মানুহে মানুহর বাবে…

গানের পাখি ভূপেন হাজারিকা

বাবু রহমান | ৮ নভেম্বর ২০১১ ১২:৪১ পূর্বাহ্ন

bhp_8.jpg…….
ভূপেন হাজারিকা (৮/৯/১৯২৬ – ৫/১১/২০১১)
……..
অসমিয়া, হিন্দি ও বাংলা ভাষার এক গানের পাখি ছিলেন ড. ভূপেন হাজারিকা। মুম্বই কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালে ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চারমাস রোগে (কিডনী বৈকল্য ও বার্ধক্যজনিত সমস্যা) ভোগার পর মারা যান তিনি। অবিভক্ত ভারতে যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে তখন অরুণাচল ও অসমের সীমান্তবর্তী অঞ্চল সাদিয়া শহরে ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানকার শিবসাগর স্কুলে ঠাকুর্দা বংশীধর হাজারিকার ছেলে বাবা নীলকান্ত হাজারিকা শিক্ষক ছিলেন। মা শান্তিপ্রিয়া দেবী সুগৃহিনী ছিলেন। বাবার সরকারী চাকুরী হওয়ায় দু‘বছর অসমের ধুবড়ী, দুবছর গুয়াহাটি এবং চার বছর তেজপুরে ভূপেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেন। সেখান থেকে ১৯৪১-এ ম্যাট্রিক পাশ করে পরে গুয়াহাটি কটন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। তিনি কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বিএ এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ করেন। তারপর ১৯৫২ সালে নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি নেন তিনি। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল “প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষায় শ্রবণ-দর্শন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতের মৌলিক শিক্ষাপদ্ধতি প্রস্তুতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব”।

‘মানুহে মানুহর বাবে’–বাংলায় ‘মানুষ মানুষের জন্যে’–১৯৬৪ সালে প্রথমে এই গান রেকর্ড করেন ভূপেন। উপরে অসমিয়া মূল ভাষায়, নিচে বাংলা সংস্করণ। ইউটিউব থেকে।

তেজপুরে পড়ার সময় বিপ্লবী বিষ্ণু রাভা (১৯০৯-১৯৬৯) আর অসম শিল্প তারকা জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালার (১৯০৩-১৯৫১) সান্নিধ্য ও প্রভাব ভূপেনের জীবনে পড়ে।

bhp_7.jpg……
স্ত্রী প্রিয়ম্বদা প্যাটেলের সঙ্গে ভূপেন হাজারিকা
…….
স্থানীয় গীত-রীতি ওজা-পালি (চর্যাপদের সমসাসয়িক), দুর্গাবরী গীত (একজন গীত ব্যক্তিত্ব), বরগীত, কামরূপী ও গোয়ালপাড়ার লোকগীত, কাহিনীগীত (মালিতা), জিকির, চা মজদুরের গান, বিহুগীত, হুঁচরি ইত্যাদি লোক ও গ্রামীণ সংস্কৃতির আবহে ভূপেন লালিত। আনন্দীরাম দাস (১৯০৯-১৯৬৯) নামে আর একজন গীতিকার রচিত বনগীত-এরও অসম রাজ্যে প্রভাব পড়ে। পার্বতী প্রসাদ বড়ুয়া ও কমলানন্দ ভট্টাচার্য নামে আর দুজন সঙ্গীতকার গীতিকার অসমের সঙ্গীত আলোকিত করেছিলেন। সেই সাগরে ভূপেনের অবগাহন।

সেই সময় অর্থাৎ ১৯৩৭ ভূপেনের রচনা–কু

কুসুম্বরের পুত্র শ্রী শঙ্কর গুরু ধরেছিল নামেরে তান
নামের শুরুতে আনন্দে নেচেছিল পবিত্র বরদোয়া খান
মোর গুরু ঐ বরদোয়া খান।

১৯৩৯ সালের রচনা:

অগ্নিযুগের স্ফুলিঙ্গ আমি
নতুন ভারত গড়িব
সর্বহারাদের সব দিয়ে আজ
নতুন ভারত গড়িব

ভূপেনের জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী দুই মহানায়কের একটু পরিচিতি প্রয়োজন, নইলে ভূপেনের ভিত্তি বোঝা যাবে না।

জ্যোতিপ্রসাদ ১৯২১ সালে তেজপুর হাইস্কুলে পড়েন। অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিলেত যান। উচ্চশিক্ষা অসমাপ্ত রেখে জর্মনিতে চলচ্চিত্র অধ্যয়ন করেন। ১৯৩০ সালে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৩২ সালে ১৫ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা হয় তাঁর। ১৯৪১ সালে কংগ্রেস সেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগদান করেন। সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, চলচ্চিত্র স্টুডিও ও ছবিনির্মাণ ইত্যাদি করেন। সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সংবাদপত্র পরিচালনা, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও আন্দোলনসহ নানা জনকল্যাণমুখী কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫১ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা (১৯০৯-১৯৬২) হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত ও নৃত্যে বিশদ জ্ঞান লাভ করেন। তার শিল্পকে জনসচেতনার কাজে নিয়োগ করেন। অসম জীবনীকার ড. দিলীপকুমার দত্ত লিখেছেন:

বহুক্ষেত্রে বিষ্ণু প্রসাদ রাভা ভূপেন হাজারিকার গুরুর মতন। রাভার কোলেতে বসেই ভূপেন হাজারিকা গান শিখেছিলেন, ওর সাইকেলে চড়েই রিহার্সেলে গিয়েছিলেন আর বিষ্ণুপ্রসাদের ‘কামতে কলচী লৈ যাই ও রচকী বাই’ (কাঁখেতে কলসি নিয়ে যায় ওই রসকী বাঈ), আর ‘উলাহতে নাচি বাগি হলি বিয়াকুল’ (উল্লাসেতে নাচি নাচি হলি ব্যাকুল) এই গান দুটি গেয়েই তার জীবনের প্রথম রেকর্ড করেছিলেন।
(ভূপেন হাজারিকার সঙ্গীত ও জীবন-চক্র। মূল, ড. দিলীপ কুমার দত্ত। অনুবাদ, তপতী লাহিড়ী, গুয়াহাটি, অসম, জানুয়ারি, ১৯৯১, পৃ. ২১।)

দুই.
অসম রাজ্যের এই দুই মহানায়কের প্রভাব ভুপেনের জীবনকে বিকশিত হতে সাহায্য করে। যে প্রভাব ভূপেনের গানের বাণীর জন্য নতুন দিকনির্দেশনা নিয়ে আসে। গণসংস্কৃতির ভিত্তি তখন থেকে ভূপেনকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। যেমনটি এ ভূ-খণ্ডে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬), মুকুন্দ দাস (১৮৭৯-১৯৪৫), রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭) ফণী বড়ুয়া (১৯১৪-২০০১), সত্যেন সেন (১৯০১-১৯৮১), সুখেন্দু চক্রবর্তী (১৯২৮-১৯৮৯), সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫), শাহ আব্দুল করিম (১৯১২-২০০৯), শেখ লুৎফর রহমান (১৯২৬-২০০৫), সাধন সরকার (১৯২৫-১৯৯৫), হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-১৯৮৭), আলতাফ মাহমুদ (১৯৩০-১৯৭১), নিজামুল হক (১৯৩২-২০০২) ও মোমিনুল হক (১৯৩১-২০০১) প্রমুখের মধ্যে দেখা যাবে।

ভূপেন তাঁর স্মৃতিকথা আমি এক যাযাবর গ্রন্থে লিখেছেন:

১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল অবধি প্রায়ই আসতে হয় কোলকাতায়। আমার তখন রেকর্ড হচ্ছে ক্রীক রোর সেনোলা কোম্পানীতে। ওয়েলিংটন স্কোয়ার, ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের বাড়ি সব আমার চেনা। দু-আনা পয়সা খরচ করে আসি টালিগঞ্জে। শ্রীনিকেতন, শান্তিনিকেতন, রয়েল হোটেল অথবা আড়াই টাকা খরচায় বউ বাজার আমহাস্ট স্ট্রিটের মোড়ে ক্যালকাটা হোটেলে থাকি। … তেরো বছর বয়সে ১৯৩৯ সালে ইন্দ্রমালতী ছবিতে গান গাওয়ানোর জন্য জ্যোতিপ্রসাদ আমায় নিয়ে এলেন অরোরা স্টুডিওয়।

এমন করে শুরু। এন.বি.সেন এন্ড কোম্পানী ভূপেনের হাফ প্যান্ট ও শার্ট পড়া ছবি ছেপে লিখেছিল–‘আমাদের কনিষ্ঠতম শিল্পী’। চলার পথে দেখেছেন বিচিত্র শিল্পী ও ব্যাক্তিত্ব। পাহাড়ী স্যানাল (১৯০৬-১৯৭৪), শচীন দেব বর্মণ (১৯০৬-১৯৭৫), আব্বাসউদ্দিন (১৯০৩-১৯৫৯) সহ হাজারো নামীদামী শিল্পীর সাথে তাঁর সাহচর্য ও পরিচয় ছিল।

অসম থেকে কোলকাতা গিয়েছেন। সেখান থেকে বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়। সহপাঠী, ভর্তির অভিজ্ঞতা, রাজনীতি ও সঙ্গীতবেত্তাদের সম্বন্ধে লিখেছেন নিজের স্মৃতিকথায়:

শহরে গিয়ে গান শিখতে হয়। রণদা উকিল, সারদা উকিলের কাছে ছবি আঁকা শিখতে যেতে হয়। বি.এ পড়ার সময়েও কণ্ঠে মহারাজ আনোখে লালের বাড়িতে যাই। বিসমিল্লাহ খানের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর রেওয়াজ শুনি। আবার আচার্য নরেন্দ্র দেবের মার্কসিস্ট ক্লাস অ্যাটেন্ড করি। কারণ কতগুলো ঘটনা পরম্পরায় আমার মনের মধ্যে রি-এ্যাকশন চলেছে। গান্ধীজী বলেছেন, কুইট ইন্ডিয়া। নেতাজী বলছেন, অহিংসার পথে স্বাধীনতা আসবে না। আর মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাত্র বলছে, এটা নাকে পিপল্‌স ওয়ার।

এই সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের প্রতি আগ্রহ এবং রাজনৈতিক দোলাচল তাঁর জীবনকে দুলিয়ে দিয়েছিল। নানা ঘটনা তাঁর জীবনে রেখাপাত করেছে। সেখানে তাঁর নতুন চোখ খুলেছে। তিনি লিখেছেন:

বেনারসে আসার পর আমার জীবনের চিন্তাধারাটাই বদলে গিয়েছিল। একসময় মারাঠী বা গুজরাটি বা অন্য প্রদেশের মানুষদের দেখলে মনে হতো যেন কত আপনার। আবার যখন আমার সহপাঠী হিসেবে একজন আফ্রিকার ছেলে, একজন ইন্দোনেশিয়ার ছেলে বা একজন জাপানের ছেলেকে দেখতাম কিংবা একজন মুসলমান সহপাঠীকে সংস্কৃত পড়তে দেখতাম তখনই বিশ্বমানবতার প্রকৃত স্বরূপ ক্রমশঃ পরিষ্কার হয়ে যেত। চোখের সামনে দেখেছি, কাশ্মীরের অধিবাসী আহমেদ হোসেন দানি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিরেক্টর অফ আর্কিওলজি হয়েছেন। কলকাতায় থাকলে আমি পূর্ব-ভারতীয় হয়ে থাকতাম। কিন্তু বেনারসে গিয়ে আমি মহাভারতের সন্ধান পেয়েছিলাম।

ভূপেন চার বছর ছিলেন বেনারসে। অনেক আঞ্চলিক সংস্কারকে কাটিয়ে বিশ্বাঙ্গনে প্রবেশ করতে লাগলেন। ১৯৪৯-এ সেপ্টেম্বরে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবেন। সেখানে ভারতীয় ছাত্রদের সাথে দেখা। হঠাৎ একদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৯৬১-১৯৪১) একান্ত সচিব অমিয় চক্রবর্তীর (১৯০১—১৯৮৬) সাথে দেখা আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসে। তিনি হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। ভূপেনের গবেষণার বিষয় ঠিক করতে অমিয় চক্রবর্তীর দান অপরিসীম। এখানেই তাঁর সঙ্গীত জীবনের ভাবগুরু পল রবসন (১৮৯৯-১৯৭৬) সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে শুরু করেন তিনি।

ভুপেন হাজারিকা লিখেছেন:

একদিন হাঠাৎ শুনলাম, পল রবসন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। সম্প্রতি তাঁকে নিগৃহীত করা হয়েছে। প্রায় সম্পূর্ণ আমেরিকাই তাঁকে বয়কট করেছে। হলিউড থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। স্টেজেও তাঁকে বয়কট করেছে। কোথাও তাঁকে গান করতে দেয়া হবে না। রেকর্ডিং কোম্পানীগুলি তাঁর গান রেকর্ড করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোলকাতায় যেমন পাড়ার ছেলেরা স্বরবতী পূজো করে সেইভাবে মঞ্চ করা হয়েছে। আমরা সবাই বসে আছি একেবারে রাস্তায়। এ কথা আজ অনস্বীকার্য যে, পল বরসনের প্রভাব আমার জীবনে বিশেষভাবে পড়েছে। আমেরিকার যত নামকরা কাগজ আছে তার ছেঁড়া কাগজের ফালি দিয়ে সামনে একটা স্কীনবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। পল ছ’ফুটের বেশি লম্বা। কোনো গ্রীনরুম নেই। নির্ধারিত সময়ে এলেন তিনি। পুরো কালো নয়। চকোলেট ব্রাউন গায়ের রং।… সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেলাম উদাত্ত কণ্ঠের আহবান, ‘ওল ম্যান রিভার, ইউ ডোন্ট নাথিন্‌ । ইউ জাস্ট কিপ রোলিং রোলিং।’ লোকগীতি। তিনটে অন্তরা আছে।… সঙ্গে শুধু একটা গীটার রয়েছে। খুব যে একটা ব্যাকরণ মেনে গান করেন তাও নয়। মনে পড়ে গেলে, ক্লাস সিক্স এ পড়ার সময় প্রথম যখন গান করি তখন আমিও তো দাঁড়িয়ে গান করেছি। অসাধারণ লাগলো পল রবসনের সঙ্গীত পরিবেশনা রীতি। আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। দেখা করলাম তাঁর সঙ্গে। বললাম, আমি কিন্তু মাঝে মাঝে আপনাকে এসে বিরক্ত করবো। বললেন, নিশ্চয়ই আসবেন। ওখান থেকে ফিরে এসে বন্ধুদের বললাম, সার্থক হয়ে গেল আমেরিকা দর্শন।

bhp_4.jpg…….
২০০৯-এ অসমের গুয়াহাটিতে অল অসম স্টুডেন্টস’ ইউনিয়নের তরফে ডিঘালিফুখুহুরি হ্রদের তীরবর্তী জিএসবি রোডে বসানো আপন মূর্তির সামনে ভূপেন। ভাস্কর: বিরেন সিংহ।
……
গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্স এম.এ করার পর মাস কমিউনিকেশন এম.এ পড়ার অনুমতি পান। দেড় বছরে ‘অডিও ভিসুয়াল এডুকেশন’ শেষ করে তারপর পি এইচ ডি লাভ করেন। ডিগ্রী শেষ করে শ্বশুরবাড়ি বরোদায় এলেন। পরে আসামে নিষিদ্ধ হন। ছবি গান নিয়ে মাতামাতি শুরু হলো। জীবনে অনেক চড়াই-উৎরাই পেড়িয়েছেন। তাঁর গাওয়া ও সুর করা গানে আমরা পেয়েছি অসমের বিহু থেকে নানা ঢঙের লোকসঙ্গীতের সুরের আবহ। কথায় পেয়েছি নতুনত্বের ছোঁয়া। বিচিত্র গান তাঁর কণ্ঠে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গান গেয়ে আমাদের সাথে জড়িয়ে আছেন তিনি। ড. দিলীপ কুমার দত্ত তাঁর গ্রন্থে ‘অগ্নিযুগ আর বিদ্রোহের গান’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে লিখেছেন:

বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর স্বাধীনতা যুদ্ধেও তিনি তাদের মনে সাহস ও শক্তি এনে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজও বাংলাদেশবাসীরা অনেকেই স্বীকার করে যে ভূপেন হাজারিকার ‘হে দোলা হে দোলা’ ‘গঙ্গা আমার মা’, ‘বিম্তীর্ণ দু’পারে’– এই তিনটি গান তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছিলো এবং হৃদয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের মতো উন্মাদনা এনে দিয়েছিল।


‘হে দোলা হে দোলা’, ইউটিউবে।


‘গঙ্গা আমার মা’, ইউটিউবে।


‘বিম্তীর্ণ দু’পারে’, ইউটিউবে।

এ ব্যাপারে তাঁর অনেক সফল গানের গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৭ সালে জুলাইয়ের প্রসাদ পত্রিকায় লিখেছিলেন:

এসে গেল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।… এই সময় কিছুটা অনিচ্ছাকৃত ভাবে সন্তোষ সেন গুপ্ত ( এইচ.এম.ভির ইনচার্জ) আমার লেখা একটা গান ভূপেনদাকে দিয়ে সুর কারিয়ে ভূপেনদাকে দিয়েই রেকর্ড করলেন। রেকর্ড বাজারে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মনে আলোড়ন শুরু হয়ে গেল। ঘরে ঘরে তখন বাজছে ‘গঙ্গা আমার মা, পাদ্মা আমার মা’,… অবশ্য এর আগে আমার লেখা গান ‘একখানা মেঘ এল আকাশে’ ভূপেনদার সুরেলা কণ্ঠের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে।

তাঁর গাওয়া ‘আমি এক যাযাবর’ অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’, ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় নজরুল’, ‘সহস্র জনে মোরে প্রশ্ন করে মোর প্রেয়সীর নাম’, ‘মাইয়া ভুল বুঝিস নাই’, ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’–গানগুলি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছে। বাংলাদেশে সম্বন্ধে বলতে গিয়ে ভূপেন তাঁর আমি এক যাযাবর গ্রন্থে বলেছেন:

কিছুদিন আগে ঢাকার একটা কাগজে আমার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সাক্ষাৎকারের হেডিং ছিল, ‘বঙ্গ সংস্কৃতির স্ফূরণ’–আমি ঢাকায় দেখেছি। কোনো দ্বিমতই নেই–বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক বেশি পরীক্ষা-নীরিক্ষা ঢাকায় আমার চোখে পড়েছে। আমি তো ভেবেছিলাম, বিগত আন্দোলনের পর অসমে অসমীয়া সাহিত্যের স্ফূরণ হবে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। কোলকাতার চোখে পড়েছে গোষ্ঠীচক্র, অহঙ্কার আর শভিনিজম। একসময় বঙ্গ-সংস্কৃতির জন্য সারা পৃথিবী যেমন কোলকাতার দিকে তাকিয়ে থাকত, আজ ঠিক সেইভাবে তাকিয়ে থাকে ঢাকার দিকে। প্রমাণিত হয়ে গেছে, বঙ্গ সংস্কৃতির গভীরতা কোলকাতার চেয়ে ঢাকায় অনেক বেশি।

বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর যে টান এ টান নাড়ীর না হলেও প্রাণের। যেমনটা আবু সয়ীদ আইয়ুব, রাজেশ্বরী দত্ত সহ আরও অনেকের মধ্যে দেখা গেছে। নিজের জন্মভূমি অসম তাঁকে করেছে চাকুরীচ্যুত, দিয়েছে জেল ও নিষেধাজ্ঞা। যেখানে পাবার কথা ছিল সম্মান। প্রথম সম্মান পেয়েছেন ভারত সরকারের পদ্মশ্রী (১৯৭৭)। যদিও ১৯৬২-৭২ সালে অসম বিধানসভার নির্দলীয় সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালে অসম সরকার সংস্কৃতি চর্চার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ‘শঙ্কর দেব’ পুরস্কার এবং ২০০৯ সালে ‘অসম রত্ন’ পুরস্কার দেয়। ১৯৭৮ সালে গ্রামোফোন কোম্পানী তাঁকে গোন্ডেন ডিস্ক পুরস্কার দিয়েছে। ১৯৯২ সালে ‘দাদা সাহেব ফালকে’ সর্বভারতীয় পুরস্কার এবং ২০০১ সালে ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কার ভূষিত করে ভারত সরকার। যে অসম তাঁকে এত আঘাত দিয়েছে তাদের তিনি কম দেননি একথা বলা যায়।

অসমে জন্ম নিয়ে তাঁর এই যে বাংলাপ্রীতি আমাদের অনেককে অবাক করেছে, শিখিয়েছে তার চেয়ে বেশি। বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (১৯২০-১৯৮৯)-এর প্রসাদ পত্রিকার (জুলাই ১৯৮৭) একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি:

দীর্ঘদিন বাংলায় বসবাস করার ফলে বাংলার প্রতি ওর মমত্ববোধ স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু অসমের প্রতি বিশেষতঃ সেখানকার মানুষদের প্রতি ওর আকর্ষণ কোনোদিন তো কমেনি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। তবে আমার মতে, ভূপেনের কোনো সীমারেখা নেই। সে আজ শুধু বাংলা বা শুধু অসমের, এমনকি সারা ভারতবর্ষেরও না, সারা পৃথিবীর।

তাঁর মৃত্যুর পর আমরা এটা বলতে পারি অসম, বাংলা এবং ভারতে তাঁর সৃষ্টি তাঁকে অমর করে রাখবে।

৬ নভেম্বর ২০১১

আর্টস-এ আরো লেখা

নজরুলের হারিয়ে যাওয়া গান: “ওরে আশ্রয়হীন শান্তিবিহীন আছে তোরও ঠাঁই আছে…”
নজরুল প্রতিভা
উপমহাদেশের সঙ্গীতকার কমল দাশগুপ্ত
শামসুর রাহমানের গান: ‘আমি প্রতিদিন তোমাকেই দেখি’
নজরুলসঙ্গীতের নবজন্মে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা

…….

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: বাবু রহমান
ইমেইল: baburahman@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রকাশ বিশ্বাস — নভেম্বর ৮, ২০১১ @ ১১:৪৮ অপরাহ্ন

      চমৎকার এই লেখাটি খুব তাড়াতাড়ি আশা করেছিলাম বাবু [রহমান] ভাইয়ের কাছ থেকে। পেয়ে গেলাম। ভালো লাগলো খুব। তবে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং তার সঙ্গীততত্ত্ব সন্নিবেশিত হতে পারতো। তার জীবনের আরো ঘটনা তুলে আনা যেত এ লেখায়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এ জেড এম নূরুল হক — নভেম্বর ৯, ২০১১ @ ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

      ভাবছি…বাংলাদেশ থেকে এই মহান শিল্পীকে কোনভাবে সম্মানিত করা যেত কিনা…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এ জেড এম নূরুল হক — নভেম্বর ৯, ২০১১ @ ১২:২৪ পূর্বাহ্ন

      আমাদের সন্তানেরাও তার কাছ থেকে দেশপ্রেম শিখবে…মানবতাবোধ শিখবে..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অসীম বড়ুয়া — নভেম্বর ৯, ২০১১ @ ৩:৫১ অপরাহ্ন

      চমৎকার এবং তথ্যবহুল লেখা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shah alam — নভেম্বর ১০, ২০১১ @ ৩:১৯ অপরাহ্ন

      আমাদের দুর্ভাগ্য জীবিত থাকতে আমরা গুণীজনকে সম্মান জানাতে পারি না। মারা গেলে চিন্তা করি। তাকে আরও আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্মান জানানোর প্রয়োজন ছিল।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com