গর্কি: ১২ নভেম্বর ১৯৭০

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২৯ নভেম্বর ২০০৭ ১১:৩১ অপরাহ্ন

1970.jpg

নভেম্বর ১৩, ১৯৭০। সকাল থেকে মন খারাপ। ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ও ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ – দুটো কাগজেই দক্ষিণের ঘূর্ণিঝড়ের ওপর এলোমেলো, আনুমানিক ও সত্যনির্ভর নানা ধরনের খবর ছেপেছে। শিমূলের কেবলই মনে হচ্ছে, উত্তর হাতিয়া যদি জনমানবহীন বিরান ভূমি হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে মনুভাইয়ের বাড়ির মানুষজন, গোরুমোষ, পুকুরভর্তি মাছ, কালাম নানা, হাতিয়া দ্বীপ মহাবিদ্যালয়, বোস্টুমির আখড়া, কীর্তন, মোষের দুধের অতিঘন দৈ-গুড় মেখে ভাত খাওয়া, মনুভাইয়ের বাবা হাতিয়ার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মোক্তার ফসিহুল আলম সাহেবের অপার স্নেহ, ওকে লিখে দেয়া এক কানি অর্থাৎ ১৬ বিঘে জমি – সবই মিছে? দুঃস্বপ্নের মতো ভ্যানিশ করে গেল? এ কেমন গর্কি?

শামিম ভাইয়ের বাসায় যাওয়া যাক ভেবে ১১ টা নাগাদ সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। দশমিনিট হাঁটলেই তাহেরবাগ লেইন। বেল টিপতে শামীম ভাই দরজা খুললেন, বসবে একটু? আমি প্রায় তৈরিই আছি। তুমি এককাপ চা খাবে? না শামীম ভাই, চলেন যাই ওদিকে। বেরিয়ে বিসিসি রোডে হাঁটতে হাঁটতে ওরা নবাবপুরের মোড়ে পৌঁছে ডানে ঘুরল। বাঁয়ে তাজ হেটেল, সেন্ট্রাল হোটেল, বাটার দোকান পার হয়ে ক্যাপিটালের সামনে শিমূল দাঁড়িয়ে পড়ল। আজ শরীফের সিঙাড়ার বদলে ক্যাপিটালের মোগলাই খাই, কী বলেন? শিমূলের প্রশ্নের জবাবে শামীম ভাই মৃদু হেসে রেস্তোরাঁর কাচের দরোজা ঠেলে ঢুকে পড়েন। পকেটে টাকাকড়ি আছে তো বেশ? আমি কিন্তু তোমার ঘাড়ে আজ…কোই পরোয়া নেহি। শুধু মনুভাইয়ের পাত্তা লাগাবো বলেই আজ পরীক্ষার পড়া ফেলে বেরিয়েছি। ভাল লাগছে না ঝড়ের সংবাদ শুনে আর পড়ে অবধি…শিমূল মখা কথা শেষ করে না। ইচ্ছে করে না। দুজনে চুপচাপ সিগ্রেট ধরায়। একসময় ধোঁয়াওঠা ঘি-এর ম’ ম’ গরম-গরম লালচে ভাজা মোগলাই এসে গেল টেবিলে। পরোটা-কফি খেয়ে এক টাকা পঁচাত্তর পয়সা বিল মিটিয়ে, শিমূলরা বেরিয়ে এসে গুলিস্তান থেকে দোতলা বাস ধরে টিএসসি মুখো হল। শরীফ মিয়ায় চলছে একই আলোচনা – দক্ষিণের ‘বইন্যা’ বা ‘গর্কি’ অর্থাৎ সাইক্লোন আর প্রলয়ঙ্করী জোয়ারের বৃত্তান্ত। হাতিয়ায় কিছু নেই – ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে – এর বেশি কিছু জানা গেল না। সারাদিনমান আড্ডায় কাটিয়ে সন্ধ্যায় টিএসসিতে গেল ওরা ব্যাডমিন্টন খেলতে। সাগর, বড় শামীম, শফিক, সাজাহান ভাই সবাই এসেছেন – নেই কেবল মনু – মনিরুল আলম। মনুভাই নাকি দিন দুয়েক আগে বাড়ি গেছেন, কে যেন বলল। মিঠু এল ঝড়ের মতো, হাতে সান্ধ্য কাগজ টেলিগ্রাম। তাতে খবর বেরিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তান বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক উইং ক্রান্তি-র অধিনায়ক মনিরুল আলম মনু তাঁর পরিবারের সকল সদস্যসহ ঘূর্ণিঝড়ে নিহত হয়েছেন। শোনামাত্র সবরকমের ছুটোছুটি বন্ধ হল, সবাই শুকনো মুখে চুপচাপ বসে। শফিক বুড়ো কথা বলে উঠলেন, শিমূল-শামীম, তোমরা মনুর গতিবিধি নিয়মিত ট্র্যাক করে এসেছো এ্যাদ্দিন। এখন যাও, মনুর খোঁজখবর করে আমাদের সবাইকে নিশ্চিন্ত করো।

শামীম, শিমূল উঠে পড়ল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে শিমূল গায়ে উইন্ডচিটার চড়াল, শামীম থমথমে মুখে সোয়েটার কোমর থেকে খুলে ঠিকঠাক গায়ে দিল, বেরিয়ে পড়ল। রিকসা চড়ে মতিঝিলে মনু ভাইয়ের আস্তানা, অর্থাৎ এজি অফিসের কলোনির দিকে যেতে যেতে ওরা মনুর প্রিয় গণসঙ্গীত একের পর এক গেয়ে চলল রিকশাওয়ালা একবার পেছনে তাকিয়ে ওদের ‘রোদনভরা’ শোকোদ্দীপ্ত মুখমণ্ডল দেখে নিল।

চাচার বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, তিনতলার ফ্ল্যাটে বড় তালা ঝুলছে। অতঃপর কাছেই কলোনির মধ্যে কামাল ভাইয়ের বাসায় গেল ওরা। কামাল লোহানি, দীপ্তি বৌদি, ছেলে সাগর – সবাইকে পাওয়া গেল। কামাল ভাই ডাকলেন, এসো, এসো, থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের তৃতীয় রতœটি কি মিসিং? না, না, লোহানি ভাই, টেলিগ্রামের খবর বলছে, মনু এবং তার পরিবারের সবাই নিখোঁজ অর্থাৎ…। শামীম ভাইয়ের কণ্ঠে আর্জেন্সি, হাস্যপরিহাসের লেশমাত্র নেই। শিমূল চোখ মোছে। কাণ্ড দেখে দীপ্তি বৌদি এসে শিমূলের হাত ধরে টেনে নিয়ে বসালেন, পাশে বসে স্নিগ্ধকণ্ঠে বললেন, ঠাণ্ডায় সারা শহর ঘুরে এলে, আগে বৌদির হাতে এককাপ কফি খাও, তারপর শোনা যাবে কী হয়েছে। আমরা সবাই মিলে মনুকে খুঁজে বের করবো, তুমি ভাবছো কেন? শিমূল এবার সংবিত ফিরে পায়। দৃশ্যত সঙ্কুচিত হয়। বৌদি উঠে গিয়ে কফি তৈরিতে ব্যস্ত হন, তোমাদেরও চাই তো এক-এক কাপ করে? সাগর, তোমাকেও বেশি দুধ দিয়ে আধ কাপ দেব, সন্ধের পর থেকে শুধু নাক টানছো।

টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার, ইউ নো, শামীম, কামাল ভাই উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন। আর, হাঙ্গার ইজ দ্য বেস্ট সস…শিমূল চটপট যোগ করে আর বৌদির হাত থেকে কফির কাপ আর বাটিভর্তি আচার দিয়ে মুড়িমাখা টেনে নেয়। কফি খেতে খেতে উঠে গিয়ে কামাল ভাই দু’একজনকে ফোন করেন। সাগরের তবলাবাদন শুনে আর দীপ্তি বৌদির সঙ্গে গলা মিলিয়ে রবীন্দ্র নাথের প্রকৃতি ও প্রেমের গান গেয়ে শিমূল-শামীমের মন ভাল হয়ে যায়। কামাল ভাই জানান, ইতোমধ্যে যদ্দুর উনি খোঁজখবর করতে পেরেছেন, মনুভাইদের পরিবার সম্ভবত নোয়াখালি চলে আসতে পেরেছে। ওদের বাসা থেকে বেরিয়ে দুজনে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের রিফ্রেশমেন্ট রুমে বসে কোকাকোলা মিশিয়ে রাম পান করল। তারপর বেরিয়ে এসে দেখল, শহর সুনসান। অল্প হেঁটে স্টেশন লাগোয়া একটি হোটেলের নিচে রেস্তোরাঁয় মাংসভাত খেয়ে দোতলায় উঠে বানোয়াট নাম-ঠিকানা লিখিয়ে ঘরভাড়া করে রাত কাটিয়ে দেবে ভাবল। এত রাতে বাসায় ফেরা ঠিক হবে না, শামীম ভাই একবার বলছিল রাম পান করার কালে। আর, পুলিশের ঝামেলার ভয়ে ইস্টিশন লাগোয়া হোটেলে ঢাকা শহরবাসী কাউকে ঘরভাড়া দেয়া হয় না, ওরা জানত।

পরদিন সকালে শরীফ মিয়ায় বসে ঠিক করা হল, ওরা উপদ্রুত এলাকায় রিলিফ নিয়ে যাবে। সহায়তা পাবার আশায় শিমূল-শামীম-মিঠু ঢাকা শহরে ওদের যেসব বন্ধু-বড়ভাই ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত – চাকরি বা ব্যবসা করে – তাদের দপ্তরে, বাড়িতে গিয়ে ধর্না দিতে লাগল। লেগেও গেল। ফিলিপস্-এর পার্সোনেল ম্যানেজার মাহবুব জামিল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। জামিল ভাইয়ের বস্ উইং কমান্ডার বাকী ছিলেন ফিলিপ্স পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রধান। ওঁর দুই ছেলে – নেহাল ও বেলালের সঙ্গে শিমূলের নটরডেম কলেজে পড়ার সময় থেকে চেনাজানা। বেলাল পড়ত মেনন ভাইয়ের ছোটভাই বাদলের সঙ্গে, শিমূল-নেহাল একক্লাস ওপরে। যাই হোক, বাকী সাহেব, তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকন্যারা সকলে মিলে অনেক টাকাকড়ি তুলে ফেললেন। শিমূল শামীম এদিকে মনুভাইকে না পেয়ে আরেক পাসোকান (চঅঝডঙঈঅঘ অর্থাৎ পাকিস্তান স্টুডেন্টস ওয়ার্ক ক্যাম্প এসোসিয়েশ্যনের সদস্য) সয়েল সায়েন্টিস্ট মজনু ভাইয়ের সঙ্গে মিলে ‘দ্য ইয়াং ট্রিও’ প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছে জামিল ভাইয়ের পরামর্শে। ফিলিপ্স-রোটারি? ক্লাবের যৌথ প্রচেষ্টায় টাকাকড়ি, ত্রাণসামগ্রী যা যোগাড় হতে থাকবে, সেগুলো বাকীচাচা ও জামিল ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে থাকবে, ঠিক হল।

‘দ্য ইয়াং ট্রিও’ পেশাদারি মনোভাব নিয়ে ও নিষ্ঠার সঙ্গে উপদ্রুত গলাচিপা থানার উলানিয়া ইউনিয়নের উলানিয়া বাজার ও গ্রাম পুনর্নিমাণ করে দেবে কথা হল। দ্য ইয়াং ট্রিও-র নামে ব্যাঙ্ক একাউন্ট খোলা হল টিএসসি-তে। তিন অংশীদারের যে কোন দু’জন চেক লিখে টাকা তুলতে পারবে। শিমূলের প্রথম ব্যাঙ্ক একাউন্ট ছিল গ্রীণ্ডলেজ ব্যাঙ্কের মতিঝিল শাখায়। নটরডেমে ভর্তি হয়ে ‘৬৪ সালে ঐ একাউন্ট খুলতে হয়েছিল – বৃত্তির টাকাকড়ি বোর্ড অফিস থেকে ওখানে পাঠানো হত।

সকাল থেকে সন্ধ্যা – পড়াশোনা শিকেয় তুলে শিমূল শামীম আর মজনু ভাইয়ের সঙ্গে কর্ম সমন্বয় করে ছোটে পাটুয়াটুলি, চকবাজার আর মিটফোর্ড রোডের পাইকারি দোকানে – লেপের অর্ডার, ডেকচি- বাসনপত্র, রেডক্রস অফিসে গিয়ে কম্বল তোলা, দা-বঁটির জন্য কামারের গদিতে হামলে পড়া, ওষুধপত্র কেনা – ইত্যাকার কাজ। মজনুভাই হিসেবপত্রে দড় বলে ওর কাছেই সব রশিদপত্তর আর দরকারি কাগজ জমা করত শিমূল আর শামীম। দিন ৫/৬ উর্ধ্বশ্বাস কাজ করে ওরা মোটামুটি সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ১৯ নভেম্বর দক্ষিণে যাত্রা করবে স্থির করল। পগোজ স্কুলের সতীর্থ বুলুদের হাইস্পীড ন্যাভিগেইশ্যন কোম্পানির অফিসে গিয়ে, বুলুর বন্ধু হবার সুবাদে বেশ ভাল, ঝক্ঝকে একটি দোতলা স্টীল বডির লঞ্চ ভাড়া করে ফেলল শিমূল।

বাড়িতে মাকে উজ্জীবিত করতে শিমূলের দু’মিনিট লেগেছিল। আব্বা গম্ভীর, একবার শুধু মনে করিয়ে দেবার ভঙ্গিতে বলার চেষ্টা করেছিলেন, তুমি যে সাঁতার, এমনকি ডুবও দিতে…অমনি মা ঝেঁঝে উঠেছিলেন, যাচ্ছে ছেলেটা দেশের কাজে, যাক না। তোমার কেবলই আগ্লে রাখার ঝোঁক। সেবার আমিতে ওর সিলেকশ্যন চূড়ান্ত, অথচ তুমি পারিবারিক ছাড়পত্রে সই দিলে না। শিমূল এই সুযোগে পোঁ ধরল, কাকুল না যাওয়াতেই তো এখন আমাকে সেই লালমোহন গলাচিপায় যেতে হচ্ছে, আগুনমুখায় ঢেউয়ের চূড়ায় উঠে সবাইকে বোঝাতে হচ্ছে যে, আমিও পারি…। ব্যস, ব্যস, ঠিক আছে, বাবা, শামীম-মিঠু-মোস্তাফা যাচ্ছে তো? সাবধানে থাকবে, আর কী বলব। না, আব্বা, মিঠুর বাবা ম্যাজিস্ট্রেট চাচার কড়া হুকুম, পরীক্ষার আগে আর ওর পাসোকান এডভেঞ্চারে বেরোনো চলবে না – মিঠু আমাদের ঘনিষ্ঠভাবে কেবল সমর্থন দিতে পারছে, আর বাড়িতে যত বাড়তি কাপড়চোপর, জিনিসপত্র ছিল, সব এনে আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে রোজ।

গুড, গুড, তা আমাদের বাড়ি থেকে নিচ্ছ না কিছু, আব্বার সাগ্রহ প্রশ্ন। হ্যাঁ-এ-এ, মা তো অলরেডি দুই-তিন বস্তা কাপড়, কাঁথা, লেপ-কম্বল, থালাবাসন সব দিয়েছেন বের করে, সব ফিলিপ্সের গুদামে। এখন – ১৯শে সন্ধ্যায় সদরঘাটে লঞ্চে উঠে যাবে, শিমূল জানায়।

আব্বা পার্স খুলে ৫০০ টাকার এক গোছা নোট বের করলেন, গুণলেন, তারপর শিমূলের হাতে দিয়ে বললেন, তোমার মা বললেন, তুমি নাকি ডেপুটি টিম লিডার হিসেবে যাচ্ছ? তা, সাঁতার না জানার কারণে তোমার টিমমেটরা মাঝদরিয়ায় পৌঁছে নেতার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনবে না তো? সে সাহস হবে না কারো বোধহয়, আব্বা, আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কিন্তু এই টাকাগুলো কি আপনি ঘূর্ণিঝড়ে কাবু মানুষদের কল্যাণে দান করছেন?

শিমূল ভেবে পাচ্ছিল না, অতগুলো টাকা দিয়ে কী করা হবে। আব্বা ওকে নিশ্চিন্ত করেন, সে তো তোমার ব্যাপার, ওখানে প্রয়োজন হলে যেন তোমাদের টানাটানিতে না পড়তে হয়, সেজন্য বাড়তি কিছু টাকা তোমার টিমের নিরাপত্তা, কাজকর্ম অব্যাহত রাখার কথা ভেবেই আমার দেয়া…।

যথারীতি হাইস্পীডের লঞ্চে উঠে পড়া গিয়েছিল ১৯ ডিসেম্বর রাত ৮টায়। মিঠু এসেছিল ওদের টিমকে বিদায় দিতে, যাবার সময় গলায় ঝোলানো পশমী মোটা পুলোভারটা শিমূলের জন্য রেখে গেল, সদরঘাটে নদীর ওপরে ভাসতে না ভাসতেই যা ঠাণ্ডা লাগছে, ওটা ওখানে তোমার কাজে লাগবে। মিঠু হাত নেড়ে বিমর্ষ মুখে নেমে গেল। পরীক্ষা তো সামনে আমারও, শিমূল ভাবছিল, তবে ওর আবার মৃত্তিকা বিজ্ঞান বলে কথা! নিশ্চয় ঝক্কি-ঝামেলা আমার সাদামাটা ইংরেজি সাহিত্যের তুলনায় ভারীই হবে। নইলে ওরও খুব যাবার ইচ্ছে ছিল। দেশের অত দক্ষিণে ওরা কখনো যায়নি আগে। লঞ্চে রান্না, খাওয়া, শোয়া ও আড্ডার সুন্দর জায়গা ছিল। ২০ নভেম্বর ভোরে বরিশাল পৌঁছে আরও কিছু বাজার সেরে ওরা আবার দক্ষিণমুখে রওনা হল। অভিজ্ঞ সারেং-সুখানির ভরসাতেই সেবার ওদের ওই অতদূরে কিছুটা নিরুদ্দেশ যাত্রায়। দুপুরের পর ভোলা পার হতেই ভেসে আসা লাশের দেখা মিলতে লাগল। সেই সঙ্গে পচা দুর্গন্ধ। জামিল ভাই বয়স, অভিজ্ঞতায় সকলের সিনিয়র হলেও সরাসরি টিমের কোনো দায়িত্ব নেননি। আসলে উনি শিমূলদের সঙ্গে প্রথম যাত্রায় যোগ দিয়ে ছিলেন ‘দ্য ইয়াং ট্রিও’-র কর্মপরিচালনা, কুশলতা ইত্যাদি সরেজমিনে দেখার জন্যই কেবল, যাতে ফিরে গিয়ে তাঁর বস্ বাকী চাচাকে এই কার্যক্রম সম্পর্কে একটা বাস্তব ধারণা দিতে পারেন। উইং কমান্ডার সাহেব ওই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কাজকর্মের গতিনির্দেশনা দেবেন। ঢাকায় ফিরে বুঝেছিল, ওর আঁচ সঠিক ছিল। ২০ নভেম্বর বিকেলের ওই লঞ্চ যাত্রাটুকু এখনো শিমূল মনশ্চক্ষে ধারাবাহিক স্লাইড শো-র মতো দেখতে পায়। গত ৩৭ বছর যাবত কত জায়গায়, কতজনকে যে সে ওই বিকেলের কথা বলেছে, তার ইয়ত্তা নেই।

লঞ্চের গতি কমিয়ে দিতে হয়েছিল ভোলা পার হতেই – কারণ, ওই ভাসমান লাশের দঙ্গল বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ ও কচুরিপানা – সবই নাকি ১২ নভেম্বরের ঝড়ের কুফল। মরদেহের দুর্গন্ধে – মানুষ ও গোরু-মোষ-ছাগল একাকার – ওরা শ্বাস নিতে পারছিল না প্রায়। জামিল ভাই ন্যাপথলিনের বাক্স খুলে সবাইকে একটি-দুটি করে গুলি দিলেন, ওরা যে যেমন সুবিধে, রুমালে পেঁচিয়ে নাকে ধরে রইল তখনকার মতো। শিমূল অবশ্য বুঝতে পারছিল, ওই দুর্গন্ধ ওদের সঙ্গী হয়ে গেল পরের ক’দিনের জন্য, কারণ, যত দক্ষিণে যাওয়া হবে, ততই মৃত্যুর ঘনত্ব বাড়ার কথা। ওর অশুভ অনুমান ঠিকই ছিল। লঞ্চের গলুইয়ে লেগে জটলাগা লাশের বড় বড় দলা ফেটে ফেটে যাচ্ছিল। নগ্ন, ফোলা, কাকপক্ষী খুঁটে খাওয়া মানুষের – নারী-পুরুষ-শিশুর আট দিনের পচা মরদেহ অসংখ্য। সন্ধেবেলা মজনু ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে শিমূল সিদ্ধান্ত নিল, লালমোহন লঞ্চঘাটে ওদের লঞ্চ বাঁধা হবে। যে ক’দিন সম্ভব, চরফ্যাশন-লালমোহন এলাকায় কাজ করে প্রথম যাত্রা শেষ করে ফিরে যাবে। উদ্দেশ্য, সবচেয়ে বেশি দুর্গত এলাকা সম্পর্কে ধারণা নেয়া।

ভোরে উঠে শিমূল দেখে, আরো দুটো বড় স্টীমারে রাতে সেখানে পৌঁছেছে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর সদস্যরা। ওদের আসার খবর অবশ্য আগের ক’দিনে কাগজে পড়েছে সবাই কয়েকবার। তবে এই সুদূর দক্ষিণে, দরিয়ার সমীপে তাদের সঙ্গে দেখা হবে, ভাবেনি। ওদিকে করিৎকর্মা টিম লিডার মজনু ভাই আর জামিল ভাই নেমে গিয়ে আর্মি অফিসারদের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ সেরে এসেছেন। কাজের পদ্ধতি বিষয়েও কিছু-কিছু আলাপ হয়েছে। কথা হয়েছে, শিমূলরা যেহেতু বাঙালি এবং স্বেচ্ছাসেবক – দু’দলে সমন্বয় করে এক সঙ্গে কাজ করবে, উদ্ধার থেকে শুরু করে টিকা-ইঞ্জেকশন দেয়া, খাবারদাবার সবরাহ সবই একসঙ্গে করবে – ওদের বাংলাভাষার জ্ঞান সেনাবাহিনীর কাজেও নাকি সহায়ক হবে বেশ।

লঞ্চের বাবুর্চি সকালেই ভর্তাভাত, ঘনডাল, ডিমভাজা আর গাওয়া ঘি পরিবেশন করল। উদ্দেশ্য, ভরপেট সকলকে খাইয়ে দেয়া, যাতে শুকনো বিস্কুট-টিস্কুট খেয়ে সবাই মোটামুটি দিন কাটিয়ে ফিরতে পারে। রাতে আবার সে গরমভাত খাওয়াবে, প্রতিশ্র“তি দিল। কিন্তু সমস্যা হল, কেউই তেমন খেতে পারছে না, হাঁ করে যেখানে মুখ ভরে বাতাস নেয়াই দুষ্কর, সেখানে চিবিয়ে গলা দিয়ে খাবার নামানো দুরূহতর মনে হচ্ছিল সবার কাছেই। লঞ্চের সারেং-সুখানিদের অনেকেরই বাড়ি ওদিকে, কাজেই তাদের কাছে শিমূলদের আচরণ যাতে আদিখ্যেতা বা অমানবিক না প্রতিপন্ন হয়, সে-বিষয়ে অবশ্য সকলে সচেতন ছিল। তবে, সর্বত্রগামী ঐ গাঢ়, পচা দুর্গন্ধ থেকে কারও একমুহূর্তের জন্য রেহাই ছিল না ক’দিন।

জোয়ারের জল নেমে যাওয়া স্যাঁৎসেতে মাটিতে নেমে সিঙ্গল ফাইলে হেঁটে সেনাবাহিনীর লঞ্চের কাছে পৌঁছনো গেল। সৈনিকরা আগে থেকেই তৈরি। পাশাপাশি দুই লাইনে ওরা নদীর পার ছেড়ে ভেতরে রওনা হল। বড় বড় তালগাছ, অন্যান্য বুড়ো গাছ আর ন্যাড়া নারকেল বীথি ছাড়া ঘরবাড়ি কিছুই নজরে পড়ে না। আধঘন্টায় কিলোমিটার তিনেক দ্রুত হেঁটে ওরা আরেকটি খালসদৃশ স্রোতার এধারে পৌঁছল। আর্মির লোকজনের নির্দেশনায় শিমূলদের দলের দুজন মোটা রশি ধরে সাঁতরে ওপারে উঠে এপার-ওপার দড়ি টেনে গাছে বেঁধে দিল। সেনাবাহিনীর রাবারের নৌকো ফুলে উঠল, পানিতে ভাসল এবং দড়ি টেনে দু’দলের সবাই ওপারে পৌঁছে গেল অচিরে। সবশুদ্ধ আধঘন্টা সময় লেগেছিল। ওপারে পৌঁছে ওরা দলবদ্ধ নগ্ন লাশের দেখা পেল। সেনাবাহিনী ও শিমূলেরা বেগে নরম মাটিতে কোদাল চালিয়ে গর্ত খুঁড়ল, কোদাল-বেল্চা দিয়ে অমৃতের সন্তানদের গলিত শব ঠেলে গর্তে নামিয়ে কোনমতে মাটিচাপা দিয়ে বাঁচল। হা ভগবান, সে দুর্গন্ধের স্মৃতি এখনো শিমূলের অন্নপ্রাশনের ভাতপানি উগরে দিতে চায়। পাকি লালমুখোরা আশ্চর্য নির্বিকার। দু’একজন কেবল মাঝে-মাঝে ‘ইয়া আল্লাহ্, আল্লাহ্ মালিক’ ইত্যাদি উচ্চারণ করছিল মাঝে-মাঝে।

এক বৃদ্ধ ছেঁড়া লুুঙ্গি পরে গাছতলায় বসে ঝিমোচ্ছিলেন। নভেম্বরের ঠাণ্ডায় তার নগ্ন গা কেঁপে, কুকঁড়ে যাচ্ছিল। শিমূলদের সঙ্গে কিছু কাপড় ছিল। পোঁটলা খুলে একটি ঢিলেঢালা মোটা কাপড়ের শার্ট ও সোয়েটার তাকে পরিয়ে দেয়া হোল। লুঙ্গির ওপর দিয়েই পাজামা পরানো হল। বৃদ্ধ এতক্ষণ নির্বাক ছিলেন। এবারে তাঁর দু’চোখে অশ্র“র ঢল, হাতে হাই-প্রোটিন বিস্কুট, কিন্তু খাচ্ছেন না। জামিল ভাই তার পাশে বসে ঘাড়ে হাত বুলিয়ে পানির সঙ্গে বিস্কুট খাইয়ে দিলেন। জামিল ভাইয়ের মাথায় হাত নিয়ে বৃদ্ধ বললেন, ‘আমার ৫০ কানি জমির ধান, ৫৮ জন ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, জনমানুষ, ৮টা দোতলা টিনের ঘর, গাই বলদ, ছাগল, মোষ, হাঁস-মুরগি – সব ভাসাইয়া নিছে ওই গর্কি।’

‘মানে তুফান?’ জামিল ভাইয়ের প্রশ্ন।

‘হ, হগো বাবা সকল। আমি রিলিফ নিয়া কই যামু, কারে খাওয়ামু, কই থুমু, কন?’ এরই মধ্যে আর্মির মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট একজন তাঁকে টিএবিসি ভ্যাকসিন দিয়েছে। কিছু খাবার ও পানি রেখে বৃদ্ধকে বলা হল, ফেরার পথে ওরা তাকে লঞ্চে নিয়ে যাবে। একা মানুষ, শোকে প্রায় পাথর হয়ে গেছেন। শুনে বৃদ্ধ হ্যাঁ-না কিছুই না বলে সুদূর দক্ষিণে, দরিয়ামুখে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন, চোখ বুঁজলেন। ক্লান্তিতে, ক্ষুৎপিপাসা কিঞ্চিৎ নিবৃত্ত হওয়ায় বোধহয়।

সারাদিনে ওরা শ’তিনেক লাশ মাটিচাপা দিতে পেরেছিল। ক’জন জীবিত মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছিল এক আধপাকা স্কুলবাড়িতে। ওপরে টিনের ছাদ ছিল, এখন সুনীল আকাশ কেবল দৃশ্যমান। যথারীতি টিকা, খাবার, কাপড় দেয়া হোল, টিমের অবস্থান বুঝিয়ে বলা হোল। দিনে-রাতে যখনই হোক, ওদের কাছে পৌঁছলে আরো সহায়তা পাবে। এরকম বেপরোয়া আশ্বাসও দিয়ে বসল জামিল ভাই ও শিমূলের মতো রোম্যান্টিকরা। বেলা পড়লে ফেরার পথে এক গাছতলায় বসে ওরা দুপুরের জলখাবার খেল – বিস্কুট, চিঁড়ে মুড়ি – যে যেমন পারল। সৈনিকরা ওদের মেসটিনে চামচ চালিয়ে খিচুড়ির মতো কিছু একটা খেল, দু’একজন ওদের অফারও করেছিল। জামিল ভাইয়ের চোস্ত উর্দু তাকে বেশ খাতির এনে দিচ্ছিল ও তরফ থেকে। হবে না! জামিল ভাইরা তো ’৪৭ সালে ওপার বাংলা থেকে সোনার পূর্বপাকিস্তানে সম্পত্তি বিনিময় করে চলে এসেছিলেন। তবে কলকাত্তাই বোলচাল তো রক্তে থেকে গিয়েছিল কিনা খানিকটা! তো দিন সাতেক লালমোহন-চরফ্যাশন এলাকা চষে, সকলেরই দু’চার কেজি ওজন ঘেঁটেছিল, খাওয়া দাওয়ার প্রতি চরম বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছিল আর ক’টা সর্বহারা মানুষের অপার কষ্ট সইবার ক্ষমতা চাক্ষুষ করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী তদ্দিনে নদীর ঘাটে তাঁবু গেঁড়েছে, আরও ত্রাণ এসেছে।

ওহ, আর একটি ব্যাপার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক কীভাবে যেন লালমোহনে হাজির হয়েছিলেন। শিমূলদের দলের সঙ্গে ওঁদের দেখাও হয়েছিল। শিমূলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও ডঃ খান সারওয়ার মুর্শেদও ছিলেন ঐ শিক্ষকদের সঙ্গে – কাঁধে ঝোলানো নক্সী, সচ্ছিদ্র দড়ির ঝোলাভর্তি মহার্ঘ, আমদানিকৃত ফলের সম্ভার থেকে একটি কমলা বের করে শিমূলকে দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, এমএ ফাইনাল পরীক্ষাটা দেবার আদৌ ইচ্ছে রয়েছে কিনা। শিমূল বলেছিল, শূওর স্যার!

মুর্শেদ স্যার অপ্রসন্ন মুখেই বিদায় নিয়েছিলেন। মাস তিনেক পর ভাইভার দিনে সে বুঝেছিল, স্যারের অসন্তোষ কত গভীর হয়েছিল সেদিন।

ফেরার সময় সকলেরই মন কিছু নির্ভার। লঞ্চের ছাদে বসে গণসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া চলছিল। ভোলা পেরিয়ে বরিশালের দিকে ওরা যখন এগোচ্ছে, তখন জামিল ভাই ঘোষণা করলেন, ওই রাতে ক্যান্ডললিট ডিনার সার্ভ করবে লঞ্চের শেফ এবং ঐ বিশেষ ভোজের যাবতীয় খরচ ফিলিপ্স ইস্ট পাকিস্তানের পক্ষে উনিই দেবেন। রাতে লঞ্চ বরিশালে ঘাটে বাঁধা থাকবে। শিমূল প্রস্তাব দিল, ক্যাম্পলিডার মজনু ভাই ও ডেপুটি সে ইচ্ছুকদের বরিশালে সিনেমা দেখাবে। সবাই হুররে বলে বিপুল সমর্থন জানাল, শিমূল সারেং সাহেবকে উজ্জীবিত করে, লঞ্চের গতি সামান্য বাড়িয়ে, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বরিশালে ল্যান্ড করাবার ব্যবস্থা নিল। ঘাটে নেমে মজনু ভাই বাজারে গেলেন। বলে গেলেন, বাজার সেরে লঞ্চে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি সোনালি হলে ওদের সঙ্গে মিলবেন।

এই সোনালি হলে সিনেমা দেখার সিদ্ধান্ত কী করে হলো? পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের ফিরু ভাইদের পাড়ার হল ওটি। উনি আবার আড্ডা দিতেন সিনেমাহলের কাছেই গুলশান হোটেলে। অতএব, চেনাজায়গায় যাওয়া ভাল ভেবে শিমূল ঐ সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিল। জামিল ভাই যাবেন না। উনি ডিনারের প্রস্তুতি তদারকি করবেন। শিমূলরা রিকসা ভাড়া করে সোনালি হলে পৌঁছল। দলবেঁধে চিনেবাদাম খাওয়া চল্ল, শিমূল মাথা গুণে, একজন সঙ্গী নিয়ে ভেতরে টিকিট কাউন্টারে গেল। সঙ্গের ছেলেটি, নাম আজ মনে নেই, বলল, টাকা দেন, আমি টিকিট নিচ্ছি। শিমূল কিছু না ভেবে একশো টাকার নোট এগিয়ে দিল। ছেলেটি ঢাকা ইউনিভাসিটির নয়, কায়েদে আজম কলেজের ছাত্র, মজনু ভাইয়ের পরিচিত। শিমূল আনমনে ভাবছিল। এরপরের যাত্রায় কাজ শুরু হবে শিমূলের নেতৃত্বে, সেরকমই কথা হয়ে আছে। গলাচিপার উলানিয়ায় এই গর্কিতে ক্ষতির ব্যাপকতা কম নয়।

ভাবনার জাল ছিঁড়ে গেল ছেলেটির চিৎকারে, শিমূল ভাই, আমার হাত বলে কাইট্টা ফালাইবো, তাড়াতাড়ি আসেন। তাকিয়ে দেখে, ছেলেটির চোখে ত্রাস, ডানহাত টিকিট ঘরের ঘুলঘুলির ভেতরে, বের করতে পারছে না টানাটানি করছে। শিমূল দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ছোট্ট জানালা দিয়ে উকি দিল, শক্ত গলায় বলল, কী হয়েছে, ওর হাত ছেড়ে দিন। না, ছাড়–ম না, কয় কী, ঢাকা ইন্ভাসিটির ছাত্র, আমারে ধমকায়, ভেতর থেকে একটি জেদি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

শিমূল নিরুপায় হয়ে, বলল আমি ফিরুভাইয়ের ছোট ভাই, তাকে কি ডেকে আনব গুলশান থেকে? সাঁৎ করে আটকানো হাত বেরিয়ে এল, ফিরুভাইয়ের কতা হুইন্যা ছাড়লাম, নাইলে তর পাঞ্জা কাইট্টা হলের সামনে ঝুলাইতাম, ভেতরের কণ্ঠ বলে খটাস এবং শব্দে টিকিটঘরের জানালাটা বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে লোক জমে গিয়েছে। কে যেন নিচুস্বরে বলছে, মালিকের ভাইগ্না, অর নাম ডেভিড, দেখতে সোন্দর, কিন্তু স্বভাবটা শয়তানের। আপনারা বিদেশি মানুষ, যান গিয়া, ওর লগে ঝামেলা কইরেন না। শিমূল খানিকটা দমে গেলেও গলায় জোর এনে বলে, সিনেমা না দেখে যাব না, আর আমরা তো এই দেশেরই ছেলে, বিদেশি কেন ভাবছেন? শো শুরু হবে। মানুষজন ভেতরে ঢুকছে। শিমূল ঘুরে পেছনে গিয়ে টিকিটঘরে ঢোকে। আমাদের টিকেটগুলো? বলেই থমকে যায় সে। এত সুন্দর চেহারা ছেলেটার? গ্রীক দেবতার মতো, টি সার্ট পরা হাতের গুলি নড়াচড়া করছে, রীতিমতো বডিবিল্ডার।

আপনার নাম কী?

আমি শিমূল। ইংরেজিতে পড়ি। সামনে ফাইন্যাল পরীক্ষা। রিলিফের কাজে চরফ্যাশন গিয়েছিলাম, শিমূল থামে।

আমি ডেভিড, মালিকের ভাইগ্না। বি এম কলেজে পড়ি, ফাস্ট ইয়ার এইচ এস সি। এই নেন টিকিট আর টাকা। তবে আপনার দলের ওই পোলাডারে আমি বানামু। আপনাদের কোন ভয় নাই। সুন্দর দাঁত বের করে ডেভিড হাসে।

অগত্যা শিমূল দলের ছেলেদের হলে বসিয়ে, একটু পর বেরিয়ে আসে। লবিতে মজনু ভাই। এসে গেছেন, গুড, এই আপনার টিকিট। আর একটা ব্যাপারে আমি একটু ঘুরে আসছি। মজনু ভাইকে সংক্ষেপে ঘটনার সার শুনিয়ে সে বেরিয়ে রিকশাওলাকে বলে, চলেন গুলশান হোটেল।

রিকশা হোটেলের সামনে পৌঁছতে, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি আবার হলে যাব বলেই শিমূল একলাফে রিসেপশনে। ফিরুভাই দোতলায় আড্ডা দিচ্ছেন, খবর নিয়ে আবার দৌড়ে দোতলায়। নক্ নক্। ‘দ্যাখ্ তো কেডা,’ ফিরু ভাইয়ের চওড়া কণ্ঠ চিনতে পারে। অল্প ঠেলাতেই ভেজানো দরজা খুলে যায়, ভেতরে টেবিল ঘিরে বেশ ক’জনের ভিড়। টেবিলে তাস, চিকেন টিক্কা আর দেশি মদের বোতল, গেলাস ভর্তি, খালি, সিগ্রেটের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করছিল ওর। ফিরুভাই স্লামাকুম।

চোখ কুঁচকে নিরীক্ষণ করে ফিরুভাই অবাক, আনন্দিত, ‘আরে তুই, শিমূল, কবে আইছ? বয় বয়। এই ওরে দে, মুরগি খা, সিগ্রেট নে।’

‘ওসব পরে হবে ফিরু ভাই, মহাবিপদ সামনে।’

‘আরে গর্কি তো এই কেবল গ্যাল, তুই কই গেছিলি? থাকবি কয়দিন?’

শিমূল পাঁচটি বাক্যে বর্তমান ও অতীত সপ্তাহের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে গেলাসে দ্রুত চুমুক দেয়, মুরগির ঠ্যাং চিবোয় ও সিগ্রেট ধরায়। হালকা মনে হয় নিজেকে।

ফিরুভাই দ্রুত ভাবছে। ঘড়ি দ্যাখে, একবার। সঙ্গীরা চুপচাপ ওদের কথা শুনছিল এতক্ষণ। এবার ফিরুভাই সোচ্চার হয়, ‘বুজলি তোরা। ওই ডেভিড হারামজাদাডা কি জানে যে, এই শিমূল সামনের বচ্ছর বি এম কলেজে প্রফেসার হইয়া আইবে আর ওরে নিল ডাউন করাইবে? হাঃ, হাঃ, হাঃ, আমার ছোট বাইয়ের সাথে ইতরামি? শিমূল তুই যা, তোর টিম লইয়া সিনেমা দেখার পর দেখবি আসল নাটকটা।’

‘না, না, ফিরুভাই কোনো নাটক দরকার নাই। কোনো ঝামেলা যাতে না হয়, সেজন্যই আপনার কাছে ছুটে আসা। আমাদের দল একটা ভাল কাজে এখানে এসেছে। কোনো রকম কেলেঙ্কারি হলে সকলেরই মানইজ্জত যাবে।’

‘আরে, আমি ঠিক সময় মতো যাবানে। তুই যা, ঐসব টিমফিম না নিয়ে আসলি তোরে, ছারতাম নাকি?’

এক চুমুকে গেলাস উপুড় করে শিমূল ওঠে। খানিকটা নিশ্চিন্ত বোধ করে। পেটে অল্পসময়ে বেশ কিছুটা কারণবারি প্রবেশের কারণেও ওই নিশ্চিন্তি এসে থাকতে পারে। সোনালি হলে ফিরে, আসনে হেলান দিয়ে চোখ বুঁজে থাকে কিছুক্ষণ। টিমের ছেলেরাও বেশ টেনশনে রয়েছে। কানাকানি করছে, কী হয় কী হয়। মজনু ভাইকে শিমূল সব খুলে বলে। ‘ভাল করছস, যেমন বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুলরে খবর দিছস। কিন্তু আইবো তো ফিরুভাই, নাকি টাল্ টালায়মান হইয়া নিদ যাইবো গুলশানের বাগানে?’

দেখাই যাক, শিমূলেরও মন থেকে দুশ্চিন্তা যাচ্ছিল না। ফিরুভাইয়ের তো মতিগতির ঠিক নেই। এদিকে ইন্টারমিশনের সময় নাকি ওই ডেভিড ছোঁড়া আরো কজন বডিবিল্ডার সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঘুরে ওদের আগাপাস্তলা জরিপ করে গেছে। অবশেষে গুরুভার সিনেমা দেখা অথবা ইজ্জত কা সওয়াল নাটকের শেষ দৃশ্য উপস্থিত হয়। ঘোড়ার ডিমের ছবি দেখতে না এলে কী হত? শিমূল ভাবে, কিচ্ছু না, বরং জ্যোৎস্নায় লঞ্চের ছাদে গান বাজনা হত, বিশুদ্ধ আমোদ হত।

ছবি শেষ হল, আলো জ্বলল, ওরা অন্য দর্শকদের সঙ্গে দোতলা থেকে নিচে নামল। শিমূল সবার আগে, মজনু ভাই পিছনে আর যাকে নিয়ে গোলমালের সূত্রপাত, সে দলের মাঝে। সকলেই মনে মনে লড়বার জন্য তৈরি, যদি আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী হয়। সশঙ্কচিত্তে নিচের লবিতে নামতে দেখা গেল, ছফুট লম্বা ফিরুভাই হলের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে একটু টলছেন। দু’হাতে দুটি বোতল কালচে লাল কেরুসুরায় পূর্ণ। শিমূলকে দেখতে পেয়ে উৎফুল্ল, এদিক আয়, আবার বাইরের দিকে ঝুঁকে ডাক, তুইও আয় ডেভিড। শিমূল বিমূঢ় হয়ে এগোয়। ওই ডেভিড, এই শিমূল স্যারের পায়ে হাত দে, সালাম কর, তোগো ইংরেজির প্রফেসার ওইয়া আসতেছে। কার সাথে কী করিস, কিছু বুজিস নে, পাগল। ডেভিড সত্যি সত্যি নত হলে শিমূল তাকে টেনে তোলে হাত মেলায় অকপট।

ফিরুভাই দু’হাতে ধরা বোতল দেখিয়ে হাসেন, ‘শিমূল এই দু’ডো ডেভিড আমারে দেলে, আমি আবার তোরে দেলাম। আর ডেভিড, তুই তোর শিমূল স্যারের দলরে পাহারা দিয়া লঞ্চে উডাইয়া দিয়া গুলশানে আমার সাথে দ্যাখা কইরা বাড়ি যাবা, বোজলা? শিমূল আমি গেলাম রে, আবার বরিশাল আইলে দ্যাখা করিস, আমার মেহমানদারি তোর পাওনা থাকল, ক্যামন?’ বলে শিমূলের মাথায় হাত বুলিয়ে ফিরু ভাই অপেক্ষমান রিকশায় উঠল।

সারা সন্ধের উদ্বেগের ক্লান্তি তখন শিমূলকে প্রায় কাত করে ফেলেছে, মাথা ধরেছে তার ভীষণ। কাঁধের ঝোলায় ফিরুভাইয়ের উপঢৌকন পুরে চুপসে থাকা, অবাক হওয়া টিমকে পাশাপাশি দু’সারিতে ফল্-ইন করাল, হেঁকে বলল, ভলান্টিয়ার্স, এখান থেকে আমরা হেটে লঞ্চঘাটে যাব ঠিক আছে? ডেভিড ওর চ্যালাদের বলল, আমি সামনে শিমূল স্যারের সঙ্গে আর তোরা টিমের পিছনে আয়।

ডেভিড, তুমি আমার ছোটভাইয়ের মতো, আমি যেমন ফিরুভাইয়ের। আজ আমরা সাত দিন পর পেটভরে ভাল খাবার খাব। তুমিও আমাদের সঙ্গে খাবে। তোমার সাগরেদদের খাওয়াতে হলে একটু দেরি হবে, আবার রান্না করতে হবে, শিমূল বলে। ডেভিডের ঘাড়ে ওর হাত, রীতিমতো বন্ধু তখন ওরা। কী যে বলেন স্যার, খাব না আমরা কেউই, আপনাদের পৌছে দিয়ে গুলশানে আবার ফিরোজ চাচাকে রিপোর্ট দিতে হবে। না, ডেভিড, তোমার এই রাম তাহলে আমাদের গলা দিয়ে নামবে না। এক কাজ কর, তুমি আমাদের সঙ্গে দু’ঢোঁক মেরে একটু খাবার মুখে দিয়ে চলে যাও, আমাদের আড্ডা চালু থাকবে, তুমি কাজ সেরে আবার এসে যোগ দেবে, ক্যামন? শিমূল সাগ্রহে ডেভিডের সুন্দর, গম্ভীর প্রোফাইল দেখে। ঠিক আছে, তবে জোর করবেন না, আমাকে আমার কাজ করতে দেবেন স্যার, প্লীজ। ওর দৃষ্টি সমুখের আলো-আধাঁরি রাস্তায় নিবদ্ধ।

wali@bdcom.net

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ripon Majumder — নভেম্বর ১২, ২০১৩ @ ২:২১ অপরাহ্ন

      অসাধারণ স্মৃতিচারণ। সত্তরের ভয়াল নভেম্বর পরবর্তী ত্রাণ কার্য নিয়ে আর কোন লিখা আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়নি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com