খণ্ডিত জীবন (কিস্তি ৭)

ফয়েজ আহ্‌মদ | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১ ১০:৪৪ অপরাহ্ন

কিস্তি ১ | কিস্তি ২ | কিস্তি ৩ | কিস্তি ৪ | কিস্তি ৫ | কিস্তি ৬

(কিস্তি ৬-এর পরে)

আমি ঢাকায় আইসা কলেজে ভর্তি হইতে যাই। জগন্নাথ কলেজে। থাকতাম এক ভাইয়ের বাসায়, জেলখানার পাশে, আবুল হাসনাত রোডে। আমার চাচতো ভাই ছিলেন উনি, সে এই বাড়িটা সরকারের কাছ থেকে পাইছিলো, থাকার জন্য। সে সরকারের কাজ করে—পূর্ব পাকিস্তান সরকারের। সেই বাড়িটার সাথে একটা এক্সট্রা রুম ছিলো, পূজার রুম ছিলো ওইটা। বাড়িটা ছিলো হিন্দুদের। পাকিস্তান হবার পর ইন্ডিয়া চইলা গেছে। তখন পরিত্যক্ত বাড়ি হিসাবে সরকারের লিস্টে ছিলো ওই বাড়ি। সরকারি অফিসাররা খুঁইজা খুঁইজা বাইর করতো এই ধরনের বাড়ি, কইরা সরকারের কাছে আবেদন করতো থাকার জন্য। আমার ভাই ছিলো পুলিশের ডিএসপি তখন। ডিএসপি মানে ডেপুটি সুপারিন্ডেন্ট অব পুলিশ।

fayez-k-7.jpg
১৯৭৩ সালে মওলানা ভাসানীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বঙ্গবার্তা’র প্রধান সম্পাদক ফয়েজ আহ্‌মদ , টেপ রেকর্ডার ধরে আছেন বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানী। ছবি: অজানা

সে সরকারের কাছে আবেদন করলো যে আমারে বাড়ি দাও, বাড়ি পাওনা হইয়া গেছে তাঁর। তখন সরকার তারে এই বাড়িটা দিছে। বাড়িটায় তার হইয়া দুই-তিনটা রুম বেশি হইছিলো। সেইখান থেকে একটা রুম আমাকে দিলো। পরে দেখলাম যে সেইটা ছিলো পূজার ঘর। হিন্দু ফ্যামিলির রোজকার পূজা হইতো সেই ঘরে। এইজন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিলো। নিচতলায় ছিলো সেইটা। আমি সেই ঘরে থাকতে শুরু করলাম। আমার ভাই ফ্যামিলি নিয়া থাকে উপরের তলায়।

মুন্সীগঞ্জে কলেজ ছিলো। আমার বোন ছিলো। কিন্তু আমি ভর্তি হইলাম ঢাকায়। কারণ ঢাকায় অ্যাডভান্টেজ বেশি, অনেক বেশি। মুন্সীগঞ্জে একটা রাস্তা, কয়েকটা চায়ের দোকান, একটা খেলার মাঠ, কয়েকটা সরকারি অফিস—এই তো! এই কারণে ঢাকায় ভর্তি হইতে আমার আগ্রহ বেশি ছিলো। কিন্তু আমার লেখাপড়া নিয়া গণ্ডগোল হইছে অনেক। আমার একটা মত, অন্যদের আরেকটা মত। এইসব গণ্ডগোলে আমার লেখাপড়া বেশি আউগায় নাই। কলেজ ছাড়ছি কয়েকবার। উল্টাপাল্টা অনেক কিছু হইছে আমার জীবনে।

কলেজে পড়ার সময় বাংলাবাজারে অনেক লাইব্রেরি ছিলো। আদিল ব্রাদার্স, প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরি, ইসলামিয়া লাইব্রেরি—এইগুলা খুব বড় বড় লাইব্রেরি ছিলো, হিন্দুদের বড়ো লাইব্রেরি ছিলো। তার অনেকগুলাই পরে ভারতে চইলা গেছে। এই লাইব্রেরিগুলা স্কুলের নোটবই ছাপাইতো। সেইসব কাজ আমিও কিছু করছিলাম। মনে আছে একবার ক্লাস সিক্সের ইতিহাস বই-এর নোটবই লিইখা দিছিলাম আমি। একটা ছেলে গ্রাম থেকে আইছে, মাত্র স্কুল পাশ কইরা—সে ইতিহাসের কী জানে! আমারে ইতিহাসের বই দিয়া কইলো—এইটারে সংক্ষিপ্ত কইরা লিখে দাও। আমি সারাংশ টাইপের লিইখা দিলাম। এইটা ফিফটির দিকে। আমার মতো আরো লোক ছিলো। ক্লাস ফাইভ বা সিক্স—বইলা দিছে আমাদের, আমরা ওইভাবে লিখছি। আমাদের দিতো চাইর থেকে ছয় টাকা ফর্মা। আমি হাতে লেইখা দিলাম, পরে কম্পোজ হইলো, তখন ফর্মার হিসাব করা হইতো। কম্পোজ কইরা হয়তো দেখা গেলো ১৬ পৃষ্ঠা হইছে। আমারে তখন ছয় টাকা দিলো। বেকার মানুষ কামাই করতে হবে। ইতিহাস লিখলাম, এইটা ওইটা লিখলাম, যখন যেটা দেয়। ইতিহাস, সাহিত্য—নানা রকম বই দিতো। এইভাবে লেইখা খাইছি কিছু দিন। আর যারা ছিলো তারা ওইগুলা লিখতে লিখতে মইরা গেছে, আমার মতো কেউ আর হইতে পারে নাই। আমার তো নানা দিক ছিলো—সাহিত্য করা, সাংবাদিকতা ইত্যাদি। এই কারণে আমি ওইগুলা থেকে বাইর হইতে পারছিলাম।

ছয় টাকা তখন একেবারে কম টাকা না, আমি খাইলাম, দাইলাম সেই টাকা দিয়া। ছয় টাকায় অনেক দিন চইলা যাইতো। একটা দোকান আছিলো—ইসলামিয়া নাম। ওইখানে এক ধরনের মুরগীর মাংস পাওয়া যাইতো—গ্লাসি বলতো সেইটারে। গ্লাসি এক টাকা না যেন বারো আনা দিয়া কিনতাম। আর দুইটা রুটি, আটার রুটি—বড়ো। খুব ভালো খাওয়া। আর যদি ভাজি দিয়া খাইতাম তাইলে আরো কম লাগতো।

আমার তখন খুব শখ ছিলো খাসির কলিজা খাওয়া। সেইটা বাসি হইলে আরো ভালো হয়। একদিন আগের রান্না, সেইটা গরম কইরা দেবে। চকবাজারে একটা দোকান আছিলো। চাইর আনা দিয়া এক প্লেট খাসির কলিজা পাওয়া যাইতো সেই দোকানে। টিনের একটা প্লেট, ছোট; আর দুইটা আটার রুটি। খাইয়া চইলা আইলাম, রাইতের খাবার হইয়া গেলো। আবার চকের ভিতরে বিরানির দোকান ছিলো। চকির উপরে পাটি বিছানো। চাইর আনা দিয়া এক প্লেট বিরানি খাইতাম আসন দিয়া বইসা।

নবাবপুরে একটা রেস্টুরেন্ট ছিলো। মুকুল সিনেমার গায়ে। নাম ছিলো ‘ওকে’। মহাযুদ্ধের সময় এই নাম বাইর হইছে। আমেরিকানরা কথায় কথায় কইতো ওকে, ওকে। সেইখান থেকে ওইটার নাম দেওয়া হইছিলো ‘ওকে’। খুব ভালো চা বানাইতো। সেইখানে একটা ডিম ফ্রাই আর দুইটা পাউরুটি খাইতাম, এক কাপ চা। ‘ওকে’ তখন খুব ফেমাস। সকালে চার আনায় এক পাউন্ড পাউরুটি পাওয়া যেত।

এই সময় আর যেইটা করতাম—সিনেমা দেখতাম। পঞ্চাশের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিনেমা মাঝেমাঝেই দেখতাম। পরে আস্তে আস্তে কইমা গেলো। সাংবাদিকতায় ব্যস্ত হইয়া গেলাম। তখন ঢাকায় ৭/৮ টা বড়ো বড়ো হল ছিলো। মুকুল হইলো সেই সময়। মুকুল হলটা ছিলো কোর্টের উল্টাদিকে। আরেকটা হইলো ‘মানসী’। নবাবপুর রোড দিয়া ডাইনে যাইতে হয়, বংশাল রোডে। বংশাল রোডের মুখেই ছিলো ‘সংবাদ’-এর অফিস। তখন সিনেমা বলতেই ছিলো হিন্দি সিনেমা। হলে হিন্দি সিনেমা চলতো, আর আমি প্রায়ই দেখতাম। আমাদের দেশেও কিছু সিনেমা হইতো, বাজে সিনেমা—ভালো না। কোলকাতাতেও ভালো সিনেমা ছিলো, তবে বোম্বে থেকেই আসতো বেশি। হিন্দি সিনেমা পরে আস্তে আস্তে বন্ধ হইয়া যায়। হলিউড থেকে ইংরাজি সিনেমাও আইতো, আরমানিটোলা একটা হল ছিলো, সেইখানে ইংরাজি সিনেমা চলতো। সবসময় না, মাঝে মাঝে।

আমি সিনেমা দেখতাম বাইছা বাইছা, সব দেখতাম না। বোম্বের নার্গিস ছিলো তখন আমার প্রিয় নায়িকা। আরো ছিলো সুরাইয়া, মধুবালা। উত্তম-সুচিত্রার সিনেমাও দেখতাম হলে। পথের পাঁচালি দেখছি; কিন্তু বোম্বের সিনেমাই বেশি দেখা হইতো। নার্গিস আর রাজ কাপুর খুব ফেমাস জুটি ছিলো। তখনই সুরাইয়াও আসলো। রাজ কাপুরের বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুরও ফেমাস ছিলো। পৃথ্বীরাজ কাপুর আর মধুবালার মুঘল-ই-আজম বিখ্যাত হইছিলো। আমি এইটা দেখছিলাম বেশ পরে।

আরো অনেক সিনেমা দেখছি, মনে নাই। বাংলা সিনেমা প্রায় দেখি নাই। ঢাকায় প্রথম যেইটা করলো, সেইটা আংশিক দেখছিলাম, ভাল্লাগে নাই। এর বাইরে ঢাকায় তৈরি করা বাংলা সিনেমা দেখি-ই নাই।

কিন্তু এগুলার বাইরে আমার একটা রাজনৈতিক এবং সাংবাদিক জীবন ছিলো। ১৯৫২ সালে আমি সংবাদ-এর ম্যাগাজিন সেকসনে ছিলাম। কিছু লোক–আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু—এম আর আকতার মুকুল, মোহাম্মদ সুলতান, আবুল হাসনাত—বন্ধু ছিলাম আমরা, এক বয়সের। আমরা মোটামুটি লেফটের দিকে ছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পর্কিত এবং গভীরভাবে সম্পর্কিত যুবলীগের সাথে। আমি কোন কমিটিতে ছিলাম না, অন্যরা ছিলো কিনা মনে নাই, তবে সুলতান ছিলো–যুবলীগে।

সো ফার আই রিমেম্বার নাইনটি নাইন নবাবপুর রোডে আওয়ামী লীগের প্রথম দিককার অফিস ছিলো। ৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় এই অফিসে একটা মিটিং হয়। সেই মিটিং-এ আমি গেছিলাম। মিটিং-এর বিষয় ছিলো—পরের দিন ১৪৪ ধারা বিষয়ে করণীয়। সেই সময় একটা কমিটি ছিলো—রাষ্ট্রভাষা প্রতিরোধ কমিটি, সর্বদলীয়, বেশ কয়েকদিন আগেই এই কমিটি করা হইছিলো। এই কমিটির মিটিং। মিটিং-এ অনেকেই আইছিলো। আতাউর রহমান ছিলো, ওলি আহাদ—আরো অনেকে, যারা নাকি তখন প্রগ্রেসিফ ফোর্সে কাজকর্ম করে। তাহা বলে একটা ছেলে ছিলো—ইসলামপন্থী, কিন্তু বাংলার পক্ষে। ২১-এর আগের রাতে গুরুত্বপূর্ণ এই সভা হয়।

তখন শেখ মুজিব ছিলো জেলে, মওলানা ভাসানী ছিলো ঢাকার বাইরে—যমুনা নদীতে নৌকায়। তো মিটিং আরম্ভ হয়। বিভিন্ন জন বক্তৃতা দেয়। কুড়ি তারিখেই ঢোল পিটাইয়া বলা হইছে যে ফর্টি ফোর জারি করা হইছে ঢাকা শহরে। এই ব্যাপারে সবাই ক্ষুব্ধ, কিন্তু এইটা কেমনে কি ফেইস করবে—সেইটা কেউ বলতে পারতেছে না বক্তৃতায়। বক্তৃতায় কেউ কেউ বললো—যেহেতু সরকার এই অ্যাটিচ্যুড নিছে, দে উইল ডেফিনিটলি টেক স্ট্রং অ্যাকসন। কী ঘটে তার ঠিক নাই। সুতরাং আমাদের ফর্টি ফোর ব্রেক করার প্রয়োজন নাই। কমিটির মেম্বারদের মেজরিটি সংখ্যা এই অভিমত দেয় যে প্রসেসন বের করা, শ্লোগান দেওয়া আমাদের প্রয়োজন নাই। সেই মিটিং-এ দুইটা ভাগ হইয়া গেলো। কিন্তু যারা ফর্টি ফোর ব্রেক করতে চায় তারা স্ট্রং, কিন্তু সভায় সংখ্যায় কম।

মিটিং টাইমলি আরম্ভ হইছে, কিন্তু অনেকেই তখনো আসে নাই। যুবলীগের সবাই তখনো পৌঁছায় নাই। তখন যুবলীগের জেনারেল সেক্রেটারি ছিলো ইমাদুল্লাহ। যুবলীগের অফিসে মিটিং, যুবলীগের কেউ নাই। মিটিং শেষ হওয়ার আগে ওলি আহাদ, সুলতান, ইমাদুল্লাহ—এরা দল বাইন্ধা উপস্থিত। এরা ছিলো মিলিট্যান্ট। তারা মিটি-এ প্রবেশ কইরা জানতে পারলো যে—এই মাত্র রেজুলেসন নেওয়া হইয়া গেছে। রেজুলেসন নেওয়া হইছে যে, ফর্টি ফোর ব্রেক করা হবে না। এইটা শুইনা খেইপা গেলো তারা। বললো, ‘আমরা আসি নাই—সবাই দেখতেছেন, নিশ্চই আমরা কোন মিটিং-মুটিং-এ জড়িত হইছি। আমরা রেগুলার মিটিং-এ আসি, সেই আমরা আসি নাই কেউ। সেইটা দেইখাও আপনারা কী কইরা রেজুলেসন নিলেন? এই রেজুলেসন আপনারা নিতে পারেন না। ক্যানসেল দি রেজুলেসন।’
তখন রেজুলেসন সংশোধনের কথা হলো।

[চলবে…]

পরের কিস্তি

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ফয়েজ আহমদ
ইমেইল: artsbdnews24@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shawkat — সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১১ @ ২:০২ পূর্বাহ্ন

      আহা…সেই ঢাকা শহরটা যদি আবার পাওয়া যেত…!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com