বান্দরবনর পাআরত

নূরুল আনোয়ার | ২ অক্টোবর ২০১১ ১২:০২ অপরাহ্ন

nab (42).JPG
আলীকদমের মিরিঞ্জা পর্যটন কেন্দ্র।

আমার বাড়ি চট্টগ্রামে। আমাদের বাড়ি থেকে বনাঞ্চল তিন কিলোমিটারের বেশি নয়। কৈশোরের উচ্ছল বয়সে আমি বহুবার এ বনাঞ্চলে গিয়েছি এবং উঁচু উঁচু পাহাড়ে ওঠার সুযোগ আমার হয়েছে। আমি যখন গভীর বনে চলে যেতাম একটা নতুন জগত খুঁজে পেতাম। এমন সব জায়গা আমি দেখেছি সূর্য ঠিক মাথার ওপর উঠে এলেও তার আলো কী জিনিস চোখে পড়ত না। ছোট ছোট বয়ে চলা ছড়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে ওপরে পাহাড়ের চূড়া দেখতে গেলে ঘাড়টা একেবারে পেছনে বাঁকিয়ে ফেলতে হত। পাহাড়গুলো এমন খাঁড়া তার ওপরের দিকটা দর্শন করতে চাইলে মাথার টুপি পড়ে যাবে। পাহাড়ে ছিল নানারকমের গাছগাছালি। কত রকম গাছই-না ছিল ওখানে। করই, জারুল, চম্পা, কাঁঠালি, বুনো আম, গামারি, গর্জন এরকম অনেক গাছ। সব গাছের নাম কি আমি জানি? একেকটা গর্জন গাছের বেড় ছিল দশ বার হাতের মত। বাঁশবনে ঢুকলে বেরোবার পথ খুঁজে পাওয়া যেত না। পাহাড়ের শরীরটা একেবারে মসৃণ কালো পাথরের মত। তার শরীরখানা ছিল ভেজা ভেজা। তার মানে পাহাড়গুলো সবসময় ঘামে। সেই ঘাম থেকে সৃষ্টি হয় বনাঞ্চলে শত শত ছোট বড় ছড়া। ছড়ার পানি ভারি শীতল এবং তা এত পরিষ্কার যে আপনার পান করতে ইচ্ছে করবে। সত্যি সত্যি মানুষ তা পান করে। আমরা নদী, পুকুর, নলকূপ এমনকি বৃষ্টির পানিও পান করে থাকি। এসব পানির একেক ধরনের হালকা স্বাদ আছে। আমরা পান করলে তা টের পাই। কিন্তু ছড়ার পানির স্বাদটা আলাদা।

nab (3).JPG…….
ডুলাহাজারি সাফারি পার্কে
…….
আপনি যখন পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে ছড়ায় নেমে আসবেন এবং ছড়া থেকে ওপরে পাহাড়ে উঠবেন তখন একটা নিঃশ্বাস আরেকটা নিঃশ্বাসের নাগাল পাবেন না। আপনি হাঁপানি রোগির মত মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে থাকবেন এবং ছড়ার পানি পান করতে ছুটে যাবেন। তখন আপনি ওই পানির স্বাদ আরও বেশি করে উপলব্ধি করবেন।

ছড়াতে কোনো কাদা নেই। সর্বত্র বালি আর বালি। মাঝে মাঝে পাথরের সন্ধান পাবেন। কিন্তু সেই পাথর পাকা বাড়িতে ব্যবহারযোগ্য পাথরের মত কঠিন নয়। বনাঞ্চলে যেতে হলে এই ছড়া দিয়ে হেঁটেই যেতে হবে। তবে পথগুলো মসৃণ নয়। একবার আমি একটা ভয়ানক সমস্যায় পড়েছিলাম।

nab (34).JPG…….
মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রে।
…….
আমি যাব ধোপাছড়ি গ্রামে। আমার সঙ্গে ছিল আরও তিন বন্ধু। যাচ্ছিলাম একটা বৈষয়িক বিষয়ের সুরাহা করতে। ধোপাছড়ি যেতে হলে বনভূমি পাড়ি দিয়ে যেতে হবে। আমার বাড়ি থেকে ওই গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১২ মাইল। পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে ১২ মাইল পথ পাড়ি দেয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ছড়া থেকে একটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আবার নিচে নামা আমাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। তাছাড়া এসব পাহাড়ে চলাফেরায় আমরা একরকম অনভ্যস্ত ছিলাম। আমরা সকাল সকাল রওনা দিয়েছিলাম। দুপুরে আমাদের পৌঁছতে হবে। কাজ সেরে আবার সন্ধ্যার আগে আগে বাড়ি ফিরতে হবে। ব্যাপারটা খুব বেশি সহজ ছিল না। কিন্তু আমাদের কাছে ওটা খুব বেশি কঠিনও মনে হয়নি। কারণ আমরা ছিলাম তারুণ্যের উচ্ছলতায় উদ্দীপিত। একেকটা পাহাড় ডিঙাতে গিয়ে আমাদের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসছিল। ঘামে আমাদের কাপড়চোপর একরকম একশা হয়ে যাচ্ছিল। ক্লান্তির ভারে আমাদের শুয়ে পড়ার মত অবস্থা। কিন্তু আমাদের তারুণ্য কোনো কিছুতে হার মানতে রাজি নয়। আমরা হাঁটছিলাম আর উচ্চৈঃস্বরে গান করছিলাম। মাঝে মাঝে আমরা হনুমানের মত চিৎকার করছিলাম। আমাদের ডাকে যারা বনে কাঠ এবং বাঁশ কাটতে গিয়েছিল তারাও আমাদের চিৎকারে অনুরূপ সাড়া দিচ্ছিল। আমরা আপন মনে হাঁটছিলাম। হাঁটছিলাম পাহাড়ের চূড়ার ওপরে বাঁশবনের ভেতর দিয়ে। একসঙ্গে এত বাঁশ আমি তার আগে আর কোনোদিন দেখিনি। এ বাঁশবন ছিল অনেকটা পাটক্ষেতের মত। পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে তো হাঁটা যায়, কিন্তু বাঁশবনের ভেতর দিয়ে হাঁটা তো দূরের কথা আপনি ঢুকতেও পারবেন না।

আমরা পাহাড়ের চিকন চিকন পথ ধরে হাঁটছিলাম। কিন্তু আমাদের রাস্তা ফুরোতে চাইল না। দুপুর পার হতে বসেছে, কিন্তু আমরা কোনো লোকালয়ের দেখা পেলাম না। সত্যি আমরা পথ ভুলে গিয়েছিলাম। আমরা কু-উ-উ, কু-উ-উ করে চিৎকার করতে থাকলাম। ভেবেছিলাম কেউ আমাদের ডাক শুনে সাড়া দেবে, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।

আমাদের পথ চলা থেমে নেই। আমরা হাঁটছি আর হাঁটছি। হঠাৎ আমরা গাছ কাটার শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা খুব দূরে মনে হল না। আমরা ওদিকে হাঁটতে থাকলাম। আমাদের বেশি যেতে হয়নি। দেখলাম এ গহীন বনে একজন লোক মাঝারি ধরনের একটা গাছের গোড়ায় কুঠার চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা স্বস্তি পেলাম অন্তত তার কাছে আমরা পথের নিশানা খুঁজে পাব। আমরা তিন তরুণ ছিলাম প্যান্ট-শার্ট পরা। সাধারণত বনের ভেতর কেউ এ ধরনের পোশাক পরে যায় না। আমাদের সাহেবিয়ানা দেখে লোকটা ভয় পেয়ে গেল। সে হয়ত ভেবেছিল আমরা ফরেস্ট অফিসের লোক। সে কুঠারখানা কাঁধে নিয়ে দৌড়াতে আরম্ভ করল। আমরা তাকে থামতে বললে সে আরও জোরে পা চালাতে থাকে। আমরাও তার পিছু পিছু ছুটলাম। এক সময় সে পাহাড় থেকে থলিতে নেমে গেল। চারদিকে পাহাড় এবং মাঝখানে কয়েক শ’ ফুট গভীর জায়গাটাকে পাহাড়ি লোকজন থলি বলে। কোনো কোনো থলি হাজার ফুটের মত গভীর। আমরা আশ্চর্য হয়ে একটা জিনিস লক্ষ করলাম লোকটা পরনের লুঙ্গিটা খুলে একেবারে উলঙ্গ হয়ে গেল। তারপর কুঠারখানা হাতে নিয়ে অশ্লীল ভাষায় বলতে থাকল, আলার পুত আলারা ইক্কা আইলে এক্কুইবারে কোবাই কোবাই মারি ফেলাইয়ুম। (শালার পুত শালারা এদিকে এলে কোপাতে কোপাতে একেবারে মেরে ফেলব।)
আমরা তাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আঁরা তোয়ার হন খারাপ গইরতাম ন। আঁরা ফরেস্টর মানুষ নয়। আঁরা পথ আঁজাই ফেলাই ত, তুঁই আঁরারে এক্কেনা পত্থান দেহাই দেও। আঁরা ধোয়াছড়ি যাইয়ুম। (আমরা তোমার কোনো অন্যায় করব না। আমরা ফরেস্ট অফিসের লোক নই। আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি, তুমি আমাদের পথখানা দেখিয়ে দাও। আমরা ধোপাছড়ি যাব।)

মনে হল লোকটা আমাদের কথা বিশ্বাস করেছে। সে লুঙ্গিখানা পরতে পরতে ওপরের দিকে আসতে থাকল। কাছে এসে বলল, আঁই তো মনে গরগিলাম ফরেস্টর মানুষ। এহন কি কওনের আছে ক? (আমি তো মনে করেছিলাম ফরেস্ট অফিসের মানুষ। এখন কী বলার আছে বলুন?)

আমি বললাম, আঁরা ধোয়াছড়ি যাইয়ুম। হুনদি গেলে গম অইব। (আমরা ধোপাছড়ি যাব। কোনদিকে গেলে ভাল হবে।)

সে আঙুলে দেখিয়ে দিয়ে বলল, অই পাআরর উরদি উত্তুর মিক্কা যও গৈ। কদ্দুর গেলে একখান ছাড়া পাইবা। অই ছাড়া বাইয়েরে পুক মিক্কা গেলে ধোয়াছড়ি। (ওই পাহাড়ের ওপর দিয়ে উত্তর দিকে চলে যাও। কত দূর গেলে একটা ছড়া পাবে। ওই ছড়া ধরে পুবদিকে গেলে ধোপাছড়ি।)

আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু লোকটার অদ্ভুত কাণ্ড দেখে আমাদের বারবার হাসি পেতে থাকল।

এই বনাঞ্চল আমাকে নানা কারণে বহুবার পাড়ি দিতে হয়েছে। কখনও একা, কখনও সঙ্গী-সাথীসহ। তবে বনাঞ্চলে কখনও একাকী বিচরণ করা উচিত নয়। একবার আমি ধোপাছড়ি থেকে আসার সময় সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছিল। আমি সবেমাত্র বনাঞ্চলের উঁচু পাহাড়টায় এসে পৌঁছেছি। খানেক বাদে সন্ধ্যা নেমে আসবে। আমাকে ঘন অরণ্যের ভেতর দিয়ে কখনও পাহাড়ে কখনও ছড়া দিয়ে পথ চলতে হবে। আমি একরকম সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। চট্টগ্রামের পাহাড়ে ভয়ানক বন্য জীবজন্তুর বিচরণ তেমন একটা নেই বললে চলে। শুনেছি আগে চিতাবাঘের বেশ উৎপাত ছিল। এখন মাঝেমধ্যে তার দেখা মেলে। হরিণ ছিল প্রচুর। শিকারীরা তার অবশিষ্ট রাখেনি। বানর-হনুমান রয়েছে হাজার হাজার। চট্টগ্রামের পাহাড়ে আমি যত বানর-হনুমান দেখেছি তার সিকিভাগও আমি কোথাও দেখিনি। বন্য শুয়োর আছে প্রচুর। আছে হাতির পাল। এরা মানুষকে তেমন আক্রমণ না করলেও তাদের ক্ষেতখোলার বেশ ক্ষতি করে। এজন্য কৃষকদের রাত জেগে থেকে তাদের ফসলের পাহারা দিতে হয়। হাতি তাড়ানোর একমাত্র কায়দা হল ফাঁকা গুলি। মশাল জ্বালিয়ে তাড়ায় শূকরের পাল। মাঝে মধ্যে ভালুকে আক্রান্ত মানুষ আমি দেখেছি। ভালুক প্রথমে মানুষের মুখমণ্ডলে হামলা করে, এটা আমার বিশ্বাস। কারণ এ পর্যন্ত আমি বেশ কজন ভালুকে আক্রান্ত মানুষ দেখেছি তাদের মুখমণ্ডল একেবারে ক্ষতবিক্ষত। এসব মানুষ ওদের কবল থেকে কীভাবে বেঁচে এসেছে সেটা জানার সুযোগ কোনোদিন আমার হয়নি। সাপের অবাধ বিচরণও মানুষের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্ষাকালে এত জোঁকের জন্ম হয় মানুষ-গরু-ছাগল কোনোটাকে আক্রান্ত না করে ছাড়ে না। এক ধরনের জোঁক আছে যেটাকে চাঁটগেয়ে ভাষায় বাতারা জোঁক বলে। এই জোঁক কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। প্রাণীর রগ ফাঁটিয়ে তারা রক্ত চুষে খায়। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পেট না ভরবে ততক্ষণ তারা চামড়ার সঙ্গে একেবারে লেগে থাকে। যখন জোঁক রক্ত খেয়ে একেবারে ফেটে যাবার মত অবস্থা হয় তখন সে ঝরে পড়ে। কিন্তু আক্রান্ত প্রাণীর রক্ত বন্ধ হয় না। তার রক্ত ঝরতে থাকে আর ঝরতে থাকে। এক সময় সে মরতে বসে।

থাক ওসব কথা। আমি ঘন অরণ্যের ভেতর দিয়ে পাহাড় বেয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এক পাল বন্য কুকুর আমার দিকে তেড়ে এল। আমি অসম্ভব রকম আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমার এমন কোনো উপায় ছিল না এই কুকুর থেকে নিজেকে রক্ষা করি। আমি যদি গলা ফাটিয়ে চিৎকারও করি কেউ আমাকে বাঁচাতে আসবে না। আমার অজানা নেই বন্য কুকুরের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করা একরকম দুঃসাধ্য। আমি ভয় পেলাম বটে, কিন্তু মনে মনে একটা সাহস সঞ্চয় করতে থাকলাম। তবে সব সময় সাহসে কাজ হয় না। আমি কৌশল অবলম্বন করলাম। যখন কুকুরগুলো একেবারে সন্নিকটে চলে এল আমি লাফ দিয়ে একটা গাছে উঠে পড়লাম। এখন যখন মনে পড়ে আমি হাসি। এ ধরনের কাণ্ড আমি সত্যি সত্যি ঘটিয়েছিলাম। কুকুরগুলো কিছু সময় অপেক্ষা করে ওখান থেকে সরে গেল। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি সাহস করতে পারছিলাম না গাছ থেকে নিচে নামি। কিছুক্ষণ পর দুজন লোক এল ওই পথ দিয়ে। আমি তাদের দেখে গাছ থেকে নেমে এলাম।

যা হোক, ওই সময় থেকে আমি পাহাড় এবং বনাঞ্চলের কথা উঠলেই ভয় পেতাম। কেউ যদি আমাকে বলত পাহাড়ি অঞ্চল ঘুরতে যাবে আমি রাজি হতাম না। আমি মনে মনে ধরে নিতাম পাহাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য এবং ভীতিকর পরিস্থিতি কোনোটাই আমার অজানা নয়। সুতরাং পাহাড়ি অঞ্চল ঘুরে বিশেষ কাজ নেই।


উনিশ শ’ একানব্বই সালের ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের গ্রামে বেশ কিছু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমি আমার কাকা আহমদ ছফাকে ধরে একটা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওইসব ঘরবাড়ি মেরামত করে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। তখন ওই প্রতিষ্ঠানের কিছু তরুণ ঢাকা থেকে গ্রামটি পরিদর্শনে এসেছিল। তারা কাজের ফাঁকে একদিন আমাকে ধরে বসল তাদের বান্দরবান নিয়ে যেতে হবে। আমি কোনোদিন বান্দরবান যাইনি। কেবল এতটুকু জানি আমার বাড়ি থেকে বান্দরবান যেতে দেড় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বান্দরবান একটি পাহাড়ি এলাকা। সুতরাং পাহাড়ি এলাকা দেখতে কেন যেতে হবে আমি একটুও ভেবে পাইনি। আমি তো আগেই পাহাড়ের স্বাদ পেয়ে গেছি। কিন্তু আমার ওই তরুণ বন্ধুদের চাপে পড়ে আমাকে বান্দরবানে যেতে হয়েছিল।

সময়টা ছিল বর্ষাকাল। মুষলধার বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আমরা বাসে চেপে পথ চলছিলাম। সাতকানিয়ার কেরানিহাট পর্যন্ত ছিল আমার চেনা পথ। তারপর বাস যখন মোড় নিয়ে পুবদিকে চলা আরম্ভ করল আমার কাছে সবই অচেনা। কয়েক কিলোমিটার যাবার পর আমি বায়তুল ইজ্জত জায়গাটির সঙ্গে পরিচিত হলাম, যেটিকে এতদিন বিডিআর ক্যাম্প হিসেবে জেনে এসেছি। জায়গাটা ভারি সুন্দর। এখানে সেখানে কিছু বিডিআর সদস্যের বিচরণ লক্ষ করলাম। যাক, একটা নতুন জায়গা দেখার সুযোগ লাভ করলাম।

আমরা লোকালয় পেরিয়ে পাহাড়ের দেশ বান্দরবানে ঢুকে পড়লাম। আমি চট্টগ্রামের পাহাড়ের চে’ এখানকার পাহাড়ের একরকম ভিন্নতা লক্ষ করলাম। চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে চড়লে এক পাহাড় থেকে আর পাহাড় দেখা যায় না। ওখানকার পাহাড়গুলো বড় বড় গাছপালায় আচ্ছাদিত। ঝোপ-জঙ্গলও বেশ। ফলে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে দূরে দৃষ্টি প্রসারিত করা সম্ভব নয়।

পাহাড়ি অঞ্চলে প্রথম গাড়িতে করে যাবার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। উঁচু পাহাড়ে ওঠার সময় মানুষ যেমন একটা নিঃশ্বাসের পর আরেকটা নিঃশ্বাসের নাগাল পায় না তেমনি গাড়িগুলোর একই দশা লক্ষ্য করলাম। বান্দরবান শহরে যাবার পথে উঁচু যেই পাহাড়টি পড়ে তার নাম লেইচা। এই পাহাড়ে ওঠার সময় আমাদের গাড়িটাকে মনে হল তার যৌবন হারিয়ে ফেলেছে। গোটা রাস্তা যেভাবে গাড়িটি সদর্পে চলেছিল এখানে এসে সে একরকম নেতিয়ে পড়েছে। গাড়িখানা যত ওপরের দিকে উঠছিল ততই সে গোঁ গোঁ শব্দ করতে থাকল, যেভাবে মানুষ প্রসববেদনায় আর্তনাদ করে। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যদি গাড়িটা চালকের নির্দেশ না মেনে দিক হারিয়ে নিচে পড়ে যায়, তখন আমরা তো দূরের কথা গাড়িরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাহাড়ের ধার কেটে কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। গাড়িতে বসে ওপর থেকে নিচের দিকে তাকালে আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না। প্রতিটি মোড় বড়ই বিপজ্জনক। আপনি সোজা যাচ্ছেন তো যাচ্ছেন হঠাৎ দেখতে পাবেন প্যাঁচানো একটা মোড়। তার আগে আপনি লক্ষই করেননি এখানে বিপদসঙ্কুল একটা মোড় রয়েছে।

এই রাস্তায় যারা গাড়ি চালান তারা ভীষণ রকম অভিজ্ঞ। কোনো আনাড়ি চালক এখানে এসে সহজে গাড়ি চালাতে পারবে না। চালালেও তাকে ভীষণ বেগ পেতে হবে। গাড়ি যখন ওপরের দিকে উঠতে উঠতে হঠাৎ মোড় নিত আমার নিঃশ্বাস একরকম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হত। কিন্তু লেইচা পাহাড়ের ওপর থেকে অন্য পাহাড়ের সৌন্দর্য অবলোকন করে যে আনন্দটা আমি পেয়েছিলাম সেটা আমার ভয় কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়েছিল। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এতগুলো পাহাড় দেখার সুযোগ এর আগে আমার আর কোনোদিন হয়নি। এই পাহাড়গুলোতে বড় বড় বৃক্ষের সমারোহ নেই বটে, কিন্তু কোথাও সবুজের ঘাটতি নেই।

আমরা অল্প সময়ের মধ্যে বান্দরবান শহরে চলে গেলাম। শহরটা আমাকে তেমন একটা খুশি করতে পারেনি। আমাদের গ্রামের বাজারটা তার চে’ প্রশস্ত। পার্থক্য এটুকু এখানে কিছু সরকারি অফিস আদালত রয়েছে। এখন অবশ্য বান্দরবান শহরের কিছুটা প্রসার ঘটেছে। বান্দরবান যাবার পথে পাহাড় এবং শহর দেখে আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিলাম। আমরা ধরে নিয়েছিলাম বান্দরবান আমাদের দেখা হয়ে গেছে। তখন বান্দরবান সম্পর্কে এত বেশি প্রচার-প্রসার ছিল না যে সেখানে বিশেষ কিছু দেখার আছে। আমরা ক্ষুধার্ত ছিলাম, কিন্তু কোথাও গিয়ে তৃপ্তিসহকারে ভূরি ভোজন করতে পারি তেমন হোটেল খুঁজে পাইনি। তৃতীয় শ্রেণীর একটা হোটেলে ঢুকে আমাদের খিদে নিবারণ করতে হয়েছিল। বান্দরবান সম্পর্কে এটা ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।


আমার বন্ধু গফুর বান্দরবানে এখন একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আমরা দুজনে এক সঙ্গে এসএসসি পাশ করেছিলাম। আমাদের দু’জনের মধ্যে সখ্য ছিল। গফুরের আর্থিক অবস্থা বিশেষ ভাল ছিল না। তারা বাবা বাজারে বাজারে সবজি বিক্রি করতেন এবং বর্গাজমি চাষ করতেন। তাতে করে তাদের অভাব-অনটনের সংসার কোনোভাবে চলতে চাইত না। তাদের একটা ষাঁড় ছিল। বেশ বড়সড়ো। সম্পদ বলতে তাদের ওটাই ছিল। তার বাবা কোরবানির হাটে গরুটি বিক্রি করেছিলেন। এটি উনিশ শ’ তিরাশি সালের কথা। ওই সময়ে গরুটি বিক্রি করে আট হাজার টাকা পেয়েছিলেন। এই সময়ে হলে তার তার দাম হত পঞ্চাশ হাজার টাকার ওপরে। তার বাবা এ টাকাটা নিয়ে নানারকম স্বপ্ন দেখছিলেন। একবার ভাবেন কিছু বন্ধকি জমি নিয়ে চাষাবাদ করবেন। আবার ভাবেন ছোট ছোট আরও দু’ চারটি গরু পুষবেন। এ-ও ভেবেছিলেন অন্তত থাকা যায় এমন একটা ঘর তৈরি করবেন। কিন্তু গফুরের পড়াশুনা নিয়ে তিনি কোনো রকম চিন্তা করলেন না। পড়াশুনা করেই-বা কী হবে। পরের জমিতে একবেলা কামলা দিলে পঞ্চাশ টাকা পাওয়া যায়। সুতরাং পড়াশুনার চাইতে গফুরের কামাইটা তার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু ওসবে সে অভ্যস্ত নয়।

একদিন সে একটা পিয়নের চাকরির লোভে থানচিতে গেল। একটা চাকরি তখন খুব দরকার ছিল। কিন্তু থানচিতে গিয়ে সে নিরাশ হয়ে ফিরে এল। মনটা তার ভারি খারাপ হয়ে আছে। সে বান্দরবান শহরে একটি দোকানের সামনে এসে বসল। দোকানি হয়ত তার পূর্ব-পরিচিত। একথা সেকথা বলতে বলতে দোকানি বলল, দোকানটা সে মালামালসহ বিক্রি করে দেবে। গফুর বলল, কত টাকা?

দোকানি বলল, পাঁচ হাজার টাকা হলেই ছেড়ে দেব। তুমি করবে কিনা ভেবে দেখ।

গফুর আমতা আমতা করতে থাকল। বলল, আমার তো টাকা নেই।

হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল তার বাবার গরুবেচা টাকার কথা। তখনই সে বলে বসল, এই দোকান আমি করব। আমাকে একদিন সময় দাও।

দোকানি সম্মতি জানাল, তাই হবে।

কারণ দোকানি বাকিতে মাল বিক্রি করতে করতে সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিল। সে দোকানটা ছেড়ে দিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে। দোকানটা ছিল মধ্যম পাড়ায়, যেখানে পাহাড়িরা বাস করে। এই পাহাড়িদের সম্পর্কে গফুরের কোনো ধারণা ছিল না। তারপরেও সে রাজি হয়ে গেল।

গফুর ওইদিনই বাড়ি এসে গরুবেচা টাকাটা কোথায় রেখেছে খোঁজা আরম্ভ করে দিল। সে জানত বেশি টাকা থাকলে তার বাবা তা ধানের বস্তার ভেতরে লুকিয়ে রাখেন। টাকাটা চুরি করে পরের দিনই গফুর পালিয়ে গেল।

গফুর যে গেল আর ফিরে আসে না। বাড়ির লোকজনের মধ্যে খোঁজাখুঁজি পড়ে গেল। তার মা কেঁদে কেঁদে অস্থির, চোখের পানি ফেলতে ফেলতে অন্ধ হবার যোগাড়। কিন্তু বাবার কাছে ছেলে নয়, তিনি টাকার শোকে পাথর হয়ে গেলেন। তারা বিভিন্ন গণকের কাছে গিয়ে জানতে পারলেন ছেলে দেশে নেই। সে ভারত পেরিয়ে পাকিস্তান চলে গেছে।

গফুর দোকানিকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দিল। বাকি তিন হাজার টাকায় আরও কিছু মালামাল কিনল। সেই দিন তার সাত শ’ টাকা বিক্রি হয়। তাতে তার দু’ আড়াই শ’ টাকার মত লাভ হয়েছিল। জীবনে কোনোদিন সে একসঙ্গে এত টাকা কামাই করেনি। প্রথম দিনেই সে সাহসী হয়ে উঠল।

abdul-gafur.jpg…….
লেখকের বন্ধু আবদুল গফুর।
…….

এই দোকানের ওপর ভর করে বর্তমানে সে অনেক সহায়-সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছে। বান্দরবান শহরের সবচে’ বড় মুদির দোকানটি তার। জমজম হোটেল নামে ভোজনশালাটি বান্দরবানের সকলে চেনে। বান্দরবানে একমাত্র এই ভোজনশালাটিই মোটামুটি মান রক্ষা করে খাবার পরিবেশন করে। আমার এ বন্ধুটিকে নিয়ে আমার ঈর্ষা হয়। যে দেশে মানুষ অসদুপায়ে বিত্তশালী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে আমার এই বন্ধুটি তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আমি বান্দরবানের কথা বলতে গিয়ে কেন এই বন্ধুটির কথা বলছি। আমার বন্ধুটি আছে বলেই আমাকে প্রায়ই বান্দরবান যেতে হয়। গফুরকে আমি বলেছিলাম, তোর বান্দরবন লইয়েরে মানুষ এত সুন্দর সুন্দর কথা কয়, এত নাম গরে আঁর কিন্তু এক্কেনাও পছন নয়। (তোর বান্দরবান নিয়ে মানুষ এত সুন্দর সুন্দর কথা বলে, এত তারিফ করে আমার কিন্তু একটুও পছন্দ নয়।)

তখন সে আমাকে প্রশ্ন করল, তুই বান্দরবনর হডে গিয়ছ? (তুই বান্দরবানের কোথায় গিয়েছিস?)

আমি তাকে বললাম, বান্দরবনে যাইবার জাগা হডে? ছোড একখান শঅর, আধা ঘণ্টা আঁডিলে আর আঁডার জাগা ন থাগে। একখান বৌদ্ধমন্দির আছে। ইয়ান ছাড়া আর হডে যাইবার জাগা আছে। রাজবাড়ির একখান বড় মাঠ আছে, জিয়ান ডায়াবেটিস রোগির কামত আইয়ে। ঈতারা আজন্যা বেইন্যা এ্যাডে দৌড়াদৌড়ি গরে। ঈয়ান ছাড়া আর কী আছে ক? (বান্দরবানে যাবার জায়গা কোথায়? ছোট একটা শহর, আধা ঘণ্টা হাঁটলে আর হাঁটার জায়গা থাকে না। একটা বৌদ্ধমন্দির আছে। ওখানে ছাড়া আর কোথাও যাবার জায়গা আছে? অবশ্য রাজবাড়ির একটা বড় মাঠ আছে, যেটি ডায়াবেটিস রোগির কাজে আসে। তারা সকাল-বিকাল ওখানে দৌড়াদৌড়ি করে। তাছাড়া আর কী আছে বল?)

সে হেসে বলল, বান্দরবন শঅরত চোগে লাগিবার মত কিছু নাই। তুই পাআরত গিয়স না? (বান্দরবান শহরে চোখ ধাঁধানো কিছু নেই। তুই কি পাহাড়ে গিয়েছিস?)

আমি বললাম, ন যাইবার কী আছে? আইবার সমত বওত পাআরই ত চোগত পরে। তুই কি পাআর ইয়ুনুর হতা হদ্দে না? (না যাবার কি আছে? আসার সময় তো অনেক পাহাড়ই তো চোখে পড়ে। তুই কি ওসব পাহাড়ের কথা বলছিস?)

গফুর বলল, হ, আঁই অই পাআর ইয়ুনুর হতা হদ্দি। তুই আইবার সমত জিয়ুন দেইখ্যস সামান্যই দেইখ্যস। চিম্বুক, নীলগিরি, কেওকেডাং ইয়ুন তো বওত দূর। এ্যাডে যওন সমর ব্যাপার। বান্দরবন শঅরর কাছে মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র। এ্যাডে যা, তারপর আঁর লয় কথা কইস। (হ্যাঁ, আমি ওইসব পাহাড়ের কথা বলছি। তুই আসার সময় যা দেখেছিস সামান্যই দেখেছিস। চিম্বুক, নীলগিরি, কেওকেডাং এগুলো তো অনেক দূর। ওখানে যাওয়া সময়ের ব্যাপার। বান্দরবান শহরের কাছে মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র। ওখানে যা, তারপর তুই আমার সঙ্গে কথা বলিস।)

তাৎক্ষণিকভাবে মেঘলা যাবার ইচ্ছে এবং সময় আমার কোনোটাই ছিল না। আমি ঢাকায় থাকি। কালেভদ্রে আমাকে কোনো কাজের খাতিরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে যেতে হয়। ২০০২ সালের দিকে আমার সহকর্মী আলাউদ্দিন সাহেব বলে বসলেন, সামনের কোরবানির ঈদ কীভাবে কাটাবেন?

আমি বললাম, শুয়ে শুয়ে ঘুমাব। সময়ে সময়ে বই পড়ব। গান শুনব। মনে ধরলে টেলিভিশন দেখব। সময় দিব্যি কেটে যাবে।

তিনি জানতেন কোনো ঈদে আমি কোথাও যাই না। তখন আমি ব্যাচেলার জীবনযাপন করতাম। আমি আরও কিছু ব্যাচেলার জুটিয়ে নিয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে আমি বেশ ছিলাম। ঈদের ছুটিতে তারা আমাকে রেখে গ্রামের বাড়িতে ছুটে যেত। কেউ কেউ আমাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে চেষ্টা করত। আমি রাজি হতাম না। কেন জানি না বাড়ি যেতেও মন চাইত না। তার কিছু কারণও ছিল। মাঝে মাঝে আমি একাকীত্বকে বেশ মানিয়ে চলি। তখন নানা ধরনের ভাবনা আমার মাথায় এসে ভর করে। আমি জীবনটাকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ পাই। জগৎ সংসার থেকে আলাদা হয়ে থাকার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ আছে। এক কথায় সেটাকে আমি উপভোগ করার চেষ্টা করতাম। মন্দ লাগত না। যা হোক আলাউদ্দিন সাহেব বললেন, আপনার মধ্যে কি কোনো অভিমান কাজ করে?

আমি বললাম, মোটেই না। মানুষ ত্রিশ দিন রোজা রেখে ক্ষুধা জিনিসটা কী উপলব্ধি করে। আমি কটা দিন একাকী থেকে উপলব্ধি করি মুনি-ঋষিরা কীভাবে বন-জঙ্গলে কাটিয়ে দেয়।

আলাউদ্দিন সাহেব বললেন, আপনি যদি আমাকে কদিন সময় দেন আপনাকে নিয়ে আমি আপনাদের চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘুরে আসতে চাই। আমার একা একা যেতে মন চাইছে না। তাছাড়া আপনাদের ওই এলাকা সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই।
আমি তার কথায় সায় না দিলেও পরে রাজি না হয়ে পারিনি। ঈদের পরদিন আমরা গিয়েছিলাম কক্সবাজার। তারপর সেন্টমার্টিন। সেন্টমার্টিন ঘোরার পরও দেখলাম তার ভ্রমণতৃষ্ণা মিটেনি। তিনি আমাকে ধরে বসলেন বান্দরবানে যাবেন। আমি বললাম, আপনার ইচ্ছাই শিরোধার্য।

আসলে বান্দরবান যাওয়াটা আমার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না। বন্ধু গফুরের সঙ্গে দেখা করাটাই ছিল আমার অভিপ্রায়।

আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। গিয়ে দেখি বান্দরবান শহরটা একরকম জনশূন্য। ঈদের ছুটিতে প্রায় সকলে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। আমার বন্ধুও তাদের কাতারভুক্ত হয়েছে। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। আশেপাশের লোকজনের কাছে জানলাম এ সপ্তাহে তার ফেরার সম্ভাবনার একেবারে ক্ষীণ। আমরা কেন বলতে পারব না ব্যাগ দুটি তার দোকানের সামনে রেখে ওখানে থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি তো আলাউদ্দিন সাহেবকে বান্দরবানে নিয়ে এলাম, কিন্তু এখানকার কিছুই তো আমি চিনি না। তাকে আমি কোথায় নিয়ে যাব!

আমি হোটেলে যাবার কথা ভাবতে থাকলাম। বান্দরবানে তখন থাকার ভাল কোনো হোটেল ছিল না। আমরা নানাজনের কাছে জিজ্ঞেস করতে থাকলাম কোথায় গিয়ে ওঠা যায়। আমরা ব্যাগ দুটি কাঁধে ঝুলিয়ে যখন পথ চলতে আরম্ভ করলাম গফুরের ছোট ভাই জাফরের দেখা পেয়ে গেলাম। সে হাসতে হাসতে আমাদের দিকে ছুটে এল। বলল, অনারা কত্তুন? (আপনারা কোথা থেকে?)

আমি বললাম, আঁর বন্ধুরে লইয়েরে বেরাইতে আইস্যিলাম দে। কিন্তু এডে আইয়েরে তোঁয়ারারে কেয়ারে ন পাইয়েরে হোটেলত যাইদ্দি। (আমার বন্ধুকে নিয়ে বেড়াতে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে তোমাদের কাউকে না পেয়ে হোটেলে চলে যাচ্ছি।)

সে বলল, হোটেলত যওনের দরহার নাই। আঁরার বাসা খালি। আরও পাঁচজন থাইলেও অসুবিধা অইত নয়। যেই কদিন থাইকত চন এডে থাইত পারিবান। (হোটেলে যাবার দরকার নেই। আমাদের বাসা খালি। আরও পাঁচজন থাকলেও অসুবিধা হবে না। যে কদিন থাকতে চান এখানে থাকতে পারবেন।)

আমি বললাম, গফুর হডে? (গফুর কোথায়?)

সে জবাব দিল, বদ্দা আইসতে আরও কদিন লাগিব। বাড়িত গরবা আছে। (বড় দাদা আসতে আরও কদিন লাগবে। বাড়িতে মেহমান আছে।)

আমরা তার ডেরায় গিয়ে আশ্রয় পাতলাম। শীত তখন মোটামুটি জেঁকে বসেছে। তাদের টিনের ঘরটি দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ঘরে পর্যাপ্ত কাঁথা-কম্বল দেখে সেই ভয়টি কেটে গেল। জাফরকে বললাম, তোঁয়ার হনো কাম আছে না? আঁরা এক্কেনা ইক্কা ওইক্কা ঘুইরতাম চাই। তুঁই আঁরারে সময় দিত পারিবা না? আঁই ত বান্দরবানের কিছু ন চিনি? (তোমার কোনো কাজ আছে? আমরা একটু এদিক ওদিক ঘুরতে চাই। তুমি কি আমাদের সময় দিতে পারবে? আমি তো বান্দরবানের কোনো কিছু চিনি না।)

জাফর বলল, অনারে আঁই আগেই কইয়ি আঁর হনো কাম নাই। অনারা জেডে যাইত চন আঁই ওঁয়ারে যাইয়ুম। (আপনাদের আমি আগেই বলেছি আমার কোনো কাজ নেই। আপনারা যেখানে যেতে চান আমি সঙ্গে যাব।)

জাফরের সম্মতি জেনে আমার মনটা আনন্দে নেচে উঠল। আমি তাকে বললাম, আঁরা হডে হডে যাইত পারি? (আমরা কোথায় কোথায় যেতে পারি?)

সে জানাল, আঁই অনারারে দুইয়ান জাগাত লই যাইত পারি। এক্কান অইলদে মেঘলা, আরেক্কান চিম্বুক। চিম্বুক আজিয়া যাইত পাইরতান নয়। কালিয়া যন পরিব। যাইতে আইসতে একদিন লাগিব। মেঘলা কাছে আছে। দুই তিন মাইল অইব। আঁরা মেঘলাত যাইত পারি। এহন গেলে আজন্যার আগে আগে আয় যাইত গৈ পাইরগম। (আমি আপনাদের দুটি জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। একটা হল মেঘলা, আরেকটা চিম্বুক। চিম্বুকে আজকে যেতে পারবেন না। আগামীকাল যেতে হবে। যাওয়া-আসায় একদিন লাগবে। মেঘলা কাছে আছে। দুই তিন মাইল হবে। আমরা মেঘলায় যেতে পারি। এখন গেলে সন্ধের আগে আগে চলে আসতে পারব।)

আমি বললাম, তইলে দেরি গরি লাভ নাই। ইত্তারাই রওয়ানা দিই। (তাহলে দেরি করে লাভ নেই। এখনই রওয়ানা দেই।)

জাফর বলল, ঠিক আছে। কিন্তু রাতিয়া আইয়েরে খাইয়ম কী? হনো হোটেলত ত রান্নাবান্না অইত নয়। (ঠিক আছে। কিন্তু রাতে এসে খাব কী? কোনো হোটেলে তো রান্নাবান্না হবে না।)

আমরা বললাম, ভাতর চিন্তা গরি লাভ নাই। রাতিয়া চুড়া মুড়ি কিছু এক্কান অইলে চলিব। (ভাতের চিন্তা করে লাভ নেই। রাতে চিড়া-মুড়ি কিছু একটা হলেই চলবে।)

জাফর বলল, অনে অইলে হতা ন আছিল। ওঁয়ারে গরবা আছে। অনারা থিয়ন, আঁই এহনই আইর। (আপনি হলে কথা ছিল না। সঙ্গে মেহমান আছে। আপনারা দাঁড়ান, আমি এখনই আসছি।)

জাফর দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কথা যা হচ্ছে আমাদের দুজনের মধ্যে। আলাউদ্দিন সাহেব চুপচাপ। মাঝে মধ্যে তিনি হ্যাঁ-হুঁ জবাব দিয়ে চলেছেন। জাফর চলে যাবার পর তিনি মুখ খুললেন, আনোয়ার সাহেব, উনি কোথায় গেলেন?
আমি বললাম, সে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে গেছে। তিনি বললেন, আমরা এসে বেচারারে কষ্টে ফেলে দিলাম। আমি বললাম, আমার তো কিছু করার নেই, যা করছে সে খুশি মনে করছে।

দশ পনের মিনিট পরে জাফর ফিরে এল। সে যা জানাল, আমাদের ভাগ্য ফর্সা। রান্না করার একজন লোক পাওয়া গেছে। সাঙ্গু নদের একটা রুই মাছ কিনে তাকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। মাছটি খুবই তাজা। এধরনের মাছ সচরাচর মেলে না। তার অনেকদিনের শখ সাঙ্গু নদের মাছ খাবে। আমরা আসাতে তার সে ইচ্ছেটি পূরণ হল। তাই চড়া দাম দিয়ে একটা মাছ সে কিনে ফেলেছে। আমাদের জন্য তার গাঁটের পয়সা খোয়াতে হল তা সে চেপে গেল।

আমরা একটা বেবি টেক্সিতে করে মেঘলা চলে গেলাম। দু’ তিন কিলোমিটার পথ যেতে আমাদের বিশ পঁচিশ মিনিট লেগেছিল। উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে বেবি টেক্সির কোনো কোনো সময় দম আটকে যাবার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু কোনো রকম সমস্যা হয়নি। জাফর বেবি ভাড়াটা মিটিয়ে দিল।

পর্যটনে ঢোকার জন্য টিকেট কাটতে হয় সেটা আমার জানা ছিল না। জাফর বলল, অনারা ইঁয়ত থিয়ন, আঁই টিকেট লই আই। (আপনারা এখানে দাঁড়ান, আমি টিকেট নিয়ে আসছি।)

আমি জাফরকে বললাম, তোঁয়ার টিকেট কাডন লাইগত নয়। টিকেট আঁইই কাইট্টম। (তোমার টিকেট কাটা লাগবে না। টিকেট আমিই কাটব।)

জাফরকে থামানো গেল না। সে দ্রুত টিকেট কাউন্টারে চলে গেল। এখানে বোধকরি তেমন লোকজন আসে না। কাউন্টারে লোকজনের ভিড় তেমন একটা চোখে পড়ল না। শুনতে পাই অল্পদিন আগে এটা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। অদ্যাবধি তার প্রচার প্রসার ঘটেনি। আমি কথাগুলো বলছি দুই হাজার দুই সালের।

প্রধান সড়কের পাশেই মেঘলার প্রবেশ পথ। আমরা যখন গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম আমি টের পেতে থাকলাম বান্দরবান যাবার রাস্তাটি অনেক ওপরে। আমরা সিঁড়ি বেয়ে এক দু’ শ’ ফুট নিচে নামলাম। তারপর খানিকটা পাকা রাস্তা। রাস্তাটি এত নিন্মমুখী যে আমরা নিজেদের ধরে রাখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কোনো একটা অদৃশ্য শক্তি আমাদের সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।

আমাদের হাতে ক্যামেরা দেখে জাফর দুটো ফিল্ম কিনে নিয়েছিল। তার কথা হল, যেখানে যাব ছবি তুলব। দরকার হলে আরও ফিল্ম কিনে নেব। আমাদের পেয়ে একধরনের উৎসাহ তার মধ্যে কাজ করতে থাকল। গেট পেরিয়ে অল্প পথ যেতে না যেতেই জাফরের বেশ কটি ছবি তুলতে হল। না তুলে উপায় কী। অদ্ভুত এক সুন্দর জায়গা। পুরো জায়গাটা ছবির মত। আমার মনে হল আমি ছবি থেকে ছবি তুলে চলেছি। আমরা কোনো সুন্দর কিছু দেখলে ছবির সঙ্গে তুলনা করি। বলে থাকি ছবির মত সুন্দর। এই জায়গাটি এত সুন্দর, আমার কেন জানি মনে হতে থাকল, আমি যে তার ছবি তুলছি তাতে আসল স্বরূপ ফুটে উঠবে কিনা। ব্যাপারটি এই রকম, অনেক সুন্দরী রমণী আছে দেখতে অপূর্ব, কিন্তু ক্যামেরায় তোলা ছবি তেমন ফুটে ওঠে না। অনেক সময় কদর্য রমণীর চেহারাও ক্যামেরার তোলা ছবিতে ভাল দেখায়।

আমরা অল্প সময়ের মধ্যে একটি হ্রদের কাছাকাছি চলে এলাম। হ্রদটির ওপরে একটি টানা ব্রিজ। পুরো ব্রিজটা কাঠের তৈরি। মোটা তারের রশি দিয়ে তা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। রাঙ্গামাটির টানা ব্রিজে আমি গিয়েছি। ছবিতে ওটা যত সুন্দর দেখায় বাস্তবে তত নয়। ওই ব্রিজটির গড়ন মজবুত। কোনো রকম নড়চড় নেই। বান্দরবানের মেঘলার টানা ব্রিজটির একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটতে গেলে দোল খায়। মনে হবে এখুনি পড়ে যাব। আপনি যদি তাল রেখে চলেন অন্যরকম একটা আনন্দ পাবেন।

দার্জিলিং হয়ে আমার মিরিক যাবার সুযোগ হয়েছিল। ওখানে পাহাড়ের ওপর একটা কৃত্রিম হ্রদ রয়েছে। এই হ্রদ ওই পাহাড়ে একধরনের বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। নেপালের পোখরাও একটি হ্রদের কারণে আপন মহিমায় মহিমান্বিত। মেঘলার হ্রদটিও পুরো জায়গাটিকে অনন্য করে রেখেছে। একটা জিনিস আমার চোখে বারবার ভাসছে। মিরিক এবং পোখরার হ্রদ খোলামেলা, বাংলার কোনো কোনো দিঘির সঙ্গে ওগুলোর সামঞ্জস্য রয়েছে। কিন্তু মেঘলার হ্রদ মনুষ্যসৃষ্টি বিবর্জিত। এখানে মানব সন্তানের কোনো হাত নেই। প্রকৃতির আপন মহিমায় এটি লালিত। দু’ পাশে অসংখ্য গাছপালা এবং লতাপাতা হ্রদটিকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যে কারও মনে হবে ওই সমস্ত বৃক্ষরাজি আঁকাবাঁকা জলরাশিকে বুকের তলায় আগলে রেখে নিজের করে নিচ্ছে। বৃক্ষ এবং লতাপাতায় ঘেরা হ্রদের এই জলরাশি মেঘলার এক বাড়তি আকর্ষণ তো বটেই।

nab (38).JPG

আমরা টানা ব্রিজ পেরিয়ে ওপারের পাহাড়ে চলে গেলাম। পাহাড়ে দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের পাহাড় আর পাহাড়। বৈকালিন সূর্যের রক্তিম আলোর দীপ্তি পূর্বদিকের পাহাড়গুলোর বৃক্ষরাজিকে লাবণ্যময়ী করে তুলেছে। আমি একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে অন্য পাহাড়গুলো অবলোকন করছি। আমার বারবার মনে হচ্ছিল আমি যদি ওই পাহাড়গুলোতে ছুটে যেতে পারতাম? জানি না, ওই পাহাড়গুলো আরও কত সুন্দর!

মেঘলার উঁচু পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে দু’ চোখ জুড়ে যায়। অদ্ভুত এক সুন্দর জায়গা। আমরা যে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়েছিলাম তারও উঁচু পাহাড় ওখানে রয়েছে। কিন্তু ওপরে উঠার কোনো জো নেই। একটা পাহাড় রয়েছে, যার একপাশ একেবারে খাঁড়া, একেবারে ঘরের দেয়ালের মত। হতে পারে কোনো কালে কোনো দুর্যোগের কবলে পড়ে পাহাড়টির অর্ধাংশ ঝরে পড়ে গেছে। খাঁড়া এ অংশটিতে কোনো গাছপালা নেই। তাই বলে পাহাড়টির একটুও সৌন্দর্যহানি ঘটেনি। বরঞ্চ বিস্তীর্ণ সবুজের মাঝে একটা টিপের মত হয়ে আছে ভাঙা অংশটি।

আমরা পাহাড় ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম। অপর পাড়ের পাহাড়ে গিয়ে দেখলাম। ছোট একটা চিড়িয়াখানা। একটা খাঁচায় বন্দি বেশ কটি হরিণ। পাশের খাঁচায় কিছু খরগোশ। প্রাণীগুলোকে আমার বড়ই অসহায় মনে হল। তারা মানুষ দেখলে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তখন তাদের প্রতি বড়ই মায়া হয়। এই প্রাণীগুলোকে খাঁচার মধ্যে বন্দি না রেখে যদি গাছপালা আচ্ছাদিত পাহাড়ের একটি অংশকে ঘিরে রাখা হত তাহলে বেশ মানানসই মনে হত। ওখানে তারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারত এবং পর্যটকদের কাছে তা আকর্ষণীয় বস্তুতে পরিণত হত।

আমরা সন্ধ্যাবধি মেঘলায় ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দিলাম। মেঘলা এমন একটা জায়গা চোখে কোনো রকম ক্লান্তি আসে না। আমার যদি সুযোগ থাকত আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওখানে বসে থেকে কাটিয়ে দিতাম। সেই সুযোগ আমার ছিল না। সূর্য ডুবে গিয়েছে। একটা বড় আফসোস নিয়ে আমাকে মেঘলা থেকে বেরিয়ে আসতে হল।

আমরা পুনরায় একটা বেবি টেক্সিতে করে বান্দরবানে চলে এলাম। জাফর বলল, আর হনো মিক্কা যাইবান না? (আর কোথাও যাবেন কিনা?)

আমি জবাব দিলাম, বান্দরবানে ত আর হনো মিক্কা যওনের জাগা নাই। (বান্দরবানে আর কোথাও তো যাবার জায়গা নেই।)

সে বলল, বৌদ্ধ মন্দির!

আমি বললাম, বৌদ্ধ মন্দির আঁই আগে দেকখি। (বৌদ্ধ মন্দির আমি আগে দেখেছি।)

জাফর পুনরায় বলল, এহন ত রাইত অই গিয়ে গৈ। একদিন দিনের বেলায় সঙ্গ খাল [সাঙ্গু নদ] ঘুরি দেখাইয়ুম। (এখন তো রাত হয়ে গেছে। একদিন দিনের বেলায় শঙ্খ খাল ঘুরে দেখাব।)

জাফর আমাদের নিয়ে গিয়ে আদিবাসী পল্লীগুলো ঘুরে ঘুরে দেখাল। পাহাড়িদের একটা জিনিস আমার কাছে ভীষণ ভাল লাগে–তারা সহজ সরল কিন্তু আমাদের বাঙালি ললনার মত লাজুক প্রকৃতির নয়।

nab (19).JPG

আমি কক্সবাজার নিয়ে লিখেছি। আমি যখন মাতার বাড়িতে থাকতাম, প্রতিদিন বাইসাইকেলে চড়ে বেড়ি বাধ পরিদর্শন করতে যেতাম। তখন দেখতাম গ্রামের মেয়েরা আমাকে দেখে লাল কাঁকরার মত দৌড় দিয়ে ঘরে ঢুকে যেত। আমার এখনও মনে পড়ে, একজন বৃদ্ধা বলেছিলেন, দুইন্নাই আর বেশি দিন নাই। মানুষ দুই চাক্কার গাড়িত চড়ি ঘুরি বেরায়। হালে হালে আরও হত কিছু দেইখ্যুম? (দুনিয়ার আর বেশি দিন নেই। মানুষ দুই চাকার গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কালে কালে আরও কত কিছু দেখব?)

ওই বৃদ্ধার কথা শুনে আমার মনে হয়েছিল এই ধরনের অনেক মানুষ এখনও বাংলাদেশে আছে যারা কখনও নিজ গণ্ডির বাইরে যায়নি এবং অনেক কিছু দেখেনি। বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের অনেকেই ওই বৃদ্ধার মত এখনও আধুনিক জীবনপ্রণালীর সঙ্গে পরিচিত নয়। জাফর যখন আমাদের পাহাড়ি পল্লীতে নিয়ে গেল অনেকে আমাদের সমাদর করল। তার একটা বড় অংশ মেয়ে। জাফরকে তারা সকলে চেনে। সেই সূত্রে আমরাও তাদের কাছের হয়ে গেলাম। বাঙালি মেয়েদের মত তারা পালিয়ে বেড়ায় না। জাফরকে একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করল, এ মানু কত্তুন আইস্যে দে? (এই মানুষ কোথা থেকে এসেছে?)

জাফর জবাব দিল, ঢাহাত্থুন। (ঢাকা থেকে।)

সে অবাক কণ্ঠে বলল, ঢাহাত্থুন! তুঁই মানুর লয় অনেক মানুর পরিচয়। (ঢাকা থেকে! তুমি মানুষের সঙ্গে অনেক মানুষের পরিচয়।)

তাদের থাকা-খাওয়া-পরা সবই ব্যতিক্রম। আমাদের বাঙালিদের কাতারে তাদের কোনোভাবে ফেলা যাবে না। এক সময় তারা খুবই সহজ সরল ছিল। তারা এখন কিছুটা হিসেবি হয়ে উঠেছে। আমরা বাঙালিরা খোঁচাতে খোঁচাতে তাদের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। যতই তারা বাঙালিদের সংশ্রবে আসছে নিজেরা নিজেদের বুঝতে শিখছে। তারপরেও তারা ঘোর-প্যাচ রেখে কথা বলে না। একটা সত্য ঘটনার কথা বলি। আমার এলাকার একজন লোক থানচি থেকে তরিতরকারি, কলা ইত্যাদি কম দামে কিনে এনে বেশি দামে বিক্রি করে। একদিন সে ওখানে গিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে আর ফিরতে পারেনি। ফলে রাতে এক পাহাড়ির বাড়িতে তাকে আতিথ্য গ্রহণ করতে হয়েছে।

পার্বত্য এলাকার পাহাড়িদের ঘরগুলো মাচা করে বানানো সেটি কারও অজানা নয়। ওই মাচাঘরে তাকে থাকতে হয়েছিল। হঠাৎ রাতে তার ঘুম ভেঙে গেল। মাচাটা মচমচ শব্দ করছে। সে ভয় পেয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল। তার পাশে শোয়া ছিলেন গৃহকর্তা। তিনি বললেন, তুমি মানু ঘুমত্থুন উইঠ্য কিল্লাই। ঘুমো। আঁর ছেলে পোয়া বানা দে। (তুমি মানুষ ঘুম থেকে উঠছ কেন? ঘুমাও। আমার ছেলে বাচ্চা তৈরি করছে।)

যা হোক, জাফর আমাদের নানা জায়গায় ঘুরিয়ে তাদের হোটেলে নিয়ে এল। রাত তখন প্রায় ন’টা বাজে। হোটেলের দরজা খুলে দেখলাম, যে লোকটিকে জাফর রান্না করতে বলেছিল সে রান্না করে টেবিলে সাজিয়ে রেখে চলে গিয়েছে। জাফর বলল, চলন আঁরা খাই লই। কালিয়া বেইন্যা সরে সরে ঘুমুত্তন ওডন পরিব। নইলে গাড়ি পাইতাম ন। (চলুন আমরা খেয়ে নেই। আগামীকাল ভোরে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হবে। নইলে গাড়ি পাব না।)

জাফর অতি বাস্তববাদী ছেলে। তার চিন্তাভাবনা হিসেবি। তার কথার বাইরে যাবার সাহস আমার নেই। সে যা বলে আমাদের অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আমরা বেসিনে হাত ধুয়ে খেতে বসে গেলাম। খাবারের আয়োজন বিশেষ জাঁকজমক না হলেও আমাদের জন্য যথেষ্ট বলা চলে। তরকারি হিসেবে ছিল ডাল, সবজি, মাছ। সাঙ্গু নদের মাছের প্রতি ওই এলাকার মানুষের একটা লোভ বিদ্যমান। সেটি আমারও অজানা ছিল না। কিন্তু সেই মাছ খাওয়ার ভাগ্য আমার কোনোদিন হয়নি। জাফর বড় বড় দু’ টুকরো মাছ আমাদের পাতে তুলে দিল। তাজা মাছের স্বাদ তো আছেই, তাছাড়া সাঙ্গু নদের মাছ বলে কথা। আমরা বেশ আগ্রহ নিয়ে তা খেতে থাকলাম। অস্বীকার করব না সেই মাছের স্বাদ আমি এখনও ভুলিনি।

জাফর আমাদের বিছানাপত্তর ঠিক করে দিল। গোটা দিন আমাদের কোনো বিশ্রাম ছিল না। শরীরে একরকম ক্লান্তি এসে ভর করেছিল। আলাউদ্দিন সাহেব ছিলেন আমাদের হাতের পুতুলের মত। তাকে যা বলি কেবল শুনে যাচ্ছিলেন। কোনো কিছুতে তার দ্বিমত নেই। তাকে বললাম, আলাউদ্দিন ভাই, চলুন এবার ঘুমিয়ে পড়ি।

তিনি বললেন, মন্দ হয় না।


পরের দিন আমাদের খুব ভোরে জাগতে হল। জাফরই আমাদের ঘুম ভাঙানোর দায়িত্বটা পালন করেছে, নইলে ঠিক সময়ে আমরা উঠতে পারতাম না। আমরা পালা করে সকালের যাবতীয় কাজ সেরে নিলাম। বান্দরবানে শীতের সময় খুব ঠাণ্ডা এবং গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম। গোসলটা নিয়ে একরকম ভয় ছিল। এত ভোরে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে কীভাবে গোসল সারব ভেবে উঠতে পারছিলাম না। জাফর বলল, বেইন্যা টিউবওয়েলের পানি গরম থাগে। আগোদি কিছু পানি চাবি চাবি ফেলাই দেওন। (সকালবেলা টিউবওয়েলের পানি গরম থাকে। আগে কিছু পানি চেপে চেপে ফেলে দিন।)

আমার ধারণা ছিল না সকালবেলা নলকূপের পানি গরম থাকে। আমি জাফরের কথা মেনে মিনিটখানেক নলকূপের হাতল চেপে চেপে পানি ফেলে দিলাম। সত্যি তাই। আমি এক সময় গরম পানির সাক্ষাৎ পেয়ে গেলাম। জাফর নলকূপের পানি চাপতে থাকল, আর আমি শরীরে পানি ঢালতে থাকলাম। মন্দ নয়। নলকূপের পানি যতই শরীরে ঢালছি আমি এক রকম উষ্ণতা অনুভব করতে লাগলাম। আমার শরীর থেকে দেখলাম বাষ্প বেরুচ্ছে। আলাউদ্দিন সাহেবকে বললাম, আলাউদ্দিন ভাই, আমি খুব মজা পাচ্ছি। বিশ্বাস করুন আমার একটুও শীত লাগছে না।

তিনি বললেন, আপনি মজা পাচ্ছেন সেটা ঠিক আছে। কিন্তু জাফর সাহেব যে হাঁপিয়ে উঠেছেন সেদিকেও একটু খেয়াল রাখুন।

আমি বললাম, তাই তো!

আমি তাড়াহুড়ো করে গামছা দিয়ে শরীর মুছে নিলাম। আলাউদ্দিন সাহেবও গোসল করতে করতে একই কথা স্বীকার করলেন, আসলে তাই, পানিটা মোটেই ঠাণ্ডা নয়।

সকাল সাতটা বাজার আগে আমরা তৈরি হয়ে একটা হোটেলে ঢুকে নাস্তা সেরে নিলাম। তারপর একটা রিকশায় করে রুমা বাস স্টেশনে চলে গেলাম। পাহাড়ের পাদদেশে এ বাস স্টেশনটি। তেমন গাড়ি-ঘোড়া নেই। গাড়ি বলতে দু’ তিনটি লক্করঝক্কর মার্কা জিপ গাড়ি। স্থানীয় ভাষায় চান্দের গাড়ি। চান্দের গাড়ির কথা আমি বহুবার শুনেছি। এই গাড়ি দেখার ইচ্ছে আমার মনে বহুবার জাগ্রত হয়েছিল। কিন্তু সুযোগ হয়নি। গাড়ির জগতের তৃতীয় শ্রেণীর এ জিপকে চান্দের গাড়ি নামকরণ করায় আমি মনে মনে হাসলাম। বিচিত্র গাড়ির বিচিত্র নাম। আমার ধারণা ছিল চান্দের গাড়িতে খান্দানি লোকজনে চড়ে। আমার অনুমান ভুল প্রমাণিত হল। আমরা গাড়িতে ওঠার আগে দেখলাম দু’জন বাঙালি শ্রমিক এবং ক’জন পাহাড়ি সেখানে স্থান করে নিয়েছে। তাদের সঙ্গে দা, কাস্তে, কোদাল, লম্বা ছুরি এবং এক ধরনের ঝুড়ি। ঝুড়িগুলোকে স্থানীয় ভাষায় থুরুম বলে, যেগুলো পাহাড়িরা পিঠে ঝুলিয়ে রাখে। জাফর বলল, তাড়াতাড়ি গাড়িত উডি বইয়ুন, নইলে বইত পাইত্তান ন। (তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসুন, নইলে বসতে পারবেন না।)

আমরা পাহাড়িদের পাশে বসে পড়লাম। একজন মহিলা হাতে তৈরি আস্ত তামাকের চুরুট টানছে। সে যখন নাক মুখ দিয়ে ধুম্ররাশি উদগীরণ করে পুরো গাড়ি ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। চুরুটের এক ধরনের উৎকট গন্ধে আমি অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। তামাক পোড়া গন্ধ সম্পর্কে আমি অপরিচিত নই। কিন্তু অপরিশোধিত তামাকে তৈরি চুরুটের গন্ধ কত ভয়ানক হতে পারে প্রথম টের পেতে থাকলাম। তারপরেও আমাকে সহ্য করে থাকতে হল। একবার ইচ্ছে হয়েছিল নিষেধ করি। আবার মনে মনে ভাবলাম যদি হিতে বিপরীত হয়? শুনেছি পাহাড়িরা একরোখা ধরনের। সে যা করছে তার স্বাধীনচেতা মন নিয়ে করছে। আমার নিষেধ অমান্য করে সে যদি আমাকে দা-ছুরি দিয়ে আঘাত করে বসে তখন আমি কী করব? তার আশেপাশে ধারাল অস্ত্রশস্ত্রের তো অভাব নেই। আমি ভেতর থেকে চেপে গেলাম। শহরের পাতিকাক এসে গ্রামের দাঁড়কাকের ওপর তো খবরদারি করতে পারি না। মনে মনে ভাবলাম এটা প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোকের গাড়ি নয়। তারা নিত্যদিনের যাত্রী। তাদের ভাড়ার টাকায় এসব গাড়ি চলে। আমরা কালেভদ্রে এসব গাড়িতে চড়তে আসি। সুতরাং তাদের স্বাধীনতায় তো হস্তক্ষেপ করতে পারি না।

আমি নিজেকে সংযত করতে চেষ্টা করলাম।

দশ মিনিটের মাথায় পুরো গাড়ির চেহারা পাল্টে গেল। আমি কোথায় উঠলাম! এতুটুকুন একটি গাড়িতে বড়জোর দশ থেকে বারজন মানুষ চাপাচাপি করে বসতে পারে। সেখানে প্রায় বিশ-পঁচিশজন মানুষ ঠায় করে নিল। ভেতরে যত মানুষ বসেছে তার চে’ বেশি ঝুলে আছে গাড়ির পেছনে। এটাকে কার সঙ্গে তুলনা করব? মৌচাকে বসে থাকা মৌমাছির সঙ্গে, নাকি গাছে থোকা থোকা ঝুলে থাকা কাঁঠালের সঙ্গে? গাড়ি যখন যাত্রা আরম্ভ করল একরকম গোঁ গোঁ শব্দ করতে থাকল। মনে হতে থাকল গাড়িটার যেন প্রসববেদনা শুরু হয়ে গেছে।

nab (41).JPG
নীলগিরি পাহাড়

যত কিছুই আমার মনে হোক না কেন, এ সকল মাটির মানুষের সঙ্গে বসে ভ্রমণের মজাটাই আলাদা। এধরনের বিচিত্র মানুষের সান্নিধ্য পাওয়াও একটা ভাগ্যের ব্যাপার। প্যান্ট-শার্ট পরা ভদ্রলোকের সংখ্যায় আমরা ছিলাম অল্প। সুতরাং আমরা তাদের মাঝে এক রকম বেমানান হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে আমরা একটা মোড়ে চলে এলাম। এ মোড়ে ছোটখাটো একটা লোহার সেতু। তার পাশে রয়েছে একটা ঝর্নাধারা। জায়গাটা এমন ইচ্ছে করলে গাড়ি বেগ নিয়ে চলতে পারছিল না। সে সুবাদে আমি ঝর্নাটা বেশ ভালভাবে দেখার চেষ্টা করলাম। পানির প্রবাহ খুব বেশি ধারালো নয়। একটা শ্যাওলা জন্মানো কালো পাথরের ওপর দিয়ে পানির ধারাটা ছেয়ে পড়ছিল। তখন বেশ লাগছিল। আমি জাফরকে বললাম, ফেরার পথে আমরা এখানে নামব।

সে না করল না।

আমরা যাচ্ছিলাম চিম্বুক পাহাড় দর্শন করতে। বান্দরবান শহর থেকে দশ পনের মিনিট পথ চলার পর আমরা উঁচু পাহাড়ে চলে গেলাম। তখন পুব আকাশে উদীয়মান সূর্য কুয়াশা ভেদ করে পাহাড়ের গায়ে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। আমরা গাড়ির বাম পাশে বসেছিলাম। যতদূর আমার চোখ যাচ্ছিল দিগন্তপ্রসারি কেবল পাহাড় আর পাহাড়। আমি যত পথ পাড়ি দিচ্ছিলাম চমকে চমকে উঠছিলাম। প্রতিটি পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা ধোঁয়ার মত কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে আছে। সবুজ পাহাড়ে এই ধোঁয়ার কুণ্ডলী সৌন্দর্যের অন্যরকম আবহ সৃষ্টি করেছিল। মাঝে মাঝে একেকটা কুণ্ডলীকে মনে হত পেঁজা তুলোর মত। শীতের সূর্যের কোমল আলোতে এগুলোকে বেশ ফর্সা দেখাচ্ছিল। দিগন্তবিস্তারী সবুজ পাহাড়ের সমারোহ এবং তার সৌন্দর্য দেখে দেখে আমি একরকম আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম। একি আমার দেশ, নাকি অন্য কোথাও এসেছি!

আমি একবার শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং গিয়েছিলাম। আমাদের বাহন ছিল এরকম চাঁন্দের গাড়ি। পাহাড়ি অঞ্চলে কেন এধরনের গাড়ি চলে আমার জানা নেই। হতে পারে এ গাড়িগুলো পাহাড়কে বেশ মানিয়ে চলতে পারে। গাড়িতে বসে আমার দার্জিলিং-এর পাহাড় দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রথম দেখায় যে যা দেখে তাই ভাল লাগে। দার্জিলিং আমার ভাল লেগে গিয়েছিল। আমি একরকম প্রেমেও পড়ে গিয়েছিলাম। ভ্রমণ শেষে অনেকদিন পুরো দার্জিলিংটা আমার চোখে ভাসিয়ে রেখেছিলাম। আমি কোনো নৈসর্গিক দৃশ্যের সঙ্গে দার্জিলিংকে তুলনায় আনতে পারিনি। বান্দরবানের পাহাড়ের চেয়ে দার্জিলিং-এর পাহাড় আরও উঁচু। এটা হতে পারে তার অহংকারের বিষয়। কিন্তু দার্জিলিং বান্দরবানের সৌন্দর্যের কাছে হার মানতে বাধ্য। বান্দরবানের পাহাড় যৌবনদীপ্ত লাবণ্যময়ী। আপনি যত দেখবেন চোখে কোনো রকম ক্লান্তি নেমে আসবে না। দার্জিলিং-এর পাহাড়ের সে ক্ষমতা নেই। ওসব পাহাড়ের শরীর মাঝে মাঝে নগ্ন দেখায়। খানেকটা ক্ষত-বিক্ষতও। সবুজে আছে কৃত্রিমতা, যা মানবহস্তে লালিত। ওখানকার যা কিছু সুন্দর বান্দরবানের পাহাড় ওরকম কিছু নয়। বান্দরবান পাহাড়ের সৌন্দর্যে কোনো খুত নেই। প্রকৃতির আপন মহিমার নিপুণ হাতে পুরোটা গড়া এবং পুরো পাহাড়ি অঞ্চল যেন একটা সবুজের মেলা।

(কিস্তি ২)

—–

লেখকের অন্য রচনা
ছফামৃত (ধারাবাহিক রচনা)
সেন্টমার্টিন: দইরগার চরত বেরাই টেরাই হনো মজা ন পাইবা…
কক্সবাজার: হক্কল জাগা পুরি খাইলাম ন পাইলাম চাডিয়ার নান!
সিলেটে
সুন্দরবন: এক সবুজ বস্ত্রখণ্ড!

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: নূরুল আনোয়ার
ইমেইল: nurulanwar1@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাজী আবু ইউসুফ — অক্টোবর ২, ২০১১ @ ২:৫৫ অপরাহ্ন

      আঁর তো আন্নের লেখা বহুত পসন্দ হয়। তয় আন্নের স্থানীয় ভাষা শিখার শখ খুউব বেশি। আন্নের ভ্রমণ কাহিনী আগের দুইটা লেখা পড়েছি কক্সবাজার, সিলেট নিয়া লেখা। ধন্যবাদ। সুন্দর লেখার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শফিক শাহীন — অক্টোবর ২, ২০১১ @ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

      আঞ্চলিক শব্দই যদি দিবেন, তবে বদ্দা ‘ফাআরত্’ ন হিল্লাই?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূরুল আনোয়ার — অক্টোবর ১০, ২০১১ @ ৯:৫৫ পূর্বাহ্ন

      কাজী আবু ইউসুফ এবং শফিক শাহীন আঁর লেখা পইরগি, গম লাইগ্যি বদ্দা। বওত ধন্যবাদ। চাঁটগাইয়ারা প-রে ক্ষেত্র বিশেষে ফ উচ্চারণ গরে, ইয়ান ঠিক আছে। তই পাআরে ফ অইত নয় বদ্দা। গম থাইক্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন yusuf reza — অক্টোবর ১২, ২০১১ @ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন

      নিজের পরিচয়েই আপনি এখন লেখক। ভাল লাগল লেখাটা। আপনাকে অনেক থ্যাংকস।
      yusuf_reza@hotmail.com

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Orannya — অক্টোবর ১২, ২০১১ @ ১:৪২ অপরাহ্ন

      দারুণ লিখা। সত্যিই উপভোগ্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন MITU — অক্টোবর ২৯, ২০১১ @ ৯:২৮ অপরাহ্ন

      সত্যি খুব ভাল লেগেছে। বন্য কুকুরের তাড়া খেয়েছিলেন কত সালে ?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tarek — জুন ১৯, ২০১২ @ ২:০৩ অপরাহ্ন

      আপনার ভ্রমন কাহিনি পরে ভাল লাগে।একটা বই আকারে এসব প্রকাশ করলে মনে হয় আর ভাল হবে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com