেকে যে এমা গোল্ডম্যান এই কবিতা তুলে এনেছেন কে জানে? (বলশেভিক-বাইবেলের প্রতি আজন্মলালিত ঈমান অটুট থাকা সত্ত্বেও লেনিন-রচিত স্বর্গ-পতনের দাগা খেয়ে যাঁর মোহ টুটেছে, তিনি বুঝবেন আমার সংশয়। লেনিনবাদের পরিবর্তে নৈরাজ্যবাদ! আবার আরেকটা অন্ধ মতবাদ!! পাগল!!! কভি নেহি। এই ছিল আমার সংশয়ের সারসত্তা। এই সংশয়ের কারণেই আমি বছর দশকের নিবিড় বোঝাপড়া না করে জনসমক্ষে নৈরাজ্যবাদের নাম নিই নি।) আর আজ—গুগলকে বলতেই একদম গড় গড় করে একগাদা পাতা বের করে দিল জন ম্যাকে সম্পর্কে। তার মানে অনলাইনে নৈরাজ্যের চর্চা আমার মতো বিষাদপ্রবণ অকম্মার জন্য বসে নেই। ধাঁই ধাঁই করে তা বিকশিত হয়ে চলেছে। স্বাধীনতা-সহযোগিতা-সৃজনশীলতার এই নৈরাজ্যিক জ্ঞানের বিকাশই আজকে মার্কিন মুলুকে ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’র মতো একটা দুর্দান্ত আন্দোলনের জমি তৈরি করে দিয়েছে। বাংলাদেশে অক্ষরশিক্ষিত লোকজনের মধ্যে যাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার স্পৃহা এবং সমষ্টিগত সমাজতন্ত্রের সাধ আছে তাঁদেরকে আজ হোক কাল হোক এই কাজটাই শুরু করতে হবে দৈনিক উপাসনার মতো একাগ্রতা নিয়ে।

ইন্টারনেটে অবশ্য একটা তথ্য আমি খুঁজে পেলাম না। উপযুক্ত কেউ খুঁজে পেতেও পারেন। সেটা হচ্ছে ইংরেজিতে ম্যাকের এই কবিতাটির অনুবাদকের নাম। ম্যাকে লিখতেন জার্মান ভাষায়। সে ভাষায় তাঁর একটা কাব্যগ্রন্থের নাম অবশ্য উদ্ধার করতে পেরেছি—স্টার্ম (দ্য স্টর্ম)। ‘জার্মান পাঠকদের জন্য’ নিবেদিত এই কবিতাগুলোকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল “অহম সংক্রান্ত, নৈরাজ্যিক কবিতাসমূহের সংকলন” নামে। এখনকার এই “নৈরাজ্য” কবিতাটা ঝড় নামের ঐ কাব্যগ্রন্থেই স্থান পেয়েছিল।

‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একবিংশ শতকের নতুন নৈরাজ্য আজ গণপরিসরে আত্মপ্রকাশ করছে। আমরা বাংলাদেশের অরাজ-পথিকেরা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে তা অধ্যয়ন করছি। বাংলায় “নৈরাজ্য” প্রকাশের জন্য সত্যিই এ এক মোহনীয় মুহূর্ত।

স.র.ন./রাবি/১৩ই নভেম্বর ২০১১


নৈরাজ্য

জন হেনরি ম্যাকে

চির গালাগাল-প্রাপ্ত, অভিশপ্ত, অনাদি-অনুপলব্ধ তুমি—
আমাদের জমানার ভয়ঙ্কর-মৃত্যুগন্ধী ত্রাস।
লোকজনেরা চিল্লায়: “যাবতীয় বিন্যাসের বিধ্বস্ত তলানি,
যুদ্ধ ও খুনের তুই অনিঃশেষ ক্রোধের হুতাশ”।

ওদের চেঁচাতে দাও। একটা শব্দের পিছে নিহিত সত্যের
অর্থ অন্বেষণ যারা করে নি কখনো, শব্দটার
সঠিক সংবাদ দেওয়া হয় নি তাদের, তারা সমস্ত অন্ধের
ভেতরে নিজেকে আরও অন্ধ করে যাবে লাগাতার।

অথচ হে শব্দ, তুমি এতটাই পষ্ট, দৃঢ় আর সত্য বটে
যে, তুমিই প্রকাশিছ আমার অভীষ্ট, লক্ষ্য—যা কিছু শপথ।
যখন প্রত্যেকে জেগে উঠবে অন্ততপক্ষে নিজের নিকটে—
তোমাকে দিলাম সেই আগামীর হাতে, তুমি সেথা নিরাপদ।

রৌদ্রচ্ছটায় আসবে? আসবে কি ঝোড়ো শিহরণে?
সেটা তো দেখবে ধরা!—পারি না তা করতে বিবৃত।
আমি যে নৈরাজ্যবাদী! কোনোদিন আমি সে-কারণে
করব না শাসন, বা কখনই হব না শাসিত!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, আগস্ট ২০০৭

—————

ইংরেজি অনুবাদে

Anarchy

Ever reviled, accursed, ne’er understood,
Thou art the grisly terror of our age.
“Wreck of all order,” cry the multitude,
“Art thou, and war and murder’s endless rage.”

0, let them cry. To them that ne’er have striven
The ‘truth that lies behind a word to find,
To them the word’s right meaning was not given.
They shall continue blind among the blind.

But thou, O word, so clear, so strong, so true,
Thou sayest all which I for goal have taken.
I give thee to the future! Thine secure
When each at least unto himself shall waken.

Comes it in sunshine? In the tempest’s thrill?
I cannot tell – but it the earth shall see!
I am an Anarchist! Wherefore I will
Not rule, and also ruled I will not be!

—-

Source: Emma Goldman (1910), “Anarchism: What It Really Stands For”, in Anarchism and Other Essays (With biographic sketch by Hippolyte Havel), New York: Mother Earth Publishing Association.

Original German Book: Sturm (The Storm). To German Readers. By John Henry Mackay. A Collection of Egoistic and Anarchistic poems in the German language.

লেখকের আরো লেখা

চিন্তার সংকট: সাহিত্যের স্বাধীনতা: মানুষের মুক্তি প্রসঙ্গ হাসান আজিজুল হকের কার্তেসীয় পদ্ধতি এবং সাহিত্যে আত্মঘাতী বোমাবাজির প্রবণতা

—–
সেলিম রেজা নিউটন

…….

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: সেলিম রেজা নিউটন
ইমেইল: salimrezanewton@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর — নভেম্বর ১৬, ২০১১ @ ৯:৫৪ অপরাহ্ন

      অনুবাদ যেমন ভালো লেগেছে, ব্যক্তিক নৈরাজ্যবাদ সম্পর্কে ম্যাকের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরেও উদ্দীপ্ত হলাম।
      স্বোপার্জিত স্বাধীনতা আর ব্যাপক-সমাজবাদের সংবাদ প্রদানও দরকারি কাজ মনে হচ্ছে।
      সৃজনকর্তাকে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।