সিডনির পথে পথে (৮)

আবু সুফিয়ান | ৪ নভেম্বর ২০১১ ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

12.jpg
লা পেরোজের বীচ সংলগ্ন সিঁড়িতে লেখক ও আফসানা

সিডনির পথে পথে ১ | সিডনির পথে পথে ২ | সিডনির পথে পথে ৩ | সিডনির পথে পথে ৪ | সিডনির পথে পথে ৫ | সিডনির পথে পথে ৬ | সিডনির পথে পথে ৭

(গত সংখ্যার পর)

সিডনিতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গায় গেছি। যেমন প্যারাম্যাটটা (PARRAMATTA), সিডনি অলিম্পিক পার্ক, ব্যাংকস টাউন, ব্লাক টাউন, রকডেল, ক্যাম্বল টাউন, সার্কুলার কী–ই, লিভারপুর, ওয়াটসন বে ইত্যাদি। রাইড (Ryde) এলাকাতে যাওয়া হয়নি। অথচ রাইড হচ্ছে সেন্ট্রাল সিডনির সাথে সবচেয়ে নিকটতম এবং জমজমাট এলাকা। আজ সেখানে যাবো।

আফসুরা থাকে ওয়েষ্ট রাইড । ওর বর পারভেজের সাথে আগে দেখা হয়নি। হাজবেন্ড ওয়াইফ দুজন মিন্টো’তে এলো আমাদের নিয়ে যেতে। মেহমান আগমন উপলক্ষে চাচি খাওয়া দাওয়ার বিরাট আয়োজন করেছেন। আমরা আস্ট্রেলিয়া আসার ঠিক আগে উনার হাত পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়ার মাত্রা হচ্ছে তিন ডিগ্রী। অর্থাৎ বড় ধরনের ইনজুরি। এসব দেশে বাসা বাড়িতে বাংলাদেশের মতো ছুটা বুয়া বা বাধা বুয়ার ব্যবস্থা নেই। সুতরাং সব কাজ নিজেদেরই করতে হয়।

সন্ধ্যায় নির্ধারিত অতিথির বাইরে আরো কিছু মেহমান চলে এলো। টিটো ভাই, তাঁর স্ত্রী ও বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন। উনারা ঢাকাতে এক সময় চাচিদের বাসায় ভাড়া ছিলেন। টিটো ভাইয়ের স্ত্রী, ভাবী চ্যাপা শুটকির ভর্তাসহ মজার কিছু বাঙালি খাবার তৈরি করে সাথে এনেছেন।

তরুণী তন্দ্রা, কাকুর বন্ধুর মেয়ে। সিডনিতে পড়াশোনা করতে এসেছে। সে এলো তার হবু বর সাইফ ভাইকে নিয়ে। সেও খাবার নিয়ে এসেছে–চিংড়ি মাছের কারি।

সিডনিতে বাঙালি পরিবারগুলো কারো বাসায় গেলে এরকম বিশেষ আইটেম রান্না করে নিয়ে যায়। এটা এখানকার এক ধরনের রেওয়াজ। ভালো রেওয়াজ।

রাতের খাবারের প্রধান আইটেম ল্যাম্ব বিরিয়ানী। চাচির রান্না হয়েছে অসাধারণ। খুবই মজা। আনন্দ নিয়ে সবাই বিরিয়ানী খেলাম।

আফসু-পারভেজ বিশেষ ধরনের মিষ্টান্ন নিয়ে এসেছে। লেবানিজ সুইট।, নাম বাকলাভা। বিভিন্ন ফ্লেভারে তৈরি। সুস্বাদু। জীবনে এই জিনিস প্রথম খাচ্ছি।

আমার খাদ্য উপভোগ দেখে আফসু একের পর এক ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভার তুলছে। বলে–এটা খাও। আরেকটা খাও। এই লাস্ট …. এটা এক কামড় খাও…!

ছোট বোনের আব্দার রক্ষা করছি। বাকলাভা মিষ্টি, অতিরিক্ত ফ্যাট। এর শরীর ডুবো তেলে (সম্ভবত ঘি-তে) ভাজা হয়। আমার এসব খাওয়া নিষিদ্ধ না হলেও সীমিত খাওয়ার নির্দেশনা আছে।

সাবৃনা ঘটনা দেখে বিরক্ত গলায় বললো, যত ইচ্ছা খাও। কোনো অসুবিধা নাই। কোলেস্টেরল আরো বাড়াও। প্রেশার হাই হোক। তারপর এক সাথে সব খাবার-দাবার বন্ধ করে দিও।

বলে সেও একটা ভিন্ন ফ্লেভারের মিষ্টি মুখে দিলো, মজা তো!

আমার দিকে আরেকটা তুলে দিয়ে বললো, এটা খাও! ডিফরেন্ট মজা!

স্ত্রীর অনুরোধে আরেকটি মিষ্টি খেতে খেতে বললাম, অনেক রাত হয়েছে, চলো আমরা বের হই।

2.jpg
………
ডায়নিং এ সস্ত্রীক নাশতা খাচ্ছেন লেখক
………

খাওয়া দাওয়া শেষ। আড্ডা ও হৈ হুল্লোড় করতে করতে রাত এগারোটা বেজে গেলো। পরের দিন সবারই কাজ আছে। মেহমানরা আনন্দিত মুখে বিদায় দিচ্ছেন। সাবৃনা ও আমি বের হলাম সবার শেষে। চাচি আমাদের বিদায় দিচ্ছেন।

সাবৃনা বললো, চাচিকে ঐ কথাটা বলো।

চাচি চিন্তিতভাবে জানতে চাইলেন কী, কোনো সমস্যা হয়েছে?

না।

খাওয়া-দাওয়া ঠিক ছিলো?

সব কিছুই ঠিক ছিলো। আপনার বাসা থেকে অতিথিরা সবাই সন্তষ্ট মনে ফিরে যাচ্ছে। দৃশ্যটি সুন্দর। সৌভাগ্যের।

ঢাকাতেই এখনকার সময়ে হঠাৎ করে বাড়িতে মেহমান এলে বেশির ভাগ মানুষ বিরক্ত হন। সেখানে সিডনির মতো ব্যস্ত শহরে এমন মেহমানদারি উল্লেখ করার মতো। প্রশংসনীয়।

চাচি জানালেন, প্রায়ই তার বাসায় এরকম মেহমান আসে। তিনি অতিথিদের আতিথ্য দিতে পছন্দ করেন। তিনি সৌভাগ্যের বিষয়টি জানার জন্য অপেক্ষা করছেন।

সহীফায়ে আলী গ্রন্থে মেহমান বিষয়ে একটি অমূল্য বিধান উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, যখন কোনো অতিথির আগমন ঘটে, তাকে সম্মান কোরো। মেহমান (আসমান থেকে তার রিজিক বা খাদ্য) নিয়েই আসে। তারপর যখন সে (সন্তুষ্ট মনে) ফিরে যায়, তখন শুধু গৃহকর্তার পাপগুলোই নয় বরং পরিবারের সকলের গুনাহগুলো সাথে করে নিয়ে যায় এবং তা সমুদ্রে নিক্ষেপ করে।

সুতরাং অতিথিকে তুষ্ট করতে পারা বড় ধরনের সৌভাগ্য।

কাকু-চাচি দরজার বাইরে এসে বিদায় জানালেন।

গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। আমি বসেছি পারভেজের সাথে। সামনের সিটে। আফসু এবং সাবৃনা পেছনে। আমাকে বললো, সিট বেল্ট বাঁধো, নয়তো ফাইন হবে।

বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে জিজ্ঞেসা করলাম, ওয়েষ্ট রাইড যেতে কতক্ষণ লাগবে?

পারভেজ বললো, পঞ্চাশ মিনিট থেকে এক ঘন্টা।

7.jpg
………
ওয়েষ্ট ফিল্ডে আফসানা, সাবৃনা ও পারভেজ
………

‘বিসমিল্লাহ’ বলে সে গাড়ি স্টার্ট করলো। জিপিএস অন করা। একের পর এক নির্দেশনা আসছে- গো লেফট…স্ট্রেইট…টার্ন রাইট… আফটার থ্রি হানড্রেড মিটার…ইত্যাদি।

আমরা টুকটাক গল্প করছি। অপরিচিত পথ শেষ করে গাড়ি মটর ওয়েতে উঠলো। পারভেজ জিপিএস অফ করে দিয়েছে। এর পরের পথ তার চেনা।

পুরো সিডনি শহরে ১১০ কি.মি এর সংযুক্ত মটরওয়ে রয়েছে। মটর ওয়েতে উঠে গাড়ি উড়াল দেয়। পারভেজ উড়াল দিলো না। সে গাড়ি চালাচ্ছে সতর্ক গতিতে। কারণ কিছুদিন আগে একবার ফাইন খেয়েছে।

পশ্চিমা দুনিয়ায় আইন রক্ষায় ‘ফাইনে’র এই শাস্তি খুবই কার্যকর। বাংলাদেশে অবশ্য এসব আইন কোনো কাজে আসবে না।

এখানে বসবাসকারিরা ফাইন দিতে কষ্ট পায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যারা গাড়িতে চড়ে, তারা বাঘের বাচ্চা। আনন্দমুখেই তারা ফাইন দেবে। তারপর সেই অপরাধ আরো দ্বিগুণ মাত্রায় করবে। অনেকটা লাইসেন্স নিয়ে মদ খাওয়ার মতো।

কারো কারো কৌতুহল হতে পারে, কেনো এমনটা হয়?

এর মূল কারণ হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশে ‘ইসার টুপি’ মুসার মাথায় আর ‘মুসার টুপি’ ইসার মাথায় দিয়ে ‘হারাম’ কামাই করা খুবই সহজ। ফলে টাকা পয়সার ফাইন গায়ে লাগে না। আইনও কোনো উপকারে আসে না।

ওয়েষ্ট রাইড চলে এসেছি। রাত বাজে প্রায় বারোটা। রাস্তা ঘাট নিরব।

আফসুদের বাসার সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা। আলাদা গ্যারাজ আছে। লন্ডনের বাড়ি ঘরের সাথে এই স্ট্রাকচারের খুবই মিল।

পারভেজ গাড়ি পার্ক করছে। আমরা উপরে উঠে এলাম।

1.jpg
………
আফসুর বাসার বিশেষ ইজি চেয়ারে লেখক
………

দুই কামরার ইউনিট। সাথে কিচেন এবং বাথ। ছোট্ট, কিন্তু টিপটপ। সামনের ঘরের দেয়ালের সাথে ডায়নিং পাতা। ফোর সিটেড। আরেক পাশে সেমি ডাবল বিছানা। পাশে বিশেষ ধরনের একটি ইজি চেয়ার আছে। সমুখের দেয়াল জুড়ে এলসিডি টিভি। ফ্লোরের মিনি কার্পেটের ওপর টী-টেবল রাখা। আর ডান দিকে রয়েছে খোলা বারান্দা। ব্লাইন্ডের পর্দা সরালেই ঘর থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়। ভালো লাগে।

সকালবেলা পারভেজের আফিস আছে। ওকে বের হতে হবে ভোর পাঁচটায়। খানিকক্ষণ গল্প করে সে ঘুমাতে গেলো।

আমরাও শুয়ে পড়লাম।

জায়গা বদল হলে আমার ঘুমে বিঘ্ন হয়। এখানেও ব্যতিক্রম হলো না। তবে কোনো সমস্যাও নেই। হিসাব করে দেখেছি ৬০ বছরের গড় আয়ুর একজন মানুষ ১৬ বছর ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। অর্থাৎ একটিভ লাইফ হচ্ছে তার ৪৪ বছর। গড়ে প্রতিদিন আট ঘন্টা হিসাবে প্রায় এগারো বছর আমি ঘুমিয়ে ফেলেছি। এক রাতে ঘুমের বিঘ্ন হলে কিছু আসে যায় না।

সকালে প্লান ছিলো–আফসু আমাদের নিয়ে বের হবে। প্লান বাতিল হলো। কারণ, গাড়ি ছাড়া সাবৃনা বের হবে না। ট্রেন জার্নি তার অপছন্দ। কোথাও হেঁটে যাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না।

আমি বিপদে পড়ে গেলাম। বাসায় বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না।

এই সংকট সৃষ্টির কারণ হচ্ছে পারভেজ। সে ভুলবশত গাড়ির চাবি পকেটে নিয়ে অফিসে চলে গেছে।

আফসু দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো।

আমি বললাম, কোনো সমস্যা নেই। তোমরা বাসায় থাকো। আমি এলাকাটা ঘুরে দেখি।

আফসু বললো, একা না বের হয়ে বাসাতেই থাকো। পারভেজ আসলে একসাথে বের হবোনে।

না। না হাঁটলে কোনো শহর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। একটু হাঁটা দরকার। তোমরা থাকো। আমি বের হই।

সাবৃনা বিরক্ত কন্ঠে বললো, যেতে দাও। তোমার ভাই বিদেশে আসলে বেশি উজিয়ে যায়।

কথা সঠিক।

স্ত্রীর মুখে এই সতর্কবাণী শোনার পরে বের হওয়া ওয়াজিব হয়ে গেলো। তবে তাঁকে খেপিয়ে যাওয়াও কোনো বুদ্ধির কাজ না। আমি ব্যাগ থেকে লেখার কাগজ কলম বের করলাম। বললাম, বাইরে যেয়ে আজ আস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের ওপর প্রথম লেখাটা লিখবো।

বলেই দরজার কাছে এসেছি। সাবৃনা নরম গলায় বললো, সাবধানে যেয়ো। ফোন করলে ফোন ধরো।

ওষুধে কাজ হয়েছে।

আমি নিচে নেমে এলাম।

রাইডের এই জায়গাটা সুন্দর। রাস্তাঘাট ঝকঝকা। ফুটপাথগুলো পরিষ্কার। লন্ডন ও আমস্টারডাম ছাড়া অন্যান্য ইউরোপিয়ান শহরের মতো কোথাও কুকুরবিষ্ঠা চোখে পড়েনি।

আমি হাঁটছি।

সামনেই অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ব্রান্ড চেইন শপ Woolworths। রাস্তা মনে রাখার জন্য উলওর্থের দোকানকে মাথায় রাখলাম।

আশপাশটা খুবই জমজমাট। সাই সাই করে গাড়ি যাচ্ছে। বাম দিকে খানিকটা এগুতেই বাস স্টপেজ। তার পেছনে রেল স্টেশন। প্রাণবন্ত স্থান। দেখতে ভালো লাগছে।

রোদের তাপ তুলনামূলক অনেক কম। ঝিরঝির করে হাওয়া বইছে। আরামদায়ক আবহাওয়া। মাথায় কোনো চাপ বা টেনশন নেই। এ রকম পরিবেশে মনে অহেতুক ফুর্তির উদয় হয়। আমার মনেও ফুর্তি টলমল করছে।

3.jpg
………
আফসানা ও লেখক
………

রাস্তা পার হয়ে বাস স্টপে চলে এলাম। যিনি কথা বলতে শিখিয়েছেন, তাঁকে বললাম, তোমার দরবারে অশেষ কৃতজ্ঞতা। মানুষের অন্তরের একছত্র নিয়ন্ত্রণকারী তুমি! তুমি আমার মনকে আনন্দ উপভোগ করার অনুভূতি দিয়েছো–এর শুকরিয়ার শেষ নেই।

বাস ছাউনির নিচে বসার জায়গা আছে। বেঞ্চের মতো সরু স্পেস। পেছনটা খোলা। আমি ব্যাগের কাগজপত্র বের করে বসেছি। একটা বাস এলো। একজন বয়স্ক মহিলা বসা ছিলেন। শাদা চুল। উনি বাসে উঠে গেলেন।

পেছনের স্টেশনে ট্রেন এসেছে। কিছু লোকজন এসে নামলো।

আমার পেছন দিকেও পথ আছে। এক লোক সেখানে পায়চারি করছে। চোখে কালো চশমা। পরনে অরেঞ্জ গেঞ্জি। সে ট্রেন বা বাসের যাত্রী না। যাত্রীদের চোখে মুখে এক ধরনের ব্যস্ততা থাকে। তার ভাব ভঙ্গিতে সে রকম কিছু নেই। উপরন্তু কালো চশমার সমস্যা হলো, চোখ দেখা যায় না। চশমাধারী কোনদিকে তাকায় বোঝা মুশকিল।

সতর্কতা স্বরূপ আমি জায়গা বদল করে বসলাম। কারণ প্যারিসে একাধিকবার ছিনতাইকারীর কবলে পড়াসহ বিদেশে বেশ কিছু বিপদে পড়ার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে।

স্কুলের একদল ছেলেমেয়ে হুড়মুড় করতে করতে বাস ছাউনির কাছে এলো। সবাই কম বয়সী কিশোর কিশোরী। পরনে স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা শার্ট। ফর্সা এক মেয়ে সামনের দিকে দাঁড়ানো। প্রায় সব ছেলেই তার গালে পর্যায়ক্রমে চুমু খাচ্ছে। মেয়েটির কোনো ভাবান্তর নেই। তার গাল অনেকখানি লালচে হয়ে গেছে।

আরব সমাজে সাত রকমে চুমু প্রচলিত আছে। রাজা বাদশাদের চুমু দিতে হয়- হাতে। কেউ কারো কাঁধে চুমু খেলে বুঝতে হবে সে ‘বস’ স্থানীয় কেউ। ভাগ্নে ভাস্তেসহ ছোটদের চুমু দিতে হয় কপালে। পরিবারের মানুষরা পরস্পর পরস্পরকে বুকে চুমু খায়। বিদায়কালে একে অপরের গালে চুমু খায় স্বামী-স্ত্রী। নাক এবং ঠোঁটে চুমু বিষয়ে জটিল ব্যাখ্যা আছে। তবে সেখানে এক জায়গার চুমু আরেক জায়গায় পড়লে মহা বিপদ।

অস্ট্রেলিয়ান ছেলে মেয়েদের এই চুমুর মানে কি কে জানে!

গাট্টাগুট্টা এক ছেলে গলাফুলা পুরুষ কবুতরের মতো মেয়েটির চারপাশে ঘুরছে। কিন্তু চুমু খাচ্ছে না। তার চেহারা লাল হয়ে আছে। এটা এক ধরনের ‘তেজ’ লাল। সে বিড়বিড়ি করে কি যেন বলছে। বোঝা যায় না। তবে তার কথার শেষ শব্দটি হচ্ছে ‘fuck’। প্রতিবারই বেশ জোর দিয়েই সে এই শব্দটি উচ্চারণ করছে।

অনেকে মনে করেন গরিব বা অসভ্য দেশের মানুষরাই শুধু গালাগালি করে। ধারণাটি ভুল।

আরেকটি বাস এসে দাঁড়ালো। স্কুল ছাত্রছাত্রীদের দলটি হুড়মুড় করে বাসে উঠছে। পরস্পর উচ্চ স্বরে কথা বলছে। মেয়েটি নিশ্চুপ। সে উঠেছে সবার শেষে। ওঠার আগে কবুতর গলা বালক বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকে চুমু খেলো। তারপর আবার বললো ‘fuck’।

বাস চলে গেছে। সে ভনভন করতে করতে সামনের রাস্তায় উঠে গেলো।

এতক্ষণ বাস ছাউনির কাছে যে কোলাহল মুখরতা ছিলো, মুহূর্তেই নিরিবিলি হয়ে গেলো।

তামশা দেখা শেষ করে লেখা শুরু করেছি। তখনই কালো চশমাধারী আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি তাকালাম। লোকটি বললো, আমাকে কিছু সাহায্য করো।

সে এতক্ষণ ধরে আমাকে টার্গেট করেছে!

আমি তার পায়ের দিকে দেখছি। পরনে দামি জুতা। হাতে মোটা চেইনের ঘড়ি। লোকটি তাগড়া। বাহ্যত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। গায়ের রং বাদামি। মাথার চুলে গ্লেস দিচ্ছে। বোঝা যায় সে কেশ পরিচর্যাও করে। এমন একটা লোক ভিক্ষা চাইলে কেমন লাগে? তাও আবার আমার কাছে?

পশ্চিমাদের সবকিছুতেই কৌশল আছে। কোনো কোনো কৌশলে শিল্পও থাকে।

ইউরোপে দেখেছি জবান খুলে কিংবা হাত পেতে কেউ ভিক্ষা করে না। ভিক্ষুক বা ভিক্ষুকের দল থকে। তারা গান গেয়ে অর্থ তোলে। কিংবা কোনো কসরৎ দেখিয়ে সাহায্য চায়। ওদের ভিক্ষার স্মার্ট নাম হচ্ছে ‘চ্যারিটি’।

একবার লন্ডনে ল্যাডব্রোক গ্রোভ স্টেশনের পরের এক টিউবে এসে দাঁড়িয়েছি। ছোট স্টেশন। লোকজন নেই। ফাঁকা। নিরিবিলি। হঠাৎ স্যুট পরা এক ভদ্রলোক এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। চমকে উঠেছি। লোকটি বয়সী। মাথায় টুপি। ভয়ে আমার বুক ধড়ফড় করছে।

তিনি আঞ্চলিক বাংলায় বললেন, আমি লন্ডনের বাইরে থাকি। আমার কাছে বাড়ি যাওয়ার মতো ট্রেনের ভাড়ার টাকা সাথে নেই। তুমি বাঙালি, দেখেই বুঝেছি। কিছু সাহায্য করো বাবা। আমি তোমার জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করবো।

ঘটনার আকস্মিতায় কিছু চিন্তা করতে পারিনি। কিছু ভাংতি পয়সা ছিলো, দিয়ে দিলাম। পরে মাহফুজা আপার কাছে ঘটনা শুনলাম, এই বুড়ার ছেলেমেয়ে খুবই অবস্থা সম্পন্ন। সবাই লন্ডনে থাকে। কিন্তু বুড়ার খাসলত খারাপ। সে নেশাখোর। ছেলেমেয়েরা নেশার টাকা দেয় না বলে রেল স্টেশনে মিথ্যা কথা বলে সারাদিন ভিক্ষা করে। সন্ধ্যার পরে পাবে গিয়ে বসে মদ খেতে।

কালো চশমা পরা লোককে বললাম, কিছু মনে করো না–তুমি সাহায্য চাচ্ছো কেনো? তোমার স্বাস্থ্য ভালো। পরনের পোশাক-আশাক উন্নত। সমস্যা কী চোখে?

এরকম প্রশ্নের জন্য সে একদমই তৈরি ছিলো না।

বললাম, তুমি যদি কানা হও, তবে কালো চশমা খুলে আমাকে চোখ দেখাতে হবে।

লোকটি আর সহ্য করতে পারলো না। দাঁতে কামড় দিয়ে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে উলওর্থস-এর দিকে হাঁটা দিলো।

এখানে বসে থাকা এখন আর নিরাপদ না। এই ব্যাটা আবার কোনো গ্যাং এর সদস্য কিনা কে জানে!

ব্যাগ শুছিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। আর বিপদটা ঘটলো তখনই। এখানে বিভিন্ন দিকে রাস্তা চলে গেছে। তাড়াহুড়ায় রাস্তার দিক খেয়াল করিনি। হাঁটা শুরু করেছি। বেশ খানিকক্ষণ পরে বুঝতে পারলাম আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি!

আজ কপালে কী আছে—কে জানে!
(চলবে)

—–

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: আবু সুফিয়ান
ইমেইল: abusufian18@gmail.com



free counters


ফেসবুক পেজ । আর্টস :: Arts

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নিটোল — নভেম্বর ৪, ২০১১ @ ৩:০৩ অপরাহ্ন

      অনেকদিন ধরেই আপনার অস্ট্রেলিয়া কাহিনি পড়ে আসছি……এতদিন কমেন্ট করিনি বলে স্যরি। তবে আপনার লখো পড়ে খুব মজা পাচ্ছি, প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা পড়তে খুব ভালো লাগে…….মনে হয় অচেনা কোন জগত স্বেচ্ছায় এসে ধরা দিচ্ছে! লিখতে থাকুন আরও….সব সময় সাথে আছি

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন halim — নভেম্বর ৪, ২০১১ @ ৩:৪৪ অপরাহ্ন

      ভাল লেগেছে। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ASRA — নভেম্বর ৪, ২০১১ @ ৬:০৮ অপরাহ্ন

      আমি গত দশ বছর ধরে সিডনি থাকি, এই লেখকের লেখা ও উপলব্ধির অনেক কিছুই সত্য এবং পরিষ্কার। লেখক নিজে বাংলাদেশী মুসলমান, তার বোন + বোনজামাই এবং চাচাশ্বশুর সহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরাও মুসলমান! তিনি সিডনির সকল জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছেন কিন্তু হালাল দোকান উল্লেখ করে খাবার খান নাই।

      তার লেখায় কিছু কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়েছে খুব বেশি করে। এরপরে তার অভিজ্ঞতার কথা লেখার আগে আরও সতর্ক হওয়া উচিত হবে। কেননা সিডনির অভিজ্ঞতা বর্ণনা তার ব্যক্তিগত হলেও এখানে বসবাসকারী মুসলমানদের খাওয়া/হালাল খাদ্য সমন্ধে তার আরও বিস্তারিত জানা ও লেখা উচিত ছিল। এতে আমার একটু সন্দেহ দেখা দিচ্ছে যে লেখক আর তার আত্মীয়রা কেউই হালাল খাদ্যে অভ্যস্ত কিংবা সতর্ক নন!

      এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে সিডনিতে প্রায় সকল এলাকাতেই হালাল খাদ্য পাওয়া যায়। এমনকি বিশেষ ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতেও। আর কিছু এলাকাতে তো রীতিমত মুসলমান আধিপত্য রয়েছে। লেখকের স্ত্রী, বোন এবং আত্মীয়দের ছবি দেখে বোঝা গেছে এরা কেউই স্বাভাবিক ধার্মিক মুসলমান নন। তথাকথিত বাংলাদেশী মুসলমান! যারা সুযোগ পেলেই বিদেশী সাজতে পিছপা হন না। কাক হয়ে ময়ূর সাজার মানসিকতা! আর তাই এরা কেউই হালাল খাদ্য নিয়ে ব্যথিত চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন নন! যে কোনোখানেই গেলাম আর খেলাম এটা একজন প্রকৃত মুসলমানের পক্ষে শোভনীয় নয়। বিদেশ ভ্রমণে আমাদের এটা একটা বিরাট কন্সার্ন হবার কথা। এটা মাথায় নিয়েই বিদেশে যাওয়া উচিত! বিশেষ করে যার আত্মীয় আগে থেকে সেখানে থাকেন তাদের তো এই বিষয়ে আরো সুবিধা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশীরা নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে সচেতন নয়! এটাই প্রমাণ পাওয়া গেল লেখকের লেখা থেকে! দুঃখিত বোধ করলাম সঙ্গে অপমানিতও!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জুনাইদ আহমেদ শাওন — নভেম্বর ৫, ২০১১ @ ২:২৫ অপরাহ্ন

      পুরো লেখাটা পড়লাম। এখানে হালাল-হারামের প্রসঙ্গ পুরোটাই অপ্রাসঙ্গিক। লেখককে আক্রমণটা আমার কাছে নিরর্থক মনে হয়েছে। (তবে লেখকের কাছে আবেদন ইসলামের কোনো উদ্ধৃতি দিলে যেন তিনি সরাসরি কোরআন-হাদিস থেকে অথবা নির্ভরযোগ্য কোনো গ্রন্থ খেকে (যেখানে দরকার সেখানে) সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ দেন। অনেক লেখকের লেখাই আবেগযুক্ত/প্রতীকী ধরনের হয়। যেমন পাপ সমুদ্র নিক্ষেপ করার কথাটা হয়ত লেখক প্রতীকী অর্থে লিখেছেন এবং এটা ইসলামে নেই, বরংচ কথাটা কিছুটা অন্য ধর্মের কাহিনীর মত হয়ে যায়। এখানে এক লাইনের ব্যাখ্যা দিলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হত, অনেকে এ নিয়ে আক্রমণ করে বসে)। সুন্দর লেখা তবে লেখাটা লেখক আরো সুন্দর করতে পারেন তিনি প্রকৃতির যে সুন্দর বর্ননা দিয়েছেন তার সাথে কোনো ছবি যোগ করে:)

      ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shihab — december ২৩, ২০১১ @ ৫:৫১ পূর্বাহ্ন

      ভাইজান দিলেন তো সব গোলমাল করে। লেখা টা ভাল লাগলো। কিন্তু এর ভিতরে ধর্মের আগমোন কেন হলো তাইতো বুঝলাম না। লেখক হালাল খান কিনা তা কে দেখে বিচার করবেন, আল্লাহ না ASRA? যে যেভাবেই ধর্ম পালোন করুক সেটা না হয় তার নিজের কাছেই থাক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com