অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস

ফাহমিদুল হক | ২৯ নভেম্বর ২০০৭ ১১:৩৬ অপরাহ্ন

galpa.jpg

ছোকরাটা একটা ব্লেড নেয়। ধীরে ধীরে ব্লেডের কাভার খোলে। প্রথমে ওপরের রঙচঙা অংশটি ফেলে, পরে ভেতরের সাদা কাভারটিও খোলে। এরপর রুপালি রঙের ব্লেডটি নির্বিকারভাবে মাঝ বরাবর ভেঙে ফেলে। অর্ধেক ব্লেড সাদা কাভারের ভেতরে সযত্নে রেখে দেয়। আরেক অংশ ক্ষুরের ভেতরে প্রবিষ্ট। এবার ক্ষুরটি নিয়ে সে আমার দিকে এগিয়ে আসে। এখন সে আমার গলায় ক্ষুরটি আলতো করে ছোঁয়াবে – পাতলা ত্বকের নিচেই খাদ্যনালী, শ্বাসনালী – খ্যাচ্ করে কেটে ফেলতে বাড়তি কোনো আয়াস করতে হবে না। কারণ আমি মাথা-ঘাড় উঁচু করে গলাটা বাড়িয়ে রেখেছি। পশু কোরবানির সময় অসহায় জীবটির থুতনি চেপে ধরে গলাটাকে টানটান করা হয়, জবাইটা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য; ঠিক তেমনিভাবে আমি আমার গলাটাকে বাড়িয়ে রেখেছি। এজন্য কাউকে জোরাজুরি করতে হয়নি, আমি নিজেই যথাসম্ভব টানটান করে রেখেছি গলাটাকে। ছোকরাটা দেখতে প্যাকাটে-দুর্বল হলেও তার জিলেট ব্লেডটি তো অরিজিনাল। এখনি সাফল্যের সঙ্গে আমার গলাজবাই হয়ে যাবে। গলগল করে বেরিয়ে আসবে খাঁটি হিমোগ্লোবিনসমৃদ্ধ টকটকে রক্ত। কী বীভৎস ব্যাপার!

আমি স্বেচ্ছায় জবাই হতে এসেছি।

ছোকরাটি হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে ক্ষুর নিয়ে এগিয়ে আসে। তার মাথাটা গানের তালে তালে হালকাভাবে নড়ছে-চড়ছে। পাশেই ক্যাসেট প্লেয়ারে মমতাজের গান হচ্ছে, পোলা তো নয় সে যে আগুনের গোলা গো…। ছোকরাটিকে আমার এখন আস্ত ‘আগুনের গোলা’ মনে হচ্ছে – এক হলকায় আমাকে পুড়িয়ে কালো করে দেবে। গলা থেকে বেরিয়ে আসা গলগলে রক্ত আগুনের তাপে পুড়ে বাতাসে উবে যাবে। আমার কঙ্কাল জড়িয়ে কেবল অল্প কিছু কালো-পোড়া মাংস টিকে থেকে বোঁটকা গন্ধ ছড়াবে। উফ, কী ভয়ঙ্কর! আমি আগুনের গোলাকে সজোরে ধাক্কা দিই। সে মেঝেতে পড়ে যায়।

পাছায় লেগে থাকা অন্য মানুষের কেটে-ফেলা কালো কালো চুল হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে ছোকরা নাপিতটি উঠে দাঁড়ায়। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার ভাই? দাড়ি কামাবেন না?

আমি সাধারণত সেলুনে চুল কাটাই, দাড়ি-গোঁফ কাটাই না। কারণ দাড়ি কামাতে গেলে আমার নিজেকে কোরবানির জন্য নির্বাচিত পশু বলে মনে হয়। ঐযে, মাথা পেছনে দিয়ে গলা টানটান করে রাখতে হয়। নাপিত ব্যাটা জুলফির নিচ থেকে দাড়ি কাটতে কাটতে নিচের দিকে আসতে থাকে, থুতনি পেরিয়ে গলার মাঝ বরাবর যখন আসতে থাকে, আমি ঘামতে থাকি। এখন তার হাতেই আমার জীবন, সে চাইলেই অনায়াসে আমার গলাটাকে খ্যাচ্ করে কাটতে পারে। কিন্তু সে তা করে না। এর আগে হাতে-গোনা যে-কয়েকবার দাড়ি কামাতে বাধ্য হয়েছি, প্রতিবারই নাপিত দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।

আজও বাধ্য হয়েই আমি নাপিতের কাছে এসেছি। কারণ নীলিমা আজ ফিরছে। প্রায় তিন মাসের সেপারেশন শেষে সে আমার কাছে আসছে। যদি ফিরে এসে আমার মুখভর্তি দাড়ি দেখে, তবে দরজা থেকেই আবার বাপের বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু তিন মাসে দাড়িটা বেশ বড়োই হয়ে গেছে, একা একা রেজর দিয়ে এই দাড়ি কামানো যাবে না। বাধ্য হয়ে, ভয়ে ভয়ে, সেলুনে আসা। এমনিতে মনে হয় কত লোকেই তো হররোজ দাড়ি কামাচ্ছে, সেলুনে গিয়ে। এ আর এমন কী! কিন্তু সেলুনের দরোজায় পা দিতেই ভয়টা আমাকে গ্রাস করে।

ইতোমধ্যে আপনারা জেনেছেন যে:
১. আমার স্ত্রী নীলিমা তিন মাসের সেপারেশন শেষে স্বামীগৃহে ফিরছে। অর্থাৎ আমাদের দাম্পত্য জীবন নির্বিঘ্ন নয়।
২. আমি দাড়ি কামানোয় ভয় পাই।

প্রথম বিষয়টা বিস্তারিত বলার আগে দ্বিতীয় বিষয়টা আরেকটু ব্যাখ্যা করি। আমি বলেছি যে দাড়ি কামানোতে আমি ভয় পাই। আসলে কিন্তু একে কেবল ভয় বললে চলবে না, খানিকটা অন্যকিছুও। আরও কয়েকটা উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হতে পারে।

ধরুন, আমি ছাত্রজীবনে যখন উত্তরবঙ্গ-ঢাকা করতাম, আরিচা-নগরবাড়ি ফেরি পারাপারের সময় দুই বা তিন তলার ডেকে গিয়ে প্রকৃতি-প্রেমিক ভাব নিয়ে ফেরির রেলিং ধরে দাঁড়াতাম, যমুনার আদিগন্ত জলরাশি দেখতে দেখতে খুব কাছে ফেরির নিচে তাকাতাম, সাদা রঙের লৌহদানব কীভাবে পানি ঠেলে গজরাতে গজরাতে এগিয়ে যাচ্ছে দেখতাম। তখন কেটে যাওয়া জলতরঙ্গের দিকে তাকিয়ে থেকে এক পর্যায়ে সম্মোহিত হয়ে ভাবতাম দিই ঝাঁপ ঐ যমুনাজলে!

কিংবা ধরুন আজকালকার কথা। বাস করি তেত্রিশতলার ফ্ল্যাটে। বারান্দায় কাপড় নাড়তে বা ওঠাতে গিয়ে হঠাৎ করে হাতের ক্লিপটি পড়ে গেল, আমি দেখছি ক্লিপটি বত্রিশতলা-একত্রিশতলা-ত্রিশতলা পার হয়ে যাচ্ছে…ক্লিপটির যাত্রাপথ অনুসরণ করতে করতে ভাবি কিছুতেই ক্লিপটাকে পড়তে দেয়া যাবে না, দিই ঝাঁপ আমিও! মাটিতে পড়ার আগেই ওটাকে ধরতে হবে।

চট্টগ্রামের এক পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলাম। সঙ্গে এক বন্ধু ছিল। মাস্টার্স ফাইনাল উদযাপন উপলক্ষ্যে বেড়াতে যাওয়া। ঝোপ-জঙ্গল পেরিয়ে, ঘেমে-নেয়ে অবশেষে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে পারার আনন্দ কী, যারা ওঠেনি তারা বুঝবে না। তেমনি অপার্থিব আনন্দের ক্ষণ অতিবাহিত হবার এক পর্যায়ে পাহাড়ের নিচে তাকাই; ঝোপজঙ্গল কম, কেমন ঢালু হয়ে পাহাড়ের শরীর নেমে গেছে। আমার হঠাৎ ইচ্ছা হলো বন্ধুটিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিই। এমন একটা ঢালু পাহাড় বেয়ে একটা মানবসন্তান গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখার আর সুযোগ পাওয়া যাবে না।

আমি কেবল তখন গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের অফিসটা চালু করেছি। ধীরে ধীরে অফিসটা জমে উঠেছে। স্থায়ী কয়েকজন চাকুরে ছাড়াও চারুকলার কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আমার ওখানে পার্টটাইম কাজ করে। প্রত্যেকের সঙ্গেই আমার সহজ ও সু-সম্পর্ক। রাগিণী নামের মেয়েটি কাজ ভালো বোঝে, দেখতে মোটমুটি। আপাতভাবে মনে হয়ে তার ফিগার সুন্দর হবে। কাজ বুঝে নিতে, জমা দিতে, পরামর্শ করতে প্রায়ই সহকর্মীরা আমার রুমে হুটহাট ঢুকে পড়ে। আমার পুলিশ অফিসার বন্ধু সোলায়মান বলে, অবিবাহিত পুরুষেরা মেয়েদের স্তন দেখার চেষ্টা করে, আর বিবাহিতের চোখ আটকাতে চায় নিতম্বে। সোলায়মানের তত্ত্ব অনুসারে, কাজ বুঝে নিয়ে ফিরে যাবার সময় আমার চোখ হঠাৎ হঠাৎ রাগিণীর নিতম্ব অনুসরণ করতো। একদিন হঠাৎ কী হলো, মনে হলো, এক্ষুনি চেয়ার থেকে উঠে রাগিণীকে জাপটে ধরি, ওর নিতম্বে হাত দিই।

উদাহরণ অনেকগুলো দেয়া হলো। এর কোনোটি ভয় সংক্রান্ত নয়, কিন্তু আজকের দাড়ি কামানোর ঘটনার সঙ্গে একটা সূক্ষ্ম-সাধারণ মিল কি প্রত্যেকটার মধ্যে নেই? আমার মনে হয় একটি শব্দ দিয়ে এই মিলের সুতোটিকে ধরা যাবে – অস্বস্তি। ফেরি থেকে যমুনাজলে শুধু শুধু ঝাঁপ দেয়া, সামান্য ক্লিপকে রক্ষা করতে তেত্রিশতলা থেকে লাফ দেয়া, পাহাড়চূড়ায় উঠে বন্ধুকে ধাক্কা দেয়া, সহকর্মীর নিতম্বে হাত দেয়া – প্রত্যেকটি ঘটনাই কীরকম অস্বস্তিকর! কোনোটাই কিন্তু ঘটে না। কারণ আমি প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই নিজেকে সংবরণ করেছি, করতে সমর্থ হয়েছি। ঘটনাগুলো ঘটে না, কিন্তু কিছু একটা তো ঘটে! অস্বস্তিটা আমার মধ্যে জায়মান থাকে। ডিজাইনিংয়ের ফাঁকে, শাহবাগের মোড় পার হতে হতে, স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গম করতে করতে, অস্বস্তিকর প্রায়-ঘটতে-যাওয়া ঘটনাগুলো হঠাৎ মনে পড়ে। কাজে মন বসে না, রাস্তা পার হতে গিয়ে ভুল করি, সঙ্গমটি মজাদার থাকে না। তাহলে কি আপনি এখন মানতে রাজি যে দাড়ি কামাতে গিয়ে জবাই-হয়ে-যাবার অনুভূতি গ্রাস করার ঘটনাটা, যতটা ভয়ের তার চাইতে অস্বস্তির!

আমার পুরো জীবনটাই বলতে গেলে অস্বস্তিতে ভরা। নীলিমার সঙ্গে পরিচয় হওয়া থেকে শুরু করে বিয়ে-দাম্পত্য পর্যন্ত, পুরো ঘটনাই নাটকীয়ভাবে অস্বস্তিকর।

সম্ভবত আমার দ্বিতীয় এক্সিবিশন ছিল সেটা, নতুনদের যা হয়, যৌথ প্রদর্শনী। সঙ্গে আরও চারজনের পেইন্টিং আছে। জয়নুল গ্যালারির পাশে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছি। মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে উঁকি মারছি, আমার পেইন্টিংয়ের সামনে কেউ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় আটকে আছে কিনা। আমি তখন খুব উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করতাম পেইন্টিংয়ে। খেয়াল করেছি, সেকারণেই কিনা, আমার ছবির পাশে লোকজন একটু বেশি সময় দাঁড়াচ্ছে। কিউবিজম প্রভাবিত বিমূর্ত ছবিই বেশি দিয়েছিলাম সেই প্রদর্শনীতে। একসময় দেখলাম আমার একটি ছবির সামনে থেকে উল্টো ঘুরে একটি মেয়ে আমাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে। আসছে তো বটেই, এসে দাঁড়ালোও। এবং জানা গেল আমাকেই চায় সে। অর্থাৎ ‘কম্পোজিশন-৩’ ছবিটির শিল্পীকে চায় সে। ছবিটি কিনতে চায় ও শিল্পীর সঙ্গে পরিচিত হতে চায় মেয়েটি। বুঝতেই পারছেন, ওটা কেবল শুরু ছিল। পরে সে আমার প্রেমিকা হয়েছে, স্ত্রী হয়েছে। কিন্তু আবারও বলছি, পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল নাটকীয়। আমার জন্য সবই ছিল অস্বস্তিকর।

ওর সঙ্গে পরিচয় হওয়াটাকে কি নাটকীয় বলবেন না? আবার বলছি আপনি যেটাকে নাটকীয় বলবেন, আমার জন্য তা অস্বস্তিকর। ধরুন আপনার কল্পনার সব রঙ মিশিয়ে যে-নারীমূর্তিকে আপনি কাক্সক্ষা করেন অতি-তরুণ বয়সে, সে হঠাৎ আপনার সামনে এসে বললো, চলো বেড়াতে যাই। অথবা ধরুন আপনার প্রিয়তম বলিউড-নায়িকা পর্দা ছেড়ে নেমে এসে বললো, চলো কফি খাই। আপনি কী করবেন? স্মার্টলি বলবেন, ও তুমি এসেছো, লেটস গো? নাকি প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে যাবেন? নীলিমা তেমনই সুন্দর-সুশ্রী মেয়ে। আপনার কাক্সিক্ষত নারীর ক্ষেত্রে কী হতো জানি না, আমি প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়ে যাই। কিন্তু আমন্ত্রণ উপেক্ষা করার সাহস বা শক্তি আমার ছিলনা। নীলিমা আমার জীবনের ছক এঁকে ফেলে – গ্র্যাজুয়েশন শেষে আমি দিল্লি যাবো। উচ্চতর পড়াশুনা শেষ করে ফিরে আসলে আমাদের বিয়ে হবে। গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের ব্যবসা করবো আমি, অ্যাড বানাবো। বিয়ের পাঁচ বছর পরে একটিমাত্র সন্তান হবে। আর আমরা বাস করবো আকাশের কাছাকাছি, নগরের উচ্চতম ফ্ল্যাটে।

নীলিমাদের মতো মেয়েদের জন্য আমার মতো মফস্বল থেকে আগত সাদামাটা ছেলের জীবনের ছক এঁকে ফেলা সহজ। তার দৈহিক সৌন্দর্যের কথাই বলা হয়েছে কেবল, আর্থিক সঙ্গতির কথা বলা হয়নি। তার বাবা চট্টগ্রামের বিরাট ব্যবসায়ী। সে তাদের খুলশির বাড়িতে আমাকে নিয়েও গিয়েছে, বাবার সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছে। ওদের বাড়ির গেটের দশাসই দারোয়ানের সালাম নিয়ে, অ্যালসেশিয়ানের মৃদু ভর্ৎসনা খেয়ে, বিশাল লন ডিঙিয়ে, নিচের প্রকাণ্ড হলরুম পেরিয়ে ওপরের ভোমা সাইজের সোফায় আমি ক্ষুদ্রতর হয়ে বসি। আর নীলিমা তার বাবার সামনে গড়গড় করে আমার জীবনের ছক উপস্থাপন করে। সব শুনে বাবা মৃদু হেসে সমর্থন দেন। কেবল উচ্চশিক্ষার স্থল দিল্লি না প্যারিস তা নিয়ে দু’জনের মধ্যে খানিক বিতর্ক হয়। ঘনঘন দেখা-সাক্ষাতের সুবিধা – এই অকাট্য যুক্তির বলে মেয়ের কাছে বাবা হার মানেন। সেই বাড়িতে ঢোকাটা আমার জন্য অস্বস্তিকর ছিল। তার চাইতে অস্বস্তিকর ছিল, নীলিমা এসব আমার কাছে আগে থেকে কিছুই বলেনি, সরাসরি বাবার সামনে পেশ করেছে।

অথচ এই অস্বস্তিগুলো প্রকাশ করার সাহস আমার ছিল না। নীলিমার সৌন্দর্য, নীলিমার ব্যক্তিত্ব আমাকে বিকশিত হতে দেয় না। ওর বাবাই তেত্রিশতলার ফ্ল্যাটটি কিনে দেয়। গাড়ি-ড্রাইভার সরবরাহ করে। গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ের অফিসটার ক্যাপিটাল নীলিমারই। অন্যদিকে, বিয়ের পরে হঠাৎ করে অনেকগুলো নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়, যেগুলো বিয়ের আগে থাকে না। দুই পরিবারের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা। নীলিমা একবার মাত্র আমার বগুড়ার বাড়িতে গিয়ে দায় সেরেছে। অথচ আমাকে প্রায়ই চট্টগ্রাম যেতে হয়, আর মাকে ব্যস্ততার কথা বলে বগুড়া যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখি। বিয়ের পরে ধীরে ধীরে আমার অনার্য রূপ নীলিমার কাছে ধরা পড়তে থাকে। আমি প্রতিদিন শেভ করতে চাই না। ঘরে খালি গা-লুঙ্গি আমার প্রিয়তম পোশাক, অথচ নীলিমার কাছে তা অসহ্য – পারলে বাসার মধ্যে স্যুট-টাই পরিয়ে রাখতে চায়। সে বলে, আমি আমার বাবা-চাচাকে স্মার্টলি চলাফেরা করতে দেখেছি, আমি নিজেও তাই চেষ্টা করি। তুমি কেন চেষ্টা করো না? আমি বলি, এটা ইউরোপ হলে আমি সবসময় জামা-জুতো পরে থাকতাম। গরমের দেশে স্যান্ডেল পরে অফিসে যাওয়া দোষের কিছু হতে পারে না।

নীলিমার কাছে আমি এভাবে ‘গাঁইয়া’ হয়ে যাই। আমি গাঁইয়া, আমার মা গাঁইয়া, ভার্সিটি-পড়–য়া আমার ভাইটা গাঁইয়া – ভাবীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় জানে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, চাল-চলনে, কথাবার্তায় নীলিমা অসম্ভব আর্য। এই ভয়াবহ আর্যরূপ আমার মধ্যে প্রচণ্ড অস্বস্তি তৈরি করে। সে যখন আমার অনার্যতা নিয়ে আমাকে আক্রমণ করে, তার মধ্যেও আর্যত্ব থাকে। শয্যাতেও সে আর্য। তার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আর্যরূপ। আর আমার কালচে-অনার্য শরীর বেমানানভাবে একটি পরম আর্যশরীরের সঙ্গে লেপ্টালেপ্টি করে। কিন্তু বিষয়টিকে সমতায় নিয়ে আসার জন্য নীলিমার চেষ্টার কমতি থাকে না। প্রতিবার শুরু করার আগে আমাকে ব্রাশ করতে হয়, ডিওডোরেন্ট মাখতে হয়। সে এক অসহ্য ব্যাপার।

একটা বিষয়ে কেবল নীলিমা বরাবরই, এমনকি এই শেষের তিক্ত দিনগুলোতেও, আমার প্রশংসা করতো। সেটা হলো, আমার শিল্পীমেধার তুলনা নেই। অথচ নীলিমাই আমার সেই মেধাকে গ্রাফিক ডিজাইনার পদে নামিয়ে দিয়েছে। এটাই সম্ভবত, আমার কাছে সবচাইতে বেশি অস্বস্তির ব্যাপার। কতদিন পেইন্টিংয়ে বসা হয়নি। স্টুডিও রুমটাতে ধুলো পড়ে থেকেছে। ইলাস্ট্রেশন, বিজ্ঞাপন, নিয়ন সাইন – এইসব নিয়ে দিন কাবার হয়ে যায়। এই একটিমাত্র অস্বস্তির কথা, আমি মিনমিন করে হলেও নীলিমাকে জানিয়েছিলাম – তুমি আমার ক্যারিয়ারটাকে নষ্ট করে দিয়েছো। মেধার অপচয় হচ্ছে আমার। অবশ্য নীলিমার কথার তোড়ে তা দাঁড়াবার সুযোগ পায়নি।

সাম্প্রতিক সেপারেশনের সিদ্ধান্তটি নীলিমারই নেয়া। আজকের ফিরে আসার সিদ্ধান্তটিও তার। মাঝের তিন মাস ছিল আমার স্বাধীন ও সুখকর কিছু দিন। অনেকগুলো ছবি এঁকেছি। বহুৎ মদ গিলেছি। যখন খুশি অফিসে গিয়েছি। সারা শুক্রবার একা ঘরে নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, মাস্টারবেশন করেছি। কোনো কোনো রাত কেটে গেছে পেইন্টিং করতে করতে। আবার কোনো কোনো রাত ইন্টারনেটে কেটেছে পর্নোগ্রাফি দেখে। একদিনও শেভ করিনি। তিনমাস পরে আজ সকালে বাধ্য হয়েই সেলুনে গিয়েছিলাম।

আমি নীলিমাকে বলতে পারতাম সেপারেশনটা স্থায়ী হোক। বাচ্চাকাচ্চা নেই। অস্বস্তিতে ভরা, অসুস্থ দাম্পত্য আর চাই না। কিন্তু আমি বলতে পারিনি। আমার সেই ক্ষমতা নেই। নীলিমা যখন ফোনে বললো – তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। চট্টগ্রামে আর ভালো লাগছে না। তুমি বাসায় থেকো, কাল আসছি – আমিও প্রেমাস্পদ স্বামীর মতো বললাম, আমারও তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। কথাটা খুব মিথ্যেও না। অমন সুন্দর মুখ তিনমাস না-দেখে থাকাও কষ্টের।

সকালে সেলুনে গিয়ে, নাপিতের দয়ায় জবাই থেকে বেঁচে যাবার পর, বাসায় ফিরে সবকিছু নিজহাতে পরিষ্কার করেছি। বিছানার চাদর পাল্টেছি, কিচেনে লেগে-থাকা ময়লা তুলেছি, মপার দিয়ে ফ্লোর মুছেছি, গুলশানে গিয়ে কেএফসি থেকে বার্গার এনেছি; আর এখন অস্বস্তিকর আগ্রহে অপেক্ষা করছি কখন নীলিমা আসে। বেশ কিছুক্ষণ আগেই ফোনে জানিয়েছে ঢাকায় ঢুকেছে গাড়ি। একাই আসছে, ওকে ড্রপ করেই ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রামে ফিরে যাবে।

ডোরবেল বাজে। আমি অস্বস্তি নিয়ে দরজার হাতল ঘুরাই।

পেনাং, ১৬ আগস্ট ২০০৭

—–

আর্টস-এ প্রকাশিত আরো লেখা
ডিজিটাল সিনেমা নিয়ে তারেক মাসুদের সাক্ষাৎকার
তারেক মাসুদ: বন্দি পাখিটা কি মুক্তি পেল
খেলাঘর: যুদ্ধকালের ভালবাসার গল্প (গল্প)
ডিজিটাল এইজে মানুষকে আরও বড়ো মাপের মানুষ হতে হবে — তারেক মাসুদ

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ফাহমিদুল হক
ইমেইল: fahmidul.haq@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এহসানুল কবির — নভেম্বর ৩০, ২০০৭ @ ৬:০৯ অপরাহ্ন

      এ গল্পটার মধ্যে সবচেয়ে ‘অস্বস্তি’র ব্যাপার বোধহয় এটাই যে, একটামাত্র শব্দ ‘অস্বস্তি’র ভিতরে গল্পকার অনেকগুলো লঘু-গুরু মানুষিক অনুভব ও উপলব্ধিকে পুরে দিয়েছেন; গল্পটার সম্ভাবনাটাও কি ঐ একই বিন্দুতে? আমার উত্তর ঋণাত্মক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন — december ১৪, ২০০৭ @ ১০:৩৪ অপরাহ্ন

      হ্যাঁ, এ শুধু অস্বস্তির ব্যাপার নয়। আরও বেশি কিছু। ফাহমিদুলের এ গল্পটার অনেক ‘অস্তিত্ববাদী’ সম্ভাবনা ছিল। মনে পড়ছে জীবনানন্দের ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতায় বলা ‘কোন এক অন্তর্গত বিস্ময়ে’র কথা। এ কি সেই বিস্ময় যা কীনা খেলা করে রক্তের ভেতর; খেলা করে এবং ক্লান্ত করে!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অলৌকিক হাসান — এপ্রিল ২৫, ২০০৮ @ ৮:৫১ অপরাহ্ন

      আমারও মাঝে মাঝে মনে হতো কোনো সভাস্থলের ডায়াসে দাঁড়িয়ে বক্তৃতারত বক্তাকে যদি একটা ঘুষি মেরে দিয়ে আসি তাহলে কি হবে। সবাই হুটোপুটি শুরু করবে। কেউ কেউ আমাকে জাপটে ধরবে। কেউ কেউ ভয়ে পালিয়ে যেতে চাইবে ..

      কিন্তু কোনোদিনও করা হলো না এটা …

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।